শেহেজাদার আদর পর্ব ৯
সুমাইয়া ইসলাম নূর
কয়েকটা দিন কেটে গেছে…
সেই রাতটার পর থেকে সবকিছু যেন একটু বদলে গেছে।
বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক—
কিন্তু ভেতরে ভেতরে…
অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই।
ইউভি এখন আর আগের মতো বাড়িতে থাকে না।
সারাদিন তো নয়ই—
রাতেও যেন তার উপস্থিতি শুধু নামমাত্র।
গভীর রাতে বাড়ি ফেরে…
যখন পুরো চৌধুরী ভিলা ঘুমিয়ে থাকে।
আর ভোর হওয়ার আগেই—
চুপচাপ আবার বেরিয়ে যায়।
কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করে না।
কিন্তু তবুও—
তার অনুপস্থিতিটা সবাই অনুভব করে।
ইনায়ার
ইউভির সাথে তার দেখা হয় না বললেই চলে।
যেন দুজন মানুষ—
একই বাড়িতে থেকেও আলাদা দুই জগতে বাস করছে।
এইদিকে—
বসন্ত এসে গেছে পুরোপুরি। 🌸
চারদিকে উৎসবের আমেজ…
কলেজে শুরু হয়েছে বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতি।
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা—
এই তিন বান্ধবী এখন ভীষণ ব্যস্ত।
নাচের প্র্যাকটিস, ড্রেস প্ল্যান, গান সিলেকশন—
সবকিছু নিয়ে তাদের দিন কাটছে দৌড়ের ওপর।
প্রতিদিন ক্লাস শেষে তারা সোজা চলে যায়
নাচের ক্লাসে।
হাসি, ঝগড়া—
সব মিলিয়ে জমে উঠছে তাদের দিনগুলো।
পিয়াসা মজা করে বলে—
“এইবার বসন্ত উৎসবে না নাচলে, আমার নামই পিয়াসা না!”
তুবা হেসে উঠে—
“আগে স্টেপ ঠিক কর, তারপর নাম রাখিস!”
চৌধুরী ভিলায় আরেকটা বড় আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
রিমঝিমের বিয়ে।
আর মাত্র ১৫ দিন বাকি।
বাড়ির প্রতিটা কোণায় এখন সাজসজ্জার পরিকল্পনা,
কেনাকাটা, অতিথি তালিকা—
সবকিছু নিয়ে হইচই পড়ে গেছে।
রেশমা চৌধুরী আর নুসরাত চৌধুরী প্রায় সারাদিন ব্যস্ত—
কখনো গয়না, কখনো শাড়ি, কখনো গেস্ট লিস্ট নিয়ে।
আয়াত আর আতিকা তো একেবারে খুশিতে আত্মহারা—
“ফুপি বিয়ে করবে! আমরা নাচবো!”
বসন্তের রঙে রঙিন চারপাশ…
কিন্তু কিছু গল্প এখনো রঙ পায়নি।
চৌধুরী ভিলার ভেতরে ইউভির জন্য আলাদা করে তৈরি করা হচ্ছে এক নতুন জগৎ…
একদম তার মতো—গম্ভীর, নিখুঁত আর রাজকীয়।
উপরে তার রুমের পাশেই তৈরি হচ্ছে একটা বিশাল ড্রেসিং স্যুট রুম।
এটা কোনো সাধারণ ওয়ারড্রোব না—
বরং পুরো একটা আলাদা ঘর,
যেখানে ঢুকলেই বোঝা যায়—
এই ঘরের মালিক সাধারণ কেউ না।
চারপাশে দেয়ালজুড়ে কাঠ আর গ্লাসের কম্বিনেশন করা আলমারি…
প্রতিটা সেকশন আলাদা করে সাজানো—
একদিকে শুধু ফরমাল স্যুট—
কালো, গ্রে, নেভি ব্লু… একেকটা নিখুঁতভাবে হ্যাঙ্গারে ঝোলানো।
অন্যদিকে ক্যাজুয়াল শার্ট, টি-শার্ট, জ্যাকেট—
সব রঙ অনুযায়ী সাজানো।
