শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৮
সুমাইয়া ইসলাম নূর
রাতটা যেন আজ অস্বাভাবিক ভাবে নীরব লাগছে।
আকাশে মেঘ জমে আছে। মাঝেমধ্যে ঠান্ডা বাতাস বইছে… দূরে কোথাও বিদ্যুতের আলো ঝলসে উঠছে। আর সেই অন্ধকার রাতের মাঝেই পুরো “সিটি কেয়ার হাসপাতাল” যেন চৌধুরী পরিবার এর আতঙ্কে জমে গেছে।
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে শুধু কান্নার শব্দ।
ICU এর লাল বাতিটা এখনও জ্বলছে।
অনেকক্ষণ অপারেশনের পর অবশেষে ইনায়াকে ICU তে শিফট করা হয়েছে।।কিন্তু ডাক্তারদের মুখের গম্ভীরতা দেখে কারও বুকের কাঁপুনি কমছে না। নুসরাত চৌধুরী বারবার মেয়ের নাম ধরে কাঁদছেন। আমার নূর… আমার মা… একবার চোখ খোল মা…”তিনি মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।
সাবিহা চৌধুরী আর রেশমা চৌধুরী কোনোমতে তাকে সামলাচ্ছেন।রাতিব চৌধুরী করিডোরের এক পাশে বসে আছেন একদম পাথরের মতো।
চোখদুটো লাল হয়ে আছে… কিন্তু মানুষটা কাঁদছেও না। শুধু ফাঁকা দৃষ্টিতে ICU এর দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন।পিয়াসা ICU এর সামনে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো মেঝেতে বসে আছে।
বারবার উঠে দরজার ছোট্ট কাঁচের ভিতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে।আমার বেবিটা ঠিক হয়ে যাবে। তো…?”
— “ওরা এতক্ষণ ধরে ভিতরে কী করছে…?”
কথা বলতে বলতেই আবার কান্না করে দিচ্ছে মেয়েটা। ঠিক তখনই হাসপাতালের করিডোরে দ্রুত পায়ে ঢুকলো রিমঝিম আর রাশেদ মির্জা।
নুসরাত চৌধুরী রিমঝিমকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।আমাদের দোষ রে রিমঝিম…”
— “আমরা কেন মেয়েটারে এই অবস্থায় বাইরে যেতে দিলাম রিমঝিম কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল।
তার নিজের বুকটাও যেন ভেঙে যাচ্ছে।
কিন্তু নিজেকে শক্ত রাখতেই হবে।
সে ধীরে ধীরে নুসরাত চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বললো ভাবি প্লিজ নিজেকে সামলান।”
ইনায়া খুব স্ট্রং মেয়ে। ও কিছু হবে না।
কিন্তু কথাগুলো বলতে গিয়েও তার নিজের গলাটা কেঁপে উঠল।একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লিখন চৌধুরী হঠাৎ রাশেদ মির্জার হাত শক্ত করে ধরে বললেন—
আমি কীভাবে থাকবো আমার মেয়েটারে ছাড়া, রাশেদ…?“আমার লক্ষ্মী মা “আমার ইউভিকে আমি কী বলবো তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
— “আমার পাগল ছেলেটা আরও পাগল হয়ে যাবে আমি পারলাম না আমার ছেলের ভালোবাসাটারে যত্ন করে রাখতে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে আবার বললেন—
আমি ইউভিকে কথা দিছিলাম আমার নূর মারে আমি ওর হাতে তুলে দিবো আমি কথা রাখতে পারলাম না রাশেদ।
রাশেদ মির্জা ধীরে ধীরে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরলেন।“ভাইয়া… কিছু হবে না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে করিডোরের অন্যপাশে গেলেন। সেখানে রবিউল চৌধুরী মাথা নিচু করে বসে আছেন। রাশেদ মির্জা নিচু গলায় বললেন—
লন্ডনে খবর দিছেন?”
রবিউল চৌধুরী ক্লান্ত চোখে তাকালেন।
— “না…”
ঠিক কী বলবো বুঝতেছি না
রাশেদ মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন আমি বলতেছি।
এরপর তিনি ফোন বের করে ইউভির নাম্বারে কল দিলেন।দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ইউভির গলা ভেসে এলো—
— “ফুপা?
তোমরা কই?”
তার গলায় স্পষ্ট অস্থিরতা।
— “ফুপা… কিছু হইছে?”
