শেহেজাদার আদর পর্ব ৪১
সুমাইয়া ইসলাম নূর
দেখতে দেখতে ইনায়াদের লন্ডন যাওয়ার দিন চলে এলো।
গত কয়েকদিনে ইনায়া অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে। বুকের ব্যথাও এখন আগের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু বাড়ির পরিবেশে আজ যেন অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা কাজ করছে।
রেশমা চৌধুরী আর নুসরাত চৌধুরী গত কয়েকদিন ধরে মেয়েদের জন্য তাদের পছন্দের সব খাবার রান্না করেছেন। কখনো কাচ্চি, কখনো ইলিশ ভাজা, কখনো আবার গরুর মাংসের ভুনা। সকালে ঘুম থেকে উঠলেই টেবিল ভর্তি থাকতো তাদের প্রিয় সব খাবারে।
আজ বাড়ির তিন কর্তা—লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী—কেউ অফিসে যাননি। মেয়েরা চলে যাবে বলে সবাই ছুটি নিয়েছেন। রেদোয়ানও আজ বাসাতেই আছে।
চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা মানুষের মনই আজ ভারী।
এদিকে ইনায়ার রুমে বিছানার উপর বসে আছে তুবা। কান্নায় তার চোখ-মুখ ফুলে গেছে।
স্কুল জীবনের শুরু থেকেই ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা একসাথে। একই স্কুল, একই কলেজ, একই দুষ্টুমি, একই স্মৃতি।
আজ প্রথমবারের মতো এত দূরে চলে যাবে ওরা।
ইনায়া তুবার পাশে গিয়ে বসলো। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলল—
— “এই বেবি এত কান্না করিস না তো। আমরা কি চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছি? মাত্র চার মাস পরই তো আবার আসবো। মাঝখানে পরীক্ষার জন্যও আসতে হবে।”
তুবা নাক টেনে বলল—
— “তাও তো চার মাস…”
ইনায়া মুচকি হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
— “জানিস তুবা, জীবনে প্রতিটা মেয়েকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। পরিবার যত বড়লোকই টাকাওয়ালা হোক না কেন, নিজের একটা পরিচয় থাকা খুব দরকার।”
তারপর আঙুল দিয়ে তুবার কপালে টোকা মেরে বলল—
— “আর তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। তোকে তো ডাক্তার হতে হবে, তাই না?”
ঠিক তখনই পিয়াসা রুমে ঢুকলো।
পরিস্থিতি দেখে তার নিজেরই চোখ ভিজে উঠল।
সে এসে দুজনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে বলল—
— “আমরা আবার আগের মতোই শয়তানি করবো। চার মাস কোনো সময়ই না। ভিডিও কলে তো প্রতিদিন কথা হবেই। আর মাঝেমধ্যে তো আসবও।”
তুবার মুখে এবার একটু হাসি ফুটলো।
— “আচ্ছা ঠিক আছে। আমাকে আর বুঝাতে হবে না।”
হঠাৎ দুষ্টু হেসে সে বলল—
— “যাই হোক, তোরা চার মাস ইউভি ভাইয়া আর রেদোয়ান ভাইয়াকে ছাড়া থাকবি কীভাবে?”
কথাটা শুনে মুহূর্তেই ইনায়া আর পিয়াসার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
পিয়াসা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না।
— “আমি আসছি। আমার এখনও অনেক প্যাকিং বাকি আছে।”
কথাটা বলেই চোখ মুছতে মুছতে রুম থেকে বের হয়ে গেল সে।
পিয়াসা বেরিয়ে যেতেই ইনায়া একটু দুষ্টু ভাব নিয়ে বলল আমার কিচ্ছু হবে না। উনাকে আমার লাগবেই না।
তুবা ভ্রু তুলল।
ইনায়া গম্ভীর মুখে বলে চলল—
— “আমি নতুন কাউরে খুঁজে নিবো।”
— “ওমা!”
