Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৭

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৭

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৭
আয়েশা শেখ

একজন অফিসার আলতাফ চৌধুরী ও নূরজাহান বেগমের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে সোজা এগিয়ে গেলেন দীঘির সামনে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হলো দীঘির মুখের ওপর।
— যতদূর শুনেছি, সেদিনের পার্টিতে নি/হত ছেলেটা আপনার সঙ্গেই ড্যান্স করছিল?
— জি।
অফিসার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নোটপ্যাডের পাতা উল্টালেন। যেন মনে মনে কোনো হিসাব মেলাচ্ছেন, এমন ভঙ্গিতে শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— আমরা ওর ফ্যামিলির সাথে কথা বলেছি। ওদের স্পষ্ট দাবি—তাদের কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক শত্রু নেই। ছেলেটাও যথেষ্ট শান্ত আর ভদ্র ছিল। সো, কোনো পুরনো শত্রুতার জের ধরে যে খু/নটা হয়েছে, এমন ক্লু আমরা পাচ্ছি না।
দীঘি চুপ করে রইল। তারপর বলল,

— আমি সেটা কীভাবে বলব, আমি সেদিনই তাকে প্রথম দেখেছিলান। আর সে নিজেই আমার সঙ্গে নাচতে এসেছিল।
অফিসার দীঘির খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। তার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
— একজন অচেনা ছেলের সাথে হুট করে ড্যান্স ফ্লোরে যাওয়ার পর… ঠিক কী এমন ঘটেছিল যে কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই তাকে লা/শ হতে হলো? ড্যান্স করার সময় ও আপনাকে অদ্ভুত কিছু বলেছিল? নাকি অন্য কারো নজর ছিল আপনাদের ওপর?
— কিছুই বলেনি সে আমাকে। হয়তো কারও নজর ছিল যে তাকে শ্যুট করেছে।
— আপনার কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে?
দীঘি একবার মুখটা শক্ত করে তাহসিন এর দিকে তাকাল। বলল,
— না।
সিআইডি অফিসাররা দীঘিকে আরও কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করলেন। তবে দীঘির থমথমে আর সংক্ষিপ্ত উত্তরে বিশেষ কোনো সূত্র না পেয়ে নোটপ্যাড বন্ধ করলেন প্রধান অফিসার। চলে যাওয়ার আগে চৌধুরীদের দিকে এক নজর তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
— আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। প্রয়োজনে আবার আসতে হতে পারে।

​রাত তখন প্রায় দুটো। নিঝুম ঘরের থমথমে অন্ধকারে একা বসে ছিলেন নি/হত ছেলেটার বাবা। চোখের পাতা এক করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে গেছে তার। ​ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হঠাৎ ভাইব্রেট করে উঠল। কোনো নাম নেই, স্ক্রিনে ভাসছে একটা আননোন নাম্বার।
​হাত বাড়িয়ে ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক অচেনা, হিমশীতল ও ভারী কণ্ঠস্বর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা সরাসরি বলল,
— ছেলেকে নিয়ে বড্ড বেশি ঘাটছেন। এখানেই থেমে গেলে কিন্তু আপনার জন্যই ভালো।
​কথাটা শুনেই মাথায় রক্ত চড়ে গেল বৃদ্ধের। সোজা হয়ে বসে গর্জে উঠলেন,
— এই! কে তুমি? কী বোঝাতে চাইছ শুনি?
​ওপাশের কণ্ঠস্বর বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। শান্ত অথচ থমথমে গলায় বলল,

— বলছি, থামুন।
​— থামব মানে? তুমি ভেবেছ কি আমাকে? আমি আমার ছেলের খু/নিকে বের করেই ছাড়ব! পুলিশ দিয়ে হোক কিংবা নিজের ক্ষমতায়!
​ওপাশ থেকে হালকা ঠাণ্ডা হাসির শব্দ পাওয়া গেল। তারপর খুব সাধারণ টোনে প্রশ্ন এলো,
— মার্কেট থেকে নেওয়া এক কোটি টাকার ব্যাংক ঋণটা বোধহয় আপনার এখনো শোধ করা হয়নি, তাই না?
​বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই ধক করে উঠল লোকটার। বিষম খেয়ে বললেন,
— মানে? তুমি… তুমি এসব কীভাবে জানো?
​— কত বাকি এখনো?
​লোকটা ঢোক গিলে থমথমে গলায় জবাব দিলেন,
— নব্বই লাখ…
​— বেশি অঙ্ক নয়। সকালের মধ্যেই আপনার সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকাটা পৌঁছে যাবে। হ্যাঁ, অবশ্যই এর দ্বিগুন সংখ্যা যাবে।
​— আপনি… আপনি কে বলছেন?
​ওপাশের লোকটা কোনো উত্তর না দিয়ে বলল,

