শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২১
আয়েশা শেখ
— আমার ইংরেজি আর আইসিটি পরীক্ষাটা খুব খারাপ হয়েছে। আপনি ইংরেজিটায় একটু বেশি মার্কস দেবেন, কেমন? ক্লাসে সবার থেকে যেন আমার মার্কস বেশি হয়।
বারিশের মুখে খাবারের লোকমা তুলতে তুলতে বলল ঝিলমিল। বারিশ ল্যাপটপে কাজ করছে। খাবার মুখে নিয়ে তা শেষ করে বলল,
— পারব না।
ঝিলমিল কপাল গুটিয়ে বলল,
— আপনি কিন্তু আমার হাতে খাবার খাচ্ছেন!
— তো?
— প্রতিদিন রাতে আমি আপনাকে খাইয়ে দেই, আর আপনি আমার জন্য এতটুকু করতে পারবেন না?
— ওটার সাথে এটার সম্পর্ক কী?
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, দিতে হবে না। আনায়াকে দিয়েন বেশি করে মার্ক।
— ‘আনায়া কে?’ বারিশ যেন সত্যিই চিনতে পারছে না।
— আনায়াকে চেনেন না? আপনার প্রিয় স্টুডেন্ট। প্রতিদিন সামনের বেঞ্চে বসে।
— ‘হ্যাঁ, আমার প্রিয় স্টুডেন্ট।’ বারিশ এখনো চিনতে পারেনি। কারণ সামনের বেঞ্চে অনেকেই বসে। আর নাম মনে রাখা তো বারিশের কাছে অসম্ভব। কে জানে কার কথা বলছে?
ঝিলমিলের মুখের ভাব কেমন বদলে গেল! এবারের লোকমাটা হালকা ঝটকা মেরে বারিশের মুখে দিল। এর চেয়ে তো ফাহিম স্যারই ভালো। সেদিন আইসিটি পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে শুধু ঝিলমিল বলেছিল ‘ স্যার আমার পরীক্ষা তেমন ভালো হয় নি।’
ফাহিম স্যার চোখ মেরে বলেছিল ‘ চিন্তা করো না, আমি আছি তো।’
আর কী চাই? এর মানে তো স্যার ঝিলমিলকে ভালো মার্ক পাইয়ে দেবে। আর এই লোক!
— এরপর থেকে নিজে হাতে খাবেন, নয়তো আনায়াকে বলবেন এসে খাইয়ে দিতে।
— ‘আনায়া কে?’ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাল বারিশ।
— বললাম তো একটু আগে! আপনার প্রিয় স্টুডেন্ট।
— ‘হ্যাঁ, আমার প্রিয় স্টুডেন্ট।’ আবারও ঠিক একই কথা বলে কাজে মনোযোগি হলো সে। ঝিলমিল পরবর্তী লোকমাটা আর দিলো না বারিশকে। খাবারে পানি ঢেলে দিয়ে প্লেট নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। বারিশ একবার তাকাল সেদিকে। কিন্তু কিছু বলল না।
রুমে এসে লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ল ঝিলমিল। বারিশ এখনো বিছানায় কাজে মগ্ন। তবে কিছুক্ষণ পর সে-ও ল্যাপটপটা বন্ধ করে একপাশে রেখে শুয়ে পড়ল। ঝিলমিল মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাথাটা এমনভাবে মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, যেন একটা তাগড়া ভূ”ত কাথার নিচে বাসা বেঁধেছে!
কিছু সময় পার হতেই এক অদ্ভুত, গা ছমছমে শব্দ ভেসে এল তার কানে। কাথার ভেতর থেকেই আঁ’’তকে উঠে ঝিলমিল। আবারও সেই ভয়ানক শব্দ! শব্দটা কেমন যেন খসখসে, অতিপ্রাকৃতিক আর অস্পষ্ট। ঠিক যেন নিঃশব্দ রাতে কেউ খুব কাছে এসে দাঁতে দাঁত ঘষছে, আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে ভারী, শ্লেষ্মাচ্ছন্ন কোনো খাঁচাকাটা দীর্ঘ শ্বাস কানের একদম পাশ ঘেঁষে যাওয়া-আসা করছে। শিরশির করে উঠল ঝিলমিলের পুরো সর্বাঙ্গ, গায়ের লোমগুলো খাঁড়া হয়ে দাঁড়াল। এই চারদেয়ালের বন্ধ রুমে ভূ”ত আসবে কোথা থেকে? ভূ”ত বলতে তো বাস্তবে কিছু নেই! তবে এমন হাড়হিম করা শব্দটা আসছে কোত্থেকে? মনে হচ্ছে ঠিক তার গা ঘেঁষেই কেউ শুয়ে শুয়ে এই গোঙানির মতো শব্দটা করে যাচ্ছে!
