Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৮

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৮

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৮
Fatima Fariyal

উপরে নিজের রুমে এসে আদনান যেন নিজের ভেতরের দম বন্ধ করা ঝড়টা আর ধরে রাখতে পারল না। কাঠের ভারী দরজাটা সে প্রায় লাথি মারেই খুলে ফেলল, দরজার ফ্রেম প্রচণ্ড ধাক্কায় কেঁপে উঠল। ভিতরে ঢুকেই সে হাতের ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে মারল। তার নিশ্বাস এখন দ্রুত, বুকটা উঠছে-নামছে রাগে। যেন বহুদিন জমে থাকা অগ্নিগোলক তার ভিতরে ফুঁড়ে উঠেছে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আহিয়া ভয়ে আর লজ্জায় কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে আসার সাহস তার হচ্ছে না। দরজার ঠিক পাশের দেয়ালে লাগানো ছোট্ট লবনমাখা আলোতে তার মুখটা অস্বস্তিতে ফ্যাকাসে লাগছে।

আদনান শার্টের গলার দুটো বোতাম খুলে ফেলল। হাতের তালু দিয়ে গলার অংশটা টেনে আলগা করল যেন ঠিকঠাক শ্বাস নিতে পারে। তীব্র উত্তেজনায় তার কণ্ঠনালী পর্যন্ত টানটান। কিন্তু দরজার বাইরে আহিয়াকে এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। একটা গম্ভীর, অগ্নিমাখা স্বর বেরিয়ে এলো,
“ওখানে দাঁড়িয়ে কি তামাশা দেখছিস? ভিতরে আয়।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আহিয়া দোনোমনা করে, যেন ঠান্ডা পানিতে পা দেবে কিনা ভাবছে। অবশেষে ছোট ছোট পা ফেলে ভিতরে ঢুকল। দরজার কাছে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। চিবুকটা প্রায় বুক ছুঁই ছুঁই। হঠাৎ আদনান এক অপ্রতাসিত কান্ড করে বসলো, যা আহিয়া কল্পনাও করেনি। আহিয়াকে ঝট করে দু’হাতে ধরে পিছনের দরজায় ঠেসে ধরল। আহিয়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, চোখ বিস্ফারিত। আদনানের শ্বাস বুকের ভেতর থেকে হাঁপ ধরে ধরে বেরিয়ে আসছে,
“ওই তানভীরের সাথে এত ঘেঁষাঘেঁষি করছিস কেনো?
এত কিসের পিরিত তোর ওর সাথে? হুহ, বল!”
আদনানের এমন কথা শুনে আহিয়া স্তব্ধ। সে এই প্রথম আদনানকে এভাবে কথা বলতে শুনছে। তার বুক কেঁপে উঠল। ওষ্ঠজোড়া হা হয়ে আছে। কথা আটকে গেছে।
তাকে চুপ থাকতে দেখে আদনান তার দু’বাহু আরো শক্ত করে চেপে ধরল, যন্ত্রণায় আহিয়ার দেহ কেঁপে উঠল।

“আমি তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আহিইই! এত কিসের কথা তোর তানভীরের সাথে?”
“আমরা তো শুধু মজা করছিলাম, আর কিছু না…”
কাঁপা কণ্ঠে বলল আহিয়া, কিন্তু কথাটা শেষ হতেই আদনান বজ্রগর্জনের মতো গর্জে উঠল,
“কিসের মজা হেহ? আমি আসলে তো আমার সামনে তোর মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হয় না। তিনবার জিজ্ঞেস করলে একবার উত্তর দিস! কেনো আহি? আমার বেলায়ই এমন কেনো?”
আহিয়ার চোখের পাতা কাঁপছে, চোখ ঝাপসা। আদনানের হাত তার বাহুতে চেপে বসেছে। আহিয়া কম্পিত গলায় বলল,

“আপনি তো এসব পছন্দ করেন না… সবসময় গম্ভীর, চুপচাপ থাকেন। তাই..”
“আমি সবসময় এমন ছিলাম না আহি! আমি আগে তোদের সাথে আড্ডা, মাস্তি মজা করতাম না? এখন তোরা আমায় এমন বানিয়েছিস, বিষেশ করে তুই!”
এই অন্যায় অভিযোগে আহিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল,
“আমি কি করেছি? আমাকে অযথা দোষারোপ কেনো করছেন? এখন সবকিছুর জন্য আমি দায়ী?”
“হ্যাঁ, তুই ছাড়া আর কে? তোর ভাইয়ের থেকে তোর অবদান বেশি আমাকে এমন বানানোর পিছনে!”
আহিয়া এক মূহুর্ত তাকিয়ে রইল আদনানের দিকে। তার ভিষন কান্না পাচ্ছে। আদনানের এমন আচরন অসহ্যনীয়, সে ঠোঁট চেপে কান্না সংযত করে বলল,

