লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৪
অহনা রহমান
হিয়া গোলাপি একটা জরজেট শাড়ি পড়লো৷ সাদা স্টোনের একটা সেট পড়লো কানে ও গলায়। লম্বা চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। মাথার মাঝখান থেকে সিঁথি করে সেখানে একটা টিকলি পড়েছে৷ ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক। ব্যাস মেয়েটিকে স্বর্গের পরীর থেকে কম কিছু লাগছে না। ডেসিন টেবিলের সামনে বসে চুল ঠিক করছিলো। এমন সময় রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো নাফি৷ তার পরনে সম্পুর্ন সাদা পোশাক। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা। তাকেও কল্পলোকের কোনো নায়কের থেকে কম লাগছে না। নাফির আগমন হিয়া আয়নায় দেখতে পেলো।
কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। স্থির হয়ে বসে রইলো। ওদিকে নাফির রুমে এসেই চোখ গেল আয়নায়। প্রেয়সীকে এই রূপে দেখে হৃদপিণ্ড থমকে গেল। নাফি বুকের বা পাশে হাত দিয়ে হৃদয়ের গতিবেগ বোঝার চেষ্টা করলো। ওভাবেই এগিয়ে গেল হিয়ার দিকে। ধীরেধীরে, যেন কোন তাড়া নেই তার। দৃষ্টি তার হিয়াকে আবদ্ধ। আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকা হিয়ার দৃষ্টি ও নাফির দিকে। দুজনের কি হলো কে জানে! চোখে চোখে কত না বলা কথা তারা আদান-প্রদান করছে তাও ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এটা শুধুমাত্র তারাই জানে। নিজের দিকে নাফিকে এগোতে দেখে হিয়াও ধীরে ধীরে দাঁড়ালো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ততক্ষণে নাফি তার অনেকটা কাছে চলে এসেছে। নাফি আর হিয়ার মাঝে দুরত্ব তেমন নেই বললেই চলে। নাফির বুকের সাথে লেপ্টে আছে হিয়ার পিঠ। নাফি হিয়ার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখ নিলো। টুকুস করে ঠোঁট ছোঁয়ালো হিয়ার উন্মুক্ত কাঁধে। দৃষ্টি তখনও হিয়ার দিকেই। ওদিকে হিয়া নাফির উষ্ণ স্পর্শ পেতেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। খামচে ধরলো নিজের পরনের শাড়িটা। নাফি দেখলো হিয়ার ভাবগতি। বাঁকা হাসলো নাফি৷ তার বউটা একটু বেশিই কিউট আর লজ্জা পেলে তো মাশাল্লাহ!
নাফি এইবারে হিয়ার কানের কাছে মুখ নিলো। হিয়ার কান ছুঁইছুঁই ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মাশাল্লাহ রোদ্দুরী! তোমার সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখা রূপ নয়, এ যে আমার অন্তরের অমলিন শান্তি, প্রতিপলে যে আলো জ্বেলে দেয়
আমার সমস্ত অন্ধকারের গহ্বরে।”
হিয়া কেঁপে ওঠে। নাফির কন্ঠে এক অদ্ভুত মাদকতা। যা হিয়াকে চুম্বকের মতো টানছে। সে নিজেকে ধাতস্থ করে চোখ মেললো৷ নাফি তখন স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তাকালো আবার আয়নার দিকে। ফের দুজনের দৃষ্টির মিলন হলো। নাফি হিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। সামনাসামনি এবং খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো এবার। সমস্ত লজ্জা ভয় কাটিয়ে হিয়া অপলক তাকিয়ে রইলো নিজের স্বামীর দিকে। ঠিক সেসময় কাবাবে হাড্ডি হয়ে রুহি প্রবেশ করলো হিয়াদের রুমে। কোনরকম নক না করেই সে ঢুকে পরলো৷ এবং হাক মেরে হিয়াকে ডাকলো,
“হিয়াআআআ!”