​— বাকি জীবনটা সুদে-আসলে শান্তিতে বাঁচতে চান, নাকি ছেলের খু/নির পিছে ছুটে পুরো পরিবারকে রাস্তায় বসাতে চান? চয়েস ইজ ইউরস।
​কথাটা শেষ হতেই ফোনটা কেটে গেল।
​স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন তিনি। সত্যি তো, লড়াই করে আর কী পাবেন তিনি? ছেলে তো আর ফিরবে না! কিন্তু এই ৯০ লাখ টাকার ব্যাংক ঋণ আর দেনার বোঝা… পুরো পরিবারকে ধুঁকে ধুঁকে শেষ করে দেবে। লোকটার চোখের সামনে ভেসে উঠল স্ত্রীর ফ্যাকাশে মুখ আর নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
​খানিকক্ষণ নিথর হয়ে ভাবলেন। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে কাঁপতে থাকা আঙুলে ফোনের ডায়াল প্যাডটা খুললেন। ​কলটা সোজা গেল সেই সিআইডি আফিসারের ব্যক্তিগত নম্বরে। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই থমথমে গলায় বললেন,
​— হ্যালো, অফিসার? আমি… আমি আর এই কেসটা চালাতে চাই না। আপনারা কেসটা ক্লোজ করে দিন।

আজ আর ঝিলমিলকে কেউ আটকে রাখতে পারল না। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে সে। ক্লাসরুমে ঢুকে আগের মতোই একদম পেছনের বেঞ্চে ইরানের পাশে গিয়ে বসল। সামনের দিকে রোদ্দুর, শুভ আর মেধা গল্প করছে।
অন্যদিন হলে ঝিলমিলের কথার চটপটে ওদের কান ঝালাপালা হয়ে যেত, কিন্তু আজ সে একদম নিশ্চুপ। মুখখানা থমথমে। কলেজে এসেও যেন ভুল করেছে সে, মন কোনো কিছুতেই টিঁকছে না। সেদিন যে মাতাল অবস্থায় গেল তারপর লোকটার আর দেখা মেলেনি। একটা দিনও না!
​— তোকে তো টেক্সট দিলে পাওয়া-ই যায় না। ইদানীং কলেজেও ঠিকমতো আসিস না। কিছু হয়েছে নাকি?
​রোদ্দুর বেঞ্চের সামনে এসে প্রশ্নটা করলেও ঝিলমিলের কান অবধি বোধহয় পৌঁছাল না। মেয়েটা একধ্যানে জানালার ওপারে শূন্যে চোখে তাকিয়ে আছে।

​— কিরে?
​কাঁধে মৃদু একটা ঝাঁকুনি পড়তেই ঝিলমিল ঘোর ভাঙার মতো চমকে উঠে বলল,
— হ্যাঁ? কিছু বললি?
​রোদ্দুর কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। মেয়েটার সেই হাসিখুশি চঞ্চল মুখশ্রীতে আজ যেন অমাবস্যার ছায়া। দুশ্চিন্তা আর অস্পষ্ট ক্লান্তি ঘিরে রেখেছে ওকে।
​— রাতে ঠিকমতো ঘুমাসনি?
​প্রশ্নটা শুনে ঝিলমিল সামান্য অবাক হয়ে শুধাল,
— তুই কী করে বুঝলি?
ম্লান হাসি ফুটল ​রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণে।
— নিয়মিত ঘুমাবি, আর খাওয়া-দাওয়াটাও সময়ে করবি।
​ঝিলমিল নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। রোদ্দুর আর কথা না বাড়িয়ে নিজের সিটে গিয়ে বসল। ঝিলমিল ক্লান্ত শরীরটা একটু এলিয়ে দিয়ে ইরানের কাঁধে মাথা রাখতেই ইরান নিচু গলায় ফিসফিস করে উঠল,