ভয়ে ঝিলমিলের হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এল। ভূ”তে সে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না, কিন্তু রাত বারোটার এই নিঝুম নিস্তব্ধতায় এমন অলৌকিক সুরের ভৌতিক শব্দ শুনে কার না আত্মা খাঁচাছাড়া হয়!
ধীরে ধীরে কাথার এক পাশ সামান্য সরিয়ে পেছন দিকে ঘুরতে শুরু করল সে। পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছে। মন বারবার সায় দিচ্ছে পেছন দিকে ঘুরলেই নিশ্চিত ভয়ানক, র”ক্ত হিম করা কোনো বীভৎস দৃশ্য দেখতে পাবে সে! আর দেখা মাত্রই কানের পর্দা ফাটানো এক চিৎ”কার বসাবে! মনে মনে চি”ৎকার করার পূর্ণ প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলল সে।
কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে সাবধানে তাকাতেই ঝিলমিলের চোখ আটকে গেল বারিশের ঘুমন্ত মুখে। ঝিলমিলের দিকে মুখ করেই শুয়েছে সে। বুক খালি করে একটা দীর্ঘ স্বস্তির শ্বাস ফেলল ঝিলমিল। যাক, কোনো প্রেতা”ত্মা নয়! তবে বিড়ম্বনা কমেনি, সেই খসখসে অদ্ভূত শব্দটা এখনও একটানা হয়েই চলেছে! ঝিলমিল কৌতুহল আর অস্বস্তি নিয়ে বিড়বিড়িয়ে একটু এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। ঘুমন্ত বারিশের খোদাই করা তীক্ষ্ণ চোয়ালে আলতো করে হাত রেখে আস্তে করে বলল,
— এই, একটু তাকান।
তাকাল না বারিশ। ঝিলমিল আবারও একই ভঙিতে ডাকল,
— এই যে… শুনছেন? একটু চোখ খুলুন না, প্লিজ!
চোয়াল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে এবার বারিশের চওড়া কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিতেই আস্তে করে চোখ মেলল সে। একদম ধীর শান্ত দৃষ্টি। চোখ খুলেই দেখল, তার খুব কাছে আতঙ্কিত চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে ঝিলমিল। বারিশকে জেগে উঠতে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেল মেয়েটা, আরও একদফা বুক ভরে স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে।
বারিশ মুখে কিছু না বলে প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে রইল। ঝিলমিল এবার কাঁপাকণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল,
— ‘আ-আপনি কি কিছু শুনতে পাচ্ছেন?’
— কী?
— ঐ যে! ঘরের মধ্যে কেমন একটা বাজে শব্দ হচ্ছে। আপনি শুনতে পাচ্ছেন না?
বারিশ বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
— রাত হলেই কি তোমার মাথা খারাপ হয়ে যায়? কিসের শব্দ?
শুনে ঝিলমিলের আ”তঙ্কের মাত্রা হাজার গুণ বেড়ে গেল! লোকটা শুনতে পাচ্ছে না মানে? তার মানে এই ভয়ানক অলৌকিক শব্দ শুধু ঝিলমিল একাই শুনতে পাচ্ছে? ভয়ে আর তীব্র দুশ্চিন্তায় ঝিলমিলের চোখ জোড়া জলে ভরে উঠল, মুখটা কান্না পাওয়ার মতো করুন আর ছোট হয়ে এল।
মেয়েটার কালচে মেরে যাওয়া ভয়াল চেহারা দেখে বারিশ সামান্য নরম হলো। সে একটু শোধরে নিয়ে বলল,
— ‘কী হয়েছে? ঠিক কেমন শব্দ পাচ্ছ তুমি?’
