লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৬
অহনা রহমান
পরদিন সকালবেলা রুহির বাবা কামরুল এবং রুহির এক মামা মিজান আসলো নাফিদের বাড়িতে। হিয়াদের ফেরানি নিতে। তারা বাড়ির দুই জামাই মেয়েকেই নিতে এসেছে। এমনিতে তো হিয়াদের যাওয়ার কথা৷ কিন্তু হিয়ার বিয়ের সময় যেহেতু রাজ রুহি ছিলো না। তাই সবার সিদ্ধান্তে ঠিক হলো যে দুই রুহিরাও যাবে ও বাড়িতে।
ওই বাড়ি থেকে লোক আসতে আসতে বেজে গেল সকাল দশটা। নাসিমা আজও কলেজে ছুটি নিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করলেন। কামরুলরা ঠিক করলেন, তারা থাকবেন না৷ পরে একসময় এসে ঘুরে যাবেন। কিন্তু আজ থাকবেন না। সামান্য কিছু নাস্তা করলেন তারা। ওদিকে দুই মেয়ে জামাইকে তাগাদা দিতে থাকলেন তৈরী হওয়ার জন্য। দুপুরের খাবার ওই বাড়িতে গিয়েই খাবেন৷
হিয়াকে তৈরি হতে সাহায্য করছে নাফি। এই যেমন হিয়ার শাড়ির কুঁচি ধরে দিচ্ছে। তো আবার হিয়ার গলায় গয়না পড়িয়ে দিচ্ছে। আবার কখনো চুলগুলো ঠিক করে দিচ্ছে। এর একটা কথাও হিয়ার নাফিকে বলে দিতে হচ্ছে না। নাফি কেমন পটু হাতে সব বুঝে বুঝে করে দিচ্ছে। হিয়া যে পারছে না, একথা ও বলা লাগছে না৷ নাফির প্রতিটি কেয়ার হিয়ার ভালো লাগলেও, এইবারে হিয়া অবাক হলো। হবে না? এতো মেয়েলি কাজ নাফি কোথা থেকে জানলো? কেমন পটু হাতে সব বুঝে বুঝে, নির্ভুলভাবে হিয়াকে গুছিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বিষয়ে সে এক্সপার্ট। হিয়ার মাথায় কথাটা গেঁথে গেল। হিয়া ভাবলো নাফিকে জিজ্ঞেস করবে কথাটা। কোথা থেকে নাফি শিখলো এতসব? পরক্ষণেই ভাবলো, নাহ সে তো নতুন বউ। এখনই যদি এতসব খবর নিতে যায় তাহলে হয়তো নাফি মাইন্ড করবে৷ হিয়া মনে মনে নিজেকে মানিয়ে তো নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তার মাথায় ঘুরতে থাকলো এই বিষয়টা। চোরা চোখে কয়েকবার তাকালোও নাফির দিকে। কিন্তু জড়তা কাটিয়ে আর বলা হলো না।
হিয়া শাড়ি পড়েছে খয়েরী রঙের। নতুন বউ তো! লাল, খয়েরী না পড়লে কেমন অসম্পূর্ণ মনে হবে। সব গোছানো হয়ে গেছে তার৷ শুধু একটু মেকআপ বাকি আছে৷ সেটাই হিয়া ডেসিন টেবিলের সামনে বসে করছে৷ আর নাফি খাটের উপর বসে গালে হাত দিয়ে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হিয়ার দিকে। হিয়া তখন কপালে টিপ পড়ছে। আয়নার দিকে তাকাতে গিয়ে হঠাৎ নাফির চোখে চোখ মিললো হিয়ার। হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে হাসলো কেবল। কিন্তু নাফির চোখের পলক নড়ে না মোটেও। সে নির্বিঘ্নে চেয়ে আছে৷ না আছে কোন তাড়া আর না আছে কোনো ব্যস্ততা৷
প্রথমবার চোখে চোখ মেলার পর হিয়ার অবাধ্য চোখ জোড়া বারবার চলে যাচ্ছে নাফির দিকে৷ খুব করে চাইছে, ওই চোখে কি আছে দেখতে৷ হিয়া পড়লো অস্বস্তিতে। কেননা, কেউ যদি বুঝতে পারে তার দিকে কেউ একজন একনাগাড়ে তাকিয়ে আছে। তাহলে কেমন অদ্ভুত লাগে নিজের কাছে নিজেকে৷ হিয়ারও লাগছে৷ সে বারবার দেখছে নিজেকে। কোথাও তাকে বাজে লাগছে না তো? নাহলে নাফি ওভাবে তাকিয়ে কেন থাকবে? হিয়া অনেকক্ষণ খুঁজেও যখন কিছুই পেল না। তখন আয়নার মাঝে নাফির চোখে চোখ রাখলো সে। বহুকষ্টে বলল,
“কি দেখছেন অমন করে?”
