Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৭+২৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৭+২৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৭+২৮
সাইয়্যারা খান

বৃষ্টি তখনও পড়ে নি। অপেক্ষমান সে সঠিক সময়ের জন্য। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে ডেকে যাচ্ছে আকাশ। সেদিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৃত্তিকা। সন্ধ্যা হলো বলে। দেখা নেই তখনও পূর্ণ’র। সেই সকালে বের হলো। মৃত্তিকা’কে ভার্সিটি পৌঁছে দিয়ে নিজে কোন এক দলীয় কাজে গিয়েছে। মৃত্তিকা শুধু জানে মনোনয়ন পেয়েছে পূর্ণ।
কারো গলার স্বর কানে যেতেই মৃত্তিকা রুম থেকে বের হলো। ড্রয়িং রুমে টেবিলটাতে কিছু রাখছেন পূর্ণ’র বাবা। উনিই ডেকেছেন মৃত্তিকা’কে। মৃত্তিকা শাড়ীর আঁচলটা ঠিক করে কাঁধে তুলে এগিয়ে গেলো। শাড়ী অবশ্য পূর্ণ’র জন্য ই পড়া হচ্ছে। লোকটার রোজ সকালের আবদার যাতে মৃত্তিকা শাড়ী পড়ে। মৃত্তিকা ও ফেলতে পারে না সেই আবদার। মূলত ফেলতে চায় না। তার ভালো লাগে পূর্ণ’র জন্য সাজতে। নিজেকে প্রস্তুত করতে।
মৃত্তিকা’কে দেখেই চওড়া হাসলেন পূর্ণ’র বাবা। টেবিলে’র উপর কিছু গোছাতে গোছাতে বললেন,

— এদিকে আয় মা। এককাজ কর চা করে নিয়ে আয়। তোর শাশুড়ী আসছে।
হেসে কিচেনে গেলো মৃত্তিকা। শশুর, শাশুড়ী’র সাথে তার দারুন একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের আদুরে খরগোশ ছানা মৃত্তিকা। যাকে খুব যত্নে তারা লালন পালন করে। ফুটন্ত পানিতে চা পাতা ছাড়তেই পানিটা রং ধারণ করলো। ফ্রীজ থেকে দুধ বের করতেই দেখলো ওর শাশুড়ী এসেছে এদিকে। শশুর’কে একঝাঁক ঝেড়েছেন ইতিমধ্যে। কারণ হিসেবে রয়েছে কেন মৃত্তিকা’কে এখন রান্না ঘরে পাঠালো।
শশুর’কে বাঁচাতে মৃত্তিকা কিচেন থেকে ডাকলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— আম্মু দেখো তো চিনি কতটুকু দিব।
ব্যাস শাশুড়ী থেমেছে। এগিয়ে এসে দুধ,চিনি দিতে দিতে রাগী কন্ঠে বললো,
— তোমার আব্বু বললো আর তুমি কিচেনে হাজির? আর জানি না দেখি।
মৃত্তিকা হেসে শাশুড়ী’র হাত ধরে কিচেন থেকে বাইর করতে করতে বললো,
— আই লাভ টু ডু ইট আম্মু। যাও আসছি আমি।
অল্প হেসে স্বামী’র পাশে গেলেন তিনি। মৃত্তিকা তিনটা চায়ের কাপ হাতে একটু বাদই এগিয়ে গেলো। একদম শাশুড়ী’র গা ঘেঁষে বসে পরলো সোফায় পা তুলে। ঠিক যেমন একটা বিড়াল ছানা তার মালিকের নিকট আদরের আশায় বসে। পূর্ণ’র মা ও চায়ে চুমুক দিয়ে প্রশংসা করলেন। এটা অবশ্য প্রথম না। প্রায় সময়ই রান্না করে মৃত্তিকা। পূর্ণ’র বাবা প্লেটে থাকা ভাজাপোনা গুলো এগিয়ে দিলো তার পুত্রবধুর নিকট। মৃত্তিকা একগাল হেসে হাতে নিয়ে কামড় বসালো।