​— ছেলেটা মনে হয় তোকে পছন্দ করে রে।
​— ‘ করতেই পারে…’
ঝিলমিলের কণ্ঠে চরম ঔদাসীন্য।
​— তোর উচিত ওর থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখা।
​— ও তো আমাকে সরাসরি কিছু বলেনি। বললে না হয় এড়িয়ে চলতাম বা বুঝিয়ে বলতাম। ও যেমন নিজের অনুভূতি চেপে রেখেছে, আমিও না জানার ভান করেই থাকি।
​ইরান একটু অবাক হয়ে তাকাল
— বাহ্‌! এত বুদ্ধি কবে থেকে হলো তোর?
​— আমি বুঝি কখনো নির্বোধ ছিলাম?
​— চার বছরের বেশি সময় ধরে চিনি তোকে। সত্যি বলতে, তোকে কখনো এতটা নীরব দেখিনি।
​হঠাৎ করেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল ঝিলমিলের। হুট করে কাছের কাউকে মনে পড়লে বুকের গহীনে যেমন অজানা হাহাকার আর তীব্র দহন শুরু হয়, ঠিক তেমনই একটা অনুভূতি ঝিলমিলের পুরো অস্তিত্বকে গ্রাস করল। অথচ যার কথা মনে পড়েছে তাকে কাছের মানুষ হিসেবে কখনো দেখেইনি ঝিলমিল।
মনের অস্থিরতা ঢাকার তাগিদেই এক লহমায় সোজা হয়ে বসে প্রসঙ্গ বদলে বলল,

​— ক্লাস শুরু হচ্ছে না কেন এখনো?
​— হবে। এই স্যার সবসময় একটু দেরি করেই আসেন। ফাইজান স্যার তো এখন আর আসেই না।
​ঝিলমিলের মনটা আরও একধাপ ভারী হয়ে গেল। বিষাদগ্রস্ত মুখে সে ব্যাগের ওপর মাথা গুঁজে এলিয়ে পড়ল। ​কিছুক্ষণ পরেই ক্লাসে স্যারের আগমন ঘটল। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ জানাল। কেবল ঝিলমিলেরই একবিন্দু নড়তে ইচ্ছে করল না। পেছনের সিটে বসার সুবাদে প্রায় সময়ই স্যাররা এলে সে পুরোপুরি দাঁড়ায় না, দাঁড়ালেও ঢিলেঢালাভাবে কোনোমতে উঠে আবার বসে পড়ে। কিন্তু আজ সে নড়লই না।
​হঠাৎই পুরো নিস্তব্ধতা নেমে এলো ক্লাসরুম জুড়ে। কারও মুখে কোনো শব্দ, বাক্য কিচ্ছু নেই। এমন অস্বাভাবিক নীরবতার পরও মাথা তুলল না ঝিলমিল। ইরান নিজের আঙুল দিয়ে ক্রমাগত ওকে খোঁচা দিচ্ছে, নিঃসন্দেহে উঠে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত। পাশ থেকে মৃদু ফিসফিসানির খসখস শব্দ ভেসে আসছে, সেটাও নিশ্চয়ই ওকে সতর্ক করার জন্য। কিন্তু ঝিলমিল অনড়।
​একপর্যায়ে ইরানের খোঁচা দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল, অথচ ক্লাসের নীরবতা একটুও ভাঙল না। কারও একটা নিঃশ্বাসের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক মুহূর্ত এভাবে কাটতেই খটকা লাগল ঝিলমিলের। অলস ভঙ্গিতে ব্যাগের ওপর থেকে মুখ তুলে চারপাশে তাকাল। সকলের দৃষ্টি ওর দিকে। যেন সে কোনো প্রকাণ্ড অপরাধ করে ফেলেছে! দৃষ্টি ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই ওর চোখের তারা দুটো থমকে গেল! বুকটা ধক করে উঠল নিমিষে। ঝটপট ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

​— আসসালামু আলাইকুম, স্যার!
​সামনে ডায়াসের কাছে স্যার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং ফাইজান বারিশ! ​ঝিলমিলের হৃৎপিণ্ডটা যেন প্রতি মুহূর্তে হাজারটা ড্রাম পেটাতে শুরু করেছে। ধুকপুকানি সব সীমা ছাড়িয়ে গেল দ্রুতগতির রক্তপ্রবাহে।
​বারিশ একদম নির্বিকার, ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে আছে। ক্লাসে ঢুকেই তার তীক্ষ্ণ নজর চলে গিয়েছিল সবার পেছনের বেঞ্চে মাথা গুঁজে রাখা সেই ছটফটে মেয়েটার দিকে। বাকি সবাই সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেও বারিশের শীতল দৃষ্টি আটকে ছিল কেবল ওই এক অবাধ্য কিশোরীর ওপর। শিক্ষকের মুখাবয়বের এমন থমথমে রূঢ়তা দেখে ক্লাসের কেউ একটি টু শব্দ করারও সাহস পায়নি। ইরান যখন ঝিলমিলকে ধা”ক্কা দিয়ে সজাগ করার চেষ্টা করছিল, বারিশ তখন চোখ রাঙিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়েছিল।
বারিশ তখনও নির্বিকার চোখে তাকিয়ে আছে। ঝিলমিলও তার সেই গভীর, শীতল জোড়া চোখের দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছে। দীর্ঘ মুহূর্ত দুজনের নীরব দৃষ্টিবিনিময় শেষে বারিশ স্থির গলায় ক্লাসের উদ্দেশে বলল,

