লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৪
Fatima Fariyal
ঝড়ো সন্ধ্যার কালো মেঘে ঢাকা শহরটা যেন আরও অচেনা, আরও ভয়ার্ত হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দর থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত, কুড়িল থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত সবার দরজা কড়া নাড়া হয়েছে, কিন্তু কোথাও রিদির হদিস নেই।
“ভাইয়া, এবার কি করবে? কোথায় খুঁজবে ভাবিকে?”
আদিলের কণ্ঠ ভারী, আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। আদিল আবার জিজ্ঞেস করল,
“সারাদিনে একটা ক্লু ও পেলাম না! ভাবি কোথায় যেতে পারে? আচ্ছা, ভাবি কি ইচ্ছে করেই কোথাও লুকিয়ে আছে? নাকি তার সাথে… তার সাথে সত্যিই কিছু ঘটেছে?”
একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে আদিল। অথচ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আহাদ রাজার মনে শুধুু তোলপাড় চলছে। ভিতরটা লেলিহান চিতার মতো দাউদাউ করে জ্বলছে। বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা, অসহ্য, তবুও সে যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে রাখল। ধীরে, খুব ধীরে বলল সে,
“জানিনা আদিল… জানিনা। একদমই বুঝতে পারছি না। রিদি কোথায় আছে, কেমন আছে.. কিচ্ছুই জানিনা আমি, কিচ্ছু না!”
তার কণ্ঠে অসহায়ত্বের সঙ্গে দমিয়ে রাখা আগুন। এক মুহূর্ত থেমে দাঁতে দাঁত পিষে সে আরও যোগ করল,
“কিন্তু এটা যদি ওর ইচ্ছাকৃত কোন চাল হয়ে থাকে। যদি ও নিজের ইচ্ছায় আমাকে ছেড়ে গিয়ে থাকে। তাহলে আমি যে ওকে কি করব.. সেটা আমি নিজেও জানিনা।”
তার চোখে তখন ঝড়। সেই ক্রোধ বিস্ফোরিত হতে পারে যেকোন সময়। সে গাড়িতে উঠে দরজাটা ধপ করে বন্ধ করে দেয়। শাহীন ও দ্রুত উঠে বসলো সামনের সিটে। গাড়ির সারি ছুটল শহরের ব্যস্ত পথে। কিন্তু আজকে শহরের আকাশটাও শান্ত নেই। ঘন কালো মেঘ জমছে, বিদ্যুতের রেখা বারবার আকাশ ফেঁড়ে নিচে নেমে আসছে। বাতাসে ধুলোর তীব্রতা, ঝড় আসার মতো অবস্থা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ শুরু হলো গর্জন, সাথে প্রবল বর্ষণ। ছোট বড় সব দোকানের ঝাপি টেনে বন্ধ করে দিচ্ছে। রাস্তাগুলো প্রায়স ফাঁকা হতে থাকে। এতোটাই ভারী বর্ষন, যে এক হাত সামনেও কিছু দেখা যায় না। বাধ্য হয়ে তাদের গাড়ি থামল রেললাইনের পাশে। এভাবে তারা প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আহাদ রাজা বেশ বিরক্ত হলো, আজ যেনো উপরওয়ালা ও তার ধৈর্যের পরিক্ষা নিচ্ছে। সে কপাল গুছিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে তাকাতেই দৃষ্টি পড়ে, ল্যাম্পপোস্টের আধো আলোয় এক মেয়ের অবয়ব। হলুদ চুড়িদার। এক হাতে কালো বড় ছাতা, যা ঝড়ো বাতাসে বারবার উল্টে যাচ্ছে। সামলাতে পারছে না বিধায় বৃষ্টিতে একদম ভিজে একাকার!
আহাদের বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল। ভারী বর্ষনের জন্য স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু মেয়েটার অবয়বটা ভয়ানকভাবে রিদির মতো লাগছে। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। গাড়ির দরজা খুলে এক দৌড়ে ছুটে গেলো তার দিকে।
“ভাই, কোথায় যাচ্ছেন? পরিস্থিতি ভালো না!”
