Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৭

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৭

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৭
লিজা মনি

বাইরে উত্তাল সমুদ্রের উন্মত্ত গর্জন আছড়ে পড়ছে তীরের বালুকারাশিতে। নোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে আশ্রমের পুরনো জানালার কপাটগুলো মাঝে মাঝে আর্তনাদ করে উঠছে। কক্ষের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। রুমে কেবল মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ক্ষণস্থায়ী চমকে দেওয়ালের নোনা ধরা পলেস্তারাগুলো বীভৎস দেখাচ্ছে।
রুমের ভেতরে ​অর্ধবয়স্ক একজন ব্যক্তি শয্যায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে আছেন। কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধের প্রভাবে তার শরীর যেন সীসার মতো ভারী হয়ে আছে। চেতনার অতল গহ্বরে তিনি অনুভব করলেন কেউ একজন ঘরে প্রবেশ করেছে। মেঝের ওপর খুব ধীর কিন্তু ভারী একটি পদশব্দ। বাতাসের ঘ্রাণে মিশে আছে পচা নোনা জল আর কোনো এক অচেনা ধাতব গন্ধ।

​তিনি চেষ্টা করলেন চোখ মেলতে কিন্তু চোখের পাতা দুটো যেন কেউ আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে। মস্তিষ্কের এক কোণে বিপদের সাইরেন বাজছে। অথচ অবশ দেহটা অবাধ্য। অনেক যুদ্ধের পর যখন তিনি জোর করে চোখের মণি দুটোকে আলোর দিকে ফেরালেন, তখন হৃদপিণ্ডটা সজোরে এক ধাক্কা খেল।
​অন্ধকারে শয্যার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘাকৃতি কালো অবয়ব। সেই মূর্তির কোনো সুনির্দিষ্ট মুখ নেই। কেবল কুচকুচে অন্ধকার। বৃদ্ধ লোকটা ভয়ে একদম শক্ত হয়ে যান।তিনি যখনই এক বুক মরণভয়ে চিৎকার দিতে চাইলেন, অমনি সেই অবয়বের হাড়সর্বস্ব শীতল হাতটা তার মুখ চেপে ধরল। চিৎকারটা গলার ভেতরেই গুমরে মরে গেল। মনে হচ্ছিলো ওষুধের ঘোর আর মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ দুটো মিলে তাকে এক জীবন্ত কবরের স্বাদ আস্বাদন করাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটা ছটফট করছে ছুটার জন্য। ঘামে তার কপাল, গলা ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে। কালো অবয়বটা ফিসফিস শব্দ করে বলে,

” একটা চিৎকারের শব্দ আসলে এখানেই গলা চেপে মারব। একদম চুপচাপ থাকবি।
কথাটা বলে অবয়বটা ছেড়ে দিলো মুখ। বৃদ্ধ লোকটা যেন নতুন জীবন ফিরে পেলো। ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে হঠাৎ এই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। অবয়বটার পায়ে পড়ে কান্না করে উঠে,
” ক.. কে আপনি? আমাকে কেনো মারতে এসেছেন?
অবয়বটা সরে যায়। ডিভানে পায়ের উপর পা তুলে বসে। আবার পা নামিয়ে লোকটার দিকে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলে,
” যদি সব প্রশ্নের উত্তর সত্যি করে বলিস তবে প্রানে বেঁচে যাবি। নয়ত তর ইয়াতিম খানায় যত বাচ্চা আছে সব গুলোর লাশ দেখতে পাবি তুই।
বৃদ্ধ লোকটা আৎকে উঠে। কালো অবয়বটা তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
” তকে যে বাবা বলে ডাকে সে কি তর আপন মেয়ে?
বৃদ্ধ লোকটা যেন থমকে যায়। পালিত মেয়ে বলতে লোকটা ব্যাথা অনুভব করে বুকে। এরপরও বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য বলে,

” রিদ্ধিমার কথা বলছেন?
অবয়বটি মাথা নাড়ালো। লোকটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
” পালিত মেয়ে আমার। খুব ছোট কালে আমার বুকে আগলে নিয়েছিলাম।
অবয়বটির ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। রিভলভারটা কোমরে গুঁজে বলে,
” কোথায় পেয়েছিলি? আর তর কাছে কিভাবে এসেছে? সত্যি কথা বলবি কিন্তু!
বৃদ্ধটা অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে,
” এখন বয়সের ভারে নুইয়ে গেলেও আগে আইনের লোক ছিলাম। একা হাতে অনেককে ঘায়েল করার ক্ষমতা ছিলো তখন। পরিবার -পরিজন দুর্বলতা কেউ ছিলো না। একবার মাফিয়া চক্রে পুলিশ অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অনেক শিশু উদ্ধার করা হয় পাচার থেকে। সেই শিশুটির মধ্যে একজন ছিলো আমার মেয়ে রিদ্ধিমা। ওই অশুভ জায়গা থেকে তুলে নিয়ে আসি তাকে। এরপর থেকে আমার গর্ব, আমার অহংকার, আমার একমাত্র মেয়ে হয়ে ওর বেড়ে উঠা। আমার রিদ্ধিমা!
অবয়বটি ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। গম্ভীরতা নিয়ে বলে,

” ওর বাচ্চা কালের ছবি?
বয়স্ক লোকটা তাকায় অবয়বের দিকে। সেই আগের গৌরব নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” তুমি কে? আমার মেয়ের এত খোঁজ করছো কেনো?
অবয়বটির পছন্দ হয় নি সে প্রশ্ন। চট করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বয়স্ক লোকটার পিছনে এসে দাঁড়ায়। রাতের নিস্তব্দ অন্ধকারে অবয়বটার এক অদ্ভুত বাজ পাখির মত গলা,
““ দ্য মোস্ট টুইস্টেড মনস্টার-মাইন্ডেড আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট।
পর মুহূর্তে কন্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যায়। অস্বাভাবিক ও ধীরগতিতে বলে,
” শহরের স্তব্ধতা আমার কণ্ঠস্বরের দাস। পদশব্দে যখন মাটি কেঁপে ওঠে, তখন কিছু শুয়রের বাচ্চা ভুলে যায় শ্বসন প্রক্রিয়া। আমি সেই আন্ডারগ্রাউন্ডের বিভীষিকা, যাকে পৃথিবী চেনে এক জীবন্ত নরক হিসেবে।
কথাটা বলে অবয়বটা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার পায়ের শব্দে যেন রুমটা আরও ছমছমে হয়ে উঠে। ভারী গলায় বলে,

