লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৭
লিজা মনি
ব্যস্ত বিকেলের সেই ব্যস্ততা যেন রিদ্ধিমাকে স্পর্শ করতে পারছে না। কফিশপের কাঁচের দেয়ালের ওপাশে দ্রুতগতিতে বয়ে চলা নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে নিজেকে আড়াল করে সে এক কোণে বসে আছে। রিদ্ধিমার উৎসুক দৃষ্টি অবাধ্য পাখির মতো বারবার কফিশপের প্রবেশদ্বার আর রাজপথের জনস্রোতের ওপর আছড়ে পড়ছে। তার অস্থির চাউনি আর ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে আঙুলের নড়ন দেখে স্পষ্টই প্রতীয়মান হচ্ছে। সে প্রহর গুনছে বিশেষ কারো প্রতীক্ষায়। সময়ের ব্যবধানে আগমন ঘটে সেই ব্যাক্তির।
কাঁচের ওপাশে চেনা অবয়বটা নজরে পড়তেই রিদ্ধিমার শরীরের টানটান স্নায়ুগুলো এক নিমেষে শিথিল হয়ে যায়। ফুসফুস ভরে একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয়। সে এতোক্ষণ বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসে ছিল। স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে জুস খেতে থাকে।
তবে স্বস্তিটা স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। মানুষটা কফিশপের ভেতরে পা রাখতেই রিদ্ধিমার চেহারার সেই কোমল ভাব উধাও হয়ে গেল। সেখানে জায়গা করে নিল একরাশ তীব্র বিরক্তি। কাঙ্খিত ব্যাক্তিটা রিদ্ধিমার বিরক্তি মুখ দেখে ঠোঁট উল্টে ক্ষমা চাইতে থাকে,
” সরি দোস্ত। বিলিভ মি, আই হ্যাভ ডান নাথিং রং। প্লিজ ডোন্ট বি অ্যাংরি উইথ মি, জানেম্যান। হোয়েন ইউ কিপ ইওর ফেস অল ডার্ক অ্যান্ড কোয়ায়েট লাইক দিস, ইউ লুক জাস্ট লাইক আ কিউট লিটল গোস্ট।
রিদ্ধিমার বিরক্তি আকাশ ছোঁয়া। ধমক দিয়ে বলে,
” এড্রিয়ান স্টপ! আবার এমন ইংলিশ ঝাড়লে মাথা ফাটাব তর। রাগ নয় বিরক্তি আসছে। আমি কি তর গার্লফ্রেন্ড শালা, যে বসে বসে অপেক্ষা করব? চল্লিশ মিনিট ধরে বসে আছি।
এড্রিয়ান লাজুক হেসে চুল ব্রাশ করে বলে,
” শুধু গার্লফ্রেন্ড নয় বউ বানাতেও রাজে। শুধু তুই রাজি হয়ে যাহ।
রিদ্ধিমা ঠাট্টা করে বলে,
” হে হে নাইস জোক্স। আমি মুসলিম আর তুই খ্রিষ্টান। বিয়েতে তুই যাবি গির্জায় আর আমি যাব মসজিদে। একবার তর নিয়মে বিয়ে করব আবার আমার নিয়মে তাই না?
এড্রিয়ান চোখ টিপে বলে,
” মন্দ হয় না কিন্তু। আধুনিক আধুনিক ফিল আসবে। সাথে বাচ্চারাও ইউনিক বাবা -মা পেয়ে যাবে।
রিদ্ধিম রাগে ধমক দিয়ে উঠে,
” ফরেনারের বাচ্চা চুপ থাক। রাগাবি তো পচা নদীতে চুবিয়ে আনব। ভাগ্যে বিয়েটাও জুটবে না। আপাযত আমার কথা শুন।
” তুই খুব নাদান রিদ্ধি। বুঝলিনা আমার ভালোবাসা।
রিদ্ধিমা রাগী চোখে তাকাতেই এড্রিয়ান থমথমে মুখে বলে,
” বল কি বলবি। আর জ্বালাচ্ছি না। তবে এইটা সত্যি তর জন্য আমি এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। কিন্ত এলার্ম কেনো বাজে নি বুঝতে পারি নি। এলার্ম ও বাজে নি আর ঘুম ও ভাঙ্গে নি। তাই আসতে দেরী হয়ে গিয়েছে। এখন কি প্রয়োজনীয় কথা বলে ফেল। আমি থাকতে ডিপ্রেশন কিসের তর?
রিদ্ধিমা মুখটা ফ্যালাশে করে বলে,
” আমি দু – টানায় ভুগছি এড্রি।
” কিসের দু- টানায়। সবটা খুলে বল।
” এড্রি আমি আমার রক্তের ভাইয়ের সন্ধান পেয়েছি। সে এসেছিলো আমার কাছে।
এড্রিয়ানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। উত্তেজনায় বলে উঠে,
” আরে শালী কি বলিস?
ব্যাস, রিদ্ধিমার মেজাজ আবার ও গরম হয়ে যায়। সে এড্রিয়ানের হাতে ঘুষি মেরে বলে,
” আরেকবার গালি দিলে তর মুখ ফাটাব আমি।
এড্রিয়ান কাচুমুচু খেয়ে বলে,
” সরি, দোস্ত। উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম কিছুটা। এখন বাকিটা দ্রুত বল। আর তর ভাই কে? কোন দেশের?
রিদ্ধিমা হতাশার নিশ্বাস ফেলে বলে,
” তার পরিচয় নিয়ে আমিও বিব্রত এড্রি। সে কেনো আমার ভাই হলো অন্য কেউ কেনো নয়। কিন্ত ইচ্ছে করছে ভাইয়ের বুকে ছুটে যেতে। কিন্তু পারছি না।
রিদ্ধিমা কথা গুলো বলতে বলতে মুখে হাত চেপে ধরে। কান্না গলা পাকিয়ে আসছে তার। এড্রিয়ান পানি এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” তর তো খুশি হওয়ার কথা রিদ্ধি। তুই নিজের পরিবার, নিজের ভাইকে পেয়েছিস। সে তর ভাই হওয়াতে কি সমস্যা? চিনি তাকে আমি?
রিদ্ধিমা পানিটা খেয়ে বলে,
” শুধু তুই নয় তাকে সবাই এই চিনে। আবার জমের মত ভয় ও পায়।
” কে সে?.
রিদ্ধিমা নিশ্বাস টেনে বলে,
” কানাডা আর আফ্রিকার সব থেকে ক্ষমতাধর গ্যাংস্টার, আন্ডারগ্রাউন্ড টেররিস্ট নিক জেভরান!
এড্রিয়ান সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠে,
” হুয়াট! কি বলছিস এইসব তুই রিদ্ধি? মাথা ঠিক আছে তর? সপ্ন দেখেছিস নাকি। নয়ত এমন আজগুবি কথা কেনো বলছিস? তর ধারনা আছে তুই কি বলছিস?