— খুব… খুব ভয়ানক শব্দ! আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না…
বারিশ যেন একটু চিন্তা করে গম্ভীর মুখে বলল,
— হুম। যদিও আমি এই ভূত-প্রেতের ফালতু কথায় বিশ্বাস করি না, তবে এই রুমে এমন অদ্ভুত শব্দ এর আগেও হয়েছে বহুবার। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই শুনে আসছি।
— ‘স-সত্যি?’ ঝিলমিলের চোখ গোল গোল হয়ে গেল।
— হুম।
— তাহলে আপনি এর কোনো পদক্ষেপ নেননি কেন? তাড়ানোর ব্যবস্থা করেননি?
— এখন তো আর ওসব শুনতে পাই না। অভ্যেস হয়ে গেছে বোধহয়।
— কিন্তু আমি তো স্পষ্ট পাচ্ছি!
— ‘তাতে আমার কী? গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো,’ বলেই বারিশ শান্ত মুখে আবার চোখ দুটো বন্ধ করে নিল।
রাগে, অসহায়ত্বে আর এক মুহূর্তও না ভেবে দু-হাতে বারিশের টি-শার্ট শক্ত করে খামচে ধরল।
— ‘আপনার কী মানে?! আপনি কালকেই যেকোনো মূল্যে একজন হুজুর ডেকে এনে এই ঘর ঝাড়ফুঁক করাবেন! একটা ব্যবস্থা আপনাকে করতেই হবে!’
— আমাদের বাসায় এসব ভুয়ো গল্প কেউ বিশ্বাস করবে না। উল্টো তোমাকেই আস্ত পাগল তকমা দিয়ে দেবে।
ঝিলমি বারিশের টি-শার্ট আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। কিন্তু শব্দটা এমন ভাবে আসছিল আর কিছু বলতে পারল না আপাতত।
কোনো উপায় না পেয়ে ঝিলমিল চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলে বারিশের শক্ত, চওড়া বুকের ওপর আলতো করে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে দিল।
যতবারই ওই অদ্ভুত, খাঁচাকাটা শব্দটা নিঝুম ঘরের মধ্যে গমগম করে উঠছিল, ততবারই শিউরে উঠে বারিশের টি-শার্টের কাপড়ে নিজের মুখটা আরও শক্ত করে গুঁজে দিচ্ছিল ঝিলমিল। ভয়ের চোটে তার পুরো শরীরটা তখন থরথর করে কাঁপছে।
বারিশ নিঃশব্দে ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফোটাল। সে এক হাত বাড়িয়ে ঝিলমিলের পিঠের ওপর রেখে অন্য হাতটা সাবধানে বালিশের পাশ থেকে তুলে নিল নিজের ফোন। ফোনের স্ক্রিনে একটা অ্যাপ থেকে আওয়াজ ভেসে আসছিল। যেখানে একটা স্পেশাল ভৌতিক সাউন্ড এফেক্ট প্লে হচ্ছিল এতক্ষণ। বারিশ স্ক্রিনের ওপর আঙুল ছুঁইয়ে এক ক্লিকেই অডিও ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
হুট করেই পুরো ঘরে নেমে এল একদম পিনপতন নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও ঝিলমিল ভয়ে শক্ত হয়ে লেপটে রইল সেই অনড় বুকের ওমেই!
— তুমি আবার ড্রা”গ নিয়েছ দীঘি?
আচমকা দীঘির রুমে নিজের মাকে প্রবেশ করতে দেখে চমকাল দীঘি। ক’দিন ধরে রুম থেকেই বের হয় না সে, অফিসেও যায় না। সেজন্যই নূরজাহান চৌধুরী সকাল সকাল এসেছেন তার রুমে।
— ‘হ্যাঁ।’ অস্বীকার করার কিছু নেই, কারণ সারা রুমে সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
— ‘তুমি কি শোধরাবে না একটুও? কেন এমন হচ্ছো?’
