Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর

সকালের নরম রোদ জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে।
লন্ডনের আকাশ আজ একদম পরিষ্কার। দূরে সারি সারি বিল্ডিংয়ের গায়ে সোনালি আলো ঝলমল করছে। রাস্তার মানুষের ব্যস্ত চলাফেরা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।এদিকে ইনায়া আর পিয়াসাও ভার্সিটির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
নিচতলায় আগের মতোই গার্ডরা তাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করে রেখেছে। ডাইনিং টেবিলে গরম কফি, টোস্ট, অমলেট, ফল আর জুস সুন্দর করে সাজানো।পিয়াসা চেয়ারে বসতে বসতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
— “কিরে? তোরে এমন ক্লান্ত লাগতেছে কেন?”
ইনায়া চুপচাপ কফির মগটা হাতে নিল।
পিয়াসা আবার বলল রাতে ঘুমোসনি নাকি? এমন বিড়ালের বাচ্চার মতো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটতেছিস কেন? কী হইছে?”
ইনায়া আমতা আমতা করে বলল—

— “তোর ভাইয়া ঘুমাইতে দিলে তো ঘুমোবো”
পিয়াসা মুখের জুস প্রায় ফেলে দিয়েছিল।
“কীইইহ!”
— “হুম। তোর ভাইয়া লন্ডনে আসছে”
— “কি বলিস!”
— “কাল রাতে হঠাৎ আইসা হাজির। মনে হইলো আকাশ থেইকা উড়ে নামছে।”
পিয়াসা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল।
তারপর?”
— “তারপর আবার সকালে ঘুম ভাঙার আগেই কোথায় যেন চলে গেছে।।কথাটা বলেই ইনায়ার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল।ঘুম ভাঙার পর আর দেখি নাই। পিয়াসা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল—বেবি, আমার ভাইয়া যদি সত্যি আইসা থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।”
ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— “জানি না।ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।একজন গার্ড এগিয়ে এসে বলল—
— “ম্যাম, গাড়ি প্রস্তুত।”
দুজন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
সকালের ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগতেই ইনায়ার একটু ভালো লাগল।গাড়ি ধীরে ধীরে লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ভার্সিটির দিকে এগিয়ে চলল।
কিন্তু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ইনায়ার মাথায় বারবার একটাই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল সকালে ঘুম ভাঙার আগেই ইউভি কোথায় চলে গেল?আর কেনই বা তাকে কিছু না বলেই চলে গেল?
অন্যদিকে, শহরের আরেক প্রান্তে…
একটি কালো গাড়ির ভেতরে বসে ইউভি নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তার সামনে আজকের দিনের জন্য একটা বিশেষ পরিকল্পনা অপেক্ষা করছে।
আর সেই পরিকল্পনার কথা এখনও কেউ জানে না…

বিশাল কাঁচঘেরা হলরুম। সামনে ডিজিটাল স্ক্রিন। গোল টেবিলে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীরা বসে আছে পিয়াসা নিজের ল্যাপটপে আগের দিনের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কাজ করছে।
আর ইনায়া?
তার অবস্থা বেশ করুণ।
রাতের ঘুমটা ঠিকমতো না হওয়ায় বারবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।পিয়াসা একবার তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—কিরে? তোরে তো দেখে মনে হচ্ছে এখনই ঘুমিয়ে পড়বি।”
ইনায়া বিরক্ত মুখে বলল—
— “চুপ থাক।”
ঠিক তখনই হলরুমের দরজা খুলে গেল।সাথে সাথে সবার দৃষ্টি দরজার দিকে চলে গেল।একজন যুবক ভেতরে প্রবেশ করল।কালো স্যুট।হাতে ট্যাবলেট।
আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ তার ।প্রায় ছয় ফুট চার ইঞ্চি লম্বা।ব্যক্তিত্ব এমন যে মুহূর্তেই পুরো রুমটা যেন তার উপস্থিতি টের পেল।বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
অনেকে ফিসফিস করে কথা বলছে।
কেউ আবার চোখ সরাতেই পারছে না।পিয়াসা একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিল।
অন্যদিকে ইনায়াও খুব একটা খেয়াল করল না।
নতুন কোনো ট্রেইনার এসেছে ভেবেই মাথা নিচু করে বসে রইল।ঠিক তখনই প্রোগ্রামের প্রধান মেন্টর উঠে দাঁড়ালেন।