নাফি সেকেন্ডের মাঝেই উত্তর দিলো,
“আমার নিজস্ব চাঁদটাকে দেখছি। যার অপরূপ সৌন্দর্যে আমার অন্তর পুড়ে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়।”
কথাটা যেন নাফির গোছানো ছিলো। তাই সে হিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই উত্তর দিয়ে দিলো। এতে নতজানু হলো হিয়া। এভাবে কেউ প্রসংশা করে নাকি? বলতেই হবে তার জামাই একটু অন্যরকম আছে। এদিক থেকে হিয়া নিজেকে ভাগ্যবতীই ভাবে৷ হিয়া প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
“একটা কথা বলি?”
নাফি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল হিয়ার দিকে। হিয়ার একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো সে৷ নরম কন্ঠ শুধালো,
“কি জানতে চান সুলতানা? আপনার খেদমতে সবসময়ই আমার জান’টাও কুরবান করতে পারি।”
হিয়া কেশে উঠলো। এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? সে যাইহোক! হিয়া নিজের উশখুশ মেটাতে বলেই ফেললো,
“এই যে আপনি আমাকে তৈরী হতে হেল্প করলেন। এতসব আপনি কিভাবে শিখলেন?”
নাফি চমকে উঠে, চোখ বড় বড় করে হিয়ার দিকে তাকালো৷ নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তার। হিয়া এতগুলো কথা তার সাথে বলল? তাও কোনো কাঁপাকাঁপি ছাড়া? বাহ! ওদিকে নাফির অমন চমকিত চেহারা দেখে হিয়া ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। সে তো বলতেই চাইছিলো না। কিন্তু এটা জানতে না পারলে যে তার শান্তি হবে না। তাই জিজ্ঞেস করতেই হলো। কিন্তু এভাবে তাকানোর কি আছে? নাফি কেন এভাবে তাকিয়ে আছে?
“না মানে অনেক মেয়েরাও আছে যারা এতসব গুছিয়ে করতে জানে না। সেখানে আপনি পার্ফেক্ট করেছেন সব। তাই বললাম।”
নাফি হিয়ার সামনে গিয় বসলো। ডেসিন টেবিলের উপরে আরকি৷ তারপর হিয়ার চিবুক উঁচু করে ধরলো। মুগ্ধ নয়নে খুব কাছে থেকে, আবারও দেখে নিলো হিয়াকে। হিয়ার কথার জবাব না দিয়ে গেয়ে উঠলো,
“প্রথমও যৌবনের কালে যেদিন তোমায় দেখেছি৷ এ দেহ পিঞ্জিরার মাঝে আপন করে রেখেছি…..!!”
হিয়া আরেক দফায় হতবাক হয়ে গেল৷ বিস্ময়ে চোখ দুটো বড়বড় হয়ে এলো। যেন কোঠর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। এমন অবস্থা হবে না? নাফি যে এত সুন্দর গান গাইতে পারে তা তো সে জানতোই না৷ আর তার তো বুঝতে সময় লাগেনি নাফি তাকেই উদ্দেশ্য করে গানটা গেয়েছে। হিয়ার রসগোল্লার মতো মুখটা তখনও নাফির হাতে৷ সে দেখেছে হিয়ার বিস্ময়৷ মনে মনে হাসলো নাফি। এরপর দুহাতে হিয়ার গালদুটো টেনে দিয়ে বলল,
“আমি তো জানতাম তোমাকে বিয়ে করবো। আর এটাও জানতাম তুমি সাজতে পছন্দ করো। গুছিয়ে থাকতে ভালোবাসো। তাই ইউটিউব দেখে শিখে নিয়েছি সব।”
কথাটা বলে নাফি আর বসলো না সেখানে। এখনই যেতে হবে। দেখা যাক নিচের দিকে কি অবস্থা। হতবিহ্বল হিয়াকে রেখে নাফি চলে গেল রুম ছেড়ে৷ আর বোকাসোকা হিয়া ভাবতে লাগলো, তাকে নাফি বিয়ে করবে এটা ওই লোক আগে থেকেই জানতো?
