শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৩
রুহানিয়া ইমরোজ
ইশতিরাজ হার্ট স্পেশালিষ্ট হলেও হিউম্যান সাইকোলজি খুব ভালো মতো বুঝে। মানুষকে সহজে বশীভূত করা, ফাঁদে ফেলে কথা বের করা তার বাঁ হাতের কাজ। ফারজানার অতীত জানার জন্য প্রিমার সাথেও সেইম কাজটা করতে বাধ্য হয় ইশতিরাজ।
প্রথমে খারাপ পরিণতির কথা বলে ভয় পাইয়ে দেয়।এরপর প্রিমাকে ধাতস্থ হতে কিছুক্ষণ সময় দেয়। কী করবে বুঝতে না পেরে প্রিমা যখন অস্থির হয়ে যায় তখন ইশতিরাজ শীতল কন্ঠে বলে,
–” আমি কেবল পেশেন্টের অবস্থা জানালাম বাকি সিধান্ত আপনাদের হাতে। ভেবে দেখুন কী করবেন। তবে খুব বেশি দেরি কইরেন না। উনার কন্ডিশন খুব একটা স্টেবল নয়। একবার বেঁচে ফিরেছেন, বার বার কিন্তু ফিরবেন না।
প্রিমা পুরোপুরি ভাবে জব্দ হয়ে যায়। ইশতিরাজের হুঁশিয়ারি বার্তা তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। যার কথা ভেবে এত বড় সিধান্ত নিয়েছে দিনশেষে সেই যদি না বাঁচে তাহলে..
আর ভাবতে পারে না প্রিমা। অভিভাবক বলতে ওই একটা মানুষই আছে তার। যে তাকে বাচ্চাদের মতো আহ্লাদ করে। বড়দের মতো শাসন করে। তার মনে জমায়েত সব কথা শুনে। সব সিচুয়েশনে সাপোর্ট দেয়। ফারজানার কিছু হলে সত্যি সত্যি এতিম হয়ে যাবে প্রিমা।
সবকিছু ভাবতে ভাবতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে প্রিমা। ইশতিরাজ খুব সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পরখ করছিল প্রিমাকে। সে যখনই আতঙ্কিত হতে শুরু করে তখুনি লাস্ট ডোজ হিসেবে ইশতিরাজ বলে,
–” এবার আপনি আসতে পারেন মিস প্রিমা। কথা শেষ আমার..
প্রিমা হকচকিয়ে উঠে বলে,
–‘ ক্ কিন্তু কোনো সমাধান পেলাম না তো।
ইশতিরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
–” আপনি তো সমস্যার কথায় জানাননি আমাকে। সমাধান আশা করছেন কীভাবে?
প্রিমা নিজের ভুলটা বুঝে একমুহূর্তের জন্য চুপ হয় এরপর বলে,
–” আমার বোন আদৌ..কখনো সুস্থ হবে?
ইশতিরাজ তার চোখে চোখ রেখে বলল,
–” সুস্থতা সৃষ্টিকর্তার হাতে তবে আমরা চেষ্টা করতে পারি।
প্রিমা ধীর কন্ঠে শুধাল,
–” এখন কী করা উচিত আমার?
ইশতিরাজ সোজাসাপ্টা বলে,
–” সমস্যাটা যেহেতু মানসিক সেহেতু সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত আপনাদের।
প্রিমা অসহায় গলায় বলল,
–” সম্ভব নয় ডক্টর..
কথা বলার সাথে কিঞ্চিৎ ফুঁপিয়ে উঠে বেচারি। তা দেখে মায়া হয় ইশতিরাজের। টিস্যু বক্সটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
–” রিল্যাক্স.. কান্না করতে হবে না। বুঝিয়ে বলুন সবটা। আমি চেষ্টা করব সমাধান বের করার। উদ্দেশ্য যেহেতু নেক সেহেতু উপরওয়ালা নিশ্চয়ই পথ দেখাবেন আমাদের।
প্রিমা টিস্যু নেয় না। কাতর চোখে ইশতিরাজের দিকে চেয়ে রুদ্ধ কন্ঠে শুধায়,
–” ক্যান আই ট্রাস্ট ইয়্যু ডক্টর?