— “Ladies and Gentlemen, please welcome our new senior business consultan
যুবকটি মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল—
— “Good Morning, Everyone.”
সবাই একসাথে উত্তর দিল—
— “Good Morning.”
যুবকটি মৃদু হেসে বলল—
— “My name is Shehzad Uvi Chowdhury.”
নামটা শুনেই পিয়াসা চমকে উঠল।
কিন্তু আসল ঝড়টা বয়ে গেল ইনায়ার ভেতরে।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে সামনে তাকাল।
আর তাকিয়েই যেন জমে গেল।
ইউভি।সত্যি সত্যিই ইউভি।
তার বুকের ভেতরটা৷ কেমন ধক করে উঠল।
ইউভি তখন সম্পূর্ণ পেশাদার ভঙ্গিতে নিজের পরিচয় দিচ্ছে।
— “For the next four months, I’ll be conducting advanced sessions on business strategy, leadership, investment planning and real-world business case studies.”
“( আগামী চার মাস ধরে আমি ব্যবসায়িক কৌশল, নেতৃত্ব, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং বাস্তব জীবনের ব্যবসায়িক কেস স্টাডি নিয়ে উন্নতমানের সেশন পরিচালনা করব।”)
পুরো হলরুমের সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে ইউভির কথা
আর ইনায়া অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই ইউভির চোখ এসে থামল ইনায়ার উপর। সবার অগোচরে ইউভির ঠোঁটের কোণে পরিচিত সেই দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
আর পরের মুহূর্তেই সে খুব সূক্ষ্মভাবে ইনায়ার দিকে চোখ টিপে দিল।ইনায়া এতটাই অবাক হয়ে গেল যে তার হাতে থাকা কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল।
পাশ থেকে পিয়াসা ফিসফিস করে বলল—

বেবি… এখন বুঝছিস ভাইয়া কেন লন্ডন এসেছে।
ইনায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।
কারণ তার মাথায় তখন শুধু একটাই কথা ঘুরছে—তাহলে আগামী চার মাস… ইউভি ভাইয়া এখানেই থাকবে?”হলরুমের পরিবেশটা যেন মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল।
ইউভি ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার কণ্ঠে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস, যা অজান্তেই সবাইকে মনোযোগী করে তুলছে।
ইউভি কোনো বই খুলে মুখস্থ কথা বলছে না।
বরং বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছে।
স্ক্রিনে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানির কেস স্টাডি দেখিয়ে ইউভি বলল—
Suppose you are the CEO of a company.”
(ধরুন, আপনারা একটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।)
A new competitor has entered the market.”
(বাজারে নতুন একজন প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছে।)
What decision would you make?”
(আপনারা কী সিদ্ধান্ত নিতেন?)
কথাটা বলেই সে পুরো হলরুমের সবার দিকে তাকালো।সাথে সাথে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী নিজেদের মতামত দিতে শুরু করল।
কেউ বলল মার্কেটিং বাড়াবে।
কেউ বলল নতুন প্রোডাক্ট আনবে।
কেউ আবার বলল বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে।ইউভি সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল।
তারপর হাসিমুখে বলল—
There is no such thing as a wrong answer.” (ভুল উত্তর বলে কিছু নেই।)
The most important thing in business is the courage to make decisions.” (ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস।)