“আমার এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে..”
সে নিজের বাহু ঝটকা মেরে আদনানের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে বরফঠান্ডা কণ্ঠস্বর,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
আহিয়া দাঁড়িয়ে পরল। ঘাড় বাঁকিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিচে। আর এখানে থাকবো না। এক মূহুর্তও না।”
এরপর যা হলো, আহিয়া কল্পনাও করতে পারেনি। আদনান ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে তার হাত ধরল। শক্ত করে। এতটাই শক্ত যে আহিয়ার নিশ্বাস থমকে গেল। এক প্রকার টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে গেল ভিতরে। বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে ছোট একটা ধারালো ছু’রি বের করল। এক মুহূর্তও না ভেবে ছু’রি’টা আহিয়ার হাতের মুঠোয় ধরিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরল। তার কণ্ঠ যেনো কাটা, ছেঁড়া নিঃশ্বাস হয়ে বেরোতে লাগল,
“যাওয়ার আগে আমাকে বাকিটুকুও শেষে করে দিয়ে যা। আমি ক্লান্ত আহি, অনেক বেশি ক্লান্ত! আর পারছি না, বিলিভ মি!”

আহিয়া হতবাক। একদৃষ্টিতে দেখছে, আদনানের বুকে ছু’রির’ আগাটা গেঁ’থে আছে। ত্বক ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো কিন্চিৎ লাল র’ক্ত। আকাশি-রঙা শার্টে ছোপ ছোপ র’ক্ত ফুটে উঠল। আহিয়ার দম আটকে গেল, দুনিয়া যেন দুলে উঠল। যখন বোধগম্য হলো, সে ঝটকা মেরে ছু’রি’টা ছুড়ে ফেলল দূরে। চোখ টলমল করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু পড়ল।
শুষ্ক খসখসে ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিল। তার দৃষ্টি আটকে আছে আদনানের বুকে। কেমন যেন এক টান তৈরি হচ্ছে ভেতরে, দ্রুত, অজানা, তীব্র! আদনানের বুকে মাথা রেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু সাহস হলো না।
সামনে হাত বাড়িয়ে কাঁপা আঙুলে তার খ’ত’টা ছুঁয়ে দেখতে চাইল। বিহ্বল স্বরে বলল,

“এটা কি করেছেন আপনি? আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এ.. এটা কেনো করলেন আদনান ভাই!”
আহিয়া এগোতেই আদনান পিছিয়ে গেলো কয়েক ধাপ। আহত স্বরে বলল,
“মানবতা দেখাতে হবে না। যেতে চেয়েছিলি না? চলে যা।
আর দু’সেকেন্ড থাকলে আমি এমন কিছু করে ফেলবো,
যা তোর জন্য খারাপ হবে। সো… গেট লস্ট।”
আহিয়া অবাক, ব্যথিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। আদনান আজকে ভীষণ অচেনা, কিন্তু তবুও কেন জানি অদ্ভুত আকর্ষণ, অদ্ভুত টান। কষ্ট আর ভালো লাগা মিশে জট পাকাচ্ছে তার ভেতর। আর সহ্য করতে পারল না। এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। আদনান স্থির দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। চোখে এক ধরনের শূন্যতা। বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“সবকিছুরই নাকি একটা শেষ আছে, তাহলে আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না কেনো? কেনো শেষ হয় না এই যন্ত্রণাগুলো!”

নিচের হলঘরের নরম লাইটগুলোর আলো ঝাপসাভাবে পড়ছে মার্বেল ফ্লোরে। সোফার এক কোণায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে রিদিতা। ঈশানীরা এখনই বেড়িয়ে যাবে। রিদিতা কোলে বসা মাহির গাল দুটো চেপে ধরে হালকা আদর করল, আবার দুইটা ‘হামি’ ও দিল। হালিমা বেগম কতবার করে বলেছে, আজ যেন ঈশানীরা না যায়। কিন্তু ঈশানী অমত করেছে, বিভিন্ন অজুহাতও দিয়েছে না থাকার। হালিমা বেগম কতক্ষণ বা আর বলবে।

ঠিক তখনই মূল দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন আফরোজা শেখ। সাদা শাড়ির উপর কালো পাড়, হাতে কালো উকিলি কোর্ট আর ব্যাগ মুখে প্রচণ্ড ক্লান্তির ছাঁপ, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা। হলঘরের মাঝামাঝি আসতেই তাকে দেখে ঈশানী দাঁড়িয়ে পড়ল। রিদিতাও ভদ্রভাবে উঠে দাঁড়াল। রিতু দ্রুত দৌড়ে এসে আফরোজা শেখের হাতের ব্যাগ আর কোর্টটা নিয়ে নিল। আফরোজা শেখ তাদের দেখতেই এক মলিন হাসি ফুটিয়ে তুললেন, ক্লান্তি ভেদ করে তার মুখে উজ্জলতা জেগে উঠল। ঈশানী স্বভাবত সালাম দিল। তিনিও উত্তর নিয়ে ধীর পায়ে নিজের পরিচিত চেয়ারে গিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিলেন। ঈশানী সোফার পাশ থেকে ব্যাগটা তুলে নিতে নিতে রিদিতাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমরা এবার আসি। তোর ভাইয়া বাহিরে অপেক্ষা করছে, দেরি হয়ে যাবে আবার। তুই সাবধানে থাকিস তোর তো আবার কিছু হলেই অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার স্বভাব আছে।”