” আমি যা বলছি সব সত্যি। বিশ্বাস কর আমার কথা। সে আমার একমাত্র বড় ভাই। সে নিজে এসেছিলো আমার কাছে। উনার মুখ তো বাহিরের জগতের কেউ দেখে নি। সব সময় কালো হুডিতে আবৃত থাকে। তাই আমিও চিনতে পারি নি, উনি কে। এরপর বাবা বললো উনি গ্যাংস্টার বস। আমার কাছে দুইজনের ডিএনএ রিপোর্ট ও আছে।
এড্রিয়ান পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে বলে,
” সে জন্য এতদিন ভাবতাম তুই এমন জেদী আর উগ্র কেনো? মৃত্যু বা আঘাতের কোনো ভয় নেই। এতদিনে বুঝলাম আসল কাহিনী। মুলত নিক জেভরানের সেই রক্ত বইছে তো তাই এমন।
রিদ্ধিমা চোয়াল পিষে বলে,
” তুই এমন মুহূর্তে মজা নিচ্ছিস শয়তান? আমাকে উত্তর খুঁজে দে।
” ভাইয়ের সাথে দেখা কর। এরপর ভাই -বোনে কোলাকোলি করে ভালোবাসার মুহূর্ত পালন করে। চিৎকার করে ভাইয়ের গলায় ধরে কাঁদবি সেও তর গলায় ধরে কাঁদবে। অবশ্য তর ভাই কাঁদতে পারে তো? নাকি শুধু মানুষ এই কেটে টুকরো টুকরো করেছে আজীবন?
রিদ্ধিমা অদ্ভুত নিশ্বাস ফেলে। সিরিয়াস মুহূর্তে এই ছেলের মজা জীবনেও যাবে না। তবে এই ছেলে রিদ্ধিমার খুব আপনজন। পুরো শহরে একমাত্র বন্ধু তার। যে তার বিপদে সব সময় হাজির। কতটা বিপদ থেকে যে রক্ষা করেছে তার হিসেব নেই। রিদ্ধিমা সমস্ত কথা বিনা নোটিশে শেয়ার করতে পারে। রিদ্ধিমা রেগে বলে,
” ট্রাস্ট মি এড্রি তুই যদি এখনও সিরিয়াস না হয়ে কথা বলিস তবে তর দুই গালে থাপ্পর বসাব আমি।
এড্রিয়ান নিজের দুই গালে ধরে আহত গলায় বলে,
” আর করব না মজা। শুন, সে খারাপ হোক, জানোয়ার হোক, পশু হোক কিন্তু দিনশেষে তদের ডিএন এর মিল হয়েছে। এত দিন পর নিজের ভাইকে পেয়েছিস। এখন কি দুরে সরে থাকবি?
” তার পেশা নিয়ে প্রথম ভাবলেও এখন ভাবি না। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে আমার মা কেনো আসলো না আমার কাছে? আমার বাবা কেনো আসলো না?
” মাফিয়াদের পরিবার থাকে গাধী? জানা মতে নিক জেভরানের রক্তের বলতে কেউ নেই। তার দুর্বলতা বলতেও কেউ নেই। এখন গর্ত থেকে তুই বের হলি। তর ভাই তকে নিয়ে যেতে আর আসে নি?
রিদ্ধিমা মন খারাপ করে বলে,
” তার মানে বাবা- মা নেই আমার? কিভাবে মারা গেলো তারা? ভাইয়া ওদিন আসার পর আসে নি। সেদিন বলেছিলো ইচ্ছে হলে চলে যেতে। সে আর আসবে না। কারন তিনি কারোর দরজায় দ্বিতীয়বার পা রাখে না।
” হক কথা বলেছে।
” কি করব?
” যা তার কাছে। গিয়ে ভাইয়া ডাক। হারিয়ে যাওয়া আপনজকে ফিরে পাওয়া অনেক খুশির জিনিস রিদ্ধি। উপেক্ষা করিস না কিছু।
” বাবা অসুস্থ এড্রি। তাই যেতে চাচ্ছি না। নিক জেভরান আরও মাস খানেক আগে এসেছিলো আমার কাছে। পরিচয় জানিয়ে গিয়েছে আমার। অথচ মাসের ভেতরে তার কাছে যায় নি। নিশ্চই কষ্ট পাচ্ছে তাই না এড্রি?
এড্রিয়ান ভাবুক গলায় বলে,
” উনার হৃদয় বলতে আদ’ও কিছু আছে?
” অবশ্যই আছে। মানুষের হৃদয়ে পাথরের প্রলেপ পড়লেও কিছুটা ফুলের সুবাস থাকে। যেটা আপনজনদের সান্নিধ্যে আসলে সুবাস ছড়ায়। তাহলে কাল আমি তার কাছে যাব?
এড্রিয়ান ভয়াতুর গলায় বলে,
” রিদ্ধি শুন, যাবি ভালো কথা নিজেকে আড়াল করে রাখিস। মাফিয়া জগতের এক একটা হিংস্র কীট। ওইখানে রক্তপাত আর কাটাকাটি ছাড়া কিছু নেই।শত্রুর আপনজনদের খুজে তাকে মেরে ফেলে। আপনজনদের মেরে শত্রুর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করে। সাবধানে থাকিস। নিক জেভরানের শত্রুরা যাতে জানতে না পারে তুই তার বোন। জানতে পারলে তকে আ্যটাক করতে দুইবার ভাববে না।
কায়াতের নামে নিবন্ধিত চারটি ব্যাংক হিসাবে সংঘটিত হয়েছে এক নিঃশব্দ অথচ সর্বগ্রাসী বিপর্যয়। সংখ্যার হিসেবে সেখানে সঞ্চিত অর্থ ছিল বিলিয়নের ঘরে। অগণন অঙ্কের সমাহার। যার প্রতিটি শূন্য তার অবৈধ সাম্রাজ্যের শক্ত খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হিসেব কষতে গিয়ে কায়াত বুঝতে পারে তার নিষিদ্ধ বাণিজ্য থেকে আহরিত সম্পদের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি এই চারটি হিসাবেই গচ্ছিত ছিল। অর্থাৎ, ওই চারটি একাউন্ট কেবল টাকা নয় তার ক্ষমতা, প্রভাব ও অপরাধজগতের ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু সেই কেন্দ্রবিন্দুই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষ। সাধারণ কোনো হ্যাকার নয় অত্যন্ত চতুর, ভয়ংকরভাবে প্রভাবশালী, এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ছায়ার মতো অদৃশ্য এক ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিখুঁত পরিকল্পনায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার শিরা-উপশিরা ভেদ করে অর্থ লোপাট করেছে। কোনো চিহ্ন নেই। কোনো ভুল নেই। শুধু শূন্যতা যা কায়াতের চোখে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
এখন কায়াত মানসিক ভারসাম্য হারানোর কিনারায় দাঁড়িয়ে। তার বিবেক তপ্ত লোহার মতো জ্বলছে।চিন্তা ছুটছে উন্মত্ততার ঘূর্ণিতে। পাগলা কুকুরের ন্যায় সে শহরের অলি-গলি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের গোপন আস্তানা, বিশ্বাসঘাতক মুখগুলোর ছায়া সবখানে খোঁজ চালাচ্ছে। শত্রু কে খুঁজছে ঠিক কিন্তু সে এইটা ও অনুভব করেছে আসল শত্রু কে? একটা ব্যাংক হ্যাক করা সাধারন কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। যে করেছে সে নিশ্চই অনেক ক্ষমতাধার। আর ক্ষমতাধর ভাবতে গিয়ে কায়াতের প্রথম নজর যায় নিকের দিকে। নিক ছাড়া এত বড় ক্ষতি তার কেউ করতে পারবে না। তার ক্ষমতা কোনো দিক দিয়ে কম নয়। কারোর সাহস নেই তার পিছনে লাগার। শুধু একজনে এই আছে। আর সেটা হচ্ছে নিক জেভরান!