একটা পুরো অংশ শুধু জুতার জন্য—
শেলফের পর শেলফ ভরা দামি লেদারের জুতা, স্নিকার্স…
আরেক পাশে—
ঘড়ি, কাফলিংক, টাই, পারফিউম—
সব কিছু আলাদা আলাদা গ্লাস কেসে রাখা।
রুমের মাঝখানে বড় একটা আইল্যান্ড টেবিল—
যেখানে সে দাঁড়িয়ে নিজের লুক সেট করে…
আর সামনে পুরো দেয়ালজুড়ে বড় আয়না—
যেন নিজেকে প্রতিটা দিক থেকে দেখা যায়।
এই রুমটা শুধু কাপড় রাখার জায়গা না…
এটা ইউভির ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন—
পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, আর ক্ষমতাবান।
আর নিচে—
বাড়ির বিশাল বাগানের একপাশে তৈরি হচ্ছে ইউভির জন্য আলাদা প্রাইভেট জিম জোন।
খোলা আকাশের নিচে…
চারপাশে সবুজ গাছপালা…
কিন্তু ভেতরে
একদম আধুনিক সব জিম ইকুইপমেন্ট।
হেভি মেশিন, ডাম্বেল র্যাক, ট্রেডমিল—
সবকিছু একদম প্রফেশনাল সেটআপে সাজানো।
একপাশে গ্লাস পার্টিশন দিয়ে আলাদা স্পেস—
যেখানে সে একা ট্রেনিং করতে পারে,
কেউ তাকে ডিস্টার্ব করতে পারবে না।
এই জায়গাটায় দাঁড়ালেই বোঝা যায়—
ইউভি শুধু বড়লোক না…
নিজেকে তৈরি করতেও জানে।
চৌধুরী পরিবারের ব্যবসা,
নিজের তৈরি IVA কোম্পানি—
সব মিলিয়ে ইউভি এখন কোটি টাকার মালিক।
কিন্তু তার এই বিলাসিতার পেছনে—
লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর পরিশ্রম…
একাকিত্ব…
আর নিজেকে প্রমাণ করার একগুঁয়েমি।
সবকিছুই আছে তার—
টাকা, পাওয়ার, স্ট্যাটাস…
তবুও—
কোথাও একটা জায়গা এখনো ফাঁকা।
যেখানে শুধু একজনের জায়গা…
তার “আদর”।
অফিসের কনফারেন্স রুম।
বড় টেবিল ঘিরে বসে আছেন—
লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী…
আর সামনে ইউভি আর রেদোয়ান।
টেবিলের ওপর ফাইল, ল্যাপটপ, প্রেজেন্টেশন—
সবকিছুই চলছে ঠিকঠাক…
কিন্তু পরিবেশটা ভারী।
হঠাৎ—
রাতিব চৌধুরী ফাইলটা বন্ধ করে ইউভির দিকে তাকালেন।
চোখে স্পষ্ট বিরক্তি।
“ইউভি… এখন অন্তত আমাদের পিছু ছাড়ো।
”
ঘরের ভেতর হালকা নীরবতা নেমে এলো।
রেদোয়ান চোখ তুলে তাকাল—
বুঝতে পারছে, কথাটা এখানেই থামবে না।
ইউভি ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি—
“আমি পিছু কোথায় পড়লাম, বাবা?”
চোখ সরাসরি বাবার দিকে—
“তোমার বাবাই তো আমাকে তোমাদের পিছু লাগিয়ে দিয়েছে।”
লিখন চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে তাকালেন—
“বাবা বাবা… কেন এমন করতে বলবে?”
ইউভির চোখে এবার অন্যরকম আগুন।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল—
“তুমি মা-কে বাড়ির অমতে বিয়ে করেছো…”
কথাটা ধীরে বললেও—
প্রতিটা শব্দ ভারী।
“আর সেই তুমি—
আমার ভালোবাসা মেনে নিতে পারছো না?”
