Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন শেষ পর্ব

লাভ বাই দ্যা ভিলেন শেষ পর্ব

লাভ বাই দ্যা ভিলেন শেষ পর্ব
লিজা মনি

” আমাকে ডেকেছো এনি?
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তানভীকে দেখে এনি ইশারা করে রুমের ভেতরে আসার জন্য। তানভী এসে বিছানায় এনির পাশে বসে। তানভীকে দেখা মাত্রই এরিক হাত -পা ছুঁড়ে হেসে উঠে,
” আইই..মাম…আয়ায়া”
তানভী মাথা ঝুঁকে এরিকের নাভির এখানে নাক ডুবায়। ভেঙচি কেটে বলে,
” বাব্বাহহহ!
নাভির সুঁড়সুঁড়ি পেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে ছোট্ট দেহখানা। নীলাভ চোখ দুইটা চিকচিক করছে। নীর দুই হাতে কোল বালিশ ঝাঁপ্টে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
এনিকে ছটফট করতে দেখে তানভী ভ্রুঁ কুচকে বলে,

” তোমাকে অস্বাভাবিক লাগছে।
এনির চোখে পানি চিকচিক করছে। নিজেকে সামলে বলে,
” আমি নাভিদ ভাইকে দেখতে চাই তানভী।
তানভী অবাক হয়ে বলে,
” নিক জেভরানের আচরণ ভুলে গিয়েছো? নাভিদের নামটা যেখানে সহ্য করতে পারে না সেখানে তোমাকে উনি যেতে দিবে ভেবে থাকলে ভুলে যাও। আগুন নিয়ে কেনো আবার খেলতে চাইছো?
এনির ঠোঁট কাঁপছে। স্বাভাবিক গলায় বলে,
” আগুন নিয়ে তো আমি প্রথম থেকেই খেলছি তানভী। এইবার ও আমি জিতে যাব।একবারের জন্য হলেও নাভিদ ভাইকে দেখতে যাব। উনি মানসিক হাসপাতালে ছিলেন এতদিন। আর কাল ব্রেইন স্ট্রোক করেছে। মরণের দরজায় আছে আজ। আমি কিভাবে মুখ ফিরিয়ে নেই ? অমানুষ নই আমি। তুমি শুধু বাচ্চাদের দেখো রেখো আর কিছু চাই না।
তানভী ভয়ার্ত গলায় বলে,

” নিক জেভরান যেতে দিবে তোমাকে?
এনি বাঁকা হেসে বলে,
” অনেক অস্বাভাবিক কাজ এইতো সাধন করেছি।
এইটা চেষ্টা করলে ক্ষতি কি?
কক্ষে উপস্থিত তানভীর অবয়বে সুস্পষ্ট অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। কেবল নিরুপায় ভঙ্গিতে হস্তযুগল কচলাচ্ছিলো। তানভীর এমন চরম ভীতিবিহ্বল রূপ দেখে এনি বিস্ময়ে ললাট কুঞ্চিত করে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে মৃদু হেসে কিছু বলার উদ্যোগ নেয়, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বহির থেকে কারও ভারি পদশব্দে কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায়। তানভী দ্রুততার সঙ্গে দরজার দিকে দৃষ্টিপাত করে। পরক্ষণেই এনির দিকে তাকিয়ে আশঙ্কাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে ,
​” তোমার জামাই আসছে? হায় ঈশ্বর, যমরাজের মুখেই পড়তে হলো সকাল বেলা!
​তানভীর অস্থিরতা দেখে এনি ভ্রূ যুগল কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করে,

​”এখনও ওনাকে এত ভয় পাও কেন?”
​তানভী ভয়ে কম্পিত হয়ে প্রত্যুত্তরে জানায়,
​”উনাকে দেখা মাত্রই আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। ওই দিন কী নৃশংসভাবে কলিজা…”
​বাক্যটি সম্পূর্ণ সমাপ্ত করতে পারল না। স্মৃতির অতল থেকে উঠে আসা এক তীব্র অস্বস্তিতে শরীর গুলিয়ে উঠে। সেদিনের সেই নারকীয় দৃশ্যাবলি মস্তিষ্কে এত গভীরভাবে রেখাপাত করেছে যে, তা কস্মিনকালেও বিস্মৃত হওয়া অসম্ভব।
​ইতিমধ্যে ‘নিক’ দরজার কাছে এসে পড়ে। তানভী চট করে তাকায় সেদিকে। এক সেকেন্ড ও দেরী না করে ভোঁ দৌঁড়! তানভীকে এমন দৌঁড়াতে দেখে এনি হেসে ফেলে খানিকটা। নিক কোনোদিকে পাত্তা না দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। এনিকে এমন ঘাপটি মেরে বসে থাকতে দেখে কপাল কুচকায়,

” স্বামী মারা গিয়েছে? বিধবা হয়ে গিয়েছো? কাঁদছো কেনো?
এনি দ্রুত চোখের পানি মুছে নিলো। লোকটা কিভাবে বুঝলো সে কাঁদছে। নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” কিভাবে বুঝলেন?
” যেখানে আত্নার কম্পন শুনতে পাই সেখানে চোখের পানি এই আর এমন কি? ইউ ডিডন্‌ট আন্সার দ্য কোয়েশ্চন। হোয়াই ওয়ার ইউ ক্রাইং?
এনি চুলগুলো হাতখোপা করে নিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কালো টি-শার্টটা টানতে -টানতে বলে,
” শুনোন না…
নিকের কপালের ভাঁজা আরও গভীর হয়। এনির বেঁধে রাখা চুলগুলো খুলে দিয়ে সেখানে মুখ ডুবায়। কানে -গলায় চুমু খেয়ে বলে,