রিদিতা কন্ঠ নিচু করে ছোট করে বলল, “আচ্ছা।”
আফরোজা শেখ সেদিকে তাকিয়ে নিজের দৃঢ় স্বরে বললেন,
“সে কি! তোমরা চলে যাচ্ছো? রিদিতা, তুমি ওদের বলোনি থাকতে?”
“জ্বি, বলেছি।”
আফরোজা শেখ ভ্রু উঁচিয়ে তাকালেন,
“এটা কেমন হলো? তোমরা এভাবে চলে গেলে তো রিদিতারও খারাপ লাগবে। থেকে যেতে পারতে না? হালিমা, তুমি ওদের বলোনি?”
হালিমা বেগম উত্তর দেওয়ার আগেই ঈশানী ব্যস্ত স্বরে সাফাই দিল,
“না আন্টি, আজকে আর থাকতে পারবো না। আসলে মাহির বাবার অফিসে একটু চাপ চলছে, আর মাহিরও টিউশন আছে। আবার অন্য একদিন আসবো।”

আফরোজা শেখ ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন, তার ক্লান্ত চোখে সামান্য আক্ষেপ জমে উঠল,
“তাহলে আর কি বলবো, কিন্তু থেকে গেলে খুশি হতাম।”
তখনই পাশ থেকে তানভীর বলে উঠল,
“ঠিক আছে, তাহলে আমি থেকে যাচ্ছি। আপনাদের কষ্ট দিয়ে আমি যাইতে চাইনা। ঈশানীপু, তুই বরং সুমন ভাইয়ার সাথে চলে যা। চল আমি আগায়া দিয়া আসি।”
তার কথায় রিদিতা কপাল গুছিয়ে তাকাল। এখন এই বান্দর এখানে থেকে আবার কি কি কান্ড করে কে জানে!
আফরোজা শেখ আর কিছু বললেন না। ঈশানী সবার কাছে বিদায় নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। তানভীরও তাদের এগিয়ে দিতে চলে গেল। আফরোজা শেখ সবে মাথা পিছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ক্লান্তি দেহটাকে একটু আরাম দেয়ার চেষ্টা করলেন। এমন সময় একটা মোলায়েম স্বর ভেসে এলো,
“আম্মা… আপনার পানি।”

আফরোজা শেখের সেই ডাকে অন্তর ভিজে এলো, কি মধুর ডাক। সে ধীরে চোখ খুলে দেখলেন, রিদিতা ঠাণ্ডা পানি ভর্তি গ্লাস হাতে তার দিকে বাড়িয়ে ধরে আছে। আফরোজা শেখকে ক্লান্ত দেখে নিজে থেকেই পানি এনে দিল। হালিমা বেগম আর বানি রান্নাঘর থেকে উকি দিয়ে তাকিয়ে আছে দুই শাশুড়ি-বউয়ের আবেগময় মুহূর্তের দিকে। আফরোজা শেখ কোন দ্বীধা না করে গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে তৃষ্ণা মেটালেন। রিদিতা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনার আর কিছু লাগবে, আম্মা?”
আফরোজা শেখ মৃদু হাসলেন,
“না, তুমি আমাকে যে আম্মা বলে ডেকেছো এটাই অনেক। আর কি চাইতে পারি আমি, এর থেকে বড় চাওয়া আর কিছু নেই।”

রিদিতা চিবুক নামিয়ে নিল, মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আম্মা বলে ডাকতে তাকে নিজের সাথে কত যুদ্ধ করতে হয়েছে, তবেই না সে আম্মা বলে ডাকতে পেরেছে! সামান্য নীরবতা ভেঙে আফরোজা শেখ জিজ্ঞেস করলেন,
“আমার বজ্জাত ছেলে আর তোমার শশুর কোথায়, জানো?”
“উনি বিকেলের দিকে বেড়িয়েছেন, বলেছে জরুরি কাজ আছে ফিরতে দেরি হতে পারে। উনির সাথে বাবা আর চাচুও গেছে।”
আফরোজা শেখ একটু সোজা হয়ে বসলেন। দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হলো তার কপালে। তিনি কাঁধের চাদরের ভাজ ঠিক করতে করতে চিন্তিত স্বরে বললেন,