হঠাৎ এমন কাজে হতবিহ্বল নাফি ও হিয়া৷ দুজনে চট করে সরে। নাফি আর যাইহোক রুহির সম্পর্কে ভাসুর। তাই কিছু বলতে গিয়েও পারলো না। সবটা হিয়ার উপর ছেড়ে দিয়ে নিজে ইতস্তত বোধ করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। হিয়া রাগী দৃষ্টিতে তাকালো রুহির দিকে। যদিও রুহি বুঝতে পারেনি নাফি রুমে আছে। আর ওরা এমন অবস্থায় ছিলো তা তো ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি সে। সেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। ভয় হলো, নাফি যদি আবারও তাকে অপমান করে। যেহেতু সে হিয়াকে নাম ধরে ডেকেছে। এবং নক না করেই রুমে এসে পড়েছে। রুহি ভ্যাবাচেকা খেয়ে হিয়ার দিকে তাকালো। ঠিক তখনই খেঁকিয়ে উঠলো হিয়া। বর্তমান সম্পর্কের ফায়দা তুললো সে।
“কারো রুমে ঢুকতে হলে যে নক করতে হয়, সে কমনসেন্স ও নেই? আর এটা তোমার ভাসুরের রুম। বোধবুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েছি নাকি?”
নাফি যেহেতু ওয়াশরুমে তাই রুহি ভাবলো হিয়াকে দু-চারটে কথা শুনিয়ে তবেই যাবে। তাই রুহি বলল,
“তুই একটু বাড়াবাড়ি করছিস না হিয়া? লিমিট টা ক্রস করিস না প্লিজ। তোর ধারণা ও নেই আমি কি করতে পারি?”
হিয়া জানে রুহি নাফির সামনে তাকে কিছুই করতে পারবে না। তার কিছু হলে নাফিও ছোট ভাইয়ের বউ-টউ কিছুই মানবে না। তাই হিয়া স্পর্ধা দেখালো রুহির সামনে। নির্ভয়ে, স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“কি করবে তুমি? যা করার করে নিও। আগে তুমি আমার রুম থেকে বের হও। আর তুই তোকারি করছো কার সাথে? শোনোনি সকালে তোমার বড় ভাইয়া কি বলেছে? আমাদের সম্পর্ক এখন পাল্টে গেছে ছোটবউ। আমার সাথে ফারদার এভাবে কথা বলবে না। এখন বের হও আমার রুম থেকে৷ কারো রুমে কিভাবে ঢুকতে হয় তার ক্লাস করে এসো আগে।”
রাগে অপমানে রুহির গা পিত্তি জ্বলে উঠলো। পারে না তো সে হিয়াকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। রুহির সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতে থাকে। কিন্তু সে কিছুই করতে পারে না। ওদিকে হিয়া ও রুহিকে সম্পুর্ন উপেক্ষা করে ওয়াশরুমের কাছে গেল। রুহির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো সে। এরপর ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে একটু ন্যাকামি করে বলে উঠলো,
“জান? ও জান হয়েছে তোমার? আমাদের লেইট হচ্ছে তো।”
রুহি রাগে কটমট করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে গেল। এর একটা হেস্তনেস্ত না করা পর্যন্ত সে আর শান্তি পাবে না।
রুহি চলে যেতেই হিয়া তটস্থ হলো। সে কি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেললো? না না সে কিভাবে বাড়াবাড়ি করলো? তাকে তো প্রতিশোধ নিতেই হতো এবং হবেও। তাকে ঠকানো? এতো সহজে হিয়া ছেড়ে দেবে নাকি? কখনোই না। নাফির সাথে বিয়ের চক্করে সে এসব ভুলে গেলেও তার তো প্রকৃত অর্থে লাভই হয়েছে। এখন সবকিছু সহজ হয়ে যাবে তারজন্য। বরঞ্চ তাকে আগলে রাখার জন্য একটা নাফি ও এসে পড়েছে।
হিয়ার এসব ভাবনার মাঝেই নাফি বের হলো ওয়াশরুম থেকে। নাফিকে বের হতে দেখে হিয়া স্থির হয়ে দাঁড়ালো। নাফি হিয়ার কাছাকাছি এসে হাস্কি স্বরে বলল,
“কি বলছিলে একটু আগে?”
