Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১২

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১২

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১২
রুহানিয়া ইমরোজ

তাজরিয়ান বেরিয়ে যেতেই অফিস রুমের অবস্থা আবারও থমথমে হয়ে যায়। আরশিয়ান টের পায় তার ভাই ভীষণ হার্ট হয়েছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেনো করে ওঠে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে বলে,
–” মাফ চাওয়ার জন্য আলাদা করে ইনভাইটেশন দিতে হবে আপনাদের ?
আরশিয়ানের ত্যাড়া কথায় সকলে ভড়কে যায়। এক মুহূর্ত দেরি না করে যে যার মতো স্যরি বলে। এসব দেখে তাচ্ছিল্য হেসে প্রিমা বলে ওঠে,
–” অভিনেতা হিসেবে সেরা আপনারা।
প্রক্টর সাহেব না পারতে জিজ্ঞেস করে বসেন,
–” মানে?
প্রিমা গর্জে উঠে বলল,

–” অন্যায় দেখে আপনাদের মূল্যবোধ জেগে উঠেনি কিন্তু আজ যখন স্বয়ং এমপি সাহেব উপস্থিত হয়েছেন তখন আপনাদের গ্লানিবোধের শেষ নেই। আপনারা চাইলে তৎক্ষনাৎ একটা ব্যবস্থা নিতে পারতেন।
সবার মুখ কালো হয়ে যায় প্রিমার কথায়।ওদিকে আরশিয়ান সরু চোখে তাকায় তাদের দিকে। সকলে ফাঁকা ঢোক গিলতে থাকে। আরশিয়ান না পারতে তার সাথে থাকা একজন অফিসার কে বলে,
–” ইনকোয়েরি কমিটি গঠন করুন। আজ পর্যন্ত এই ভার্সিটিতে হওয়া সকল সমস্যা নিয়ে ইনভেস্টিগেট করুন। সপ্তাহখানেকের মধ্যে আমার রেজাল্ট চাই। মেইক শিওর, ততদিন যেনো ভার্সিটির সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
সকলের মাথায় রীতিমতো বাজ পড়ে। মেহরিমা এবং প্রিমাও চমকে উঠে। প্রক্টর সাহেব এগিয়ে এসে হাত জোড় করে বলেন,

–” মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আমাদের দ্বারাও হয়েছে। প্লিজ স্যার.. শেষ একটা সুযোগ দিন। ম্যাম.. আমরা লজ্জিত নিজ কর্মের জন্য। আসলে আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এজন্যই..
উনার অনুনয় দেখে প্রিমা দোটানায় পড়ে যায়। পাশ থেকে মেহরিমাও বলে,
–” আমি আর কোনো ঝামেলা চাইছি না আপা। প্লিজ এসব বন্ধ করো।
কী বলবে বুঝতে না পেরে আরশিয়ানের দিকে তাকায় প্রিমা। সাথে সাথেই দুজনের চোখাচোখি হয়। প্রিমা না পারতে বলে উঠে,
–” উনাদের কী শেষ একটা সুযোগ দেওয়া যায় না স্যার?
আরশিয়ান থমথমে দৃষ্টিতে তাকায় প্রিমার দিকে। গম্ভীর স্বরে শুধায়,
–” আর ইয়্যু শিওর?
প্রিমা ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,

–” জ্ জ্বী
একটা বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে আরশিয়ান বলে উঠে,
–” ফাইন.. লাস্ট চান্স দেওয়া হচ্ছে আপনাদের। এরপর যদি আর কোনো..
প্রক্টর সাহেব তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন,
–” ন্ নো নো স্যার এমন কিছুই হবে না।
আরশিয়ান ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে,
–” গুড ফর ইয়্যু..
কথাটা শেষ করে প্রিমার সামনে এসে দাঁড়ায় আরশিয়ান। জলদগম্ভীর স্বরে বলে,
–” গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণে আপনার ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হলো। সন্ধ্যায় একটা মিটিং আছে ইয়্যু হ্যাভ টু জয়েন মাস্ট।
বার্তাটুকু দিয়েই প্রিমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় আরশিয়ান। তার পিছু ছুটে যায় সমস্ত গার্ডস। এক মুহূর্তের জন্য প্রিমা ঘোরের মাঝে চলে যায়। আরশিয়ান যথেষ্ট নরম সুরে কথা বলে তার সাথে অথচ আজ তার কন্ঠে ছিলো অজানা এক কঠোরতা।
প্রিমাকে ভাবনায় মশগুল হতে দেখে মেহরিমা বলে,