“তোমার শশুড়কে তিনবার কল করেছিলাম। রিসিভ করছে না। যেখানে আমি একবার কল দেয়ার সাথে সাথে রিসিভ করে, তাই চিন্তা হচ্ছে। আহাদের সাথে তোমার কথা হয়েছে?”
রিদিতা দু’বার ডানে বামে মাথা দোলালো অর্থাৎ না, কথা হয়নি। আফরোজা শেখের উদ্বেগ আরও একটু বাড়ল, কিন্তু সেটা সামনে থাকা রিদিতাে বুঝতে দিল না। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে এগোলেন, কিন্তু এক পা যেতেই থেমে আবার ফিরে তাকালেন। তার কণ্ঠে মা-সুলভ উদ্বেগ,
“তোমার শরীর এখন কেমন? জ্বর কি কমেছে? ওষুধ ঠিকমতো নিয়েছো? আসলে.. সারাদিনের এত ব্যাস্ততার কারনে একটু খোঁজ নিতে পারিনি।”
রিদিতার চোখে হালকা ঝিলিক দেখা গেলো। সে নিচু কন্ঠে বলল,

“আমি এখন ঠিক আছি, আম্মা। আপনার ছেলে ওষুধ দিয়ে গেছে।”
একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,
“আপনাকে কি চা বা কফি কিছু দেবো আম্মা?”
আফরোজা শেখ কণ্ঠ নিচু করে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“আমার কিছু লাগলে রিতু দিয়ে যাবে। তুমি নিজের শরীরের খেয়াল রাখো, আর এই টিপিকাল বউদের মতো আচরণ বন্ধ করো। আমি বলেছি, আমাকে আম্মা ডাকবে, শাশুড়ি আম্মা নয়। বুঝেছো?”
“জ্বি, আ.. আম্মা।”
রিদিতা মাথা নত করে রাখলো। আফরোজা শেখ তার মাথায় একটু স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। অতঃপর নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। রিদিতা কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। এক মূহুর্তেের ব্যাবদানে উপরের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, আহিয়া এতক্ষণ হয়ে গেলো এখন এলো না কেনো? সেই কখন উপরে গেছে অথচ আসার নাম গন্ধ নাই। তাকে এভাবে একা রেখে চলে গেলো! যদিও সে নিজেই বলেছে যাওয়ার জন্য, তাই বলে কি আর আসবে না! ভাবতে ভাবতেই সে তৎক্ষণাৎ সিঁড়ির দিকে হাটা ধরল।

রাত তখন প্রায় নয়টা ছুঁই ছুঁই। সাভারের নির্জন প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তালুকদারের বিশাল বাংলোবাড়িটির সামনে এসে প্রবল শব্দে ব্রেক কষে থামলো আহাদ রাজার নেতৃত্বে আসা গাড়িগুলোর দীর্ঘ কনভয়। মুহূর্তেই গাড়িগুলো থেকে নামলো তাদের লোকজন। পুরো বাংলো এলাকা এক নিমেষে ঘেরাও করে ফেলল নিরাপত্তারক্ষীরা। আহাদ রাজা, আমজাদ মীর সহ একে একে সবাই গাড়ি থেকে নামল। পেছনে সারি বদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের গার্ডরা।গেটের সামনে দাঁড়ানো তালুকদারের কিছু গার্ড তৎক্ষণাৎ তাদের পথ রুখে দিল। আহাদ কপাল কুঁচকে একবার শাহীনের দিকে তাকাতেই, শাহীনের নির্দেশে কয়েকজন এগিয়ে গিয়ে মুহূর্তে তাদের মাটিতে ফেলে দিল। বিশাল গেট ভেদ করে তারা ঢুকলো সারি বদ্ধ হয়ে। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই তালুকদারের লোকেরা কয়েক দিক থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমজাদ মীরকে চার-পাঁচজন একসাথে পিছন থেকে ঝাপটে ধরেছে। আহাদ আর আসফাক এগিয়ে যেতেই তিনি ইশারায় থামিয়ে দিলেন।

অতঃপর মূহুর্তেই সে সবকটাকে চিৎপটাং করে দিলেন।
কালো শার্টের উপর অফহোয়াইট ব্লেজারটা একটু ঝেড়ে আমজাদ মীর আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, যেন কিছুই হয়নি। এই সময় আহাদ ফ্লোরে পড়ে থাকা একটাকে গলা টিপে চেপে ধরে গর্জে উঠল,
“ওই… তালুকদারের বাচ্চা কোথায়? সময় কম আছে। দ্রুত বল, কুইক!”
লোকটা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে বলল, “বস… উপরে…”

