শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬২
সুরভী আক্তার
উঠানে ধেই ধেই করে নাচছে ময়না । বাড়ি সম্পুর্ন ফাঁকা । আফতাব আর ওর বাবার দুপুরের খাবার বেঁধে নিয়ে ক্ষেতে গেছেন খালেদা । ময়না কে বাড়িতে একা রেখে গেছেন । এইতো বাড়ির পেছনেই ক্ষেত । দুই বাপ ছেলে আসতে দেরি করছিলো বলে খাবার সাজিয়ে সেখানেই নিয়ে গেছেন তিনি । এতেই ফাঁক পেয়েছে মেয়েটা । ওকে আর দেখে কে ? লাফালাফি , ছটফটে পনা করা হয় না ইদানিং । শরীরে জং ধরে গেছে সারাদিন বাড়িতে বন্দি হয়ে থাকতে থাকতে । কাজ ও নেই তেমন । যা আছে , তা খালেদা নিজেই করেন । ময়না কে কুটু টিও নাড়তে হয় না । গোসল সেরে কোমর সমান ভেজা চুল খুলে রেখে কোমরে শাড়ির আঁচল গুঁজেছে ময়না ।
বারান্দার খুঁটির সাথে একটা খাঁচা লটকানো । একটা টিয়া পাখি ভেতরে । এটাকে আফতাবের বাবা ধরে এনেছেন কদিন আগে । তিনিই খাঁচায় বন্দী করে রেখেছেন ।
ময়না ওটার সাথে পকর পকর করে সময় কাটায় । একটা নাম ও দিয়েছে , সোনাই । ওটাকে সামনে রেখে গুন গুন করতে করতে শরীর দোলাচ্ছে ময়না । পাখিটাও খাঁচায় বন্দী থেকেই ডানা ঝাপটাচ্ছে । উড়াল দিতে চেষ্টা করছে বন্দী অবস্থায় । তবে শিকলে বন্দি সে । পার পাওয়া দায় ।
ময়না নাচুনি হয়েছে আজ । চুল এলোমেলো করে পাগলের মতো ঝাপাচ্ছে শুধু । আফতাবের এনে দেওয়া সেই নতুন শাড়িটা আজ আবার পড়েছে । চুড়ি গুলোও পড়েছে । শরীরের ঝাঁকুনির সাথে সাথে ঝিনঝিন শব্দে বাজছে চুড়ি গুলো । এতক্ষণে হাঁপিয়ে গিয়ে ধপ করে বারান্দায় বসলো । ফের উঠে দাঁড়িয়ে খাঁচা টাকে নিচে নামালো । দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মুখের ঘাম মুছলো আঁচলে । পাখিটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে বললো….
” শোন সোনাই , তোরে কথা শিখতে হইবো । আমি যতক্ষন একলা থাকমু । ততক্ষণ তোর লগে কথা কমু । একলা একলা কথা কইতে কার ভালো লাগে , ক ? তোর লগে খালি আমি একলা একলাই পকর পকর করি । তুই বুঝোস কি না আল্লাহ জানে । বুঝতে হইবো ? না হইলে হইবো না । কথা শিখবি আইজ থিকা । চল শুরু করি । প্রথমে কি শিখামু তোরে ?
আচ্ছা , ক আব্বা….
টান দিয়ে শেষ শব্দ টা উচ্চারণ করলো ময়না । সোনাই চেয়ে আছে ভোলাভালার ন্যায় । চোখে পলক ফেলতে ফেলতে লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক ওদিক বিচরন করলো । ময়না কে উপেক্ষা করলো । এতেই বিরক্ত হলো ময়না । ভারিক্কি ভাবে তেঁতে বললো….
” ঐ , শুনোছ না আমার কথা ? কথা না শিখলে তোরে খাইতে দিমু না । ক , যা কইতে কইছি জলদি ক । আচ্ছা আব্বা ডাক কঠিন । সহজ একখান ডাক শিখ আগে । আমার নাম ক ,,, এবার ক ময়না….
সেই একই ভাবে পিটপিট করে চেয়ে আছে সোনাই । ময়না ফুঁসে উঠে খাঁচা টা ঝাঁকালো । বললো ঝাঁজ দেখিয়ে….
” সোনাই,,, তোরে কিন্তু সত্যিই খাইতে দিমু না । কথা শিখবি না তুই ?
পেছন থেকে পুরুষালি গুরুভার কন্ঠ ভেসে আসলো এ পর্যায়ে….
” ও কথা শিখে কি করবে ?
চমকে পাশ ফেরে ময়না । ঘর্মাক্ত আফতাব কে দেখে তড়িঘড়ি করে স্বাভাবিক হয় । আফতাব লুঙ্গির কোচা ছেড়ে আবার বলে…
” কথা শেখাচ্ছো ওকে ?
