লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫১
লিজা মনি
অধিরাজ গাড়ির মধ্য থেকেই তানভীকে ফোন দেয়। কয়েকবার রিংটন হতেই ফোন রিসভ হয়। ওই পাশ থেকে মেয়েলী শান্ত আওয়াজ,
” হুম বলো।
অধিরাজ চোখ বন্ধ করে ফেলে। এই কন্ঠটা তার হৃদয়ে কতটা শীতল স্রোত বয়ে আনে সে নিজেও জানে না। কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
” কেমন আছো?
” ভালো আছি। তুমি?
তানভীর রোবটিক আওয়াজে অধিরাজ তপ্ত শ্বাস ফেলে। কন্ঠে অনেক অভিযোগ আর অভিমান মিশে আছে। সঠিক সময় আসলে সব অভিযোগ সে একত্রে ভেঙ্গে দিবে। অধিরাজ গাড়ি থামিয়ে সিটে হেলান দেয়। চোখ বন্ধ করে বলে,
” ভালো নেই।
তানভী খুব শান্ত সুরে বলে,
” অসুস্থ হলে মেডিসিন নাও।
” যদি বলি এই রোগের মেডিসিন আমার কাছে নেই।
” রাজ হেয়ালি করো না। এমনিতেই চিন্তায় থাকি তোমাকে নিয়ে। এইভাবে চিন্তায় ফেলে কি মিজা পাও তুমি?
অধিরাজ গম্ভীর হাসলো। চাপা গলায় বলে,
” তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তানভী। একটু নিচে আসবে?
তানভী শুয়া থেকে লাফিয়ে উঠে। চিন্তিত গলায় বলে,
” তুমি বাসার নিচে?
” হুম। তোমাকে দেখে চলে যাব।
তানভী ছটফট গলায় বলে,
” মামা বাসায় আছে। এখন বের হলে বিশ্রি একটা পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
অধিরাজ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” আমি আসব?
” কিভাবে?
” বেলকনির দরজা খুলে রাখো।
” দেয়াল দিয়ে উঠবে?
” হ্যা।
তানভী অধৈর্য হয়ে বলে,
” এই চারদিন যখন না দেখে থাকতে পেরেছো আজ রাত ও পারবে। কষ্ট করে মানিয়ে নাও। প্রমিস করছি
কাল দেখা করব।
অধিরাজের চোখ -মুখ শক্ত হয়ে উঠে। একটু দেখতেই এসেছিলো। এইভাবে রিজেক্ট করাটা সহ্য হলো না। দেখা করার ইচ্ছে থাকলে সাত সমুদ্র পার করেও আসা যায়। অধিরাজ ঠিক বুঝতে পেরেছে ইচ্ছেকৃতভাবে আসে নি।
তানভী নরম সুরে বলে,
” খেয়েছো তুমি?
” নাহহ।
অধিরাজের গম্ভীর কন্ঠ। তানভী সেসবে পাত্তা না দিয়ে বলে,
” এই মুহূর্তে বাসায় গিয়ে খাবার খাবে। এরপর ঘুমিয়ে যাবে চুপচাপ।
অধিরাজ তপ্ত শ্বাস ফেলে ফোন কেটে দিলো। রাগে ব্যাক সিটে ছুঁড়ে মারে। সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়। স্ট্রিয়ারিং ঘুরিয়ে যেতে থাকে নিজের গন্তব্যের দিকে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর ঠোঁটে হাসির ঝিলিক। যেন অধিরাজের এই রাগটাকে সে উপভোগ করছে।
নাজলী ওয়াশরুম থেকে চোখ মুখে পানি দিয়ে রুমে আসে। বিছানার দিকে তাকাতেই হতভম্ভ হয়ে যায়। আরিশ বিছানার এক পাশে বসে আছে। দুই আঙ্গুলের সাহায্যে মাথায় চেপে ধরে আছে।।চোখ-মুখের অবস্থা একদম বেহাল। নাজলী ভাবনার মধ্যেই কপাল কুচকে ফেলে।।এই লোক এই রুমে কেনো এত রাতে? সন্দেহের রেশ ধরে নাজলী এগিয়ে যায়। আরিশের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গলা খাঁকারি দেয়। আরিশ মাথায় হাত রেখেই ভারী গলায় বলে,
” তোমার মত কুম্ভকর্ণের উপস্থিতি দশ মাইল দুরে থেকেও বুঝা সম্ভব। কষ্ট করে আর গলা খাঁকারি দিতে হবে না।
নাজলী কুচকে যাওয়া ভ্রুঁ সোজা হয়ে আসে। তাকে কুম্ভকর্ণের সাথে তুলনা করলো! রাগে নাজলী দাঁত পিষে বলে,
” ভালো কথা মুখ দিয়ে বের হয় না, তাই না?