আহাদ তার পরিচিত ভঙ্গিতে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নাকটা ঘঁষে কোমর থেকে পি’স্ত’ল বের করে নিয়ে, সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। তার দুই পাশে বাবা আর চাচা, পেছনে ত্রয়ী আর গার্ডরা। উপরে উঠেই দরজাটা লাথি দিয়ে এক ঝটকায় ভেঙে ফেলল। ভিতরে দৃশ্য দেখে মনে হলো, রংমঞ্চের নোংরা নাটক সাজিয়ে রেখেছে। রুম জুড়ে লাল আলো। টেবিলে অ্যা’ল’কো’হ’লে’র বোতল, তাস, ধোঁয়া, নেশাজাতীয় দ্রব্য। বিছানা এলোমেলো, মেঝে ছড়ানো নারীদের জুতা, কাপড়-চোপড়। অথচ রুম পুরো ফাঁকা একজনও নেই। আমজাদ মীর ইশারা করতেই আহাদ দ্রুত গিয়ে বেলকনির পর্দা সরায়। আর সাথে সাথেই চোখে পড়ে পাঁচ-ছয়জন স্বল্পবসনা নারী নিশ্চয়ই নর্তকী। তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে আহাদ ঘুরে দাঁড়ায়। এক নাগারে বিড়বিড় করতে লাগল,

“আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম! নাউযুবিল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাআহ! তওবা, তওবা! বিশ্বাস কর জানু আমি কিছু দেখি নাই। এটা ইচ্ছাকৃত ছিল না, সব দোষ তোমার এই শশুড় মশাইয়ের। তোমার মন্ত্রী মশাই নির্দোষ!”
আমজাদ মীর আর আসফাক মীর হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। আহাদ এক চোখ ধীরেধীরে খুলে দেখে তার বাবা আর চাচা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আহাদ চেঁচিয়ে উঠল,
“বাবা! চাচুউউউ!”
দু’জনেই যেন হুসে ফিরে দ্রুত মুখ ঘুড়িয়ে নিল। আহাদ দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠলো,
“লজ্জা করে না? এই বয়সে এভাবে তাকাও? আজকে বাসায় ফিরেই আম্মাকে সব বলে দেবো দাঁড়াও! আমার চোখটাও নষ্ট করলা। এর শাস্তি তোমরা পাবে।”
আমজাদ মীর শান্তভাবে কালো চশমা পরে পিঠ ফেরানো অবস্থায় বললেন,

“আমরা কি ইচ্ছাকৃত ভাবে দেখেছি নাকি? এটা তো অপ্রতাসিত ছিল। আর তুই বলে দিলে আমরা কি চুপ করে থাকবো নাকি? আমরাও রিদিতাকে বলে দিবো।”
আহাদ তার বাবার সামনে গিয়ে কটমট করে,
“তুমি আমাকে ফাঁসিয়ে এখন আবার থ্রেট দিচ্ছো? সব কিছু হয়েছে তোমার জন্য! আমি আম্মাকে বলে তোমার নামে মামলা দিব।”
“আমি দিব তোর নামে মামলা! তুই আমার নামে বদনাম রটাচ্ছিাস! আমি চুপ করে থাকবো?”
“বাবাআআআ!”
আসফাক মীর এসে বাবা ছেলের মাঝখানে দাঁড়ালেন। সে জানতো বাপ ছেলে যেখানে যাবে সেখানে একটা না একটা গন্ডগোল হবেই হবে। সে মাঝখানে এসে ধমকে উঠলেন,

“থামবি তোরা? দিনের মধ্যে একশ’বার একে অপরের নামে মামলা দেস। এখানে কি জন্য এসেছিস ভুলে গেছিস?
দু’জনেই ফুঁসতে লাগল। হিতাহিত বোধগম্য হতেই আহাদ একটু নাক টেনে শাহীনকে ডেকে বলল,
“শাহীন! এই মেয়েগুলোকে যতদ্রুত সম্ভব বাড়ি থেকে বের কর, কুইক! আর কিছু টাকাও দিস, টাকার অভাবে বড় কাপড় কিনতে পারে না। ছোটছোট কাপড় পরে ইজ্জতের ফালুদা বানাচ্ছে!”
শাহীন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “ঠিক আছে ভাই।”

শাহীন একটান দিয়ে বিছানার চাদর তুলে নিয়ে মেয়েগুলোর দিকে বাড়িয়ে দিল। তার এতক্ষণ আতঙ্কে কাঁপছিল কিন্তু আহাদের কথা শুনে তাদের ভ’য় কমে গেল। শাহীনের দেয়া চাদরটা দিয়ে নিজেদেরকে ঢেকে শাহীনের সাথে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেল। আহাদ এবার তালুকদারকে খুঁজতে লাগলো, সে যে এই কক্ষেই আছে আহাদ নিশ্চিত! সে গিয়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসল। দুই আঙুলে তুড়ি বাজাতেই তার লোকেরা বিশাল বেডটা উঠিয়ে পাশে সরিয়ে দিল। তখনই দেখা গেল, বিছানার নিচে গুটিসুটি হয়ে ঘাপটি মেরে আছে সোলাইমান তালুকদার! বেড সরতেই তার চোখ আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। আসফাক মীর হেসে উঠলেন,

