Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর

গভীর রাত। চারপাশটা নীরব, শুধু জানালার বাইরে হালকা বাতাসের শব্দ ভেসে আসছে।
ইউভি কিছুক্ষণ ল্যাপটপে কাজ করার পর সেটাকে পাশে টেবিলে রেখে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে ইনায়াকে নিজের বুকে টেনে নেয়। ইনায়া এখন গভীর শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে—তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
ইউভি খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকে, দু’হাতে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত ইনায়ার দিকে। তারপর মনের ভেতর ধীরে ধীরে বলে ওঠে এই শান্তিটা… আমার এখন থেকে প্রতিটা রাতেই চাই, আদর।”
তারপর আরও একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় ফিসফিস করে বলে—
“খুব দ্রুত তোকে বড় হতে হবে…”
ইউভি ইনায়ার কপালে আলতো করে একটা চুমু দেয়।এরপর আবার তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে নেয়। ধীরে ধীরে দু’জনই সেই নীরব রাতের ভেতর ঘুমের গভীরে হারিয়ে যায়।

সকালের গ্রাম। হালকা হাওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে। বিছানায় শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে আছে ইনায়া। ঠিক তখনই পিয়াসা আর তুবা ঘরে এসে ইনায়াকে জাগিয়ে তোলে।
পিয়াসা বলে—
“বেবি, ওঠ না… চল না, শীতারামরাজার পুকুর দেখতে যাব। চল তুলি আর তারিনও অপেক্ষা করছে।”।ইনায়া ঘুম ঘুম চোখে একটু নড়ে ওঠে। হঠাৎ চমকে উঠে দেখে ইউভি পাশে নেই।
তার চোখে এক মুহূর্তে অস্থিরতা নেমে আসে।
ইতিমধ্যে পিয়াসা বিষয়টা বুঝে যায়। পিয়াসা হালকা হাসে, তারপর বলে ভাইয়া তো সকালে রেদোয়ান ভাইয়া আর ফুপুর সাথে ঢাকায় গেছে। আজ একটা ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে, তাই বিকেলের আগেই ফিরে আসবে।
কথাটা শুনে ইনায়ার মুখটা একটু মলিন হয়ে যায়।
পিয়াসা আবার বলে বেশি চিন্তা করিস না বেবি।”
ইনায়া চুপচাপ বসে থাকে। ইনায়ার মনটা যেন একটু খারাপ হয়ে গেল
মনে মনে বললো।মাত্র তিনটা দিনও কি ইউভি একটু ছুটি নিতে পারল না?

গ্রামের পরিবেশটা তখন গ্রীষ্মের দুপুরের মতোই উজ্জ্বল। চারপাশে আম, জাম আর কাঁঠালের গাছে ভরে আছে প্রকৃতি। কোথাও পাকা আম ঝরে পড়ে আছে, কোথাও কাঁচা কাঁঠাল ঝুলছে ডালের ভারে, আবার জাম গাছের নিচে বেগুনি রঙের ছোট ছোট জাম ছড়িয়ে আছে মাটিতে।
রোদটা একটু তীব্র হলেও গ্রামের বাতাসে এক ধরনের শান্ত শীতলতা আছে।
ইনায়া, পিয়াসা, তুবা তারিন তুলি পাঁচজন মিলে হাঁটতে থাকে। তারা গ্রামের পাকা পথ পার হয়ে ধীরে ধীরে মেঠো পথে পা বাড়ায়। কাঁচা রাস্তার দুই পাশে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে ছোট ছোট পুকুর আর তালগাছের সারি—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।
তাদের গন্তব্য—শীতারাম রাজার পুকুর।
পুকুরটা বিশাল বড়। এত বড় যে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দেখা যায় না ঠিকভাবে। পুকুরের দুই পাশে সারি সারি বাড়ি, আর দূরে দুই পাশে গোরস্থান—একটা একটু ভৌতিক আবহ তৈরি করলেও পুরো জায়গাটার সৌন্দর্যকে আলাদা এক অনুভূতি দেয়।

পুকুরের পানি শান্ত, আকাশের নীল রং যেন তার ভেতরে মিশে আছে। চারপাশের গাছপালা আর বাতাসের হালকা শব্দ মিলিয়ে পুরো জায়গাটা এক অন্যরকম নীরব সৌন্দর্যে ভরে আছে
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা তিনজনই দাঁড়িয়ে পড়ে। তারা সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে যেন মুগ্ধ হয়ে যায়—কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারে না, শুধু তাকিয়ে থাকে সেই শান্ত, সুন্দর গ্রামের পুকুরের দিকে।
পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ তুবার চোখ পড়ে দূরে বাঁধা একটা ছোট নৌকার দিকে।
তুবা একদম বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে উঠল— “বেবিরা! নৌকা! সত্যি সত্যি নৌকা!
পাঁচজন একসাথে দৌড়ে নৌকার দিকে গেল। শহরের মেয়ে বলে কথা—নৌকা দেখেই উত্তেজনায় সবার অবস্থা খারাপ
ইনায়া আগে উঠতে গিয়ে পা পিছলে “আল্লাহ!” বলে সোজা পানিতে পড়ল।
তার সাথে সাথে পিয়াসাও ইনায়াকে ধরতে গিয়ে ধপাস করে পরে গেল তুবা হাসতে হাসতে নৌকায় উঠতে গিয়ে নিজেই ব্যালান্স হারিয়ে বসে পড়ল পানির মধ্যে।