— ঝিলমিল বাদে সকলে বোসো।
ঝিলমিল দেখল, একে একে সহপাঠীরা সবাই যার যার আসনে বসে পড়ল। বারিশ এবার লেকচার শুরু করতে যাবে, ঠিক তখনই সামনের দিক থেকে আনায়া নামে মেয়েটা চট করে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
— স্যার! আপনি এতদিন ক্লাসে আসেননি কেন?
— এমনি।
— এমনি কেন, স্যার? আপনি কি অসুস্থ ছিলেন?
বারিশ এবার পুরোপুরি মেজাজ হারাল। মেয়েটার দিকে ঘুরে, কপালে রগ ফুলিয়ে, একদম দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলল
— কেন, তুমি কি ডক্টর?
স্যারের ধারালো কথায় বেচারি আনায়া নিমেষেই থতমত খেয়ে ধপ করে আসনে বসে পড়ল। ঝিলমিলের প্রথমে সামান্য রাগ হলেও, পরক্ষণেই ঠোঁট টিপে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। বারিশ নিজের মতো লেকচার দিতে শুরু করল। আর ঝিলমিল চুপচাপ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। অন্যদিন হলে দশ মিনিটের মাথায় পা ব্যথা, কোমর ব্যথার অজুহাত তুলে ক্যানভাস করা শুরু করত, কিন্তু আজ সে একবিন্দু অভিযোগ করল না।
ঝিলমিল নিজে চুপ থাকলেও ক্লাসের আধা ঘণ্টা পার হয়ে যেতেই আর স্থির থাকতে পারল না রোদ্দুর। একটা মেয়েকে খামোখা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভেতরের অস্বস্তিটা রাগে রূপ নিল। সে হুট করে নিজের সিট থেকে দাঁড়িয়ে গলার স্বর কিছুটা উঁচু করে বলল,
— স্যার, ঝিলমিলকে অযথাই দাঁড় করিয়ে রাখছেন না?
বারিশ লেকচার দেওয়া থামিয়ে আস্তে করে রোদ্দুরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। উপর থেকে নিচ অব্দি ছেলেটাকে একপলক মেপে নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় শুধাল,

— তোমার কী সমস্যা?
— আমার কোনো সমস্যা না, স্যার! তবে ভুল করেছিল, আপনি শাস্তি দিতে চেয়েছেন—দিয়েছেন। কিন্তু টানা আধা ঘণ্টা ধরে একটা মেয়েকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা কি আদৌ ঠিক?
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল স্যারের। ডেস্কে হাত দুটো রেখে সামান্য সামনে ঝুঁকে, হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
— আই ডিসাইড কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল! ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু টিচ মি হাউ টু রান মাই ক্লাস! বেশি দরদ উথলে উঠলে ক্লাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়াও, না হলে চুপচাপ বসে লেকচার শোনো!
স্যারের রুক্ষ রূপ দেখে পুরো ক্লাসরুম বরফের মতো জমে গেল যেন। পাশের বেঞ্চে বসে থাকা মেধা আর শুভ ভয়ে রোদ্দুরের শার্টের কোণা টেনে ধরে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল,

— আরে রোদ্দুর, বস তুই! পাগল হয়েছিস নাকি?
এমনকি ইরানও আতঙ্কে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করল। রোদ্দুরের এই আগ বাড়িয়ে অনধিকার চর্চা দেখে তার বিরক্তও লাগল, আবার ছেলেটাকে এভাবে বলায় বারিশের উপরও রাগ হলো।
রোদ্দুর আর কিছু না বলে চুপচাপ বসে পরল। পরবর্তী আধা ঘণ্টা ঝিলমিল নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিজের জায়গায়, তার পুরো দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল কেবল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ওপর। কেমন গভীর, বিষণ্ন গম্ভীরতা আর চাপা অভিমানি চাউনি। না বলা হাজারটা প্রশ্ন যেন ওর থমকে থাকা নিষ্পলক চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠছিল।
বারিশ লেকচার দেওয়ার ফাঁকে না চাইতেও কয়েকবার মেয়েটার দিকে চোখ যাচ্ছিল। চুল গুলো আজ একদম পরিপাটি। হয়তো নূরহাজান চৌধুরী বেঁধে দিয়েছে।

— বসো।
স্যারের কন্ঠে ঘড়ির দিকে তাকাল ঝিলমিল। ক্লাস শেষ হতে আর তিন মিনিট বাকি। এখন বসতে বলছে! মানুষ নাকি মাটির তৈরি হয়– ঝিলমিলের অনেক সময় মনে হয় এই লোকটা গিঁটওয়ালা বাঁশের কঞ্চির তৈরি, যা মচকাবে কিন্তু কিছুতেই সোজা হবে না! সেদিন রাতে তো একদম তাকে ছাড়া ম”রেই যাচ্ছিল। খেতে নাকি পারে না তাকে ছাড়া। আর আজ যেন চিনছেই না! নাটক!

টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই ঝিলমিল আর ইরান ক্লাস থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে আসছিল। হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়াল জারিফ। ওকে আচমকা দেখে ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা সামান্য কেঁপে উঠলেও, মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ পড়তে দিল না সে। জারিফের ঠোঁটের কোণে ঝুলছে কুটিল হাসি, আর তার পেছনে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে আছে ওর চ্যালা বন্ধুরা।
ঝিলমিল ভ্রূ দুটো কুঁচকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
— পথ আটকেছিস কেন?
জারিফ চোখের ইশারায় আড়ালে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
— আয় আমার সাথে।
ঝিলমিলের এই ই”তরের সাথে এক সেকেন্ড কথা বলারও ইচ্ছে নেই। সে অবহেলার ভঙ্গিতে অন্যদিকে ঘুরে হেঁটে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, জারিফ হুট করে এগিয়ে এসে ঝিলমিলের কবজিটা শক্ত করে চেপে ধরল। হাতের ওপর সেই স্পর্শ লাগতেই ঝিলমিলের ভেতরের রাগ আ”গ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠল। ঝটকা মে”রে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

— ডোন্ট ইউ ড্যার টু টাচ মি! হাত ছাড় বলছি!
জারিফ অপমানে অন্ধ হয়ে সে হিংস্র সিংহের মতো আবার ঝিলমিলের বাহু খামচে ধরতে চাইল। ঝিলমিল এবারও নিজেকে সরিয়ে নিজের বাঁ হাত শুন্যে তুলে চ/ড় বসিয়ে দিল জারিফের মুখাবয়বে!
— বললাম না, ধরবি না আমায়!
চ/ ড় খেয়ে জারিফ নিজেকে সামলাতে পারল না। রাগে-ক্ষোভে চোখ দুটো র”ক্তবর্ণ হয়ে উঠল তার। কোনো তোয়াক্কা না করে একদম ঝিলমিলের হাতটা মুচড়ে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল কলেজের খোলা মাঠের দিকে। ঝিলমিল চি”ৎকার করে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ টানাটানি করতে লাগল। পাশ থেকে ইরান ছুটে এসে জারিফকে সরানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল,
— জারিফ, তুনি পাগল হয়ে গেছ নাকি? হাত ছাড়ো ওর!
কিন্তু জারিফ তখন রাগে অন্ধ। মাঠে পৌঁছেই সে বিকট গলায় চেঁচিয়ে কলেজের আশেপাশের সবাইকে ডাকতে শুরু করল,