“ওরে শালা! তলে তলে বিড়ালের ঠ্যাঙ ধরে আশ্রয় নিয়ে বসে আছিস দেখি!”
আহাদের লোকেরা টেনে এনে তাকে আহাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসালো। পোষাক বলতে শরীরে শুধু একটি লাল আন্ডারওয়ার, গলায় নারীদের রঙিন স্কার্ফ ঝুলান। শরীরের কয়েক জায়গায় লিপস্টিকের দাগ। আহাদ পি’স্ত’ল হাতটা গালে ঠেকিয়ে ঝুঁকে বসলো। এক সেকেন্ড পরখ করে বলল,
“বয়স তোর সত্তুর ছুঁই ছুঁই। এক পা ধরে, আরেক পা কবরে! পক্ষীটাও তো অ-কেজো, তাহলে এই সব সার্কাসে করিসটা কী আমারে বুঝা!”
সোলাইমান তালুকদার ভিতরে ভিতরে ভয় পেলেও সেটা দমিয়ে রাখলেন। নিজের দূর্বলতা লুকিয়ে চোখ গরম তেঁতে উঠলেন,

“আমার বাড়িতে এসে, আমার বেডেরুমে বসে আমাকেই অপদস্থ করতেছিস? তোদের সবকটাকে আমি এক তুড়িতে শেষ করে দিতে পারি।”
আমজাদ মীর পিছন থেকে তার ঘাড় ধরে উঠিয়ে দাঁড় করালেন। দাঁত কপাটি দিয়ে বললেন,
“সে তো সময় বলে দিবে, কে কাকে কেল্লাফতে পাঠায়! আগে তোর জন্য যে উপহার নিয়ে এসেছি, সেগুলো পছন্দ হয় কিনা দেখ!”
“উপ.. উপহার? কিসের উপহার!”

তালুকদার সামান্য বিচলতি হয়ে জানতে চাইলো। আহাদ কিন্চিৎ বাঁকা হাসলো, সেই হাসি ছিল ভয়ংকর, ভীষন ভয়ংকর! আমজাদ মীর দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে ইশারা করলে তারা সোলেইমান তালুকদারকে টেনে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে। সেখানে মাঝঘরে রাখা দুটি বড় লাল কফিন। কাপড় সরাতেই তালুকদার পিছিয়ে গেল। ভিতরে তার দুই বিশ্বস্ত লোকের নি’থ’র দে’হ। এটা সরাসরি ইঙ্গিত করছে, তারও মৃ’ত্যু ঘনিয়ে এসেছে। তাকে বাঁচানোর মত এখন তার লোকের কেউ নেই। সবাই আহত বা নিহত। তালুকদার হঠাৎ সুযোগ বুঝে ছুট লাগালো দরজার দিকে। পালানোর অপ্রায়ন চেষ্টা, কিন্তু দরজার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই আহাদের ত্রয়ী সামনে এসে দাঁড়াল। ধাক্কা খেয়ে তালুকদার মেঝেতে পড়ে গেল। আহাদ রাজা ক্রুর হাসলো, পা মেপে মেপে হাটু বাজিয়ে বসলো তালুকদারে সামনে। তালুকদার ছটফটিয়ে পিছাতে লাগল, ভেঙে পড়া কণ্ঠে আকুতি করতে লাগল,
“আমারে ছাইড়া দে.. আমার সাথে এমন করতে পারোছ না! দেখ.. আমারে যাইতে দে কইতাছি! ভালোয় ভালোয় যাইতে তে দে, তা না হলে খুব খারাপ হইব। আমারে যাইতে কইতাছি!”

আহাদ রাজা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নাকটা ঘঁষে নিল। ঠোঁট বাঁকিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“অবশ্যই তোকে যেতে দিব! এত করে যখন বলছিস, তোকে যেতে না দিয়ে পারি? কি বলতো, তোমার মনটা আবার ভীষণ নরম, একদম হাওয়াই মিঠাইয়েরর মত! তুই যখন এত অনুরোধ করছিস, তোকে বিনা টিকিটে পরপারে পাঠিয়ে দেব। নো টেনশন।”
“না না.. না, আমাকে কিছু করবি না কইলাম। আমারে যাইতে দে।”
আহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চক্ষু রক্তবর্ণ। সে এক ভয়ানক গর্জন করে উঠল,
“মুখ খোল। আমি বলছি, হা কর!”