দীঘি রুম থেকে বের হতে হতে বলল,
— ‘তোমার ঘ্যানঘ্যান শোনার সময় নেই মা। আমি বের হলাম।’
নূরজাহান চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। দীঘি ম”দ্যপানে আ”সক্ত হলেও কখনো ড্রা”গ নেয়নি। এর জন্য যদি কেউ দায়ী হয়, তবে সেটা নূরজাহান চৌধুরী নিজেই। তিনি ড্রা”গের জিনিসপত্র তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। এসব মেহরাজ আর আলতাফ চৌধুরী দেখলে বিরাট ঝামেলা বাঁধবে! আর কত কী লুকিয়ে বেড়াতে হবে এই মেয়ের জন্য, তাঁর জানা নেই।
নিচে আসতেই দীঘি দেখল ডাইনিং টেবিলে মেহরাজ, আলতাফ চৌধুরী আর তাহসিন বসে ব্রেকফাস্ট করছে। জিহানকে নাজমা বেগম খাইয়ে দিচ্ছেন। দু’দিন পর দীঘিকে রুম থেকে বের হতে দেখে জিহান দৌড়ে এসে তার কোলে চড়ল। দীঘি বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেও কেন যেন আর গেল না। ফিরে এসে ডাইনিং টেবিলে বসে কাজের মেয়েটিকে বলল খাবার দিতে। সকলে অবাক হলেও কিছু বলল না। তাহসিন একবারও চোখ তুলে তাকায়নি, দীঘিও তাহসিনের দিকে নজর দেয়নি।
নূরজাহান চৌধুরীও নিচে এসে খেতে বসলেন। খাবারের মাঝেই হঠাৎ দীঘি বলে উঠল,
— ‘তোমার ছেলে কেমন আছে?’
সকলেরই খাওয়া থেমে গেল। তাহসিন ছাড়া উপস্থিত কেউই বুঝল না দীঘি কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল। তবে দীঘির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল তাহসিনের দিকেই।
— ‘ওর ছেলে আসবে কোত্থেকে?’ আলতাফ চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন।
— ‘রাতে আবারও কিছু খেয়েছিস নাকি দীঘি? আজেবাজে বকছিস!’ মেহরাজও যোগ করল।
— ‘আমি ঠিক আছি। যাকে প্রশ্ন করেছি, তাকে উত্তর দিতে দাও।’ দীঘির গলায় বরফশীতল ভাব।
তাহসিন শান্ত গলায় বলল,
— ‘ভালো আছে।’
নূরজাহান চৌধুরীর মুখে এবার বিস্ময় ফুটে উঠল। শুধু তাই নয়, আলতাফ চৌধুরী ও মেহরাজও হতবাক হলেন।
— ‘তোমার বাচ্চা আছে তাহসিন?’ মেহরাজ শুধাল।
— আছে।
এবার নূরজাহান চৌধুরী বললেন,
— ‘আমাকে তো বলেছিলে তোমার কেউ নেই!’
তাহসিন চুপ করে রইল। সে সত্যিই বলেছিল তার কেউ নেই। খানিক থেমে বলল,
— ‘তখন জানানো জরুরি মনে হয়নি, আম্মা। এর জন্য স্যরি।’
— ‘বাহ! নাম কী তোমার ছেলের? বয়স কত?’
তাহসিন একবার দীঘির দিকে তাকাল। তারপর ধীরকণ্ঠে বলল,
— ‘দিহানূর তাহসিন দিগন্ত। বয়স দু’বছরের একটু বেশি।’
দীঘি তাহসিনের দিকেই তাকিয়ে ছিল, নামটা শুনতেই তার দৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে গেল। এদিকে নাম আর বয়স শুনে নূরজাহান চৌধুরীর শরীরটা না চাইতেও ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল।
মেহরাজ হেসে বলল,
— ‘আরে! নামটা তো একদম আমাদের দীঘির মতো! দীঘির পুরো নাম দীপানূর চৌধুরী দীঘি।’
মেহরাজ স্বাভাবিকভাবে বললেও তাহসিন হাসল না। নিজের খাবার প্লেটে নজর রেখে নিচু গলায় বলল,
— ‘এটা খুবই স্বাভাবিক।’
—‘ কী হলো আম্মা, আপনি খাচ্ছেন না কেন?’ আলতাফ চৌধুরী মাকে ডেকে বললেন।
নূরজাহান চৌধুরী নড়েচড়ে বসলেন। খেতে শুরু করলেন আবারও।
— ‘তুই এখনো এখানে কী করিস ঝিলমিল? বাসায় যাবি না?’