বেশি কিছু ভাবার আগেই নিচে থেকে ডাক এলো। গলা ছেড়ে কামরুল ডাকলেন হিয়াকে৷ হিয়া নিজের ভাবনা-টাবনা সব ফেলে রেখে ব্যাগপত্র নিয়ে দ্রুত নিচে নামলো। দাঁড়ালো নাফির পাশে গিয়ে। দুজনকে কি যে সুন্দর লাগছে…! নাসিমা সহ সকলেই খেয়াল করলো বিষয়টা। হিয়া আর নাফিকে যে কি ভীষণ সুন্দর লাগছে৷ নাসিমা তো বলেই ফেললেন,
“মাশাল্লাহ! আমার ছেলে-বউয়ের দিকে কারো যেন নজর না লাগে৷ তোমরা দুজন সারাজীবন এমন কিউট কাপল হয়েই থেকো।”
ঠিক সেসময় ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হলো রুহি ও রাজ। হিয়া আর নাফির সৌন্দর্যে আর নাসিমার বলা কথাতে রুহি হিংসায় জ্বলতে থাকলো। এখানে এসে হিয়াকে দেখতেই সে বিরক্ত হলো। তবে কিছু বলতে পারলো না এই হচ্ছে আফসোস তার। ওদিকে রাজ আবার হিংসায় জ্বলছে না। সে জ্বলছে হিয়ার পাশে নাফিকে দেখে। হিয়ার পাশে নাফিকে জাস্ট সহ্য হচ্ছে না রাজের। ও বিরক্ত চোখে ওদের দিকে চেয়ে আছে।
এদিকে নাফিও কম যায় না। ও বুঝতে পারলো রাজ রুহির জ্বলন৷ তাই যাওয়ার সময়ে সে, হিয়ার হাত ধরে নিয়ে গেল। যেন হিয়া ছোট কোনো বাচ্চা, হাত ছাড়লেই আছাড় খাবে। এসব দেখে রাজের হাত মুঠো হয়ে গেল আপনাআপনি।
রাতের খাবার খেয়ে হিয়া নাফি রুমে এলো মাত্র। দুপুরের দিকে এসে খেয়েদেয়ে রেস্ট নিয়েছে। বিকেলে উঠে একটু একটু বাহিরের দিকে ঘুরতে গিয়েছিলো নাফি৷ সাথে অবশ্য হিয়াও ছিলো। হিয়ার এলাকায় এসেছে এজন্য হিয়াকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলো সে। সন্ধ্যায় বসে হিয়ার কাজিনদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা দিয়েছে নাফি। যদিও সে আড্ডা দেওয়ার মতো মানুষ নয়৷ তবুও রাজ ছিলো না বলেই সে একটু গল্প করেছে। নাহলে ব্যাপারটা কেমন যেন দেখায়। নাফির সাথে রাজের দেখা হয়েছে রাতে খাওয়ার সময়ে। এজন্য মাঝখানে আর কোনো ঝামেলা ঘটেনি। তবে এরমধ্যে একটা ঝামেলা হিয়ার সাথে আর রুহির সাথে বেঁধেছে। সন্ধ্যায় যখন হিয়া ও নাফি হিয়ার কাজিনদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো তখন সেখানে রুহিও ছিলো। আর এই সুযোগটায় কাজে লাগিয়েছিলো হিয়া। রুহি যেমন করে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে রাজের প্রসংশা করেছিলো৷ সেও আজ এমনই করেছে।
এই যেমন, নাফি উঠে একটু কল রিসিভ করতে গেছিলো৷ সেসময় রুহিও এসেছে। হিয়া রুহিকে শুনিয়ে শুনিয়ে তুবাদের বলল,
“আরে তোদের ভাইয়া তো আমাকে ময়না সোনা ছাড়া বলেই না৷” তুবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই তুবা তুই দেখেছিস না, তোর ভাইয়া কেমন করে৷ আর বলিস না আমাকে এত্তো কেয়ার করে। জানিস আমার কি মনে হয়? জীবন থেকে দুইটা ইবলিশ হারিয়েছি তার বদলে আল্লাহ তায়ালা আমাকে একজন শুদ্ধ মানুষ দিয়েছে। যার কাছে সবার আগে আমার খুশি।”
রুহি রুক্ষ স্বরে তুবাকে বলল,