কপাল গুনে এমন শশুর বাড়ী পেয়েছে সে। নতুন ভাবে নতুন একজন আব্বু পেয়েছে। আম্মু পেয়েছে সাথে আছে পূর্ণ যে তার ষোলকলা পূর্ণ করে।
মৃত্তিকা’র মনে পরলো কিছুদিন আগের কথা। কতটাই না উদাস মনে এই বাড়ী ফিরেছিলো পূর্ণ’র সাথে। ও জানতো বাবা’র কাছে যাবে অথচ পূর্ণ তাকে এখানে নিয়ে এলো। মন খারাপের সাথে সাথে অভিমানি মৃত্তিকা মনের গহীনে জমায়ি ফেলে একঝাঁক অভিমান। যা ভাঙতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে পূর্ণ’কে। বউ তার সহজে মানে নি। বাবা’কে ফোন দিয়ে নিজের স্বরে কেঁদেছিলো পর্যন্ত যা পূর্ণ তার পূর্ণ্যময়ীর চেহারা দেখেই বুঝেছিলো। সারাটা রাত বুকে নিয়ে কথা বলেছে। মান ভাঙিয়েছে। মৃত্তিকা ও মেনেছে। বুঝেছে। তার বাবা ও তাকে বুঝিয়েছে। সবটুকু মেনে এগিয়ে চলার চেষ্টা করেছে মৃত্তিকা। সমস্যা একটাই দিন শেষে তার যে বাবা পাওয়া হচ্ছে না। এই তো গতকাল দেখেছিলো অথচ আজ দেখা হয় নি। হাজার কথা হলেও সেই একদেখা’র অদম্য ইচ্ছাটা পূরণ না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। আজও তাই পূর্ণের অপেক্ষায় আছে। সে আসলেই বলবে বাবা’র সাথে দেখা করিয়ে আনতে।
হঠাৎ কন্ঠে মৃত্তিকা চমকালো। মূলত ওর শশুর কিছু বলছিলেন ওকে অন্যমনস্ক দেখে। মৃত্তিকা চমকাতেই ওর শাশুড়ী ধমকে উঠলেন শশুর’কে,

— মেয়েটা ভয় পেয়ে গেলো আমার। এভাবে ষাঁড়ের মতো চিল্লাও কেন?
— স্বামী’কে ষাঁড় ডাকে কেউ?
— আমি ডেকেছি, কি করবা তুমি?
— আসুক আমার ছেলে বিচার হবে আজ। সম্মান দাও না আমাকে।
মৃত্তিকা হতভম্ব হয়ে গেল। পুরোদমে দুইজন ঝগরা করে যাচ্ছ। মনে হচ্ছে যেই কোন মুহূর্তে মাথা ফাটাফাটি লেগে যাবে। একবার শাশুড়ী তো একবার শশুর’কে থামাতে চাইলো মৃত্তিকা। কেউ ই থামার পাত্র নয়। হাল ছেড়ে দিয়ে মৃত্তিকা উঠে দাঁড়ালো। শশুরের সামনে গিয়ে থামাতে চাইলেই পূর্ণ’র বাবা ওর হাত ধরে ওকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। মৃত্তিকা ভাবলো ওর শাশুড়ী হয়তো থামাবে কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে ওর শাশুড়ী মুখে পাকড়া গুজে টিভিতে নজর দিলেন।

গাড়িটা নিজের বাসার সামনে থামতে দেখে মৃত্তিকা অবাকই হলো। শশুরের দিকে তাকাতেই দেখলো তার মুখ জুড়ে হাসি৷ মৃত্তিকা টলমলে চোখে নিজে ও হাসছে। পূর্ণ’র বাবা ওর চোখের কোণে থাকা পানিটুকু মুছিয়ে দিয়ে বললেন,
— কেমন ঠপটা দিলাম তোর শাশুড়ী’কে?
মৃত্তিকা এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। দুইজন বেরিয়ে বাড়ীতে ঢুকতেই দেখলো মৃন্ময় হাওলাদার সোফায় বসা। মিঠি ওকে দেখেই আপা বলে দৌড়ে এলো। মিঠি’র মা কেমন মৃত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটাকে নিজের হাতে ছোট থেকে বড় করেছেন। তার বুকেও যে ব্যাথা হয় মৃত্তিকা নামক মেয়েটার জন্য। সে কি জানে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা? যেদিন জানবে কিভাবে সামলাবে নিজেকে? পরক্ষণেই ভাবলেন, সামলানো তো দূর মৃত্তিকা নামক অস্তিত্বটাই হয়তো ঐদিন মিটে যাবে।