কায়াতের প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রতিশোধের গন্ধ । প্রতিটি দৃষ্টিতে তার সন্দেহের ধারালো ছুরি। যে তাকে এই নগ্ন আর্থিক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত কায়াতের এই উন্মত্ত অনুসন্ধান থামবার কোনো অবকাশ নেই। কায়াত হিংস্র হায়েনার মত সামনে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে ওয়াইনের গ্লাসটা। এমনভাবে ধরেছে যে – কোনো মুহূর্তে ফেটে পড়বে। কায়াতের এসিস্ট্যান্ট এসে বলে,
” বস, বাকি দুইটা ও হ্যাক করার চেষ্টা চলছে। কি করব এখন?
কায়াত জেদ আর হিংস্রতায় কথা বলতে পারছে না। সব কিছু জ্বালিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
” যত টাকা আছে সব তুলে ফেল।
এসিস্ট্যান্ট মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। কায়াত ওয়াইনের গ্লাসটা আছড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে।।চুল টেনে ধরে বিরবির করে উঠে,
” দেওলিয়া করেছিস তুই আমাকে কুত্তার বাচ্চা। তুই আমার টাকা নিয়ে রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করেছিস। আর আমি তর আপনজকে তর থেকে কেড়ে নিব। আমার ভুল হয়েছিলো সেদিন তর উপরে বোমা হামলা করানো তে। উচিত ছিলো তর রক্ষিতাকে শেষ করে দেওয়া। তাহলে তুই ধুকে ধুকে মরতি। বাচ্চার বাপ হচ্ছিস তো তুই, তাই না? অপেক্ষাতে রইলাম সেদিনের। তর বাচ্চাগুলোকে যদি আমি ফুটন্ত তেলে না ভেজেছি তবে আমার নামও কায়াত নয়। রক্ষিতাকে রুম বন্ধী করে রাখলি কিন্তু বাচ্চাদের কতদিন রাখবি? চ্যালেঞ্জ করছি আমি তকে তর বাচ্চাদের তেলে ভাজা শরীর তুই নিজ চক্ষে দেখবি কুত্তার বাচ্চা!
নাজলী সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,
” প্রয়োজনীয় একটা কথা বলার ছিলো।
আরিশ ঘাড় ঘুরিয়ে কপাল কুচকায়। নাজলী এমন কুচকানো কপাল দেখে থমথমে খেয়ে বলে,
” ইরান যাব আমি। আমার রাজ্যে আমি যেতে চাই। নিজের দেশ অনেক দিন হলো দেখি না।
আরিশ খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বলে,
” হ্যা, যাও।
নাজলী অবাকের চরম পর্যায়। এত সহজে যেতে দেওয়ার ব্যক্তি তো এই পুরুষ নয়। ভেবেছে অনেক যুদ্ধ করতে হবে এইটা নিয়ে। আশর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” সত্যি যেতে বলছেন?
” মিথ্যে কখন বললাম?
” আপনি যে এত ভালো জানা ছিলো না। অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাকে যেতে দেওয়ার জন্য।
” আমি জন্ম থেকে এই ভালো। কিন্তু যারা খারাপ তারা আমাকে খারাপ ভাবে। আর যারা ভালো তারা আমাকে ভালো ভাবে।
নাজলী চোখ ছোট ছোট করে ফেলে।
” খুঁচাটা কাকে দিলেন আপনি? আপনি খারাপ তাই খারাপ ভাবি। খারাপ লোককে খারপ ভাবলে কেউ খারাপ হয় না। বরং খারাপ লোককে ভালো ভাবলে সেটা অন্যায়। যায় হোক তর্ক করে নিজের এই শান্ত মেজাজ অশান্ত করতে চাচ্ছি না। আপনি থাকুন আমি যাচ্ছি ভেতরে। কাপড় গুছাতে হবে।
আরিশ ভ্রু নাচিয়ে বলে,
” কাপড় গুছাবে কেনো?
নাজলী অবাক হয়ে বলে,
” এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাব। কাপড় গুছাব না? কাপড় না নিলে ওইখানে পড়ব কি?
আরিশ সামনের দিকে তাকিয়ে বলে,
” সপ্নে কোনো জায়গায় গেলে কাপড় গুছাতে হয় না। শুধু বিছানায় শুয়ে একটা ঘুম দাও। দেখবে অলরেডি চলে গিয়েছো। কাপড় দিয়ে কি করবে শুধু শুধু?
নাজলীর চোখ-মুখ কুচকে আসে। চোয়াল শক্ত করে বলে,
” কিহহ! সপ্নে যাব মানে? ফাজলামো করছেন আমার সাথে?
আরিশের চোখ-মুখ ও কিছুটা কঠিন হয়ে আসে। নাজলীর সম্মুখী দাঁড়িয়ে বলে,
” আপনি কি আমার বেয়াইন হন , যে ফাজলামো করব? তোমার সাহস হলো কিভাবে এমন একটা আবদার করার? তুমি একা একা ইরান যাবে আর সেই অনুমতি আমার থেকে নিতে এসেছো? এতটা ভালো তো আমি নয় নাজলী মাইলাহ।
নাজলী পুরোটা হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে থাকে। একটু আগে কি সুন্দর আশার আলো দেখালো। আর পর মুহূর্তে আলোটা কষ্ট ছাড়া এই নিভিয়ে দিলো। কিন্তু নাজলী নিজেও থেমে যাওয়ার পাত্রী নয়।
” আমি যাব, দেখি কিভাবে আটকান আমাকে।
আরিশ দাঁত পিষে বলে,
” বাহিরে যাস্ট পা রাখো, পা ভেঙ্গে গলায় ঝুলিয়ে দিব।
নাজলী মুচকি হেসে আরিশের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর শার্টের কলার ঠিক করতে করতে হেসে বলে,
” আমি এনি নয় মি, আরিশ। যে স্বামী আমাকে ঘর বন্ধী করে রাখবে আর আমি সেটা মেনে নিব। স্বামীকে হারিয়ে মানসিক রোগীতে পরিনত হব। আমি হলাম নাজলী মাইলাহ। স্বামীকে ভালোবাসব, তার জন্য পাগল ও হব কিন্তু তার স্বৈরচারী স্বভাব মেনে নিব ভেবে থাকলে ভুল। পা ভাঙ্গা -ভাঙ্গির ভয় আমাকে দেখাতে আসবেন না। এইসবে নাজলীরা ভয় পায় না।
আরিশ ঘন ঘন শ্বাস টানছে। নাজলীর শরীরের মেয়েলী পারফিউমের গন্ধ তার অবাদ্ধ হৃদয়কে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে। হাত নিশ-পিশ করছে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য। গলা- কপাল দিয়ে চিকন ঘাম পড়ছে। আরিশ দুই কদম পিছিয়ে হুশিয়ারি দিয়ে বলে,
” কাছে আসবে না একদম।
নাজলী প্রথমে অবাক হলেও আরিশের ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে বাঁকা হাসে। আরিশের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
” সামান্য কাছে আসা সহ্য করতে পারছেন না আর হুমকি দিচ্ছেন পা ভেঙ্গে রেখে দিবেন? হুহ!
