লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৫
Fatima Fariyal
ঠিক তার সামনে লাল জামদানি শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রেয়সী। ফর্সা মুখে লাল আভা ছড়িয়ে তাকে যেন আরও অপরূপ দেখাচ্ছে। নাকের ডগাও লালচে, কান্নার চাপে নাকি ঠান্ডায় বোঝা মুশকিল। চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রুর টলমল থোকা। আহাদ রাজা মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। এটা কি সত্যি? নাকি আবারও তার কল্পনা? এই নিয়ে ছাব্বিশবার সে রিদিকে দেখেছে কিন্তু চোখ খুললেই বুঝেছে এটা ভ্রম। শুধুই ভ্রম!
সে হালকা মাথা ঝাঁকাল, কপাল চেপে ধরল শক্ত করে। ঠিক তখনই এক চেনা মোহনীয়, অদ্ভুত মিষ্টি সুঘ্রাণ এসে তার নাকে লাগল। জুঁই আর সিনামের মতো এক অদ্ভুত গন্ধ, যেটা শুধু রিদির শরীর থেকেই পাওয়া যায়। তার মানে এটা কল্পনা হতে পারে না… এটা ভ্রম হতে পারে না। সে এক ঝটকায় চোখ খুলে তাকাল। একদম তার সামনে, তার খুব কাছে তার প্রেয়সী দাঁড়িয়ে। আহাদের বুকের ভেতরটা স্থির হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে আঙুলের উল্টোপিঠ দিয়ে রিদির গাল স্পর্শ করে তার গালের উষ্ণতা, আর্দ্রতা, টান সব অনুভব করতে চাইল। রিদি নিঃস্পন্দ। ঠোঁট চেপে রেখেছে অভিমানে। কিছু বলার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তার চোখের ভেজা আভা বলছে অনেক কিছু। আহাদ রাজা তার কম্পিত গলায় ডাকল,
“রি… দি…”
রিদিতা মাথা নিচু করে উপর নিচে নেড়ে সাড়া দিল। আহাদ দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, যেন জীবন ফিরে পেয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দ এক সেকেন্ডও স্থায়ী হলো না। তার মনে পড়ল, রিদি তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। মুহূর্তে তার মুখের ভঙ্গি বদলে গেল। চোখের দৃষ্টি লাল হয়ে উঠল, ঠিক অগ্নিশিখার মতো। রিদির চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরল, কণ্ঠে তীক্ষ্ণ গর্জন,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কি করে, হুহ? কি করে পারলি আমাকে ছেড়ে যেতে, জানু? বুক কাঁপলো না তোর? সাহস বেড়ে গেছে খুব না? কিছু বলছি না বলে দিন দিন সাহস বেড়ে যাচ্ছে! আমি বলেছি না, আমাকে না বলে কখনো চলে যাসনা। তাহলে কেন গেলি? কোন আইডিয়া আছে আমার ভিতর কোন ঝড় বইছে? ধারনা আছে তোর?”
রিদিতার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল সূক্ষ অশ্রুর ধারা। সে ঠোঁট কাঁপিয়ে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু বলতে পারল না। আহাদ নিজের উত্তেজনার তোড়ে খেয়ালই করেনি, সে কতটা শক্ত করে রিদির চিবুক চেপে ধরেছে। হালিমা বেগম আর শারমিন এগিয়ে এলেন রিদিকে ছাড়াতে। কিন্তু আহাদের ক্রোধী হাত নড়লই না। আফরোজা শেখ এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন,
“মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার? ছাড়ো ওকে! রিদিতা যেতে চায়নি। আমিই জোর করে ওকে নাসরিনের সাথে পাঠিয়েছি। ওকে কয়েকদিন সেখানে থাকতে বলেছি। তাতে যদি তোমার একটু শিক্ষা হয়। কিন্তু না! ও তো তোমার মতোই পাগল, একদিন যেতে না যেতেই ফিরে এসেছে।”
রিদিতা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হালিমা আর আহিয়া তাকে ধরে আছে দুই পাশে। আহাদ আবার ক্ষেপে এগোতেই শারমিন তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাকে শান্ত করতে চাইলেন,
“আহাদ, বাবা.. মাথা ঠাণ্ডা কর। এতো রাগ ভালো না বাবা! দেখ, রিদিতা তোকে ভয় পাচ্ছে। তুই এমন..”