” ফার্স্ট মেয়ের ছবি দেখা।
লোকটা বসা থেকে উঠে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। আলমারি খুলে একটা ছবি বের করে। এমনভাবে বের করে যেন অনেক যত্নের জিনিস। অবয়বটার দিকে তাকিয়ে বলে,
” আমার মেয়েটাকে কিছু করো না। এখনও বাচ্চা সে। ও কোনো ভুল করে থাকলে আমায় বলো। বাবা হিসেবে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। মেয়েটার প্রচুর রাগ। হুটহাট রেগে যাওয়ার কারনে অনেক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। তুমি কি কলেজের সেই বখাটে ছেলেটা?
অবয়বটার কপাল কুচকে আসে,
” বখাটে মানে? কলেজের কোন বখাটে ছেলে?
বয়স্ক লোকটা থমথমে খেয়ে যায়। কাঁশতে কাঁশতে বলে,

” আমার মেয়েটাকে প্রচুর জ্বালাতন করে। ভালোভাবে কলেজে যেতে পারে না। নোংরা আর অসভ্য ইঙ্গিত দেয়। প্রচুর ভয়ে থাকি ওকে নিয়ে। বয়স হয়েছে অনেক আগের মত শক্তিও নেই। নাহলে দেখো এক বয়সে তোমাদের মত কত হুডি পড়া গুন্ডাদের ঘায়েল করেছি। আর আজ ভালোভাবে সোজা হয়ে দাড়াতে পারছি না। এইটাই সময় বদলায়, মানুষ আর শক্তিও বদলায়।
অবয়বটা ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। শক্ত গলায় বলে,
” ছেলেটার নাম?
” আরিব।
অবয়বটা ভ্রুঁ নাচালো। রহস্যময় হাসি দিয়ে বয়স্ক লোকটার হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেখলো। তার মুখের রিয়্যাকশন বুঝার ক্ষমতা নেই। হুডির আড়ালে যাস্ট বাঁকা হেসে যেভাবে এসেছিলো ঠিক সেভাবেই বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে কিছু শব্দ বলে,
” আপনার মেয়েটা আপনার হলেও সে আমার রক্ত!

ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটার ঘরে। নিশীথিনীর সেই অভিশপ্ত প্রহর তখন। যখন জীবন্ত আর মৃতের ব্যবধান ঘুচে যায়। শ্বেতশুভ্র জ্যোৎস্না আজ যেন বিষাক্ত ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে। আরিশের গাড়িটা এসে থামে একটা প্রাচীরের সামনে। তার হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। সে গাড়ি থেকে নেমে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ হচ্ছে। যেন মৃত আত্মারা তার আগমনে আর্তনাদ করে উঠছে। সে এসে দাঁড়াল এক নিভৃত সমাধির সামনে। যেখানে মাটির কবরের নিচে তার কলিজার টুকরো—তার একমাত্র বোন ‘মেহের’ চিরনিদ্রায় শায়িত। আরিশের পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠে।
​ইট-পাথরের দেয়াল ঘেরা এই ঘুপচি ঘরটি যেন এক অন্য জগত। আরিশ যখনই ভেতরে প্রবেশ করল তখন এক হিমশীতল হাওয়া তার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল। তার কানে ভেসে আসতে লাগল মেহেরের সেই চঞ্চল হাসির প্রতিধ্বনি। সেই হাসি পাথরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পিশাচের অট্টহাসির মতো বারবার ফিরে আসছে। মেহেরের সেই ভালোবাসাময় ডাক,

” ভাইয়া!
বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আরিশের কানে। এতদিন হয়ে গেলো কেউ ডাকে না তাকে। কেউ জড়িয়ে এসে বাচ্চামো আবদার করে না। কেউ এসে বলে না ভাইয়া আমাকে নিককে এনে দাও।
​আরিশের সেই লৌহকঠিন শরীর যার এক হুঙ্কারে শহর থমকে যায় আজ তা শরতের শুষ্ক পাতার মতো থরথর করে কাঁপছে। তার চোখের মণিতে ফুটে উঠেছে এক আদিম ত্রাস। এই ভয়, এই অসহ্য স্মৃতি দহনের ভয়েই তো সে দিনের পর দিন এখানে পা রাখেনি। নিজের স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে ধপ করে বসে পড়ল ভেজা মাটির ওপর।
​কবরের শীতল মাটি খামচে ধরে সে ডুকরে কেঁপে উঠল। যে হাত দিয়ে সে মানুষের কণ্ঠনালী টিপে ধরে সেই হাত আজ নিজের আদরের বোনকে স্পর্শ করার ব্যাকুলতায় হাহাকার করছে। আরিশের মনে হলো, কবরের গভীর থেকে মেহের তাকে ডাকছে। অন্ধকারের সেই নিস্তব্ধতায় আরিশের দীর্ঘশ্বাসগুলো এক একটা বিষাক্ত সাপের মতো ফুঁসছে। আরিশ ভেজা মাটিতে স্পর্শ করে বলে,

” বোন আমার, আই মিস ইউ। আমি তর অভিভাবক ছিলাম কিন্তু অভিবাভকের দায়িত্ব পালন করতে পারি নি। এক জালিমের হাতে তর জীবন নিশ্বেঃস হয়েছে, এই বাস্তবতা আমি কিভাবে মানি? ফরগিভ মি, আই ফেইলড টু প্রোটেক্ট ইউ। ভাইয়া তকে সেইভ করতে পারে নি। খুব করে সরি!
আরিশ মাটির উপরেই চুমু খেলো। হায় দৃশ্য! সামান্য ডাস্ট এ যে লোক হাজার বার নাক ছিটকায় সে বোনের কবরে এসে চুমু খাচ্ছে!আন্ডারগ্রাউন্ডের সেই ক্রিমিনাল আজ এক পরাজিত ভাইয়ের বেশে কবরের ধুলোয় মিশে আর্তনাদ করছে। যার শব্দ শোনার মতো কেউ নেই—কেবল নোনা বাতাস আর কবরের নীরবতা ছাড়া। শহর কি এই দৃশ্য দেখেছে? উহুম কখনোই না। এই দুর্বলতা গুলো রাতের অন্ধকার দেখতে পায় আর কেউ নয়।
আরিশ চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে। কবরে হাত দিয়ে স্পর্শ করে হালকা হেসে বলে,