“আচ্ছা তোরা অন্যের জামাইয়ের কথা কেন শুনছিস? প্রথম প্রথম এমন কত দেখাবে৷ পরেই না বোঝা যাবে কে কেমন। তুবা এসব খুচরা আলাপ কিভাবে শুনছিস বলতো? আমার তো জাস্ট বিরক্ত লাগছে।”
হিয়া রুহির কথা হেঁসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“তুবা যে যা পাই না তাই শুনলেই রাগ লাগে বল? হিংসা হয়৷ সে যাইহোক! জানিস আমি তো মাঝেমধ্যে তোর ভাইয়ার কেয়ার, ভালোবাসা দেখে বিরক্ত হই। এতো কেউ কাউকে ভালোবাসে?”
ঠিক তখনই নাফি এলো। এবং হিয়ার শেষ কথাটা সে শুনলো। মনে মনে দুঃখ পেল নাফি। তবে হিয়াদের কাউকে বুঝতে দিলো না। সে আবারও গিয়ে ওখানে বসেছিলো। তবে আগের মতো আর আড্ডা সে দিতে পারলো না৷ হিয়া যে তার ভালোবাসাতে বিরক্ত হয় এটা তো সে কল্পনাও করতে পারেনি৷ ঠিক তখনই হচ্ছে রাতের খাবারের জন্য ডাকা হয়৷ ডিনার সেরে হিয়া ও নাফি সবে রুমে এসেছে।
হিয়ার রুমটা পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। নাফি বিষন্ন মনে বসে রইলো চেয়ারের উপর। গায়ের শার্ট টা খুলে একটা টিশার্ট জড়ালো নাফি। হিয়ার দিকে সে আর তাকালো না আগের মতো করে৷ হিয়া প্রথমে এসব এতটা গুরুত্ব না দিয়ে নিজের মতো বিছানা গোছালো। মশারি খাটিয়ে সব গোছগাছ করে নাফির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো সে। কিন্তু নাফি হিয়াকে তোয়াক্কা করলো না তেমন। নিজেই অন্যপাশ দিয়ে খাটে শুয়ে পড়লো। এতে হিয়া ভীষণ ভাবে চমকালো। নাফি কি তাকে ইগনোর করছে? নাফির মুখের সেই হাসিটাও এখন আর নেই। এমনকি নাফি বিছানায় শুয়ে হিয়ার দিকে পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে থাকলো৷ সে ও বা কি করবে? একপাক্ষিক কোন কিছুই হয় না। আর যেখানে হিয়া বিরক্ত হয় সেখানে নাফির সেধে গিয়ে এতটা ভালোবাসা মানায় না। এখন থেকে নাফি নিজেকে ঠিক সামলে নেবে৷ হিয়াকে ভালোবাসবে না এমন না৷ ভালো ঠিকই বাসবে আগের মতো করেই। কিন্তু এখন আর দেখাবে না তা।
হিয়া কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না৷ সে খাওয়ার টেবিলেও দেখেছে নাফি একেবারের জন্যও তাকায়নি তার দিকে। হিয়া মনে মনে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়লো। এই মানুষটার এই এক ঘন্টার অবহেলা যে হিয়াকে দারুণ কষ্ট দিচ্ছে। প্রতি মুহুর্তে হিয়া নিজেকে অসহায় অনুভব করছে নাফির সামনে। হিয়া শুয়ে পড়লো নাফির পাশে। নিজেকে ধাতস্থ করে সে নাফির কাঁধে হাত রাখলো। বিয়ে যখন হয়েছে সে নাফির স্ত্রী। সে নাফিকে মেনে নিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক করতে হবে৷ নাহলে যে ঘোর সর্বনাশ! হিয়া তা হারে হারে টের পাচ্ছে। নাফি নিশ্চিত কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়েছে যেটা হিয়া জানে না।
হিয়া নাফির কাঁধে হাত রেখে কোমল গলায় বলল,
“শুনছেন?”