আরিশ এইবার তাকালো নাজলীর দিকে। ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” জন্মসূত্রে আমার অস্তিত্বে কোনো ভালো জিনিস নেই। ভালো কিছু বলা আমার জন্য কষ্টদায়ক।
নাজলী চুপ হয়ে যায়। ঠোঁট ভিজিয়ে চুল ঠিক করে বলে,
” এত রাতে আপনি আমার রুমে কি করছেন?
আরিশ চারপাশে তাকায়। কাঁধ নাড়িয়ে বলে,
” অন্য মেয়ের রুমে যাব, এমনটা আশা করছিলে?
” জাহান্নামে যান, তবুও এই রুম থেকে বের হন।
আরিশ বাঁকা হাসলো,
” জাহান্নামে গেলেও তোমাকে সাথে করেই নিয়ে যাব। চিন্তা করো না।
নাজলী নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করে। বিরক্তিকর কন্ঠে বলে,
” ভিক্ষুকের মত আমার পিছন পিছন ঘুরছেন কেনো?
আরিশের সোজা উত্তর,
” তুমি বড়লোক তাই।
নাজলী চুপ হয়ে যায়। সে বড়লোক এইটা বলে কি অপমান করলো? শান্ত গলায় বলে,
” উত্তর কিন্তু দেন নি। এই রুমে এসেছেন কেনো?
আরিশ এইবার উঠে দাঁড়ায়। চোখ – মুখ শক্ত করে বলে,
” রুম আমার, বাড়ি আমার। কোন রুমে যাব সেটা কি তোমাকে জিজ্ঞাসা করে যেতে হবে?
নাজলী থতমত খেয়ে তাকায়। কিন্তু কথাটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে। চোয়াল শক্ত করে চোখে চোখ রেখে বলে,
” যখন এইটা আপনার বাড়ি, আপনার রুম, তাহলে বাহিরের লোক থাকার কোনো রাইট নেই। আপনার মত ক্রিমিনালের সাথে এক রুমে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।
নাজলী কথাটা বলে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। পিছন থেকে আরিশ খপ করে বাম হাতটা শক্তভাবে চেপে ধরে। নাজলী পিছনে তাকানোর সুযোগ পায় নি। তার আগেই চোখের পলকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। শক্ত দেয়ালের সাথে ধ্বাক্কা খেতেই ব্যাথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে। আরিশ পিঠ গলিয়ে পিছন থেকে হাত চেপে ধরেছে। নাজলী ব্যাথায় চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে। চোখ থেকে পানি ফেলে মনের অজান্তেই। নাজলী ছটফট করে উঠে,
” ছাড়ুন, লাগছে আমার।
আরিশের রাগান্বিত কন্ঠস্বর,
” কেনো, বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে না?
নাজলীর চোখ লাল হয়ে আছে। আরিশের চোখে চোখ রেখে বলে,
” চলেই তো যাচ্ছিলাম। আটকেছেন কেনো?
” পা দুইটা ভেঙ্গে গলায় ঝুঁলিয়ে দিব। এত তর্ক করতে ভয় লাগে না?
” কাকে ভয় পাব? আপনার মত ক্রিমিনালকে ভয় পেয়ে নিজের ইজ্জতের রফাদফা করতে চাই না।
” জংলী মেয়ে তুমি? কলিজা পিছন নিয়ে ঘুরে বেড়াও?
নাজলীর কেনো জানি হাসি পাচ্ছে। হাতে অসহ্য ব্যাথা, চোখে পানি টলমল করছে। অথচ ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলে,
” আপনি মুলত কি চাচ্ছেন, বলোন তো? প্লিজ খোলাসা করুন সব কিছু। আপনার এমন ব্যবহার নিতে পারছি না।
কথার মধ্যেই নাজলী চোখ-মুখ শক্ত করে ফেলে। সামান্য ক্ষেপা কন্ঠে বলে,
” জীবনের সব থেকে বড় ভুল ছিলো আপনার সাথে পরিচিত হওয়া। সেদিন আপনাকে চুক্তির অফারটা করা আমার জীবনের চরম ভুল। যদি আমি সেদিন এই পদক্ষেপ না নিতাম তাহলে অন্তত আপনার মত ক্রিমিনাল আমার পিছনে আসার সুযোগ পেত না। সেদিন তো অপমান করেছিলেন। গভীর মধ্য রাতে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সত্যি বলছি সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। কথামত সেই অন্ধকার রাতেই বের হয়ে গিয়েছি। নিজের মত করে নিজের গন্তব্য খুঁজে নিয়েছি। কখনো আপনার সামনে আসতে চাই নি। আপনি কেনো বার বার আমার পিছু নিচ্ছেন? আমি কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে কথা বলছি এইসব জেনে আপনার কি লাভ? নাভিদের সাথে কথা বললে আপনার শরীরে লাগে কেনো? আমি জাহান্নামে যাব এতে আপনার কি? কেনো বার বার আমাকে স্টক করছেন? হাপিয়ে উঠেছি আপনার অত্যাচারে। মি, আরিশ আমি একজন মানুষ।খুব সাধারন একজন মানুষ আমি। এত যুদ্ধ করার শক্তি নেই আমার। সত্যি বলছি ধৈর্য ফুরিয়ে যাচ্ছে আমার। আর পারছি না। প্লিজ মুক্তি দেন আমাকে। কি চাই আপনার? কেনো এমন করছেন?