— “হ্যাঁ। যে আমাকে ভালোবাসবে দিনে একশো বার বলবে ভালোবাসি। এমন কাউকেই খুঁজে নিবো।”
তুবা এবার হেসে ফেলল।
— “কিন্তু তোর চোখ-মুখ তো অন্য কথা বলতেছে।”
ইনায়া তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিল।
আচ্ছা শোন, আমরা যাওয়ার সময় কিন্তু তুই এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যাবি।তুবা কিছু বলার আগেই ইনায়া অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।
কারণ সে জানে, মুখে যতই শক্ত কথা বলুক, বুকের ভেতরের শূন্যতাটা সে নিজেও অনুভব করছে।
অন্যদিকে পিয়াসা ধীরে ধীরে রেদোয়ানের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো।
দরজাটা আলতো করে খুলে ভেতরে ঢুকল।কিন্তু রুমে কোথাও রেদোয়ানকে দেখা গেল না।
চারপাশে তাকিয়ে সে ভেবেছিল হয়তো নিচে গেছে। ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ ভেসে এলো।পিয়াসা মুচকি হেসে রুমের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো।
বিকেলের নরম বাতাস বইছে।
তার খোলা চুলগুলো বারবার উড়ে এসে মুখে পড়ছে।বিরক্ত হয়ে সে বারবার চুল সরাচ্ছিল।
হঠাৎ ঘাড়ের কাছে উষ্ণ একটা স্পর্শ অনুভব করতেই পুরো শরীর কেঁপে উঠল তার।
পেছন থেকে রেদোয়ান এসে দাঁড়িয়েছে।
সে খুব আস্তে করে পিয়াসার ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল—
— “পিহু…”
পিয়াসা চমকে উঠল।মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।
আর রেদোয়ান?
সে শুধু মুগ্ধ হয়ে নিজের প্রিয় মানুষটার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইল।পিয়াসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে হঠাৎ করেই রেদোয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কাঁপা কাঁপা গলায় বলল—
অনেক মিস করবো তোমাকে…”
রেদোয়ান মুচকি হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
তারপর খুব স্নেহ করে পিয়াসার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল আমি খুব দ্রুতই তোর কাছে চলে যাব, পিহু। এখানে কিছু কাজ আছে, সেগুলো শেষ করেই আসবো।।পিয়াসা চুপচাপ শুনছে।
রেদোয়ান আবার বলল—জানিস, প্রথমে আমিও বোকাদের মতো তোকে যেতে দিতে চাইনি
কিন্তু দিন শেষে ভেবে দেখলাম, আমার পিহুরও একটা পরিচয় হওয়া দরকার। ভাইয়া যেমন বোনুর জন্য এত সুন্দর একটা সুযোগ করে দিচ্ছে, তেমনি তোকে প্রতিষ্ঠিত করাও আমার দায়িত্ব।”
পিয়াসার চোখ আবার পানিতে ভিজে উঠল।
রেদোয়ান তার চোখের কোণের পানি মুছে দিয়ে বলল মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। একদিন তুই সবার সামনে প্রেজেন্টেশন দিবি আর আমি বসে বসে মুগ্ধ হয়ে আমার পিহুকে দেখবো।
পিয়াসা চোখ মুছতে মুছতে হেসে ফেলল।
— “সত্যি? প্রতি সপ্তাহে আমার কাছে আসবা?
রেদোয়ান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
জি মহারানি। আপনার জন্য সবকিছু করা সম্ভব।”
কথাটা শুনে পিয়াসার মুখে সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল।রেদোয়ান আবার তাকে নিজের কাছে টেনে নিল।ব্যালকনির বাইরে বিকেলের বাতাস বইছে।
কিছুক্ষণ পর পিয়াসা হঠাৎ খেয়াল করল, রেদোয়ান এখনও ঠিকমতো তৈরি হয়নি।
সে লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল—
— “আপনি আগে রেডি হয়ে আসেন।”
রেদোয়ান ভ্রু তুলে বলল—
— “কেন?”পিয়াসা সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিল।
— “এমনি।”
রেদোয়ান এবার হেসে ফেলল।
সে বুঝতে পারছে পিয়াসা অস্বস্তিতে পড়েছে।
আমার কাছে তো ভালোই লাগছে। পিয়াসা চিল্লিয়ে বললো তুমি যাবে।
রেদা আর কিছু না বলে মৃদু হেসে বলল—
আচ্ছা, ঠিক আছে। পাঁচ মিনিট দে।
পিয়াসা মাথা নেড়ে ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখে লাজুক হাসি।
আর বুকের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই অনুভূতি চার মাস অনেক সময়।
কিন্তু অপেক্ষা করার মতো মানুষ থাকলে, সময়ও হয়তো এতটা কঠিন লাগে না।রেদোয়ান রুমে ফিরতেই পিয়াসা তাড়াহুড়ো করে বলল—
চলো, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু রেদোয়ান কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পিয়াসার দিকে।
পিয়াসা লজ্জা পেয়ে বলল কি দেখছো এমন করে?”