” মেহের তর মনে আছে, আমার বউ দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলি। আমি তকে নাজলীর সাথে সাক্ষ্যাত করিয়েছিলাম। বায়না ধরেছিলি এই মেয়েটাকে যেন সারাজীবন আগলে রাখি। এমন রুপবতী আর ভালো ভাবী তুই হাত ছাড়া করতে চাস না। তর আবদার না হয় আমি পূরন করে ফেললাম কিন্তু তর অস্তিত্ব কোথায়? যখন এই মনে হয় তর হাহাকারের কথা তখন ভাই হিসেবে আমি অসহায় হয়ে পড়ি। বলেছিলি নিককে না পেলে যাতে তর জন্য খাটিয়া সাজানোর ব্যবস্থা করি। খাটিয়া সাজাতে চাইনি বলে এতটা নৃশ্বংসভাবে সাজাতে বাধ্য করবি কলোনোদিন কল্পনাও করি নি। লোকে বলে ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহাম একটা পাষন্ড পুরুষ। কিন্তু সেই পাষন্ড পুরুষটা জানে মেহরিমা মেহের ঠিক কতটা নিখুতভাবে কাঁদাতে জানে। এইতো আমাকে কাঁদাচ্ছে। আমি নিশ্বব্দে কাঁদছি। কেউ দেখি নি আরিশ ইলহামের চোখের পানি। কিন্তু রাতের নিস্তব্দ পরিবেশ ঠিক এই দেখছি। প্রসঙ্গ যখন আসে আমার বোনকে নিয়ে তখন ভাই হিসেবে সব থেকে ব্যার্থ আমি।
আরিশের চোখের রং ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। হাতে থাকা প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে কারোর রক্তাক্ত কলিজা আর চোখের মণি বের করে আনে। এতদিন বরফে ডুবিয়ে রাখার কারনে আগের মত নেই। এতেও যেন আরিশের শান্তি। কলিজার খন্ডগুলো মেহেরের কবরের উপর রেখে কর্কশ গলায় বলে,

” এই হলো তর খুনীর কলিজা। ভালোভাবে দেখে নে এই চারটা লোক তকে আঘাত করেছে। আর সব থেকে ফ্যাকাসে কলিজাটা হচ্ছে ইগরের। যে তকে অশুভ হাতে ছুঁয়েছে। বিশ্বাস কর মেহের নিক ওদের খুব নরক যন্ত্রনা দিয়ে মেরেছে। এমনভাবে মেরেছে যে এর ভিডিও কেউ দেখলে আত্না পর্যন্ত কেঁপে উঠত। তুই খুশিতো?
প্রশ্নের কোনো উত্তর আসে নি। আরিশ গম্ভীর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। শরীরের বালিগুলো হাত দিয়ে মুছে বলে,
” যারা আমার বোককে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। তাদের রক্ত দিয়ে শহর রাঙ্গিয়েছি। তাদের শরীরের মাংস কুকুরকে খাইয়েছি। আমি শান্ত কিন্তু তবুও অশান্ত। দেখা করলাম, কথা বললাম। আজ এইবার আসি। দেখা হবে আবার। আবার আসব আমার বোনটাকে দেখতে। আসছি এখন!

রাত তখন প্রায় একটার কাছাকাছি। চারদিকে গুলাগুলির শব্দ ও তেমন নেই। মিনারে প্রবেশ করে নিক, আরিশ আর অধিরাজ। ডিভানের মধ্যেই নাজলী আর এনি সামনাসামনি হয়ে বসে আছে। তাদের সামনে অনেক খাবার পড়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা ছোটোখাটো পার্টি করেছে। নাজলী অনেক দিন পর নিজ হাতে রান্না করে দিয়েছে। আর এনি প্রতিবারের মত আয়েশ করে সেই রান্নার স্বাদ গ্রহণ করেছে।
আরিশ আড়চোখে তাকায় নিকের দিকে। ভয়ে তার নিজের এই ভেতরে ধুক ধুক করছে। একজন গার্ড এসে নিকের পায়ের সুজগুলো খুলে রাখে। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে ভেতরে প্রবেশ করে। এনি কিছুটা ঘুমিয়ে গিয়েছিলো বলে টের পায় নি। নাজলী চট করে তাকায় সেদিকে। নিককে দেখেই নাক-মুখ কুচকে ফেলে। সবার অস্তিত্ব আর পায়ের আওয়াজের শব্দে এনির ও ঘুম ভেঙ্গে যায়। গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে থাকে নিকের দিকে। নিককে কেমন অদ্ভুত ভয়ংকর দেখাচ্ছে চোখ- মুখ গুলো।
নিক প্রতিটা খাবারের খালি পাত্রের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে নিজের। স্টাফের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরতা নিয়ে বলে,

” সবার জন্য খাবার পরিবেশন করো। সবাই একসাথে ডিনার করবে এই মুহূর্তে। বিশেষ করে আমার নারী!
আরিশ, অধিরাজ একে -অপরের দিকে তাকায়। যে মেয়েকে রুম থেকে বের হতে দেয় না তাকে নিয়ে সবার সাথে ডিনার করবে! কিন্তু কেনো? কোন রাগের বহি:প্রকাশ এইটা ?
সবার থেকে বেশি অবাক হয় এনি। কারন সে আজ এত পরিমানে খেয়েছে যে সামান্য পরিমানে খাওয়ার জন্য রুচি নেই। পেট পুরোটা ফুল হয়ে আছে। কি করে খাবে সে এখন!
সময়ের ব্যবধানে টেবিলের উপর সাজানো হয় বাহারি রকমের খাবার। খাবারগুলোর রাজকীয় বাহার যেন পুরো কক্ষের আবহাওয়াকে ভারী করে তুলেছে। ধোঁয়া ওঠা লেবানিজ মান্দি, সুগন্ধি মশলায় জারানো তুর্কি কাবাব আর ইতালীয় ঘরানার হালাল স্টেক সাজানো হয়। প্রতিটি পদের সুবাসে চারপাশ ম ম করছে। কিন্তু সেই সুবাস ছাপিয়ে এক তীব্র অস্বস্তি পুরো ঘরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে।
আরিশ, অধিরাজ, নাজলী উপস্থিত সবাই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখছে নিকের সেই ভয়ংকর রূপ।
​নিকের ফর্সা মুখটা রাগে আগুনের মতো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। তার কপালে ফুটে ওঠা রগগুলো আর চোয়ালের কঠোর ভঙ্গি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে ভেতরের ঝড়টা কতখানি প্রলয়ংকরী। তার চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত বিকৃতি হয়ে আছে। যেখানে রাগের সাথে মিশে আছে এক অদম্য অধিকারবোধ।