রাশেদ মির্জা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললেন—তোমরা সোজা হাসপাতালে আসো।
মেজো ভাবি অনেক অসুস্থ।Emergency ICU তে রাখা হইছে…কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বয়ে গেল দুজনের মধ্যে । তারপর ইউভির ঠান্ডা গলা শোনা গেল কোন হাসপাতাল?”
— “City Care Hospital.।ইউভি খুব ছোট্ট করে বলল মেজো মায়ের খেয়াল রাখো।আমি আর রেদোয়ান এখনই আসতেছি।
তারপর হঠাৎ থেমে আবার বলল রেদোয়ানকে কিছু বলো না এখন…আমরা অন্য ব্যবস্থা করতেছি।আজ রাতেই পৌঁছাবো।।
কল কেটে গেল।
রাশেদ মির্জা কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন ছেলেটারে আমরা কীভাবে সামলাবো…?”
রবিউল চৌধুরী চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করলেন—
তুমি একটা ভালো কাজ করছো সত্যিটা না বলে…”
—ওখানে যদি শুনতো ইনায়ার কথা
—“তাহলে ইউভির কী অবস্থা হইতো আল্লাহই জানে
ঢাকার ব্যস্ত শহরও যেন গভীর রাতের আঁধারে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে।
রাস্তার দুইপাশের লাইটগুলো ঝাপসা হলুদ আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও দূরে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে কোথাও ট্রাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে আর সেই ফাঁকা রাস্তার মাঝখানে পড়ে আছে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া একটা বাইক। বাইকটা রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে আছে। সামনের অংশ পুরো ভেঙে গেছে।
আর কয়েক হাত দূরে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে ইনায়া। সাদাশার্টটা ধুলো আর রক্তে মাখামাখি।
মাথায় হেলমেট থাকায় বড় আঘাত লাগেনি… কিন্তু শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
তার হাতটা রাস্তার উপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।
চারপাশে কিছু মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ ফিসফিস করে বলছে—
—মনে হয় মাইয়া টা বাঁচে নাই…”
—ইন্না লিল্লাহ…”এত জোরে এক্সিডেন্ট হইছে!”
ঠিক তখনই এক বৃদ্ধ লোক সাহস করে সামনে এগিয়ে এলেন।কাঁপা হাতে ইনায়ার নাকের কাছে হাত রাখলেন।কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎ চিৎকার করে বললেন মাইয়াটা বেঁচে আছে! আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছে!
মুহূর্তেই চারপাশে হইচই পড়ে গেল।
দুই-তিনজন দ্রুত এগিয়ে এসে ইনায়াকে উঠালো।
ইনায়া আধো জ্ঞানহীন অবস্থায় কেঁপে কেঁপে শুধু একটা নাম বলছিল ইউ…ভি ভাইয়া…”
তারপর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল দ্রুত পাশের একটা ছোট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে।
কিন্তু সেখানে নিয়ে যেতেই ডাক্তাররা অবস্থা দেখে বলে দিল পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিক্যাল। আমাদের এখানে পর্যাপ্ত ট্রিটমেন্ট সম্ভব না। দ্রুত বড় হাসপাতালে নিতে হবে।
চারপাশে সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক তখনই সেই বৃদ্ধ লোকটা সামনে এসে বললেন সময় নষ্ট কইরেন না। আমি খরচ দিমু। আগে মাইয়াটারে বড় হাসপাতালে নেন! লোকটার চোখেও পানি চলে এসেছিল।নিজের মেয়ের বয়সী একটা মেয়েকে এভাবে দেখে বুকটা কেঁপে উঠেছে তার।
তারপর নিজের গাড়িতেই ইনায়াকে দ্রুত শহরের সবচেয়ে বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ইউনিট পুরো ব্যস্ত।
চারপাশে নার্সদের ছোটাছুটি… স্ট্রেচারের শব্দ… মনিটরের বিপ বিপ আওয়াজ।
ঠিক তখনই ইমার্জেন্সির করিডোর দিয়ে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছিল রাজ্য।
ডাক্তারের কোট পরা… চোখেমুখে ক্লান্তি।
সে তখন অন্য এক রোগীর রিপোর্ট দেখছিল।
কিন্তু হঠাৎ স্ট্রেচারে করে আনা মেয়েটার দিকে চোখ যেতেই রাজ্যের পুরো শরীর জমে গেল।
হাত থেকে ফাইলটা নিচে পড়ে গেল।
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
— “ই…ইনায়া…? পরের মুহূর্তেই সে দৌড়ে এগিয়ে এলো।স্ট্রেচারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁপা হাতে ইনায়ার মুখ ছুঁয়ে বলল আমাদের ইনায়া
ইনায়ার চোখ বন্ধ ঠোঁট কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে শরীর নিস্তেজ হয়ে আছে ।রাজ্যের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
সে প্রায় চিৎকার করেই বলল—
— “ওটি রেডি করো! NOW!”