বাবা’র বুকে ঢুকে একদম গুটিয়ে গেলো মৃত্তিকা। মৃন্ময় হাওলাদার যতটুকু জানেন পূর্ণ বলেছিলো আজ আনবে না। ভাগ্য ভালো থাকায় বেঁচে গিয়েছেন। সময়টা উনিশ বিশ হলেই আজ খারাপ কিছু ঘটে যেত। মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বুকে চেপে রাখলেন তিনি।
পূর্ণ’র বাবা ও হেসে এগিয়ে বরাবর বসলেন। কথা হলো বেশ সময়। মৃন্ময় হাওলাদারের জোড়াজুড়িতে রাতে খেতে বাধ্য হলেন তারা। মৃত্তিকা বুঝলো না কিভাবে কিন্তু ঠিক খাওয়ার আগ মুহূর্তে পূর্ণ হাজির সেখানে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিজের বাবা’কে দেখে বললো,

— আমার বউ নিয়ে তুমি রাত বিরাতে রাস্তায় ঘুরো কেন আব্বু? আজ বাসায় চল দেখো কি করি। না নিজে বউ নিয়ে শান্তিতে থাক না আমাকে বউ নিয়ে শান্তিতে থাকতে দাও। যত জ্বালা আমার।
মৃন্ময় হাওলাদার তখন পাশে ছিলেন না। মৃত্তিকা অবশ্য টুকটাক ইদানীং এমন সব পূর্ণ’র উদ্ভব কথা হজম করা শিখেছে। মৃন্ময় হাওলাদার পূর্ণ’কে দেখে মুচকি হাসলেন বিনিময়ে পূর্ণ জড়িয়ে ধরলো তাকে।
রাতের খাবার খেয়ে বাবা’কে আবারও একবুক কষ্ট নিয়ে বিদায় জানিয়ে মৃত্তিকা ফিরে এলো পূর্ণ’র হাত ধরে।
মৃন্ময় হাওলাদার মেয়ে’র যাওয়া দেখলেন। কেউ না দেখলেও তার চোখে একদিকে যেমন মেয়ে’র সুখ স্পষ্ট ঠিক তেমনই তার রাজকন্যা’র বেদনাটাও স্পষ্ট। তাকে ছাড়া হাজার ভালো থাকার মধ্যে ও ভালো নেই তার রাজকন্যা। অথচ তিনি যেন আজ কাঙ্গাল। চেয়েও তার হাত আজ রিক্ত। অতীত কাউকে ছাড়ে না। তাকেও ছাড়বে না। সময় থাকতে সবটা গুছাতে চান তিনি। যেতে হবে তাকে। মনের বিরুদ্ধে, খুব অন্তরালে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি যা বাস্তবায়ন তাকে করতেই হবে। লোভ সবার ই থাকে। কারো টাকার, কারো ক্ষমতা’র, কারো বেঁচে থাকার তো কারো ভালেথাকার।
মৃন্ময় হাওলাদার ও ভালো থাকতে চান। তার রাজকন্যা’কে নিয়ে সুখে থাকার চাওয়াটা নিশ্চিত খুব বড় চাওয়া নয় অথচ আজ মনে হচ্ছে না চাওয়াটা খুব বড়। ভীষণ দামি। নয়তু এটতা কেন ভুগছেন তিনি?

বিছানা গুছিয়ে মৃত্তিকা নিজের বইগুলো গুছিয়ে রাখলো। বাইরে তখন ঝড়ো হাওয়া বহমান। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় কোন এক ঝড় উঠেছে তারই রেশ ঢাকা শহর সহ বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। এমনিতেই নভেম্বর মাস। শীত আসবে আসবে ভাব। এখনও আসে নি। মৃত্তিকা শীত প্রেমি মানুষ। তার ভীষণ পছন্দের এই আবহাওয়া। আলগোছে বারান্দার দরজাটা খুলে মৃদু আলোতে থাকা বারান্দায় গেলো। ওমনিই ঠান্ডা এক ঝাপটা লাগলো সারাদেহে। শীতলতা বয়ে গেলো অঙ্গজুড়ে। নরম হাতটা বাড়িয়ে দিলো বাইরে ওমনিই টুপটাপ কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির পানি হাতে পরলো। অতি ঠান্ডা এই কণা গুলো শিহরণ বহালো মৃত্তিকা’র বদনে। এটা বুঝি কম পড়লো?

নিজের হাতের নিচে বড় একটা হাতের অস্তিত্ব টের পেলো মৃত্তিকা। পেছনে ঘুরতেই ধাক্কা খেলো তার পুরুষটার উষ্ণ বুকে। পূর্ণ সরলো না বরং চাপলো একটু। যতটুকু কাছে আসা যায় সবটুকু আসলো সে। মৃত্তিকা নিজের হাতে থাকা বৃষ্টি’র পানিটুকু ছিটিয়ে দিলো পূর্ণ’র মুখে। হঠাৎ এহেন কান্ডে পূর্ণ মুখ কুঁচকে নিলো। মৃত্তিকা’র কিটকিয়ে হাসা হাসিটা যেন এমন আবহাওয়ায় পূর্ণ’র নিকট বেশ লাগলো। ঝিমঝিমিয়ে উঠলো তার দেহ। নিজের ঠান্ডা হাতে’র স্থান দিলো মৃত্তিকা’র কোমড়ে। টেনে একদম কাছে এনে নিজেও পানি ঝিটালো মৃত্তিকা’র মুখে। মৃত্তিকা মুখ সরিয়ে তখনও হেসে যাচ্ছে। পূর্ণ’র আদুরে লাগে এই নারীকে। যেমনটা কোন তুলতুলে বিড়াল ছানা। মৃত্তিকা’কে ঘুরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো পূর্ণ। থমকে যাওয়া গলায় জানালো,

— আপনি আমার নভেম্বরের বৃষ্টি মৃত্ত। আপনি আমার সেই বৃষ্টি যে শীতলতা আনে। যে তীব্র গরমকে ঠান্ডা করার ক্ষমতা রাখে। যে নিজের সবটুকু দিয়ে তার প্রেমিক’কে আগলে রাখে।
— আপনি তো প্রেমিক না। ভুলে গেলেন?
— উহু ভুলি নি। আপনার সাথে সম্পৃক্ত কিছুই ভুলার নয় আমার।
— সত্যি?
— একদম।
বলেই কোলে তুলে সোজা রুমে চলে গেল পূর্ণ। মৃত্তিকা দুই হাতে গলা জড়িয়ে ধরে আর্জি জানালো,
— আইসক্রিম খাব।
— একদমই না মৃত্ত। প্রয়োজনে আমাকে খাবেন তবুও আইসক্রিম না।
— নামান আমাকে। খারাপ লোক।
পূর্ণ’র ঠোঁটে বাঁকা হাসি। বিছানা থেকে মৃত্তিকা নামতে নিলেই পূর্ণ আটকে নিলো। টেনে বুকে নিতেই মৃত্তিকা বললো,

— আম্মু রাগ করেছে আব্বু’র সাথে। দেখে আসি।
— কোন দরকার নেই। গেলেই দেখবেন দুইজন দুইজনকে বিড়ালের মতো ঘঁষাঘঁষি করছে।
— ছিঃ চুপ থাকুন।
— আজব আমি কি বললাম?
— আপনি একটা লাগামহীন ঘোড়া।
— এই যে আম্মু’র সাথে থাকার সাইড ইফেক্ট এটা। আব্বু’কে ষাঁড় ডাকে আপনি শিখলেন কি না ঘোড়া ডাক?
— ঘুমান আপনি।
— আপনাকে লাগবে।
বলেই টেনে নিলো নিজের কাছে। কানে ঠোঁট লাগিয়ে কিছু বলতেই মৃত্তিকা মুখ লুকালো পূর্ণ’র কাঁধে। অস্পষ্ট স্বরে বললো,

— পঁচা লোক।
— আপনারই তো।
— কথা নেই।
— দরকার নেই।
পূর্ণ’র দুষ্টামি শুরু হলো। মৃত্তিকা হার মানলো তার সামনে। কখন, কিভাবে, কেন জানা নেই কিন্তু মৃত্তিকা আটকে গিয়েছে এই পুরুষে। সম্পূর্ণ ডুবেছে এই সুদর্শন পুরুষে। তাকে ছাড়া যেন শ্বাসটাও মৃত্তিকা’র আসতে চায় না। বাবা’র পর একদম নিজের বলতে মৃত্তিকা তার জীবনে এই পুরুষটাকে ভীষণ ভালোবাসে।

কারো মিঠা ওষ্ঠের ছোঁয়া পেয়ে জোড়ালো ঘুমে ভাঙন ধরলো মৃত্তিকা’র। বেশ ঠান্ডা লাগছে তার। তাই তো সায় দিলো না উঠার জন্য বরং বুকে ঢুকার চেষ্টা করলো তার প্রিয় পুরুষের। পূর্ণ ওর আচরণে হাসলো। আগের মতো গম্ভীর মুখ তার এখন মৃত্তিকা’র সামনে খুব কমই থাকে। পূর্ণ হঠাৎ ওর কানে চুমু খেয়ে বললো,
— হ্যাপি ওয়ান মান্থ অব এনিভারসিরি মৃত্ত।
ফট করে চোখ মেললো মৃত্তিকা। ওদের বিয়ে’র একমাস পূর্ণ হলো আজ। ঘড়িতে রাত ১২ টা। মৃত্তিকা’কে চমকে দিয়ে ওর কপালে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো পূর্ণ। মৃত্তিকা নিজেও এর উপহার সরুপ পূর্ণ’র চওড়া কপালে চুমু খেতে চাইলো কিন্তু সুযোগ মিললো না। পূর্ণ দুইহাতে নিজের পূর্ণ্যময়ী’র চেহারাটা ধরে নাকে, মুখে সমানে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে নিলো মৃত্তিকা। সিনিয়র পূর্ণ ভাই এখন থামার নয়। একমাসে যথেষ্ট চিনিছে ওকে মৃত্তিকা। বেশ রয়েসয়ে থামলো পূর্ণ। গাঢ় এক দৃঢ় চুম্বন করে বললো,

— চোখ খুলুন মৃত্ত।
মৃত্তিকা চোখ খুলে নজর দিলো পূর্ণ’র দিকে। যার গাঢ় দৃষ্টি মৃত্তিকা’র দিকে। পূর্ণ’কে অবাক করে দিয়ে এই প্রথম মৃত্তিকা ও তার কপালে চুমু খেয়ে বললো,
— আমার জীবনে আসার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। আমি সারাজীবন আপনার পূর্ণ্যময়ী হয়ে থাকতে চাই।
— চাইলেও এ জীবনে আপনার মুক্তি নেই মৃত্ত।
— আপনার মৃত্ত মুক্তি চায় না।
পূর্ণ হঠাৎ নিজের দুই বাহুর মাঝে স্থান দিলো মৃত্তিকা’র। চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে আবার ছেড়ে ও দিলো। একটা প্যাকেট মৃত্তিকা’র হাতে দিয়ে বললো,

— আপনার গিফট মৃত্ত। আই নো আপনি আরো বেশি কিছু ডিডার্ভ করেন বাট আপাতত আপনার স্বামী’র ততটা তৌফিক নেই।
মৃত্তিকা ছোঁ মেরে পূর্ণ’র হাত থেকে প্যাকেট টা নিলো। খুলতেই দেখা মিললো সুন্দর একটা শাড়ী। মোটেও কম দামী নয় সেটা। মৃত্তিকা’র মুখ জুড়ে তখন হাসি। পূর্ণ থেকে পাওয়া সকল কিছু তার নিকট মূল্যবান। শাড়ীটা বসা অবস্থাতেই নিজের কাঁধে তুলে ফোনটা হাতে নিতেই তা পূর্ণ নিয়ে নিলো। ভোঁতা মুখে মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করলো,

— কেন নিলেন?
— এত রাতে আব্বু’কে কল দিতে হবে না।
— কিভাবে বুঝলেন?
— আপনার আগা গোড়া মুখস্থ আমার মৃত্ত। আগামী কাল নাহয় আব্বু’কে সরাসরি দেখাবেন।
— আচ্ছা। আপনি দেখুন আমাকে মানিয়েছে না এটা?
পূর্ণ অল্পস্বল্প হাসে। যার দেখা মিলা যায় না সচারাচর। এই নারী অল্পতেই তুষ্ট। তার বড্ড সখের এই মৃত্ত। মৃত্তিকা’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— আপনাকে আমি ততটা সুখে রাখতে পারছি না মৃত্ত। কিছুটা সময়….
— ভালোলাগে না আমার। বারবার এসব কেন বলেন?
কন্ঠে তার অভিমান। মাঝেমধ্যে রাগ হয় মৃত্তিকা’র। পূর্ণ যখন নিজেকে ছোট করে কথা বলে তখন কেন জানি মৃত্তিকা’র নিজের কাছেই নিজেকে ছোট মনে হয়। পূর্ণ দুই হাতে আগলে কোলে তুলে নিলো মৃত্তিকা’কে। নিজের মুখ বরাবর সামনে বসিয়ে বললো,

— এই বাড়ী, গাড়ি কিছুই আমার নয় মৃত্ত। শুধু বাইক আর যেই গাড়ীটা ব্যবহার করি ঐ দুটো আমার নিজের। বাকিসব আব্বু’র করা।
যদিও কোচিং দুটো ভালো চলছে। ইনকাম হচ্ছে ভালো কিন্তু সব খরচ তুলার পর প্রায় লাখ খানিক আমার থাকে। তাতেই নিজের সহ আপাতত আপনার খরচ চালাই মৃত্ত। দল থেকে আসা সকল টাকা আপাতত নির্বাচনের কাজে লাগাচ্ছি সাথে এনজিও র ফান্ডিং চলে তাতে।
একটু থেমে পূর্ণ আবারও নরম গলায় বললো,

— আমি আপনাকে আমার মন মতো সুখ দিতে চাই মৃত্ত। আমাদের সুখের সংসার দিতে চাই। আপনাকে আপনার প্রাপ্তটা দিতে চাই। আব্বু’র টাকায় আমার বউ’কে পালতে চাই না আমি।
মৃত্তিকা ধীরে সুস্থে নিজের মাথাটা পূর্ণ’র বুকে রাখলো। মৃদু শব্দে জানালো,
— আমি সুখী।
পূর্ণ ওর মাথায় হাত বুলালো। মৃত্তিকা তখন আবারও বললো,
— আপনি আর এসব বলবেন না। ভালোলাগে না আমার।
— বলব না।
মৃত্তিকা উঠার চেষ্টা করতেই পূর্ণ আটকে বললো,
— কোথায় যাচ্ছেন?
— একা যাচ্ছি না আপনিও চলুন।
পূর্ণ বুঝলো না। মৃত্তিকা ওর হাত ধরে টেনে বললো,
— উঠুন। এখন যেহেতু জেগে আছি তাই তাহাজ্জুদ পড়ে ঘুমাব একেবারে।

পূর্ণ একটু চোরা চোখে তাকালো। মৃত্তিকা পাত্তা দিলো না। টেনেটুনে দাঁড় করালো। আগ বাড়িয়ে ওযু করে এসে পূর্ণ’র জন্য ও জায়নামাজটা বিছালো নিজের বরাবর সামনে। পূর্ণ আসতেই ওকে টুপি এগিয়ে দিলো। দুইজনই দাঁড়িয়ে গেলো নামাজে।
মৃত্তিকা শুরুর দিকেই খেয়াল করেছিলো পূর্ণ রেগুলার নামাজি নয়। জুম্মা’র দিনে দলের সাথে নামাজ সহ টুকটাক মাঝেমধ্যে পড়া। মৃত্তিকা’র ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ ছিলো না। তাকে ঢেকে ঢুকে রাখতে চায় অথচ নিজের নামাজের ঠিক নেই। পূর্ণ’কে তখন থেকেই তাড়া দেয় মৃত্তিকা। সেই সাথে অবাকও হয় যখন জানতে পারে পূর্ণ বেশ কয়েকটা বড়বড় সূরা ও পাড়ে অথচ লোকটা আমল করে না। কারণ জানা নেই মৃত্তিকা’র কিন্তু এটা জানে পূর্ণ ভীতু। প্রচন্ড ভীতু এই সিনিয়র ভাই। মৃত্যু’কে সে ভয় পায় জোড়ালোভাবে। এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করে তেমন উত্তর মেলে নি। মৃত্তিকা ও ঘাটে নি।

সকালের মিষ্টি রোদটা তখন উঁকি দিচ্ছে এক সুখী দম্পত্যির ঘরে। দুইজন দু’জনের মাঝে ডুবে তখনও ঘুমে’র ঘোরে বিচরণ করছে। ধীরে ধীরে যখন আলো ফুটতে শুরু করলো তখন চোখ পিটপিট করলো পূর্ণ। পাশে থাকা তুলতুলে শরীরটাকে নিজের সাথে আরেকটু চেপে ধরলো। ঠান্ডা ঠান্ডা একটা সকাল। মৃত্তিকা গরম গরম উষ্ণ বুকটাতে গুটিয়ে গেলো। চাইলো আরো ঘুমাতে কিন্তু হলো না। পূর্ণ জ্বালানো শুরু করেছে তাকে। মৃত্তিকা নড়েচড়ে পুণরায় ঘুমানোর চেষ্টা করলো লাভ হলো না পূর্ণ’র জ্বালাতনে হার মানলো সে। চোখ মেলে আবারও বুজে নিলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে আবেদন করলো,

— আরেকটু ঘুমাই?
মৃত্তিকা’র এহেন কন্ঠ কানে ঢুকতেই যেন পূর্ণ’র র*ক্ত ছলৎ করে উঠলো। এই সাত সকালে মন চাইলো করতে অনেক কিছু। তার নিজের গুরুত্বপূর্ণ একটা সাক্ষাৎ আছে। সেটাকে উনুনে দিয়ে হলেও তার আকাঙ্খা’কে প্রাধান্য দিতে চাইলো সে কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। আজকে মৃত্তিকা’র পরিক্ষা আছে। এখন পূর্ণ’র আদর সামলে পরিক্ষা দিতে যাওয়ার মতো শক্ত নারী আবার মৃত্তিকা নয়। সে তো আদুরে ছানা যাকে অল্প স্পর্শেই কাবু করে ফেলা সম্ভব। মনকে ধমকে ধামকে শান্ত করতে চাইলো পূর্ণ। উঠে বসে চুল খাঁমচে ধরে বিরবির করে বললো,
— বউ থাকতেও ব্যাচেলরের মতো নিজেকে কন্ট্রোল করতে হয়। সবই কপাল।
ফ্রেশ হয়ে এসে পূর্ণ দেখলো ইতিমধ্যে মৃত্তিকা উঠে পড়েছে। নোট খাতা হাতে বসে আছে খাটে। পূর্ণ এগিয়ে এসে খাতাটা নিতে নিতে শুধালো,
— এখন পড়ার সময়? যান ফ্রেশ হয়ে আসুন।
মৃত্তিকা ভোঁতা মুখে বিছানা ত্যাগ করলো। পূর্ণ ততক্ষণে রুম গুছিয়ে রুম ত্যাগ করলো। কিচেনে ঢুকে টুংটাং শব্দ পেতেই দেখলো ওর মা রান্না করছে। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে পূর্ণ বললো,

— গুড মর্নিং আম্মু।
— গুড মর্নিং আব্বু।
— কি করছো? তোমার জামাই কোথায়? রাতে ঝগড়া মিটলো?
ওর মা ওকে সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
— দুই তিনবার মাফ চেয়েছে। ভেবেছিলাম কথা বলব না। পরে মায়া হলো।
পূর্ণ বাঁকা হাসে। মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,
— হেল্প লাগবে?
— না। হয়ে এলো। মৃত্তিকা কোথায়? ওর না পরিক্ষা?
— হু। উঠেছে। আসছে।
— যাও টেবিলে বস।
পূর্ণ গেলো না। ওপাশে থাকা চায়ের কাপগুলো নিয়ে টেবিলে গেলো। মা’কে প্রায় সময়ই সাহায্য করা হয় তার। ইদানীং ব্যাস্ততার কারণে ততটা হয়ে উঠে না।
ওর বাবা টেবিলে আসতেই পূর্ণ কিছুটা তাচ্ছিল্য করে বললো,

— রাত ভর নাকি বউয়ের রাগ ভাঙালা? একদম ঠিক হয়েছে আব্বু। আমার বউ নিয়ে বেশি ভুজুংভাজুং করলে তোমার বউ’কে কালা পট্টি পড়াব তোমার নামের তখন বুঝবা কেমন লাগে বউ ছাড়া? কখনো তো বউ ছাড়া থাকো নি,থাকলে আমার বউ’কে তার বাপের বাড়ী পাঠাতা না।
পূর্ণ’র বাবা কিছু বললেন না। ভদ্রলোক রাতে অনেক কষ্ট করে বউ’য়ের মান ভাঙিয়েছে। মৃত্তিকা একটু পরই এগিয়ে এসে হাসি মুখে পূর্ণ’র বাবা’কে বললো,
— আব্বু আজকে পরিক্ষা’র পর বাবা’র কাছে নিয়ে যাবেন?
পূর্ণ’র বাবা ফেঁসে গেলেন। ছেলের বউকে না করতেও পারছেন না আবার হ্যাঁ করতেও পারছেন না। হ্যাঁ করলেই পূর্ণ ওনাকে বাজে ভাবে ফাঁসিয়ে দিবে যেই ত্যাড়া এই ছেলে ওনার থেকে ভালো কে ই বা জানে?

ডিভানে পায়ের উপর পা তুলে রাজকীয় ভাঙ্গিতে বসে আছে পূর্ণ। শোয়েব মির্জা’র চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। দুই দিনের ছেলে ওনার সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। নিজেকে কোনমতে শান্ত রাখার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করলেন,

— গরম নাকি ঠান্ডা কোনটা নিবে পূর্ণ?
— কারো উষ্ণ র*ক্তের তৃষ্ণা পেয়েছে।
মাহিন মিয়া ভরকে উঠলেন। দাঁত চেপে ধরলেন শোয়েব মির্জা। কটমট করে বললেন,
— কথা ঠিক ভাবে বলা শিখ।
গা ছাড়া ভাব পূর্ণ’র। যেন কিছুই শুনে নি। পাশেই সাফারাত বসা। বাবা’র দিকে একপলক তাকিয়ে বললো,
— যার জন্য ডেকেছো তা বলো আব্বু।
শোয়েব মির্জা নিজেকে দমালেন। পূর্ণ আনমনে হাসে। শোয়েব মির্জা যেন ঐ হাসিতে খেই হারান। গুছানো কথাগুলো তার পাঁক বেঁধে যায়। এতটুকু ছেলে অথচ তার অঙ্গভঙ্গি বুঝা দায়। প্রচুর চতুর এই পূর্ণ। নিজেকে সামলে বললেন,
— নমিনেশন থেকে সরে দাঁড়াও। যা লাগে দিব। গাড়ী,বাড়ী,নারী…
কথাটা শেষ হলো না। পূর্ণ দিলো না। উঠে দাঁড়িয়ে কাঁচের টেবিলে থাকা ড্রিংকের দামী বোতলটা আঁছড়ে দিয়ে বললো,

— মুখ সামলে শোয়েব মির্জা। নিজের ছেলের মতো সবাই’কে ভাবা বন্ধ করুন। নারী তাকে এনে দিন। শ্যালা ***।
ভয়ংকর গালিটা কানে আসতেই সাফারাতের কানটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। পূর্ণ পুণরায় বলে উঠলো,
— এমপি পদ এবার পূর্ণ’র। পারলে থামিয়ে দেখা। কাপুরুষ তো তুই আর তোর ছেলে। ছুড়ি মারলে তো পিছন থেকেই মারবি।
শোয়েব মির্জা শান্ত মেজাজ রাখলেন। বুঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,
— শান্ত হও। তুই তুকারি করো না পূর্ণ। তোমার অনেক বড় সাফারাত এমনকি আমিও। শান্ত মেজাজে ভেবে দেখো।
— দেখাদেখির প্রশ্নই উঠে না। চুল তো আপনি রোদে সাদা করেন নি তাই না। রাজনীতি আমাকে দেখাতে আসবেন না।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৫+২৬

কথাগুলো বলেই হনহনিয়ে চলে গেল পূর্ণ। সাফারাত নির্বিকার। ও জানতো এমনটাই হওয়ার ছিলো। শোয়েব মির্জা হাতে ড্রিংকটা নিলেন। বিরবির করে বললেন,
— বড্ড বার বেড়েছে তোমার পূর্ণ। তোমার টগবগে র*ক্ত চুষে নিতে জানে এই শোয়েব মির্জা।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৯+৩০