পিছন থেকে চিৎকার করল শাহীন। কিন্তু আহাদের কানে কিছুই গেল না। সে পাগলের মতো প্রাণপণে ছুটে চলেছে,
“রিদি! রিদি দাঁড়াও!”
তার গলা মিশে যাচ্ছে বৃষ্টির শব্দে। মেয়েটার কান পর্যন্ত যাচ্ছে না তার ডাক। মেয়েটা তখন দ্রুত পা চালিয়ে নিরাপদ আস্থানা খুঁজছে। আহাদ পিছন থেকে চিৎকার করে উঠল,
“রিদি, দাঁড়াতে বলেছি তো! রিদিইই!”
সে এবার সরাসরি মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়াল। তাকে দেখেই মেয়েটা চমকে গিয়ে এক ধাপ পিছিয়ে গেলো।
এই শুনশান জায়গায়, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে একটা অপরিচিত পুরুষ সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালে ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। বৃষ্টির ফোঁটা আহাদের কপাল বেয়ে টুপটাপ পড়ছে। তাকাতে পারছে না ঠিকঠাক ভাবে, কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ পিটপিট করে বোঝার চেষ্টা করল। মুহুর্তেই তার বুকের পাঁজর টনটন করে উঠল। এটা তো তার প্রেয়সী নয়! তার হৃদপিণ্ড থেমে যাওয়ার মতো ধাক্কা খেলো। ভিতরটা ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা ভীতু কন্ঠে বলে উঠল,
“আ.. আপনি কে? আমার পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কেন? দে.. দেখুন, আমাকে যেতে দিন। আমার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করার চেষ্টা করবেন না! আ.. মি কিন্তু…”
“হুসস!”
এক আঙুল তুলে মেয়েটাকে থামিয়ে দিল আহাদ রাজা।
তার ধৈর্য এখন শেষ সীমায়। সে চিবুক শক্ত করে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“আহাদ রাজা শুধু তার প্রেয়সীর সাথেই উল্টোপাল্টা করতে পারে। আপনার মতো মেয়েরা তার কাছে মায়ের সমতুল্য। Understand?”
মেয়েটা কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আমার পথ আটকালেন কেন?”
“আহাদ রাজা কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নয়।”
মেয়েটা বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
“এই আহাদ রাজাটা আবার কে? বারবার তার নাম নিচ্ছেন কেন?”
আহাদ চোখ কুঁচকে তাকাল,
“আহাদ রাজাকে চিনেনা এমন মানুষও দুনিয়ায় আছে?”
মেয়েটা হাসলো হালকা ঠাট্টার ভঙ্গিতে,
“আছে। শয়ং আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তো! যে আহাদ রাজা কেন? কোন রাজাকেই বাস্তবে দেখেনি!”
“তা হলে তো এই জগতের মানুষ বলে মনে হয় না আপনাকে। বৃষ্টির সাথে আকাশ থেকে টুপ করে পড়েছেন মনে হয়।”
“কিছুটা ঠিকই আন্দাজ করেছেন।”
“স্টুপিড!”
অসহ্য রকম বিরক্ত হলো আহাদ। এই মুহুর্তে তার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই তর্ক করার। তাছাড়া অচেনা কোন মেয়ের সাথে সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করতে চায় না। কিন্তু ঘুরে যেতে নিতেই মেয়েটা আবার পিছু ডাকে,
“একটু… সাহায্য করবেন?”
আহাদ রাজার পা থেমে গেলো। তবে ঘুরে তাকাল না। মেয়েটা বলল,
“আমি আজকেই জার্মানি থেকে ফিরেছি। ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আমাকে একটু বাসায় ফিরতে সাহায্য করবেন?”
“যাকে চেনেন না, জানেন না, এখন আবার তার কাছে সাহায্য চাইছেন? হাউ ফানি!”