পুরো হলরুমের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে শুনছে।
ইউভি খুব সহজ ভাষায় জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করছে।মাঝে মাঝে বাস্তব জীবনের মজার উদাহরণ দিচ্ছে।আবার কখনো অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করছে।ফলে কারও একটুও বিরক্ত লাগছে না।
পিয়াসা অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “বেবি, আমি তো জানতাম ভাইয়া ব্যবসা বোঝে। কিন্তু এত ভালো ট্রেইন করতে পারে জানতাম না।”
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না।
সে মুগ্ধ চোখে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে।আজকের ইউভিকে যেন অন্যরকম লাগছে।
একজন বিদেশি মেয়ে অন্য একটি মেয়ে কে বলছে
— “Now I understand why he’s an international consultant.” (এখন বুঝতে পারছি কেন উনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কনসালট্যান্ট।)
বিপরীত পাশের মেয়ে টি বললো
He explains complex ideas so easily.
(উনি জটিল বিষয়গুলোও কত সহজভাবে বুঝিয়ে দেন।)
ইউভি তখন স্ক্রিনে নতুন স্লাইড দেখিয়ে বলছে—
Business isn’t only about profit.
(ব্যবসা শুধু লাভের হিসাব নয়।)
It’s about solving problems better than everyone else.
(বরং অন্যদের চেয়ে ভালোভাবে সমস্যার সমাধান করার নামই ব্যবসা।)
কথাটা বলেই সে পুরো হলরুমের দিকে তাকাল।
তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে সবাই কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে রইল।ইনায়ার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেপে উঠল।

ইনায়া হঠাৎ অনুভব করল—
এই মানুষটাকে সে যতটা চিনেছে ভেবেছিল, আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
সেশন শেষ হওয়ার ঠিক আগে ইউভি আবার মাইক্রোফোন হাতে নিল।
হলরুমে তখনও সবাই মনোযোগ দিয়ে বসে আছে।
ইউভি মৃদু হেসে বলল—
Before you leave, I have a small assignment for all of you.
(তোমাদের যাওয়ার আগে সবার জন্য একটি ছোট অ্যাসাইনমেন্ট আছে।)
সাথে সাথে অনেকেই ল্যাপটপ খুলে নোট নিতে শুরু করল।ডিজিটাল স্ক্রিনে নতুন একটি স্লাইড ভেসে উঠল।
ইউভি বলল—
I want each of you to think like a business owner.”
(আমি চাই তোমরা প্রত্যেকে একজন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকের মতো চিন্তা করো।)
Choose any successful company from your country.” (নিজের দেশের যেকোনো একটি সফল কোম্পানি নির্বাচন করবে।)
Then analyse its strengths, weaknesses, opportunities and threats.” (
তারপর কোম্পানিটির শক্তি, দুর্বলতা, সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ করবে।)
হলরুমের সবাই দ্রুত নোট নিতে লাগল।
ইউভি আবার বলল—

— “Don’t copy information from the internet.” (ইন্টারনেট থেকে শুধু তথ্য কপি করবে না।)
— “I want to know your own thoughts.” (আমি তোমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা জানতে চাই।)
— “Because in business, your ability to think is more valuable than your ability to memorize.” (কারণ ব্যবসার জগতে মুখস্থ করার ক্ষমতার চেয়ে চিন্তা করার ক্ষমতার মূল্য অনেক বেশি।)
কথাটা শুনে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
এরপর ইউভি আরও বলল—
The presentation should be five minutes long.
(প্রেজেন্টেশন পাঁচ মিনিটের হবে।)
And every team member must participate.
(এবং দলের প্রত্যেক সদস্যকে অংশগ্রহণ করতে হবে।)
পিয়াসা নিচু গলায় বলল—
বেবি, প্রথম দিনেই কাজ ধরাইয়া দিল!”
ইনায়া হাসি চেপে বলল—
তোর ভাইয়া তো ছাড়ার মানুষ না।”
ঠিক তখনই ইউভির চোখ ইনায়া আর পিয়াসার দিকে পড়ল।
সে ভ্রু উঁচু করে বলল—