হিয়া যতটা কোমল স্বরে কথা বলেছে তার চেয়ে দ্বিগুন নরম কন্ঠে নাফি বলল,
“হ্যাঁ বলো হিয়া।”
নাফির মুখ থেকে হিয়া নিজের নাম শুনে অসন্তুষ্ট হলো। একমুহূর্তে তার ভীষণ কান্না পেল। পাবে না? নাফি কি তার নাম ধরে কখনো ডাকে? এই নামে সেই নামে ডাকে তাকে। হিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরলো। নরম মনের মেয়েটা সামান্য কিছু হলেই কান্না করে দেয়। এবারেও কান্না করবে করবে ভাব। ও তখন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“আপনি কি রেগে আছেন আমার উপর?”
নাফি হিয়ার কন্ঠ শুনেই বুঝতে পারলো মেয়েটা আরেকটু হলেই কেঁদে ফেলবে। এজন্য নাফি দ্রুত পাশ ফিরে হিয়ার দিকে তাকালো। হিয়ার চোখে পানি দেখে তার প্রচন্ড খারাপ লাগলেও সে বলল,
“রাগ করিনি হিয়া। তুমি তো আমার ভালোবাসাতে বিরক্ত হও। তাই…..!”
নাফির কথা শেষ হওয়ার আগে হিয়া ক্ষীণ কন্ঠে কান্না বিজরিত হয়ে বলল,
“আপনি ভুল ভাবছেন। আমি রুহি আপাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওই কথা বলছিলাম।”
নাফি হিয়ার কথা শুনে বেশ অবাক হলো। হিয়ার কথাতে সে বুঝতে পারলো আসল ঘটনাটা। তারই ভুল হয়েছে। তবে নাফি এখানে একটা ট্রিকস খাটালো। সে দমে গেল না হিয়ার সামনে। বলল,
“ওহ বুঝতে পেরেছি।”
হিয়া রক্তিম চোখ নিয়ে তাকালো নাফির মুখপানে। মানুষটা কি এখনো রেগে আছে? হিয়া তো বুঝতেই পারেনি তখনের ওই কথা ধরে রেখে মানুষটা তার সাথে এমন করছে। হিয়া তো এখন বললোই সবটা। তাহলে? হিয়া বিচলিত হয়ে বলল,
“আপনি বুঝেছেন আমি কি বলেছি? আমি ওভাবে মিন করিনি। আমি শুধু….”
“হ্যাঁ থাক! বুঝতে পেরেছি আমি।”
“তাহলে এমন ব্যবহার কেন করছেন আমার সঙ্গে?”
“আগের দিন একটা অনুমতি চেয়েছিলাম তোমার কাছে। দাওনি তো তুমি। যদি তোমার কথা সত্যি হতো তাহলে, ওইদিন আমাকে অনুমতি দিতে।”
হিয়ার মনে পড়লো না নাফি কোন কথা বলছে৷ এতক্ষণে সে একটু হলেও স্বাভাবিক হতে পেরেছে। এজন্য ফটাফট বলল,
“কি অনুমতি? আমার তো মনে পড়ছে না।”
নাফি সময় ব্যায় না করে বলে উঠলো,
“ক্যান আই কিস ইউর লিপস?”
হিয়ার কান আবারও ঝা ঝা করে উঠলো। এই লোক কিসের মধ্যে কি ঢুকিয়ে দিলো? হিয়া লজ্জায় হাঁশফাঁশ করতে করতে উল্টো দিকে ফিরে গেল। এতে নাফি হতাশ শ্বাস ফেললো। তার বউটা যে কবে একটু লজ্জা ভাঙতে পারবে কে জানে! নাফি বলল,
“দেখেছো তুমি অনুমতি দাওনি। সেদিনও পালিয়েছিলে। তার মানে আমি যা বলেছিলাম তাই সঠিক৷ তুমি সত্যিই বিরক্ত হও।”
হিয়া শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লজ্জা কমানোর বৃথা চেষ্টা করলো। সে মনে মনে কিছু একটা ভেবে বলে উঠলো,
“আমি অনুমতি দেয়নি কিন্তু কখনো বারন ও তো করিনি।”
নাফি ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো। লাফ দিয়ে সে হিয়ার উপরে উঠলো। হিয়াকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“কি বললে আবার বলো ময়না৷ প্লিইইজ। দ্যাট মিনস আমার যা খুশি করতে পারবো? কোনো বাঁধা নেই?”