— সবাই শোনো! এদিকে এসো! দেখে যাও এই ধোয়া তুলসীপাতার আসল চেহারাটা!
জারিফের চিল্লাচিল্লিতে মুহূর্তের মধ্যে মাঠের চারপাশে ছাত্র-ছাত্রীদের বিশাল জটলা পেকে গেল। ঝিলমিল তখনও হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আর জারিফ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বি”ষাক্ত বাঁকা হেসে উচ্চস্বরে বলতে লাগল,
— এই চরিত্রহীনা মেয়েটা আমার সাথে এতদিন প্রেমের নাটক করে সুযোগ বুঝে আমারই আপন চাচাকে ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেছে! ঘরের ভেতরেই নিজের চরিত্র বিক্রি করে দিয়েছে! এখন আমার চাচাও একে লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে! ভাবতে পারো, নিজের স্বার্থের জন্য এরা কতদূর নামতে পারে?
জারিফের কথাগুলো যেন বি”ষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল ঝিলমিলের বুকে। টিফিনের সময় থাকায় কলেজের অর্ধেক স্টুডেন্ট এখন এখানে। ঝিলমিলের ক্লাসের প্রায় সবাই আছে। চারপাশের থমকে থাকা অজস্র চোখ এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে। রোদ্দুর দাঁড়িয়ে আছে স্তব্ধ হয়ে, ওর চোখে অবিশ্বাস। বাকিদের চোখ কপালে।
ভিড় থেকে একজন বলে উঠল,
— কিন্তু তোর চাচা তো…
জরিফ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
— হ্যাঁ, এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রফেসর ফাইজান বারিশ!
ঝিলমিলের পায়ের তলা থেকে মাটিটা পুরোপুরি সরে গেল। জারিফ আরও যোগ করল,
— ​চাচা দেশে আসার আগে আমার সাথে ওর সব ঠিকই ছিল, কিন্তু আমার চাচাকে দেখেই ওর মাথা ঘুরে যায়। ঝুলে পড়ে চাচার গলায়। আমার সঙ্গে প্রতারণা করে বিয়ে করে আমার চাচাকে! তোমরা জাস্ট ভাবো, কতটা নির্লজ্জ হলে নিজের প্রাক্তনের বাড়িতে থাকছে তারই আপন চাচাকে বিয়ে করে!
ঝিলমিলের এবার সহ্যের সীমা পার হয়ে গেল। জারিফের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাতটা হ্যাঁচকা টানে ছাড়িয়ে নিয়ে তীব্র চি”ৎকারে গর্জে উঠল,

— চুপ! একদম চুপ! মুখ সামলে কথা বল জারিফ! নিজের অপকর্ম আর কূকীর্তিগুলো লুকিয়ে আমাকে নিয়ে আর একটা বাজে কথা বলবি না!
— বাজে কথা? রিয়েলি ঝিলমিল? তুই সবার সামনে অস্বীকার করতে পারবি যে আমার আর তোর মধ্যে কোনো গভীর সম্পর্ক ছিল না? তোর মধ্যে যদি এতই সততা থাকে, তবে তুই অস্বীকার করে দেখা তো—আমারই র”ক্তসম্পর্কের আপন চাচাকে তুই বিয়ে করেছিস কি না?
ঝিলমিল পুরোপুরি স্তব্ধ। কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ, মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করার শক্তি নেই। পাশ থেকে রোদ্দুর এক পা এগিয়ে এল। আকুল গলায় জিজ্ঞেস করল,
— ঝিলমিল… এসব কি সত্যি?
ঝিলমিল কোনো কথা বলল না। শুধু করুণ চোখে রোদ্দুরের দিকে একপলক তাকিয়ে নিঃশব্দেই মুখ ফিরিয়ে নিল। জারিফের বন্ধুরা এবার যা ইচ্ছা তা-ই বলতে শুরু করল। তারা এগুলো আগেই জানিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জারিফ জানাতে দেয়নি। সে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিল।
জারিফ বলল,
— কী হলো? চুপ করে আছিস কেন? বল না সবাইকে!
জারিফের পাশ থেকে আরেকজন বন্ধু এগিয়ে এসে যোগ করল,
— আরে কী আর বলবে ও? ওদের বিয়েতে তো আমরা নিজেরাও উপস্থিত ছিলাম! নিজের চোখে দেখা ঘটনা কীভাবে অস্বীকার করবে?
চার পাশ থেকে কুৎসিত হাসির রোল উঠল। কেউ কেউ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ফিসফিস করছে, কেউ বাজে ইঙ্গিত করে কুরুচিকর মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে।