তুলি পেট ধরে হাসছে এইটা নৌকা ভ্রমণ না, পানিতে পড়া প্রতিযোগিতা করছো আপু তোমরা !”
ভাগ্য ভালো পানি কম ছিল, তাই কারও তেমন কিছু হয়নি।
ঠিক তখনই ইনায়ার চোখে পড়ে পানির মধ্যে ছোট ছোট কুঁচো চিংড়ি মাছ লাফাচ্ছে।
ইনায়া উত্তেজিত হয়ে বলল বেবি! বেবি! মাছ! মাছ! তোর ওরনা টা দে মাছ ধরবো।পিয়াসা সাথে সাথে নিজের ওড়না ধরে বলল ওড়না দিবো না! এটা নতুন! দে বেবি , ওড়না দে! মাছ ধরবো!”
তুবা ইনায়ার সাথে সাথে সাপোর্ট দিল হ্যাঁ দে না! এত দূর এসে মাছ না ধরলে কিসের গ্রাম ট্যুর!
তুলি আর তারিন একসাথে বলে উঠল এই পুকুরের মালিক আছে এখন! আগে গ্রামের সবাই মাছ ধরতো কিন্তু , এখন মালিকাধিন হয়ে গেছে না বলে মাছ ধরলে চৌধুরী বাড়ির মেয়েদের চোর বলবে!
ইনায়া একদম নির্লজ্জের মতো হাসল

“তাহলে তো আরও মজা হবে! গ্রামের স্মৃতি বলতে কিছু তো থাকতে হবে!
পিয়াসা বলল সত্যি! জীবনে কত কিছু চুরি করছি… আজ মাছ চুরি করি! এরপর শুরু হলো আসল মিশন। একটা ওড়না নিয়ে ইনায়া আর তারিন পানিতে মাছ ধরার চেষ্টা করছে, আর পিয়াসা-তুবা পেছন থেকে “এইদিকে! এইদিকে!” বলে চিৎকার করছে। তুলি আবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে যাস না! সামনে পানি বেশি!”
কিন্তু সমস্যা হলো—ওরা মাছের থেকে নিজেদের গায়েই বেশি পানি ছুড়ছে তারিন বলল এইভাবে মাছ আর ধরতে পারবো না আপু আমরা নিজেরাই ধরা পড়বো! চলো তো আগে বাড়ি গা চুলকাচ্ছে
ইনায়া হেসে বলল ধরা পড়লেও সমস্যা নাই। এই স্মৃতি কিন্তু সারাজীবন মনে থাকবে!।পাঁচজনের অবস্থা তখন একদম করুণ মাছ ধরতে নেমে সবাই পুরো ভিজে একাকার, অথচ একটা মাছও ধরতে পারেনি। শুধু শুধু পানিতে নেমে কাদা মেখে নিজেদের বারোটা বাজিয়েছে। তুলি আর তারিন তো ভয়েই শেষ।
তুলি কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল।“নুর আপু, এই অবস্থায় যদি রাস্তা দিয়ে বাড়ি যাই, গ্রামের বখাটে ছেলেগুলো চোখ দিয়ে গিলে খাবে আমাদের! কি ভাবে বাড়ি ফিরবো ইনায়া নির্বিকার গলায় বলল কেন? কী হয়েছে? যেভাবে আসছি, সেভাবেই যাব। তারিন সাথে সাথে বলল আপু, তুমি শহরের মানুষ না গ্রামের বিপদ জানো না!
তুলি তাড়াতাড়ি বলল “চলো মাঠ দিয়ে যাই। একটু দূর গেলেই আমাদের ফলের বাগান। কেউ দেখবে না, চুপচাপ চলে যাব। পিয়াসা বললমহ্যাঁ এইটাই বেস্ট আইডিয়া। চলো এরপর পাঁচজন ধানের জমির সরু আইল ধরে হাঁটা শুরু করল।

কিন্তু সমস্যা হলোনরাস্তা এতটাই পিছল যে কেউ ঠিকমতো হাঁটতেই পারছে না শেষে সবাই জুতা খুলে হাতে নিল।তুবা এক পা দিয়ে খুব ভাব নিয়ে হাটছিলো
ঠাসসস! সোজা কাদার মধ্যে পড়ে গেল।
পিয়াসা পেট ধরে হাসতে হাসতে বলল এইটা হাঁটা না অন্য কিছু বেবি সবাই মিলে তুবাকে টেনে তুলল।
কিছুদূর যেতেই আবার পিয়াসা পা পিছলে গেল।
“আল্লাহ!” বলে সেও ধপাস করে পড়ে গেল কাদার মধ্যে সবাই পিয়াস কে উঠিয়ে আবার হাটা শুরু করলো।কিছু দূর যেতে না যেতেই তারিন আর ইনায়া একসাথে স্লিপ খেয়ে পড়ে গেলো
ইনায়া রেগে গিয়ে বলল— “গুয়া মারার জন্য এই রাস্তা বেছে নিছিস?! বালের রাস্তা! পায়ে ব্যথার জায়গায় আবার ব্যথা পেলাম! এখন কিভাবে যাবো? তুলি একদম দার্শনিক মুখ করে বলল— “কি আর বলবো আপু… মানুষ এখন আর মানুষ নাই। একেকজন ফেরাউনের বাচ্চা হয়ে গেছে

“দুই পাশের জমির মালিক দুই দিক থেকে আইল কাটতে কাটতে আইলটা এত সরু করছে যে একটা পিঁপড়াও যেতে পারবে না! আর আমরা চৌধুরী বাড়ির হাতি—আমরা কেমনে যাই বলেন?
এই কথা শুনে সবাই আবার হেসে উঠল।
এরপর পিয়াসা আর ইনায়া রেগে গিয়ে বলল— “চল! ওই সালাদের ফসলের মাঝ দিয়েই যাবো। যাদের মাথায় এত শয়তানি, তাদের একটু ক্ষতি করলে আল্লাহ গুনাহ দিবে না!
পাঁচজন মিলে ফসলের মাঝ দিয়ে হেঁটে কোনোমতে সেই সরু রাস্তা পার হলো। রাস্তা পার হতেই সামনে চোখে পড়ল বিশাল একটা শসার ক্ষেত
ইনায়া চিৎকার করে উঠল— “বেবি! শসা গাছ! চল ছিঁড়ি! তারিন সাথে সাথে ভয় পেয়ে বলল ও আপু! ভুলেও এই জমি থেকে কিছু ছিঁড়ো না! ইনায়া বলল— “কেন?”
তারিন ফিসফিস করে বলল এই জমির মালিক খুব হিটলার টাইপ। শুনলে শেষ! চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা শুনলে জমি ধরে দিবে!
পিয়াসা দাঁত বের করে বলল লাওড়া! তাতেই তো মজা আছে! মাছ আনতে পারিনি, শসা মিস করা যাবে না! এরপর শুরু হলো “অপারেশন শসা চুরি
পাঁচজন মন ভরে শসা ছিঁড়ছে, কেউ জামায় ভরছে, কেউ ওড়নায় বেঁধে রাখছে। ঠিক তখনই দূর থেকে গলা ভেসে এলো—

“কেডা রে? আমি আইতেছি! খাড়া!
দেখে জমির মালিক লাঠি হাতে দৌড়ে আসছে
পাঁচজন একসাথে চিৎকা দিল “দৌড় দে।
এরপর সবাই শসা হাতে নিয়ে আবার সেই ধানের জমির মধ্যেই দৌড় দিল
তুবা দৌড়াতে দৌড়াতে বলল আমি আর শসা খাবো না কাকু।
পাঁচজন তখন জান বাঁচানো দৌড় দিলো
কারও হাতে শসা, কারও ওড়নায় শসা, আবার কেউ দৌড়াতে দৌড়াতে শসা খাচ্ছেও!
পিয়াসা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।শসা চুরি করতে এসে আজ মনে হয় গ্রামের ইতিহাসে নাম উঠে যাবে!
তুবা দৌড়াতে দৌড়াতে বলল আমার স্যান্ডেল কই?! আমি আমার স্যান্ডেল ফেলে আসছি!
তুলি সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল জীবন বাঁচানো আগে না স্যান্ডেল আগে?!
ঠিক তখনই তারিন পেছনে তাকাতে গিয়ে আবার আইলে পা পিছলে ধপাস করে পড়ে গেল।
তার সাথে ইনায়াও জড়িয়ে গিয়ে আবার কাদার মধ্যে পরলো
ইনায়া রেগে চিৎকার করে বলল ওরে আমার বালের কপাল রে এই মেয়ে! তুই কি মানুষ না কলার খোসা?! বারবার পড়ে যাস কেন!
তারিন কাদা মাখা মুখ নিয়ে বলল— “আমি একা পড়লে সমস্যা নাই… কিন্তু তোমরা সবাই আমাকে ধরে পড়ে যাও কেন!

এদিকে তুবা দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ থেমে গেল।
সবাই ভয় পেয়ে বলল কি হলো?! মালিক আইছে?! তুবা শান্ত গলায় বললনা আমার ওড়নায় শসা বেশি হয়ে গেছে, ওজন টানতে পারছি না
এই কথা শুনে সবাই দাঁড়িয়ে হেসে দিল
ঠিক তখনই দূর থেকে আবার গলা ভেসে এলো—
ধর ধর! শসা চোরগুলারে ধর!
পাঁচজন একসাথে আবার দৌড় দিল।
দৌড়াতে দৌড়াতে ইনায়া একটা শসা কামড় দিয়ে বলল— যাই হোক চুরি করা শসার টেস্ট কিন্তু আলাদা!
পাঁচজন মিলে লুকিয়ে লুকিয়ে শসা খাওয়া শেষ করলো. কারও গালে কাদা, কারও চুলে ধানের পাতা আটকে আছে। অবস্থা এমন যে দেখলেই বোঝা যায়—এরা ভালো কিছু করে আসে নাই।
এখন সমস্যা একটাই…

বাড়ির ভেতরে ঢুকবে কীভাবে?
কারণ আজ পুরো বাড়ির সবাই উঠানে বসে আছে। মাটির চুলায় বড় বড় হাঁড়িতে রান্না হচ্ছে। কেউ সবজি কাটছে, কেউ মসলা বাটছে, আবার কেউ গল্প করছে।
ইনায়া উঁকি দিয়ে অবস্থা দেখে বলল— “আজ তো ধরা খাওয়া আজ শেষ আমার বাপের বউটা আজ আমাকে কুচি কুচি করে কাটবে রে।
পিয়াসা ফিসফিস করে বলল— “কে আগে যাবে?”
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
তারিন সাথে সাথে বলল— “আমি না! আমি গেলে আম্মু আগে স্যান্ডেল ছুড়বে আমাই
তুলি একদম পেছনে লুকিয়ে বলল— “আমি তো গ্রামের মানুষ, আমারে বেশি মারবে! তোমরা একজন যাও না
শেষে ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলল— “ধুর! আমি যাচ্ছি। তোরা পেছন পেছন আয়।”
এরপর পাঁচজন চুপিচুপি পা টিপে টিপে কলপাড়ের দিকে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই—

রেশমা চৌধুরীর চোখ গিয়ে পড়ল ওদের দিকে
তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন।এই! পাঁচ বান্ধর! কই গেছিলি তোরা? এই অবস্থা কেন?।
তারপর মাথায় হাত দিয়ে বললেন হায় আল্লাহ! ইউভির বাবা, দেখে যাও তোমার মেয়ের কাহিনি!
এই কথা শোনামাত্র পাঁচজন একসাথে আল্লাহ বাঁচাও বলে।এক দৌড়ে কলপাড়ে চলে গেল
এরপর সবাই দ্রুত ফ্রেশ হয়ে, কাপড় পাল্টে, ভদ্র মেয়ের মতো মুখ করে উঠানে এসে দাঁড়ালো।
কিন্তু উঠানে এসেই পাঁচজনের বুক ধক করে উঠল
দেখে সেই শসা ক্ষেতের মালিক দাঁড়িয়ে আছে!
লোকটা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলছে চৌধুরী সাহেব! পাঁচটা মাইয়া আইসা আমার সব শসা শেষ কইরা দিছে! খুঁজে বাইর করেন কারা করছে!
তুবা বললো বকে কি সালা আমরা নাকি সব শসা শেষ করে দিছি।
মুস্তাক চৌধুরী শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন।
হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল ইনায়াদের পাঁচজনের দিকে।
পাঁচজন তখন এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে—মুখ শুকনো, ভয়েতে কাচুমাচু অবস্থা
মুস্তাক চৌধুরী একটু চোখ ছোট করে তাকাতেই ইনায়া তাড়াতাড়ি দুই কান ধরে বলল—
“সরি দাদু… আর হবে না।

একথা শুনে মুস্তাক চৌধুরী সব বুঝে গেলেন।
তিনি হাসি চেপে গম্ভীর গলায় বললেন— “কত টাকার ক্ষতি হইছে বলেন, আমি দিয়ে দিচ্ছি।”
লোকটা সাথে সাথে বলল— “ছি ছি, আপনি দিবেন ক্যান? ওই মাইয়াগুলারে দিতে হইবো!
মুস্তাক চৌধুরী ভ্রু তুলে বললেন— “ওই মাইয়াগুলার হয়ে আমি দিলে সমস্যা কোথায়?
লোকটা চলে যেতেই পাঁচজন একসাথে এমনভাবে হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন মৃত্যুদণ্ড মাফ হয়ে গেছে
পিয়াসা বুকের উপর হাত রেখে বলল— “আল্লাহ… আমি তো ভাবছিলাম আজকেই আমাদের পোস্টার গ্রামে টানাবে—‘শসা চোর দল বলবে বুইরা কী মিথ্যা বাদি রে বাবা কতো গুলো টাকা নিয়ে নিলো।
তুলি বললো এই জন্যেই তো আমি সাবধান করেছিলাম সালা হিটলার বুড়ো।
এই কথা শুনে সবাই আবার হেসে উঠল।
এরপর একে একে পাঁচজন গিয়ে মুস্তাক চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল। কেউ গালে চুমু খাচ্ছে, কেউ “দাদুভাই লাভ ইউ” বলছে।

মুস্তাক চৌধুরী মুখ গম্ভীর করে রাখার চেষ্টা করলেও হাসি চাপতে পারছিলেন না।
পাশেই বসে চা খাচ্ছিলেন রাতিব চৌধুরী, রবুল চৌধুরী আর লিখন চৌধুরী। তিনজনই ওদের কাণ্ডকারখানা দেখে মজা নিচ্ছিল।
লিখন চৌধুরী চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন— “কি চাচা… আমাদের পাঁচটাই যে এ কাজ করছে, আমরা বেশ বুঝে গেছি।
রবুল চৌধুরী হেসে বললেন তোরা গ্রামের মানুষগুলারে অন্তত একটু শান্তি দে মা!
তুবা মুখ ফুলিয়ে বলল আমরা কি করছি চাচ্চু ? একটু শসাই তো খাইছি!
কিন্তু ভদ্রলোকটা তো বলে গেল তোমরা নাকি জমির সব শসা শেষ করে দিয়ে আসছো।
এরপর দুপুরের দিকে সবাই পুকুরপাড়ে গেল।
আয়াত, আতিকা আর রিদ পুকুরের ধারে বাঁধা কাঠের দোলনায় দোল খাচ্ছিল। তাদের হাসির শব্দে পুরো জায়গাটা মুখর হয়ে ছিল।
পুকুরের পানি চিকচিক করছে, হালকা বাতাসে গাছের পাতা দুলছে। গ্রামের সেই শান্ত দুপুর যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে।

ইনায়া, পিয়াসা, তুবা, তুলি আর তারিন গিয়ে পুকুরপাড়ে বসল। কেউ পা পানিতে ছুঁইয়ে রেখেছে, কেউ আবার চুপচাপ আকাশ দেখছে।
পিয়াসা হঠাৎ বলল— “জানিস… আজকের দিনটা আমি কোনোদিন ভুলবো না।
তুবা সাথে সাথে বলল “আমিও না। বিশেষ করে ধানের জমিতে পড়ে যাওয়ার সিনটা!
ইনায়া হাসতে হাসতে বলল আর শসা চুরির ইতিহাস! তারিন মাথা নাড়িয়ে বলল তোমাদের অনেক মিস করবো আপু । ইনায়া বললো।এখন থেকে আমরা ছুটি পেলেই গ্রামে আসবো এমনকি দুই ঈদে আমরা গ্রামে আসবো। কথাটা শুনে সবাই হেসে দিলে
সেই হাসির শব্দ, পুকুরের শান্ত পানি আর গ্রামের বিকেল—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটা হয়ে রইল।

সন্ধ্যার নরম আলো তখন পুরো চৌধুরী বাড়িটাকে অন্যরকম সুন্দর করে তুলেছে।
পুকুরের পানিতে আকাশের শেষ আলো চিকচিক করছে। হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলছে ধীরে ধীরে।
ঠিক তখনই বাড়ির সামনে এসে একে একে তিনটা গাড়ি থামলো।
একটা থেকে নামল ইউভি,একটা থেকে রেদোয়ান,
আর শেষ গাড়িটা থেকে নামল রাজ্য।
ঢাকা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসায় তিনজনের মুখেই ক্লান্তির ছাপ।
বিশেষ করে রাজ্য—হাসপাতালে ইমার্জেন্সি ওটি শেষ করেই সোজা এখানে এসেছে। তিনজনের চোখের নিচেও ক্লান্তি স্পষ্ট।

গাড়ি থেকে নামার পর সবার আগে রাজ্যর চোখ চারপাশে কাউকে খুঁজতে লাগল।
আর ঠিক তখনই পুকুরপাড়ের সিঁড়িতে বসে থাকা তিনটা মেয়ের উপর চোখ গিয়ে থামল।
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা।
তিনজন পাশাপাশি বসে আছে। কারও হাতে কাঁচা আম, কেউ আবার পা দোলাতে দোলাতে গল্প করছে। সন্ধ্যার হালকা আলোয় দৃশ্যটা অদ্ভুত শান্ত সুন্দর লাগছে।
টুবা কিছু একটা বলতে বলতে হঠাৎ হেসে উঠল।
সেই হাসিটা শুনেই রাজ্যের ক্লান্ত মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।ঢাকায় থাকার পুরো সময়টা এই মেয়েটার কথাই মাথায় ঘুরছিলো তার
আর এখন সামনে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটাকে দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি লাগছে। তুবা এখনো কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। সে পিয়াসার সাথে তর্ক করেই যাচ্ছে—

“আমি বলছিলাম আমে এত মরিচ দিস না!
পিয়াসা সাথে সাথে বলল তোরে তো চিপচিপে ঠোঁট কেন বলতো ঝাল লেগেই থাকে তাই না।
ইনায়া দুইজনের ঝগড়া দেখে হেসেই যাচ্ছে।
ইউভি দূর থেকে কিছুক্ষণ চুপচাপ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সারাদিনের ব্যস্ততা, মিটিং, ক্লান্তি—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে হালকা হয়ে গেল মেয়েটাকে দেখেই।রেদোয়ান হালকা হেসে বলল—
“চল ভেতরে যাই।”
কিন্তু রাজ্যের পা যেন সেখানেই আটকে গেল।
তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে তুবার দিকেই।
মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরছে—

“এই পিচ্চিটার জন্যই তো এত ক্লান্ত শরীর নিয়েও আবার ফিরে আসলাম ভাবা যাই।
ইউভি ধীরে ধীরে পুকুরপাড়ের সিঁড়ির কাছে এগিয়ে এলো। তার চোখ একবারও ইনায়ার দিকে গেল না।
সোজা গিয়ে পিয়াসার পাশে দাঁড়িয়ে বলল—
“কি হচ্ছে এখানে, বোনু? পিয়াসা মুচকি হেসে বললকিছু না ভাইয়া, আমরা গল্প করতেছি।
ইউভি মাথা নেড়ে পিয়াসাকে হালকা জড়িয়ে ধরল। তারপর শান্ত গলায় বলল চল, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখানে আর থাকা ঠিক না।এরপর তুবার দিকে তাকিয়ে বললতুবা, চলো।
তুবা সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু পুরো সময়টায় ইউভি একবারও ইনায়ার সাথে কথা বলল না। একবার তাকালও না ঠিকভাবে।
ইনায়া চুপচাপ বসে রইল।মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখটা কেমন ছোট হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ভারী লাগতে শুরু করল। সারাদিন ইউভির জন্য মন খারাপ ছিল… আর এখন সামনে এসেও মানুষটা যেন তাকে দেখছেই না।ইনায়ার চোখ দুটো ধীরে ধীরে কেমন ছলছল করে উঠল।

রেদোয়ান বিষয়টা সাথে সাথেই খেয়াল করল।
সে ধীরে ধীরে ইনায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল—চল বোনু।
ইনায়া সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে রাগ দেখিয়ে বলল—
যাবো না। রেদোয়ান ভ্রু তুলে বলল—
কেন? ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল পড়ে যাবো… তোমরা যাও। আমার ভালো লাগছে না।
শেষের কথাটা বলতেই গলাটা কেঁপে উঠল তার।
ইউভি দূর থেকে রেদোয়ানকে ইশারা করলো চলে আসতে।
রেদোয়ান চলে আসতেই ইউভি ধীরে ধীরে সোজা ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। মূলত সবাইকে সরানোর জন্যই এতক্ষণ ইউভির এই প্ল্যান ছিল।
ইনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইউভি হঠাৎ তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
তারপর খুব আস্তে করে ইনায়ার সেই ব্যথা পাওয়া পায়ে হাত দিয়ে বলল—
“পা তো ঠিক হয়ে গেছে, আদর … তাই না?”

ইনায়া সাথে সাথে চমকে নিচের দিকে তাকালো।
ইউভি তার পায়ের কাছে বসে আছে।
মুহূর্তের মধ্যেই ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতেই ইউভি ভ্রু কুঁচকে বলল জাস্ট এতটুকু অবহেলা সহ্য করতে পারিস না… আমার আদর?
ইনায়া এবার সত্যিই কেঁদে ফেলল।
কাঁপা গলায় বলল—
“হুট করে আপনি অবহেলা করলে আমি বিব্রত হয়ে যাই ইউভি ভাইয়া… আমি যে আপনার যত্নে অভ্যস্ত, অবহেলায় না…”

কথাটা বলেই ইনায়া চোখ মুছে হালকা করে মুচকি হাসল।।ইউভি কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে।।তারপর ধীরে ধীরে উঠে ইনায়ার একদম কাছে এসে বসল। নরম গলায় বলল—
এত কান্না কেন, হুম?
ইনায়া মুখ ফিরিয়ে বলল—
আপনি বুঝেন না কিছু।
ইউভি হালকা হেসে বলল—
সব বুঝি। তোর চোখ দেখলেই বুঝি।
এই বলে খুব আস্তে করে ইনায়ার কানের পাশ থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল।
ইনায়ার বুকটা আবার কেমন করে উঠল।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“সবসময় এমন করে তাকাইয়েন না তো।
—ইউভি আরও ঝুঁকে এসে বললো। কেন?
ইনায়া লজ্জায় ছোট্ট গলায় বলল কেমন যেন লাগে। ইউভি আর একটু কাছে এসে বললো কেমন লাগে।
“অদ্ভুত লাগে…”

ইউভি মুচকি হেসে বলল আমার তো ভালো লাগে।”
তারপর হঠাৎ ইনায়ার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আঙুলের সাথে আঙুল জড়িয়ে ফেলল।
পুকুরপাড়ের বাতাসটা তখন আরও নরম হয়ে উঠেছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে পানিতে চাঁদের হালকা আলো পড়ছে। ইউভি ধীরে ধীরে বলল—
“জানিস আদর সারাদিন যত ক্লান্তিই থাকি না কেন, তোকে দেখলেই সব ঠিক হয়ে যাই।”
ইনায়া এবার আস্তে করে ইউভির কাঁধে মাথা রাখল।
ইউভি কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে খুব যত্ন করে ইনায়ার মাথার উপর গাল ঠেকাল।
তারপর ফিসফিস করে বলল আদর এত ভালোবাসলে পরে কিন্তু তুই আরও বেশি বাজে ভাবে অভ্যস্ত হয়ে যাবি।
ইনায়া চোখ বন্ধ করেই ছোট্ট করে বলল—

হয়ে গেছি তো। হঠাৎ ইউভি নিচু গলায় বলল—
রেডি হয়ে থাকিস, আদর। তোর জন্য অপেক্ষা করবো আমি… রাত ঠিক ৯টায়। ইনায়া অবাক হয়ে তাকাল কেন? কোথায় যাবো আমরা?
ইউভির ঠোঁটের কোণে হালকা দুষ্টু হাসি ইনায়ার নাকটা আলতো টেনে দিয়ে বলল—
তোর একটা আবদার আজ পূরণ করবো।
কি আবদার? ইনায়া কৌতূহলী চোখে তাকালো।ইউভি ধীরে ধীরে বললো
তোকে নিয়ে পুরো মাগুরা শহর ঘুরবো, আদর।
কথাটা শুনেই ইনায়ার চোখে খুশির ঝিলিক দেখা দিলো
সত্যি?

ইউভি মাথা নেড়ে হেসে বলল হুম। শুধু আমি আর আমার বউ। ইউভি ভাইয়া! ইনায়া লজ্জা পেয়ে চারপাশে তাকালো। আর ঠিক তখনই ইউভি হঠাৎ তাকে কোলে তুলে নিল।
ইনায়া চমকে উঠে সাথে সাথে ইউভির শার্ট খামচে ধরল।এই! কি করছেন? নামান আমাকে! কেউ দেখে ফেলবে! ইউভি একদম শান্ত গলায় বলল—
বউ হোস তুই আমার। কে কি দেখলো তাতে এই শাহজাদ ইউভি চৌধুরীর কিচ্ছু যায় আসে না।
ইনায়ার মুখ লাল হয়ে গেল।স
এরপর ইনায়াকে কোলে নিয়েই বাড়ির ভেতরে ঢুকলো সে। আর ঠিক তখনই বাড়ির সবাই একসাথে চমকে উঠল।রেশমা চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন হায় আল্লাহ! আবার কি হইছে? আজও কি পায়ে ব্যথা পাইছে মেয়েটা?”রবিুল চৌধুরী কপালে হাত দিয়ে বললেন এই মেয়েটারে নিয়ে আর পারি না! পিয়াসা আর তুবা দূর থেকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তারিন তো হাসি চেপেই রাখতে পারছে না। ইউভি একদম স্বাভাবিক গলায় বলল—

“তোমরা চিন্তা কইরো না। আমি দেখে নিবো।”
কথাটা এমন ভাব নিয়ে বলল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ সে-ই।ইনায়া তখন ইউভির বুকের দিকে মুখ লুকিয়ে মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচলো—
“যাক… কেউ ভুল বুঝে নাই!
তারপর মনে মনে আবার বিড়বিড় করল।এই বালের শাহজাদা সবসময় মুডে থাকে…”
কিন্তু ঠোঁটের কোণের হাসিটা সে কিছুতেই লুকাতে পারল না।

রাত ঠিক ৯টা।
চৌধুরী বাড়ির চারপাশ তখন একদম অন্যরকম শান্ত সুন্দর।দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে উঠানের একপাশে টাঙানো হলুদ বাতির নরম আলো, আর হালকা ঠান্ডা বাতাসে গাছের পাতাগুলো আস্তে আস্তে দুলছে।
ইনায়া তখন রুমে বসে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
দরজা খুলতেই ইউভি দাঁড়িয়ে আছে।সাদা টি-শার্টের উপর কালো জ্যাকেট, ব্ল্যাক জিন্স… হাতে একটা ছোট প্যাকেট।
ইউভি প্যাকেটটা ইনায়ার হাতে দিয়ে মুচকি হেসে বলল ড্রেস আছে। রেডি হয়ে নিচে আয়, আমার আদর। ইনায়া অবাক হয়ে প্যাকেট খুলতেই দেখল
একদম ম্যাচিং ড্রেস।
সাদা টি-শার্ট, কালো জ্যাকেট, কালো জিন্স আর সাদা জুতা।ইনায়ার অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পর রেডি হয়ে যখন নিচে নামল, পুরো বাড়ির চোখ এক মুহূর্তের জন্য ইনায়ার দিকেই চলে গেল। সাদা-কালো ড্রেসে মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। আর গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভির সাথে তো একদম পারফেক্ট ম্যাচিং লাগছে
রাতিব চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন—

কোথায় যাও মা? ইনায়া বাবার কাছে গিয়ে নরম গলায় বলল বাবা… মাগুরা শহর ঘুরে আসি?
লিখন চৌধুরী আর রাতিব চৌধুরী একসাথেই বলে উঠলেন সাবধানে যেও নূর মা ।
ইনায়া হেসে মাথা নেড়ে দিল।দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখছিল পিয়াসা আর তুবা। তুবা হঠাৎ আফসোসের সুরে বলে উঠল।কত লাকি রে আমাদের ইনায়া
ঠিক তখনই পেছন থেকে রাজ্যের গলা ভেসে এলো পিচ্চি তুমি ও যাবে নাকি মাগুরা শহর ঘুরতে?
তুবা ভ্রু তুলে বলল কেন ডাক্তার সাহেব? নিয়ে যাবেন নাকি আপনি?
রাজ্য হালকা হেসে বলল নিয়ে গেলে সমস্যা?
তুবা মুখ ফিরিয়ে বলল চুপ করুন তো। এখন আপনার সাথে ঝগড়া করার মুড নাই।
এই সময় রেদোয়ান এসে দাঁড়িয়ে বলল—
দুজনেই রেডি হয়ে নিচে আসো। তোমাদেরকেও নিয়ে যাবো। পিয়াসা চোখ বড় বড় করে বলল—
সত্যি রেদোয়ান ভাইয়া? রেদোয়ান মুচকি হেসে বলল হুম। ১০ মিনিটের মধ্যে রেডি। তুবা সাথে সাথে পিয়াসার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে উপরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর আগে একটা পরে দুইটা বাইক বের হলো চৌধুরী বাড়ি থেকে।
মাগুরা শহরের রাত তখন আলোয় ঝলমল করছে।
রাস্তার দুই পাশে দোকানের লাইট, ফুচকার স্টল, চায়ের দোকান… কোথাও হালকা গান বাজছে, কোথাও মানুষ আড্ডা দিচ্ছে।রাতের বাতাসে শহরটা যেন আরও সুন্দর লাগছে। ইউভির বাইকের পেছনে বসে ইনায়া চারপাশ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
তার চুলগুলো বাতাসে বারবার উড়ছে।
হঠাৎ ইউভি বাইক সাইডে থামিয়ে একটা হেলমেট বের করল। ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
হেলমেট পরে নে।
ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল না পরে পরবো।”
ইউভি ভ্রু কুঁচকে বলল এখনই পর।”
একটু পরে পড়বো আমার শেহেজাদা
ইউভি আর কিছু বলল না। আবার বাইক চালানো শুরু করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরও যখন দেখল ইনায়া হেলমেট পরে নাই, তখন হঠাৎ ব্রেক কষে বাইক থামিয়ে দিল। ইনায়া চমকে উঠে ইউভির শার্ট ধরে ফেললো

“এই! কি হলো?”
ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার দিকে ঘুরে তাকাল।
ইউভির চোখদুটো এবার একদম গম্ভীর।
তারপর খুব নিচু কিন্তু শক্ত গলায় বলল—
“বেয়াদব… হেলমেট পর।
ইউভি এক হাতে হেলমেট ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর সামনে ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইউভি বিরক্ত গলায় বলল—
“তুই কি কোনোদিন ভালো হবি না, বেয়াদব?”
ইনায়া হেলমেটটা হাতে নিয়ে মুচকি হেসে বলল—
“হুম… হবো তো।”
ইউভি ভ্রু তুলে বলল—

“কখন শুনি?”
ইনায়া একদম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আপনি ‘ভালোবাসি’ বললেই… এখান থেকেই ভালো হয়ে যাব।”
কথাটা শুনে ইউভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল।
ধীরে ধীরে ইনায়ার কাছে এসে খুব নিচু গলায় বলল
“তোর ভালো হওয়া লাগবে না, বেয়াদব।”
ইনায়া চোখ বড় বড় করে তাকাল।
ইউভি এবার হালকা করে তার নাক টেনে দিয়ে বললো
“তুই এমন এলোমেলো, জেদি, বাচ্চা টাইপ হয়েই থাক… আমাকে বুঝা লাগবে না।”
ইনায়া সাথে সাথে নাটকীয় গলায় বলল—

“ও ইউভি ভাইয়াআআ…”
ইউভি সাথে সাথে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল—
“আর একটা কথা বললে ঠাস করে মাঝরাস্তায় ফেলে রেখে চলে যাব, বেয়াদব!”
ইনায়া বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে হাসল।
তারপর দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে বলল—
“আমি ভালো করেই জানি আপনি যাবেন না।”
“কেন?” — ইউভি এগিয়ে এলো।
ইনায়া এবার ফিসফিস করে বলল—
“কারণ আপনি আমাকে ছাড়া পাঁচ মিনিটও থাকতে পারেন না।”
কথাটা শুনে ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি স্পষ্ট।
সে ধীরে ধীরে ইনায়ার আরও কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
“এই অতিরিক্ত বুঝটা যদি অন্য জায়গায় খাটাইতি
“তাহলে আজ আমাকে বউ ছাড়া রাতে ঘুমাইতে হইতো না।
কেন আপনি তো আমাকে নিয়েই ঘুমোন এখোন। ইউভি রেগে বললো।চাচির বেটি
বললাম তো আমাকে বোঝা লাগবে না।

আপনি না একদম অসভ্য!
ইউভি মুচকি হেসে হেলমেটটা তার মাথায় পরিয়ে দিল।
তারপর খুব যত্ন করে স্ট্র্যাপ লাগাতে লাগাতে বলল
“অসভ্য না হলে তোর মতো বিয়াদোব টার জন্য জীবন শেষ করে দেই।
ইনায়া এবার সত্যিই আর কথা বলতে পারল না।
শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, আর বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপতে লাগল।ইউভি খুব যত্ন করে ইনায়ার হেলমেটের স্ট্র্যাপটা ঠিক করে দিল।
তারপর একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বলল—
এবার ঠিক আছে।”
ইনায়া হেলমেটের ভিতর থেকেও মুচকি হাসল।
ইউভি বাইকে উঠে একটু পেছনে তাকিয়ে বলল—
ভালো করে ধরে বস, আদর। ইনায়া ইচ্ছে করেই বলল—
না ধরলে?”
ইউভি বাইক স্টার্ট দিতে দিতেই বলল না ধরলে কি দেখাচ্ছি আমি।
ইনায়া সাথে সাথে ইউভির জ্যাকেট শক্ত করে ধরে ফেলল না না আমি ধরে বসছি তো।
ইউভি হেসে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে বাইকটা রাতের মাগুরা শহরের রাস্তায় ছুটতে লাগল।

রাতের শহরটা যেন অন্যরকম সুন্দর।
রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট দোকানের আলো জলছে কোথাও চায়ের দোকানে আড্ডা জমেছে কোথাও ফুচকার গন্ধ ভেসে আসছে।
ইনায়া ইউভির পিঠে মাথা ঠেকিয়ে চারপাশ দেখছে।
বাতাসে তার চুলগুলো বারবার উড়ছে।
আর ইউভি মাঝেমধ্যে এক হাত দিয়ে পেছনে ইনায়ার হাতটা ছুঁয়ে দেখছে—ঠিকমতো ধরে আছে কিনা। একসময় ইনায়া ধীরে ধীরে আরও একটু কাছে সরে এলো।।ইউভি হালকা হেসে বলল—
“কি হলো? ভয় লাগছে?।ইনায়া মাথা নাড়িয়ে বলল না… শান্তি লাগছে।
এই কথাটা শুনে ইউভির বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।
বাইকটা শহরের ব্রিজের উপর উঠে গেল।
নিচে কালো পানিতে শহরের আলো ঝিলমিল করছে। ইউভি গতি একটু কমিয়ে দিল যেন মুহূর্তটা আরও দীর্ঘ হয়।।ইনায়া ধীরে ধীরে বলল—

“ইউভি ভাইয়া…”
“হুম?”
“আজকের রাতটা অনেক সুন্দর।”
ইউভি মুচকি হেসে বলল—
“রাত সুন্দর না… আমার সাথে আছিস তাই সুন্দর লাগতেছে।”
ইনায়া লজ্জা পেয়ে তার পিঠে ছোট্ট করে একটা চাপড় দিল ক্রেডিট কম নেন মিস্টার।
রাত তখন আরও গভীর হয়েছে।
মাগুরা শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এসেছে, কিন্তু শহরের সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গেছে।
ইউভির বাইকটা ধীরে ধীরে রাতের রাস্তা কেটে এগিয়ে যাচ্ছে।
দুই পাশের দোকানগুলোর অর্ধেক বন্ধ, কোথাও আবার এখনো হালকা আলো জ্বলছে। চায়ের দোকানে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছে, দূরে কোনো এক দোকান থেকে পুরোনো বাংলা গান ভেসে আসছে। ইনায়া ইউভির পিঠে মাথা রেখে চুপচাপ শহরটা দেখছে।
ইউভি মাঝে মাঝেই বাইকের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

কখনো শহরের আলো দেখাচ্ছে, কখনো নিরিবিলি রাস্তা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। একসময় তারা শহরের এক পুরোনো ব্রিজের উপর এসে থামল।
নিচে কালো পানির উপর লাইটের প্রতিচ্ছবি কাঁপছে। দূরে দু-একটা গাড়ির আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।।ইনায়া হেলমেট খুলে গভীর শ্বাস নিল।
“উফফ… কি সুন্দর!”
ইউভি বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শুধু ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
ইনায়া চারপাশ দেখতে দেখতে বলল—
“আগে কখনো রাতের শহর এভাবে দেখি নাই ইউভি ভাইয়া। ইউভি মুচকি হেসে বলল—
“কারণ আগে তো আমি ছিলাম না।”

ইনায়া হেসে ফেলল। তারপর দুজনে আবার হাঁটতে শুরু করল ব্রিজের উপর দিয়ে।
রাতের বাতাসে ইনায়ার চুলগুলো বারবার মুখে এসে পড়ছে।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ইউভি শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পুরো পৃথিবীতে দেখার মতো একমাত্র জিনিসটাই ইনায়া। ইনায়া হঠাৎ ঘুরে তাকাতেই ইউভির সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল।
সে ভ্রু কুঁচকে বলল—
“এভাবে কি দেখেন?”
ইউভি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
একদম সামনে এসে থামল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল—
“তোকে।”
ইনায়ার বুকটা আবার কেঁপে উঠল।

ইউভি হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে করে তার এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দিল।
তার আঙুলের ছোঁয়ায় ইনায়া অজান্তেই চোখ নামিয়ে ফেলল। ইউভি মুগ্ধ গলায় বলল—
জানিস এই মুহূর্তে তোকে এত সুন্দর লাগতেছে যে চোখ সরাইতে পারতেছি না আদর
ইনায়া ছোট্ট করে হেসে বলল—
আপনি সবসময় বাড়িয়ে বলেন ইউভি ভাইয়া
একটুও না।
ইউভি এবার আরও একটু ঝুঁকে এলো।
তার নিঃশ্বাস এসে লাগছে ইনায়ার মুখে।
ইনায়া ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
ইউভি ভাইয়া
হুম?”
এভাবে তাকাইয়েন না…”
কেন?”

ইনায়া লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
“হার্টবিট বেড়ে যায়…”
এই কথাটা শুনে ইউভির ঠোঁটে নরম হাসি ফুটল।
সে খুব আস্তে করে ইনায়ার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা একটু উপরে তুলল।
তারপর কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল তার চোখের দিকে। চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেছে। নদীর উপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে…
আর সেই বাতাসের মাঝেই ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার কপালে একটা গভীর নরম চুমু দিল।
ইনায়া চোখ বন্ধ করেই ইউভির জ্যাকেট শক্ত করে ধরল।
ইনায়ার নিঃশ্বাস তখন কাঁপছে।
সে চোখ বন্ধ করতেই ইউভি খুব ধীরে, খুব যত্ন করে ইনায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
একটা নরম, শান্ত, ভালোবাসা ভরা চুমু।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই…

শুধু গভীর মায়া আর দুজন মানুষের সমস্ত অনুভূতি মিশে আছে সেই মুহূর্তে। ইনায়া কেঁপে উঠে ইউভির জ্যাকেট আরও শক্ত করে ধরল। আর ইউভি তাকে আরও কাছে টেনে নিল নিজের বুকের সাথে।
ইউভি কপাল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল—
এত মায়া কেন তোর মধ্যে, আমার আদর।
ইনায়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
দুজনের মাঝে দূরত্ব তখন প্রায় নেই বললেই চলে।
ইউভি তার নাকের সাথে ইনায়ার নাক আলতো ছুঁইয়ে দিয়ে বললো আজকের রাতটা আমি কোনোদিন ভুলবো না আদর
ইনায়া ছোট্ট করে হেসে বলল—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৩

“আমিও না ইউভি ভাইয়া
তারপর ইনায়া নিজেই ধীরে ধীরে ইউভির বুকের কাছে সরে এলো।
ইউভি এক হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে নিল।
ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ একে অপরের খুব কাছে রইল যেন পুরো শহরটা দূরে সরে গেছে, আর তাদের ছোট্ট পৃথিবীতে শুধু তারা দুজনই আছে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৫