হিয়া ভাঙা কন্ঠে বলল,
“ক..কই ক..কিছু ন..না তো?”
নাফি একপা একপা করে এগিয়ে গেল হিয়ার দিকে। আর হিয়াও একপা একপা করে পিছনে সরতে লাগলো। নাফি ফের বলল,
“জান ও জান? এরকম কি যেন শুনলাম মনে হলো!”
হিয়া নাফির কথা নাকচ করে দিয়ে বলল,
“না না আমি ওভাবে বলিনি তো।”
“ও তাহলে মানছো তুমি আমাকে জান বলেছো? আর সাথে তুমিও।”
“না না মানে হ্যাঁ মানে না মানে…!”
“কি মানে মানে করছো? বললেই বা কি? পর মানুষকে তো আর বলোনি। বলেছো তোমার স্বামীকে। তোমার সবচেয়ে আপন ব্যক্তিকে।” কিছুক্ষণ থেমে নাফি আবারও বলল,
“বাই দা ওয়ে ময়না থ্যাংকস।”
“কিসের জন্য?”
নাফি বলল,
“ওই যে তুমি আগের মতো প্রতিবাদী হয়েছো। অন্যায় কখনো মেনে নিও না পাখি। আমি তোমার পাশে আছি, তোমার ভয় নেই কোনো। অন্যায় হলেই প্রতিবাদ করো।”
“আচ্ছা।”
“কি আচ্ছা?”
হিয়া দেয়ালের সাথে লেপ্টে গেছে৷ নাফি লুইচ্চা বেডা ফের হিয়ার সামনে এলো। আবারও বলল,
“কি আচ্ছা?”
হিয়া জবাবে বলল,
“দেরি হয়ে যাচ্ছে। আম্মু অপেক্ষা করবে তো।”
এটা বলে সে নাফিকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। লাজুক হেঁসে দৌড়ে বের হয়ে গেল রুম থেকে। হিয়াকে ওভাবে যেতে দেখে নাফি মাথার চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে হাসলো। মানিব্যাগ, ফোন, চাবি নিয়ে বের হলো রুম থেকে।
রুহি ধাক্কা দিলো রাজকে৷ হিংস্র হয়ে রাজের কলার চেপে ধরলো। খেঁকিয়ে বলল,
“কাপুরুষ তোকে এইজন্য বিয়ে করেছিলাম আমি? গিয়ে দেখ তোর ভাই আর ভাবি কিভাবে রোমান্স করছে। আমি হিয়াকে শেষ হতে দেখবো বলে তোর মতো লুজারকে বিয়ে করেছিলাম৷ অথচ ও এখন…..!”
কথা শেষ করার আগেই রাজ রুহিকে নিজের থেকে সরিয়ে নিলো। ঠাটিয়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো রুহির বাম গাল বরাবর। নিজেও রুহির মতো উশৃংখল হয়ে বলল,
“তোর মতো শয়তানকে কে বিয়ে করে রে? আমার ঠ্যাকা পড়েনি তোর মতো অমানুষ কে বিয়ে করার জন্য। তুইই তো এসে রিকুয়েষ্ট করেছিলি আমার সাথে হাত মেলাবি।”
“কথাবার্তা ঠিক ভাবে বলো।”
রাজ অগ্নিচক্ষু নিয়ে এগিয়ে গেল রুহির দিকে। রুহির গলা চেপে ধরে বলল,
“ঠিক ভাবে কি বলবো রে? তোরে বিয়ে করার জন্য আমি কাঁদছিলাম? এসে জুটেছিল কেন আমার কপালে?”