​এনি ইচ্ছে করে পালিয়ে যেতে চাইলো। যে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য সে চাতক পাখির ন্যায় ছটফট করেছে। এখন চাইছে দ্রুত যেন রুমে যেতে পারে। সবার চোখের আড়াল করে সামনের দিকে হাটা ধরে। কিন্তু তখনই ঘটল সেই আকস্মিক ঘটনা। কোনো বাক্য ব্যয় না করে নিক সজোরে এনির কবজি চেপে ধরল। আঙুলের সেই চাপ এতটাই প্রবল ছিল যে এনির মনে হলো হাড়গুলো বুঝি এখনই গুঁড়ো হয়ে যাবে। পালানোর কোনো পথ না দিয়েই নিক হিড়হিড় করে টেনে তাকে নিজের একদম কাছে নিয়ে আসে। এনির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
নাজলী সহ্য করতে না পেরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আরিশ চেপে ধরে।।চোখের ইশারাতে একদম চুপ থাকতে বলে। নাজলী চোয়াল শক্ত করে রাগে ফুঁশ-ফুঁশ করছে।
এনি ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট শুরু করে। নিক
রমণীর ধনুকের মত বাঁকানো কোমরটা চেপে ধরে সবার সামনে সজোরে নিজের উড়ুর উপর বসিয়ে দেয়।
​পুরো ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। আরিশ অন্য সময় হলে হাসত। কিন্তু তার ভয় হচ্ছে নিক খাবার নিয়ে উত্তেজিত কেনো হয়ে পড়লো।

লজ্জায় আর অপমানে এনির মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা যদি দু’ভাগ হয়ে যেত, তবে সে ভেতরে ঢুকে নিজেকে লুকিয়ে ফেলত। এতগুলো জোড়া চোখের সামনে এমন পরিস্থিতিতে পড়ার গ্লানি তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ভয়ে আর আড়ষ্টতায় তার নিঃশ্বাস বুকের মাঝপথে আটকে যাচ্ছে । সে চাইলেও নড়তে পারছে না, কারণ নিকের এক হাতের কঠিন বেষ্টনী তার কোমরকে লোহার শিকলের মতো বেঁধে রেখেছে।
​নিকের তপ্ত নিঃশ্বাস এনির ঘাড়ের কাছে আছড়ে পড়ছে। আর এনি শুধু শূন্য দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার প্রার্থনা করছে। কোনোরকম আওয়াজ করে বলে,
” ছাড়ুন আমাকে। আমি পাশের চেয়ারে বসছি।
নিকের গম্ভীর গলা,

” নো বেবিগার্ল! যেখানে তোমাকে বসানো হয়েছে সেখানেই বসবে। এখন সামনের খাবারগুলো শেষ করো, কুইক!
এনির চোখ ছলছল করে উঠে। এত খাবার সে কিভাবে খাবে? নিজের কান্না সংযত করে মিহি আওয়াজে বলে,
” আ… আমি খেয়ে নিয়েছি। খেতে পারব না এতসব খাবার।
নিক শুনলো না। এনির পাত্রে চামচের সাহায্যে কিছু খাবার রাখে। এনি ছটফট করে বলে,
” সত্যি বলছি খাওয়ার মত ক্ষুদা নেই।
নিক তবুও খাবার পরিবেশন করলো। নাজলী নিজেকে আটকাতে না পেরে বলে,
” আপনি কানে শুনতে পাননি? ও এত খাবার কিভাবে খাবে? মেয়েটা ভয় পাচ্ছে দেখতে পারছেন না। এইভাবে নিজের স্ত্রীকে আগলে রাখেন। হাস্যকর!
সাথে সাথে নিকের গর্জে উঠা প্রতিধ্বনি,

” আরিশ নিজের ওয়াইফকে চুপ রাখ। নয়ত….
নিক থেমে যায়। আরিশ নাজলীর হাত চেপে ধরে ইশারা করে।
পুরো ডাইনিং হলজুড়ে এক অশুভ নীরবতা থমকে আছে। নিকের পেশীবহুল হাতের বাঁধন এনির কোমরের চারপাশে যেন লোহার শিকল হয়ে চেপে বসেছে। নিক এনিকে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে নিয়েছে । এনির ভেতরে এতক্ষণ যে ভয়টা ছিল তা এখন আগ্নেয়গিরির মতো রাগে রূপ নিয়েছে। তার দুচোখ ফেটে পানি আসার উপক্রম। কিন্তু সেই কান্নার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে জেদ।
​সে বারবার বলেছিল যে সে খেয়ে নিয়েছে। পেটে একবিন্দু জায়গা নেই। অথচ সবার সামনে এই অহেতুক জবরদস্তি আর রাজকীয় খাবারের প্রদর্শনী এটা কীসের প্রতিশোধ? নিক কি সবার সামনে তাকে নিজের কেনা কোনো খেলনা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে? কিসের এত রাগ আপনার নিক জেভরান? আর প্রতিবার আমার সাথেই কেনো?

​নিক যখন রূপালি চামচটা খাবারের স্তূপ থেকে তুলে এনির পাত্রে রাখলে। জেদের বসে এনি পাত্র থেকে তুলে নিচে ফেলে দেয়। নিকের দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরে মুখটা সরিয়ে নেয়। নিক দাঁত কটমট করে পুনরায় খাবার রাখলে সেইম কাজ এনি আবার ও করে।
​নিকের চোখের ধূসর মণি দুটো রাগে লাল হয়ে উঠে। সে কোনো কথা না বলে শুধু দাঁতে দাঁত চিপে চামচটা আবার ভরে নিল। নিজের মুখের ভেতরে পুরোটা খাবার নিয়ে এক ঝটকায় এনির ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো মুঠোর ভেতর পেঁচিয়ে ধরল সে। ব্যথায় এনির মুখটা আধখোলা হতেই নিক সেই খাবারটা জোর করে তার মুখের ভেতর ঠেলে দিল।

​ঘটনাটা এতই ক্ষিপ্র আর হিংস্র ছিল যে এনি সংবিত ফিরে পাওয়ার আগেই তার মুখ খাবারে ভরে গেছে।
নাজলী বিব্রত হয়ে অন্য পাশে তাকিয়ে যায়। যতই হোক বড় বোন সে। ছোট বোনের এমন দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখার মত ধৈর্য নেই তার। আরিশ ঠোঁট কামড়ে হাসতে থাকে।
এইদিকে অপমানে আর ঘেন্নায় এনি যখন খাবারটা মুখ থেকে বের করে দিতে চাইল ঠিক তখনই নিক বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিজের ঠোঁট দিয়ে এনির ঠোঁট দুটোকে এমনভাবে পিষে ধরল যে এনির ছটফট করার সামান্যতম সুযোগও রইল না।
​নিকের তপ্ত নিঃশ্বাস আর গায়ের উগ্র পারফিউমের ঘ্রাণে এনির দম বন্ধ হয়ে আসছে। নিক তার মুখটা এনির কানের কাছে নিয়ে কর্কশ গলায় বলে,