ঝিলমিলের চোখ দুটো এবার টলমল করে উঠল অশ্রুতে। সে খুব ভালো করেই জানে, জারিফ ওর সাথে যে কত বড় ছলনা করেছে, কী জঘন্য খেলা খেলেছে—তা আজ মুখ ফুটে বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই আজ কেবল ওপরের মিথ্যে সত্যটাকেই বেছে নেবে। চারপাশের শত শত তাচ্ছিল্যভরা চোখ আর ক্রূর হাসির মাঝে নিজেকে খুব একা, নিঃস্ব মনে হচ্ছে তার। কারণ জারিফের কথা মিথ্যে হলেও আংশিক সত্য। আর সেটা জারিফ খুব বাজে ভাবে উপস্থাপন করে ফেলেছে।
— মেয়েদের এই এক সমস্যা, বেটার পেলেই আগের জনকে ভুলে যায়।
ঝিলমিলের ক্লাসমেট আনায়া বলল কথাটা। ঝিলমিল অবাক হয়ে দেখল মেয়েটাকে। প্রতিবাদ করল ইরান।
— তুই নিজেও তো একটা মেয়ে, তাহলে কী তুইও এমন?
— না, আমার চরিত্রের দাম আছে। ভাতিজাকে খেয়ে চাচাকে গিয়ে ধরার মতো চরিত্র আমার নয়!
আনায়ার কথা হেঁসে উঠল সকলে। হাসল না শুধু রোদ্দুর, শুভ আর মেধা, ইরান।
জারিফ বিজয়ী হাসি হেসে আরেক পা এগিয়ে এসে ঝিলমিলকে আরও কিছু কটু কথা বলতে যাবে, ঠিক তখনই পুরো প্রাঙ্গণ কাঁপিয়ে একটি ধারালো, গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এল,

— মিসেস বারিশ, হোয়্যার আর ইউ? ইয়োর হাসব্যান্ড নিডস ইউ রাইট নাও।
(মিসেস বারিশ, তুমি কোথায়? তোমার হাজব্যান্ডের এই মুহূর্তে তোমাকে দরকার।)
আওয়াজটা শোনামাত্রই থমকে গেল চারপাশ। মাঠের হৈচৈ আর অশালীন হাসির রোল এক নিমেষে উধাও হয়ে সেখানে এক ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই খেয়াল করে দেখল, শব্দটা স্পিকারের মারফতে পাশের বিশাল অডিটোরিয়াম রুম থেকে ভেসে আসছে। মাইক্রোফোনের ঘর্ষণের মৃদু শব্দ পেরিয়ে আবার ভেসে এল সেই একই রাশভারী কণ্ঠ,

— মিসেস বারিশ! ঝিলমিল! ক্যান ইউ হেয়ার মি? টেক ইয়োর টাইম, বাট ডোন্ট কিপ মি ওয়েটিং ফর টু লং।
কথাগুলোর প্রতিটি শব্দ যেন মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ওপর বজ্রপাতে পরিণত হলো। জারিফের ঠোঁটের সেই বিজয়ের কুটিল হাসিটা মুহূর্তেই বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে এল। তার জানা মতে তার চাচ্চু তো আজ আসেনি কলেজে। এবার কী হবে? তার তো হি/সু চলে এসেছে!
জারিফের বন্ধুরা ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। ঝিলমিল চোখের পানি মুছে স্তব্ধ হয়ে তাকাল অডিটোরিয়ামের বারান্দার দিকে। অডিটোরিয়াম রুমের আবছা আলো পেরিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে তার অর্ধাঙ্গ—ফাইজান বারিশ। বুকের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত ভয় আর নিঃসঙ্গতা কীভাবে যেন উধাও হয়ে গেল।
​মাঠের উপস্থিত সবাই সেদিকে তাকাল। স্যারে এই রূপটা কলেজের কারো চেনা নয়। সাধারণত কলেজে ঢোকার সময় কলারের যে বোতামগুলো কঠোরভাবে বন্ধ থাকে, এখন তার ওপরের দুটো বোতাম আলগা করা। নিয়ম করে পেছনে আঁচড়ানো চুলগুলো এখন কপালে আর দু’পাশে হালকা এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। এমনকি চোখে সেই চশমাটাও বর্তমানে নেই। দেখে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই সে এই নামজাদা কলেজের রাশভারী একজন প্রফেসর! যেন ভিন্ন এক আনকন্ট্রোলড, রাফ অ্যান্ড টাফ সুদর্শন যুবক।

​চারপাশের স্তম্ভিত ভিড়, কাউকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে, যেন সেখানে কেউ উপস্থিতই নেই এমন ভান করে ফাইজান সোজা ঝিলমিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার গভীর, কালো কুচকুচে চোখ জোড়া সোজা ঝিলমিলের ভেজা চোখের দিকে স্থির হলো। শান্ত অথচ গভীর স্বরে বলল,
​— কোথায় ছিলে? কখন থেকে খুঁজছি আমি? চার্জ শেষ আমার। এখন আমার ইমিডিয়েট রিচার্জ হওয়া দরকার, মিসেস বারিশ। ইউ নো নাহ, তুমি ছাড়া আমি রিচার্জ হতে পারি না।
— মানে?
ঝিলমিল কাঁপা গলায় বলল। জবাব দিল না বারিশ। লোকলজ্জা, নিয়মের শৃঙ্খল কিংবা কলেজের অনুশাসন সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঝিলমিলের মুখের ওপর নিজের মুখটা ঝুঁকিয়ে আনল সে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস ঝিলমিলের ঠোঁটে আছড়ে পড়তেই একদম নিচু, থমথমে স্বরে ফিসফিস করে বলল,