চারপাশের ডাক্তার-নার্স সবাই দ্রুত নড়েচড়ে উঠল।
রাজ্য নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে…
কিন্তু হাত কাঁপছে তার। কারণ স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা মেয়েটা শুধু কোনো পেশেন্ট না…ও চৌধুরি বাড়ির প্রাণ। তুবার হাসির সঙ্গী। আর ইউভির পুরো পৃথিবী।
রাজ্য কাঁপা গলায় আবার বলল—
— “কিছু হইতে পারবে না তোর… শুনছিস বোনু? কিছু হইতে দিব না…তারপর নিজের চোখের পানি মুছে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারের দিকে চলে গেল। অপারেশন থিয়েটারের লাল আলোটা তখনও জ্বলছে। পুরো করিডোরজুড়ে ভারী নীরবতা।
শুধু মাঝে মাঝে ভেসে আসছে নার্সদের দ্রুত হাঁটার শব্দ… আর মনিটরের কাঁপা কাঁপা বিপ… বিপ… শব্দ।ওটির ভেতরে যুদ্ধ চলছে।একটা জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ। ইনায়ার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে সাদা বেডে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক।
হাতজুড়ে ক্যানোলা আর স্যালাইনের লাইন।
মনিটরে তার হার্টবিট কখনো দ্রুত উঠছে… কখনো হঠাৎ নিচে নেমে যাচ্ছে। রাজ্য গ্লাভস পরা হাতে দ্রুত কাজ করছে।কিন্তু তার চোখের ভেতরের ভয়টা স্পষ্ট। একজন ডাক্তার দ্রুত বলে উঠল—
— “BP dropping, sir!”আরেকজন বলল—
— “Pulse weak! রাজ্যের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে দ্রুত ইনায়ার দিকে তাকাল।মেয়েটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। যেন একটু পরেই হারিয়ে যাবে।রাজ্য কাঁপা গলায় বলল—
— “No… no… ইনায়া চোখ খোল বোনু
ঠিক তখনই মনিটরের শব্দ হঠাৎ বদলে গেল—
বিপ——————
একটানা লম্বা শব্দ।চারপাশ থমকে গেল।
একজন নার্স ভয় পেয়ে বলল—
— “Sir… cardiac arrest!”
রাজ্যের পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
— CPR START!সে সাথে সাথে ইনায়ার বুকের উপর চাপ দিতে শুরু করল।
একবার…
দুইবার…
তিনবার তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।
চোখ লাল হয়ে গেছে।
— “Come on বোনু ফিরে আয়।কিন্তু মনিটরের সরল দাগটা বদলাচ্ছে না।রাজ্য প্রায় চিৎকার করেই বলল Defibrillator!”
নার্স দ্রুত মেশিন এগিয়ে দিল।রাজ্য কাঁপা হাতে শক প্যাড ধরল।তার গলাটা কেঁপে উঠছে—
— “Clear!”শক দেওয়ার সাথে সাথে ইনায়ার শরীরটা হালকা কেঁপে উঠল।
মনিটরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবার ছোট ছোট রেখা উঠল…
তারপর আবার—
বিপ——————
রাজ্যের চোখ ভিজে উঠল।না না তুই এভাবে যেতে পারিস না…”
সে আবার বুক চাপতে লাগল।আরও জোরে।
তার হাত কাঁপছে… নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে।
— “ইনায়া! তোর ইউভি ভাইয়ার কাছে ফিরতে হবে!”ঠিক তখনই—
মনিটরে হঠাৎ আবার ছোট্ট একটা বিট উঠল।
বিপ…বিপ…বিপ…
পুরো ওটিতে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
একজন ডাক্তার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
— “She’s responding!।রাজ্য কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো রাজ্য
অপারেশনটা অবশেষে সফল হয়েছে।
কিন্তু বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এই কারণেই ইনায়াকে সরাসরি ICU তে শিফট করা হয়েছে। ICU-র কাঁচের দরজার ওপাশে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা।মুখে অক্সিজেন মাস্ক… হাতে স্যালাইন… শরীরজুড়ে অসংখ্য তার জড়িয়ে আছে।
মনিটরের ধীর বিপ… বিপ… শব্দটাই শুধু বুঝাচ্ছে—
ইনায়া এখনো বেঁচে আছে।আর দরজার এপাশে…
পুরো চৌধুরী পরিবার যেন ভেঙে পড়ে আছে।
নুসরাত চৌধুরী এখন ও বারবার মেয়ের নাম ধরে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।
রেশমা চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী তাকে ধরে বসিয়ে রাখছেন।কিন্তু মায়ের বুকের ভেতরের হাহাকার কি আর কেউ থামাতে পারে?