আরিশ আরও শক্তভাবে চেপে ধরে। এক হাত চলে যায় কোমরের ভাঁজে। নাজলী ফ্যাঁল-ফ্যাঁল করে তাকিয়ে থাকে। আরিশ নিশ্বাস টানে বড় করে। নাজলী উত্তরের আশায় তাকিয়ে থাকে। ভেবেছে হয়ত কিছু একটা বলবে। কিন্তু সেই আশাকে ভুল প্রমাণ করে আরিশ ভারিক্কি আওয়াজে বলে,
” উত্তর দিতে বাদ্ধ নয় আমি। আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই এমন করছি। উত্তর চাইছো কোন সাহসে?
নাজলীর চোখ-মুখে রাগ ভেসে উঠে। ইচ্ছে করছে নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতে। এমন ঘারত্যারা মানুষ আদ’ও হয়? এতগুলো কথা বললো। একটা উত্তর দিলে কোন কলিজায় আগুন লাগত! শালার যদি নিজের ইচ্ছেই চলবি তবে আমাকে ধরেছিস কেনো? নাজলী ধ্বাক্কা দিয়ে আরিশের বুকে কিল বসায়। আরিশ বুকে হাত দিয়ে আর্তনাদ করে উঠে। ব্যাথায় চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে শক্তভাবে। বাম বুকে হাত দিয়ে সাথে সাথে মেঝেতে বসে যায়।
আরিশের ব্যাথাতুর অবস্থা দেখে নাজলী হতভম্ভ হয়ে যায়। কোনো কিছু না ভেবে আরিশের কাছে ছুঁটে যায়। আরিশ একইভাবে বুকে হাত দিয়ে মেঝের দিকে মুখ করে বসে আছে। ব্যাথায় চোখ-মুখ খিঁচে রেখেছে। নাজলী আরিশের বলিষ্ঠ বুকে হাত রেখে উত্তেজিত হয়ে বলে,
” কি হয়েছে আপনার? সরি আমি তেমনভাবে দিতে চায় নি। প্লিজ উঠে বসুন।
আরিশ উঠে না। একইভাবে বসে আছে ঘাপটি মেরে। নাজলী চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। দ্রুত উঠে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। আরিশের মুখের কাছে নিয়ে বলে,
” হা করুন প্লিজ। পানিটা খান দ্রুত। সব ঠিক হয়ে যাবে।
আরিশ পানিও খেলো না। নাজলী এক প্রকার জোর করে পানিটা খাওয়ায়। আরিশ এমনভাবে বসে আছে যেন এখনই কিছু একটা ঘটে যাবে। নাজলী প্রায় কেঁদে দিবে অবস্থা। আরিশের শরীর হেলে পড়ে এক পাশে। নাজলী দুই হাত দিয়ে আটকে মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে। আরিশ নিজের শরীর ছেড়ে দেয়। নাজলী অধৈর্য হয়ে কান্না করে উঠে,
” প্লিজ আরিশ ঠিক হন। আমি তো এতটা কঠিনভাবে দেয় নি। কিছু হবে না আপনার। অপেক্ষা করুন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।
আরিশ একইভাবে চোখ বন্ধ করে আছে। নাজলীর বুকে মাথা রেখে যেন শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে। নাজলী আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে। আরিশ আর চুপ থাকতে পারি নি। হুট করেই জোরে হেসে উঠে। আরিশের হাসির শব্দ পেতেই নাজলী চুপ হয়ে যায়। আশ্চর্য হয়ে তাকায় আরিশের হাস্যজ্জ্বল মুখের দিকে। প্রথমে রেগে গেলেও সেই রাগ থেমে যায়। এই হাসির ঝংকার এতটা সুন্দর কেনো? গম্ভীর, খারাপ লোকেদের হাসি এত সুন্দর হয় কেনো? আরিশ হাসতে হাসতে তাকায় নাজলীর দিকে। নাজলী নিজের হুশে ফিরে আসে। নিজের বোকামির কথা চিন্তা করতেই বিরক্ত হয়।
আরিশ হাসি থামিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলে,
” মিস, নাজলী মাইলাহ কান্না করছিলে কেনো? এতটা বেপোরোয়া হয়ে যাবে ভাবতে পারি নি।
নাজলী ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে বলে,
” আপনি এতক্ষণ অভিনয় করছিলেন?
আরিশ বুকে হাত গুঁজে বলে,
” বাস্তব ভেবেছিলে?
” এইভাবে অভিনয় করার মানে কি? অভিনয় করছিলেন তাই না?