আরিশ নাজলীর বিদ্রুপ কন্ঠে চোখ কুচকায়। নাজলীকে হাসতে দেখে ঠোঁট চেপে ধরে নিজের। নিজের অস্থিরতাকে থামিয়ে সেও এগিয়ে আসে নাজলীর দিকে। আরিশকে এগিয়ে আসতে দেখে নাজলী পিছিয়ে যায়। কিন্তু তার আগেই ক্রিমিনাল লিডার পেঁচিয়ে ধরে তার লতানো কোমর। শিরশির করে উঠে নাজলীর শরীর। খামছে ধরে আরিশের জেকেটের অংশ। নাজলীর এমন কাঁপা শরীর অনুভব করে আরিশ দুষ্টু হেসে তার ঠোঁট নিয়ে যায় নাজলীর গালে – গলার দিকে। ফিসফিস করে বলে,
” তোমার কাছে আসা আমি সহ্য করতে পারি বেইবি। কিন্তু আমি কাছে আসলে তুমি সহ্য করতে পারবে না। কাঁদবে খুব। সেদিনের রাত আর সকালের কথা ভুলে যাও নি নিশ্চই?
কি চাও নিজেকে নিয়ন্ত্র না করে রাস্তার মধ্যেই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়? তাহলে চলো তাই হোক।
নাজলী ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। চারপাশে কেমন একটা নিরবতা। সামনেই সমুদ্রের গর্জন আর পাশে ছোট একটা জঙ্গল। আর দুর থেকে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য গার্ড মিনারটাকে ঘিরে আছে। এই মুহূর্তে আরিশকে তার মোটেও ভালো ঠেকছে না। ঘুমন্ত সিংহকে খুঁচা মেরে নিজের বিপদ ডেকে আনলো না তো? আরিশ কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। নিজের জেকেটটা খুলে পাশে ফেলে দেয়। নাজলীর দিকে তাকিয়েই শার্টের বোতাম একটা একটা করে খুলতে থাকে। নাজলী বুদ্ধি সব হারিয়ে শুধু ঠোঁট ভিজিয়ে যাচ্ছে। হুট করে আরিশের হাত টা শক্ত করে ধরে বলে,
” রাস্তার মধ্যে কি শুরু করে দিয়েছেন। সরি, আর বলব না এমন। আমি তো মজা করছিলাম।
আরিশ শুনলো না। গম্ভীর গলায় বলে,
” মজা করা উচিত হয় নি বেইবি। আমার তো মুড চলে এসেছে। কিছু করার নেই।
নাজলী রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই থেমে যায় সে। মনে হচ্ছে আরিশের পিছন দিকে দুর থেকে কেউ একজন আছে। অন্ধকারে তার অদ্ভুত চোখ গুলো চিকচিক করছে। নাজলী ভয়ে ভয়ে আরিশের দিকে তাকায়। কাঁপা গলায় বলে,
” আপনার পিছনে কেউ একজন আছে। প্লিজ চলুন এখান থেকে। মনে হচ্ছে কেউ ফলো করছে আমাদের।
আরিশ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
” কেউ আসার অযুহাত দিচ্ছো?
নাজলী চোয়াল শক্ত করে বলে,
” আমার অযুহাতের প্রয়োজন পড়ে না। আপনাকে আটকানো আমার বা হাতের খেলা। কিন্তু আপাযত এখানে বিপদ। ট্রাস্ট না হলে পিছনে তাকিয়ে দেখুন কেউ একজন তাকিয়ে আছে।
আরিশ নিজেও কিছুটা সিরিয়াস হলো। নাজলীর ভয় দেখে সে ও পিছনে ঘুরলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সে ঘুরার সাথে সাথে ছায়া গায়েব। কেউ নেই সেখানে। আরিশ কিছু দেখতে না পেয়ে বলে,
” কোথায় তোমার সেই লোক?
নাজলী তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। আশ্চর্য হয়ে বলে,
” কেউ একজন ছিলো এখানে। আপনি তাকানোর সাথে সাথে সরে গিয়েছে। এই জঘন্য লোকটা কিছু একটা করার জন্য তো অবশ্যই এসেছে। আর সে আমার জন্য এসেছে সিউর?
আরিশ খাপছাড়া ভঙ্গিতে বলে,
” তুমি কিভাবে বুঝলে সে খারাপ আর তোমার জন্য এসেছে ?
নাজলী এগিয়ে যায় মিনারের দিকে। যেতে যেতে বলে,
” জীবনে কত কুকুর আর সাপ দেখছি, এখন তাকালেই বুঝি চাটতে আসছে নাকি কাটতে। মেয়েদের দৃষ্টিশক্তি আর অনুমান শক্তির গভীরতা আপনি বুঝবেন না।
নাজলীর কথা শুনে আরিশ দাঁড়িয়ে যায়। নাজলীর মুখের ভাষা নিয়ে কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করে। এমন জংলী কেনো তার কপালে পড়লো!
