লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৯
অহনা রহমান
রুহি ও হিয়ার পিছনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে রাজ। রুহি হিয়াকে ধাক্কা দেবে সেই উত্তেজনায় রাজকে খেয়াল করেনি৷ ওদিকে হিয়া ও নিচে মাকে দেখে আর কোনো দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখেনি। চঞ্চলা হরিনী হিয়া নিচে পা বাড়ালো। অলৌকিক ভাবে রাজ হয়তো কিছু বুঝতে পেরেছিলো। ও এক লাফে দুই সিঁড়ি ডিঙিয়ে হিয়ার পাশাপাশি গেল। রুহি নিজের সর্বশক্তিতে ধাক্কা মারতে নিলো হিয়াকে। ঠিক সেসময় রাজ হিয়ার হাত টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। রুহিও তাল সামলাতে পারলো। হিয়াকে ধাক্কা মারতে গিয়ে নিজেই পড়লো মুখ থুবড়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে গেল। রুহির চিৎকারে ঘরের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। ওর নাক-মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
হিয়া ভয় পেল রুহির অবস্থা দেখে। ও কার কাছে তা বুঝতে পারলো না। রাজের বুকের কাছটায় খামচে ধরে, ভয়ে মুখ লুকালো। কিন্তু এই ঘটনার এক মিনিটও অতিক্রম হতে পারলো না। তার আগেই চিলের মতো ছো মেরে রাজের কাছ থেকে হিয়াকে ছিনিয়ে নিলো নাফি। সেকেন্ডের মাথায় হিয়াকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। বুকের উপর চেপে ধরলো হিয়ার মাথা। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে তার। নিচে ততক্ষনে হৈচৈ পরে গেছে। নাফি শক্ত কন্ঠে রাজকে বলল,
“আমার বউকে তোর দেখতে হবে না। নিচে তোর বউ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে৷”
যদিও নাফি জানে না এখানে আসলে কি ঘটেছে। ওর তো হিয়াকে রাজের কাছে দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। রাজকে কথাটা বলে আবার শান্ত ভাবে হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আদুরে স্বরে বলল,
“কিছু হয়নি বেইবি রিলাক্স।”
রাজ বেশি কথা বাড়ালো না। এখনই নাফির কাছে এক্সপ্লেইন করতে গেল না সব। দৌড়ে নিচে গেল সে। ততক্ষণে রুহি ব্যাথায় জ্ঞান হারিয়েছে৷ উৎসবের আমেজ মুহুর্তেই শোকে পরিনত হয়েছে। রুহির মা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওর বাবা ও ছিলো। যতই রাগ থাকুক মেয়ের এমন দশায় তারা স্থির থাকতে পারলেন না। রুহির মা ভদ্রমহিলা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। রাজ নিচে নেমে রুহিকে পাঁজা কোলে করে তুললো।
“ ওকে হসপিটালে নিতে হবে এক্ষুনি।”
কথাটা বলেই রাজ, নাসিমা সহ আরও কয়েকজন ছুটলো সদরদরজার দিকে।
“রুহি আপা কিভাবে পড়লো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
“তুমি ঠিক আছো বেইবি? আর কারো কথা তোমার চিন্তা করতে হবে না।”
“কি বলছেন? রুহি আপা আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। ও বলেছে রাজের সাথে ও সংসার করবে। নিজেকে বদলে ফেলবে ও।”
হিয়ার কথা শুনে নাফি অবাক’ই হলো। সে সবটা জানতে চাইলো হিয়ার কাছে। হিয়া ও আস্তেধীরে সবটা বললো নাফিকে। সব শুনে নাফির কেমন যেন খটকা লাগলো। একটা মানুষ হুট করেই পরিবর্তন হতে পারে? কেন যেন নাফির বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুই। আর রুহি হঠাৎ’ই পরলো কিভাবে?
নাফি বসে আছে ডাইনিং টেবিলের পাশের চেয়ারে। তার দুই উরুদেশের উপর বসে আছে হিয়া। বাড়িতে তখন কেউই নেই৷ সবাই গেছে হসপিটালে। নাফি বলল,
“আচ্ছা, এখন রুমে যাও। ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নাও ।”
“তৈরি হবো কেন? রুহি আপার এই অবস্থায় বাড়িতে অনুষ্ঠানে করা কি ঠিক হবে?”