” হুম.. বলো জান !
” একটা আবদার পূরণ করবেন?
” চেয়েই দেখ না।
এনি ঠোঁট কামড়ালো নিজের। নিকের পিঠ খামছে ধরে বলে,
” নাভিদ ভাইকে দেখতে চাই, নিয়ে যাবেন?
নিক থেমে যায়। গলা থেকে মুখ তুলে এনির দিকে রক্তলাল চোখে তাকায়। চোয়াল পিষে এনির চিবুকটা হালকা চেপে ধরে,
” হাউ ডেয়ার ইউ মেক সাচ আ ফা*কিং ডিমান্ড? মেরে একদম রাস্তায় ফেলে আসব! ইউ ওয়ার্ন্ট ইভেন স্কেয়ার্ড টু মেক সাচ আ ফাকিং রিকোয়েস্ট?
এনির চোখে পানি চলে আসে। নিককে শক্ত করে চেপে ধরেই বলে,

” আই ওয়ান্ট টু গো ফর আ লিটল হোয়াইল। প্লিজ!
” ফা*ক ইউ ব্লাডরোজ! একদম রাগাবে না।
এনি কান্নাটা আর আটকে রাখতে পারছে না। এখন কান্নাটা তার জন্য মঙ্গলজনক নয়। যা চেয়েছে সব ভেস্তে যাবে সামান্য চোখের জলে। খুব ভালো করে জানে সামনে থাকা পুরুষটা নরমাল ব্যবহার করলেও তার ভেতরের সত্তাটা কতটা ভয়ানক। পর – পুরুষের জন্য কাঁদা তার জন্য বারণ। কিন্তু মন আর মস্তিষ্ক কি আর সেই বারণ শুনে? ঠোঁট কামড়ে ধরে ভাঙ্গা গলায় বলে,
” এতটা নিষ্ঠুর কেনো হচ্ছেন?
” আমি প্রথম থেকেই এমন। কেনো? তুমি জানতে না? আমার শান্ত-অশান্ত সব রুপেই তুমি পরিচিত।
নিকের সোজা জবাব। এনির ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। নিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,
” কিন্তু পরিস্থিতি আজ ভিন্ন। সবাই আমার থেকে লুকিয়েছেন নাভিদ ভাইয়ের অসুস্থ হওয়ার কথা। বলেছেন তিনি ইরান চলে গিয়েছে। তবে কেনো উনি মৃত্যুশয্যায়? আপনি কি বুঝতে পারছেন না উনার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী। শেষ বার উনি আমাকে দেখতে চেয়েছে। একটু দয়া করুন উনার উপর। প্লিজ!
নিক দাঁত পিষে তাকায় এনির দিকে। ক্রোধে ফেটে পড়ছে চোখ দুইটা। এনি শুকনো ঢোক গিলে ঠোঁট ভেজায়। আহত গলায় বলে,

” আপনি বলেছিলেন তো আমাদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিবেন?
” স্বাধীনতা দিব বলেছি,আমি ব্যাতিত অন্য পুরুষকে ব্যাকুল হয়ে দেখার স্বাধীনতা দিব কখন বলেছিলাম?
নিকের ভয়ানক কন্ঠস্বর । এই আওয়াজে ঠিক কতটা রাগ মিশে আছে সেটা কেবল এনিই অনুমান করতে পারছে। তবুও শেষ ভরসায় সাহস নিয়ে বলে,
” আপনি ব্যাতীত অন্য কোনো পুরুষকে নিয়ে যে ভাববো না সেটা নিজেও খুব ভালো করে জানেন। আমি কোনো প্রেমিকা হয়ে ওখানে যাব না। আমি যাব শুধু একজন মৃত্যুশ্যয্যা মানুষের শেষ আবদার পূরণ করতে। ফাঁসির আসামীর ও তো শেষ আবদার পূরণ করে নিক। উনি অতীতে খারাপ ছিলেন কিন্তু বর্তমানে উনি সুধরে গিয়েছিলেন। বাবা -মা হারিয়ে যখন একদম নি:স্ব -অস্তিত্বহীন ছিলাম তখন ওই মানুষটা সব বিপদ থেকে আগলে রেখেছে। আজ তার এই করুণ সময়ে এতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হব? আমি তো আপনার মত পাষাণ নই। আমার শেষ আবদার বলতে পারেন এইটা আপনার থেকে। আমি যেতে চাই নাভিদ ভাইয়ের কাছে।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে ঈগল দৃষ্টিতে তাকায়। নিকের এমন দৃষ্টি দেখে এনি নিশ্বাস টানে,
” নাভিদ ভাইয়ের সাথে যে শুধু আমার সম্পর্ক আছে এমন কিন্তু নই। আপনার সাথে তো উনার একটা সম্পর্ক আছে। ভুলে গেলেন কিভাবে?
নিক চোয়াল শক্ত করে বলে,