প্রিমার কথায় কী ছিলো কে জানে। বুক কেঁপে উঠে ইশতিরাজের। তার পঞ্চম ইন্দ্রিয় জানান দেয়, খুব ভয়ংকর কিছু জানতে যাচ্ছো তুমি। ইশতিরাজ খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে প্রিমাকে আশ্বস্ত করতে বলে,
–” থাউজ্যান্ড টাইমস..
প্রিমা বিশ্বাস করতে পারে না। তবুও পরিস্থিতির বিবেচনায় এটাকে মিথ্যে আশ্বাস ভেবে গ্রহণ করে। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলে,
–” সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভব নয় কারণ মাস দুয়েক আগে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের দ্বারা যৌ*ন হয়রানির স্বীকার হয় বুুবু। ওটার পর থেক্..
কথা আঁটকে আসে প্রিমার। কান্নার তোড়ে ফুলে উঠে নাকের পাটা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে। ইশতিরাজ চমকায় না কারণ আগেই ধারণা করেছিল এমন কিছু। তাই স্বাভাবিক কন্ঠে শুধাল,
–” সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে কেনো যেতে হয়েছিল আপনার বোনকে?
প্রিমা বিষন গলায় বলে,
–” এক ভয়ংকর অতীতের স্মৃতি ভুলাতে..
ইশতিরাজ আগ্রহী কন্ঠে বলে,
–” কিসের স্মৃতি?
প্রিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে,
–” মধ্যবিত্ত পরিবারের আদুরে সন্তান ছিলেন উনি। মা, বাবা এবং বড় ভাই মিলিয়ে চার সদস্যের ছোট্ট পরিবার ছিলো । বাবা ছিলেন আর্মি অফিসার, আর মা জার্নালিস্ট। দু’জনে জব হোল্ডার হওয়ায় তার থেকে বছর সাতেকের বড় ফারনাজ ভাইই উনাকে কোলেপিঠে মানুষ করে। এজন্যই দু’ভাইবোন এর বন্ডিংটাও ছিলো চমৎকার।
এতটুকু বলে সামান্য থামে প্রিমা। শ্বাস টেনে পুনরায় বলতে শুরু করে,
–” সবকিছু ভালোই যাচ্ছিল কিন্তু আকস্মিক একটা ঝড় এসে লন্ডভন্ড করে দেয় সবকিছু। সকাল বেলা ফারনাজ ভাই ভার্সিটির উদ্দেশ্য বেরোয় ঠিকই কিন্তু ফিরে আসে লাশ হয়ে। আংকেলের শত্রুপক্ষের কেউ একজন ফারনাজ ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। কাজটা এত দ্রুত হয় যে কেউ টেরই পাইনি।
ইশতিরাজ নড়েচড়ে বসে এপর্যায়ে। কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে আসে প্রিমার। কোনোরকমে ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে পুনরায় বলতে শুরু করে,
–” বুবুর উনিশতম জন্মদিন ছিলো সেদিন। যথারীতি জলদিই ফেরার কথা ছিলো ভাইয়ার কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পরও সে নিখোঁজ। মা- বাবা তো তাকে সময় দেয়না এখন ভাইও ব্যস্ততা দেখাচ্ছে ভেবে ভীষণ অভিমান করে বসে বুবু। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে আচমকা কলিংবেল বেজে উঠে। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতেই আনন্দে চোখজোড়া চকচক করে উঠে উনার। কারণ মেইন ডোরের সামনে রাখা ছিলো একটা মাঝারি সাইজের র্যপিংয়ে মোড়ানো গিফট বক্স।
প্রিমা আবারও থামে। পরের কথাটুকু বলার সাহস জোটে না। ইশতিরাজ নিজেও আন্দাজ করতে পারে বিষয়টা। থামাতে যাবে এমন সময় প্রিমা কম্পিত কন্ঠে বলে উঠে,
–” বুবু গিফট বক্স খুলে ভেতরের দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠে ছিটকে পড়ে এক পাশে। ভয়ে কেঁপে উঠে তার অন্তরাত্মা কারণ বক্সের একপাশে রাখা ছিলো নাজ ভাইয়ের কাটা মাথা। অন্যপাশে মাঝারি সাইজের ডেকচিতে ছিলো তার খণ্ডিত মাংসের তরকারি..