কিন্তু তালুকদার বুঝল না! শুধু নির্বাক চেয়ে আছে। এবার আহাদের সব ধৈর্যের সীমারেখা পার হলো। এক সেকেন্ডর ব্যাবধানে সে তালুকদারের চোয়াল চেপে ধরে পর পর দুটো গুলি করল। সেই বুলেট মাথা ফুঁড়ে বেড়িয়ে গেল।তালুকদার লুটিয়ে পরল মেঝেতে। মূহুর্তেই তালুকদারের কাম তামাম! আহাদ উঠে দাঁড়ালো, মেঝেতে পরে থাকা নিথর তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আহাদ রাজা দু’বার অপশন দেয়। তৃতীয়বারে অ্যাকশন নেয়। মাইন্ড ইট!”
তাদের লোকগুলোকে ইশারা করার সাথে সাথে তারা সব লা’শ’গু’লো প্যাকেট করে নিয়ে গেলো, নদীতে ফালানোর উদ্দেশ্যে। আহাদ রাজা তার দাদুর প্রতিশোধ নিয়েছে!
তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে এলো। সবাই মিলে তালুকদারের অপকর্মের বাঙলো বাড়ি পিছনে ফেলে অন্ধকার রাতের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

রাত গভীর হয়ে এসেছে। অর্ধরাত্রির শেষ প্রহর, মীর হাউজের লাইটের আলো ক্ষীণ। বাতাস ভারী। সবকিছু নিস্তব্ধ। মিশন শেষ করে বাড়িতে প্রবেশ করলো মীর পরিবারে সকল পুরুষ। সবাই ক্লান্ত, আজকের ধামাকা সবার চোখে মুখে স্পষ্ট। তবুও সেই ক্লান্তির গভীর প্রতিশোধের ঠাণ্ডা সন্তুষ্টি। মূল দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই সবাই মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ডাইনিং স্পেসের ওপরে ঝোলানো ঝাড়বাতির নরম আলোয় এক শান্ত, পবিত্র দৃশ্য ফুটে উঠেছে। কাঁচের ডাইনিং টেবিলে মাথা রেখে গভীর ঘুমে ঢলে আছে রিদিতা। টেবিলে খাবার সাজানো। সবাই রাতের খাবার শেষে করলেও রিদিতা জানায় পরে খাবে। আহিয়াও রাতে খায়নি, তো আহিয়ার অজুহাত দিয়েছিল। সবাই যে যার মত চলে গেলেও রিদিতা খাবার টেবিলে বসে অপেক্ষা করতে থাকে বাড়ির পুরুষদের জন্য। অপেক্ষা করতে করতে কখন চোখ লেগে এসেছে, সে নিজেও জানে না। আসফাক মীর কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বললেন,

“এই মেয়েটা কি… সত্যি আমাদের জন্য এভাবে খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করছিল? মা ছাড়া তো কোনোদিন কেউ আমাদের জন্য এমন করে বসে থাকেনি, ভাইজান। না, তোমার বউ, না আমার বউ!”
আহাদ রাজা নিজের প্রেয়সীর ঘুমন্ত কোমল মুখটার দিকে তাকাল। যেন পৃথিবীর সকল শান্তি এই মুখটার মাঝে লুকিয়ে আছে। তার ঠোঁটে খেলা করল মৃদু একটা হাসি।নিচু স্বরে বলল,
“দেখতে হবে না এটা কার বউ! আহাদ রাজার একমাত্র বউ বলে কথা! ডিফারেন্স তো হবেই।”
তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত গর্ব মিশে ছিল। হালকা হেসে সেদিকে এগিয়ে গেল। আমজাদ মীর ছেলের চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,

“এমনভাবে বলছে, যেনো আমাদের দু’চারটা করে বউ আছে!”
আসফাক মীর হতাশায় মাথা নাড়ালেন। দুই বাপ-বেটার এই খোঁচা-খুঁচি নিত্যদিনের দৃশ্য। আসফাক মীর ক্ষুদার্ত থাকায় দ্রুত হাত ধুয়ে টেবিলে গিয়ে বসল। আহাদ কাছে এসে কিছুক্ষণ রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকে অজনা এক শান্তির ধারা নেমে এসেছে, তার প্রেয়সীর এই শান্তির ঘুম নষ্ট হবে ভেবে আর ডাকল না। বরং ধীরে আলতো হাতে তাকে নিজের কোলে তুলে নিল। রিদিতার মাথাটা এসে ঠেকলো আহাদের বুকে, তার ঘুমন্ত ভারী শ্বাস প্রশ্বাস আহাদের বুক ছেদ করে দিচ্ছে। তার শরীরে অদ্ভুত শীহরন বয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য আহাদ রাজার মনে হলো, জগতের সব অশান্তির বিনিময়ে এই এক শান্তির মুহূর্ত তার ভীষন প্রয়োজন ছিল। সে প্রেয়সীর মাথাটা বুকে চেপে, বাবা আর চাচার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ইনজয় ইউর ডিনার।”
বলেই ধীরেধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ততক্ষণে হালিমা বেগম আর বানি বেড়িয়ে এলো রুম থেকে। কিছুক্ষণ পর আমজাদ মীরও এসে চেয়ারে জায়গা নিলেন। হলঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল থালাবাসনের মৃদু টুংটাং শব্দ। ঘুমন্ত রিদিতাকে কোলে নিয়ে আহাদের নীরব, সংযত পদচারণা যেন এক শিল্পকর্ম!
উপরে নিজের ঘরে আসতেই রিদির শরীর সামান্য নড়ে উঠল। যেন কোনো অচেনা স্পর্শ বা পরিচিত উষ্ণতা তাকে টেনে তুলেছে নিদ্রার গভীরতা থেকে। ঠিক সেই মুহূর্তেই আহাদের বুকে মুখ গুজে থাকা রিদির নাকে এসে লাগল এক পরিচিত মাতাল করা পুরুষালি ঘ্রাণ, ধূপ, অলিভ, উড আর আহাদের নিজস্ব মাদকতা মিশ্রিত এক উষ্ণ গন্ধ!ঘুমের ঘোরে থাকা রিদির মনে হলো, এই গন্ধ যেন তাকে আরও গভীর কোনো আবেশে টেনে নিচ্ছে। সে আনমনে নাকটা আহাদের বুকে আরও গুঁজে দিল, যেন এক নিশ্বাসে পুরোটা গভীরে টেনে নিতে চায়। যতবার শ্বাস টানছে, ততবার গন্ধটার উত্তাপ তার মাথার ভেতর নরম কাঁপুনি তুলছে।
আহাদ থমকে গেল। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। নিজের বুকের ওপর রাখা রিদির মুখ, তার নিশ্বাসের উষ্ণতা আর ছোট্ট সেই ঘ্রাণ নেয়ার অভ্যাস, সব মিলিয়ে সে নিজেই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে রিদির কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