” কোনো সম্পর্ক নেই!
” নাভিদের সাথে নেই কিন্তু ভিকির সাথেও কি কোনো সম্পর্ক নেই? যদি সম্পর্ক না এই থাকে তবে নাভিদকে কেনো জানে মেরে ফেলেন নি? আমার দিকে একবার কেউ তাকালে কুত্তার মত মেরেছেন ওদের। তবে নাভিদ ভাই কেনো রেহাই পেলো বলতে পারেন? ভুলে গেলে মনে করিয়ে দিচ্ছি আপনাকে। এই ভিকির বাবা আপনাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ ত্যাগ করেছিলো। মরার আগে নিজের দুই পশুর মত সন্তানদের আপনার কাছে আমানত রেখে গিয়েছিলো। আফসোস একজনকেও বাঁচাতে পারলেন না। দুইজনের এই হত্যাকারী আমি।
নিক বাঁকা হেসে দৃষ্টি ঘুরায় চারদিকে। পর-পর এনির দিকে নিক্ষেপ করে বলে,
” আসামী তুমি ছিলে বলেই এই হত্যার কোনো বিচার হয় নি।
এনি একই ভঙ্গিতে বলে,
” দ্বিতীয় ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ ও আমি। আসামী যেহেতু আমি তাই মরণটাও নাহয় আমার সামনেই হোক।
এনির মারপ্যাঁচ কথায় নিক ভ্রুঁ কুচকায়।তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর,
” সিদ্ধান্ত তুমি নিয়েছো আর অনুমতি আমার কাছে চাইছো?
এনি চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রেখে বলে,
” সিদ্ধান্ত একজন নারী নিয়েছে আর অনুমতি একজন স্ত্রী চাইছে।

নাভিদের শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত ক্ষীণগতিতে চলছে। তাঁর মুখে আছে অক্সিজেন মাস্ক। হাতে ক্যানুলা লাগানো। দীপ্তিহীন নেত্রযুগলে পরিলক্ষিত হয় এক সুগভীর আচ্ছন্নতা। মুখের উজ্জলতা কমেছে বহু আগে। যেই ত্বক আগে সৌন্দর্যে উপচে পড়ত আজ তা মাসাধিক কালের ব্যাধিযন্ত্রনায় বিবর্ণ ও পাণ্ডুর রূপ ধারণ করেছে।
​এতৎসত্ত্বেও, তাঁর নীরব দৃষ্টি পরম ব্যাকুলতায় কক্ষের প্রবেশদ্বারের পানে নিবদ্ধ। কারোর আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কেউ একজন আসবে, যিনি এসে তাঁকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করবেন। উচ্চকণ্ঠে নিবেদন করবেন তাঁর হৃদয়ের পুঞ্জীভূত অনুরাগের আকুল স্বীকৃতি। তবেই নাভিদের এই ব্যাকুল আত্মার প্রশান্তি মিলবে, তিনি নিশ্চিন্তে চিরনিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে পরলোকের অভিমুখে যাত্রা করতে পারবেন। এই অন্তিম মুহূর্তের প্রতিক্ষায় নাভিদের অন্তরাত্মায় তীব্র অস্থিরতা ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে। ছটফট করছে দেহখানা।
নাভিদের অক্ষিপল্লবের ঈষৎ কম্পনের সঙ্গেই উন্মোচিত হলো সেই কাঙ্ক্ষিত অবয়ব। প্রারম্ভে নিজের বিভ্রান্তি মনে করে তাঁর ঠোঁটে ক্ষণিকের জম্য তাচ্ছিল্যের সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠলেও, তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নেননি। নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়েও যে রমণীর হৃদয়ে বিন্দুমাত্র অনুরাগের সঞ্চার ঘটাতে পারেননি, সেই সর্বনাশী সত্তার পানেই তিনি নির্নিমেষ চোখে চেয়ে রইলেন। একপক্ষীয় ভালোবাসার পরিনিতি এত ভয়ানক কেনো!
​এনি থমকে দাঁড়িয়ে থাকে কেবিনের দরজার কাছে। ভেতরে ডুকার সাহস হচ্ছে না। এনিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নাজলী আস্তে করে বলে,

” দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?
এনি শক্ত করে চেপে ধরে করিডরের দরজা। কাঁপা গলায় বলে,
” সাহস হচ্ছে না ভেতরে যাওয়ার।
“সময় থাকতে ভাবা উচিত ছিলো।
এনি আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে বলে,
” আপা তুমিও দোষ দিচ্ছো আমাকে? সব কিছুই তো জানো। আমার কি করার ছিলো?
নাজলী নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
” তর দোষ কোথায় দিচ্ছি? দোষ দিচ্ছি তর স্বামীর। দুইটা জীবন ধ্বংস হয়েছে তার জন্য। প্রথম মেহের, সেকেন্ড নাভিদ! অথচ তার কোনো ভাবান্তর নেই। একটা দিন মেহেরের কবরের পাশে গিয়েছে? এক মুহূর্তের জন্য নাভিদকে দেখতে এসেছে? হৃদয় এতটা পাথর কিভাবে হয়? ট্রাস্ট মি এনি দুনিয়ার সবাই ওই জানোয়ারটাকে ক্ষমা করে দিলেও অতীতের প্রতিটা ভয়ানক দিনের কথা আমি মনে রাখব। তর মত মহান নই আমি। জানো**
” আপা প্লিজ না!
” খারাপ কথা শুনলে স্বামীর জন্য বুক পুড়ে?
এনি আহত গলায় বলে,

” তুমি উনাকে প্রথম থেকে ঘৃণা করো জানি। কিন্তু তোমরা উনার দুর্বলতা দেখো নি যেটা সে আমাকে দেখিয়েছে। তোমরা উনার অতীতের সেই যন্ত্রনা অনুভব করো নি যেটা আমি করেছি। সাইকোপ্যথ আচরণ কেউ জন্ম থেকে পায় না। তীব্র মানসিক যন্ত্রনা তাকে সাইকোতে পরিনত হতে বাধ্য করে। যে জীবনে কখনো সামান্য সরি উচ্চারণ করে নি সে সহস্রবার তার অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। সে আমার স্বামী আপা। তার সন্তান আমি গর্ভে নিয়েছি। ক্ষমা, ত্যাগ, উন্মাদনা, ভালোবাসা পাওয়ার পরও তীব্র ঘৃণা কিভাবে করতে পারি? আল্লাহর কালাম পাঠ করে এই অমানুষটার সাথেই আজীবন বাঁচার শপথ করেছি।