রাতিব চৌধুরী করিডোরের এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন।চোখদুটো স্থির হয়ে আছে ঠোঁট শুকিয়ে গেছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষটা প্রতিটা সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই দৌড়ে হাসপাতালে ঢুকল তুবা।
চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে—
মেয়েটা পুরো রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে এসেছে।
ICU-র সামনে এসেই সে রেশমা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আন্টি… আমার বেবিটারে বলেন না আমার সাথে কথা বলতে…”
— “ও ছাড়া আমি আর পিয়াসা কীভাবে থাকবো?”
তুবার গলা কাঁপছে।নিঃশ্বাস পর্যন্ত ঠিকমতো নিতে পারছে না।ও এতটা স্বার্থপর ক্যান হইলো আন্টি…?”
— “একবারও আমার আর পিয়াসার কথা ভাবলো না?”পিয়াসা তুবার কান্না শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দৌড়ে এসে তুবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।দুই বান্ধবির কান্নায় পুরো করিডোরটা আরও ভারী হয়ে উঠল।রাত যত গভীর হচ্ছে…স্বজনদের আহাজারি তত বাড়ছে।
কেউ এক ফোঁটা পানিও খায়নি।
কেউ হাসপাতাল থেকে এক পা নড়েনি।
সবাই শুধু একটা ভালো খবরের অপেক্ষায়।
একবার যদি ডাক্তার এসে বলে—
“ইনায়া এখন বিপদমুক্ত…”
তাহলেই যেন সবাই আবার নিঃশ্বাস নিতে পারবে।
ধীরে ধীরে রাত গড়িয়ে ভোর নামল।
ঘড়িতে তখন প্রায় রাত চারটা বাজে।
হাসপাতালের করিডোরের সাদা আলোয় সবার ক্লান্ত মুখগুলো আরও ফ্যাকাশে লাগছে।
কারও চোখে ঘুম নেই।কারও শরীরে শক্তি নেই।
ঠিক তখনি দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আজান এর ধনী
নিস্তব্ধ রাতটা কেমন কেঁপে উঠল সেই সুরে।
করিডোরে বসে থাকা সবাই ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। কারও চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কারও ঠোঁট কাঁপছে ।
নুসরাত চৌধুরী দুই হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বললেন আল্লাহ… আমার নূরটারে ফিরায়ে দেন…”
—ওরে ছাড়া আমি বাঁচবো না
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।
আকাশটা ধূসর হয়ে আছে।ঢাকার ঠান্ডা ভোরে এয়ারপোর্টের চারপাশে কুয়াশার হালকা আস্তরণ জমেছে।ঠিক তখনই এয়ারপোর্টের গেট পেরিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলো ইউভি আর রেদোয়ান।
বাইরে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে ইউভির অ্যাসিস্ট্যান্ট আর কয়েকজন গার্ড।
কালো গাড়ির দরজা খুলে ধরতেই এক মুহূর্ত দেরি করল না ইউভি।দ্রুত গাড়িতে উঠে বসে সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতেই বলল—রেদোয়ান, উঠ… জলদি।”
তার গলাটা অস্বাভাবিক ভাবে ঠান্ডা।
মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে ভাইয়ের দিকে তাকাল।
পুরো পথেই ইউভি একদম চুপ ছিল।
একটা কথাও বলেনি।রেদোয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বলল কি হইছে ভাইয়া?।তোমাকে স্বাভাবিক লাগতেছে না পুরোটা পথ তুমি আমার সাথে একটা কথাও বলো নাই।।আবার এত দ্রুত সব করতেছো কেন?