​”একটা দানা যদি মুখ থেকে বাইরে পড়ে, তবে আজ এই টেবিলেই কেয়ামত ঘটে যাবে।
এনি ভয়ে শুধু চিবিয়ে যাচ্ছে। গিলতে পারছে না গলায় আটকে আসছে। কেমন যেন পেট থেকে সব উগ্রে আসছে।
​নিকের হাতের আঙুলগুলো এনির চিবুকটা এমনভাবে চেপে ধরে আছে যে নড়াচড়া করার উপায় নেই। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা লোনা পানি খাবারের স্বাদের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এনির মুখের খাবার শেষ হতেই নিক সেইমভাবে এনির মুখে খাবার ডুকিয়ে দিলো। সে নিজেও কখনো তৈলাক্ত জিনিস খায় না। তার উপর বার বার এইসব তৈলাক্ত খাবার মুখে নেওয়াতে নাক-মুখ কুচকে আসছে। তৃতীয়বারের মত নিক খাবার দিতে যাবে তার আগেই এনি বমি করতে যায়। পুরো ডাইনিং হল মুহূর্তের মধ্যে এক বীভৎস নরককুণ্ডে পরিণত হয়ে যায়। নিকের সেই পাশবিক জেদ আর জোর করে মুখে খাবার গুঁজে দেওয়ার চরম পরিণতি হলো অত্যন্ত শোচনীয়। অপমানে, যন্ত্রণায় এবং শারীরিক অস্বস্তিতে এনির পাকস্থলী উল্টে আসে । নিকের ঠোঁটের বাঁধন আল
গা হতেই এনি নিজেকে সামলাতে পারল না।

​তীব্র বেগে বমি করে সে নিকের দামী শার্ট আর প্রশস্ত বুক ভাসিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্ত আগে যে খাবারে আভিজাত্য মিশে ছিল এখন তা নিকের শরীরের ওপর এক বীভত্য রূপ নিয়েছে।
​নিকের মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং আভিজাত্যপ্রিয় একজন মানুষের উপরে বমি করে দেওয়ার বিষয়টা প্রচুর ঘৃনার। নিক প্রথমে নাক কুচকালো। ​নিজের নোংরা হয়ে যাওয়া শরীরের তোয়াক্কা না করে আবার এনিকে নিজের বুকের সাথে সজোরে চেপে ধরে । এনির শরীরটা তখন একদম ছেড়ে দিয়েছে। অনবরত বমি আর মানসিক চাপে সে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে তার ঘাড়টা নিকের কাঁধের ওপর ঝুলে পড়ল। চোখ দুটো আধবোজা হয়ে আছে। ফ্যাকাশে ঠোঁটগুলো কাঁপছে অনবরত।
​ডাইনিং টেবিলের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নাজলী আর সহ্য করতে পারল না। নিজের আদরের বোনের এই পৈশাচিক অবস্থা দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। তার বুকফাটা আর্তনাদে পুরো হলের নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে যায়। হাত জোর করে অনুরোধ করে উঠে,

​”এনি! আমার বোনটা মরে যাবে! ছেড়ে দিন ওকে, দয়া করে ছেড়ে দিন!”
নাজলীর কণ্ঠস্বর ডুকরে উঠে।
​নিক তখন এনির কানের কাছে মুখ নিয়ে অদ্ভুত এক শান্ত কিন্তু শীতল স্বরে বলল, “অবাধ্যতার ফল সবসময় তিক্ত হয় ব্লাডরোজ। যে খাবার তুমি আমাকে রেখে খেয়েছো সেগুলো পেটের ভেতরে না থাকাটা এই উচিত।
নিকের কথাটা পুরো রুমে বজ্রের মত ঝংকার তুলে। সবাই হতভাগ হয়ে যায়। শুধুমাত্র আরিশ নির্বাক হাসলো।
নিকের এই উন্মাদনার কারন একটা এই ছিলো। তাকে রেখে অন্যের সাথে ফুর্তি করে খাওয়া! আর কত সাইকো রুপ দেখাবি তুই নিক? এনি আদ’ও সহ্য করতে পারবে তো? অবশ্য ভালোবাসলে সব রুপ গ্রহন করবে। নাজলীর দিকে তাকাতেই আরিশ থমথমে খেয়ে যায়। এই পাগল চটে গেলে আবার আরেক সমস্যা। তখন এইটাকে সামলানো তার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। আরিশ কোনোকিছু না ভেবে নাজলীকে পাজা কোলে তুলে নেয়। আকস্মিক আরিশের এমন কান্ডে নাজলীর কপাল কুচকে আসে। কোল থেকে নামার জন্য রাগে বলে,

” মাথার তার ছিড়ে গিয়েছে আপনার? কোলে নিয়েছেন কেনো? নামান আমাকে।
আরিশ শুনলো না। দ্রুত রুমের দিকে হাটা ধরে।
​নিকের নোংরা শার্টের সাথে এনির ফর্সা গালটা লেপ্টে আছে। এনি তখন এতটাই নিস্তেজ যে প্রতিবাদ করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
এনির দুর্বল শরীরটা দেখে উন্মাদ হয়ে উঠে গ্যাংস্টার বস। মুখে চুমু খেয়ে বলে,
” কলিজা আমার, কষ্ট হচ্ছে?
এনি দুর্বল চোখে তাকায়। ভাঙ্গা গলায় বলে,

” কষ্ট দিয়ে আবার কষ্ট হচ্ছে কি না জিজ্ঞাসা করছেন? বিষয়টা হাস্যকর। সামান্য কারনে এত জেলাসি? জেলাসি নয় অসুস্থ মনোভাব। বোন ছিলো সে আমার। আমার জন্য কোনো পর পুরুষ ছিলো না। তাহলে কেনো এমন করলেন?
নিক এনির এলোমেলো চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে ধরে। এনির আধবোজা চোখদুটো সে দেখতে পায়। নিকের চোখে তখন এক পৈশাচিক তৃপ্তি।
​”আমি থাকতে অন্য কেউ তোমাকে আনন্দ দেবে, এটা আমি সইতে পারি না বেবিগার্ল । তুমি শুধু আমার সাথে হাসবে। আমার সাথে খাবে। আমার অনুমতি ছাড়া তোমার করা প্রতিটি মজা এখন তোমার পাকস্থলী থেকে আমি টেনে বের করে দেব। দেখো, এখন তুমি আমার বিষে মাখামাখি হয়ে আমার বুকেই পড়ে আছো।”
​নিক এক হাত দিয়ে এনির পিঠটা এমনভাবে ঘষতে লাগল যেন সে কোনো অবাধ্য শিশুকে শান্ত করছে। কিন্তু তার নখের চাপ এনির চামড়া ভেদ করার উপক্রম। এনি ডুকরে কেঁদে উঠে,

