শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১১
রুহানিয়া ইমরোজ
ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছুঁই ছুঁই। জ্বর ছেড়ে যাওয়ায় ঘুমটা হালকা হয়ে আসে মেহরিমার। পিটপিটিয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে দুর্বল শরীরটা টেনে উঠে বসে।
প্রিমা তার পাশেই বসে ছিল। আরশিয়ানেরা যাওয়ার পর আর ঘুমাইনি। বসে বসে সপ্তাহখানেক যাবত ঘটে যাওয়া বিষয় গুলো ভাবছিল। হুট করে মেহুকে উঠে বসতে দেখে কপালে হাত ছুঁইয়ে প্রিমা চিন্তিত কন্ঠে শুধাল,
–” কেমন লাগছে এখন? শরীর ভালো?
বোনের আদুরে স্বরে আহ্লাদে গলে পড়ল মেহরিমা। প্রিমার বুকে মুখ গুঁজে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
–” ভাল্লাগছে না..
প্রিমা হেসে ফেলল মেহরিমার বাচ্চামিতে। মাথার চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
–” উঠে ফ্রেস হয়ে নে সোনা। এরপর দুজনে মিলে একসাথে নাস্তা করব৷
মেহরিমা টেনেটুনে চোখ খুলে তাকাল। চারপাশটা দেখে অবাক হলো কিঞ্চিৎ। বিস্মিত কন্ঠে বলল,
–” কোথায় আছি আমরা?
প্রিমা বুঝল তার অবাক হওয়ার কারণ তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বানোয়াট কথাটা বলল,
–” প্রমোশন হয়েছে আমার। তাই অফিস থেকে এই কোয়ার্টার দিয়েছে।
সংবাদটা শুনে মেহরিমা খুশিতে লাফিয়ে উঠল এক প্রকার। প্রিমাকে ঝাপটে ধরে বলল,
–” কংগ্রাচুলেশনস আপাআআআ।
প্রিমা মলিন হাসে বোনের উচ্ছ্বাস দেখে। তবে সেটা তাকে বুঝতে না দিয়ে বলে,
–” হয়েছে বাচ্চা। এবার উঠে ফ্রেশ হয়ে নে জলদি।
মেহরিমা আমতা আমতা করে বলল,
–” ঘেমে-নেয়ে একাকার আমি। শাওয়ার নিতে হবে।
প্রিমা জানতো এমন কিছুই বলবে মেহরিমা। কারণ শুচিবায়ু রোগ আছে তার। তাই তাড়া দিয়ে বলল,
–” মাননীয় আইলসাবতী। ওয়াশরুমে শাড়ি সহ যাবতীয় জিনিসপত্র রাখা আছে। আপনি চাইলে শাওয়ার নিতে পারেন।
মেহরিমা কথাটা শুনে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। হুট করে কিছু একটা মনে পড়ায় শুধাল,
–” অফিস নেই তোমার?
প্রিমা শান্ত কন্ঠে জবাব দিল,
–” ওই বাসা থেকে মালপত্র এনে ফ্ল্যাটটা গুছাতে হবে তাই ছুটি নিয়েছি। তাছাড়াও বুবুর সাথে দেখা করতে যাব আজ। ডক্টরের সাথে ফাইনাল কথাবার্তা বলে নিব।
মেহরিমা বাধ্য বাচ্চার ন্যায় মাথা নাড়িয়ে উঠে যায়। মেহরিমা চোখের আড়াল হতেই প্রিমার চোখ ভরে উঠে অশ্রুতে। মনে মনে বলে,
–” কার সামনে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করছিস মেহু? সেই ছোট্ট থেকে দেখছি তোকে। জানি তো কতটা কষ্টে আছিস তুই কিন্তু তোর বোন অপারগ।
গ্যাংস্টার ভাইয়ের অন্যায়ের বিচার করতে স্বয়ং এমপি সাহেব এসেছেন ইউনিভার্সিটিতে। কথাটা ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ে সকলের মাঝে। কৌতূহলী ছাত্র ছাত্রীরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা চালায় কিন্তু কঠোর নিরাপত্তা থাকায় সেটা সম্ভব হয়না।
ভার্সিটির অথরিটি পড়েছে বিপদে। অফিসে ঢুকে আরশিয়ান সরাসরি প্রক্টরের সাথে কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করে। প্রক্টর সাহেব ভার্সিটিতে ছিলেন না তবে এদিকের কথা শুনে পড়িমরি করে ছুটে আসেন। তিনি রুমে এসে চেয়ারে বসা মাত্র আরশিয়ান তাকে জিজ্ঞেস করে,
–” গতকাল আপনার ভার্সিটির স্টুডেন্ট কে বিনা দোষে রাস্তার মাঝে হ্যারাস করা হয়েছে। সকলেই দেখেছে সেটা অথচ অভিযোগ জানাতে আসলে আপনারা সেটা গ্রহণ করেননি। এমন করার রিজনটা জানতে পারি?