ইউভি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।চোখদুটো অদ্ভুত স্থির। সে শুধু নিচু গলায় বলল—
কিছুটা সময় অপেক্ষা কর, রেদোয়ান।
এরপর আবার পুরো গাড়িতে নীরবতা নেমে এলো।
শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর দ্রুতগতির বাতাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
প্রায় কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এসে থামলো হসপিটাল এর সামনে রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে।
সে চিন্তিত গলায় বলল—বারির সবাই ঠিক আছে তো ভাইয়া…? তোমাকে তো স্বাভাবিক লাগতেছে না
— “বলো না ভাইয়া… মা বাবা সবাই ভালো আছে?”
তার গলা কেঁপে উঠল।আমার পিহু ঠিক আছে তো? নাকি বোনুর জ্বর বেশি আসছে?বোনু অসুস্থ?”
— “কি হইছে বলো না ভাইয়া…আমার বোনু ঠিক আছে তো…?”
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়িয়ে বলল—
জানি না রে…তোর বোনুর ফোন কাল সন্ধ্যার পর থেকে বন্ধ বলতেছে।
আর চল ভিতরে গেলে দেখবি…সবাই সুস্থ আছে…”
—শুধু মেজো মা একটু অসুস্থ…রেদোয়ানের চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। কি বলো ভাইয়া… মা?!”
এরপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি সে।
প্রায় দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে গেল।
আর ইউভি…
সে ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে রেদোয়ানের পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।
হাসপাতালের কাঁচের দরজার সামনে এসে হঠাৎ পিছনে ফিরে নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টের দিকে তাকালো।
হালকা ইশারা করে ঠান্ডা গলায় বলল—
— “গাড়িগুলো সরায়া নিয়ে যাও…”
তারপর আবার ধীর পায়ে হাসপাতালের ভেতরে চলে গেল সে।
আর তার সেই অস্বাভাবিক শান্ত মুখটা দেখেই গার্ডগুলোর বুকের ভেতর কেমন অজানা ভয় জমে উঠলো।
।রেদোয়ান হাসপাতালের করিডোর দিয়ে প্রায় দৌড়ে আসছিল।সামনেই রবিউল চৌধুরী আর রাশেদ মির্জাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—চাচ্চু! ফুপা! মা কেমন আছে? বলো না!”
ঠিক তখনই ইউভিও এসে থামল।তার নিঃশ্বাস অস্বাভাবিক শান্ত।কিন্তু চোখদুটো ভয়ংকর স্থির।
সে ধীরে ধীরে রাশেদ মির্জার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “মেজো মা কই, ফুপা?
রাশেদ মির্জা হাতের ইশারায় একটা কেবিন দেখিয়ে দিলেন।ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল মেজো মাকে ICU থেকে কেবিনে দিছে? আলহামদুলিল্লাহ… এইটা তো ভালো কথা।
তারপর ইউভি আর রেদোয়ান সেই কেবিনের দিকে হাঁটতে লাগল।কিন্তু ICU-র সামনে পুরো পরিবারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইউভি থেমে গেল।
ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকিয়ে বলল।“কি ব্যাপার? তোমরা ICU-র সামনে কেন?”
তারপর ধীরে ধীরে মেজো মার কেবিনের দরজা একটু খুলে উঁকি দিল।নুসরাত চৌধুরী ঘুমের ওষুধে অচেতন হয়ে শুয়ে আছেন।
ইউভি কিছু সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আবার ধীরে ধীরে ICU-র সামনে চলে এলো।চারপাশে তাকিয়ে দেখল বাড়ির প্রতিটা সদস্য এখানে উপস্থিত।শুধু…
ইনায়া নেই।
ইউভির বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।
সে আবার দৌড়ে নুসরাত চৌধুরীর কেবিনে গেল।
ভাবলো—হয়তো ইনায়া ওখানে আছে।
কিন্তু না।রুমে শুধু নুসরাত চৌধুরী একা।
ইউভি এবার দ্রুত পায়ে আবার ICU-র সামনে ফিরে এলো।তার গলা কাঁপছে বলবা তোমরা কী হইছে?”
— “আমার আদর কই? কেউ উত্তর দিল না।
ইউভি এবার সরাসরি লিখন চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল বাবা… আমার আদর কই?