ব্যঙ্গ করল আহাদ। কিন্তু মেয়েটা যুক্তি দিয়ে বলল,
“আপনি বলেছেন আপনার প্রেয়সী না, প্রিয় কেউ আছে। এর মানে আপনি আমার কোন ক্ষতি করবেন না। তাই সাহায্য চাইছি।”
অসহায় একটা মেয়েকে এভাবে নির্জন জায়গায় ফেলে যাবে? আহাদ রাজা অনিচ্ছা সত্তেও বলল,
“বাসা কোথায়? শাহীনকে বলে দিচ্ছি, শাহীন আপনাকে পৌঁছে দিবে।”
“শাহীন কে?”
আহাদের রাগ তরতর করে বেড়ে গেলো। এতো সাহস কি করে হয় তাকে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করার? কিন্তু সে কিছু বলার আগেই শাহীন এসে পড়ল। কিছুটা কাছে এসে বলল,
“ভাই, চলেন! এখন বৃষ্টি কিছুটা কমেছে, আবার বেড়ে যেতে পারে। তার আগেই আমাদের যাওয়া দরকার।”
আহাদ চোখ বন্ধ করে নিলো। নিজের এই অস্বাভাবিক রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার তীব্র চেষ্টা করছে। গলার স্বর রুক্ষ করে বলল,
“আমি রিদিকে না নিয়ে কোথাও যাবো না। তোরা চলে যা। যাওয়ার আগে এই উটকো ঝামেলাটাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাস। সওয়াব হবে।”
শাহীন আড় চোখে তাকালো মেয়েটার দিকে। তবে তার থেকে বেশি অবাক হলো আহাদ রাজার মুখে সওয়াবের কথা শুনে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“ভূতের মুখে দোয়া কালাম।”
আহাদ চোখ গরম করে তাকাতেই শাহীন কথা ঘুড়িয়ে বলে,
“ভাই, আপনাকে রেখে আমরা কি করে যেতে পারি।আপনাকে ছেড়ে যাবো না!”
“শাহীন!”
“যাচ্ছি ভাই, যাচ্ছি! চলুন ম্যাডাম। আপনার গন্তব্য বলুন।
ছোটখাটো সওয়াব হাত ছাড়া করতে হয় না।”
শাহীনের সাথে সাথে মেয়েটাও গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“মীর হাউজ!”
শাহীন চমকে মেয়েটার দিকে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সে কি আধো ঠিক শুনেছে? মীর হাউজ? শাহীন এবার কৌতূহল নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। মনে মনে ভাবে, যেতে যেতে বাকিটা পথে জেনে নিবে। শাহীন আর গার্ডদের গাড়ি সেখান থেকে চলে যায়!
আহাদ রাজা নিজের গাড়ির পাশে নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে আছে। না, শুধু দাঁড়িয়ে নেই; বরং যেন নিজের অস্তিত্বের শেষ ভরসাটুকু আঁকড়ে ধরে কোনোভাবে টিকে আছে। সে এখন কী করবে? কোথায় খুঁজবে তার প্রেয়সীকে? কোথায়? শহরটাকে উল্টেপাল্টে খুঁজেছে। তবুও তার প্রেয়সীর ছাঁয়াটুকু পর্যন্ত পায়নি। সে মাথার চুল দু’হাতে মুঠি করে টেনে ধরল। ভিতরের যন্ত্রণা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যেন বুকের মধ্যে আগুন, তার উপর শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। কেউ বুঝল না তাকে, কেউ না! অবশেষে তার প্রেয়সীও তাকে ছেড়ে চলে গেল। সবাই তার রাগটাই দেখলো অথচ কেউ বুঝল না, এই রাগটা তার ইচ্ছাকৃত নয়। আর এই সত্যিটাও সবাইকে বলা সম্ভব না!