ঝিলমিলকে খালি ক্লাসরুমে একা বসে থাকতে দেখে শুধাল রোদ্দুর। কলেজ ছুটি হয়েছে মিনিট দশেক আগে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আজই প্রথম ক্লাস, তাই শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এমনিতেই কম। ইরানও আজকে আসেনি। ঝিলমিলও আসত না, যদি না বারিশ তাকে জোর করে নিয়ে আসত। ছুটির পর রোদ্দুর মেইন গেট পর্যন্ত চলে গিয়েছিল, কিন্তু পেছনে ঝিলমিলকে দেখতে না পেয়ে আবার খুঁজে খুঁজে ক্লাসে এসেছে।
— ‘আমার বাবা আসবে, তুই চলে যা।’
— ‘গেটের ওখানে চল, একা বসে থাকবি?’
— ‘ওখানে রোদ, তুই যা।’
রোদ্দুর কিছুক্ষণ অনিশ্চিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তারও তাড়া ছিল, তাই আর না দাঁড়িয়ে চলে গেল। রোদ্দুরের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ঝিলমিল ভেতরের যন্ত্রনাটা আটকাতে তলপেটে চেপে ধরে সোজা বেঞ্চের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তলপেটটা যেন ভেতর থেকে কেউ নিংড়ে মুচড়ে ধরছে। শিরদাঁড়া বেয়ে হাড়কাঁপানো একটা অস্বস্তির ঢেউ নেমে যাচ্ছে কোমর আর পায়ের দিকে। মনে হচ্ছে কোমর আর উরুর সংযোগস্থল থেকে পেশিগুলো ভেঙে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, পা দুটোতে এক ফোঁটা শক্তিও আর ধরে রাখতে পারছে না সে। মেয়েলি এই শারীরিক য”ন্ত্রণায় ভীষণ অসহায় লাগছে তার। প্রতি মাসের এই বিশেষ দিনের সূচনা সবসময়ই তার জন্য এমন এক নিদারুণ য”ন্ত্রণা বয়ে নিয়ে আসে যে শরীরকে একদম অচল করে ফেলে। তবে এখন তলপেটের অসহ্য ব্য”থার চেয়েও বড় বিপত্তি ও আতঙ্ক কাপড়ে দাগ লেগে যাওয়ার।
দাঁড়ানোর কোনো উপায় নেই। এখন যদি কেউ ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ে? যদি কেউ দেখে ফেলে? অস্বস্তিতে ঝিলমিলের চোখ ভিজে এল। এই অসার, যন্ত্রণাকাতর শরীর নিয়ে সে যে এখন ক্লাসের এই বেঞ্চে পুরোপুরি বন্দি! বন্দি নিজেরই এক অসহায়ত্বের মাঝে। ইরানটা কেন যে আজ এল না! এই মুহূর্তে একটা পরিচিত হাতের স্পর্শ বা একটু আড়াল ছাড়া সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মেয়ে। যত অস্বস্তিকর ঘটনা কেন ঝিলমিলের সাথেই হয়!
নিস্তব্ধ কড়িডোর থেকে হঠাৎই বুটের আওয়াজ ভেসে আসছে। যেন খুব দ্রুত ক্লাসের দিকে আসছে কেউ। বুটের খটখট আওয়াজ পেয়ে ধীরে ধীরে মুখ তুলল মেয়েটা। ঝাপসা চোখে দরজার দিকে তাকাতেই রাগি চোখে দাঁড়িয়ে থাকা বারিশকে দেখল ঝিলমিল।
ঝিলমিলের পুরো চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে য”ন্ত্রণায়, চোখের কোণে জমা হয়ে আছে কষ্ট চেপে রাখা জল। মানুষটাকে সামনে দেখতেই মনটা যেন আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল, বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাটা বাঁধ ভাঙার উপক্রম করল তার। বারিশের চেহারায় এতক্ষণ রাগ আর বিরক্তি থাকলেও, ঝিলমিলের কান্নারত আর র”ক্তিম অসহায় মুখটা চোখে পড়তেই তা নিমিষে মিলিয়ে গেল। কেমন উদ্বেগ ফুটে উঠল তার ধারাল চোখেমুখে। ঝড়ের বেগে এগোতে এগোতে ঝিলমিলের কাছে এসে ব্যস্ত গলায় বলল,
— কাঁদছো কেন? কে মে’রেছে?
যন্ত্রণার মধ্যেও ঝিলমিলের কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠল। সে চোখ মুছে খিনকণ্ঠে বলল,
— ‘কে মারবে আমায়? আমি কি ছোট বাচ্চা?’