ইশতিরাজ বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মৃত্যু মানা যায় তাই বলে মানুষের মাংসের তরকারি? ইশ্ কী নৃশংসভাবেই না মেরেছে ছেলেটাকে। বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রিমা ফুঁপিয়ে উঠে রীতিমতো। ইশতিরাজ নিজ দায়িত্বে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় তার দিকে।
প্রিমা কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ হাত বাড়িয়ে নিয়ে নেয় সেটা। কয়েক ঢোক পানি পান করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। ইশতিরাজ তাকে একটু ধাতস্থ হতে দেখে কৌতূহলী কন্ঠে শুধায়,
–” উনার বাবা মা কোথায় এখন?
প্রিমা ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়,
–” ভাইয়ার মৃত্যুর বারোদিন পর রোড এক্সিডেন্টে মারা যান উনারা।
ইশতিরাজের নিজেরই অসহায় লাগে এবার। এত ভয়ানক অতীত মেনে নিয়ে মুভ অন করা ভীষণ কঠিন। কতোইবা বয়স হবে ফারজানার? সবে শুরু হয়েছে জীবনটা অথচ এতটুকু বয়সেই কতকিছু দেখে ফেলেছে। আর ভাবতে পারে না ইশতিরাজ। ক্লান্তিতে মাথা গুলিয়ে যায় তার। প্রিমার পানে চেয়ে মৃদু স্বরে বলে,
–” ক’দিনের দুনিয়ায় বেড়াতে এসে আকাশসম যন্ত্রণা পেয়ে বসেছেন উনি। উনাকে অবজারভ করে যা বুঝলাম, অতিরিক্ত ট্রমাটাইজড হয়ে ঘোরের মাঝে চলে গেছেন উনি। যেখানে কোনোকিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না উল্টো বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন উনি।
প্রিমা শঙ্কিত মুখে চেয়ে বলে,
–” এখন উপায়?
ইশতিরাজ ক্লান্ত গলায় বলে,
–” আমাকে একটু সময় দিন। আমি সবকিছু সেট-আপ করে আপনাকে জানাব। ডোন্ট ওয়ারি মিস লাড্ডু..
শুরুর দিকের কথা গুলো ভালো লাগলেও লাস্টের ডাকটা শুনে জোরপূর্বক হাসল প্রিমা। কারেক্ট করে দিতে গিয়েও থেমে গেল। যদি কিছু মনে করে? তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে যদি ফারজানার চিকিৎসায় ফাঁকি দেয়.. এসব ভয়ে কিছু বলল না প্রিমা। বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কেবিন থেকে।
ফারজানার কেবিনের বাহিরে সিটিং এরিয়ায় বসে ঝিমচ্ছিল মেহরিমা। গত দুদিনের ধকলে নাজেহাল অবস্থা তার। জ্বরতপ্ত দুর্বল শরীরটা আর চলছে না। তবে মস্তিষ্কে ঘুরছে হাজারটা প্রশ্ন। সেই সাথে শঙ্কায় বুক ধড়ফড় করছে।
তাজরিয়ান জাওয়াদ চৌধুরী নত হয়েছে তাও আবার তার মতো একটা মেয়ের সামনে কথাটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে মেহরিমার। কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারছে না কেনো জানি।
ভাবনায় বুঁদ মেহরিমার হুঁশ ফেরে আচমকা কেউ এসে পাশে বসায়। চমকে উঠে ঘাড় ঘুরাতেই দেখে মানুষটা আর কেউ নয় বরং তারই বোন প্রিমা। তাই স্বস্তির শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে,
–” ডক্টর কী বলল আপা?