“এমন করছো কেনো? আমি কিন্তু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি, জানু!”
গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা রিদির শরীর সেই তপ্ত নিশ্বাস আর ফিসফিস শব্দে কেঁপে উঠল। চোখ দুটো তড়াক করে খুলে গেল। আধো অন্ধকারে তার সামনে ভেসে উঠল আহাদের মুখ, ঠোঁটের কোণে হাসি আর দুষ্ট গম্ভীর রেখা। বুকে এখনো শক্ত আলিঙ্গনে ধরে আছে তাকে। রিদির মাথায় যেন ঝটকা খেল। সে এক ঝাঁকুনিতে শরীর সোজা করে উঠতে চাইল, আহাদের বুক থেকে নিজেকে সরাতে চেষ্টা করল। কিন্তু আহাদ তাকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। বিরক্ত, আধা রাগী গলায় বলল,

“সমস্যা কী? কৈ মাছের মতো এমন ছটফট করছো কেনো?”
রিদি মুখ নামিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে নিচু স্বরে, কেমন যেন কাঁপা গলায় বলল,
“কি করছেন? নামান আমাকে! আমি তো নিচে ছিলাম… এখানে উপরে কি করে নিয়ে এলেন? যদি কেউ দেখে ফেলত!”
“সো হোয়াট? আমার বিয়াত্তা বউ আমি এনেছি! তাতে কার কি? আর তাছাড়া.. সবাই দেখেছে!”
“কিহহ!”
রিদি যেন লাফ দিয়ে উঠল। বিস্ময়, লজ্জা আর ভয় মিলিয়ে পুরো চেহারা লাল টকটকে হয়ে গেল। এক লাফে নিজেকে আহাদের কোল থেকে নামিয়ে নিল। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
“কি করেছেন আপনি এটা! আমি এখন সবাইকে মুখ দেখাব কী করে। ছি! ছি!”
আহাদের কপালে গভীর ভাঁজ পড়ল। রিদির কথাগুলো তার মোটেও পছন্দ হয়নি। সে নিজের মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল,
“কি এমন অপরাধ করল সে? নিজের হালাল বউকেই তো কোলে করে এনেছে! এতে ছি ছি করার কি আছে? যেন সে কোনো অশোভন কাজ করেছে!”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৭

মনে মনে প্রচণ্ড রেগে গেল। রাগে ঠোঁট শক্ত হয়ে আছে,
ঠিক আছে! ছোঁবে না এই বজ্জাত বেডিরে! যতক্ষণ প্রর্যন্ত নিজে থেকে কাছে না আসবে, সেও আসবে না! গটগট পায়ে হাঁটতে হাঁটতে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন আর ওয়ালেট বের করে বেডসাইড টেবিলে ছুড়ে রাখল। কালো ব্লেজারটা এক ঝটকায় খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলল। কোনো কথা না বলেই দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা তীক্ষ্ণভাবে ঘরে প্রতিধ্বনি হয়ে উঠল। রিদি সেই শব্দে প্রায় চমকে উঠল। হঠাৎ করে কী এমন হলো বুঝতে পারল না! ধীরে ধীরে বিছানার এক কোনে গিয়ে বসে পড়ল। পিছনের হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে, অপেক্ষা করতে লাগল।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৯