— “Any problem?” (কোনো সমস্যা?)
পিয়াসা সাথে সাথে সোজা হয়ে বসে গেল।
No, Sir.” (না, স্যার)
ইউভিও মৃদু হেসে বলল—
— “Good.” (ভালো।)
I expect excellent work from everyone.(আমি সবার কাছ থেকে চমৎকার কাজ আশা করছি।)
— “See you tomorrow.” (আগামীকাল দেখা হবে।)
কথাটা বলেই সে ফাইল হাতে নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে গেল।
আর ইনায়া তাকিয়ে রইল ইউভির চলে যাওয়ার দিকে।
ইউভি এরপর ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে চলে গেল। ইনায়া আর পিয়াসা অবাক হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল। পিয়াসা বলল,
“কি হলো বেবি ভাইয়া আমাদের সাথে কথা বললো না, তাকালোও না একবার।
ঠিক তখনই ইনায়ার কাছে রিমঝিমের কল আসল।
ইনায়া কল রিসিভ করতেই বলল,
“হ্যাঁ বলো ফুপিমণি। রিমঝিম বলল,
নুর,আমার এক সিনিয়র স্যার আছেন, তাঁর ছেলে লন্ডনে তোদের সাথে একই কোর্সে ভর্তি হয়েছে। তোদের সাথে পরিচিত হতে চায়। আমি তোদের কথা বলেছি। ছেলেটির নাম তন্ময়
ইনায়া বলল,
তাহলে তো ভালোই হলো ফুপিমণি। নিজেদের একজনকে তো পাওয়া গেল। যাই হোক, আমরা পরিচিত হয়ে নেব।আর কিছু কথা বলে সে ফোন রেখে দিল।এরপর পিয়াসা জিজ্ঞেস করল,

“কে রে? এই তন্ময় ব্রো?”
ইনায়া বলল। জানিনা
“যাক, একটা তো বাংলাদেশি মাল পাওয়া গেল।”
পিয়াসা চোখ বড় করে তাকাল।
ইনায়া বলল চল দেখি কি মাল।”এরপর শার্ট ঠিক করতে করতে তারা সামনে এগোতে লাগল।
কিছু সময় পর একজন সুদর্শন ছেলে সেখানে বসে ছিল। সম্ভবত ইনায়া আর পিয়াসার থেকে দুই-তিন বছর বড় হবে।ছেলেটি ইনায়াদের কাছে এগিয়ে এসে বলল,
“তোমরা বাংলাদেশি, রাইট?”
ইনায়া বলল, দেখে যখন বাংলাদেশি মনে হচ্ছে তাহলে বাংলাদেশি তো হব উগান্ডা তো আর হবো না।
পিয়াসা হেসে বললো আপনি তন্ময়?
তন্ময় হেসে বলল আমি তাহলে ঠিক জায়গাতেই এসেছি।।পিয়াসা আর ইনায়া দুজনেই হেসে দিল, তারপর পরিচিত হলো।পিয়াসা ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
মালটা তো ভালোই।।ইনায়া গম্ভীর মুখে বলল,

“তোর দুই ভাই-বোন একই।
এইদিকে তন্ময় ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে মনে বলল মাশাআল্লাহ, লাল চুলের রমণী… প্রথম দেখাতেই মনটা চুরি হয়ে গেল।
“ইশশ, কী সুন্দর ডল।
ইনায়া বিষয়টা খেয়াল করে মনে মনে বলল,
সালার নজরও তো দেখছি… আমার বালের সেহজাদার মতো। সবাই লুচ্চা, যাক গে আমার কি।এরপর ইনায়া হাসিমুখে বলল তাহলে তন্ময় ভাইয়া, আমরা আজ আসি। কাল ইন শা আল্লাহ আমাদের দেখা হবে।।এরপর দুজনেই তন্ময় এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে।পিয়াসা আস্তে আস্তে বলল,ছেলেটা তোকে ভালোই নোটিশ করছে বেবি।”
ইনায়া হাসি দিয়ে বলল,ওই সব দেখার
“সময় নাই। বালের চিন্তায়ই শেষ হয়ে যাচ্ছি।

তুবা কোচিং শেষ করে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। হঠাৎ একটা বাইক এসে থামল। তুবার সামনে।হেলমেট খুলে রাজ্যো হেসে বললো
“আমার পিচ্চি।”
তুবা সাথে সাথে উঠে বলল,
“আপনি আজও এসেছেন? আর আপনার পিচ্চি কে?”
রাজ্যো বলল,
“আমি কাকে পিচ্চি বলি?
তুবা বলল,
“আমাকে।”
রাজ্যো আবার বলল,
“তাহলে আমার পিচ্চি কে?”
তুবা কিছু না ভেবেই বলল,
“আমি।”
এই তো।গুড গার্ল, আমার পিচ্চি।
তুবা বা সাথে সাথে রেগে গিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, আমি পিচ্চি, কিন্তু আপনার না।”
রাজ্যো বলল,
“কেন? আর কে তোমাকে পিচ্চি বলে?”
তুবা বলল,
“কেউ না, শুধু আপনি।”
“তাহলে সমস্যা কী? তুমি শুধু আমার পিচ্চি।
তুবা আর রাজ্যো সাথে কথাই না পেরে বলল,
কেন এসেছেন এখানে?
রাজ্যো চশমা খুলে বলল,