“রিদি সামনে আসো!”
আহাদের কণ্ঠ বজ্রপাতের মতো ফেটে পড়ল। রিদিতা শারমিনের পিছনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। যেটা আহাদের একদমই পছন্দ হলো না। সে বা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নাকটা ঘঁষে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করল। অতঃপর এগিয়ে গিয়ে রিদির হাতের কজ্বি ধরল শক্ত করে। এক প্রকার টেনে আনল সামনে। কিন্তু রিদিতার অন্য হাত ধরে আছে তার মা। আহাদ চিৎকার করে উঠল,
“আম্মা, হাত ছাড়ো!”
আফরোজা শেখ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে পাল্টা গর্জে উঠলেন,
“তুমি আগে ছাড়ো ওর হাত। ও যাবে না তোমার সাথে।”
আহাদের চোখ লাল হয়ে উঠল। সে ঘুরে কটমট করে তাকাল আমজাদ মীরের দিকে,
“বাবা! তোমার বিয়াত্তা বউকে সামলান। না হলে আমি কি করতে পারি, তুমি খুব ভালো করেই জানো। আমার ধৈর্য টেস্ট করো না!”
আমজাদ মীর উঠে দাঁড়ালেন। কপালে গভির বিরক্তিভাজন। সে এগিয়ে এসে বললেন,
“আফরোজা ছেড়ে দাও রিদিতাকে। এই বয়সে সংসার নিয়ে টানাটানি আর ভালো লাগে না। আর আমারও কপাল বটে, নিজের ছেলে কথায় কথায় বাপের সংসার ভাঙার হুমকি দেয়।”
আফরোজা শেখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলেন স্বামীকে। কিন্তু তার কিছু বলার আগেই রিদিতা মৃদু কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আম্মা.. ছাড়ুন। আমি.. আমি উনাকে সামলে নিব। আপনি চিন্তা করবেন না।”
আফরোজা শেখ এবার তাকালেন রিদিতার দিকে, তার চোখ জোড়া দেখে সে বুঝলেন, তার ভিতরের টানাপোড়ন, ভালোবাসা, অস্থিরতা সবকিছু মিশে আছে। সে আর কীই বা করবে? অসহায়ের মতো বাধ্য হয়ে হাত ছেড়ে দিল। আহাদ আর এক মূহুর্তও দেরি করল না। রিদির হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। রিদিতা শাড়ির কুচি বারবার পায়ের নিচে পেঁচাচ্ছে। তবুও সে তার মন্ত্রী মশাইয়ের পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছে। তার লাল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উড়ে পিছনে নাচছে। হলঘরের সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
ঠিক সেই সময়েই ঘরের ভেতরের ভারী নীরবতা ভেদ করে প্রবেশ করল শাহীন আর তার সাথে সেই হলুদ চুড়িদার পরা মেয়েটা। দু’জনকে দেখামাত্রই হলঘরের সবার চোখ ঘুরে গেল তাদের দিকে। ঝড়ের রাতের বিদ্যুৎ চমকের মতোই অপ্রত্যাশিত এই আগমন। শারমিন প্রথমে প্রায় বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তাঁর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল, মুখের কোণে হালকা অবিশ্বাসের টান। তিনি এক পা এগিয়ে গিয়ে বিস্মিত গলায় বললেন,
“জেরিন! তুই এখানে?”
জেরিন ঠোঁট চওড়া করে ওর স্বভাবসুলভ সেই মায়াবী, প্রাণখোলা হাসিটা দিল। লাফিয়ে উঠে শারমিনের গলায় হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
“ফুফু! কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল তো?”