লিখন চৌধুরী ঠোঁট কাঁপিয়ে বললেন—
— “সান্ত হও, ইউভি।
কিন্তু এবার ইউভির সত্যি সত্যিই ভয় করতে শুরু করল।সে ধীরে ধীরে ICU-র দরজার দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই তুবাকে দেখতে পেল সেখানে।
ইউভির বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল।
— “তুবা এখানে তার ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে।
— “না… না এইটা হইতে পারে না
তারপর হঠাৎ নুসরাত চৌধুরীর কেবিনের দিকে তাকিয়ে বলল।মা… আমার আদরের কী জ্বর বেশি আসছে?।কি হইছে ওর?।আগের থেকে বেশি জ্বর?তোমরা আমাকে আগে বলো নাই কেন?তার গলা এবার ভেঙে গেল।
আর ফুপা… তুমি শুধু মেজো মার কথা বললা…”
— “আমার আদরের কথা বললা না কেন? সবাই মাথা নিচু করে আছে।কেউ কোনো উত্তর দিতে পারছে না। ইউভি নিজের চুল মুঠো করে ধরে চিৎকার করে উঠল কি হইছে বলবা?!”
— “আমার আদর কই?!
ঠিক তখনই ICU-র দরজা খুলে রাজ্য বের হলো।
সে রাতিব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল আঙ্কেল… ইনায়ার এখনো কোনো response নাই…কি করবো বুঝতেছি না…”
রাজ্য তখনও খেয়াল করেনি ইউভি এসে গেছে।
রেদোয়ান মুহূর্তেই রাজ্যের কলার চেপে ধরল—
কি হইছে আমার বোনের? তুই আগে বলিস নাই কেন?।আমার বোনুর কিছু হইছে বল না!
এই বলে সে প্রায় দৌড়ে ICU-র ভেতরে ঢুকে গেল।
আর পরের মুহূর্তেই তার বুকফাটা চিৎকার ভেসে এলো।বোনু !”
রেদোয়ান স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে।
তার আদরের বোন সাদা বিছানায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে।শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ।বিভিন্ন যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত।দৃশ্যটা সহ্য করতে না পেরে সে দৌড়ে ICU থেকে বেরিয়ে এসে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল আমি শেষ হয়ে যাবো।
— “আমার বোনুর কিছু হইলে আমি শেষ।
এদিকে ইউভি ধীরে ধীরে ICU-র ভেতরে ঢুকল।
নার্সরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করছিল।
— “স্যার প্লিজ! Patient এর condition ভালো না! কিন্তু ইউভি যেন কিছুই শুনছে না।
সে শুধু এক দৃষ্টিতে নিজের আদরের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁপা হাতে মেয়েটার ঠান্ডা আঙুল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল আমার আদর…”
— “তুই সত্যি আমার আদর তো…?”
তার চোখে পানি নেই। কিন্তু পুরো মানুষটা কাঁপছে।
ইউভি ধীরে ধীরে রাজ্যের দিকে তাকাল।
কি হইছে আমার আদরের? আমি যেটা ভাবতেছি… ওইটা না তো, রাজ্য? রাজ্য মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর ভাঙা গলায় বললো।
— “মাথায় helmet থাকার কারণে… আমাদের ইনায়া বেঁচে গেছে কিন্তু বুকে অনেক আঘাত পাইছে ইউভি স্থির হয়ে গেল।
রেদোয়ান বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
চাচ্চু… আমাদের আগে বলো নাই কেন?”
আমার কলিজাটা খুব কষ্ট পাচ্ছে
— “সামান্য হাত কাটলেও যে পুরো বাড়ি মাথায় তোলে আমাদের সেই ইনায়া এই কষ্ট সহ্য করতে পারতেছে না।
এদিকে ইউভি ধীরে ধীরে বলল—
— “এখানে treatment কেমন?।আমার আদরের জ্ঞান ফিরবে কখন?”
রাজ্য চুপ। ইউভি এবার হঠাৎ রাজ্যের কলার চেপে ধরল।এই! তুই শুনতেছিস না?।আমি জিজ্ঞেস করতেছি আমার আদরের জ্ঞান ফিরবে কখন!
— “কতক্ষণ এইভাবে শুয়ে আছে ওই বেয়াদবটা? ”
রাজ্যের ঠোঁট কাঁপছে। বারো ঘণ্টা…”
ইউভির ঠোঁটের কোণে হঠাৎ একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
— “বাহ…”বারো ঘণ্টা বেশ ভালো তো…
তারপর ফিসফিস করে বলল—
— “আর কয় ঘণ্টা ও এইভাবে পড়ে থাকবে?”
রাজ্যের গলা শুকিয়ে গেছে।অনেক কষ্টে বলল—
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে…
ইনায়া সারাজীবনের জন্য coma-তে চলে যেতে পারে, ইউভি।
কথাটা শুনে পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল ইউভি
কিন্তু ইউভি।সে শুধু হালকা হাসল।
— “ব্যাস?”
— “এইটুকু সময়?”
তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার চুলে হাত বুলিয়ে বলল ওই বেয়াদবটার জন্য আমার কোনো শান্তি নাই
সারাজীবন ওর স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়া বারবার আমি ওরে আঘাত দেই কেন বল তো?
তার গলা কেঁপে উঠছে।
আমি যদি ওই বাইক টা গিফট না করতাম তাহলে শুধু ও একা কষ্ট পাইতো
এখন দেখ।আমার পুরো পরিবার কষ্ট পাচ্ছে ওর জন্য ।
রাজ্য বলল—আর তুই?
ইউভি আবার হাসল।
— “আমি? আমি তো একটুও কষ্ট পাচ্ছি না
তার চোখের কোণ বেয়ে অবশেষে পানি গড়িয়ে পড়ল।দেখ…আমি হাসতেছি…।
তারপর হঠাৎ ইনায়ার হাত শক্ত করে ধরে চিৎকার করে উঠল ওই বেয়াদব!তোরে আমি কতবার বলছিলাম…তোর কোনো স্বপ্নের জন্য যদি আমার আদর কষ্ট পায়…তাহলে তোরে আমি ছাড়বো।না!”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে।দেখ!”
— “তাই করলি!।
এখন আমাকে কাঁদিয়ে ঘুমিয়ে আছিস?!”
ইউভি কাঁপতে কাঁপতে ইনায়ার কপালে মাথা ঠেকাল।
— “রাজ্য…ওর জ্ঞান ফিরানোর জন্য যা যা করা লাগে কর…তারপর হঠাৎ বুকফাটা একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।আমার আদর ব্যথা সহ্য করতে পারে না রে…!।ইউভির গলা আটকে গেল।
সে কাঁপা হাতে ইনায়ার মুখ ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল আদর…”একবার চোখ খোল”
তোর শেহজাদা আইছে দেখ…আমি আর তোকে বকা দিবো না…তুই যা চাইবি সব দিব।
তুই এইভাবে চুপ থাকিস না, আদর…”
— “আমি পারতেছি না…
রাত তখন আরও গভীর হয়ে এসেছে।
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে সাদা আলো জ্বলছে। চারপাশে ওষুধের গন্ধ মেশিনের টুকটাক শব্দ… আর চাপা কান্নার আওয়াজ।।আইসিইউর ভেতরে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছে ইনায়া।শরীরজুড়ে ব্যান্ডেজ… হাতে ক্যানোলা… বুকের পাশে মনিটরের আলো জ্বলছে নিভছে।।আর ঠিক তার পাশের মেঝেতে বসে আছে ইউভি।
কালো শার্টটা এলোমেলো হয়ে গেছে। চোখদুটো লাল হয়ে গেছে ইনায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে সে।যেন হাত ছেড়ে দিলেই তার আদর হারিয়ে যাবে। রাজ্য কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল ইউভির দিকে।
মনে মনে শুধু ভাবছে—
“যে ছেলে নিজের গায়ে সামান্য ধুলো লাগলেও বিরক্ত হতো…সে আজ হাসপাতালের ঠান্ডা মেঝেতে বসে আছে শুধু একটা মেয়ের জন্য।
ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার কপালে হাত রাখল।
তারপর খুব আস্তে বলল—রাজ্য…আমার আদরের কি অনেক ব্যথা লাগতেছে…?গলাটা কেঁপে উঠল তার।
কোনোভাবে এই কষ্ট কমানো যায় না…?”