–” আপা? বাসায় যাবা না?
প্রিমার হুঁশে ফিরে তার ডাকে। উত্তর দিতে যাবে এমন সময় আচমকা তার ফোন বেজে উঠে। কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে কেউ বলে উঠে,
–” মিস ফারজানা ইয়াসমিন তুলির অভিভাবক বলছেন?
অজানা শঙ্কায় প্রিমার বুক ধড়ফড়িয়ে উঠে। কোনোমতে বলে,
–” জ্বী।
অপর পাশে থাকা ব্যাক্তি রোবোটিক স্বরে বলে,
–” সময় থাকলে কাইন্ডলি একবার হসপিটালে আসুন ম্যাম। ফারজানা ম্যামের রিপোর্ট নিয়ে হার্ট স্পেশালিষ্ট ইশতিরাজ চৌধুরী আপনাদের সাথে কথা বলতে চান।
প্রিমা ঘাবড়ে যাওয়া কন্ঠে বলে,
–” জ্বী আসছি..

লাস্ট অপারেশনটা শেষ হতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচে ইশতিরাজ। পেশেন্টের স্টেবল কন্ডিশন দেখে কিছু নির্দেশনা দিয়ে ফলো আপে রাখতে বলে ওটি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বাইরে বেরুতেই তার এসিস্ট্যান্ট বলে উঠে,
–” স্যার..
তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ইশতিরাজ ক্লান্ত গলায় বলে,
–” আম ডান ইমাদ। কোনো ইমার্জেন্সি থাকলে অন্য ডক্টরকে আসতে বলো নাহলে রোগীকে অন্য কোথাও পাঠাও। আর কোনো পেশেন্ট হ্যান্ডেল করার এবিলিটি নেই আমার মধ্যে।
ইশতিরাজের কথায় তার এসিস্ট্যান্ট ইমাদ চুপসে যায়। কিইবা বলবে সে? টানা বত্রিশ ঘন্টা ধরে ডিউটি করছে মানুষটা। এর মধ্যে হার্ডলি চার কিংবা পাঁচ ঘন্টা হয়তো ঘুমিয়েছে। এতক্ষণ ডিউটিতে থাকার পর তার অধৈর্য হয়ে ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়।
ইশতিরাজ বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে করিডর পেরিয়ে যাওয়ার সময় ফারজানার কেবিনের বাহিরে দু’জন অল্প বয়স্কা রমণীকে দেখল। না চাইতেও ভ্রু কুঁচকে আসল তার। গরম হয়ে যাওয়া মেজাজটা শিথিল হলো খানিকটা। তাকে হুট করে থামতে দেখে ইমাদ বলল,

–” উনাদের কথায় বলছিলাম স্যার। আপনি কথা বলার জন্য আসতে বলেছিলেন..
ইশতিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” দুজনের মধ্যে যার নাম মিস লাড্ডু তাকে পাঁচ মিনিট পর কেবিনে পাঠিয়ে দাও।
ইমাদ মাথা চুলকে বলল,
–” ওকে স্যার।

ফারজানার ফাইলে চোখ বুলাচ্ছিল ইশতিরাজ। এর মাঝে আচমকা দরজায় নক পড়ে। শব্দ শুনে মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
— ” কাম ইন..
প্রিমা দুরুদুরু বুকে ভেতরে প্রবেশ করে। ইশতিরাজ তার মুখপানে চেয়ে মনের অবস্থা ঠিকই ধরে ফেলে। তাই মুখের বিমর্ষ ভাবটাকে বদলে হাসিমুখে বলে,
–” প্লিজ সিট ডাউন মিস লাড্ডু..
ডাকটা শুনে কিঞ্চিৎ ভিমড়ি খায় প্রিমা। নামটা তারই তবে এটা কেবল ফারজানা ডাকে। তাকে ভড়কাতে দেখে ইশতিরাজ মৃদু হেসে বলল,
–” প্লিজ বি ইজি…
প্রিমা তৎক্ষনাৎ সামলে নেয় নিজেকে। অস্ফুটস্বরে বলে,
–” রিপোর্টসে কী এসেছে?
প্রিমার কন্ঠে স্পষ্ট ভয়। ইশতিরাজ তার শঙ্কা বুঝতে পেরে সাবলীল গলায় বলল,
–” আলহামদুলিল্লাহ সবকিছু নরমাল। ফিজিক্যাল রিপোর্টে কোনো ইস্যু নেই। সমস্যাটা ভিন্ন জায়গায়। সেটা নিয়ে কথা বলতেই ডাকা হয়েছে আপনাকে।
প্রিমা খানিকটা আশ্বস্ত হয়। ইতস্তত কন্ঠে বলে,