রাজ বেশ জোরেই ধরেছে। যার জন্য রুহির শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। দম বন্ধ হয়ে এলো তার৷ ছটফট করতে লাগলো ছাড়া পাওয়ার জন্য। রুহির অবস্থা দেখে রাজ ছেড়ে দিলো রুহিকে। ছেড়ে দিয়েই ক্ষ্যান্ত হলো না। রুহির চুল গুলো পেছন থেকে মুঠি বদ্ধ করে ধরলো। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“আমাকে কথা শোনানোর আগে নিজের দিকে তাকিয়ে নিবি।”
রুহির চোখের কোনে অশ্রু জমলো। সে ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো।
“আমার লাগছে রাজ। ছেড়ে দাও আমাকে।”
রাজ ছেড়ে দিলো রুহিকে। এরপর সে নিজেই নিজের কাজে অবাক হলো। শেষমেশ বউয়ের গায়ে হাত তুললো সে? একমুহূর্তে মনে পরলো রুহির কাছে তার বিরুদ্ধে প্রমান আছে। রুহি যে রাগীর রাগী দেখা গেল তার উপরে রেগে গিয়ে থানায় গিয়ে দিয়ে এলো সব। এজন্য রাজ কেমন নির্লজ্জের মতো রুহিকে নিজের কাছে টেনে নিলো। চোখের পানি গুলো মুছিয়ে দিয়ে বলল,
“আ’ম স্যরি রুহি। মাথাটা ঠিক রাখতে পারিনি। ওদের তো সবে বিয়ে হলো। আমি বলেছি কিছু করবো না? করবো তো। একটু সময় দাও আমাকে৷ প্লিইইজ!”
রুহি গললো না রাজের কথায়। সে পুনরায় রাজের কলার চেপে ধরে বলল,
“প্রথমবার এজন্য কিছু বললাম না। এই স্পর্ধা যদি দ্বিতীয়বার দেখাতে যাও, আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না বলে দিলাম।”
রুহির হুমকিতে রাজ ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়লেও সামনাসামনি গোবেচারার মতো ভাব করে থাকলো। মনে মনে বলল,
“শুধু হিয়া না তোরও ব্যবস্থা করবো ডাইনি। জাস্ট ওয়েট এন্ড সি!”
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় নাসিমাকে সত্যিটা বলেই এসেছে সে। নাসিমা কোন মাইন্ডই করেনি। আরও হিয়াকে উৎসাহ দিয়েছে। কোনো ভয় নেই। সে যেন তার মায়ের সাথে নির্ভয়ে দেখা করতে পারে।
নাফি আজকে প্রেয়সীকে নিয়ে বাইকে বের হলো। নাফি বাইক চালাচ্ছে নরমাল ভাবেই। হিয়া নাফির পেছনে বসে নাফিকে ধরলো না। হিয়া বাইকের পেছনে অর্থাৎ তার পাশের অংশটা ধরলো। নাফি প্রথমে ব্যাপারটা নিয়ে কিছু না বললেও কিছুক্ষণ পরে বলল,
“আমাকে ধরে বসো ময়না।”
নাফির কথা শুনে হিয়া নিজের হাত সরিয়ে এনে নাফির কাঁধে রাখলো। এতে মন ভরলো না নাফির। সে বলল,
“এভাবে না। আমার দিকে এগিয়ে এসে, আমাকে জড়িয়ে ধরো।”
হিয়া হকচকালো। পাবলিক প্লেসে ধরতে তার লজ্জা করবে না বুঝি? কিন্তু নাফির কথা না করতে পারলো না। একটা ইতস্তত ভাব নিয়ে সে নাফিকে জড়িয়ে ধরে বসলো। তখনই মনে পরলো তারা তো তার মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় দেখা করবে? বিয়ের হলে তো তিনদিন পরই যেতে হয় বাপেরবাড়ি। তার তো সবে একদিন হলো। তাহলে? হিয়া নাফিকে বলল,
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৩
“আচ্ছা আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“আম্মুর সঙ্গে দেখা করতে। আর কিছুক্ষণ লাগবে৷”
নাফি একসাথে দুইটা উত্তর দিয়েছে। তাই হিয়া আর কোনো প্রশ্ন খুঁজে পেলো না। চুপচাপ বসে রইলো।