রাজ্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল আমরা সব চেষ্টা করতেছি উভি… ইন শা আল্লাহ বোনু ঠিক হয়ে যাবে ইউভি ফাঁকা চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়েই বলল ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবো… দেশের বাইরে… পৃথিবীর যেখানে ভালো চিকিৎসা আছে সেখানে নিয়ে যাবো…আমার আদরের কিছু হলে আমি বাঁচবো না রাজ্য।
রাজ্য এবার ইউভির কাঁধে হাত রাখল।
শান্ত হ… এখানেই best treatment হচ্ছে।আমাদের বেয়াদবটা ঠিক হয়ে যাবে।ইউভি সাথে সাথে মাথা তুলে তাকাল।তারপর ঠোঁটের কোণে ছোট্ট কষ্টের হাসি এনে বলল—তোদের বেয়াদব না…”
সে আলতো করে ইনায়ার আঙুলে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
— “শুধু আমার বেয়াদব বউ…”
রাজ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তারপর পাশে চুপচাপ বসে রইল।আইসিইউর আলোয় ইউভি আবার ইনায়ার দিকে তাকাল।।
দুপুর গড়িয়ে ধীরে ধীরে বিকেল নেমে আসছে।
হাসপাতালের কাঁচের জানালা দিয়ে কমলা রঙের আলো এসে পড়ছে করিডোরে।কিন্তু ICU-র সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনে যেন কোনো আলোই নেই।ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে গেছে…
তবুও ইনায়ার জ্ঞান ফিরেনি।সবাই একইভাবে অপেক্ষা করছে।কেউ চুপচাপ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে…কেউ জায়নামাজে বসে দোয়া পড়ছে…
শুধু তুবাকে জোর করে তার বাবা বাসায় নিয়ে গেছে।কিন্তু যাওয়ার আগে মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলেছে আমার বেবি উঠলেই আমাকে call দিবা…”
আর এখন
সবাই শুধু একটাই সময় গুনছে।
আর মাত্র এক ঘণ্টা।
এই এক ঘণ্টার মধ্যেই ইনায়ার জ্ঞান ফিরতেই হবে।
ICU-র ভেতরে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে ইউভি।
তার চোখদুটো লাল হয়ে আছে।কিন্তু এখনও ইনায়ার হাত ছাড়েনি সে।ঠিক তখনই রাজ্য এসে ইউভির হাত শক্ত করে ধরল।
তার গলা কাঁপছে ভাই… এক ঘণ্টার মধ্যে যদি ইনায়ার জ্ঞান না ফেরে…তাহলে আমাদের বোন সারাজীবনের জন্য coma-তে চলে যাবে…”
রাজ্যের চোখ পানিতে ভিজে উঠল।
— “তুই কিছু কর ভাই…ওর সাথে একটু কথা বল…”
তোদের সুন্দর মুহূর্তগুলোর কথা বল ও তোর সব কথা শুনতে পারতেছে…তোর কথাতেই response করবে…আমি sure।
ইউভি ইনায়ার কানের কাছে গিয়ে তাদের একসাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলোর কথা বলতে লাগলো…
কিন্তু এতকিছুর পরও ইনায়ার কোনো সাড়া না পেয়ে ইউভি হঠাৎ ভেঙে পড়ে চিৎকার করে বললো
— “বলো কীভাবে…”
রবো এভাবে…”
— “আমায় গোছাবে…”
কে দু হাতে
— “ফিরে আসো না…
আর তো পারি না…
— “বাঁচি চলো না…
আবার একসাথে…
আদর প্লিজ চোখ খোল! তুই না বলেছিলি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবি না? তাহলে আজ এভাবে চুপ হয়ে আছিস কেন? একবার কথা বল আদর আমি আর পারছি না…”
তারপর সে ইনায়ার হাত মুঠো করে নিজের কপালে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলল—
— “ভালোবাসি আদর…”
— “অনেক বেশি ভালোবাসি তোকে…”
চোখ বন্ধ করে কাঁপা গলায় বলল—
— “তুই না শুনতে চেয়েছিলি ? তাহলে শোন।
আমি… শেহজাদা ইউভি চৌধুরী…”
তোকে অনেক ভালোবাসি…”
ভালোবাসার থেকেও বেশি ভালোবাসি…”
তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বললো
তুই কি শুনতে পারতেছিস আদর…?
শেহেজাদার আদর পর্ব ৩৭
ICU-র ভেতরে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
রাজ্য ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল।
মনে হচ্ছিল—হয়তো সত্যিই সব শেষ…
ঠিক তখনই হঠাৎ মনিটরের শব্দ বদলে গেল।
“বিপ… বিপ… বিপ…”