শারিমন বেশ অবাকই হলেন। নিজের ভাইয়ের একমাত্র মেয়েকে এখানে দেখে। জেরিন তাদের সাথেই দেশে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের তাড়াহুড়ো করে চলে আসাতে জেরিন আর আসতে পারেনি। এখন, এই দমকা হাওয়া আর বৃষ্টি-ঝড়ের রাতে তাকে দেখে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনি বাকরুদ্ধ হশে প্রশ্ন করলেন,
“তুই কিছু না বলেই… এভাবে হুট করে কিভাবে চলে এলি? আর ভাইজান তোকে একা ছাড়লো কী করে?”
জেরিন ঠোঁট উঁচু করে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হাসল,
“ফুফু, আমি এখন আর ছোট নেই। বড় হয়েছি, একা একা সব সামলাতে পারি। ফেরার পথে রাস্তায় ঝড়-বৃষ্টি ছিল, তাও ঠিকঠাক চলে এসেছি। দেখো না, তোমার সামনে ফিট-ফাট দাঁড়িয়ে আছি!”
জেরিনের কথা শেষ হতেই শাহীন পাশ থেকে ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, আর সেটা ভাইয়ের কারণেই সম্ভব হয়েছে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই তার দৃষ্টি পড়ল সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকা আহাদ আর রিদিতার দিকে। সে কিছুটা বিস্ময়ের সুরে বলল,
“ভাই কখন এল? আমরা তো ভাইয়ের আগে রওয়ানা করেছিলাম। তাহলে ভাই আগে আসল কী করে?”
পাশ থেকে আসফাক মীর হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে, তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
“বউয়ের খোঁজ পেলে সাত সাগর আর তেরো নদী অনায়াসে পার করা যায়। আর এটা তো ঢাকার শহর। তাও আবার রাজত্ব আহাদ রাজার হাতের তালুতে।”
শাহীন চোখ কপালে তুলে বলল,
“তাই তো! ভাবিকে কোথায় পেলো? কোথায় ছিল ভাবি?”
“ভাবিজানের অ্যাসিস্ট্যান্ট নাসরিনের বাসায়!”
শাহীন অবাক হয়ে তাকাল আফরোজা শেখের দিকে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মূহুর্তেই বুঝে গেল সবকিছু। জেরিনও কৌতূহলী চোখে তাকাল সিঁড়ির দিকে। ততক্ষণে আহাদ আর রিদিতা উপরের করিডোর পেরিয়ে গেছে। এখন তাদের কেবল পিঠ দেখা যাচ্ছে, তবুও সে আহাদ রাজার দেহের আকার আর চলার ভঙ্গি দেখেই চিনে ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না। হালিমা বেগম কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,
“শাহীন, তুই জেরিনকে কোথায় পেলি?”
শাহীন এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল,
“রাস্তায়! ভাই বলল, বাসায় পৌঁছে দিতে, সওয়াব হবে। এমনিতে তো সওয়াবের সাক্ষাত পাওয়া যায় না। আজকে সামনে এসে দাঁড়াল তাই তুলে নিয়ে আসলাম।”
তার ব্যঙ্গাত্মক সুর আদনানকে আরও বিরক্ত করে তুলল।
সে এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব নীরব তামাশা দেখে গেছে। এখন আবার শাহীনের টিপ্পনি, পুরোটা সহ্যসীমা পেরিয়ে যাচ্ছে। আদনানের এসব ফালতু কথা মোটেও পছন্দ না। সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো, কিন্তু তখনই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটল। জেরিন এসে হুট করে তার সামনে দাঁড়ায়। কোমরে দুই হাত রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমাকে চোখে পড়ে না? সব সময় এমন গম্ভীর, বোচমা মুখ করে থাকো কেন? হাসতে পারো না? তোমার এই চেহারা দেখে মানুষ ভয় পায় না? এমন চেহারা নিয়ে ডাক্তারি করো কীভাবে?”