হিয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ লুকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
“উহুম বাঁধা নেই।”
“ওকে তাহলে আর কি? সমস্যা নেই৷ মেয়েরা তার শশুরবাড়িতে বাসর সারে৷ এই প্রথমবার জামাই তার শশুরবাড়িতে বাসর করবে। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং আছে!”
এবারে নাফিকে আর পায় কে? সে এক সেকেন্ড ও অপেক্ষা করলো না। প্রথমবারের মতো, পবিত্র ভাবে নিজের রুক্ষ ঠোঁটজোড়া মেলালো হিয়ার নরম ঠোঁটে। গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিলো তা। কিছুক্ষন পর গলায়৷ এবং এমন উষ্ণ স্পর্শে ভরিয়ে দিলো লাজুক হিয়াকে। হিয়া খামচে ধরলো নাফির পিঠের কাছটা। আপন করে নিলো নাফির দেওয়া প্রথম ভালোবাসার মুহুর্ত টুকু। নিজের স্বামীর কাছে বিলিয়ে দেয় নিজের সবটুকু।
নাফি শুধু এতেই ক্ষ্যান্ত হয় না। তার এলোমেলো হাত ছুঁয়ে দেয় হিয়ার শরীরের বিভিন্ন অংশ। ধীরেধীরে দুরত্ব ঘুচতে থাকে দুজনের। একটা সময় দুজনে হারিয়ে যায় ভালোবাসার এক অতল গহ্বরে। সূচনা হয় হিয়ার জীবনের নতুন অধ্যায়।
তখন হয়তো সকাল ছয়টা৷ হিয়া ভেজা চুল গুলো মুছতে মুছতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। লম্বা চুলগুলোকে তোয়ালে দ্বারা ঝাড়তে লাগলো মেয়েটা। রুহির রুম আর হিয়ার রুম পাশাপাশি। হিয়ার ব্যালকনির পাশেই রুহির ব্যালকনি। চুল মুছতে মুছতে হিয়ার চোখ গেল রুহির ব্যালকনিতে। যা দেখলো তাতে হিয়ার চক্ষু ছানাবড়া। রাজ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রাজকে এত সকালে ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেনি সে। হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে রাজের দৃষ্টি অনুসরণ করে গলার কাছে হাত রাখলো। হিয়া বুঝতে পারলো এগুলো নাফির দেওয়া সোহাগের চিহ্ন। হিয়া ওরনা দিয়ে দ্রুত লোকালো তা। ভাবলো ব্যালকনি ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু তার আগেই নাফি ডাকলো তাকে। হয়তো সে আসবে এখানে। সে যেমন ডাকে ওভাবেই ডেকে বলল,
“ময়না কই তুমি?”
হিয়া রাজের দিকে আর ফিরেও তাকালো না। ওকে না দেখার ভান করে, ওকে জ্বলানোর জন্য এবং নাফি যাতে এখানে আসতে না পারে৷ সে বলে উঠলো,
“হ্যাঁ জান আসছিইই।”
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২৫
হিয়া আর দাঁড়ালো না একমুহূর্তও৷ রাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফটাফট কেটে পড়লো সেখান থেকে৷ রাজ পাশের ব্যালকনি থেকে দেখে গেল সবটা৷ হৃদয়ে সুক্ষ্ম যন্ত্রণা অনুভব করলো। কেন এ যন্ত্রণা সে জানে না। সারারাত রুহিটার সাথে ঝামেলা হয়েছে। এখন সকালে একটু এসেছিলো, সকালের হাওয়া খাওয়ার জন্য। হিয়া এসে বেচারাকে যে হাওয়া খাইয়েছে, তা হয়তো এ জীবনে ভুলতে পারবে না সে।