নাজলী দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এনিকে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। সে নিজেও জানে না নিকের প্রতি তার ঘৃণার পরিমানটা কেনো কমছে না। চোখাচোখি হলো ইথান আর নাজলীর। ইথান তাকালো নাজলীর ফুলা পেটের দিকে। বুকটা আবার ও তীব্র দহনে মুচড়ে উঠলো। ভাগ্যের কাছে তার প্রেমটাও হেরে গেলো। যে গর্ভে তার সন্তান থাকার কথা ছিলো সেই গর্ভে আজ অন্য কারোর সন্তান। নাজলী হয়ত জানবেই না ইথানের ভালোবাসার কথা। আর জানলেই বা কি? জেনে তো আর তার জীবনে ফিরে আসবে না। ইথান চোখের পানি সকলের আড়ালে মুছে নিলো।
এনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে রিদ্ধিমার দিকে তাকালো। যে নাভিদের মাথার কাছে বসে কাঁদছে। এনির নয়নযুগল বেয়ে অশ্রুধারা অনবরত প্লাবিত হচ্ছে। সমগ্র দেহ নিয়ন্ত্রহীনভাবে কাঁপছে । মস্তিষ্কে একটা কথায় ঘুরপাক খাচ্ছে,
‘আমাকে ক্ষমা করো নাভিদ ভাই। এই এক জীবনে তোমায় ভালোবাসতে পারলাম না; শুধু এই জন্মে নয়, কোনো জন্মেই তোমার সহধর্মিণী হওয়ার ভাগ্য আমার নেই। প্রতিটা জন্মে যে ওই পাপিষ্ঠ নিক জেভরানের স্ত্রী হতে চাই। কেন এত ব্যাকুলতায় আমাকে বাঁধতে চাইলে? তোমার এই নিঃশেষ ও ধ্বংসের মূল কারণ স্বয়ং আমি এই নির্মম সত্যের তীব্র দাহন আমি কীভাবে সহ্য করব?’

এনির বক্ষপিঞ্জরে তীব্র যন্ত্রণা প্রতিনিয়ত ক্ষরণ ঘটাচ্ছে। চোখের সামনে মুমূর্ষু নাভিদকে দেখে তাঁর মনে হচ্ছিল, হৃদপিণ্ডটা যেন কোনো এক অদৃশ্য করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। যে মানুষের প্রতি সে কখনো প্রেম অনুভব করতে পারেনি সেই মানুষেরই তিল তিল করে শেষ হয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ দায় আজ তাঁরই কাঁধে । এই অপরাধবোধ, অনুশোচনার দাহন তাঁর বুকের ভেতরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে ছারখার করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্যান্ত এক আত্মাকে কোনো জ্বলন্ত অঙ্গারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। নাভিদের এই নিঃশব্দ ধ্বংসের মূলাধার যে সে নিজে। এই সত্যের আকস্মিক আঘাত এনির সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে । অদেয় ভালোবাসার বিপরীতে এই বিষাক্ত ঋণের বোঝা বহন করার মতো শক্তি নেই তাঁর।
এনি বিধ্বস্ত শরীরটাকে কোনোরকম টেনে নিয়ে আসে নাভিদের কাছে। অনুভুতিহীনভাবে ধপ করে বসে পড়ে নাভিদের পাশে। কঙ্কালসার পুরো শরীরের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলে,
” কি করলে নিজের?
নাভিদ নিভু -নিভু চোখ জোড়া স্বাভাবিক করতে চাইছে। ঠোঁট নাড়াচ্ছে বার -বার কিছু একটা বলার জন্য। আরিশ এসে অক্সিজেন মাক্সটা খুলে দেয়। লম্বা করে শ্বাস টানে নাভিদ। ধীর আওয়াজে উচ্চারন করে,
” আ..আমি জানতাম তুমি আসবে পাখি।
এনি অবাকতা নিয়ে তাকায় নাভিদের দিকে। নাভিদের আঙ্গুলের মধ্যা থাকা ব্যান্ডেজ গুলোর দিকে তাকিয়ে ইথানকে প্রশ্ন করে,

” কিভাবে হলো এইসব?
” নিজেকে নিজে আঘাত করেছে। মানসিক ভারসাম্য যখন একদম হারিয়ে ফেলেছিলো তখন হসপিটালে ভর্তি করানো হয়। অনেক মাস যাবৎ চিকিৎসা দেওয়ার পর ভেবেছিলাম ঠিক হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলেছিলাম। গড়িতে বসেই তোমার আর নিকের বিয়ের ছবি-ভিডিও দেখছিলো। হুট করে পুরো শরীর ঘেমে লুটিয়ে পড়ে। পুনরায় হসপিটালে আনার পর ডাক্তার জানান ব্রেইন স্ট্রোক করেছে।
এনি থমকে যায় প্রতিটা শব্দে, প্রতিটা বাক্যে। নাক টেনে চোখের পানি মুছে নাভিদের উদ্দেশ্যে বলে,
” আজ তোমার এই অবস্থার জন্য শুধু নিজে কষ্ট পাচ্ছো না। তার সাথে কষ্ট দিচ্ছো তোমার পাশে বসে থাকা ফুলের মত মেয়েটাকে। রিদ্ধিমা তো তোমাকে ভালোবাসে নাভিদ ভাই। তবে তার ভালোবাসা গ্রহণ না করে এক মরিচীকার পিঁছনে কেনো ছুঁটলে?
নাভিদ শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় রিদ্ধিমার দিকে। রিদ্ধিমা আকুতিমাখা গলায় বলে,