আরিশ ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” তোমার সামান্য আঘাতে এইভাবে নেতিয়ে পড়ব ভাবলে কিভাবে? বুকে বুলেট রেখে রক্তাক্ত অবস্থায় ও হাজারটা খুন করার মত ক্ষমতা রাখি। একশত জন শত্রুকে পরাজিত করার মত ক্ষমতা আছে। আর সেই আমি এক টুকরো ফুলের স্পর্শে এইভাবে নেতিয়ে পড়ব? বুদ্ধিমতি ভেবেছিলাম তোমাকে।
নাজলী চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে। ঠোঁট ভিজিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“দে ডিড্ন্ট হ্যাভ টু ডু অল দিস ফাকিং অ্যাক্টিং। যেদিন সত্যিকারের বাঘ আসবে সেদিন কোনোরকম করুনা পাবেন না। আপনি মরে পচে গেলেও কখনো ফিরে তাকাব না। এই নাটক করার জন্য পস্তাতে হবে আপনাকে। আর আপনি খুব বাজেভাবে পস্তাবেন।
আরিশ কিছু বলতে যাবে তার আগেই থেমে যায়। ফোনের রিংটনে কপাল কুচকে আসে। এই মধ্য রাতে ফোন কার? আরিশ ফোন বের করে নাম দেখে কপালের ভাঁজ সোজা হয়ে আসে। দাদামশাই এত রাতে ফোন দিয়েছে কেনো?
আরিশের চোখ-মুখ গম্ভীর হয়ে উঠে। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই দাদামশাইয়ের অধৈর্য কন্ঠস্বর,
” আরিশ মেহেরকে পুরো বাড়িতে খুঁজে পাচ্ছি না। এত রাতে কোথায় গেলো মেয়েটা?
আরিশের মুখে আতঙ্ক বাসা বাঁধে। তবুও গম্ভীরতা বজায় রেখে বলে,
” ভালো করে খুঁজে দেখুন দাদামশাই। ওর মনের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। হয়ত কোথাও মন খারাপ করে বসে আছে।
দাদামশাইয়ের ভাঙ্গা গলা,
” ওকে পায় না প্রায় এক ঘন্টা ধরে।বাহিরে তুমুল বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তাই ঘুম আসছিলো না। রুম থেকে বের হয়ে এমনিই হাটাহাটি করছিলাম। উপরে তাকিয়ে দেখি মেহেরের রুমের দরজা খুলে রাখা। আর সেটা বাতাসে বার বার শব্দ করছে। দরজা লাগানোর জন্য রুমে যায়। সেখানে দেখি ও রুমে নেই। এরপর থেকে সার্ভেন্ট, গার্ড সবাইকে সজাগ করে পুরো বাড়িতে খোঁজ করি। কিন্তু কোথাও কোনো অস্তিত্ব পায় নি। আ.. আরিশ আমার নাতনিটার কিছু হবে না তো?
আরিশের চোখ দুইটা লাল হয়ে উঠে। কোনো শব্দ উচ্চারন করে নি। নাজলী এতক্ষণ দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিলো। আরিশের চোখ-মুখ দেখে বুকটা কেঁপে উঠে। বাচ্চা মেয়েটার কিছু হয় নি তো আবার? আরিশ উন্মাদের মত মোবাইলটা দুরে ছুঁড়ে মারে। ঝড়ের গতিতে চাবি নিয়ে বের হয়ে যায়। নাজলী চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে।
প্রতিটা গার্ড গাড়ি থেকে নেমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকল অনুযায়ী সমন্বিত অভিযান শুরু করেছে। সাহারা-ঘেঁষা ধুলোমাখা সড়ক, লালমাটির গ্রামাঞ্চল আর আধুনিক শহরের প্রান্ত—সব জায়গাই এখন নজরদারির আওতায়।
সাঁজোয়া পিকআপ ও অফ-রোড যান দিয়ে প্রধান হাইওয়ে, সীমান্তঘেঁষা পথ আর মরুভূমির ট্র্যাকগুলো ব্লকেড ও প্যাট্রোলিংয়ে আনা হয়েছে। যাতে কোনো দিক দিয়েই মেহের অদৃশ্য হতে না পারে।
হাতের ওয়াকি-টকি, স্যাটেলাইট ফোন আর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মাধ্যমে গার্ডরা রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় করছে। প্রতিটা সন্দেহজনক চলাচল মুহূর্তেই নথিভুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাজার, বাসস্ট্যান্ড, পানির কূপ, অস্থায়ী বসতি আর টিনের ঘরগুলো পদ্ধতিগত তল্লাশির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
একই সঙ্গে গোত্রভিত্তিক এলাকা ও স্থানীয় পথঘাট সম্পর্কে জানা লোকদের তথ্য নিয়ে সম্ভাব্য পালানোর রুটগুলো ম্যাপিং ও ট্র্যাকিংয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই অনুসন্ধান চলছে মধ্যরাত থেকে।
আরিশ নিকের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলে,
” আমার বোনটার কিছু হবে না তো নিক?