আদনান জানতো এই মেয়ের সামনে পরলে প্রশ্ন শেষ হবে না। তাই তো পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পারল না, সেই পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া করতে এলো। নিজের বিরক্তি লুকাতে না পেরে সে তার মাথায় হালকা গাট্টা মেরে বলল,
“সবে এসেছিস। আগে সবার সাথে পরিচিত হ। আর আমি সব সময়ই এমন, এটা নতুন না। তাই বাজে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাক।”
কথাটা বলেই আদনান আড় চোখে একবার তাকাল আহিয়ার দিকে। আহিয়া তার দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ছিল। চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আদনান ঠোঁট বাঁকিয়ে এক অদ্ভুত, আত্মবিশ্বাসী হাসি দিল। নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
“তুই এবার অন্য আদনান মীরকে দেখবি, আহি। আর কয়েকটা দিন… তারপর বুঝবি দৃষ্টি চুরি করার সাজা আসলে কতটা কঠিন হতে পারে!”
উপরে নিজের রুমে আসতেই বিস্ফারন ঘটাল আহাদ রাজা। দরজটা শব্দ করে বন্ধ করে দিল। এতো জোড়ে শব্দ হলো যে রুমের দেয়ালগুলো কেঁপে উঠল। রিদিতা গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়ে উঠছে প্রতিটা সেকেন্ডে। আহাদ রাজা ক্রোধের গতি সামলাতে না পেরে পায়চারী করতে লাগল রুমের এদিক-ওদিক। পকেট থেকে মোবাইল, ওয়ালেট, চাবি যা যা ছিল সব বের করে ছুঁড়ে মারল সোফায়। শার্টের গলার দুই-তিনটা বোতাম খুলে দিল তবুও রাগ কমছে না। বরং আরও বেড়ে উঠছে। যতবার তার মাথায় ফিরে আসছে, যে রিদি তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।ততবার রাগের তীব্রতা যেন ৩০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। কোন অগ্রিম বার্তা ছাড়াই ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল রিদির কোমল গালে। রিদিতার মাথা হেলে গেল পাশে, চোখ জ্বালা করতে লাগল ব্যথায়। গাল লাল হয়ে উঠল মুহূর্তেই। তবুও সে কোনোমতে নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে রইল। কারণ… ভুলটা তারই। সে ছেড়ে গিয়েছিল এই পাগল মানুষটিকে। যে তাকে ছাড়া কিছুই বেঝে না!
কিন্তু মুহূর্তেই আহাদ রাজার নিজের ভেতরেও বজ্রপাত হলো। সে তার প্রেয়সীর গায়ে হাত তুলেছে! এই উপলব্ধিতে সে নিজেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল নিজের উপর। ড্রেসিং টেবিলের ভাঙা আয়নায় একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল। তার গলা কাঁপতে লাগল। রাগে না ব্যথায়, নাকি ভয়ে বুঝা দায়,
“কেন আমাকে এতোটুকু ভালবাসলি না জানু.. কেন? কেন চলে গেলি? কেন আমায় বোঝার চেষ্টা করলি না! আমি কী এতোটাই খারাপ? হেহ? তাহলে জেনে শুনে আমার জীবনে কেন আসলি! আমি তো তোকে জোড় করিনি, ফোর্স করিনি। নিজের ইচ্ছেতেই যখন এলি তাহলে ছেড়ে গেলি কেন? কেন…”
প্রত্যেকটা কথা তার ভিতরের দহন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। কথাগুলো বলতে নিয়ে আহাদ রাজার মতে মানুষেরও গলা কাঁপছে,
“আমি তো তোকে বলেছিলাম আমাকে ছেড়ে যাসনা.. আমি ঠিক থাকতে পারিনা। আমার এই এলোমেলো জীবন আরো এলোমেলো হয়ে যায়! তবুও.. তবুও কত সহজেই আমায় ছেড়ে চলে গেলি.. কেন? আমি পাগল তাই? আমি.. উগ্র, বদমেজাজি? মানিয়ে নেওয়া যায় না আমার সাথে? ঠিক আছে… ঠিক আছে, তাহলে চলে যাও! যা!”