” আপনি অসুস্থ মস্তিষ্কের সাইকোপ্যাথ। খুব খারাপ আপনি। বন্ধী করতে চাইছেন আমাকে?
” আমার করতে চাইছি।
” শ্বাস নিজের নিয়ন্ত্রনে নেওয়ার ইচ্ছেটাকে নিজের করতে চাওয়া বলে? ধীরে ধীরে নিজের আসল রুপে তবে ফিরছেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। এনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
” তোমাকে আবার ও বলছি আমি কতটুকু খারাপ সেটা পৃথিবী জানে। কিন্তু তোমার জন্য কতটুকু খারাপ হতে পারে সেটা দুনিয়া এখনও দেখে নি। আই রিপিট এখনও দেখো নি। আমি ভালোবাসার মত পুরুষ নয়। প্রেমিকার হাত ধরে শহর ঘুরে বেড়াব এমন প্রেমিক পুরুষ ও আমি নয়। আই’ম রিয়েলি টেরিবল। ইফ এনি ওয়ান ইন দিস ওয়ার্ল্ড ইজ দ্য ওয়ার্স্ট, ইট’স মি। আই’ম আ মনস্টার। অ্যান্ড উইদিন অল দিস ডার্কনেস, দ্য গুড ওয়ান ইজ ইউ। আমি এতটা খারাপ যতটা খারাপ হলে কেউ তাকে ভালোবাসতে পারে না। যেমন আমাকে কেউ পারে না।
এনি অসহায় চোখে তাকায়। নিক পাজা কোলে তুলে নেয়। এনির চোখ বার বার ভিজে আসছে। যার কারনে এইভাবে দুর্বল হলো তার বুকেই নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। অদ্ভুত!

আরিশ দরজার সামনে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছুতেই নাজলীকে বাহিরে যেতে দিবে না। নাজলী রাগে কটমট চোখে তাকায়,
” ওইখানে জানোয়ারটা তাকে মেরে ফেলছে। কি ধরনের কথা এইগুলো? বোন সে আমার। অনেকদিন পর আমার রান্না পেয়ে খেয়েছে।।তাই বলে এইসব কি ধরনের ব্যবহার? মনে হচ্ছে না সব কিছু বেশি হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দিনের পর দিন টর্চার করে যাচ্ছে। আর কত সহ্য করব!
নাজলী চিৎকার দিয়ে উঠে। পাশে থাকা ফ্লাওয়ার টবটাকে আছড়ে ফেলে দেয়। মাটির টবটা অর্ধেক ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আরিশ ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে নাজলীর দিকে। এই ধনেলঙ্কা তার জীবনে জড়ালো কিভাবে! আরিশ দরজা থেকে সরে এসে নাজলীর দুই হাত চেপে ধরে। নাজলী চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়। আরিশ নাজলীর চোখে হাত রেখে বলে,

” ক্রিমিনাল লিডারকে ভয় দেখাচ্ছো? হুম!
নাজলী আরিশের বুকে ঘুষি দিয়ে বলে,
” ক্ষমতা দিয়ে কিনে নিয়েছেন আমাদের। আপনাদের হাতের পুতুল আমরা। নিক জেভরান এমন ব্যবহার কেনো করলো এনির সাথে?
আরিশ শান্ত করার চেষ্টায় বলে,
” শান্ত হও। বলছি সব।
নাজলী বিছানায় বসে। আরিশ শান্ত গলায় বলে,

” নাজলী কাউকে বুঝানোর রুলস আমার ব্যক্তিত্বে নেই। এই প্রথম কাউকে শান্ত করার জন্য আরিশ ইলহাম অধৈর্য হয়ে উঠেছে।হাস্যকর! নিক ছোট থেকে অনেক ট্রমার স্বীকার হয়েছে। এমন এমন ট্রমা পেয়েছে যেগুলো শুনলে তুমি নিজেও কেঁদে উঠবে। সব থেকে বর্বর দৃশ্য সে নিজের জন্মদাত্রীকে খুন করেছে। আর তার পিছনে আছে এক মর্মান্তিক ইতিহাস! চোখের সামনে নিজের মাকে পর পুরুষের সাথে অবাধ্য কাজে লিপ্ত হতে দেখে ঠিক রাখতে পারে নি নিজেকে। তাছাড়া পূর্বে এই পরকীয়ার কারনে তার বাবা স্ট্রোক করেছিলো। তার বোনকে হারিয়েছে। তার দাদা -দাদী অকালে মরেছে। সে নিজেও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পর পর নিজের মায়ের প্রতি ঘৃনা এত তীব্র ছিলো যে খুন করে ফেলে। সাথে মেরেছিলো নিজের মায়ের অবৈধ প্রেমিককে ও। এই কাহিনীটা ছিলো নিকের মস্তিষ্ক বিকৃত করে দেওয়ার মুল কারন। মায়ের অবহেলা পেয়ে ভেবে নিয়েছে দুনিয়ায় কেউ তাকে ভালোবাসে না। নিজের সর্বস্ব হারিয়ে এতটা একা হয়ে গিয়েছিলো যে তার জায়গায় তুমি হলে টিকতে পারতে না নাজলী। মাফিয়া জগতে টিকে থাকার ভয়ানক খেলা তুমি জানো না। পদে পদে এই রক্তাক্ত কাহিনী আমি জানি। প্রস্টিটউট ক্লাবে হাজারও সুন্দরী রানীর ভীর ছিলো। কোনোদিন ফিরেও তাকায় নি গ্যাংস্টার বস সেদিকে। তার জীবনে এত বছরে কেউ ছিলো না। পর পর আপনজনদের হারিয়ে নিক উন্মাদের মত হয়ে গিয়েছিলো। এতদিন পর এনিকে নিজের জীবনে পেয়ে সেই ভয়টা আবার আকড়ে ধরে। বাকিদের মত যদি এনিও তাকে ছেড়ে চলে যায়। যদি দুরে কোথাও পালিয়ে যায়। এই একটা ভয় নিককে পাগল করে তুলছে নাজলী। হারিয়ে ফেলার এক তীব্র ভয় নিকের মনে। এনি যখন বলে আমি থাকব না আপনার সাথে ঠিক তখন এই গ্যাংস্টার বস পাগল হয়ে যায়।