“সুখের খোঁজে।”
তুবা বলল,
“কিসের সুখ?”
রাজ্যো হেসে বলল,
“চোখের সুখ।”
এই যে তোমাকে দেখছি, এই চোখ দুটোতে যে কত শান্তি পাচ্ছি, তুমি বুঝবে না পিচ্চি।
রাজ্য আবার বললো মেসেজের রিপ্লাই দাও না কেন?
তুবা বলল,আপনি এক নম্বর অসভ্য লোক, আপনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। রাজ্যো একটু ঝুঁকে বলল,
তাহলে কি ইচ্ছা করে বলো সব করবো ?
তুবা রেগে বলল,আপনি যান, আমি বাড়ি যাব।
রাজ্যো বলল,
“চলো পাখি হয়ে উড়ি আকাশে ।”
তুবা বলল,

“মানে?”
রাজ্যো বলল,
“বাইকেই উঠো, নামিয়ে দিয়ে আসবো।
তুবা কিছু তেই রাজি হচ্ছে না।
ব্যাস এরপর রাজ্যো তুবাকে এক ঝটকায় নিজের কাছে নিয়ে আসলো এরপর খুব সাবধানে বাইকে বসিয়ে দিল।রাজ্যো বাইক স্টার্ট দিল।
রাজ্যো শান্ত গলায় বললো
“শান্তি…”
রাজ্যো তুবাকে বলল,
আমার পিচ্চি রাতে কল দিবো একটু কথা বলো।
তুবা মনে মনে বললো বলবো ডক্টর সাহেব।
কিন্তু মুখে বলল পারবো না।।তখনই রাজ্যো বললো
ঠিক আছে, আমার কাছে যা আছে, সেটা তোমার ফ্যামিলিকে দেখিয়ে দেব।
তুবা সাথে সাথে বলল না থাক আমি কথা বলবো।
মনে মনে বলল,সালা হিটলার একটা।

লন্ডনের বিকেলের আবহাওয়া উপভোগ করছে ইনায়া আর পিয়াসা বারান্দায় বসে।। হঠাৎ ইনায়ার ফোনে একটা মেসেজ আসে।আমার আর ইউভির সম্পর্কটা কতটা গভীর, সেটা দেখতে হলে এই ঠিকানায় চলে আসিস। আর বড় বোন আর দুলাভাইয়ের রুমে ঢোকার আগে একটু নক করে আসিস প্লিজ।”
আর এই দিকে তিয়া ইউভিকে কল দিয়ে বলল—
ইউভি, বাবা অনেক অসুস্থ। তুমি দ্রুত আসো।”
কথাটা শুনে ইউভি এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের সব কাজ ফেলে দ্রুত ছুটে গেল তার ছোট চাচ্চুর কাছে।

লন্ডনের অভিজাত এলাকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক ম্যানশন।
চারপাশে সুউচ্চ গাছপালা, নিখুঁতভাবে ছাঁটা বাগান, ফোয়ারার পানির মৃদু শব্দ আর ঝকঝকে আলোয় পুরো জায়গাটা যেন রাজপ্রাসাদের মতো লাগছে।
বড় লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশাল ড্রাইভওয়ে। ম্যানশনের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি।ভেতরে পরিবেশটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
এই মুহূর্তে ম্যানশনের একটি বেডরুমে একজন ডাক্তার রাইহান চৌধুরীর চিকিৎসা করছেন।
ইউভি দ্রুত ভেতরে ঢুকতেই দেখল তিয়া ড্রয়িংরুমে বসে আছে।ইউভি এসে বলল—