আরিশ তাকায় সেই জঙ্গলের দিকে। রহস্যময় হেসে ঠোঁট কামড়ায় নিজের। অন্য রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যায় সেই জঙ্গলের কাঙ্খিত স্থানে। দেখা যায় একটা গাছের মধ্যে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো হুডিতে আবৃত একটা পুরুষ। তার দৃষ্টি এখনও সেই জায়গায় যেখানে আরিশ আর নাজলী দাড়িয়ে ছিলো। আরিশের চোখ -মুখ রাগে ফ্যাকাশে হয়ে উঠে। সে নাজলীর আগেই অনুমান করেছে এখানে কেউ একজন আছে। যে খুব সূক্ষ্ণ ভাবে সেদিকে তাকিয়ে ছিলো। আরিশ অপেক্ষা করলো না কিছুর। আচমকা লোকটার উপর হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার ঘাড় চেপে ধরে সোজা গাছের সাথে এক সাথে দশটা ধ্বাক্কা খাওয়ায়। লোকটা হয়ত তাকানোর সাহসটাও পায় নি। তার আগেই এমন আক্রমনের স্বীকার হয়। মাথা ফেটে রক্তে ভেসে যাচ্ছে জমিন। আরিশ রাগে ফুঁশ – ফুঁশ শব্দ করে যাচ্ছে। নিরবতকে চূর্ণ করে আহত লোকটাকে মাটির সাথে চেপে ধরে গর্জে উঠে,
” কুত্তার বাচ্চা সেদিকে তাকিয়ে কি দেখছিলি সত্যি করে বল।
লোকটা যন্ত্রনার কারনে কথা বলতে পারছিলো না। সে হচ্ছে শত্রুপক্ষের এক গুপ্তপচর। যে মিনারের চারপাশের সংবাদ পাচার করার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু আরিশের পাশে এমন সুন্দরী লাল চুলের রমণীকে দেখে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে যায়। সৌন্দর্যের মোহে পড়ে তাকিয়ে ছিলো। ভুলে গিয়েছিলো যে এখানে ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ও উপস্থিত আছে। যারা কাছে কেউ শত্রু দাঁড়িয়ে থাকলে খুব সহজে সেটা অনুভব করতে পারে। চতুরতা যাদের শিরায় শিরায়। কামনার দৃষ্টি ফেলতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনলো। লোকটা ভয়ে বলে,
” আমি কিছু দেখিনি স্যার।শুধু এই সুন্দর মিনারটা দেখছিলাম।
আরিশ শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
” মিথ্যে কম বল। মেয়েটাকে কি ভালো লাগছে তর? ভালো লাগলে এক রাতের জন্য দিতে পারি। আমি নিজেই এক রাত ব্যবহার করে আর ছুঁই নি। চাইলে নিতে পারিস।
আরিশের কোমল কথায় লোকটা সব ভুলে যায়। লালসায় অন্ধ হয়ে যায় পুরুষ মন।
” হ, হ নিতে চাই। খুব ভালো লাগছে আমার।
” কিন্তু তুই তো অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলি। মেয়েটাকে দাম দিস নি।
লোকটা উত্তেজনায় বলে বসে,
” মিথ্যে বলেছি। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমি ভেবেছি আপনার আপন কেউ। তাই মিথ্যে স্বীকার করেছি।
আরিশের শান্ত চোখ মুহূর্তেই ভয়ংকর রুপ ধারন করে। সময়ের ব্যবধানে পকেট থেকে সূক্ষ্ণ নাইফ বের করে লোকটার দুই চোখের ভেতরে গেঁথে দেয়। হাসির মধ্যে হুট করে এমন আক্রমনে লোকটা চোখে হাত দিয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে।।গগন বিধায়ী চিৎকার করে হাত -পা ছুড়াছুড়ি করতে থাকে। আরিশ বাঁকা হেসে লোকটার সামনে হাটু ভাঁজ করে বসে। সামান্য ঝুঁকে বলে,
” ভুল ভাবিস নি। আসলেই সে আমার খুব আপনজন। ক্রিমিনাল লিডার আরিশ ইলহামের খুব আদুরে বউ। যার দিকে তাকাতে আমার এই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে সেখানে তুই তাকানোর সাহস পেলি কিভাবে?
লোকটা বুঝতে পারলো তাকে অফার করাটা ছিলো ছলনার ফাঁদ। আর সে এই ফাঁদে পা দিয়ে সত্যিটা বলে দিয়েছে। সে কাতরাতে কাতরাতে চিৎকার করে উঠে,
” বাস্ট্রাড! নাটক করেছিলি এতক্ষণ। তর বউকে আমি তো চোখ দিয়ে খেয়েছি। অন্যরা সব দিয়ে খাবে। শুধু অপেক্ষা কর।
ব্যাস, লোকটার গলায় চলে সূক্ষ্ণ ছুঁরি চালিয়ে দেওয়া হয়। লোকটা চেঁচাতে পারে নি কারন তার মুখ আরিশ হাত দিয়ে বন্ধ করে রেখেছিলো। লোকটার গলা দিয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আরিশ আবার ও আঘাত করে গলায়।আরিশের হাতের নিচে লোকটার ছটফটানিটা দমে আসে ধীরে ধীরে। ছুরির শীতল ফলাটা যখন গলার চামড়া চিরে ভেতরে ঢুকে যায়। এখন শুধু একটা চাপা ঘড়ঘড়ে শব্দ শোনা যায় যেটা আরিশের হাতের তালুতেই মিলিয়ে যায়। লোকটার গোঙানিটা বাইরে বের হওয়ার সুযোগই পেল না।
গলার সেই ক্ষতটা থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া তাজা গরম রক্ত আরিশের আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
যেন এখানে মানুষ নয় পশুকে জবাই করা হয়েছে।
আরিশের পাথুরে চিবুকে কিংবা চোখের মনিতে সহানুভূতির লেশমাত্র নেই। তার স্থির দৃষ্টিতে কেবল এক আদিম প্রতিহিংসার প্রতিফলন। লোকটার দেহটা যখন যন্ত্রণায় কয়েকবার কেঁপে উঠে নিস্তেজ হয়ে আসে। আরিশ অবহেলার সাথে তার হাতের বাঁধন আলগা করে দেয়। মাটিতে জমাট বাঁধতে থাকা রক্ত যেন এক কৃষ্ণপক্ষের গাঢ় হ্রদ, যেখানে কোনো এক পশুর মতো বলি হওয়া দেহটা এখন নিস্পন্দ পড়ে আছে। এক নিপুণ নিস্তব্ধতায় আরিশ সম্পন্ন করল তার এই বীভৎস যজ্ঞ।
বিছানায় আসীন এনি বিরতিহীনভাবে ফল সাবাড় করে চলেছে। পাকস্থলী বিদ্রোহ করছে। প্রতিবার মুখে ফ্রুটস খাচ্ছে আর বমির উদ্রেক হচ্ছে। তবুও বিরতি নেই। প্রতিদিন ফ্রুটস খাওয়া তার জন্য বাধ্যতা হয়ে উঠেছে । এর অন্যথা হলেই গ্যাংস্টার বসের প্রচণ্ড রোষানলে পড়ার সুনিশ্চিত সম্ভাবনা।
বিগত তিন-চার মাসে তার শারীরিক গড়নে আমূল পরিবর্তন এসেছে। রিক্ত দেহ এখন স্থূলতায় পূর্ণ। দর্পণের সম্মুখে দাঁড়ালে নিজের গোলগাল অবয়ব দেখে সে নিজেই চমকে ওঠে। অথচ কিছুদিন আগেই নিককে হারানোর শোকে অনিদ্রা আর অনাহারে এনি প্রায় কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল। তখন তাকে দেখে মনে হতো যেন কবরের কোনো প্রেতাত্মা ধরাধামে নেমে এসেছে। কোটরগত চোখ, বিবর্ণ মুখশ্রী আর অবিন্যস্ত রুক্ষ চুল সব মিলিয়ে কেমন যেন শ্রীহীন রূপ ছিল কোনো উন্মাদিনীর ন্যায়। নিজেকে মাঝে মাঝে রাস্তার পাগল মনে হত। তবে সেই জরাজীর্ণ দশা এখন অতীত। বর্তমানের প্রাচুর্য আর যত্ন তাকে নতুন এক অবয়বে আবৃত করেছে। এনি বারান্দার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে,
” কতটা রহস্যময় আপনি গ্যাংস্টার বস। এক বিন্দু যত্নে কৃপনতা করেন নি। বার বার চেক করা আপনার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। বাচ্চাদের ভালোবাসেন না অথচ বার বার জিজ্ঞাসা করছেন নড়াচড়া করছে কি না? ওদের চান না অথচ দুনিয়ার সমস্ত আদর – যত্ন আমার সম্মুখে এনে দাড় করিয়েছেন।নিজ হাতে করছেন।
এনির স্বগতোক্তির মাঝেই ঝড়ের বেগে কক্ষে প্রবেশ করল নিক। হাতের ফোনটা টেবিলের ওপর একপ্রকার অবহেলায় রেখে সে রুদ্ধশ্বাসে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
”নড়াচড়া করছে?”