” একটু ভালোবাসবেন? শুধু একটু হলেই চলবে। আচ্ছা! ভালোবাসার ও প্রয়োজন নেই। শুধু আপনার সেবা করার সুযোগ দেন। মরার পর যাতে সবাই বলতে পারে ” তার স্ত্রী মারা গিয়েছে “! দিবেন একটু অধিকার?
শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে রিদ্ধিমার। বুক ফেঁটে চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছে। নাভিদের নিরবতা তাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। স্বরযন্ত্রের চরম ব্যাকুলতায় আবার ও রুদ্ধকণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“অন্তত অভিনয় হলেও, কোনো মিথ্যার আশ্রয়ে হলেও একবার শুধু বলুন ‘ভালোবাসি’, নাভিদ! এই জীবনে আর কোনো পুরুষের আগমন ঘটবে না। অন্তিম লগ্নে কি এই একটিমাত্র বাক্য শোনার অধিকারও আমার নেই? এই সামান্য শব্দটাকে সঙ্গী করে হাসিমুখে আজীবন এই পথ কাটিয়ে দিব।
​নাভিদের মুখাবয়ব একদম শান্ত। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো দুই- ফুঁটা অশ্রু। পরক্ষণেই তাঁর নিস্তেজ শরীর সামান্য কেঁপে উঠে। রিদ্ধিমার অশ্রুবসিক্ত চোখে তাকিয়ে বহু কষ্টে উচ্চারণ করে,

‘ দ… দুঃখিত!
পরবর্তীতে আবার ও শ্বাস টেনে উচ্চারণ করে,
” এক হৃদয়ে দুই নারীর ঠাঁই হয় না।
রিদ্ধিমা বিচ্ছিন্ন চোখে তাকিয়ে থাকে। ভালোবাসায় হেরে যাওয়ার তীব্র দহন বুঝি একেই বলে। নাভিদ এনির গভীর নীলাভ চোখে তাকিয়ে রইলো আগের ন্যায়। এনির ওপর নিবদ্ধ সেই নিভে আসা, হিমশীতল দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে পরম প্রশান্তির এক হালকা স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে নাভিদ মৃদু স্বরে উচ্চারণ করে , “আই লাভ ইউ, পাখি!”
​এনি বাক্‌রুদ্ধ, সম্পূর্ণ স্তব্ধ। ঠিক একই সময় আগমন ঘটে আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্টের। নাভিদ ঝাপসা চোখে দেখে নিককে। নাভিদের অক্ষিপল্লব চিরতরে মুদ্রিত হতে দেখে রিদ্ধিমা উন্মত্তের ন্যায় আর্তনাদ করে উঠল, “না, যাবেন না.. যা… যাবেন না আমাকে রেখে। এত বড় শাস্তি দিবেন না। দয়া করে যাবেন না! বিশ্বাস করুন, সমস্ত সত্তা দিয়ে আপনাকে আগলে রাখব! এত কঠোর শাস্তি আমাকে দেবেন না… প্লিজ।

বাক্য সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই নাভিদের নেত্রযুগল চিরতরে বন্ধ হয়ে আসে। সবার ছটফট হৃদয় আরও ছটফট করে উঠে। মুহূর্তেই একজন পুরুষের জীবনের শেষ স্পন্দনটুকুও বিলীন হয়ে যায়।
রিদ্ধিমা খাঁমছে ধরে নাভিদের পেটের কাপড়খানা। হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠে রমণী। এক বিন্দু ভালোবাসা না পেয়েও কি করুণ সেই কান্নার স্বর। করিডরের প্রতিটা দেয়াল অব্দি কেঁপে উঠছে। উন্মাদের মত ছিঁড়ে ফেলতে থাকে নাভিদের হাতের ক্যানুলা সব কিছু। নাজলী ভয়ে রিদ্ধিমার কাছে যেতে পারছে না। আরিশের হাত শক্ত করে চেপে ধরে শক্তভাবে,
” ওকে সামলান!
কথাটা বলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। চেয়ারে বসে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো। আরিশ রিদ্ধিমার মাথায় হাত রাখে। রিদ্ধিমা আরিশের বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠে,

” আমাকে কেনো একটু ভালোবাসলো না ভাইয়া? একটু ভালোবেসেই দেখতো। একটু অধিকার দিলে কি এমন ক্ষতি হত! ভিক্ষুকের মত পড়ে ছিলাম পায়ের কাছে। এক পাক্ষিক ভালোবাসা যে কতটা যন্ত্রনাদায়ক সেটাতো উনি জানত। এরপরও আমার উপর একটু দয়া করলো না। এতটা নিষ্ঠুর আচরণ কেনো করলো? ভালোবাসা দিবে না বলে একদম দুনিয়া ছেড়ে দিলো? আমি বাঁচতে চাই না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। হৃদয়ে যে প্রথম ভালোবাসা নামক উত্তাল সৃষ্টি করেছিলো তার নিথর দেহ আমি কিভাবে সহ্য করব? আমি পারছি না সহ্য করতে। আল্লাহ কে বলো না আমার রুহটা যেন বের করে ফেলে। একসাথে বাঁচতে না পারি, একসাথে মরতে তো পারব!
রিদ্ধিমার পাগামি আর চিৎকার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। নিক তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় বোনের দিকে।
​এনি চাঁদর শক্ত মুঠোয় খামচে ধরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দৃষ্টিতে নিকের পানে চেয়ে থাকে৷ চোখ দুইটা অসম্ভব লাল হয়ে আছে। উঠে দাড়াতে গেলে তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নেয়। নিক ধরতে গেলে এনি বাঁধা দিয়ে দাঁড়ায় ঠিকভাবে৷
এদিক-সেদিক তাকিয়ে রুদ্ধস্বরে বলে,