অধিরাজের যেন কষ্টে বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আরিশকে এর আগে কখনো এতটা দুর্বল দেখে নি সে। মেহেরের দুষ্টুমিগুলো বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মেহের ছোট কালে অধিরাজকে টেনে নিয়ে নিজের পাশে বসাত। এরপর অধিরাজের হাত টেনে নিয়ে নিজের হাতের সাথে মিলাত। ভাবুক হয়ে বলত,
‘ তোমার রং এত ব্ল্যাক কেনো অধিরাজ ভাই? তুমি আমার মত ফর্সা হলে না কেনো? দেখো আমি কত কিউট! একদম প্রিন্সেসের মত।
অধিরাজ হেসে চুমু খেয়ে সম্মতি জানাত। ব্যাস, খিলখিল করে হেসে উঠত বাচ্চা মেয়েটা। যার মিষ্টি হাসির ঝংকারে কাঁপিয়ে তুলত আরিশের মত একজন হার্টল্যাস ব্যাক্তির হৃদয়। চোখে হারাত নিজের বোনকে। মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে কি করে সহ্য করবে? চিন্তায় অধিরাজ অস্থির হয়ে উঠে।
নিক আরিশের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
” শান্ত হ আরিশ। কিছু হয় নি মেহেরের।
” কিন্তু আমার বোনটাকে তো এখনও খুঁজে পেলাম না নিক। কিছু না হলে কোথায় গেলো? কখনো যাতে একা বের না হয়, সেটা নিষেধ করেছি। মেহের তো আমার প্রতিটা নিষেধ মেনেই বড় হচ্ছে। তাহলে আজ কেনো রুমে আমার বোন নেই। আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না নিক। আমার পাথর হৃদয়টা কাঁপছে। কি করব আমি?
আরিশ কথাগুলো বলে চোখ বন্ধ করে ফেলে। নিক গাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। কপালে হাত রেখে এদিক-সেদিক তাকায়। পাশেই ঘন জঙ্গল। সব জায়গা খুঁজা হলেও জঙ্গলের কথা সে ভুলেই বসেছিলো। নিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের উদ্দেশ্যে গর্জন করে উঠে,
” এভরিওয়ান, সারাউন্ড দ্য জাঙ্গল। দেন ক্যারি আউট আ প্রিসাইস অপারেশন ইনসাইড ইট।
নিকের আদেশ পেতেই ঝড়ের গতিতে সবাই জঙ্গলের ভেতরে এগিয়ে যায়। নিক গাড়িতে বসে অধিরাজকে বলে,
” জঙ্গলের ভেতরে চল অধিরাজ। ফার্স্ট!
অধিরাজ স্ট্রিয়ারিং ঘুরিয়ে অধৈর্য হয়ে বলে,
” এই জায়গার কথা ভুলেই বসেছিলাম।
আরিশ একদম চুপ হয়ে আছে। অনুভুতিহীনভাবে বাহিরে তাকিয়ে আছে।
এক এক করে জঙ্গলের ভেতরে সবাই প্রবেশ করে। দাদামশাই হার্ট আ্যটাক করেছে কিছুক্ষণ আগে। উনাকে চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সাথে গার্ড সহ তানভী রয়েছে। চারদিকে যেন জন্ম -মৃত্যুর এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। সবার চোখে দুশ্চিন্তার এক উন্মাদ ছাপ।
জঙ্গলটি প্রকৃতির এক অপ্রবেশ্য দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঘন পাতার আবরণে সূর্যালোক স্তব্ধ। বাতাস ও ভারী হয়ে আছে এই মুহূর্তে। চারদিকে নীরবতা চাপা আতঙ্কে পূর্ণ।
লতাগুল্ম, কাঁটাঝোপ ও প্রাচীন বৃক্ষের গুঁড়িতে পথচিহ্ন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে আছে। ফলে প্রতিটি পদক্ষেপই অনিশ্চয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হচ্ছে।
বৃষ্টির কারন্স ভেজা মাটি, পচা পাতার গন্ধ এবং দূরবর্তী অচেনা শব্দ জঙ্গলটিকে আরও রহস্যময় ও শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে।
এই ঘন অরণ্যের ভেতরেই মেহেরকে খুঁজে চলছে সবাই। আর সময়ের প্রতিটি ক্ষণ দুশ্চিন্তাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। উৎকণ্ঠায় সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে। কিন্তু মন অস্থির ভাবে চলছে সবার হৃদস্পন্দন ত্বরান্বিত বেগে চলছে। কোনো ক্ষীণ সাড়া পেলেই আশার আলো জ্বলে উঠছে আবার নিভে যাচ্ছে।
প্রতিটি গার্ড তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। ঝোপের আড়াল, গাছের ফাঁক, শুকনো খালের ধার এক ইঞ্চি জায়গাও অবহেলায় ফেলে রাখা হচ্ছে না।
সুশৃঙ্খল কৌশলে কেউ সামনের পথ পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ পাশের অঞ্চল স্ক্যান করছে কেউ পেছন থেকে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
চোখে তীক্ষ্ণ মনোযোগ। কানে অতিসংবেদনশীল সতর্কতা আর মনে অটল দায়িত্ববোধ।সবার অনুসন্ধান চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
অরণ্যের গভীর স্তব্ধতার ভেতর হঠাৎ করে গ্যাংস্টার বসের গাড়িটা থেমে যায়। আরিশ সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,
” এই পুরাতন বাড়িটার ভেতরে ডুকা দরকার।
অধিরাজ সেদিকে তাকিয়ে বলে,
” স্যার এইটা পরিত্যাক্ত এক বাড়ি। এখানে হয়ত বহু বছর আগে সন্নাসীদের বসবাস ছিলো। মেহের এখানে আসবে কিসের জন্য?