রাস্তার মাঝেই সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ঠান্ডা বৃষ্টির পানি তার গায়ের প্রতিটি তন্তু ভিজিয়ে দিচ্ছে। পুরুষ মানুষের কান্না পৃথিবীতে বড়ই বেমানান, তাইতো তার চোখের অশ্রুকনা বৃষ্টির সাথে মিলেমিশে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এভাবে কতক্ষণ বসে ছিল সে, নিজেও জানে না। আকাশে বজ্রপাত, রাস্তায় ঝড়ো হাওয়া, আর তার ভিতরে ধ্বংসের উত্তাল সুর। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে তার ফোনটা বেজে উঠল। বৃষ্টিতে অনেকক্ষণ থাকার কারণে হাতগুলো ঠান্ডায় অবশ হয়ে গেছে। কাঁপা আঙুলে ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে আসফাক মীরের স্থির, দৃঢ় কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কোথায় তুই? এখনই বাড়ি আয়।”
আহাদ একটা ব্যাথাতুর ঢোক গিলে কাঁপা কন্ঠে বলল,
“আমি রিদিকে ছাড়া বাড়ি ফিরব না চাচু। কিছুতেই না! ওকে ছাড়া ওই বাড়িতে আমার দম বন্ধ লাগে। আমি..”
“রিদির ব্যাপারে জানতে পেরেছি। তুই তাড়াতাড়ি আয়।”
কথাটা শুনেই বিদুৎের ন্যায় ফট করে দাঁড়িয়ে পরল আহাদ রাজা। কন্ঠ কাঁপিয়ে বলল,
“ক.. কি বললে? কোথায় আছে রিদি? কি জানতে পেরেছো? বলনা আমাকে!”
“এতকিছু ফোনে বলা সম্ভব না। তুই দ্রুত আয়।”
“আসছি! আমি এখনই আসছি।”
ফোনটা গাড়ির পিছনের সিটে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে ড্রাইভিং সিটে উঠে পড়ল। এক সেকেন্ডর ব্যাবধানে কালো গাড়িটা তীরবেগে ছুটে চলল বৃষ্টিভেজা রাস্তায়। গভীর রাত আর ঘন বর্ষন হওয়ায় রাস্তা ফাঁকাই ছিল। তাই তার বাসায় পৌঁছাতে বেশি একটা সময় লাগলো না। মূল গেট পেরিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ঝড়ের গতিতে ভিতরে ঢুকল। সেখানে হলঘরে আগে থেকেই সবাই উপস্হিত। তবে তখন তার নজড়ে কেউ পরছে না, সে শুধু রিদিকে খুঁজছে। আসফাক মীরের কাছে এসেই উতলা হয়ে জানতে চাইল,
“চাচু! রিদি কোথায়? তুমি বলেছিলে রিদির ব্যাপারে জানতে পেরেছো। আমার রিদি কোথায়?”
আসফাক মীর এবার ধীরে চোখ সরালেন আফরোজা শেখের দিকে। আহাদও সেই দৃষ্টি অনুসরন করে তাকাল তার মায়ের দিকে। তার মুখে কঠিন দৃঢ়তা! আহাদ এবার চেঁচিয়ে উঠল,
“কি হলো? বলছো না কেন? রিদি কোথায়?”
আমজাদ মীর পায়ের উপর পা তুলে সোজা হয়ে বসলেন। স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“তোমার আম্মাকে জিজ্ঞেস করো। তোমার আম্মা সব জানে।”
আফরোজা শেখ স্বামির দিকে কড়া চোখে তাকালেন। এতে আমজাদ মীর পা নামিয়ে নেয়। নিচু স্বরে বললেন,
“তোমার ছেলের বউ কোথায় আছে, সেটা বলে দাও আফরোজা। এই বয়সে আমি আমার বউ হারাতে চাই না।”
আহাদ তার মায়ের দিকে তাকাল। তার মুখের ভাবভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে আগে থেকেই সব জানতো! সে রেগে মেগে এগিয়ে গেলো তার মায়ের কাছে।
“আম্মা! তুমি জানতে রিদি কোথায়? তাহলে কেন বললে না। কেন চুপ করে তামাসা দেখে গেলে? আমার ফিলিংসের কী কোন কদর নেই? আমি পাগলা কুত্তার মতো পুরা শহর খুঁজেছি, আর তুমি সব জেনেও চুপ করে আছো? কেন?”
