Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৬

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৬

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৬
রুহানিয়া ইমরোজ

পড়ন্ত বিকেল। এক্সাম শেষে হন্তদন্ত হয়ে হল ছেড়ে বেরুলো মেহরিমা। নিজের ভঙ্গুর অবস্থা আড়াল করতে দ্রুত পায়ে ছুটলো অজানায়। পেছন থেকে আদিল, ইমা, তাসফি, নিরব কত করে ডাকলো কিন্তু মেহু শুনলে তো?
ভার্সিটির পেছনে রয়েছে বিশাল এক পরিত্যক্ত পুকুর। যার আশপাশটা গাছগাছালিতে ভরা। দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানেই এসে থামলো মেহরিমা। নিজেকে সামলাতে না পেরে ধপ করে বসে পড়ল হিজল গাছের পাশটায়। দু হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠল সহসাই।
একটা ঘটনা তার জীবন পুরো তছনছ করে দিয়েছে। মানুষের বাঁকা নজর, ত্যাড়া কথা, টিপ্পনী, স্যারদের বিরক্তি ভাব সহ্য হচ্ছে না মেহরিমার। একেকজনের যা-তা মন্তব্য ভেঙেচুরে গুড়িয়ে দিচ্ছে মনটা।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর কান্না থামে মেহরিমার। নীরবে ফোঁপাতে থাকে কেবল। আচমকা চিল্লিয়ে বলে উঠে,

–” নিয়তি ছাড়বে না আপনাকে….
মেহরিমার বলা কথটা কানে আসতেই হো হো করে হেসে উঠে তাজরিয়ান। আই প্যাডের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা মেহুর অস্পষ্ট অবয়বে আঙ্গুল ছুঁইয়ে দারাজ গলায় বলে,
–” আমি নিজেই তোমাকে ধরতে আসছি সুইটহার্ট। নিয়তি খালা কে অযথা স্ট্রেস দিয়ো না ।
তাজরিয়ানের পেছনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা তামজিদ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। তাজরিয়ান গোপনে মেহরিমার উপর নজর রাখছে সেটা জানতো না। তাই বিস্মিত কন্ঠে শুধাল,
–” আপনি কী উনাকে কিডন্যাপ করার প্ল্যান করছেন স্যার?
তামজিদের কথা শুনে স্ক্রিনের উপর নজর রেখেই বাঁকা হেসে তাজরিয়ান বলল,
–” যেটা আপোষে পাবো সেটার জন্য জোরাজোরি করার দরকার আছে?
তামজিদ বোকার মতো মাথা নাড়িয়ে বলল,

–” না কিন্তু..
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই তাজরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
–” সামনে এসে দাঁড়াও তো তামা..
তামজিদ ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে বলল,
–” জ্ জ্বি স্যার?
তাজরিয়ান ভাবলেশহীন গলায় শুধাল,
–” তুমি কার এসিস্ট্যান্ট?
তামজিদ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
–” আ্ আপনার।
সেন্ট্রাল টেবিলের উপর থাকা গান টা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে পুনরায় তাজরিয়ান শুধাল,
–” তাহলে.. কার কথা শোনা উচিত তোমার?
তাজরিয়ানের হাতে গান দেখে ঘাবড়ে যায় তামজিদ।কাঁপা গলায় বলে,
–” আপনার।
উত্তর শুনে তামজিদের চোখে চোখ রেখে তাজ বলে,
–” এরপর থেকে নেতা সাহেবের কাছে যদি কোনো খবর পাচার করো তবে তোমার কবর তোমাকে দিয়েই খোঁড়াব আমি। মাইন্ড ইট..
তামজিদ হকচকিয়ে উঠে জবাব দেয়,

–” আপনার ভালোর জন্যই বসকে নিউজ দিতাম। ট্রাস্ট মি স্যার আমি একদম পিওর লয়্যাল..
তামজিদকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে তাজরিয়ান বলে উঠে,
–” দয়াল হওয়ার কোনো অপশন আমি রাখিনি তামা। এরপরেও যদি হও তাহলে তো..
বলেই হুট করে একটা ফাঁকা গুলি চালায় তাজ। তামজিদ লাফিয়ে উঠে ননস্টপ বলতে শুরু করে,
–” হবো না স্যার.. আমি কেনো? আমার বাপ, মা, বইন, খালাতো বউ, মামাতো শ্বশুর কেউই দয়াল হবে না। নো, নেভার এভার…
তামজিদের কর্মকান্ড দেখে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে তাজ। বিরক্তি মাখা গলায় বলে,
–” একজন স্বনামধন্য গ্যাংস্টারের পিএ হওয়ার পরও সামান্য গুলির শব্দে লাফাচ্ছো তুমি? শেইম অন ইয়্যু তামা..
তামজিদ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

–” গুলির শব্দ সামান্য হলেও শুটার তো অসামান্য। বিশ্বাস করুন স্যার.. উপরে আল্লাহ আর ধরণীতে আপনারে ছাড়া আর কাউকে ভয় পাই না আমি।
তাজরিয়ান মনে মনে হাসলো। বাহ্যিক ভাবে গম্ভীর ভাব বজায় রেখে বলল,
–” গুড ফর ইয়্যু..