“সত্যিই কি সব শেষ হয়ে গেল? নিক, আমি কি পাপের অপরাধী ছিলাম যে আমাকে এমন অভিশাপের ভার বইতে হলো? এক নারীর পক্ষে কীভাবে একই সাথে দুইজন পুরুষকে ভালোবাসা সম্ভব ? উনি কেনো একবার বুঝলেন না আমাকে ? কেনো এইভাবে নিজেকে শেষ করে দিলেন? আমি… আমি কি করব? কি করে এই……
এনি হাঁপাতে থাকে শুধু। কথা বলতে পারছে না। দুনিয়া ভেঙে আসছে। নিক শক্ত হাতে চেপে ধরে এনির বাহু। এনি আর সহ্য করতে পারলো না কিছু। স্বামীর বুকে মাথা রেখে নিরবে কেঁদে উঠলো। আশ্চর্যের বিষয়, গ্যাংস্টার বস একটুর জন্য ও রেগে যায় নি। নিক নিষ্পলক আর গাঢ় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল নাভিদের সেই অসাড় হয়ে যাওয়া স্পন্দনহীন দেহের ওপর। দৃশ্যটা যেন তাঁর সমগ্র স্নায়ুমণ্ডলীকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। এসির মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও ঘেমে উঠেছে। কপালে জমে উঠে বিন্দু বিন্দু ঘামের রেখাকে আঙ্গুলের সাহায্য মুছে নেয়। ​নিজেকে সংবরণ করার চরম প্রচেষ্টায় ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। সামনে রাখা আছে নাভিদের সেই লুকায়িত বক্সটা। যেটা আজ পর্যন্ত কেউ স্পর্শ করতে পারে নি। অসংখ্য চিঠি আছে এখানে। নিক আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” জানাজার ব্যবস্থা কর।
” জানাজা?

সময় ডানায় ভর করে উবে গেল। চোখের পলকেই পার হয়ে গিয়েছে তিনটি প্রগাঢ় বছর। এই পথচলায় দুটি নতুন রূপকথা ডালপালা মেলেছে—একদিকে নাজলী আর আরিশের ভালোবাসার সংসারে আলো ছড়িয়ে আগমন ঘটেছে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের। যার মায়াবী নাম রাখা হয়েছে ‘এশা ইলহাম’; অন্যদিকে তেমনি এনির জীবনে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত মিষ্টি উপদ্রব। তানভীর প্রেগন্যান্সির পাঁচ মাস চলছে। সবার জীবনেই সুন্দরভাবে পার হচ্ছে।
​গত তিন বছরে নিক তাকে ঘুরিয়ে এনেছে একে একে আশিটি দেশ! কিন্তু টানা ভ্রমণ আর নতুন জীবনের এই তীব্র ছন্দে এনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিটা দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও শরীর আর এত জার্নির ধকল সইতে পারছে না। অবশেষে নিককে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ভ্রমণের রুটিনে কিছুটা বিরতি মেলানো গেছে।
​এখন অলস বিকেলে ভাবতেই এনির নিজের ওপরই হাসি পায়—একবার তীব্র জ্বরের ঘোরে অসংলগ্ন অবস্থায় কেন যে নিকের হাত ধরে বলে ফেলেছিল, “আমি আপনার সাথে পুরো পৃথিবী ঘুরতে চাই!” সেই একটা কথার মাশুল তাকে এইভাবে গুণতে হবে ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি!
নীরের কান্নার আওয়াজ শুনেই এনির ধ্যান ভাঙ্গে। ঘাড় ঘুরয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখে মেঝেতে বসে কাঁদছে। ফর্সা মুখটা কেমন লাল হয়ে উঠেছে। এরিক গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনেই। এনি খাবারের প্লেটটা রেখে দ্রুত গিয়ে মেয়ের সামনে যায় । অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

” কি হয়েছে মাম্মাম? কাঁদছো কেনো এইভাবে?
মায়ের আদর পেতেই নীরের কান্না শেষ। এরিকের দিকে তাকিয়ে অভিমানী সুরে বলে,
” ভাইয়া মাচ্ছেহ!
এনি অবাক হয়ে তাকায় এরিকের দিকে। বোনের গায়ে সামান্য মাছিও বসতে দেয় না যেই ছেলে সে আজ নিজে মেরেছে! এরিকের উদ্দেশ্যে বলে,
” কেনো মেরেছো বোনকে?
এরিক তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় নীরের দিকে। বোনের চোখের পানি দেখে খারাপ লাগছে প্রচুর। গম্ভীর গলায় বলে,
” মারিনি। সামান্য ধমক দিয়েছি মাত্র।
পর -পর নীরের দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বলে,
” সব সময় আদর করি বলে ভেবো না অন্যায়টা মেনে নিব। নেক্সট টাইম যাতে এইসব শব্দ উচ্চারণ করতে না দেখি। বলো আর কখনো এইসব শব্দ উচ্চারণ করব না। বলো নীর…
নীর ভয়ে তাকায় ভাইয়ের গম্ভীর মুখটার দিকে। কখনো সে এরিকের থেকে ধমক খায় নি। তাই অল্প ধমক দেওয়াতে ফুঁপাচ্ছে। ভয়ে-ভয়ে বলে,