আরিশ অধৈর্য হয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। নিকের পায়ে শক্ত কালো সুজ। শুকনো পাতার উপর দিয়ে এগিয়ে যায়। কিছু পথ এগিয়ে যেতেই দুই কদম পিছয়ে যায় সাথে সাথে। মাটিতে রক্ত মিশে আছে। বৃষ্টির কারনে সব মুছে গেলেও আবছা রক্তের বড় বড় টুকরো মাটির সাথে লেগে আছে। নিকের পা দুইটা যেন অসাড় হয়ে আসছে। শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে যায় আরও সামনে। প্রতিটা কদমে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। রক্তের প্রতিটা ফোটাকে কেন্দ্র করে চলছে গ্যাংস্টার বসের নীরব পদচারন। পদচারন থেমে যায়। পায়ের নিচ থেকে যেন জমিন সরে গিয়েছে। অর্ধ নগ্ন মেহেরের লাশ দেখে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলে। হৃদয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক মৃদু শব্দ,
” আল্লাহ!
আরিশ চারপাশে দেখে নিকের দিকে এগিয়ে যায়। পিছন পিছন অধিরাজ ও যায়। নিককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিশ দৌঁড় দেয়। নিকের কাছে গিয়ে কিছু বলবে তার আগেই ভাষা থেমে যায়। সামনে নিজের বোনের অর্ধ নগ্ন শরীর দেখে অনেকটা পিছিয়ে যায়। নিক অপেক্ষা করলো না। শরীর থেকে ব্লেজারটা খুলে মেহেরের শরীরের উপর রেখে দেয়। মেহেরের খুলা চোখের দিকে তাকাতেই শক্ত বুকটা মুচড়ে উঠে। নিক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ডান হাতের সাহায্যে চোখ বন্ধ করে দেয়। অতিরিক্ত ঠান্ডার কারনে গলার কাটা স্থানটা সাদা হয়ে গিয়েছে। শরীর থেকে সব রক্ত যেন শেষ হয়ে গিয়েছে। পুরো মুখ একদম সাদা দবদবে হয়ে আছে। দুই গালে থাপ্পরের দাগ অনেকগুলো। ঠোঁট কেটে কেমন ক্ষত হয়ে আছে। শরীরে যেন কোনো রক্তবিন্দু নেই।
আরিশের দুনিয়াটা যেন ঘুরে আসে। ধপ করে বসে যায় নোংরা কাদাযুক্ত মাটির উপর। কেমন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে। কানে বার বার শব্দ তুলছে,
” ভাইয়া… ভাইয়া…. ভাইয়া….
আরিশ চোখের পাপড়ি নাড়ায়। পুরো শরীর বরফের মত ঠান্ডা হয়ে আসে তার। কেমন শক্ত মূর্তির মত বসে আছে। ক্রিমিনাম লিডার তার বোনের মৃতদেহের সামনে বসে আছে। শরীর দৃঢ় হয়ে আছে একদম। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে তার মন এক অদৃশ্য, ধ্বংসাত্মক ঝড়ের মধ্যে আটকে যায় । অনুভব করার চেষ্টা করলেও কোনোটিই সহজে প্রকাশ পায় না।
আরিশের চোখ অপ্রকাশিত হয়ে আছে। যা কোনো আবেগের ছায়াও স্পর্শ করতে পারছে কি না বুঝার উপাই নেই। সেই দৃষ্টি ভিতরে ভিতরে চাপা যন্ত্রণার বসবাস। গভীর শূন্যতার এবং নিঃশব্দ ক্রন্দনের বহিঃপ্রকাশ বহন করছে।
হাত, পা এবং শরীরের প্রতিটি অঙ্গ অচঞ্চল নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রিত। বাহ্যিকভাবে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত।কিন্তু অন্তরের লুকানো যন্ত্রণার ঢেউ প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে যাচ্ছে যা একটি অদৃশ্য আগুনের মতো ধীরে ধীরে ভেতরে ছড়াচ্ছে।
মনের গভীরে অনুভূতি এক জটিল ও অশান্ত সমীকরণ। শোক, অপরাধবোধ, ক্ষোভ, এবং অসহ্য শূন্যতার একত্রিত চাপ তার মনকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করে রাখছে।
নিকের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রত্যেক স্পন্দনে বেদনার অদৃশ্য ছায়া যা ক্রমশ তীব্র হয় এমন একটি অমোঘ চাপের আভাস দেয়। চোখের কোণে ক্ষুদ্র স্পন্দন। কপালের ভাঙা রেখা। নিঃশ্বাসের অল্প আংশিক অস্থিরতা। সবই তার অভ্যন্তরীণ অশান্তি, অমানবিক বেদনা এবং ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের নিখুঁত প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। তার চোখে -মুখে কোনো আবেগের ছিটেফুটে নেই। কিন্ত কোথাও একটা ছটফটানি মুখে ভেসে উঠছে।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে আরিশের দিকে তাকায়। আরিশের চোখ দুইটা লাল হয়ে আছে। যেন চোখের সব পানি রক্তে পরিনত হয়েছে। আরিশ মেহেরের কপালে হাত রাখে। এরপর পুরোটা মায়া ঢেলে দিয়ে সারা মুখে সহস্র চুমু খায়। অজস্র চুমুতে মেহেরের পুরো মুখ ভিজে যায়। আরিশ থেমে কপালে দুইটা শব্দ করে চুমু খেয়ে বলে,
” মেহের চোখ খুল বোন আমার। তুই চলে গেলে আমি একদম একা হয়ে যাব। খাওয়ার জন্য কেউ রাগ দেখাবে না। কেউ গাল ফুলিয়ে ভাইয়া বলে ডাক দিবে না। আমাকে ভাইয়া ডাকবে কে? এই ভাই নামক ডাকটা খুব মিস করব। আমিতো এমনিতেই নিঃস্ব। আমাকে আর নিঃস্ব করে কি লাভ হবে তর।।তার থেকে বরং পুনরায় আমার কাছে চলে যায়। যা চাইবি সব এনে দিব। প্রয়োজনে ছোট কালের মত ঘাড়ে চড়িয়ে পুরো শহর ঘুড়াব। প্রমিস করছি আমি।
অধিরাজের শরীর কেঁপছে। আনমনে বলে,
” এক বুক কষ্ট নিয়ে দুনিয়া ছাড়লো। ভালোবাসা নামক এক যুদ্ধে হেরে গিয়ে এতটা নির্মম মৃত্যু কেনো হলো?
আরিশ নিকের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। নীরব অথচ ভয়ানক কন্ঠে গর্জে উঠে,
” কোন শুয়রের বাচ্চা করেছে এইসব? আমার বোনের শরীরে হাত দিয়েছে কে?
নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে শক্তভাবে। ভেবেছিলো আরিশ কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে। নিক আরিশের চোখের জ্বলন্ত আগুন দেখে তৃপ্তির হাসি হাসলো। তবে সেই হাসি মোটেও চোখে -মুখে প্রকাশ করে না। তাদের অপেক্ষার মধ্যেই দুইজন মহিলা এসে মেহেরের নিস্তেজ লাশটাকে নিয়ে গাড়িতে তুলে। শরীরের উপর সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়।
এই বর্বর দৃশ্য দেখে টিকে থাকতে পারে নি এক হার্টল্যাস মাফিয়া। মাফিয়ার শক্তপোক্ত খোলস ছেড়ে রুপ নেয় এক উন্মাদ বড় ভাইয়ের। যে ভাই নিজের বোনকে দুই পাপিষ্ঠ হাত দিয়ে বড় করেছে। যে হৃদয়ে কারোর স্থান ছিলো না। সেই হৃদয়ে এই মেয়েটাকে স্থান দিয়েছে। অধিরাজের চোখে পানি টলমল করে উঠে। আরিশ নিজের শরীর ছেড়ে দেয়। দুই চুল খামছে ধরে উন্মাদের মত আকাশের দিকে তাকায়। কাঁপা গলায় বলে,
” আমার পাপটা কেনো আমার বোনের উপর থেকে নিলে? পাপ তো আমি করেছি, আমাকে কঠিন শাস্তি দিতে। আমার বোনটাকে কেনো এত কষ্ট দিলে।
নিক আরিশের বাহুর উপরে হাত রাখে। আরিশ নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না। আচমকা নিককে জড়িয়ে ধরে নিঃশ্বব্দে কেঁদে উঠে। কেউ শুনেনি সেই কান্নার শব্দ। কখনো কেউ দেখেছে এই ব্যক্তিটার ভেঙ্গে পড়া দৃশ্য? শত্রুরা দেখলে হয়ত দাঁড়িয়ে উপহাস করত। বিশ্রিভাবে মজা নিত! জয়ের হাসি হাসত ভয়ানকভাবে। যে ব্যক্তি দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর ধরে কাঁদে না। তার চোখ দিয়ে আজ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কে বললো মাফিয়াদের হৃদয় নেই? তাদের প্রানে আঘাত করে দেখো তারা ঠিক কতটা উন্মাদ। তারা যেমন শহরে আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে ।তাদেরকে কাঁদানোর ক্ষমতাও অনেকের আছে।