ভদ্রলোক ঘেমে উঠেন আরশিয়ানের প্রশ্নে। কোনো জবাব দিতে পারেন না। আরশিয়ান সময় নষ্ট না করে ভিপি কে বলে,
–” ডেপ্টের হেড, কোর্ডিনেটর এবং এডমিন অফিসার কে আসতে বলো। ”
বেচারা ভিপি জানের ভয়ে তাই করে। আরশিয়ান তাদেরকেও সেইম প্রশ্ন করে তবে ঘরের এককোনায় সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাজরিয়ানের পানে চোখ পড়তেই সকলে ভয়ে জুবুথুবু হয়ে চুপসে যায়।
আরশিয়ান বুঝে এভাবে কাজ হবে না। যমের সামনে মুখ খুলে কেই-বা প্রাণ হারাতে চাইবে? তাই ঝামেলা না বাড়িয়ে সরাসরি মেসেজ পাঠায় প্রিমাকে। লিখে,
–” গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেহরিমাকে নিয়ে ইমিডিয়েটলি ভার্সিটিতে আসুন। ”
মেহরিমাকে শাওয়ার নিতে পাঠিয়ে একটুখানি চোখ বুঁজেছিল প্রিমা। আচমকা ফোনের লাউড ম্যাসেজ টিউনে ঘুমটা আলগা হয়ে আসে তার।ফোন হাতড়ে নিভু নিভু চোখে মেসেজটা দেখতেই ঘুম উড়ে যায় রীতিমতো ।
চোখ কচলে উঠে বসে প্রিমা। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ভোঁ ভোঁ শব্দে কেঁপে উঠে ফোনটা। কল এসেছে একটা আননোন নম্বর থেকে।
প্রিমা কৌতূহল বশত রিসিভ করে রিনিঝিনি কন্ঠে সালাম দেয়। খানিক্ষণ নীরবতার পর অপর পাশ থেকে কেউ একজন অনুতপ্ত গলায় শুধায়,
–” ঘুমচ্ছিলেন আপনি ? আমি কী ভুল সময়ে কল দিয়ে ফেলেছি? ”
কন্ঠের মালিক আর কেউ নয় বরং আরশিয়ান। তাই না চাইতেও প্রিমা বিরক্তির স্বরে জবাব দেয়,
–” রাতে ঘুম হয়নি। সকালে আবার আরেক কাহিনী হলো। তাই…
আরশিয়ান তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে,
–” দুঃখিত ডিস্টার্ব করার জন্য। আমি জানতাম না আপনি ঘুমাচ্ছেন। আপনি বরং রেস্ট..
আরশিয়ান কথা শেষ করার আগেই প্রিমা জিজ্ঞেস করে,
–” মেহুকে নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে আসতে বলেছিলেন কেনো? ”
আরশিয়ান নরম সুরে বলে,
–” তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। ভার্সিটির অথরিটি এবং তাজরিয়ান আপনার বোনের কাছে ক্ষমা চাইতো আরকি।
বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় প্রিমার। অবিশ্বাস্য কন্ঠে শুধায়,
–” কী বললেন?
প্রিমা বেশ ভালোই চমেকেছে। অবশ্য চমকানোর মতোই ব্যপারটা। আরশিয়ান তাকে আশ্বস্ত করতে পুনরায় বলে,
–” ঠিক শুনেছেন আপনি। তবে এটা আপনার ঘুমের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেশ ভালোই ধকল যাচ্ছে কাল থেকে। এমতবস্থায় ঘুম পূরণ না হলে..
আরশিয়ানের শান্ত ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো শুনে ঘরে উপস্থিত প্রক্টর, ভিপি, কোঅর্ডিনেটর এবং ডিপার্টমেন্ট হেড হতভম্ব চোখে তাকায়। তাদের মরণ দশায় রেখে অন্যকে ঘুমাতে বলা হচ্ছে?
–” May I come in sir?
মেয়েলি কন্ঠের প্রশ্নে অফিস-রুমের নিস্তব্ধতা ভাঙে। সকলেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দরজার দিকে। মনের অজান্তেই অপরাধী খেতাবপ্রাপ্ত তাজরিয়ানেরও চোখ যায় সেদিকে।
ভুলটা বোধহয় ওখানেই হয়। শাড়ি পরিহিত অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী মেহরিমাকে দেখে তাজরিয়ান এর কঠিন চোখ জোড়া নরম হয়ে আসে ক্ষণিকের জন্য। বুকের ভেতর কিছু একটা হয়।
তবে মেহরিমার নির্লিপ্ত মুখাবয়ব দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় তার। মানুষের চোখে নিজের নামের আতঙ্ক দেখে অভ্যস্ত সে। অথচ এই দেড় ফুটের বার্বিডল তাকেই নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে।
আরশিয়ানের কল পেয়ে আর একমুহূর্ত অপেক্ষা করেনি প্রিমা। চটজলদি মেহরিমাকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে ভার্সিটিতে। তবে ভেতরকার আবহাওয়া দেখে শঙ্কিত হয় বেচারি।
অফিসের রাজকীয় সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে আরশিয়ান। তার পেছনে দু’জন গার্ডস দাঁড়ান। ডান পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অথরিটির সকল সদস্য । বাম পাশে ভাবলেশহীন ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে দ্যা গ্রেট তাজরিয়ান জাওয়াদ চৌধুরী এবং তার এসিস্ট্যান্ট তামজিদ হোসেন।
প্রিমাকে ভেতরে আসতে দেখে আরশিয়ান তাড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। সৌজন্য ভরা কন্ঠে শুধায়,
–” আসতে অসুবিধা হয়নি তো?
উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।প্রিমা সবার বিস্ময়াভিভূত কাঁদো কাঁদো মুখাবয়ব দেখে ইতস্তত করে বলে,
–” না..
আরশিয়ান বুঝতে পারে তার অস্বস্তি তাই চটজলদি ব্যপারটা শেষ করতে চায়।কয়েক কদম এগিয়ে এসে মেহরিমার সামনে দাঁড়িয়ে অনুতপ্ত গলায় বলে,
–” এমুহূর্তে একজন মন্ত্রী নয় বরং অন্যায়কারীর ভাই হিসেবে এসেছি তোমার দারপ্রান্তে। আমি জানি আমার ভাই যেটা করেছে সেটা ক্ষমার অযোগ্য কিন্তু তবুও আমি শেষ চেষ্টাটা করতে চাই। তোমার হারিয়ে যাওয়া সম্মান হয়তো আমি ফেরাতে পারব না তবে এই সমাজ যেনো তোমায় প্রশ্নবিদ্ধ না করে অতটুকু দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। সম্ভব হলে মাফ করে দিয়ো এই ব্যর্থ ভাইকে।
কথাটা মারাত্মক ভাবে আঘাত করে তাজরিয়ানের ইগোকে। সে জলন্ত চোখে তাকায় ভাইয়ের দিকে। তার ভাই নত হচ্ছে, তা-ও আবার তার জন্য? নাহ্ তার জন্য নয়.. ওই মহিলার জন্য। যাকে আরশিয়ান তার থেকেও বেশি ভালোবাসে। কথাটা জ্বালা ধরিয়ে দেয় তাজরিয়ানের ভেতর। রাগ-ক্ষোভে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার।
ওদিকে মেহরিমা ক্লান্ত চোখে তাকায় আরশিয়ানের পানে। প্রকাশ করে না ঠিকই তবে ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙেচুরে যাচ্ছে সে। এসব ক্ষমাপ্রার্থনা তার কাছে স্রেফ মেকি নাটক মনে হচ্ছে। যে মানুষ নিজ থেকে অনুতপ্ত নয় তাকে জোর করে স্যরি বলিয়ে কী লাভ? আরশিয়ান উত্তরের আশায় চেয়েছিল বিধায় নম্র কন্ঠে বলল,
–” আমি এটাকে দূর্ঘটনা ভেবে ভুলে যেতে চাই।
আরশিয়ান ঠিকই টের পায় মেহরিমার অনাসক্তি। তাই তাজরিয়ানকে ইশারায় স্যরি বলতে বলে। ভাইয়ের ইশারা উপেক্ষা করতে পারেনা তাজরিয়ান। জলদগম্ভীর স্বরে ” স্যরি ” বলে ত্রস্ত পায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার যাওয়ার পানে উৎসুক চোখে চেয়ে থাকে কয়েক জোড়া চোখ। অনেকেই আবার হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।
তামজিদ বেচারা না পারতে ছুটে যায় তাজরিয়ানের পিছু। এক দৌড়ে পার্কিং লটে যেতেই দেখে তাজ সবে গাড়ি আনলক করেছে। সে-ও আর একমুহূর্ত দেরি না করে ফ্রন্ট সিটে উঠে পড়ে। তাজরিয়ান তাকে দেখে কিছু বলে না। গাড়ি বের করতে গিয়ে অধৈর্য্য হয়ে কয়টা গাড়ি ড্যামেজ করে বসে। ঠুস ঠাস আঘাতের শব্দে তামজিদ চোখবুঁজে মনে মনে পড়ে,
–” ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন৷
মিনিট খানেকের মাঝে গাড়ি পার্কিং লট পেরিয়ে মেইন রোডে ওঠে৷ সমস্ত ট্রাফিক রুলস ভেঙেচুরে বেপরোয়া ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে থাকে তাজরিয়ান। তামজিদ ভয়ে সিঁটিয়ে যায় সিটের সাথে। তার অবস্থা দেখে তাজরিয়ান বাঁকা হেসে শুধায়,
শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১০
–” মানুষ কখন স্যরি বলে তামজিদ?
তামজিদ তোতলানো কন্ঠে জবাব দেয়,
–” ভুল করলে..
তাজরিয়ান ডেভিল হাসি দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
–” স্যরি বলা শেষ। এবার ভুল করার পালা..