সন্ধ্যার আগমন ঘটেছে ধরণীতে। অফিস আওয়ার প্রায় শেষের পথে। তবুও অধিবেশন শেষ করে শুধু মাত্র বউকে এক ঝলক দেখার জন্য ক্লান্ত শরীরে অফিসে এসেছে আরশিয়ান।
অফিসে এসে সোজা নিজের কেবিনের দিকে হাঁটা দেয়। চলতি পথে সকল এমপ্লয়িদের উপর নজর বোলাতে ভুলে না। ডান সারির মাঝ বরাবর কাজে মগ্ন প্রিমাকে দেখে হাঁটার গতি খানিকটা স্লথ হয়।
প্রিমাকে কেবিনে ডেকে নিবে ভেবে পুনরায় জোর কদমে নিজ কামরায় যেতে থাকে আরশিয়ান। তার ম্যানেজার আবির্ভাব আগে ভাগে গিয়ে তার জন্য দরজা খুলে। আরশিয়ান রুমে ঢুকতেই তার চোখ পড়ে সোফায় বসে থাকা আগন্তুকের উপর। সেই আগন্তুক আর কেউ নয় বরং তারই তিন মিনিটের বড় ভাই শওকাতুল ইশতিরাজ চৌধুরী।
সোফায় বসে এক মনে ম্যাগাজিন পড়তে থাকা রাজ কারও পদধ্বনির শব্দে চোখ তুলে তাকায়। সম্মুখে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে দেখে ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে বলে,

–” আরেএএএ.. এমপি সাহেব যে? কেমন আছেন?
ইশতিরাজের পাশের সোফায় ধপ করে বসে ক্লান্ত গলায় আরশিয়ান জবাব দেয়,
–” আলহামদুলিল্লাহ। তোর কী অবস্থা?
ইশতিরাজ ঠেঁস মেরে বলে,
–” বউ বিহীন বালকের যেমন অবস্থা হয় তেমনই আরকি।
আরশিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শুধাল,
–” এটাও জেনে গেছিস?
ইশতিরাজ চোখ মেরে বলল,
–” শুধু আমি নই তোর বেবি বয় তাজ মিয়াও জানে।
আরশিয়ান চমকাল না। সে জানতো এমন কিছুই হবে। তাই সে প্রসঙ্গে না গিয়ে সোজাসাপ্টা শুধাল,
–” ওসব ছেড়ে তোর এখানে আসার মতলবটা বল।
কথাটা শুনে স্মিত হাসলো ইশতিরাজ। গলা ঝেড়ে বলল,
–” সত্যিটা ধরে ফেলেছিস। কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে এসেছি। দিবি?
আরশিয়ান ক্লান্ত চোখে চেয়ে মলিন স্বরে বলল,

–” কখনো লুকিয়েছি কিছু?
সম্মতি পেয়ে ইশতিরাজ সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
–” কেনো করলি বিয়েটা?
আরশিয়ান ম্লান হেসে বলল,
–” ওকে না পাওয়ার আফসোস নিয়ে মরতে চাইনি তাই।
ইশতিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” তোর জীবন অনিশ্চিত। এমতবস্থায় মেয়েটাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নেওয়াটা বোকামি হয়ে গেলো না?
আরশিয়ান দারাজ গলায় জবাব দিল,
–” অলরেডি উনার জীবনটা গুছিয়ে দিয়েছি আমি। যারমধ্যে ভরণপোষণ, নিরাপদ, নিশ্চয়তা সবকিছুই বিদ্যমান।
ইশতিরাজ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–” আর ভালোবাসা? সাপোর্ট? সুখ স্বাচ্ছন্দ্য?
আরশিয়ান ধীর গলায় বলল,
–” উনি আমায় ভালোবাসে না রাজ। ইন ফিউচার সেটার কোনো রিজনও আমি দিবো না। আমার কিছু হয়ে গেলে, আমাদের অস্তিত্বই হবে উনার ভবিষ্যত।
আরশিয়ানের কঠোর স্বর ইশতিরাজ কে নাড়িয়ে দেয়। বেচারা নিস্তব্ধ হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। একটু থেমে আচমকা বলে উঠে,

–” তুই ভুল করছিস শান। বিরাট বড় ভুল করছিস। এটার জন্য পস্তাতে হবে তোকে। কারো অনুভূতি কন্ট্রোল রাখা যায় না কথাটা মনে রাখিস।
আরশিয়ান মলিন স্বরে বলল,
–” বাদ দোয়া দিস না ভাই। এমনিতেই এত যন্ত্রণা চারিদিকে। এরমধ্যে যদি..
ইশতিরাজ অনুতাপ মাখা গলায় বলল,
–” আমি ওভাবে বলতে চাইনি.. তবে আমার ধারণা যদি ভুল না হয় তাহলে প্রিমা বাজে ভাবে ফল করবে তোর উপর। সেই মুহূর্তে যদি তুই ওকে হার্ট করিস..
আরশিয়ান হকচকিয়ে উঠে বলল,
–” শাট আপ রাজ.. কী সব বলছিস। শী ইজ মাই ওয়াইফ.. হোয়াই উইল আই হার্ট হার?
ইশতিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমি শুধু এতটুকু বলব…এই ব্যপারটা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দে। তোদের বন্ডিংটা আরেকটু স্ট্রং হলে প্রিমাকে সবকিছু জানা এরপর বাকি সিধান্ত তার।
আরশিয়ান বুকে হাত রেখে অস্থির চিত্তে বলল,