ঘরের বাতাস যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
ইউভি আবার বলল—
“তাই দাদু আমাকে শিখিয়েছে—
নিজের জিনিস নিজে কিভাবে নিয়ে নিতে হয়।”
“না হলে… আমার সাদা মনে এত কাদা আসত না, বাবা…”
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
সবাই চুপ।
ইউভি ধীরে উঠে দাঁড়াল।
চেয়ারটা হালকা শব্দ করে পিছিয়ে গেল।
“যাই হোক…”
গলাটা এবার ঠান্ডা—
একদম সিদ্ধান্ত নিয়ে বলা।
“আমি তোমার ব্যবসার মধ্যে আর আসব না।”
একটু এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর হাত রাখল—
“কিন্তু—”
“তুমি-ও কথা দাও…”
“তুমি আমার আর ‘আদর’-এর মাঝে আর আসবে না।”
ঘরটা নিস্তব্ধ।
কেউ নড়ছে না…
কেউ কথা বলছে না…ইউভির কথাটা যেন পুরো কনফারেন্স রুমে প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে ফিরে বাজতে লাগল—
“তুমি আমার আর ‘আদর’-এর মাঝে আর আসবে না।”
কিছু সেকেন্ড—
পুরো রুম নিস্তব্ধ।
কারো শ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ—
রাতিব চৌধুরী ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
তার চোখে রাগ…
কিন্তু সেই রাগের নিচে লুকানো একটা কষ্টও স্পষ্ট।
“তুমি বুঝে কথা বলছো, ইউভি?”
ইউভি একটুও নড়ল না।
“খুব ভালো করেই বুঝে বলছি, বাবা।”
রাতিব চৌধুরীর কণ্ঠ এবার শক্ত—
“যে মেয়েটার কথা বলছো—
সে এই বাড়ির মেয়ে।”
“তার একটা সম্মান আছে… একটা সিদ্ধান্ত আছে…”
“তুমি কি ভাবছো, জোর করে সবকিছু নিজের মতো করে নেবে?”
ইউভির চোখে আবার সেই আগুন জ্বলে উঠল—
“জোর করে না…”
ধীরে ধীরে বলল সে—
“ভালোবাসা দিয়ে নেবো।”
রাতিব চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন—
“ভালোবাসা?”
ওইদিন যা করলে—ওটা কি ভালোবাসা?”
এই কথায়—
প্রথমবারের মতো ইউভি একটু থেমে গেল।
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
রেদোয়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
“চাচ্চু… প্লিজ—”
দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়াল সে।
“আপনারা দুজনেই যা বলছেন…
দুজনেই ঠিক—কিন্তু এভাবে না…”
লিখন চৌধুরী গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন—
সব শুনছেন, কিছু বলছেন না।
রবিউল চৌধুরী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন—
“পরিবারের কথা অফিসে এনে এমন পরিস্থিতি করার কোনো মানে হয় না…”
রাতিব চৌধুরী আবার বললেন—
“আমি শুধু একটাই চাই—
আমার মেয়ের উপর কোনো চাপ না পড়ুক।”
ইউভি শান্ত গলায় বলল—
“আমি কাউকে জোর করবো না…”
“কিন্তু কেউ যদি আমার কাছ থেকে তাকে দূরে রাখতে চায়—
সেটাও আমি সহ্য করবো না।”
রুমের ভেতরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।
রেদোয়ান এবার আস্তে বলল—
“ভাই… একটু সময় দাও
”
ইউভি একবার শুধু তার দিকে তাকাল।
তারপর—
ধীরে ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
দরজার সামনে গিয়ে থামল।
পেছনে না তাকিয়েই বলল—
“আমি আমার জায়গা জানি…”
“এবার সবাইকে বুঝিয়ে দেবো—
আমার জায়গা কোথায়।”
দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল সে।
রুমে রয়ে গেল—
চাপা রাগ…
অজস্র না বলা কথা…
আর একটা যুদ্ধের শুরু।
অফিসের নিচে এসে থামল ইউভি।
একটু বিরক্ত, একটু অস্থির…
গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসল।
স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই—
মনে পড়ে গেল একটা মুখ।
ইনায়া।
হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল সে…
তারপর ফোন বের করে ডায়াল করল—রেদোয়ান।
“কোথায়?”
রেদোয়ান বলল—
“অফিসেই… কেন?”
ইউভি নিচু গলায় বলল—
“নিচে আয়…
তোর বোনকে দেখতে ইচ্ছে করছে… অনেক।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ…
রেদোয়ান মনে মনে বললো
“এই ছেলে সত্যি পাগল হয়ে গেছে!”
নিজেই হালকা হেসে ফেলল—
“ভাইয়ার অবস্থা তো সিরিয়াস…
“আচ্ছা ভাইয়া, আসছি…”
কল কেটে দিল সে।
কিছুক্ষণ পর—
একটা দামী গাড়ি এসে থামল কলেজের সামনে—
ব্ল্যাক Mercedes-Benz S-Class
গাড়িটা থামতেই আশেপাশের অনেকেই তাকাল।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা।
তিনজন মিলে গল্প করছে—
পিয়াসা বলছে—
“কালকে নবীনবরণ… শপিং না করলে কিন্তু আমি কিছু পরবো না!”