রেদোয়ানের ঠোঁটে দুষ্টু একটা হাসি ফুটে উঠল।
ভাবতেছি, পুরো এক সপ্তাহ কিভাবে কাটাবো।
পিয়াসা মুচকি হেসে বললএক সপ্তাহই তো। তোরে ছাড়া একদিনও অনেক লম্বা লাগে, পিহু।”
কথাটা শুনে পিয়াসার মুখের হাসিটা আরও গভীর হয়ে গেল।
রেদোয়ান ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলো।
তারপর কোনো কথা না বলে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।পিয়াসাও চুপচাপ তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে রইল।কিছু মুহূর্ত দুজনের কেউই কোনো কথা বলল না।শুধু একে অপরের উপস্থিতিটুকু অনুভব করছিল।
রেদোয়ান খুব আস্তে করে বলল খুব মিস করবো তোকে, পিহু। পিয়াসা চোখ বন্ধ করেই উত্তর দিল—
— “আমিও।”
রেদোয়ান তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—
মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। নিজের খেয়াল রাখবি। আর কোনো চিন্তা করবি না।আপনি প্রতি সপ্তাহে আসবেন তো?”
যত ব্যস্ততাই থাকুক, আমার পিহুর জন্য সময় বের করবো।পিয়াসা এবার হেসে ফেলল।তারপর আরও একটু শক্ত করে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলল—
— “প্রমিস?”
রেদোয়ানও তাকে আগলে রেখে বলল—
— “প্রমিস।”
পিয়াসা একটু চিন্তিত গলায় বলল—
আমরা দুজন একা কিভাবে যাবো?”
রেদোয়ান মুচকি হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল সব রেডি করা আছে, পিহু। তোদের কিছুই করতে হবে না। নিরাপদেই পৌঁছে যাবি।”
পিয়াসা চুপচাপ শুনতে লাগল।রেদোয়ান আবার বলল—ওখানে কোথায় থাকবি, কিভাবে থাকবি, ইউনিভার্সিটির সব কাগজপত্র—সব ভাইয়া আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছে।তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বললো তোদের শুধু একটাই কাজ।”
— “কি?”
— “মন দিয়ে পড়াশোনা করা।”
পিয়াসা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে রাতের আঁধারে হারিয়ে গেছে।
চৌধুরী বাড়ির সামনে একের পর এক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে চাঁদের ম্লান আলো, আর উঠানের ঝুলানো লাইটগুলোর হলুদ আভায় পুরো বাড়িটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।গেটের বাইরে শহরের ব্যস্ততা এখনও থামেনি।দূরে গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে, কোথাও দোকানের সাইনবোর্ডের আলো জ্বলছে, কোথাও মানুষ দিনের শেষ আড্ডায় ব্যস্ত।
এদিকে চৌধুরী বাড়ির ভেতর চলছে বিদায়ের প্রস্তুতি।গার্ডরা একে একে ইনায়া আর পিয়াসার লাগেজগুলো গাড়িতে তুলে রাখছে।
বড় বড় স্যুটকেস, ব্যাগ, বইয়ের কার্টন—সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা হচ্ছে।বাড়ির সবাই হাসিমুখে বিদায় জানানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু সবার চোখেই লুকানো কষ্ট স্পষ্ট।
রাতিব চৌধুরী দুই মেয়েকে কাছে ডেকে নিলেন।
তারপর দুজনের মাথায় হাত রেখে বললেন—
আমার মেয়েরা জিতেই ফিরবে, ইনশাআল্লাহ।”
তার গলা একটু ভারী হয়ে এলো।
আমি তোমাদের নিয়ে গর্ব করি।”
পিয়াসা আর ইনায়া দুজনেই রাতিব চৌধুরী কে।জড়িয়ে ধরল।আয়াত, আতিকা আর রিদও ছুটে এলো।তিনজন মিলে দুই আপুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলল—ভিডিও কল দিবা কিন্তু সবসময়!আয়াত উৎসাহভরা গলায় বলল—
আপু, আমিও বড় হয়ে তোমাদের মতো লন্ডন পড়তে যাবো।”
সাথে সাথে আতিকা বলল—
— “আমিও!”
রিদও হাত তুলে বলল—
— “আমিও যাবো!
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
এক এক করে সবাই ইনায়া আর পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরছে, বুঝিয়ে বলছে, দোয়া করছে।
কিন্তু এত মানুষের মাঝেও ইনায়ার মনটা বারবার অন্য কাউকে খুঁজছে।ধীরে ধীরে সে গার্ডেনের দিকে এগিয়ে গেল।তারপর মাথা তুলে তাকালো ইউভির রুমের ব্যালকনির দিকে।অন্ধকার ব্যালকনিটা নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে আছে।ইনায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
সে মনে মনে বললো ইউভি ভাইয়া একবারও আসলো না…আমি এত দূরে চলে যাচ্ছি… একবারও আটকানোর চেষ্টা করলো না.
একবার বিদায়ও জানালো না…”
মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
অজান্তেই গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা অশ্রু।
ঠিক তখনই রাতিব চৌধুরী মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন।মেয়ের মুখটা দেখেই তিনি সব বুঝে গেলেন।খুব স্নেহের গলায় বললেন একদম কান্না করবে না মা।ইনায়া দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।
রাতিব চৌধুরী তার মাথায় হাত রেখে বললেন—
তুমি কান্না করলে আমি কি করে থাকবো বলো?”
বাবার কথায় ইনায়ার বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল।কিন্তু সে জানে, এই মুহূর্তে ভেঙে পড়লে সবাই কষ্ট পাবে।তাই নিজেকে শক্ত করল।
চোখের পানি মুছে বাবার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল—আমি কান্না করছি না, বাবা।”
তারপর আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—শুধু দোয়া কোরো।কিসের দোয়া, মা?”
ইনায়ার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল।
দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল তোমার মেয়ে যে জেদ নিয়ে বাড়ি ছাড়ছে… সেই জেদটা যেন সফল হয়।
কথাটা শুনে রাতিব চৌধুরীর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শুধু বললেন—ইনশাআল্লাহ, হবে মা। অবশ্যই হবে।
রাত তখন প্রায় গভীর হয়ে এসেছে।
ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে গাড়ি থামতেই ইনায়া আর পিয়াসা দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।আজ সত্যি সত্যিই তারা নিজেরা বিদেশে পড়তে যাচ্ছে।চারপাশে অসংখ্য মানুষ।কেউ বিদায় দিচ্ছে, কেউ লাগেজ টানছে, কেউ আবার ব্যস্ত পায়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে।বিমানবন্দরের কাঁচের দেয়ালগুলো আলোয় ঝলমল করছে।
বড় বড় ডিজিটাল স্ক্রিনে একের পর এক ফ্লাইটের তথ্য ভেসে উঠছে।পিয়াসা ধীরে ধীরে বলল—
— “ইয়া আল্লাহ… সত্যি সত্যি আমরা চলে যাচ্ছি।”
ইনায়া মৃদু হেসে বলল—আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। গাড়ি থেকে নামার পরই দুজন আরেকটা জিনিস খেয়াল করল।তাদের কোনো কাজই প্রায় করতে হচ্ছে না।গার্ডরা আগে থেকেই লাগেজগুলো নামিয়ে ট্রলি এনে দিয়েছে।এয়ারপোর্টে ঢুকতেই একজন স্টাফ যেন আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল।হাসিমুখে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দিল।
চেক-ইনের সময়ও কোনো ঝামেলা হলো না।
যেখানে অন্য যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তাদের সবকিছু আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুত শেষ হয়ে গেল।
পিয়াসা ফিসফিস করে বলল—
শোন…”
হুম?”
— “তোর কি মনে হয় না কেউ আমাদের অদৃশ্যভাবে হেল্প করতেছে?ইনায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।সত্যি বলতে তারও একই অনুভূতি হচ্ছে।
পাসপোর্ট চেক…ব্যাগেজ..বোর্ডিং পাস…
সবকিছু এত সহজে হয়ে যাচ্ছে যে অবাক না হয়ে উপায় নেই।ইনায়া হালকা হেসে বলল—আমারও তাই মনে হচ্ছে।পিয়াসা ভ্রু কুঁচকে বলল—
ভাইয়া আর রেদোয়ান ভাইয়া কিছু করছে নাকি?