“রুহির তেমন কিছুই হয়নি। শুধু তিনটা দাঁত ভেঙেছে সামনের। কপালের কাছটায় খানিকটা কেটেছে। আর হাত-পা ভেঙেছে হয়তো।”
হিয়া হতবাক হয়ে গেল৷
“এগুলো আপনার কাছে সামান্য মনে হচ্ছে?”
“ও যেটা করেছে তার শাস্তি হিসেবে এটা খুবই সামান্য৷ সত্যি বলতে আমার একটুও সহানুভূতি কাজ করছে না।”
অন্য সময় হলে হয়তো হিয়ারও এমন হতো। কিন্তু রুহি তো ক্ষমা চেয়েছে’ই। একটা মানুষ মন থেকে ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করতে হয়। এটাই তো শিক্ষা! অবশ্য কে মন থেকে আর কে উপরে উপরে ক্ষমা চাইছে এটা তো আর সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। এখন আর এসব বলা ঠিক না। হিয়া দু’হাতে নাফির গলা ও ঘাড় ধরলো। নাফির কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
“ও তো ভালো হয়ে গেছে। এমনকি আমার পায়ে ধরে পর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছে। দেখুন, মানুষ চাইলেই কিন্তু পবিত্র হতে পারে। যেমনটা রাজ হয়েছে।”
“আমি তোমার মতো এতো দয়ালু নই রোদ্দুরী। আমার স্ত্রীর প্রতি ওর করা সমস্ত অন্যায়ের কথা আমার মনে আছে৷ আর থাকবেও। তাছাড়া তুমি বললে না, ও তোমার পায়ে ধরেছে? জানো তো, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ! আমার কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এসব। রুহির করা সবকিছুই অভিনয় মনে হচ্ছে।”
নাফির কথা শুনে হিয়ার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো। সে এতসব জানে না বোঝে না। তবে তার যে একটুও অবাক লাগেনি এমনও নয়।
“ এখন যাও তৈরি হও। সকলে এসে পড়বে আবার।”
হিয়ার কপালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে কথাটা বললো নাফি। হিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগে ঘর কাঁপিয়ে নাফির ফোনে কল এলো। ফোনটা নাফির হাতের পাশেই ছিলো। তবুও কল এসেছে বিধায় হিয়া উঠতে গেল নাফির কোল থেকে। কিন্তু নাফি একহাতে ফোন নিয়ে অন্য হাতে হিয়াকে ধরলো৷ আবারও বসালো আগের জায়গায়।
“হ্যাঁ, আম্মু বলো। ওদিকের কি অবস্থা? সিঁড়ির কাছে দেখলাম তিনটা দাত পড়ে আছে।”
নাফির ফোনে কল করেছে নাসিমা। নাফি কল রিসিভ করে উপরিউক্ত কথাটি বললো।
“রুহির অবস্থা ভালো না। উপরের পাটির চারটা দাঁত ভেঙেছে। আরেকটা আছে কোথাও! ছোট কেটেছে। পা সম্ভবত ভেঙেছে। ডান হাত ভেঙেছে। কপাল কেটেছে।”
“আহা! মেয়েটা একটু দেখে শুনে চলবে না৷ এভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়লো! আচ্ছা ওর জ্ঞান ফিরেছে?”
নাফির কথার জবাব নাসিমা সহসাই দিলেন না৷ তিনি চুপ রইলেন খানিকক্ষণ। নাফি ও ব্যস্ততা দেখালো না উত্তর জানতে। যা হয় হোক, তার কি এসে যায়! এই সহানুভূতি শুধুমাত্র লোক দেখানো। খানিকক্ষণ পরে নাসিমা বললেন,
“হিয়া কি তোর কাছেই আছে?”
“কেন আম্মু?”
ভদ্রমহিলা ইতস্তত বোধ করলেন। তবুও তো নাফিকে জানাতেই হবে!
“রুহির জ্ঞান ফিরেছে। ডক্টররা ব্যাথার জন্য ইনজেকশন দিয়েছেন। হাত পা সব ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। সেই সাথে, বলেছেন হসপিটালে ভর্তি না হলেও সমস্যা নেই।”
“তা বেশ ত! বাসায় নিয়ে আসো। মাহবুবা আন্টি তো আছেনই।”
নাসিমা আবারও চুপ রইলেন। এতে নাফি বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই অন্য কিছু ঘটেছে। নাফি চিন্তিত হয়ে বলল,
“আম্মু কিছু হয়েছে?”