তুবা হেসে—
“হ্যাঁ রে! আজকেই গেলে ভালো হয়…”
ঠিক তখনই—
গাড়িটার দরজা খুলল।
প্রথমে নামল রেদোয়ান—
হালকা নীল শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট, চোখে চশমা—
একটা শান্ত, স্মার্ট পার্সোনালিটি।
তারপর—
ধীরে ধীরে নামল ইউভি।
ডিপ ব্ল্যাক শার্ট…
গ্রে ব্লেজার…
হাতে দামি ঘড়ি…
চুলগুলো নিখুঁতভাবে সেট করা—
তার হাঁটার স্টাইলটাই আলাদা।
যেন—
সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখে সে।
এক মুহূর্তের জন্য—
চারপাশ একটু থেমে গেল।
পিয়াসা আর তুবা—
একদম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তুবা আস্তে বলল—
“উফ… সিনেমার হিরো না নাকি?”
পিয়াসা ফিসফিস করে—
“আমার ভাইয়া…”
গলায় গর্ব স্পষ্ট।
ইনায়া—
সে প্রথমে খেয়ালই করেনি।
কিন্তু—
যেই চোখ গেল সামনে—
সে এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
চোখ বড় হয়ে গেল হালকা…
মুখে কোনো কথা নেই—
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
না… কোনো প্রেম না…
কিন্তু—
একটা অদ্ভুত থমকে যাওয়া।
মনে হলো—
“এরা কি সত্যিই আমাদের ভাইয়া?”
ইউভি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছে…
চোখ সোজা ইনায়ার দিকে।
আর ইনায়া—
না চাইলেও—
চোখ সরাতে পারছে না
ক্লাস কি এখন গেটের বাইরেই হয় নাকি?”
পিয়াসা সাথে সাথেই হাসল—
“না ভাইয়া…
কালকে প্রোগ্রাম আছে তো—নবীনবরণ।
তাই একটু শপিং করতে যাবো।”
তুবা যোগ করল—
“অনেক কিছু কিনতে হবে… তাই ভাবছিলাম এখনই যাই।”
ইউভি একবার ইনায়ার দিকে তাকাল—
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
“চল আমরা যাবো তোদের সাথে
পিয়াসা খুশিতে—
“সিরিয়াসলি ভাইয়া?
চল তাহলে!”
সবাই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
গাড়িতে বসার সময়—
সামনে ড্রাইভিং সিটে বসল ইউভি,
পাশে রেদোয়ান।
পেছনের সিটে—
এক পাশে ইনায়া,
আরেক পাশে পিয়াসা আর তুবা।
গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
ভেতরে নীরবতা…
হালকা গান বাজছে…
ইউভি ড্রাইভ করছে—
কিন্তু তার চোখ…
মাঝে মাঝে রিয়ার ভিউ মিররে উঠে যাচ্ছে।
সোজা—
ইনায়ার দিকে।
ইনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে—
চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে…
সে কিছুই টের পাচ্ছে না।
কিন্তু ইউভি—
চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
মনে মনে বলছে
“এভাবেই থাক…
দূরে থাকলেও চোখের সামনে থাক…”
তার চোখে শান্ত একটা মুগ্ধতা।
ওদিকে—
পিয়াসা বসে আছে একদম চুপচাপ।
তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে সামনে—
রেদোয়ানের দিকে।
সে কথা বলছে না…
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
“একটু ঘুরে তাকাও না…
একবার…”
কিন্তু—
গাড়ি এসে থামল যমুনা ফিউচার পার্কে। সেখানের একটি বুটিক শপে ঢুকল সবাই।
চারপাশে রঙিন শাড়ির সারি—
লাল, হলুদ, প্যাস্টেল, ফুলের প্রিন্ট…
একদম বসন্তের আবহ।
পিয়াসা উত্তেজিত হয়ে বলল—
“এইবার কিন্তু শাড়ি নিতেই হবে! নবীনবরণে আমি শাড়ি পরব!”
তুবা হেসে—
“হ্যাঁ, আজ সবাই শাড়ি নেবো!”