” হতচ্ছাড়া শিখতাছে না । কইলাম আব্বা ক , কয় না । ময়না কইতে কইলাম , এইডাও কয় না ।
আফতাব হাসে । বলে….
” শিখিয়ে লাভ নেই । ওকে মুক্ত করবো আজ ।
ময়না অগত্যা বৃহৎ নয়নে চায় । ছলকে বলে….
” মুক্ত মানে ?
” উড়িয়ে দেবো ওকে ।
” না ,
তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে বাঁধ সাধলো ময়না । পরক্ষনে গলা নামিয়ে বললো…
” উড়িয়ে দেবেন ক্যান ?
” পাখিদের বন্দি করে রাখতে নেই । ওদের মানায় মুক্ত আকাশে , মুক্ত বাতাসে ।
” আব্বা তো ওরে ধইরা আনছে , ওরে ভাল্লাগে আমার । আমি ওরে কথা শিখামু । সারাদিন একলা একলা ভাল্লাগে না আমার । আমি কথা কমু ওর লগে….
” কথা বলার জন্য আমি আছি । ওকে ছাড়ো । খাঁচা টা দাও দেখি , খুলে দেই ।
ময়না মুখ অসহায় করলো । ওষ্ঠ উল্টে ছলছল চোখে চাইলো । ভেজা গলায় বলল….
” আপনি তো থাকেন না সবসময় । আম্মার লগে থাহি আমি । আর একটা সঙ্গী পাইলে খারাপ কিসে ? ওয় থাক না আমার লগে ।
আফতাব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় । ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে মৃদু স্বরে বলে….
” আর একটু অপেক্ষা করো , অন্য একটা সঙ্গী এনে দেবো তোমায় । এটাকে উড়িয়ে দেই আজ ।
ময়না জেদি স্বরে বলে….
” না , আমার ওরেই লাগবে । ওরে আমি ছাইড়া দিতে দিমু না ।
” ময়না, জেদ করো না ।
আচ্ছা বলতো , তোমাকে যদি কেউ সবসময় বেঁধে বন্দি করে রাখে , তাহলে তোমার কেমন লাগবে ?
ময়না মুখ কাতর করলো । আচানক মানিকের কথা মনে পড়লো । অতীতের কিছু দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়তেই ধক্ করে উঠলো ময়না । সহসা চোখ খিচে দুদিকে মাথা নাড়ালো । কাছে এসে ঝুঁকে বললো আফতাব….
” কি হলো ?
বন্দিত্বের স্বাদ খুব তিক্ত হয়,তাই না ? যাকে যেখানে মানায় , তাকে সেখানেই রাখতে হয় । পাখিদের খাঁচায় পুষতে নেই । তাদের মুক্ত আকাশে ছেড়ে দিতে হয় ।
” তাইলে আমারে বন্দি কইরা রাখছেন ক্যান ? বাপের বাড়ি ও যাইতে দেন না আমারে । ঘুরতেও লইয়া যান না । আমার বুঝি এমনে সারাদিন বইয়া থাকতে ভালো লাগে ?
আফতাব মিহি হাসলো ।
” তুমি আলাদা , তুমিও পাখি , ময়না পাখি । তবে শুধু আমার একান্ত ময়না পাখি । তোমাকে উড়তে দেবো না আমি । বন্দি করেই রাখবো । এই এখানটায়….
বুকের বাম দিকে এক আঙ্গুলে ইশারা করে বলে আফতাব । ময়না লজ্জা পায় । নিমিষেই লাজুক হাসে মুখ নামিয়ে । আফতাব কেনো যেনো নিজেকে সংবরণ করতে পারে না । মেয়েটার নাক টেনে দাঁত চেপে বলে….
” ময়না পাখি , চলো উড়িয়ে দেই এই টিয়া পাখি টাকে । এক ঘরে দুটো পাখি রাখতে চাই না আমি । আমার একটা হলেই চলবে । আমার ময়না পাখির দারেই সন্তুষ্ট আমি ।
ময়না মিইয়ে যায় আরো ।
অতঃপর দুটোতে মিলে পাখি টাকে খাঁচা ছাড়া করে উড়িয়ে দেয় । ছাড়া পাওয়া মাত্রই আপন খেয়াল খুশিতে ডানা মেলে নিমিষেই অদূরে চলে যায় পাখিটা । ময়না পিটপিট করে চেয়ে রয় । এই কদিনে বেশ মায়া জমেছে ওর প্রতি । মায়া লাগিয়ে ও তো উড়ে গেলো । উদাস হয়ে বিড়বিড় করলো ময়না….
” ইশশ্ , চইলা গেলো । ক্যামনে এক নিমিষেই উইড়া গেলো দেখেন । মুক্ত আকাশে ভাসতে খুব মজা লাগে তাই না ? আমি যদি অমনে উড়তে পারতাম । যদি দুইটা ডানা থাকতো, তাইলে আমিও অমনে উইড়া যাইতাম ।
সহসা বলে আফতাব…
” আমাকে ছেড়ে ?