​— আজ পুরো পৃথিবী দেখুক… তুমি কতটা আমার। জাস্ট হোল্ড অন টু মি…
​কথা শেষ করার সুযোগটুকুও আর দিল না। এতগুলো জোড়া স্তম্ভিত চোখের সামনে, কোনো দ্বিধা, সংকোচের স্থান না রেখে, বারিশের বেপরোয়া, লাগামহীন ঠোঁট দুটো দখল করে নিল কিশোরীর কম্পিত, সিক্ত ঠোঁট।
বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল ঝিলমিলের সর্বাঙ্গে! চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। চারপাশের আলো, বাতাস আর সময় সবকিছু যেন নিথর হয়ে গেছে। বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাওয়ার জোগাড় তার। এই রাশভারী লোকটা আজ এত অবাধ্য হয়ে উঠল কীভাবে! সে দু’হাতে লোকটার চওড়া বুকে চাপ দিয়ে তাকে ঠেলতে শুরু করল।
​বারিশের আজ পিছু হটার কোনো ইচ্ছে নেই। কিশোরীর দুটো কোমল হাতের ব্যাকুল ঠেলঠেলি যেন তার কাছে কোনো বাধা তো নয়ই, বরং ভেতরে লুকিয়ে থাকা তীব্র আকর্ষণকে আরও কয়েক গুণ উসকে দিল! ঝিলমিলের ঘাড়টা কিছুটা উঁচিয়ে ধরে ঠোঁটের ওপর নিজের কর্তৃত্ব বাড়িয়ে দিল আরও এক ধাপ। চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল এবার ঝিলমিল।

কোনো নিয়ম, কোনো প্রফেশনাল ইমেজ কিংবা লোকলজ্জার পরোয়া আজ ফাইজান বারিশের ডিকশনারিতে নেই। ঝিলমিলের থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটে আছড়ে পড়তে লাগল তার উন্মত্ত নিঃশ্বাস। ওর ভেতরের সমস্ত রাগ, ভালোবাসা আর একচ্ছত্র অধিকার যেন এই একটি চুমুর মাধ্যমেই শুষে নিচ্ছে সে।
এটা কী শুধুই একটা চুমু? নাহ! বারিশের একটা চুমুই পুরো কলেজের সামনে তার চরম অধিকার আর রাজকীয় সুরক্ষার এক অঘোষিত ঘোষনাপত্র। একটু আগে ভীর দেখে যখন এদিকে আসছিল, তখনোই ঝিলমিলকে নিয়ে বাজে কথা কানে যায় তার। তারপর যা হওয়ার তাই হলো!

চারপাশের শত শত চোখ তখন আক্ষরিক অর্থে পাথরের মূর্তি। জারিফ আর তার দলবলের মুখে যেন বোম ফুটলেও কথা বের হবে না! কলেজের যে স্যারকে শিক্ষার্থীরা বাঘের মতো ভয় পায়, যে মানুষটার একটা গম্ভীর তাকানিতে পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে যায়–সেই গম্ভীর ফাইজান বারিশ আজ ভরা কলেজের মাঠে নিজের স্ত্রীর ঠোঁটে এভাবে বিভোর হয়ে আছে!
অবশেষে ঝিলমিলের দম আটকে আসার উপক্রম হলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরালো বারিশ। তবে ছেড়ে দিল না। ঝিলমিলের কপালে কপাল ঠেকিয়ে, দুটো তপ্ত নিঃশ্বাস এক করে দাঁড়িয়ে রইল সে। ঝিলমিলের চোখের পাতা দুটো তখনো লজ্জায় ভারী হয়ে চেপে বন্ধ।
বারিশ এবার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৬

— কলেজের কিছু ভুল ধারণা হয়তো এখনই শুধরে দেওয়া প্রয়োজন। ঝিলমিল এই প্রতিষ্ঠানের শুধু একজন ছাত্রীই নয়, সে প্রফেসর ফাইজান বারিশের স্ত্রী। আই রিপিট, সম্মান যেন সেই অনুযায়ীই বজায় থাকে।
এবার তাকাল বারিশ জারিফের দিকে।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ২৮