ইনায়া একটু ভ্রু কুঁচকে—
“আমি শাড়ি পরব? পারব নাকি…”
পিয়াসা সাথে সাথেই—
“পারবি না মানে? আমি পরিয়ে দিবো!”
ওরা তিনজন শাড়ি দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
একদিকে দাঁড়িয়ে ইউভি চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
তার চোখ
শুধু ইনায়ার ওপর।
একটা হালকা হলুদ শাড়ি তুলে নিল সে।
তারপর আবার রেখে দিল—
“না… এটা না…”
আরেকটা নিল—
লাল-সাদা মিশ্র…
তারপর সেটাও বাদ।
শেষে—
একটা নরম পীচ-কালার শাড়ি হাতে নিল।
হালকা ফুলের কাজ…
সাথে ম্যাচিং জুয়েলারি।
তার চোখে ভেসে উঠল একটা ছবি—
ইনায়া…
খোলা চুল…
এই শাড়িটা পরে…
ইউভি এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করল।
মনে মনে—
“আদর…
তুই যদি কাল এটা পরে সামনে দাঁড়াস—
আমি কীভাবে নিজেকে সামলাবো…?”
তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
সে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল—
চুপচাপ শাড়িটা বিল করল।
ওদিকে—
ইনায়া এখনো কিছু ঠিক করতে পারছে না।
ঠিক তখনই—
ইউভি এসে শাড়ির প্যাকেটটা তার হাতে দিল।
“এইটা নে।”
ইনায়া অবাক—
“এটা কী?”
“কালকে পরবি।”
“মানে?”
“বেশি কথা বলিস না…
যা দিয়েছি, সেটা পর।”
তার গলায় সেই চেনা অ্যাটিটিউড—
কিন্তু চোখে…
অন্য কিছু।
ইনায়া একটু চুপ করে থাকল…
তারপর ধীরে বলল—
“থ্যাংক ইউ…”
ইউভি কিছু বলল না।
শুধু মুখ ঘুরিয়ে নিল—
আর দূরে দাঁড়িয়ে—
পিয়াসা সব দেখছে…
মুখে মুচকি হাসি—
“গেম শুরু হয়ে গেছে…”
শপিং শেষে দুপুরের
খাওয়া শেষ করে সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
পিয়াসা আর তুবা সামনে সামনে হাঁটছে—
কথা বলতে বলতে হাসছে।
ইনায়া একটু পেছনে…
হাতে শপিং ব্যাগ, ধীরে হাঁটছে।
হঠাৎ—
ইউভি পাশে এসে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ…
লিফটের সামনে এসে দাঁড়াতেই—
ইউভি হালকা গলায় বলল—
“ব্যাগগুলো দে।”
ইনায়া তাকাল—
“আমি পারবো…”
ইউভি ভ্রু তুলল—
“আমি জিজ্ঞেস করিনি…
দিতে বলছি।”
কথাটা রুক্ষ শোনালেও—
সে নিজেই আলতো করে ইনায়ার হাত থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে নিল।
লিফট এসে গেল।
সবাই ঢুকে পড়ল ভেতরে।
ভিড় একটু বেশি…
ইনায়া পেছনে সরে গেল—
ঠিক তখনই—
ইউভি হাতটা সামনে বাড়িয়ে
ওকে হালকা করে নিজের পাশে টেনে নিল।
“সামনে দাঁড়া…”
তার গলায় সেই আগের মতোই অ্যাটিটিউড—
কিন্তু—
হাতটা এমনভাবে রাখা,
যাতে কারো ধাক্কা না লাগে ইনায়ার গায়ে।
পিয়াসা চুপচাপ তাকিয়ে আছে—
মুখে হালকা হাসি।
লিফট উঠতে লাগল…
এই নীরবতার মাঝেই—
ইউভি একটু ঝুঁকে, খুব নিচু গলায় বলল—
“সরি…”
ইনায়া একদম চমকে তাকাল—
“কি?”
ইউভি চোখ সরাল না সামনে থেকে—
“ওই দিনের জন্য…”
তার গলায় কোনো নাটক নেই…
কিন্তু চাপা একটা ভার।
ইনায়া কিছু বলল না…
ইউভি আবার বলল—
“আবার যেন এমন না হয়…
খেয়াল রাখিস।”
কথাটা শোনায় যেন বকাঝকা করছে
কিন্তু ভেতরে ভেতরে—
পুরোটাই কেয়ার।
লিফট থেমে গেল।
দরজা খুলল।
সবাই বেরিয়ে গেল—
ইনায়া কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল…
তারপর ধীরে ধীরে বের হলো।
মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি—
রাগ না…
অভিমান না…
শুধু—
“উনি এমন কেন…?”