আফরোজা শেখ নিজের কাঁদের চাদরটা ঠিক করে বসলেন। তার ছেলে তার সাথে গলা উঁচু করে কথা বলছে! তবে সেও কম কিসে? সে তড়াক করে দাঁড়িয়ে গলার স্বর রুক্ষ করে বললেন,
“কারণ এটাই! এই যে তোমার কথা বলার ভঙ্গি, তোমার রাগ, তোমার জেদ, এই আচরণগুলোই রিদিতার চলে যাওয়ার কারণ। তুমি যতদিন না বুঝবে, কখন কার সাথে, কোন সুরে কথা বলতে হয়, ততদিন তোমার রিদিতা তোমার কাছে ফিরবে না!”
আহাদ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল,
“মানে তুমি.. তুমি ইচ্ছে করেই রিদিকে সরিয়ে দিয়েছো? আমার কাছ থেকে?”
আফরোজা দৃঢ়ভাবে বললেন, “অবশ্যই!”
“কেন আম্মা? কেন!”
কথাগুলো তার বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো, আর্তনাদের মতো।
“কারণ আমি রিদিতার বাবাকে ওয়াদা করেছি, তার মেয়ের চোখে কখনো অশ্রুর কণা জমতে দেব না। কিন্তু তুমি… তুমি ওকে কাঁদিয়েছো। তাই আমি ওকে সরিয়েছি। যেদিন তুমি ওর কদর বুঝবে, সেদিনই রিদিতা ফিরে আসবে।”
“আমার কষ্টটা কি তোমাদের কারোর চোখে পড়ে না? দেখছো না আমি কেমন শুকিয়ে গেছি রিদির অভাবে! এভাবে চলতে থাকলে আমি তো চ্যাপা শুঁটকিমাছের মতো হয়ে যাব। আম্মা প্লিজ! ভালোয় ভালোয় বলে দাও রিদি কোথায়? না হলে কিন্তু..”
“কী করবে? আবারও ভাঙচুর করবে?”
আহাদের চোখ জোড়া লাল টগবগ করছে। রাগ তরতর করে র’ক্তে’র ধমনী ছুঁয়ে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। একাদিকবার নিশ্বাষ নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিতে চাইল। তাও পারল না। এক ঝটকায় পাশের সোফাটাকে উল্টে ফেলে দিল। সে মোটেও ভালো মানুষ না, এসব সহ্য করার মতো অতন্ত্য ধৈর্য তার নাই। তার নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম; আর তার মা বলছে, তার প্রেয়সীকে সে দিবে না! এক রকম তান্ডব শুরু করে দিয়েছে। এক এক করে সব ভাঙচুর করতে শুরু করে। সবাই ভয় আর আতঙ্কে এক পাশে সরে দাঁড়াল। এমন সময় একটা পরিচিত মেয়েলি, খুব কোমল এবং একইসাথে বিদ্ধ করা এক কণ্ঠ শুনে তার সমস্ত দেহ কেঁপে উঠল,
“মন্ত্রী মশাই!”
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪৩
আহাদের হৃদস্পন্দন থেমে গেল। হাতে একটা ফুলদানি ঝুলে রইল। চোখের পাতায় কাঁপন, সে কি ঠিক শুনেছে? সত্যিই শুনেছে? নাকি আবার তার ভ্রম? পরমুহুর্তেই সে তার মুখ কাঠের ন্যায় শক্ত করে নিল। হাতের ফুলদানি ছুড়ে মারল মেঝেতে। ভাঙা ফুলদানির এক অংশ ছিটকে এসে তার কপালে লাগল। কানের পাশে লাল র’ক্তে’র সরু ধারা বেয়ে নামতে লাগল। সে কোন মোহ চায় না, সে তার প্রেয়সীকে চায়। এখনই, এই মুহুর্তে চায়! সে ঘুড়ে দাঁড়াতেই চোখ আটকে গেল সামনে। তার র’ক্তলাভা চোখের দৃষ্টি নিমিষেই তুষারের মতো নরম হয়ে এলো। ধুকুপুক ধুকুপুক করে তার হৃদস্পন্দন বাধ্যযন্ত্রের মতো বাজছে!