” বুলব না!
এরিক নিশ্বাস ফেলে বোনের চোখের পানি মুছে দেয়। বুকের সাথে মিশিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
” খবিশ একটা গালি নীর। মাম্মাম শুনলে প্রচুর পানিসমেন্ট পেতে। নেক্সট টাইম বললে মাম্মাকে বলে দিব। স্টপ ক্রাইং রাইট নাউ, অর আই’ল টেল মমি।
ছেলে- মেয়ের কাহিনী দেখে এনি কপাল ভাঁজ করলো। এরিকের দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” কি শব্দ উচ্চারণ করেছে ও? কি দোষ ঢেকেছো শুনি?
নীর ভাইয়ের দিকে তাকালো। এরিক স্বাভাবিক গলায় বলে,
” আমাদের ব্যাপার মাম্মাম! আমরা মিটিয়ে নিয়েছি সব।

এনি হাসলো কিছুটা। হুট করে আবার ও নিভ্রিতার কথা মনে পড়ে গেলো। কাল রাতে মেয়েটাকে দেখতে গিয়েছিলো৷ টানা চার ঘন্টা মেয়ের কবরের উপর মাথা রেখে শুয়ে ছিলো। মনে হচ্ছিলো মেয়েটা তার বুকেই শুয়ে আছে। নিক, এনিকে নিয়ে আসে নি। সেও বসেছিলো বাবা-মেয়ের কবরের পাশে। নাভিদকে ও তাদের পাশেই কবর দেওয়া হয়েছে। সেদিন এনি জোর করে নিককে মেহেরের কবরের কাছে নিয়ে গিয়েছে। কবর জেয়ারত করে নিভ্রিতার নামে খুলা বিশাল ইয়াতিম খানায় অভিযান চালায়। রিদ্ধিমা সামলাচ্ছে পুরো ইয়াতিমখানা। কারোর ক্ষমতা হয় নি তাকে বিয়ে দেওয়ার। আজীবন এই ইয়াতিম খানায় বাচ্চাদের সাথেই সে জীবন পার করতে চায় বলে জানিয়েছে সবাইকে। নিক প্রথমে রাগ দেখালেও পরে মেনে নিয়েছে কিছুটা। তারা বাড়ি ফিরেছে একদম শেষ রাতে।
রাতের কথা মনে করে এনি নিশ্বাস ছাড়ে। চোখের পানি মুছে খাবার স্পর্শ করে দেখে খিঁচুড়ি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। দ্রুত আপেল কেটে নীরের মুখের সামনে নিয়ে বলে,

” অনেক কেঁদেছো। এইবার খেয়ে নাও, ফার্স্ট!
নিভ্রিতা দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
” খাবু না।
এনি চোখ রাঙ্গায় মেয়ের দিকে,
” কি খাবু না? সকাল থেকে কিছু খেয়েছিস তুই ? খিঁচুড়িটাও ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। সব গুলো ফ্রুটস শেষ করবে।
নীর খাবারের দিকে এক পলক তাকায় আরেক পলক এনির দিকে। কাঙ্খিত একজনকে দেখে হুট করেই ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠে,

” পাপা!
এনি হতভম্ভ হয়ে দরজার দিকে তাকায়। নিক ফোনে কথা বলা বন্ধ করে দেয় মেয়ের কান্না দেখে। ফ্রেশ না হয়েই বিছানার কাছে এসে মেয়েকে কোলে তুলে নেয়। এরপর রুমাল দিয়ে মুখ মুছে, গালে চুমু খেয়ে বলে,
” হোয়াট হ্যাপেন্ড, প্রিন্সেস? হোয়াই আর ইউ ক্রাইং, মাই ডিয়ার?
নীর গলা জড়িয়ে ধরে নিকের। এইখানে আসলে একদম সব অভিযোগ উগ্রে দেয়। ফুঁপাতে, ফুঁপাতে বলে,
” মাম্মাম মাচ্ছেহ!
নিক ভ্রুঁ কুচকে তাকায় এনির দিকে। চোয়াল শক্ত করে ফেলে,
” মেরেছো কেনো স্টুপিড?
এনি হতভম্ভ হয়ে যায়। সামান্য রাগ দেখিয়ে বলে,
” কখন মেরেছি আমি? সকাল থেকে কিছু খায় নি। এক ঘন্টা ধরে খিঁচুড়ি নিয়ে ঘুরছিলাম। সেটা ঠান্ডা করে ফেলেছে। এখন ফ্রুটস দিয়েছি সামান্য সেটা দেখেও নাক ছিটকাচ্ছে। মারা এই উচিত ছিলো। নামো নীর!
এনি চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়। মায়ের বড়-বড় চোখের দিকে তাকিয়ে আবার ও বাবার গলায় মুখ গুঁজে দেয়। নিক মেয়েকে কোলে নিয়েই পায়ের সুজ খুলে বলে,

” ইচ্ছে হলে খাবে, জোর করো না।
এনি বিরক্তিতে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় এরিকের প্রশ্নে,
” তোমার গলা লাল হয়েছে কিভাবে মাম্মাম? কোনো পোকামাকড় কামড় দিয়েছে? আর্ন্ট ইউ ইন পেইন?
এনি আৎকে উঠে। ছেলের প্রশ্নে লজ্জায় ওরনা দিয়ে ঠিকভাবে ঢেকে নেয় গলাটা। নিকের দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,