বারিশ কুঁচকানো কপালে কিছুটা চিন্তিত মুখে বলল,
— ‘তাহলে এখানে এভাবে বসে আছো কেন? কখন থেকে নিচে গাড়িতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আমি!’
ঝিলমিল যন্ত্রণায় চোখ দুটো বুজে ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
— আমার…আমার খুব পেটে ব্য”থা করছে। আপনি চলে যান, আমি পরে আসব।
— ‘আমি চলে যাব মানে?’
বারিশ চোখ সরু করে ঝিলমিলের পেটে শক্ত করে চেপে রাখা হাত দুটোর দিকে তাকাল, ‘কোথায় ব্য”থা করছে? দেখি?’
— ‘একদম কাছে আসবেন না!’
বলেই ঝিলমিল নিজের দুই বাহু দিয়ে পেটটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বেঞ্চের ওপর কুঁকড়ে গেল। বারিশ একমুহূর্ত স্থির চোখে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঝিলমিলের শরীর মোচড়ানো আর মুখের অসহায় ভঙ্গি দেখে পুরো বিষয়টা বুঝতে আর বাকি রইল না তার। গম্ভীর গলায় শ্বাস ছেড়ে বলল,
— ‘আগে বলোনি কেন? জানলে আজ কলেজে নিয়ে আসতাম না!’
ঝিলমিল ব্যথায় চোখ বন্ধ রেখেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল,
— ‘মনে করে দেখুন, আজ সকালে আমি আসতে চাইনি!’
উফফ! বারিশের ইচ্ছে হলো এই মেয়েটাকে ধরে একটা আছাড় মা”রতে! এই মেয়ে তো রোজ সকালেই কলেজে না আসার জন্য বায়না ধরে, কোনটা তার ফালতু বাহানা আর কোনটা সত্যি কীভাবে বুঝবে! ঝিলমিলের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকাতেই আবার নরম হলো সে। একটু নরম গলায় বলল,
— ‘খুব বেশি ব্য”থা করছে? চলো আমার সাথে।’
বলতেই ঝিলমিলকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য সামনের দিকে হাত বাড়াল সে। ঝিলমিল এক ঝটকায় নিজের শরীরটা পিছিয়ে নিয়ে বাধা দিল,
— ‘আপনি চলে যান না! একটা আয়া খালাকে ডেকে দিন।’
যুবকের শক্ত চোয়াল দুটো আরও কঠিন হয়ে উঠল এবার। নিজের রাগ আর বিরক্তি সামলাতে একটা লম্বা শ্বাস নিল সে। তারপর আবারও তাকে ধরতে গেলে একইভাবে পিছু হটে ঝিলমিল। রুগ্ন গলায় বলল,
— ‘আরে, আমি এখন দাঁড়াতেই পারব না!’
বারিশ আর কোনো কথা বাড়াল না। একদম চুপচাপ নিজের গায়ে থাকা হালকা শার্টের বোতামগুলো ঝটপট খুলে ফেলল। তারপর বেঞ্চ থেকে ঝিলমিলকে প্রায় একপ্রকার জোর করেই দাঁড় করিয়ে, শার্টটা ওর কোমরে খুব সুন্দর করে পেঁচিয়ে বেঁধে দিল। আর মুহূর্তের মধ্যেই কোনো আপত্তির সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় ঝিলমিলকে নিজের কোল তুলে নিল। হঠাৎ শূন্যে ভেসে উঠতেই ভয়ে বারিশের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ঝিলমিল। চারপাশের খালি বারান্দার দিকে তাকিয়ে আ’’তঙ্কে বলল,
— ‘কী করছেন! কেউ দেখে ফেলবে তো আমাদের!’
বারিশ ভারী পায়ে নিচে নামতে নামতে গম্ভীর গলায় গজগজ করে উঠল,
— লেট দেম ওয়াচ! আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম অ্যাবাউট এনিওয়ান হোয়েন ইউ আর ইন পেইন!