–” কী বলব তাকে আমি? বলব যে, আমার বাবা তার পরিবারের খুনি? আমার বাবার কারণে মিস ফারজানা আজ এতিম। এসব শোনার পর, সে আদৌ থাকবে আমার কাছে?
ইশতিরাজ বোঝানোর স্বরে বলল,
–” সত্য অস্বীকার করতে পারবি? ক’দিন লুকিয়ে রাখবি এসব? ওকে এভাবে ঠকানো উচিত ? তোর সততা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না এখানে?
প্রশ্নগুলো কাটার মতো বিঁধল আরশিয়ানের গায়ে। চোখবুঁজে কোনোমতে বলল,
–” ঠকিয়ে হলেও ওরে আজীবন নিজের করে রাখতে চাই আমি। সততা কুরবানি দিলে যদি ওরে নিজের করে রাখা যায় তাইলে অসৎ হইতে আপত্তি নাই আমার ।
এর বিপরীতে বলার মতো কিছুই খুঁজে পেলো না ইশতিরাজ। অতিব প্রেমে পথভ্রষ্ট প্রেমিককে সতর্ক করতে বলল,
–” সাবধানে থাকিস। বাবা জানতে পারলে কিন্তু..
আরশিয়ান আশ্বাস দিয়ে বলল,
–” জানবে না…
ইশতিরাজ বিস্মিত গলায় পুনরায় বলল,

–” আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিং এর চোখ ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়। মাস্টারমাইন্ড নামে খ্যাত মাফিয়া বসকে এত লাইটলি নেওয়ার আস্পর্ধা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি। তাজ কিন্তু তারই ডান হাত..
আরশিয়ান ক্লান্ত স্বরে বলল,
–” আমিও তারই ছেলে রাজ। ভুলে যাস কেনো? আর রইল কথা তাজের, ও বুঝে গেছে.. মেয়েটা তার ভাইয়ের জান। আমি যতটুকু জানি, সে কখনোই নিজের ভাইয়ের মৃত্যু চাইবে না।
ইশতিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” তাজ চুপ থাকলেও বাবা কিন্তু ঠিকই জেনে যাবে৷ তার কাছে প্রিয়জনের চেয়ে প্রতিশোধ বেশি প্রিয় কথাটা তুইও ভুলে যাস না। শত্রুর মেয়েকে বিয়ে করে বংশ বিস্তার করার প্ল্যান করছিস জানলে..
আরশিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
–” তুই কী ভয় দেখাতে এসেছিস? তখন থেকে বার বার এক কথা..
ইশতিরাজ কিছু বলতে নিবে তার আগেই দরজায় নক পড়ে। আরশিয়ান অনুমতি দিলে ভেতরে প্রবেশ করে প্রিমা। ব্যস..তাকে এক পলক দেখা মাত্র স্থির হয়ে যায় আরশিয়ানের দৃষ্টি। ক্লান্ত মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে। মন আঙ্গিনায় উড়ে যায় এক ঝাঁক সুখপাখি।
প্রিমা ভেতরে এসে কিঞ্চিত অবাক হয়। ইশতিরাজ কে এখানে একটু চমকায়। তবে প্রশ্ন করার সাহস পায় না। ধীর গলায় মিনমিনিয়ে বলে,

–” একটা ফাইলের হিসেবে মিলছে না।
আরশিয়ান তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে বসে বলে,
–‘ আপনি বসুন। ফাইলটা দিন আমায়। দেখছি বিষয়টা..
প্রিমা তাই করল। কয়েক মিনিট ফাইলটা এনালাইস করতেই সমস্যা গুলো পেয়ে গেলো আরশিয়ান। খুব যত্ন নিয়ে সেগুলো বুঝিয়েও দিলো তবে প্রিমা বুঝল না বোধহয়।
ফাইলের হিসেবে পর পর তিনবার ভুল করল প্রিমা। তবুও আরশিয়ান কিছুই বললো না। রেগে যাওয়ার পরিবর্তে শান্ত মেজাজে বুঝালো।
তার এই রুপ দেখে হতবাক হয়ে গেলো ইশতিরাজ। প্রিমা ফাইল নিয়ে বাইরে যেতেই কৌতূহলী কন্ঠে শুধাল,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৫

–” রগচটা এমপি হুট করে এত শান্ত মেজাজের হয়ে গেলো কীভাবে? ”
আরশিয়ান স্মিত হেসে জবাব দিল,
–” তার প্রিয়তমা ভীষণ সেনসিটিভ প্রকৃতির মানুষ বলে…
ইশতিরাজ মাথা নাড়িয়ে বলল,
–” মানতে হবে বস..

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৭