এনির চোখের মণি বিস্ময়ে সংকুচিত হয়ে আসে। হাতের শূন্য পেয়ালাটি একপাশে সরিয়ে রেখে সে ম্লান মুখে উত্তর দেয়,
”নাহ!”
পরক্ষণেই নিকের মুখাবয়বে এক তীব্র আতঙ্ক ভর করে।সেই দুর্ধর্ষ ব্যক্তিত্ব নিমিষেই যেন এক অধৈর্য সত্তায় রূপান্তরিত হয়ে আসে। সে দ্রুতপদে এনির সন্নিকটে এসে বসে। এনি এক পলক নিকের পানে তাকাতেই দেখল, নিক এক অবাধ্য অস্থিরতায় তার হাতখানি এনির উদরের ওপর রাখছে। স্পর্শটি লাগামাত্র নিকের সারা শরীরে যেন এক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে যায়। তীব্র এক শিহরণে সে চকিতে হাতটি সরিয়ে নেয়। পরক্ষণেই ছন্নছাড়ার মতো ফোন হাতে নিয়ে কাউকে কল দিতে উদ্যত হয় সে। নিকের এই দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য অবস্থা দেখে এনি যেন স্তম্ভিত হয়ে যায়।কিছু একটা করতে হবে না হলে এই লোক পাগলামি শুরু করে দিবে। এনি গলা ভিজিয়ে অত্যন্ত ধীর ও শান্ত কণ্ঠে আশ্বস্ত করে বলে,
”অধৈর্য হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। সব ঠিকঠাকই আছে। এই সময়ে প্রাণের স্পন্দন এতটা প্রখরভাবে অনুভূত হয় না।”
এনির কথায় নিকের অস্থিরতা কিছুটা প্রশমিত হলো ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই এক প্রচণ্ড ক্রোধে তার কপালের রগগুলো স্ফীত হয়ে উঠে। নিক ক্ষিপ্র গতিতে এনির কাছে ফিরে এসে তার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে,
” মিথ্যে কেনো বললে ইডিয়েট? ধারনা আছে কি অবস্থা হয়েছিলো আমার? আমাকে অস্থির করতে ভালোবাসো তুমি? নিক জেভরানের দুর্বলতায় আঘাত দ্বিতীয়বার করবে না।
এনি ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে। উদরদেশের তীব্র যন্ত্রণায় শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আসে। তবু অস্ফুট, কাঁপা স্বরে সে বলে,
“ওরা আপনার দুর্বলতা? সেই দুর্বলতা, যাদের নিয়ে আজ পর্যন্ত আপনি একদিনের জন্যও ভালোবাসা প্রকাশ পারেননি। এ কেমন দুর্বলতা, গ্যাংস্টার বস?”
নিক ধীরে এনির চোয়াল ছেড়ে দেয়।গালের ওপর হাত রেখে গম্ভীর, সংযত কণ্ঠে বলে,
“ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, ব্লাডরোজ? যন্ত্রচালিত হৃদয় কখনো খুশিতে উত্তেজিত হয় না। গ্যাংস্টার বসও ভালোবাসতে জানে, শুধু তার প্রকাশভঙ্গি মানুষের মতো নয়।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে, তাচ্ছিল্য আর কঠোরতার আবরণে কণ্ঠ ভারী করে নিক আবার বলে,
“আমি জানি, ওরা আমার সন্তান।আমার অস্তিত্বেরই সম্প্রসারণ। কিন্তু এই যে আমার দুই হাত দেখতে তোমাদের মতো হলেও এতে লেগে আছে লক্ষ মানুষের রক্তের ছাপ।আমি নিজের জন্মদাত্রীর রক্তের বোঝা নিয়েই বেঁচে আছি। আমার অবস্থান তুমি বুঝবে না, ব্লাডরোজ। আমার হাসির মধ্যেও ধ্বংস বাস করে। যাদের আগলে ধরে বাঁচাতে চাই, তারা খুব দ্রুতই আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। যেদিন তুমি সুস্থ থাকবে, ওরা সুস্থ থাকবে সেদিনই আমি ওদের নিয়ে খুশি হতে পারব।
” এত অস্থির কেনো হচ্ছেন? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আমাকে ভরসা করেন না আপনি?
” আমার সব থেকে বড় গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তোমার গর্ভে রেখেছি আর কোনো ভরসা চাও তুমি ব্লাডরোজ?
এনি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
” এইটা ভরসা?
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” ইয়েস মাই ফা*কিং বেবিগার্ল। নারী যদি ভরসার স্থান না হত তবে খোদা কি আর পুরুষের ভবিষ্যত প্রজন্ম, অস্তিত্ব নারীর গর্ভে দিত?
নিকের যুক্তি শুনে এনি ভাবুক হয়ে উঠে। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের।।রাগটাকে শান্ত করতে ঘন নিশ্বাস ছেড়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে। এনি গলা কেঁশে নিককে শুনিয়ে বলে,
” একটা সময় চাউমিন খুব পছন্দ করতাম। কিন্তু এখন কিচেন এই পা রাখতে পারি না খাব কিভাবে?
এনি বলতে দেরী নিক ল্যাপটপ অফ করে এনিকে পাজা কোলে তুলতে দেরী হয় নি। এনি হতভম্ভ হয়ে বলে,
” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
নিক সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ধমকায়,
” তোমার চাউমিন খেতে ইচ্ছে করছে আমাকে বলা যেত না স্টুপিড! আর কখনো যদি এইভাবে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকো তবে জিহ্বাটা কেটে রাস্তায় ফেলে আসব।
এনি আড়ালে মুচকি হেসে বলে,
” বললে কি হত? কে বানিয়ে দিবে আমাকে? আমাকে তো কিচেনে যেতে দিবেন না। আর বাহিরের জিনিস ও খেতে দেন না। তবে এত রাতে কে বানিয়ে দিবে আমাকে?
নিক কিছুটা ভাবুক হয়ে উঠে। নাজলী বাহির থেকে এসে আর রুমে যায় নি। ডিভানে বসে ছিলো আরিশের অপেক্ষায় । এনি – আর নিককে আসতে দেখে মাথা নিচু করে ফেলে। ডিভানে বসে থাকা নাজলীকে আচমকা দেখে এনি চোখ বড় বড় করে ফেলে। নিককে তাড়া দিয়ে বলে,
” আপা বসে আছে এখানে। নামান আমাকে দ্রুত।
নিক চোখ রাঙ্গিয়ে তাকাতেই এনি চুপ হয়ে যায়। নিক খুব যত্ন সহকারে এনিকে ডিভানে বসিয়ে বলে,
” তুমি বসো এখান বানিয়ে আনছি।
এনি শরীরের উড়না ঠিক করতে করতে বলে,
” স্টাফরা সারাদিনে ঘুমিয়েছে। এই রাতে এদেরকে ডেকে তুলবেন না প্লিজ। এখন খাব না আমি। কাল খাব সমস্যা নেই।
নিক কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। মৃদু ধমকে বলে,
” স্টাফকে ডাকব না। আমি বানিয়ে আনছি।
এনির কান দুইটা যেন ভুল শুনলো। অবাক হয়ে বলে,
” এহহহ! কি বলছেন এইসব? আজও ড্রাগস নিয়েছেন নাকি?