তুমি এইটাকে অসুস্থতা হিসেবে দেখবে কিন্তু আমি দেখছি নিকের দুর্বলতা হিসেবে। এনি নিকের সব থেকে বড় দুর্বল জায়গায়। এই জায়গায় কেউ আঘাত করতে আসলে তছনছ করে ফেলে সব কিছু। রাগ দেখিয়ে নিককে ঠিক করতে পারবে না। একমাত্র এনি যদি নিককে ভালোবেসে আগলে নেয় তবেই নিক স্বাভাবিক হবে। এই মিনারটা দেখতে পাচ্ছো? তোমার ধারনাও নেই এখানে কত সিকিউরিটি দিয়ে আবদ্ধ করে রাখা। সামান্য পাখি প্রবেশ করতে চাইলে সংবাদ চলে যায় সবার কাছে। চারপাশে অসংখ্য সিকিউরিটি রাখা। শত্রুরা তিল পরিমান স্পর্শ করতে পারে না এনিকে। আর না নিক বেঁচে থাকতে জীবনে পারবে।
নাজলী ছলছল চোখে তাকায়। অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,

” তাই বলে নিজের জন্মদাত্রীকে খুন করে ফেলবে? এইটা কি ধরনের কথা!
আরিশ হাসলো শব্দ করে। শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
” কোনো একদিন পুরো ঘটনা বলব। নিক তো খুন করেছে। আমি হলে শরীরটা টুকরো করে ফেলতাম। এমন জন্মদাত্রীর প্রতি কিসের মায়া যে পর পুরুষ নিয়ে রঙ্গলীলা করবে। যে জন্মদাত্রীর জন্য জন্মদাতা মরে যাবে। যে জন্মদাত্রীর অবহেলায় বোনকে হারাতে হবে। এমন জন্মদাত্রী কারোর না হোক যে জন্মদাত্রীর জন্য নিজের দাদা -দাদীকে হারাতে হয়। একজনকে হারায় নি। পুরো বংশটা তছনছ করে দিয়েছিলো ওই মহিলা। নিক না মারলে হয়ত বেঁচে থাকত। আরেক পুরুষের সন্তানের মা হত। নিক মরলো নাকি বাঁচলো সেটাও খোঁজ নিত না কোনোদিন। এমন জন্মদাত্রী বেঁচে থাকার থেকে মরে যাওয়া উত্তম।
নাজলীর মাথা ভঁন ভঁন করছে। এদের অতীতে এত যন্ত্রনার ইতিহাস কেনো? বিছানার চাদর শক্ত করে চেপে ধরে বলে,

” অনেক ভয়ানক অতীত উনার।
আরিশ হেসে বলে,
” সামান্য অতীতেই আফসোস করছো? একদিন নিকের মাফিয়া হয়ে উঠার ইতিহাস শুনাব। শুধু সহ্য করে নিও একটু।
নাজলী নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” উনি কি এইভাবেই বন্ধী করে রাখবে সারাজীবন?
আরিশ বিছানায় বসে বলে,
” এনিকে বলো ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে। এনি তো প্রচুর বোকা নাজলী। এনি ইচ্ছে করলেই নিককে তার অধীনে নিয়ে নিতে পারে। আমাদের শত্রুপক্ষ নিককে প্রায় এই বলে,
” পুরো সম্রাজ্য তুমি শাষন করলেও তোমাকে শাষণ করছে একজন নারী।
এনি যা বলবে তাই শুনবে। বিনিময়ে থাকতে হবে নিকের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা।
” ভালোবাসা কি এত সহজ মি, আরিশ? চাইলেই কি ভালোবাসা যায়?
আরিশ ঠোঁট চেপে বলে,

” তোমার বোন নিককে ভালোবাসে। সময় হোক তুমিও বুঝতে পারবে।
নাজলী চট করে তাকায়,
” বোকার মত কথা বলছেন।
” তুমি নিকের পাগলামী দেখার মধ্যে ব্যস্ত ছিলে। আর আমি দেখছিলাম এনির বাধ্যতা। চোখে ঘৃনা থাকলেও অন্য রহস্য ছিলো। এনিও নিককে ভালোবাসে। শুধু সঠিক সময় আসলে দেখে নিও।
নাজলী ঠাট্টা করে বলে,
” এনি খারাপ ব্যক্তিদের বাজেভাবে ঘৃনা করে।
” আর তীব্র ঘৃনা থেকেই ভালোবাসার জন্ম নেয়। নিক – এনির সম্পর্ক নিয়ে আমিও ভয়ে থেকেছি। কিন্তু এখন আমি ওই সময়ের অপেক্ষায় আছি যেদিন তারা হাসি-খুশি দাম্পত্য জীবন পার করবে। সময়টা বেশি দুরে ও নয়। নিক থাকবে স্বাভাবিক আর এনি অন্ধের মত ভালোবাসবে।
নাজলী ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের।।আচমকা বলে,

” আর আপনার – আমার সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবে। আরেক মেয়ে আসবে আপনার জীবনে।
আরিশ সাবলীল ভঙ্গিতে বলে,
” আমিও ভাবছি একটা বিয়ে করব। ভার্জিন থাকতে ইদানিং কষ্ট অনুভব করছি।
নাজলী রেগে যায়।
” কোন অধিকারে এইভাবে আটকে রেখেছেন? আমার জীবনটাকে কেনো নষ্ট করছেন এইভাবে?
আরিশ খাপছাড়া ভাবে বলে,
” যাওয়ার শক্তি থাকলে চলে যাও।
নাজলী চোখ বন্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করে। যদি ভালোবাসা না থাকে তবে এই বন্ধীত্ব আর অধিকারের মানে কি? কিসের এত অধিকারবোধ! নাজলী যেন আজ প্রশ্নের উত্তর চেয়ে এর পর শান্ত হবে। ক্ষেপা গলায় বলে,
” কি চাই আপনার? শরীর চাইতেন তবে ভাবতেম কামনা মিটানোর জন্য রক্ষিতা বানাতে চাইছেন। কিন্তু সেটাও তো চান না। ভালোবাসতে চান না, স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চান না। সঠিক সম্মান দিয়ে রাখতে চান না। তবে কি চাচ্ছেন আপনি? এখন যেভাবে আছি এইটা কি কোনো জীবন?
আরিশ চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে,