বারিশ ঝিলমিলকে কোলে তুলে নিচতলা পেরিয়ে বাইরের মাঠের দিকে হেঁটে চলল। কলেজ ছুটি হয়েছে বেশ অনেকক্ষণ আগে, তাই বিশাল মাঠটা একদম ফাঁকা। কিন্তু গেটের কাছাকাছি আসতেই বিপত্তি ঘটল। গেটের ঠিক উল্টো পাশের একটা রেস্টুরেন্ট থেকে কাচের দেয়াল ঘেঁষে ওদের এই দৃশ্য দেখল পরিণীতা। তার ঠিক সামনেই বসে আছে জারিফ। দুজন একসাথে দুপুরের খাবার খেতে এসেছে। জারিফ বাইরের দিকে ইশারা করে পরিণীতাকে দেখিয়ে বলল,
— ‘ঐ তো, দেখেছেন? বললাম না আমার চাচ্চু বিবাহিত? আর যাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে, সে আমারই এক্স ফ্রেন্ড। খুব গভীর সম্পর্ক ছিল আমাদের।’
পরিণীতা একনজরে দৃশ্যটা দেখে চোখ সরু করে শুধাল,
— ‘তোমার চাচ্চু জানে না এসব?’
— হয়তো না।
— তাহলে বলছ না কেন?
— ‘সময় হলেই বলব,’ জারিফ রহস্যময় হেসে সেদিক থেকে নজর সরাল। তারপর চোখ রাখল পরিণীতার ঘাড়ের এক পাশে, যেখানে চুল দিয়ে লুকানোর চেষ্টা করা RJ BARISH ট্যাটুটা। সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে জারিফ যোগ করল,
— ‘আমার বার্থডে পার্টিতে কিন্তু আপনি আমার স্পেশাল গেস্ট!’
সাবধানে ঝিলমিলকে গাড়ির সিটে বসিয়ে দিল বারিশ। দরজাটা আটকে দিয়ে দ্রুত পায়ে চলে গেল পাশের একটা বড় ফার্মেসিতে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এই সময়ে জরুরি যেসব জিনিস দরকার সাথে পেইনকিলার নিয়ে ফিরল সে।
গাড়ির দরজা খুলে জিনিসগুলো ঝিলমিলের হাতে দিয়ে বারিশ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। গাড়ি আর সামনের কাচ ভালো করে আটকে দিয়ে চুপচাপ একটা সিগারেট ধরাল সে।
কিছুক্ষণ পর ভেতরে এসে বোতলের মুখ খুলে একটা পেইনকিলার আর পানির বোতল বাড়িয়ে দিল ঝিলমিলের দিকে।
— এটা খেয়ে নাও। ব্য”থা কমবে।
ঝিলমিল চুপচাপ ওষুধটা গিলে নিল। তবে ওষুধ খেলেও পেটের ওই বিদঘুটে মুচড়ানো তীব্র কষ্টটা কমতে একটু সময় লাগবে। ঝিলমিল ক্লান্তিতে সিটে মাথা এলিয়ে দিল। ব্য”থার য”ন্ত্রণায় চোখ দুটো বুজে থাকতে থাকতেই একসময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে।
গাড়ি ততক্ষণে শহরের মূল রাস্তায় নেমে এসেছে। ড্রাইভ করতে করতেই বারিশ একহাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ঝিলমিলকে আলতো করে নিজের দিকে টেনে আনল। তারপর যত্ন করে মেয়েটার মাথাটা বসিয়ে দিল নিজের চওড়া কাঁধের ওপর।
হঠাৎ স্পর্শে ঝিলমিলের হালকা ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে নিজেকে বারিশের এত কাছে দেখে কিছুটা সরে আসতে চাইল সে।
বারিশ সামনের রাস্তায় নজর রেখেই বেশ ধমকের সুরে গম্ভীর গলায় বলল,
— ‘মা”রব কিন্তু!’
বারিশের ধমক শুনে ঝিলমিল আর সরে আসার সাহস পেল না। চুপচাপ লোকটার শক্ত কাঁধে মাথা রেখে পড়ে রইল। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর বারিশের গলার গম্ভীর স্বরটা আবার ভেসে এল,
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২০
— এখন একটু ভালো লাগছে?
— ‘হুঁ,’ একদম নিচু গলায় জবাব দিল ঝিলমিল।
বারিশ কোনো কথা বলল না, ঝিলমিলও নীরব রইল। ঝিলমিলের কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ মানুষকে আজ এত ভালো মানুষের রুপে দেখে কেন যেন হজম হচ্ছে না ওর।