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে এনির চুল গুলো কানের কাছে নিয়ে দেয়। এনি নাজলীর সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পরে। নিক সেদিকে হেলদুল নেয়। হাস্কি সুরে বলে,
” জীবনে কোনোদিন চামচ ছাড়া খাবার খায় নি। আর তাকে দিয়ে তুমি রান্না করিয়ে ছাড়লে বেবিগার্ল ?
এনির গলার স্বর যেন আটকে আসছে। কোনো উত্তর দিতে পারছে না। নিক কপালে আর ঠোঁটে চুমু খেয়ে সরে আসে। নিককে কিচেনে ডুকতে দেখে এনি অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,
” ইন্না – নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
নাজলী নিজেও অবাক হয়ে দেখছিলো নিককে। এনির মুখে এমন লাইন শুনে অবাক সুরে বলে,
” মরেছে কে?
” এইটা কি কেউ মরার থেকে কম? আচ্ছা আপা আমি কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সপ্ন দেখছি নাকি বাস্তব? উনি কি সত্যি রান্না করার জন্য কিচেনে গিয়েছে?
এনির এমন বাচ্চামো দেখে নাজলী নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” বাস্তবেই দেখছিস। এত অবাক হচ্ছিস কেনো? নিজের জন্য কোনোদিন না যাক তর প্রয়োজনে সে না গেলে কে যাবে? তার বাচ্চার মা হতে পারছিস আর সে নিয়মের বাহিরে গিয়ে এতটুকু করতে পারবে না? শ্বাস নে নয়ত দম বন্ধ হয়ে মরে যাবি।
এনি লম্বা শ্বাস নেয়। আসলেই তার শ্বাস আটকে আসছিলো। আরিশ ভেতরে প্রবেশ করতেই এনি ছটফট গলায় বলে,
” আরিশ ভাইয়া একটা ছবি তুলুন প্লিজ। এই দৃশ্যটা ক্যামারা বন্ধী না করলে অনেক বড় অন্যায় হয়ে যাবে।
আরিশ থতমত খেয়ে বলে,
” কিসের ছবি? কার ছবি? কি তুলব? কোথায় তুলব?
এনি চোখ দিয়ে ইশারা দিয়ে কিচেনের দিকে তাকাতে বলে। আরিশ যাস্ট বলতে যাচ্ছিলো ” এইদিক কি? তার আগেই তার কথা অসমাপ্ত রয়ে যায়। কিচেনে রান্না করা ব্যাক্তিটাকে দেখে তার চোখ দুইটা বের হয়ে আসার উপক্রম। সপ্ন ভেবে হাতের মধ্যে কয়েকটা চিমটি কেটে কিচেনের দিকে গিয়ে যায়। নিকের পেটানো শরীরের উপর কালো কালারের এপ্রোন। হাতে গ্লাভস পড়ে পেয়াজ এইসব কাটাকাটি করছে। আরিশ দেয়ালে হেলান দিয়ে অবাক হয়ে বলে,
” ভাই এইটা তুই? নাকি তর আত্না?
নিক বিরক্তির নিশ্বাস ফেলে কোনো উত্তর দেয় না। আরিশ ফোন বের করতে করতে বলে,
” গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান বউয়ের আবদার পুরন করতে কিচেনে চলে আসলো। টর্চার সেলের সেই ভয়ানক সিংহটাও বুঝি বউয়ের সামনে ভেজা বেড়াল?
আজ কিচেনে যাচ্ছে কাল বাচ্চার ডায়াপার্টও পরিস্কার করবে। কি অসাধারন দৃশ্য। দেশকে দেখানো উচিত যাকে তারা এত ভয় পায় সে কত স্ত্রী ভক্ত। চার হৃদয় অন্ধকারের মত আলোকিত।
নিক কোনো উত্তর দিলো না। আরিশের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে একটা ফ্রুটস জুসের গ্লাস হাতে তুলে নেয়। এরপর কিচেন থেকে বের হয়ে এনির দিকে যায়। এনির হাতে দিয়ে নাজলীর উদ্দেশ্যে বলে,
” নিজের স্বামীকে হেফাজতে রাখুন মিসেস নাজলী। আজকাল আপনার স্বামীকে প্রস্টিটিউট ক্লাবের সামনে অধিক দেখা যাচ্ছে। লক্ষণ কিন্তু ভালো নয়।
আরিশ হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে। নাজলী কিছুটা অবাক হলে ও অগ্নি দৃষ্টিতে তাকায় আরিশের দিকে। আরিশ মাথা নাড়িয়ে নাজলীর দিকে এগিয়ে আসত আসতে বলে,
” ট্রাস্ট মি, আমি যায় নি। ও ফাঁসানোর জন্য মিথ্যে বলছে। সব কিছু মিথ্যে। তুমি ছাড়া কোনোদিন কোনো নারীর দিকে তাকায় নি। কখনো কাউকে স্পর্শ করি নি।
নাজলী কিছু না বলে ডিভান থেকে উঠে আরিশকে স্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। আরিশ নিকের দিকে তাকিয়ে চোয়াল পিষে বলে,
” হিটলারের বাচ্চা তর মত বন্ধু আমার শত্রুর ও না হোক। এইভাবে প্রতিশোধ নিতে পারলি!
এনি এদের কাহিনী দেখে অবাক হয়ে যায়। একজন আরেকজনকে কি সুন্দর অনায়াসে ফাঁসিয়ে দিলো। নিকের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু দাড়ালেই পেটে তীব্র ব্যাথা অনুভব হয়। এনির মুখে কিছুটা আতঙ্ক চলে আসে।
আরিশ এই মুহূর্তে নাজলীর কাছে যায় না। সে নাজলীর পুরো স্বভাব মুখস্ত করে ফেলেছে। এই মেয়ে রেগে আছে এখন যদি মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে ও বলা হয় সে নির্দোষ তবুও বিশ্বাস করবে না।
এনি ডিভানের মধ্যভাগে স্থির হয়ে বসে নিকের দিকে তাকিয়ে আছে। দুপুর থেকেই চিনচিন ব্যাথা করছে পেট। কিন্তু ভয়ে কিছু বলে নি সে। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে ব্যাথার পরিমান তত বেড়ে চলছে। কিছুক্ষণ আগেও যে মুখমণ্ডলে প্রশান্ত হাসির দীপ্তি ছিল তা মুহূর্তের ব্যবধানে নিভে গিয়ে গম্ভীর স্থবিরতায় রূপ নেয়। পেটের অন্তর্গত গভীরে প্রথমে এক ক্ষুদ্র চিনচিনে অস্বস্তি জন্ম নেয় যা সে উপেক্ষা করতে চাইলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা স্ফীত হয়ে ওঠে তীব্র চেপে ধরা এক বেদনায় । ব্যথাটি যেন তরঙ্গের ন্যায় আগমন করে। কখনো চাপ বাড়ায়, কখনো সামান্য অবকাশ দেয়। আবার নির্দয়ভাবে ফিরে আসে। এনির কপালে ঘেষে দুই কর অচেতনে উদরদেশে চেপে বসে । আঙুলের পেশি সঙ্কুচিত হয়ে কাঁপতে থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। বক্ষদেশে বাতাস আটকে এসে হাপরানির সৃষ্টি করে। কপালের শিরা উন্মোচিত হয়ে ওঠে। ভ্রু কুঁচকে যায় কিছুটা। ব্যাথাহ চোয়াল শক্ত হয়। দৃষ্টিতে অনিশ্চয়তার সঙ্গে এক অদম্য সহিষ্ণুতার রেখা । নিকের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে। এইটা কি তাদের শেষ দেখা?