— “চাচ্চু কই?”
ঠিক তখনই তিয়ার চোখ গিয়ে পড়ল সামনের দিকে।সে দেখল ইনায়া এই দিকেই আসছে, সঙ্গে দুজন বডিগার্ড।
পরের মুহূর্তেই তিয়া উঠে গিয়ে ইউভিকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল।ইউভি… বাবার কিছু হলে আমি বাঁচব না। ওই মহিলা আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বাবাই একমাত্র আমার সবকিছু।”
ইউভি নিজের দুই হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে রইল।
মনে মনে বললো কুল ইউভি… কুল।”
এরপর শান্ত গলায় বলল সোফায় বসে কথা বল, তিয়া।।তিয়া চোখের পানি মুছার ভান করতে করতে ইচ্ছা করে নিজের চুল ইউভির শার্টের বোতামে আটকে দিল।যখন ইউভি দূরে সরে যেতে গেল, তিয়া বলল—আমার চুল… আমি ঠিক করছি।
এই বলে ধীরে ধীরে চুল ছাড়াতে লাগল।
আর ঠিক তখনই পেছন থেকে সবকিছু দেখে ফেলল ইনায়া।নিজের শেহজাদার পাশে তিয়াকে এতটা ঘনিষ্ঠভাবে দেখে মেয়েটার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল।সঙ্গে সঙ্গে দুইজন বডিগার্ডও পেছনে ছুটল।

— “ম্যাম! কোথায় যাচ্ছেন?”
এদিকে ইউভি রাগে ফুঁসছে।
সে তিয়ার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল—
তোর বাবা মারা গেলেও কোনোদিন আমাকে জড়িয়ে ধরবি না। এই বুকে শুধু ইনায়া নূর চৌধুরী রাজত্ব করে, বুঝলি?”
— “কোনো পরিস্থিতিতেই আমি কাউকে অ্যালাও করব না
। কথাগুলো বলেই সে সোজা রাইহান চৌধুরীর রুমের দিকে চলে গেল।ভেতরে ঢুকেই দেখলো রাইহান চৌধুরী দিব্যি ডাক্তারের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন।ইউভি রুমে ঢুকতেই দুজনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।কারণ রাইহান চৌধুরী এত দ্রুত ইউভির আসা আশা করেননি।
ইউভি হাততালি দিতে দিতে বলল

— “কে অসুস্থ, চাচ্চু? তোমার মেয়ে যে বলল তুমি নাকি অনেক অসুস্থ!।এই তার নমুনা?”
ঠিক তখনই তিয়াও রুমে ঢুকল।ইউভি এবার রাগে চিৎকার করে উঠল।আগের দিনও আমি আর রেদোয়ান এইটা সন্দেহ করেছিলাম।।তোমার কিছুই হয় নাই। কিন্তু নাটক করার কারণটা আমরা দুই ভাই খুঁজে পাইনি।”
কিন্তু এখন পাচ্ছি।।আমাকে এই বাড়িতে আনার জন্যই এই সব, তাই না?রাইহান চৌধুরী কিছু বলতে যাচ্ছিলেন বাবা…”
বাস চাচ্চু! বাস!তোমার মুখ থেকে আর একটা কথাও শুনতে চাই না।।ইউভির চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে।সে আঙুল তুলে বলল।তোমার মেয়েকে সামলাও। না হলে ও বড় হয়ে কিন্তু ছোট বোনের কাছে পদে পদে অপমানিত হবে।
আর দর্শক হিসেবে আমি হাততালি দিব।
ওর চিন্তাভাবনা চেঞ্জ করতে বলো।হঠাৎ তিয়া রাগে চিৎকার করে উঠল।শোনো ইউভি! ভালোবাসি আমি তোমাকে সেই ছোটবেলা থেকে।।ইনায়া তোমাকে ভালোবাসে মাত্র তিন মাস হবে।।আর আমি সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবাসি।”

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪২

ইউভি ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল।তুই ভুল করেছিস।তুই জানিস, এই শেহজাদ ইউভি চৌধুরী সেই ছোটবেলা থেকে শুধু একজনকেই ভালোবাসে।”ইনায়া নূর চৌধুরীকে।”
জানার পরেও তুই ভুল করেছিস।
এরপর রাইহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল—
— “আর চাচ্চু, প্লিজ মেয়েকে একটু ভালো মানুষ করো। আই রিপিট ভালো মানুষ করো।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here