” ভালোবাসা চাও?
নাজলী থমকে যায়। আরিশের কুচকানো চোখের দিকে তাকায়। পর পর চোখ ফিরিয়ে দাঁত পিষে বলে,
” আপনার মত ক্রিমিনালের ভালোবাসা সপ্নেও চাই না।
” তুমি ভাবলে কিভাবে তোমার মত জঙলীকে আমি ভালোবাসব?
নাজলীর ইচ্ছে করছিলো আরিশের মাথা ফাটাতে। কেনো ক্রিমিনালের বাচ্চা, ভালোবাসলে কি হয়!
” আমি আপনার ভালোবাসা চাইও না। শুধু নিজের স্বামীর ভালোবাসা পেলেই চলবে।
আরিশ চট করে উঠে বসে। ভ্রু কুচকে বলে,
” স্বামীর ভালোবাসা মানে?
নাজলী আড়চোখে এক পলক তাকিয়ে বলে,

” পুরো দেশ শাষণ করে চলেন অথচ স্বামীর ভালোবাসা বুঝেন না? এখান থেকে যাওয়ার পর আমার যার সাথে বিয়ে হবে সে তো আমার স্বামী হবে। মুসলমান রিতীতে তিন কবুলে আবদ্ধ হব তার সাথে। হালকা ব্লাশ করব, লজ্জা পাব স্বামীর উপস্থিতিতে। ও ভালোবাসে আমার হাতের উপর হাত রাখবে। আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলব। এরপর রাত হবে। আমি ফুলে সাজানো একটা রুমে বসে ওর জন্য অপেক্ষা করব। ও আমাকে বুকে টেনে নিবে । এরপর কপালে, গালে, নাকে, ঠোঁটে চুমু খাবে। অনেক মিষ্টি কথা আর আলিঙ্গন করবে। আমি অনুমতির হাত রাখব। ও আমার শাড়ির আচলটা নামিয়ে নিবে। এরপরের কাহিনী খুবই ব্যক্তিগত হবে। ত….
” সেট আপ! শুয়রের বাচ্চা আরেকটা বাক্য মুখ থেকে বের হলে গলা টিপে মারব। রাবিশ!
আরিশের ধমকে কেঁপে উঠে রমণী। আরিশ নিশ্বাস নিচ্ছে ঘন ঘন।​ তার কণ্ঠনিঃসৃত সেই সংহারী হুঙ্কারে অসূর্যস্পশ্যা রমণীটির অন্তঃকরণ মুহূর্তেই দুরুদুরু কম্পনে বিদীর্ণ হলো। আরিশের নাসারন্ধ্র দিয়ে তখন রোষাগ্নির তপ্ত নিশ্বাস নির্গত হচ্ছে।যেন কোনো ক্রুদ্ধ ফণাধর সর্প তার দহনকাল অতিক্রম করছে। পুঞ্জীভূত সেই ক্রোধের প্রচণ্ডতা যখন সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করল। তখন সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পার্শ্ববর্তী কাষ্ঠাসনে রক্ষিত স্ফটিকের এক কারুকার্যমণ্ডিত শোপিস ভূমিতে সজোরে আছাড় মারল।

​বস্তুটির পতনের সেই প্রলয়ঙ্করী শব্দে কক্ষের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। আছাড় দেওয়ার তীব্রতা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, কাচগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সেই ভাঙা কাচের ধারালো একটি টুকরো বিদ্যুৎগতিতে আরিশের হাতের তালুতে বিঁধে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করলেও আরিশের চোখেমুখে ব্যথার চেয়ে হিংস্রতাই বেশি স্পষ্ট ছিল।
​ভয়ে নাজলীর দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে, চোখের সামনে এক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছে যা মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ করে দেবে। আরিশের এই ভয়ংকর রূপ দেখে নাজলীর হৃৎস্পন্দন যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। নাজলী ভয়ে তাকায় আরিশের দিকে।
আরিশের হাতের তালু চিরে তখন তপ্ত রুধিরধারা অবিরাম চুইয়ে পড়ছে। অথচ তার ভ্রূক্ষেপ নেই। প্রচণ্ড ক্রোধানলে দগ্ধ হয়ে তার সুগঠিত শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। যেন কোনো আগ্নেয়গিরি তার দীর্ঘদিনের সঞ্চিত লাভা উগরে দেওয়ার অপেক্ষায় ফুঁসছে। তার চোখের মণিতে যে রক্তিম আভা।
আরিশের এমন ব্যবহারে ​ নাজলীর অন্তর অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। আরিশের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে তার হৃৎপিণ্ডটা যেন পিষ্ট হচ্ছে। কান্নায় রুদ্ধকণ্ঠে সে কোনোমতে দু-পা এগিয়ে গেল। চোখের জলে সিক্ত হয়ে নাক টেনে কম্পিত হস্তে আরিশের সেই ক্ষতবিক্ষত হাতটা ধারণ করতে চাইল সে। জনম জনমের মায়া আর সযতনে লালিত ব্যাকুলতা নিয়ে যেই না সে স্পর্শ করতে গেল, অমনি আরিশ বিদ্যুদ্বেগে তাকে ছিটকে দূরে সরিয়ে দিল।
​সেই প্রবল ধাক্কায় নাজলী টাল সামলাতে পারল না। আরিশের অবজ্ঞা যেন তার রক্তাক্ত হাতের ক্ষতের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে বাজল নাজলীর বুকে। নাজলী আবার ও বেহায়ার মত এগিয়ে যায়। শক্ত গলায় বলে,

” দেখতে দিন আমাকে।
আরিশের অদ্ভুত ভয়ানক গলা,
” চোখের সামনে থেকে বিদায় হও।
নাজলী হালকা হাসলো। কি অদ্ভুত এই পুরুষটার ব্যবহার। চোখের আড়াল হব বলাতে এত ধ্বংসলীলা চালালো। এখন নিজেই এইটার বুলি উড়াচ্ছে। নাজলী কাচের টুকরো গুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,
” সত্যি চোখের সামনে থেকে বিদায় হয়ে যাব? ভেবে বলছেন তো?
আরিশ চোয়াল শক্ত করে গর্জে উঠে,
” শুনতে পাও নি আমার কথা।
নাজলী চোখে চোখ রেখে বলে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৬

” শুনতে পায় নি আবার বলুন।
আরিশ বিছানা থেকে উঠে নাজলীর হাত চেপে ধরে। দাঁত কটমট করতে করতে বলে,
” বিধ্বংসী, ধ্বংসকারী ছলনাময়ী নারী!
নাজলী আচমকা হেসে উঠে। আরিশের গালে চাপর দিয়ে বলে,
” ছলনা কোথায় করলাম? মাত্র বিয়ে করার কথা বলেছি, সত্যি বিয়ে করে ফেলছিলাম নাকি? সামান্য কথাতে এত উত্তেজিত হয়ে পড়লে চলে ক্রিমিনাল বস! যেদিন সত্যি বিয়ে করে ফেলব সেদিন কি করবেন?

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫৮