শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৯+৩০
সাইয়্যারা খান
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দুই নারী-পুরুষ। চোখে মুখে উচ্ছাসে ভরপুর। নড়াচড়ার দরুন নারীটির হাতের চুড়িগুলোর রিনঝিন শব্দ হচ্ছে। পাশে বসেই পূর্ণ একবার তাকালো সেদিকে। দুইজন তাদের প্রেম বিলাসে মত্ত। আশেপাশের হুস ছেলেটার নেই বললেই চলে তাই তো কাল ক্রম ভুলে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলো। নিজের শক্ত দেহের সাথে পেঁচিয়ে ঠাই দিলো নিজবক্ষে। মুখে উপচে পড়া চুলগুলো সুন্দর করে গুজে দিলো তার কানের পিছনে। পূর্ণ আর ওদিক তাকালো না। নজর দিলো ফোনের স্ক্রিনে। বেশি না একটু সময় অতিক্রম হতেই ছেলেটা সহিত মেয়েটা তার কাছে এসে বসে পরলো। চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে মেয়েটা হাত নেড়ে কিছু বলছে। পূর্ণ পাত্তা দিলো না। রাগ হলো নারীটির। উঠে চলে যেতে নিলেই সাফারাত ধরে আটকালো। প্রিয় নারীটির সুশ্রী চেহারায় এহেন রাগ মানায় না। নিজের পাশে বসিয়ে পূর্ণ’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— শ্যালা আমার বউ’কে রাগাস ক্যান?
— একদম শ্যালা ডাকবি না রাত।
বেশ রাগী কন্ঠে বললো পূর্ণ। সাফারাত পাত্তা দিলো না। পাশের নারীটিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে পূর্ণ’র দিকে তাকিয়ে সরস গলায় বললো,
— আজ হোক বা দুইদিন পর সম্পর্কে তুই আমার শ্যালা ই হবি পূর্ণ।
বিরক্ত হয়ে উঠতে নিলেই হাতে বাঁধা পরলো। নারীটির মুখে পূর্ণ’র হাত। না ঘুরেই পূর্ণ শাসানোর ভঙ্গিতে বললো,
— হাত ছাড়ো। বাসায় যাব। তোমাদের প্রেম দেখতে আসি নি আমি।
নারীটি হাত ছাড়লো না। বরং সাফারাত’কে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে পূর্ণ’র বাহু আঁকড়ে ধরে চটপটে গলায় জানালো,
— সামনেই ফুঁচকার স্টল। ওখানে চল। খাব আমি।
দু’জনের বিশেষ মুহূর্তের ছবিটা নিজের ক্যামেরাতে বন্দী করে নিলো সাফারাত।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পূর্ণ’র বাহু আঁকড়ে শাড়ী পরিহিত একজন নারী। দেখতে অবশ্যই সুন্দর। একেই তো বলে আগুন সুন্দরী। হ্যাঁ, ঠিক এটাই। মৃত্তিকা’র নিকট তাকে আগুন সুন্দরী মনে হলো। যাদের দেখা মাত্র পুরুষ গলে। নিজের কায়া ভুলে, মাথা ঝিমিয়ে উঠে ঠিক ততটাই সুন্দর এই রমনী। পাতলা ঠোঁটে গাঢ় রঙা লিপস্টিকে যেন সাদা চামড়ার নারীটির সৌন্দর্য বাড়লো বহুগুণ। পিঠ ছড়ানো তার ঝরঝরা কেশ। রঙটা ও মন্দ না। ব্রাউন কালার। মৃত্তিকা’র মনে হচ্ছে চুলগুলো কালো হলে মেয়েটাকে একদম বাঙালি লাগলো। এককথায় খাঁটি বাঙালী যাকে বলে। কারণ হাতে আলতা, চুলে গাজড়া, শাড়ী পরিহিত মেয়ের চুলের রঙ কালো ই মানায় বাঙালী হিসেবে।
পরপর নিজের সঙ্গে তাকে তুলনা দিলো মৃত্তিকা। কোথায় ছবির এই রমণী আর কোথায় মৃত্তিকা। শ্যামলা গায়ের রঙ। কোঁকড়ানো চুল। উচ্চতা ও ঠিক ততটা না। হিল পড়লেও পূর্ণ’র সমান হবে না সে। কাঁধ পর্যন্ত অথচ ছবির মেয়েটি পূর্ণ’কে ছুঁইছুঁই।
অসহ্য রকমের খারাপ লাগা কাজ করলো মৃত্তিকা’র যাকে বলে একদম বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ লাগা। এটাই তো স্বাভাবিক। নিজের পুরুষের বাহু ধরে একজন যুবতীকে কেন ই বা মৃত্তিকা সহ্য করবে? মনের গহীনে অঙ্কুরিত হলো হিংসা নামক দহনের। যদিও তার মনে হচ্ছে ছবিটি পুরাতন তবে ততটাও না। কয়েক বছর আগেরই ছবিটি। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো মৃত্তিকা’র।
অতটাও অবুঝ না মৃত্তিকা যে পূর্ণ’র অতীত নামক কিছু দেখে এতটা কষ্ট পাবে। কষ্ট লাগছে কারণ পূর্ণ শুরুতেই জানিয়েছে নারী সানিধ্যে যায় নি। কথাটি কি তবে মিথ্যা ছিলো?
অতঃপর একটা ছবির উপর ভিত্তি করে ততটাও নিজের ভাবনাকে প্রশ্রয় দিলো না যদিও ছবিটাতে দুইজন’কে এক জোড়া মনে হচ্ছে। পূর্ণ আসলেই তাকে জিজ্ঞেস করবে মৃত্তিকা। নিশ্চিত পূর্ণ বলবে ছবিতে থাকা নারীটির সাথে তার তেমন কোন সম্পর্ক নেই।
কথাগুলো বলে নিজেকেই সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলো মৃত্তিকা। না চাইতেও তার মন মাঝারে খারাপ লাগাটা ছেয়েই যাচ্ছে। হাজার হোক প্রিয় পুরুষের এতটা কাছে কোন নারী অবশ্যই তৃতীয় কাউকে পছন্দ করবে না।
ছবিটা আলমারির ড্রায়রে থাকা একটা ফ্রেম থেকে পেয়েছে মৃত্তিকা। দেখার পর থেকেই মন বিষিয়ে আছে। ছবিটা নিজের শাড়ীর ভাজে রেখে রুম থেকে বাইরে চলে এলো সে। শাশুড়ী নামক চমৎকার নারীটির সাথে এক কাপ চা খাওয়া বাকি তার। অতঃপর তাকে তৈরী হতে হবে। পূর্ণ বলেছে আজ কোথাও নিয়ে যাবে তাকে।
শোয়েব মির্জা বেজায় চটে আছেন পূর্ণ’র উপর। ছেলেটা নির্বাচন থেকে পিছু তো হটবেই না উল্টো তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে আজ জন সম্মুখে ভাষণ দিয়েছে ভার্সিটির সামনে। মিছিল করেছে পুরো এলাকা হয়ে ভার্সিটির সড়ক পর্যন্ত। জনগন এতে আরো উতলা হয়েছে। এতটা সুশৃঙ্খল মিছিল তারা পূর্বে দেখে নি। রাস্তা ঘাট অবরোধ করে কিংবা জনগণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে দেয় নি পূর্ণ তার মিছিলকে বরং দুটো লেট খোলা রেখেছিলো যাতে জনগণের দুর্ভোগ না হয়। এরপর চার রাস্তায় মোড়ে সিনা টান করে জনসম্মুখে প্রকাশ করে তার নমিনেশন পাওয়ার খবর।
ছেলেটা বড্ড চতুর তা জানেন শোয়েব মির্জা।
টিভির চ্যানেলটা পাল্টে মাহিন মিয়া’র দিকে তাকিয়ে বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করলো,
— ও আমাকে কি বলে জানি?
–কু..কুতত্তার বাচ্চা।
গর্জে উঠলেন শোয়েব মির্জা। ভয়ে সিটিয়ে গেলো মায়িন মিয়া। ভুল কিছু কি উগড়ে ফেললেন?
শোয়েব মির্জা কঠিন গলায় বলে উঠলো,
— আমি কি সেটা জিজ্ঞেস করেছি? হাঁদারাম কোথাকার!
ঢোক গিললো বারকয়েক মাহিন মিয়া। কন্ঠে অপরাধ বোধ ঢেলে বললেন,
— দুঃখীত স্যার। পূর্ণ বলেছিলো আজকে এবার জয়ী হয়ে দেখিয়ে দিবে।
শোয়েব মির্জা দাঁত কটমটালেন। দেখে নিবে ভালো করে সে এই দুই দিনের ছেলেকে। রাগ তার শুধু পূর্ণ’র উপর না বরং নিজ ছেলের উপর ও। এতটা কেন নির্বিকার সে? কেন এগুচ্ছে না কিছুতে?
মৃন্ময় হাওলাদারের সঙ্গে প্রায় ঘন্টা খানিক ধরে কথা বলছে পূর্ণ। সম্পূর্ণ টা রাজনীতি ঘিরে। দারুন তার সকল বুদ্ধি। নিজ দল সহ এবার এমপি পদে দাঁড়ানোর বুদ্ধিটাও তারই ছিলো৷ পূর্ণ অবশ্য শাজাহান খান এর প্রস্তাবে প্রথমে রাজি না হলেও কিছুটা দ্বিধায় ছিলো যা সম্পূর্ণ কেটেছে শশুরের কথায়।
কথার এক পর্যায়ে মৃন্ময় হাওলাদার বললেন,
— আম্মাকে দেখো পূর্ণ। সামনেই হয়তো যাব।
পূর্ণ দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিলো। ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো। পরপর শুধালো,
— উনি থাকতে পারবে না বাবা।
— জানি আমি। একদিন না দেখেই তো থাকতে পারেন না। তবে পারতে হবে পূর্ণ। আমি জানি সেই কাজে তুমি তাকে সাহায্য করবে।
পূর্ণ উঠে দাঁড়ালো। মৃন্ময় হাওলাদার খেতে বলতেই পূর্ণ জানালো,
— ওনাকে নিয়ে বের হব আজ বাবা। ওয়াদা করেছি।
মৃন্ময় হাওলাদার হাসলেন। প্রাপ্তির সেই হাসি। বিদায় জানিয়ে পূর্ণ চলে গেল। এদিকে অতৃপ্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন মৃন্ময় হাওলাদার। অতীতটা তাকে ছাড়ছে না। একদমই না।
মৃত্তিকা দরজায় দুইটা টোকা দিয়েই ডাকলো,
— আম্মু? আসব?
অপর পাশ থেকে অনুমতি এলো না। তবে মাথা ঢুকিয়ে ঢুকে পরলো মৃত্তিকা। হাতে থাকা চা আর ভাজাপোড়া গুলো পাশের টেবিলে রেখে বললো,
— বাইরে এসো না। বারান্দায় বসে খাই?
— খাব না।
— আমি কি করলাম?
উঠে বসলেন পূর্ণ’র মা। মৃত্তিকা কিছু বলতে নিলেই রাগী কন্ঠে বললেন,
— একদম স্বামী’র হয়ে গান গাবে না। বেয়াদব ছেলে। কোন কথা শুনতে চাই না ওর নামে।
মৃত্তিকা ঢোক গিললো। একটা সময় ছিলো যখন সে হাড়ে হাড়ে ভয় পেত রাজনীতি নামক পেশাটাকে এমনকি এর সাথে জড়িত মানুষদের। কিন্তু পরিস্থিতির বদলে আজ এক রাজনৈতিক কাজে জড়িত পুরুষের বউ সে। ভয় লাগে না এমন না। পেশাটাই এমন।
পূর্ণ’র মা কখনোই রাজনীতি পছন্দ করেন না৷ পূর্ণ’কে সবসময় ছাড়তে বলেছে এসব। ছেলেটা ছাড়বে তো দূর উল্টো এখন কি না এমপি পদে দাঁড়াচ্ছে। একথা আজ সকালে জানতে পেরেছেন তা ও কি না সরাসরি সংবাদে! তার ছেলে এমপি পদে দাঁড়ায় আর এটা কি না তাকে কেউ জানায় নি? এতটাই ফেলনা? পূর্ণ জানত মা রাজি হবে না তাই বাবা সহ মৃত্তিকা’কে নিষেধ করে মা’কে জানাতে।
সকালে জেনেই ছেলেকে সাফসাফ না করেন। এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। লাভ হয় না। পূর্ণ ছাড়বে না এই রাজনীতি। তার র*ক্তে মিশা এই রাজনীতি। কিভাবে ছাড়বে এত সহজে?
মৃত্তিকা বহু কষ্টে শাশুড়ী’কে মানিয়ে বারান্দায় গেলো। একসাথে মনোযোগ দিলো চায়ের কাপে। ততক্ষণে শশুর হাজির ওর। মৃত্তিকা চা ঢেলে দিতেই তিনি চুমুক বসিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে স্ত্রী’কে বললেন,
— কি কেঁদে কেটে ছেলেকে আটকাতে পারলে?
স্বামী’র খোঁচা গায়ে মাখলেন না তিনি। শুধু এক কামড় চপ খেয়ে বললেন,
— রাতে দেখছি তোমাকে।
ব্যাস কাজে দিলো তার হুমকি। দমে গেলো মৃত্তিকা’র শশুর। তাদের এই টোনাটুনির ঝগড়া বেশ লাগে মৃত্তিকা’র কাছে।
পূর্ণ’র জন্য নিজেকে একদম সাজিয়ে রেখেছে মৃত্তিকা। শাড়ী পড়ে হিজাব ও বেঁধেছে অথচ জানা আছে পূর্ণ এমন জায়গায় নিবে যেখানে মানুষ কদাচিৎ থাকে। তার বউ সে মোটকথা লুকিয়ে রাখবে।
পূর্ণ এলো একটু বাদই। মৃত্তিকা দেখেই সালাম জানালো হাসি মুখে। পূর্ণ এগিয়ে এসে পাঞ্জাবিটা খুলে ওয়াসরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
— কাপড়গুলো দিন মৃত্ত।
মৃত্তিকা তাই করলো। নিজ পছন্দ অনুযায়ী পাঞ্জাবি বের করলো। পূর্ণ গোসল করে আসতেই দেখলো সব গোছানো বিছানায়৷ তখনই নজর গেলো তার নারীর উপর। অল্প সাজে তার হৃদমোহীনি। পূর্ণ একটানে নিজের কাছে নিয়ে গুমড়ে যাওয়া স্বরে বললো,
— আপনি একটা আতড়ের শিশি মৃত্ত। যেখানেই খুলা হোক না কেন, ঘ্রাণে মাতিয়ে দেন আমায়।
মৃত্তিকা লজ্জা পেলো। পূর্ণ তখন আধ উন্মুক্ত। ঢোক গিললো মৃত্তিকা। পূর্ণ ততক্ষণে নিজের ভেজা অধরের ছোঁয়া দিলো ওকে। কম্পমান মৃত্তিকা সরতে সরতে বললো,
— যাবেন না?
— হু। যেতে হবে বলেই ছাড় পেলেন মৃত্ত।
মৃত্তিকা’র হঠাৎ ছবিটার কথা মনে পরলো। সেটা বের করতে করতে বললো,
— কিছু জিজ্ঞেস করার ছিলো?
পূর্ণ পাঞ্জাবী গায়ে জড়াতে জড়াতে বললো,
— আমি তো আপনার নিকট খোলা বই মৃত্ত। পড়ে নিন আমায়।
হঠাৎ চোখের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি দেখে থমকে গেলো পূর্ণ। মাথায় দপদপ করে আগুন জ্বলে উঠলেও তা দমিয়ে রেখে বললো,
— যেখান থেকে নিয়েছেন সেখানেই রাখুন এটা।
মৃত্তিকা ভীত কিছুটা। পূর্ণ’র কন্ঠ বা চাহনি কোনটাই স্বাভাবিক নয়। তবে সাহস জুগিয়ে প্রশ্ন করলো পুণরায়,
— মেয়েটা কে?
— রাখুন এটা!
কিছুটা জোড়েই বললো এবার পূর্ণ। মৃত্তিকা’র চোখ তখন ছলছল করে উঠলো। এভাবে ধমক দেয়ার কি আছে? মৃত্তিকা দমলো না। জানতে চাইলো নিজের করা প্রশ্নের উত্তর। পূর্ণ এবার ধমকে উঠলো,
— কি কি জানতে চান আপনি?
— মেয়েটা কে?
— সব। সব সে আমার।
— আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছেন? বলেছিলেন কোন নারী ছিলো না আপনার জীবনে।
পূর্ণ’র রাগ এবার আকাশচুম্বী। ছবিটা মৃত্তিকা’র হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে একহাতে গাল চেপে ধরলো মৃত্তিকা’র। ঘটনার দ্রুততা কল্পনা করতে পারলো না মৃত্তিকা। পূর্ণ শুধু দাঁত খামটি মে’রে বললো,
— খুব খারাপ করলেন মৃত্ত। খুব খারাপ। আজ রাতটা আপনার আর আমার জন্য রেখেছিলাম। সব নষ্ট করার শাস্তি আপনি পাবেন।
কথাগুলো বলে ধাক্কা দিয়ে মৃত্তিকা’কে ফেলে চলে গেল পূর্ণ।
মৃত্তিকা’র চোখ গলিয়ে তখন পানির ফোয়ারা। পূর্ণ’র এহেন আচরণ আশা করেন নি ও। মেয়েটা নাকি পূর্ণ’র সব। তাহলে মৃত্তিকা কে? কি ভূমিকা তার পূর্ণ’র জীবনে?
” আমি আপনার নিকট একটা খোলা বই মৃত্ত। যেখান থেকে খুশি পড়ে নিন আমায় তবে হুট করে মাঝ থেকে পড়বেন না। অবশ্যই শুরু থেকে শেষ করবেন কারণ মাঝপথে হঠাৎ করে পড়লেই জটিলতায় আটকে যাবেন।”
কথাগুলো তাদের প্রণয় চলা কালীন সময়ে পূর্ণ বলেছিলো। যদিও পূর্ণ’র ভাষায় তাদের প্রেম ছিলো না তবে মৃত্তিকা’র ভাষায় ছিলো। মৃত্তিকা’র বারান্দায় বসে হঠাৎ করেই পূর্ণ’র বলা কথাগুলো মনে পরলো। তাহলে কি মৃত্তিকা মাঝ পথে এসেছে হুট করে? নাহলে কেন এতটা অচেনা লাগলো আজ পূর্ণ’কে? প্রশ্ন অনেক কিন্তু উত্তর জানা নেই। আর না ই আছে উত্তরদাতা।
বারান্দার ফ্লোরে বসে একমনে চাঁদহীনা আকাশ পানে তাকিয়ে কথাগুলো ভেবে যাচ্ছে মৃত্তিকা। গালে এখনও ব্যাথা করছে ওর। জীবনে বলতে গেলে এমন ভাবে পাওয়া প্রথম আঘাত এটা। বাবা কখনো হাত তোলা তো দূর ধমক ও দেয় নি ওকে। টিচারদের থেকেও জীবনে মা’র খাওয়া হয় নি। পূর্ণ হয়তো শুধু গালটা চেপে ধরেছিলো কিন্তু আঘাতটা ছিলো অসহনীয়। প্রিয় পুরুষের দেয়া অল্প আঘাত ও যে হৃদয় ফালাফালা করে দেয়। হঠাৎ করেই মৃত্তিকা’র ওর বাবা’র কথা মনে পরলো তীব্র ভাবে। আজকে বাবা’র কাছে যাওয়া হয়ে উঠে নি৷
সময়টা তদের এমন হওয়ার ও কথা ছিলো না। কথা ছিলো পূর্ণ’র হাত ধরে এখন কিছু একাকী সময় কাটানোর। তাহলে কেন পূর্ণ সব নষ্ট করলো? কেন ওমন আচরণ করলো মৃত্তিকা’র সাথে?
অস্পষ্ট স্বরে মৃত্তিকা কেঁদে উঠলো। ডেকে উঠলো, “বাবা”।
মৃন্ময় হাওলাদার আজ একাই ছাদে এলেন৷ মেয়ে ছাড়া তার ছাদে উঠা নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা অবশ্য মৃত্তিকা নিজে করেছিলো। কারণ টা ছিলো অদ্ভুত।
পাশের বাড়ীতেই একটা মেয়ে থাকে। এই তো আষ্টাদশী হবে। মৃন্ময় হাওলাদারের সাথে ভাব জমিয়েছিলো প্রচুর। তিনি ও বেশ আদর করতেন। বাবা পাগল মৃত্তিকা’র তা মোটেও সহ্য হয় নি। বাবা’কে বেশ কঠর গলায় নিষেধ করে ঐ বাড়ীর মেয়ে থেকে দূরে থাকতে। মৃন্ময় হাওলাদার ও হেসে মাথা নেড়েছিলেন। অতঃপর মেয়ের ছেলেমানুষী মনে করে ভুলেও গিয়েছিলেন।
মনের ভুলেই একবিকেল ছাদে চা হাতে তিনি উপস্থিত হন। কথা ছিলো মৃত্তিকা কলেজ থেকে এসেছে তাই ফ্রেশ হয়ে বাবা’র কাছে ছাদে যাবে। কিন্তু যখন ছাদে গেলো তখনই দেখলো ওর বাবা ঐ বাড়ীর মেয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে এমনকি চা ও দিয়েছে নিজের।
অভিমানী আর একাচোরা মৃত্তিকা চুপ করে নিজ কক্ষে চলে যায়। ঘন্টা গড়াতেই মৃন্ময় হাওলাদার নিচে আসেন মেয়েকে দেখতে। এতক্ষণ তো তার কন্যা’র লাগে না গোসলে। এসেই দেখেন মৃত্তিকা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ঘুমন্ত মেয়ে ডাকেন না তিনি কখনো। তাই ভেজা চুল গুলো সুন্দর করে নেড়ে কপালে চুমু খেয়ে চলে যান। যদিও ব্যাপার টা স্বাভাবিক ছিলো তবে মানতে পারে নি মৃত্তিকা। বাবা ডাকে নি তাকে ভেবেই রাগে সেই বিকেল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কেঁদেছে বালিশে মুখ গুজে। মৃন্ময় হাওলাদার যখন সন্ধ্যায় রুমে আলো জ্বালাতে এলেন তখন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন ওভাবে মেয়েকে দেখে।
সারাটা রাত ঐদিন মেয়েকে বুকে নিয়ে জেগে ছিলেন কারণ মৃত্তিকা’র জ্বর উঠেছিলো। মেয়েটা তার বড্ড অভিমানী। সেই থেকে তার একা ছাদে উঠা হয় নি।
আজ এতদিন পর এসে পাশের ছাদে তাকালেন। না ঐ বাড়ীর মেয়েটা নেই। মেয়েটার বাবা প্রবাসী তাই মৃন্ময় হাওলাদারের থেকে আদর নিতে এসে পরতো ছাদ টপকে।
রাতের আকাশে তাকাতেই মৃন্ময় হাওলাদারের মনে হয় আকাশটা উদাসীন। আচ্ছা এই উদাসীনতা কেন আজ? মন্ময় হাওলাদারের বিফলতা দেখে? বুক চিড়ে তার দীর্ঘ শ্বাস বের হয়। আজকে তার রাজকন্যা আসে নি। পূর্ণ’র সাথে নিশ্চিত সুন্দর সময় কাটাচ্ছে। মন্দ হাতে তুলে দেন নি তিনি তার রাজকন্যা’কে। চিনতে ভুল করেন নি। কিন্তু মনটা তবুও তার বিষন্ন ভরা। কারণ টা জানা নেই। মন বলছে তার রাজকন্যা ভালো নেই অথচ মস্তিষ্ক জানে রাজকন্যা এখন সুখের রাজ্যেই আছে।
মনকে বুঝ দেন মৃন্ময় হাওলাদার। পূর্ণ তার রাজকন্যা’র গায়ে ফুলবাদে কিছুর টোকা পড়তে দিবে না।
অন্ধকারে ঘেরা রাত্রি। চাঁদ আজ লুকিয়ে মেঘের আড়ালে। পূর্ণ বাড়ি ফিরিছে। রাগ পরেছে কি না বুঝা গেলো না। তবে মন তার মৃত্ত’র কাছে পড়ে।রুমে ঢুকা মাত্রই যেমনটা রেখে গিয়েছিলো ঠিক তেমনটাই পেলো। হঠাৎ মনে হলো তার মৃত্ত চলে গিয়েছে। পরক্ষণেই চোখ বুজে অনুভব করার চেষ্টা করলো। মন বলছে মৃত্তিকা আশেপাশেই আছে। সারা রুমে চোখ বুলিয়ে বারান্দায় গেলো পূর্ণ। সেখানেই নিজের ধ্বংস’র দেখা পেলো। এই নারী তার ধ্বংসের একমাত্র কারণ। এলোমেলো মৃত্তিকা হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আঁচলটা তার কাঁধ থেকে চ্যুত হয়েছে। খোলা বুকেটা টানলো পূর্ণ’কে খুব করে৷ দপদপিয়ে জ্বলে উঠে পূর্ণ’র কায়া। চোখের কোটরে জমে উঠে পানি। ধারণ করে তার অক্ষি লাল রঙ। ধীমি পায়ে এগিয়ে এসে একদম মৃত্তিকা’র কাছে বসে। কাছ ঘেঁষে। দুইবার শ্বাস টানে জোরে জোরে। পরপর মুখটা তুলে চুমু খায় মৃত্তিকা’র গলার নিচে। কেঁপে উঠে মৃত্তিকা’র কায়া। পূর্ণ থেমে নেই গলায় মুখ রাখে তার। হঠাৎ অল্প ব্যাথায় ঘুমের ঘোরে গুঙিয়ে উঠে মৃত্তিকা। চোখ খুলে পূর্ণ’কে দেখে সরাতে চায়। পারে না। পূর্ণ দু-হাতে শক্ত করে ধরেছে। মৃত্তিকা অল্প স্বরে জানায়,
— ব্যাথা।
পূর্ণ যেন শুনলো না বা চাইলো না শুনতে। তীব্র ভাবে সূক্ষ্ণ দাঁতের সূচালো ব্যাবহার করলো গলদেশে। ছটফটিয়ে উঠে মৃত্তিকা। ভাঙা স্বরে বললো,
— পূ..পূর্ণ আমি অনেক ব্যাথা পাচ্ছি।
ভাবলো হয়তো পূর্ণ থামবে কিন্তু তা হলো না। পূর্ণ এবারেও একটু থেমে আবারও জোরে কাঁমড়ে দিলো। মৃত্তিকা’র মনে হলো জায়গাটা থেকে হয়তো মাংস খুবলে নিতে চাইছে পূর্ণ। “বাবা” ডেকে আর্তনাদ করে মৃত্তিকা। সরতে চায়। ধাক্কা দিলেও কাজ হয় না। পূর্ণ নিজের করা ক্ষততে চুমু খায়। কিন্তু কাজ হয় না। মৃত্তিকা ফুঁপাচ্ছে। তখনও মুক্তি চাইছে পূর্ণ’র বন্ধনী থেকে। ছটফট করে যাচ্ছে অনবরত। মুখ তুলে পূর্ণ। এগুলো ঠোঁটের দিকে। লুফে নিলো নিজ শ্যামলা নারীর সেই পাতলা ওষ্ঠাধর। মৃত্তিকা’র গাল গড়িয়ে শুধু পানিই ঝড়ে গেলো৷ নিজের মুখে নোতনা স্বাদ পেতেই পূর্ণ চোখ মেললো। সোজা নজর পরলো মৃত্তিকা’র চোখে। কিছু একটা পেলো পূর্ণ সেই চাহনীতে। হ্যাঁ, মুক্তি চাওয়া পেলো। মৃত্তিকা মুক্তি চাইছে তার থেকে। পূর্ণ ধীরে সুস্থে ওষ্ঠ ত্যাগ করলো। দৃষ্টি পাত করলো মৃত্তিকা’র কাটা ঠোঁটে। মাত্র নিজেই করেছে ও এটা৷ গলা দিয়ে কন্ঠ ঠেলে বের করে বললো,
— বলেছিলাম না আমার সুন্দর রাজনী নষ্ট করার শাস্তি দিব। গলার টা ঐ শাস্তি ছিলো আর ঠোঁটের টা ছিলো আমাকে ব্যাকুল করার জন্য।
নজুক মৃত্তিকা। বাবা’র রাজকন্যা আজ সামলাতে পারে না নিজেকে। সামনের পুরুষটাকে তার অচেনা ও মনে হচ্ছে না বরং খুব চেনা মনে হচ্ছে। এই হলো সেই প্রথম পূর্ণ যাকে মৃত্তিকা চিনতো। যে জানে শুধু শাস্তি দিতে। নিজের কথা মোতাবেক মৃত্তিকা’কে চালাতে। এতদিন বরং ও পূর্ণ’কে ভিন্ন রুপে পেয়েছিলো। ভালোবাসা ময় একটা পূর্ণ’কে দেখেছিলো।
পূর্ণ আলতো হাতে মৃত্তিকা’র আঁচলটা কাঁধে তুলে দিলো। দুইহাত বাড়াতেই মৃত্তিকা বাঁধা দিলো। পূর্ণ’র দেয়া আগের কার কষ্ট আর এই কষ্ট আলাদা। তখন পূর্ন’র প্রতি ছিলো আকর্ষণ, কিছুটা টান তবে এখন সেটা রুপান্তরিত হয়েছে ভালোবাসা আর মায়া’য়। আঘাতটা অবশ্যই ভালোবাসার মানুষ থেকে পাওয়াটাই বেশি লাগে।
পূর্ণ দমলো না। একপ্রকার জোর করেই কোলে তুলে নিলো মৃত্তিকা’কে। প্রতিবারের ন্যায় পূর্ণ’র গলা জড়িয়ে ধরলো না মৃত্তিকা। কেমন চুপ হয়ে আছে মেয়েটা। আঘাতগুলো ছোট হলেও দাগ কেটেছে গভীর ভাবে। খুব সূক্ষ্ণ ভাবে ঝাঁঝড়া করেছে মৃত্তিকা’র চড়ুই সমান মনটাকে।
রুমে এনে বিছানায় বসাতেই পূর্ণ সম্পূর্ণ আলোতে এবার তার মৃত্ত’কে দেখে নিলো। আজ শ্যামলা বলে নাহলে তখন গালে চাপটাও রাগের মাথায় আস্তে দেয় নি পূর্ণ। শ্যামলা গালেই আবছা বুঝা যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে তাতে ছুঁয়ে দিতেই ব্যাথাকাতুর শব্দ তুললো মৃত্তিকা। ছোট্ট করে শুধু বললো,
— বাবা’র কাছে যাব।
— আজ না।
ছোট্ট কথার পৃষ্ঠে ছোট্ট উত্তর পূর্ণ’র। গলায় তাকাতেই এতক্ষণের জমানো রাগগুলো কিছুটা কমতে চাইলো৷ র*ক্ত জমে নেই শুধু বরং গড়িছেও কিছুটা। চিকন ধারা বয়ে কাঁধে থেমেছে। পূর্ণ নিজের কাছে নিয়ে মুখ আবার সেই ক্ষততে নামাতেই মৃত্তিকা অনুরোধের সুরে বললো,
— অনেক কষ্ট হচ্ছে আমার পূর্ণ। ওখানে আর না।
এই নিয়ে পরপর দুইবার আজ মৃত্তিকা ওর নাম মুখে নিলো। আচ্ছা শাস্তিটা কি বেশি হয়ে গেল? পূর্ণ তো আরো ভয়াবহ কিছু ভাবছিলো কিন্তু তা দেয় নি। পূর্ণ’র চুমুর স্পর্শ ও আজ জ্বালিয়ে দিলো মৃত্তিকা’র গলদেশ। খামচে ধরলো পূর্ণ’র চুল। সরাতে চাইলো। জায়গাটা তার ভয়ংকর ভাবে জ্বলছে। পূর্ণ সরলো। নিজের খসখসা হাতে গাল জড়িয়ে নিলো মৃত্তিকা’র। ঠান্ডা স্বরে জানালো,
— আপনার কষ্ট টা দৌহিক কিন্তু আমারটা আমার হৃদপিন্ডে মৃত্ত। আপনি আজ আমার হৃদপিণ্ডটাতে আঘাত দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী কি শাস্তিটা নগন্য ছিলো না? বলুন।
কপালে কপাল ঠেকালো পূর্ণ। মৃত্তিকা কেঁদে ফেললো। হিচকি তুলে তুলে কাঁদছে সে। কম্পমান তার ওষ্ঠে আলত ঠোঁট ছোঁয়ালো পূর্ণ। জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। কাটা ঠোঁটে ওষ্ঠ ছুঁয়িয়ে আবার বললো,
— আর কাঁদে না।
মৃত্তিকা শুনলো না। তার কষ্ট হচ্ছে সেটা প্রকাশ করার মাধ্যমই তার কান্না। পূর্ণ এবার ধমকে উঠলো। ছিটকে সরতে চাইলো মৃত্তিকা। তবে অপারগ হলো। পূর্ণ তখন ছোট ছোট আদরে ভাসাচ্ছে তার পূর্ণময়ীকে। পূর্ণ খেই হারাতেই মৃত্তিকা আটকে দিলো। কিছুটা অভিমানী কিছুটা দৃঢ় কন্ঠে বললো,
— কথার দিয়ে করা জখমে কথা দিয়ে মলম লাগান। এভাবে না।
পূর্ণ জোরে শ্বাস টেনে নিলো। নিজের সাথে আরেকটু জড়িয়ে ধরলো তার মৃত্ত’কে। আবেশ জড়ানো কন্ঠে শুধালো,
— আপনি গল্পের মাঝখানে চলে গিয়েছেন মৃত্ত। শুরু থেকে পড়ার চেষ্টা করুন।
মৃত্তিকা বুঝলো। তবুও প্রশ্ন করলো,
শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৭+২৮
— শুরুটা ঠিক কোথায়?
— আমায়।
আর বাক্য বিনিময় ঘটলো না। পূর্ণ ঘটতে দিলো না। জমিয়ে রাখা তার আদর, ভালোবাসা উথলে দিলো তার মৃত্ত’তে। দিশেহারা মৃত্তিকা বাঁচতে চাইলো আপ্রাণ তবে তা সম্ভব হলো না। পূর্ণ নিজেতো ডুবলো সাথে নিলো মৃত্তিকা’কে।