মানসিক স্তরে এনি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে । ভয়ের ঘনত্ব ক্রমে বাড়লেও তার অন্তরে দৃঢ়তার এক নীরব সংকল্প জন্ম নেয়। সময় তার কাছে দীর্ঘ ও ভারী মনে হতে থাকে। প্রতিটি ক্ষণ যেন ব্যথার ভার বহন করে এগোয়। শরীরী ভাষায় যন্ত্রণা সুস্পষ্ট। সে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে আবার সোজা হতে চায়। পৃষ্ঠদেশ কঠিন হয়ে আসে।।কাঁধ অনিচ্ছায় উঁচু হয়ে যায়। কখনো চোখ বন্ধ করে দাঁত চেপে ধরে।শরীরের ভেতরটা কেউ নিষ্ঠুরভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। যন্ত্রণার এক একটা ঢেউ যেন সাগরের উত্তাল তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ছে তার তলপেটে। এনি দুই হাতে শক্ত করে ডিভানের কাপড়টা খামচে ধরল। তার দীর্ঘ চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে পড়েছে কাঁধের ওপর, আর কপাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে নোনা ঘাম।
”আহ্…”
মুখ চেপে ধরে চিৎকারটা দেয়। শব্দ বের হয় না কোনোরকম। গলা চিরে কোনো চিৎকার বের হচ্ছে না শুধু একটা ভাঙা গোঙানি। বাতাসের জন্য তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। কিন্তু প্রতিটা নিশ্বাসের সাথে ব্যথাটা যেন আরও ধারালো হয়ে বিঁধছে মেরুদণ্ডের হাড়ের খাঁজে খাঁজে। মনে হচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তার শরীরটাকে দু-ভাগ করে দিতে চাইছে।
এনির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে যন্ত্রণায়। ডিভানের হাতলটা সে এমনভাবে চেপে ধরেছে যে নখগুলো তপ্ত হয়ে উঠেছে। সেই হাসিখুশি মেয়েটার মুখটা এখন যন্ত্রণার এক নীল মানচিত্র। এক লহমায় পৃথিবীটা যেন ছোট হয়ে শুধু তার শরীরের এই অসহ্য কেন্দ্রবিন্দুতে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। সে বুঝতে পারছে, এক নতুন প্রাণের আগমনের এই পথটা কতটা বন্ধুর আর রক্তমাংসে গড়া এক ভয়ংকর যুদ্ধের নাম। এতক্ষণ অনেক সহ্য করলেও কিন্তু আর সহ্য হয় নি। পেটে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠে,
” আল্লাহ!
পর পর অনেক বার উচ্চারন করে এই শব্দ। মোটেও এইটা সামান্য চিৎকার ছিলো না। গ্যাংস্টার বসের জন্য ছিলো এইটা মরন যন্ত্রনা। পরক্ষণেই রান্নাঘর থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত দূরত্বটা সে পার করল ঝড়ের গতিতে। কিন্তু ডিভানের সামনে এসে তার পা দুটো শিকড় গেড়ে দিল মেঝেতে।
এনি সেখানে যন্ত্রণায় নীল হয়ে কুঁকড়ে আছে। তার সেই টানা টানা চোখের মণি দুটো কষ্টের আতিশয্যে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। ঘামে ভিজে জবজবে হওয়া চুলগুলো মুখের ওপর লেপ্টে এক বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে।
নাজলী দরজা থেকে ফিরে আসে বোনের চিৎকারের শব্দ পেয়ে। নিক এনির পুরো শরীরটা বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। হাতে তরল পদার্থ অনুভব করতেই আরিশের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠে,
” বুলেট প্রুফ গাড়ি বের কর। হসপিটালে যেতে হবে।
আরিশ উন্মাদের মত ছুটে যায়। এনি চাচ্ছিলো নিজেকে সামলাতে। কিন্তু ব্যাথার যন্ত্রনা এত তীব্র ছিলো যে মুখ দিয়ে আচমকা চিৎকার বের হয়ে আসছে। নাজলী বোনের এই অবস্থা দেখে কেঁদে দেয়। নিক পাজা কোলে তুলে ছুঁটে যায় গাড়ির কাছে।
এনি নিকের বুকের অংশ খামচে ধরল এক অমানুষিক শক্তিতে। এনির নখগুলো তার চামড়া চিরে হাড়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।
এনির প্রতিটা নিশ্বাসের সাথে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে যা নিকের কানে কোনো ধারালো অস্ত্রের মতো বিঁধছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। কপালে ফুটে উঠল উদ্বেগের শিরা। যে মানুষটা পুরো শহর শাসন করে, সে আজ এনির এই এক ফোঁটা চোখের জলের সামনে কতটা অসহায়! এনির ঠোঁট দুটো যন্ত্রণায় সাদা হয়ে গেছে। নিক গাড়িতে বসে যন্ত্রনা কাতর এনির শরীরটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়,
” আমার প্রেম, আমার পৃথিবী, আমার জীবন কিছু হবে না তর জান। তর সমস্ত যন্ত্রনা আমার হোক। সবটা আল্লাহ আমাকে দিয়ে দিক।
এনি নিকের গালে হাত দিয়ে কেঁদে উঠে,
” আমার কিছু হয়ে গেলে বাচ্চাদের আগলে রাখবে তো? আমি প্রথমবারের মত কিছু আবদার করছি নিক। তুমি ওদের ফেলে দিও না, মুখ ফিরিয়ে না, এতটা পাষাণ হয়ে যেও না। প্লিজ বুকে টেনেও নিও। তুমি ছাড়া ওদের আর কে আছে বলো! ওরা আমাদের ভালোবাসার অংশ। ওদের মধ্যে তুমি আমাকে খুঁজে পাবে।
এমন সময়ে এনির এমন কথায় দিশেহারা হয়ে উঠে গ্যাংস্টার বস। এনির দুই ঠোঁট চেপে ধরে গর্জে উঠে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৬
” বান্দির বাচ্চা, এইভাবে কথায় আঘাত না দিয়ে ছুঁরি আঘাত দিয়ে মেরে ফেললেও তো পারতি। জীবনে আসার পর থেকে কথা দিয়ে জ্বালিয়ে মারছিস। তুই বাঁচবি, আমার জন্য বাঁচবি। আমাকে ভালোবাসার জন্য বাঁচবি। আমাদের সন্তানদের জন্য বাঁচবি। সুস্থ ভাবে ফিরে আয়। বিশ্বাস কর জান আমিও ভালোবাসতে জানি। আমাদের যে সংসার করা বাকি, কলিজা আমার!