প্রিমা সমস্যা গুলো গোপন করে জানায়,
–” তেমন কোনো ফিজিক্যাল ইস্যু নেই। হার্টে একটু সমস্যা ধরা পড়েছে শুধু। ক’দিন ট্রিটমেন্ট নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেহরিমা ম্লান গলায় শুধাল,
–” কবে জান আপুনিকে নিয়ে বাসায় যাব আমরা? আর ভাল্লাগছে না। বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মনে হয় সব শূন্য। কেউ নেই.. কিছু নেই..
মেহরিমার ফ্রাস্ট্রেশন বুঝতে পেরে তাকে এক হাতে জড়িয়ে নেয় প্রিমা। বোঝানোর স্বরে বলে,
–” শরীরের চোট গুলো ঠিক হতে সময় লাগবে। এর আগে বাসায় নিয়ে গেলে অনেক ঝামেলা হবে৷ একটু আধটু সমস্যার জন্য হসপিটালে ছুটে আসতে হবে তখন..
মেহরিমা বুঝদারের মতো মাথা নাড়িয়ে বলে,
–” হুঁ বুঝলাম। এক্ একটা কথা বলি আপা?
প্রিমা সম্মতি জানিয়ে বলল,
–” হাজারটা বল সোনা…
মেহরিমা ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
–” ভয় হচ্ছে আমার…
প্রিমা ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
–” কিসের ভয়?
মেহরিমা ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,
–” পাগলকে খেপিয়ে এসেছি৷ এখন যদি ঝামেলা করে? তাজরিয়ান জাওয়াদ চৌধুরী এত সহজে হেরে যাওয়ার মানুষ না..
কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। প্রিমার কপালেও চিন্তার বলিরেখা ফুটে ওঠে তবুও বোনকে আশ্বস্ত করতে বলে,
–” ওভারথিংক করছিস মেহু। তাছাড়াও মন্ত্রী সাহেব তো আছেনই। এত চিন্তা কিসের?
মেহরিমা মেঝেতে দৃষ্টি ফেলে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
–” লাগামহীন ঘোড়া কারও কথা শুনে না আপা৷ জেদ পূরণ করতে গিয় সবকিছু তছনছ করে তবেই থামে।
প্রিমা প্রত্যুত্তর করতে পারে না কারণ তাজরিয়ান আসলেই বশ্যতা স্বীকার করার মতো মানুষ নয়। প্রতিশোধপরায়ণতা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রথম এবং প্রধান উপাদান।
ভাবনায় মশগুল প্রিমার ধ্যান ভাঙে টুং করে আসা মেসেজের শব্দে। স্ক্রিন ওপেন করতেই তার শরীর জমে যায়। কারণ তাতে লেখা,
শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১২
–” 𝐒𝐨𝐦𝐞𝐨𝐧𝐞 𝐢𝐬 𝐰𝐚𝐢𝐭𝐢𝐧𝐠 𝐟𝐨𝐫 𝐡𝐢𝐬 𝐩𝐫𝐞𝐬𝐞𝐧𝐭. 𝐏𝐫𝐞𝐩𝐚𝐫𝐚𝐭𝐢𝐨𝐧 𝐧𝐢𝐲𝐞 𝐚𝐬𝐛𝐞𝐧 𝐩𝐫𝐞𝐦.
এরপর নিচে ছোট্ট করে এড্রেস দেওয়া। বার্তাটা পড়তেই গা হিম হয়ে আসে প্রিমার। মেসেজটা মোটেও সুবিধার না তার উপর লাক্সারিয়াস ফাইভ স্টার হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটের ঠিকানা দেওয়া। কী হতে পারে ভেবে আতঙ্কে জমে যায় প্রিমা।