–” কোন বিষয়ে সমস্যা?
ইশতিরাজ আর ভনিতা না করে সোজা গলায় বলে,
–” আমরা যাবতীয় প্রমাণ এবং জিজ্ঞেসাবাদের পর জানতে পেরেছি, দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনে থাকায় মিস ফারজানা সুইসাইড করেছিলেন।
প্রিমা ক্ষীণ স্বরে বলল,
–” জানি।
ইশতিরাজ অবাক হলো তার কথায়। ফারজানা এত বাজে ভাবে ডিপ্রেসড সেটা জানার পরও কেনো হাত গুটিয়ে বসেছিল তারা? প্রশ্নটা জিহ্বার আগালে আসলেও সেটা জিজ্ঞেস করল না ইশতিরাজ। প্রিমা কে বাজিয়ে দেখতে মোক্ষম কথাটা বলল,

–” জ্ঞান ফেরার পর থেকেই আপনার বোনের বার বার প্যানিক এট্যাক আসছে। আজ সকাল ছয়টার দিকেও এমনটা হয় তবে এট্যাক আসার পর তিনি বারংবার বলতে থাকেন, ছুঁবেন না আমাকে.. দূরে থাকুন। আমার জানামতে এরকম কথাবার্তা তখুনি আসে যখন ভিক্টিমকে সেক্সুয়ালি হ্যারাস করা হয়।
সব শুনেও প্রিমা নিশ্চল থাকে । এতে তুখোড় মাইন্ড রিডার ইশতিরাজ খুব ভালো মতো বুঝে যায়, এই বিষয় সম্পর্কেও প্রিমা আগে থেকেই অবগত। তাই গলা ঝেড়ে পুনরায় বলল,
–” কথা বলে যতটুকু বুঝলাম, আপনি এসব বিষয়ে অবগত। কেইসটা এত সিরিয়াস জেনেও হাত গুটিয়ে কেনো বসেছিলেন তা জানা নেই আমার। তবে দুঃখ জনক হলেও জানাতে হচ্ছে যে, মিস ফারজানার মেন্টাল কন্ডিশন এখন উনার বডির উপরও ইমপ্যাক্ট ফেলতে শুরু করেছে।
সামান্য থেমে ইশতিরাজ পুনরায় বুঝিয়ে বলে,

–” অতিরিক্ত স্ট্রেস থেকে প্যানিক এট্যাক হচ্ছে। এই এট্যাক সরাসরি হার্টে ইফেক্ট ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় হার্ট এট্যাক বা ব্রেইন স্ট্রোক হবে উনার৷ তখন আর কিছুই করার থাকবে না৷
প্রিমা হকচকিয়ে উঠে ইশতিরাজের কথায়। শঙ্কায় বুক কাঁপে তার। হড়বড়িয়ে বলে উঠে,
–” আপা কে ঠিক করার কোনো উপায় নেই ডক্টর?
ইশতিরাজ সহজ গলায় বলে,
–” ইমিডিয়েটলি একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হলে হয়তো…
ইশতিরাজ শেষ করতে পারেনি কথাটা তার আগেই প্রিমা মৃদু আর্তনাদ করে বলে,
–” অসম্ভব..
ইশতিরাজ নিজেও চমকায় কিছুটা। অবাক হয়ে বলে,
–” কেনো? ”
প্রিমার চোখ ভরে উঠে অশ্রুতে। অসহায় কন্ঠে বলে,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১১

–” এমনটা করলে.. মরে যাবে আমার বুবু।
ইশতিরাজ ভীষণ অবাক হয় তার কথায়। ডিপ্রেশন এর রোগী সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেলে মরে যাবে.. এটা কেমন লজিক? প্রিমার হাল বেহাল। তার চোখ মুখে লেপ্টে আছে আতঙ্ক। ভয়ে তিরতির করে কাঁপছে তার শরীর।
কোনোকিছুই ইশতিরাজের চোখ ফাঁকি দিতে পারল না। কিছু সময় পেরোতেই পরিশেষ বুঝতে সক্ষম হলো, ভয়ংকর কোন অতীত আছে ফারজানার। আর এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে জানতে হবে সেই রহস্যে মোড়ানো অতীত।

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৩