” কিছু হয় নি বাবা। একটা রাক্ষস রাতে এসে কামড়ে দিয়েছিলো। আই মিন পোকা আরকি। মলম লাগিয়ে নিয়েছি এখন আর পেইন হচ্ছে না।
নিক ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে এরিকের কপালে চুমু খেলো সময় নিয়ে। এরিক পিটপিট করে তাকায় জন্মদাতার দিকে। নিক ততক্ষণে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে যায়। রাত গভীর হচ্ছে অনেক। চারদিকে শুনশান নিরবতা। সাউন্ডপ্রুফ রুমের বাহিরে চলছে গুলাগুলির তীব্র শব্দ। যেটা বাচ্চাদের কান অব্দি পৌঁছানো অসম্ভব!
বেলকনির যে কোণটিতে একসময় থরে থরে সাজানো থাকত মদ আর হুইস্কির বোতল, সেখানে এখন সামান্য সিগারেটের ধোঁয়া ও নেই। সামান্যতম নেশাজাতীয় দ্রবের চিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই। জীবনের বাঁকে নিজে জানোয়ার হলেও নিজের খেয়ালে চলেছে, কিন্তু নিজের সন্তানদের জন্য কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
​ফোনে কথাবলতে বলতেই নিক অনুভব করল, কেউ একজন এসে তার গা ঘেঁষে বসেছে। কথা না থামিয়েই সে অতি স্বভাবজাত টানে এক হাতে রমণীকে নিজের বুকের গভীরে চেপে ধরে। রমণীটি তার পুরুষালী শরীরের তীব্র, পরিচিত ঘ্রাণে মিশে থাকে তপ্ত বুকের সাথে। মনে হচ্ছে কতকালের এক আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার সুনিবিড় তৃপ্তি। নিক ফোন কেটে এনির উন্মোক্ত কোমর চেপে ধরে বলে,

” ঘুমিয়ে গিয়েছে?
” হু!
” তুমি ঘুমাও নি কেনো? এখানে কি করছো?
” আপনাকে ছাড়া ঘুম আসছিলো না।
নিক আরও প্রগাঢ় ক্ষুব্দতায় চেপে ধরলো ধনুকের মত কোমর খানা। বাঁকা হেসে বলে,
” চলো হয়ে যাক আরেক ম্যাচ!
এনি ছটফটিয়ে উঠে বলে,
” সরুন! অসুস্থ আমি।
বিরক্তিতে ভ্রুঁ কুচকালো গ্যাংস্টার বস।নিকের উত্তপ্ত নিশ্বাস এনির উপরে পড়ছে। এনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” চাঁদ আর তাঁরাগুলো কি সুন্দর তাই না এরিকের পাপা!
” সামনেই জলজ্যাঁন্ত চাঁদ বসে আছে। অন্য চাঁদ দেখার টাইম নেই।
” এত প্রশংসা করবেন না। পরে আপনাকে ভুলে যাব রুপের অহংকারে।
কথাটা বলেই এনি হেসে ফেলে। নিক এনির ঠোঁটে কামড় বসিয়ে বলে,

” ভুলে গেলে পুনরায় বিয়ে করব। এরপর নতুন রুপে বাসর শুরু করব। মূলকথা ছাড়াছাড়ি নেই।
এনি নাক-মুখ কুচকে ফেলে,
” ছিহহহ, অশ্লীল পুরুষ! বিয়ে করেছেন অলরেডি দুইবার। আর কত করতে চান?
” যতবার তুমি চাইবে।
এনি ভাবুক গলায় বলে,
” ভালোবাসি’ শুনতে চাই আপনার মুখ থেকে।
নিক এনির চুলগুলো ঠিক করে বলে,
” ইউ আর মাই অ্যাডিকশন, ব্লাড রোজ। মাই ফিয়ার্স, লাইফ-কনসিউমিং অ্যাডিকশন। ইউ আর মাই অবসেশন, মাই লাইফ, মাই এনটায়ার ওয়ার্ল্ড। এর থেকে বড় আর কি আছে?
এনি মৃদু হেসে বলে,
” আর কিছুই না। ইউ আর মাই লাভ, আ সিগনিফিক্যান্ট চ্যাপ্টার ইন মাই লাইফ। পুরো দুনিয়া ভুলে গেলোও আপনাদের কখনো ভুলতে পারব না।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,

” এত আসক্ত হয়ে গেলে? আই রিপিট তীব্র ঘৃণ থেকে এই ভালোবাসার জার্নিটা কেমন ছিলো বেবিগার্ল?
এনি ঝুঁকে পড়ে নিকের দিকে। চোখে-চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলে,
” মারাত্নক! যাকে খুন করার জন্য মরিয়া ছিলাম আজ তাকে বাঁচানোর জন্য উন্মাদ হয়ে আছি।
জার্নিটা কোনো রূপকথা ছিল না। ওটা ছিল একটা তপ্ত নরক পার হয়ে আসার মতো গল্প। যে লোকটা জোর করে আমার জীবনটা ছিনিয়ে নিয়েছিল, যার ওপর প্রতিদিনের জমে থাকা ঘৃণাগুলো আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত—আজ সেই লোকটার বুকেই আমার একমাত্র প্রশান্তি। আপনি বন্দুকের জোরে আমার দেহটাকে বন্দী করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কখন যে কোনো এক অলক্ষ্যে আস্ত হৃদয়টাই চুরি করে নিলেন, তা আমি নিজেও টের পাইনি। ঘৃণার চাদর সরিয়ে এই উন্মাদ ভালোবাসায় তলিয়ে যাওয়ার গল্পটা ভীষণ যন্ত্রণার ছিল, কিন্তু এর শেষটা… অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর, গ্যাংস্টার বস!”

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৭ (২)

নিক বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দিয়ে আওড়ায়,
” “ইয়েস, ভিলেন হ্যাজ ওয়ান দ্য লাভ হি ডিজায়ার্ড। ইভেন আ ভিলেন নোজ হাউ টু লাভ। আই, টু, হ্যাভ ফলেন ব্লাইন্ডলি ইনটু সামওয়ান’স স্পেল, মাই ডিয়ার।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here