সে হাত তুলে দরজার দিকেই ইশারা করে রিদিকে বলছে বেরিয়ে যেতে। রিদিতার চোখ ছলছল করছে। ঠোঁট কাঁপছে। বুক উঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। হঠাৎ করেই সে দৌড়ে গিয়ে পিছন দিক থেকে আহাদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।আহাদ প্রথমে অভিমানী রাগে তাকে সরিয়ে দিতে চাইল। তবে রিদিতা ছাড়ল না বরং আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফ্যাসফ্যাস করে ভাঙা কন্ঠে বলে উঠল,
“তোমায় ছেড়ে বহুদূরে.. যাবো কোথায়… এক জীবনে এত প্রেম পাবো কোথায়…”
রিদির চোখের পানি আহাদের সাদা শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে।
তার নিশ্বাসের উত্তাপ ত্বক ভেদ করে সোজা হৃদয়ে আঘাত করছে। এমতাবস্থায় তার কী করা উচিৎ? বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ স্তব্ধ রইল। রিদিতা পিছন থেকে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরল। প্রেয়সীর আলিঙ্গনে আহাদ রাজার স্ফুলিঙ্গর মতো রাগ মূহুর্তেই গলে গেলো ঠান্ডার স্রোতে। সে ধীরে ধীরে ঘুরে মুখমোখি হলো রিদিতার, লাল শাড়িতে তার প্রেয়সীকে জ্বলন্ত হুর পরীর থেকে কোন অংশে কম লাগছে না। এই শাড়িতে তার প্রেয়সীকে দেখেলে ভালো লাগার চাইতে কেন জানি ঈর্ষা কাজ করে বেশি। যদি কেউ তাকে এই রুপে দেখে তাহলে তার মায়াজালে আবদ্ধ হতে বাধ্য! যেমনটা সে আবদ্ধ হয়েছে। আর সে চায়না, সেই মায়াজ্বালে সে বীনা অন্য কেউ বাঁধা পরুক। সে নিজের শরীর দিয়ে রিদিকে দরজার সাথে ঠেসে ধরল। দুই হাত দিয়ে তার কোমর চেপে ধরল। চোখ দুটো লালচে, কর্কশ কন্ঠে বলল,
“আমি তো তোমায় বলেছিলাম আমার অনুৃমতি ছাড়া লাল শাড়ি পরতে না! বলেছিলাম না? তাহলে কেন পরেছো? ভয় হয় না? জানের ভয় নাই? বুক কাঁপে না? মেরে ফেলি এখন?”
রিদিতা ঠোঁট ফুলিয়ে আহাদের শার্টের বোতাম খুঁটতে খুঁটতে মিনমনিয়ে বলল,
“আপনার জন্যই তো পরেছি… এখন আপনি আমাকে বুকের সাথে পিষে মারবেন, নাকি বুকে জড়িয়ে আগলে রাখবেন,
ওটা তো সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।”
আহাদ অদ্ভুত এক নেশাল দৃষ্টিতে পলকহীন তাকিয়ে রইল তার প্রেয়সীর দিকে। কপালে পরে থাকা কানের পাশের চুল গোছা গুঁজে দিয়ে এক ঝটকায় নিজের বক্ষস্থলে টেনে নিল। হেস্কি স্বরে বলল,
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৪
“বেশ… তাহলে মেরে ফেলি। একদম আমার বুকের সাথে পিষে… মেরে ফেলি।”
তার আলিঙ্গন শক্ত হলো আরো। রিদিও তাকে জড়িয়ে ধরল পাগলের মতো। মাথাটা গুঁজে দিল আহাদের বুকের ঠিক মাঝখানে… মুখে লাজুক হাসি।