ইনায়া উত্তর দিল না।
কিন্তু তার মনে অকারণেই একজন মানুষের কথা ভেসে উঠল।ইউভি।যে মানুষটা বিদায় দিতেও আসেনি সে কি করবে আমার জন্য এই কারণেই ইনায়ার মনটা আবার একটু খারাপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর বোর্ডিংয়ের ঘোষণা ভেসে এলো।
দুজন নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল।বিশাল কাঁচের করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা প কাছ থেকে বিমানটাকে দেখল।
আলোয় ঝলমল করা বিশাল সাদা বিমান।
দুজন একসাথে হেসে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে বিমানের ভেতরে উঠে নিজেদের সিট খুঁজে নিল।জানালার পাশের পাশাপাশি দুইটা সিট।বসতেই দুজনের মুখে আবার সেই বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল।জানালার বাইরে রানওয়ের আলো দেখা যাচ্ছে।দূরে একটার পর একটা বিমান দাঁড়িয়ে আছে।
পিয়াসা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “জীবনটা কেমন বদলাইয়া গেল, তাই না?”
ইনায়া ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
মাত্র কয়েক দিন আগেও তারা গ্রামের মাঠে দৌড়াদৌড়ি করেছে.. শসা চুরি করেছে…
পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দিয়েছে…
আর আজ তারা হাজার হাজার মাইল দূরের এক নতুন জীবনের পথে।
পিয়াসা আবার বলল—আমার এখনও মনে হচ্ছে কেউ আমাদের সবকিছু দেখতেছে।”
ইনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
কেন যেন তার মনে হচ্ছে।এই পুরো যাত্রার প্রতিটা ধাপে কেউ একজন নীরবে খেয়াল রাখছে।
কোনো ঝামেলা হতে দিচ্ছে না।
কিন্তু সেই মানুষটা কে…
সেটা এখনও তাদের জানা নেই।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে মন খারাপ করে বসে আছে মেয়েটা।পিয়াসা প্রথমে খেয়াল করেনি।কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখল ইনায়া অস্বাভাবিক চুপচাপ।সে কনুই দিয়ে হালকা গুঁতো মেরে বলল—
— “কি রে? এত চুপচাপ কেন?”
ইনায়া জোর করে হাসার চেষ্টা করল।
— “কই? কিছু না তো।।পিয়াসা চোখ ছোট করে তাকাল।আমাকে বোকা পায়েছিস।
ইনায়া উত্তর দিল না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলল—
— “জানিস… বাড়ি ছাড়ার সময় মনে হচ্ছিল ঠিক আছি।”
— “হুম।”
— “কিন্তু এখন কেমন জানি লাগতেছে।”
পিয়াসা মুচকি হাসল।সে জানে তার বেবির মন খারাপের কারণ।তাই ইচ্ছে করেই বলল—
— “কার জন্য?”
ইনায়া সাথে সাথে বলল—
— “কারও জন্য না।”
পিয়াসা এবার হেসে ফেলল।
— “আচ্ছা!”
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলল—
হাসিস কেন?”
কারণ তোর মুখটা সব বলে দিচ্ছে।”
কথাটা শুনে ইনায়া চুপ হয়ে গেল।
সত্যি বলতে কি…সে যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ইউভিকে মিস করছে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একবারও দেখা হলো না।একবারও বিদায় জানালো না।
একবারও এসে বলল না সাবধানে যাস, আদর।”
এই কথাটাই বারবার কানে বাজছে।ইনায়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
মনে পড়ছে মাগুরার সেই রাতের
বাইক রাইড এর মূহুর্তো গুলো
সবকিছু যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো মাথার মধ্যে ঘুরছে।পিয়াসা এবার ইনায়ার হাতটা চেপে ধরে বলল—ভিডিও কল দিবে।”
শেহেজাদার আদর পর্ব ৪০
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে বলল—যদি না দেয়?”
যে মানুষ তোর জন্য পুরো পৃথিবী উল্টাইয়া দিতে পারে, সে কল দিবে না?
ইনায়া কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা বলে দিচ্ছে সে ইউভিকে ভীষণ মিস করছে।