নাসিমা বললেন,
“রুহির জ্ঞান ফেরার পর থেকে বলছে, ওকে নাকি হিয়া ধাক্কা মেরেছে৷”
নাসিমার কথা শুনে নাফির চোয়াল শক্ত হলো। হিয়া তখন ইশারায় বলল,
“কি হয়েছে?”
অমনি নাফির রাগটা নিভে গেল। ও আবারও হিয়ার কপালে চুমু খেলো। শান্ত কন্ঠে বলল,
“এটা নিয়ে টেনশন করছো তুমি?”
“আমি জানি হিয়া মামনী কিছু করেনি। কিন্তু রুহির কান্না আর এখানের সমস্ত আত্মীয় স্বজন সবাই’ই রুহির কথা বিশ্বাস করছে। ও প্রচন্ড ভেঙে পড়েছে। হয়তোবা এইজন্যই ভুলভাল বলছে! এটাও সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে হিয়ার মাকে আক্রমনাত্মক কথাবার্তা বলছে ওর চাচিরা। আমি এতো করে বোঝানোর চেষ্টা করছি কিন্তু শুনছে না কেউ। হিয়ার মা নিঃশব্দে কাঁদছেন যেটা আমার মোটেও ভালো লাগছে না বড়ছেলে। তুই এখানে আয় না আব্বা।”
হিয়ার ফোনে কল এলো সেসময়। হিয়া যদিও কোন কথায় শোনেনি নাসিমার। ও নির্বিঘ্নে উঠে গেল ফোন রিসিভ করতে। নাফি মায়ের সাথে কথা বলছে বিধায় খেয়াল করলো না অতটা।
“আম্মু রাজ কোথায়? ও কিন্তু তখন উপরে ছিলো। আচ্ছা, তুমি একটু খেয়াল রাখো আমি আসছি এক্ষুণি।”
“রাজ ঔষধের দিকটা সামলাচ্ছে। এসবের কিছুই জানে না ও। দ্রুত আয় তুই। হিয়াকে বলিস না কিছু।”
নাফি কল কাটলো। তখনই খেয়াল হলো হিয়ার কথা। তখনই নাফির কানে পৌঁছালো হিয়ার উদ্বিগ্ন কন্ঠ। সাথে কান্নার আওয়াজ। নাফি হন্তদন্ত পায়ে ছুটলো সেদিকে।
“আমার মেয়েটার এতো বড় সর্বনাশ কিভাবে করলি কালনাগিনী? পেটে একটা আছে না? একজন মায়ের অভিশাপ যেন তোর উপর লাগে। ওর পেটেরটার সাথেও যেন এমন হয়।”
লাউডস্পিকারে থাকা কথাগুলো শুনলো নাফি। একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হিয়ার কাছ থেকে ফোনটা নিলো।
“মুখ সামলে কথা বলবেন। আপনার ভাগ্য ভালো, আমি ওখানে উপস্থিত নেই। অভিশাপ না দিয়ে শোকর আদায় করুন আল্লাহর কাছে। আমি থাকলে, কথা বলার জন্য আপনার জিভটা থাকতো না।”
কল কাটার আগে ওপাশের একটা কথা নাফি শুনলো,
“হেলেনা কই রে? ওর জামাইয়ের কত বড় সাহস! আমার জিভ টেনে ছিঁড়বে?”
রাত দশটা তখন। ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসে আছে সকলে। রুহি বসে আছে হুইলচেয়ারে। ওর মুখের অবস্থা বিভৎস৷ ফুলে ড্রামের মতো হয়েছে৷ ওকে দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। হাত-পায়ে মোটা মোটা ব্যান্ডেজ। ও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হিয়ার দিকে। যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে ও। বেশ কিছুক্ষণ পর রুহির ঘোর কাটলো। তা-ও রাজের বলা একটি কথায়,
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ৩৮
“আমি রুহিকে ডিভোর্স দিতে চাই। যেই মেয়ে তার অন্তঃস্থিত বোনকে মারতে চাই আর যাইহোক তাকে নিয়ে সারাজীবন থাকা যাবে না। আজ হিয়াকে মারতে চাইছে কাল আমার মাকে মারতে চাইবে। পরশু আমার ভাইকে। তরশু আমাকে। তারচেয়ে আপনাদের মেয়ে আপনারা নিয়ে যান।”