আরিশের কান্না শব্দটা ছিলো একদম নিঁখুত। নিক শ্বাস টেনে আরিশের পিঠে হাত রাখে। আরিশের পুরো শরীর কাঁপছে। চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছে নিকের শার্ট।
” ওই জানোয়ারগুলো আমার কলিজাটাকে ছিঁড়ে খেয়েছে নিক। আমার বোনটাকে ওরা বাঁচতে দিলো না। আমার নিষ্পাপ ফুলটাকে এত কষ্ট কেনো দেওয়া হলো। কত কষ্ট পেয়েছে। নিশ্চই ভাইয়া, ভাইয়া বলে ডেকেছে। আমি কেনো আমার বোনের কলিজা ফাটা চিৎকার শুনতে পাই নি । আমি পাষাণ হলেও ওর প্রতি ভালোবাসা আমার কোনো কালেই মিথ্যে ছিলো না। তাহলে ওর চিৎকারের আওয়াজ কেনো আমার হৃদয়ে এসে লাগে নি। যখন ওর শরীরে খামছে ধরেছে তখন নিশ্চই ভাইয়া বলে চিৎকার করেছে। সারাজীবন আগলে রেখেছি । ফুলের স্পর্শ লাগতে দেয় নি আঘাত পাবে বলে। সেই ফুলটাকে এইভাবে ছিঁড়ে খেয়েছে, বিশ্বাস করতে পারছি না। ক্ষমতা কোথায় ছিলো আজ আমার? কেনো রক্ষা করতে পারলাম না। এক বুক অভিযোগ নিয়ে কেনো চলে গেলো নিক। ভাই হিসেবে আমি আজ পরাজিত আর অসহায়।
নিক গম্ভীর গলায় বলে,
” শান্ত হ। মেহেরকে রে*প করা হয় নি।
আরিশের কথা থেমে যায়। কপালে ভাজ ফেলে তাকায় নিকের দিকে। কপাল কুচকে বলে,
” মানে? সিউর হচ্ছিস কিভাবে?
নিক ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” ওর জামার অংশটা যাস্ট ছিঁড়ে ছিলো। আর নয়ত পুরো কাপড় ঠিক ছিলো। রে**পিস্ট নিশ্চই রে* প করে জামা পড়িয়ে দিয়ে যাবে না। চেয়েছিলো রে*প করতে বাট সফল হয় নি। হয়ত মেহের নিজের গলায় নিজে ছুঁড়ি বসিয়েছে। সিউর নয় বাট এমনটা হয়ত হয়েছে। তুই এখন নিজের মধ্যে নেই তাই ভাবতে পারছিস না। ভালোভাবে ভেবে দেখ এমনটাই হয়েছে।
আরিশের মন কিছুটা শান্ত হয়। অধিরাজ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে,
” বস বাড়িটার দেয়ালে কিছু লেখা আছে। সাদা রঙ্গের উপর রক্তের ছাপ। এই বাড়িতে গেলে কালপ্রিটকে খুঁজতে সহজ হবে।
আরিশ ঝড়ের বেগে সেদিকে যায়। নিক মাথায় হুডি পড়ে এগিয়ে যায়। দেয়ালের প্রতিটা বাক্য দৃশ্যমান হয়ে উঠে।। আঁকা -বাঁকা লেখার কয়েকটা,লাইন।
” আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি নিক। কেনো আমায় একটু ভালোবাসলে না। একটু ভালোবাসলে কি এমন ক্ষতি হত? যখন মনে হয় কোনো এক নারী তোমার শরীরের মাদকতায় ঘায়েল হচ্ছে ঠিক তখনই আমি মরে যায়। মানসিকভাবে আমি আরও আগেই মরে গিয়েছি। আজ শারিরীকভাবে মরতে যাচ্ছি। তোমাদের দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া রইলো।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের।
আরেকটা লাইন,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫০
” মাফিয়াদের কান্নায় মানায় না ভাইয়া। চোখ বন্ধ করে আমাকে মনে করবে আমি ঠিক তখন তোমার সামনে হাজির হয়ে যাব। বড্ড ভালোবাসি তোমাকে। দাদামশাইয়ের খেয়াল রেখো।
আরও কয়েকটা লাইন ছিলো। কিন্ত ঝাপসা হয়ে গিয়েছে সেগুলো। সেই আঁকা – বাঁকা লাইন গুলো পড়া সম্ভব হয়ে উঠে নি। সব লাইনগুলোর মধ্যে একটা শব্দে চোখ আটকে যায়।
” ইগর খুব কষ্ট দিয়েছে আমাকে ভাইয়া।
আরিশের চোখ -মুখ হিংস্র পশুর মত হয়ে উঠে। আবেগী মুখটা রুপ নিয়েছে হিংস্র দাবানলে।