আর পেছনে দাঁড়িয়ে—
ইউভি একবার তাকাল তার দিকে।
মনে মনে—
“এভাবেই থাক…
ধীরে ধীরে বুঝবি…”
তুবাকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা আবার রওনা দিল—
চৌধুরী ভিলার উদ্দেশ্যে।
পুরো রাস্তা জুড়ে এক ধরনের চুপচাপ ভাব…
কেউ তেমন কথা বলছে না—
কিন্তু প্রত্যেকের মাথায় নিজের নিজের ভাবনা।
কিছুক্ষণ পর—
গাড়ি এসে থামল চৌধুরী ভিলার সামনে।
সবাই একে একে নামল।
ইউভি গাড়ি থেকে নামতেই একবার তাকাল—
ইনায়ার দিকে।
সেই একই নিঃশব্দ দৃষ্টি…
গভীর, স্থির…
যেটা ইনায়া এখনো বুঝতেই পারে না।
রেদোয়ানের দিকে চাবিটা ছুঁড়ে দিয়ে ইউভি বলল—
“ওদের বাসায় দিয়ে
আমার আর তোর বাইকের চাবিটা নিয়ে আয়।”
রেদোয়ান ভ্রু তুলল—
“এই সময়?”
ইউভির ঠোঁটে হালকা হাসি—
“অনেক দিন পর…
আজ মনটা একটু বেশি ভালো লাগছে।”
“রেস দেবো…
দেখি কে জিতে।”
রেদোয়ান মুচকি হেসে—
“আজ তো দেখি কারো মুড খুবই ভালো…”
ইউভি কিছু বলল না—
শুধু চোখ সরিয়ে নিল।
এদিকে—
পিয়াসা আর রেদোয়ান ব্যাগ নিয়ে একটু এগিয়ে গেল।
ইনায়া একটু পেছনে…
ধীরে ধীরে হাঁটছে।
হঠাৎ—
পিয়াসা পিছন থেকে এসে ইনায়ার হাত টেনে ধরল—
“এই বেবি… একটা কাজ কর।”
“কি?”
“ভাইয়াকে বল—আমাদের জন্য গাঁদা ফুল এনে দিতে।
কাল লাগবে।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে—
“আমার ভাইয়াকে বলছি…”
পিয়াসা সাথে সাথে থামিয়ে দিল—
“না না!
ভাইয়াকে বল!”
ইনায়া বিরক্ত হয়ে—
“ধুর! যে বাঘের সামনে যেতে চাই না—
তার কাছেই যেতে হয়!”
পিয়াসা হেসে—
“যা না প্লিজ…”
ইনায়া একটু বিরক্ত মুখে
ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গেল ইউভির সামনে।
মাথা নিচু করে
“ভাইয়া…”
ইউভি তখন থেকেই তাকিয়ে ছিল—
নিশব্দ চোখে।
তার চোখে এক ধরনের নেশা…
যেটা ইনায়া বুঝতেই পারে না।
ইনায়া ধীরে বলল—
“আমাদের কিছু গাঁদা ফুল এনে দিতে পারবেন?
কাল লাগবে…”
এক সেকেন্ড…
ইউভি চুপ।
শুধু তাকিয়ে আছে তার দিকে।
মনে মনে—
“এত কাছে এসে দাঁড়াস কেন… আদর…
নিজেকেই সামলানো কঠিন হয়ে যায়…”
তারপর হালকা গলায়—
“ওকে… এনে দিবো।”
ইনায়া মাথা নাড়ল—
“আর কিছু না…”
ইউভি ঠোঁট একটু বাঁকিয়ে—
“ওকে…
এখন যা… সামনে থেকে সরে দাঁড়া।”
কথাটা রুক্ষ—
শেহেজাদার আদর পর্ব ৮
কিন্তু গলায় চাপা হাসি।
ইনায়া কিছু না বলে চলে গেল।
আর ইউভি—
বললো
“কাল ফুল না…
তোকে পুরো বসন্তটাই এনে দিবো…”