ঝট করে তাকায় ময়না । ছলকে বলে….
” উঁহু , আপনাকে ছাইড়া যামু না । কোনো দিন যামু না । কত সাধ্যে পাইছি আপনারে । আমারে তো আর কেউ মানবো না আপনার মতো কইরা । কই যামু আমি আপনারে ছাড়া ?
” ডানা মেলে ওড়ার খুব সখ তোমার ?
ময়না মৃদু হাসে । অদূরে আসমানে তাকায় । শ্বাস ফেলে আফতাব । বাড়িতে এসেছিল ময়না একা আছে তাই । খালেদার মোটেও ওকে বাড়িতে একলা রেখে যাওয়া উচিত হয় নি । তাই ছুটে এসেছে আফতাব ।
সে হাত বাড়িয়ে ময়নার হাত খানা আচমকা ধরলো । আকস্মিক স্পর্শ পেয়ে শিউরে উঠে ঝট করে নিজের হাতের দিকে তাকায় ময়না । পরক্ষনে আফতাবের দিকে তাকাতেই হাসি ঢেকে উৎসুক স্বরে বলে আফতাব….
” ময়না পাখি , ডানা মেলে ওড়ার খুব সখ তোমার ? চলো উড়িয়ে নিয়ে আসি । পায়ে না হয় সুতো বেঁধে রাখবো । যাতে আমাকে ছেড়ে উড়ে পালাতে না পারো ।
এক গাল হাসে ময়না । পরিপ্রেক্ষিতে বলে….
” সেই সুতোয় পেঁচানো লাটাই না হয় আপনি ধইরা রাইখেন । তাইলে আর পালামু না । আপনার উপর নির্ভর কইরা একবার উইড়া আসি চলেন ।
হাসলো দু’জনেই । ওর হাত টেনে ধরেই বাড়ি ছাড়লো আফতাব । এগোলো চেনা জানা কোনো এক পথে । এখন দুজনায় যাবে চোখ যেদিকে যায় সেদিকে । অলখের পাথারে ।
ঘুমে টলছে সুরবালা । সবে রাত্রি নয়টা বাজে । আজ এতেই ঘুম লেগেছে চোখে ।
রাতের খাবার খাওয়া হলো একটু আগে । শায়লা কে ঔষধ খাইয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো সুরবালা । হাই তুলে সামনে তাকালো । খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে বই পড়ছে অংকুর । চোখে সেই চিকন ফ্রেমের চশমা । কেবল মাত্র পড়ার সময় এটা চোখে লাগায় সে । সুরবালা দরজা চাপিয়ে ঘরে ঢুকলো । বিছানার দিকে এগোতেই চোখ তুলে তাকালো অংকুর । নড়েচড়ে সুরবালা কে জায়গা দিলো । কিছু না বলেই বিছানায় গা এলিয়ে ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়লো সুরবালা । অংকুর চোখ সুক্ষ্ম করে ।
আজ এতো শান্ত কেনো ? কপাল গুটিয়ে ফেললো অংকুর । আজ এই মেয়ে ঝগড়া করবে না ? কি হলো আজ ?
বই খোলা রেখেই অংকুর আধো স্বরে ডাকলো….
” বাউড়ি ??
” হুঁ ?
” কিছু ভুলে যাচ্ছো না তো ?
” কি ?
” ঠিক আছো ?
” হুঁ ।
” ঝগড়া করবে না আজ ?
মুহুর্তেই ফোঁস করে এক ঝটকায় অংকুরের দিকে ফিরলো সুরবালা । চমকালো বেচারা । থতমত খেয়ে দ্রুত ঢোক গিলে বইয়ে দৃষ্টি পাত করলো আবার । খেকিয়ে উঠলো সুরবালা….
” বাবড়ি ওয়ালা , আমি ঝগড়া করি আপনার সাথে ?
” উঁহু ,, তুমি খুব ভালো । ঘুমাও …
ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সুরবালা । উঠে বসে । মুখ খিচে রগরগে দৃষ্টিতে খানিক চেয়ে রয় অংকুরের দিকে । অংকুর আড়চোখে তা অবলোকন করে বলে মৃদু স্বরে….
” এভাবে দেখো না বাউড়ি , জ্বলে যাচ্ছি তো ।
” আপনাকে আজ ছাড়বো না আমি ….
” একবার ধরেই দেখো , আমি কখনো ছাড়তেই দেবো না তোমায় ।
সুরবালার রাগ তড়তড় করে বেড়েই চলে । ঘুম ঘুম চোখ গায়েব হয় । ও সেভাবেই তেড়ে আসে অংকুরের দিকে । অংকুর সেভাবেই বসে থেকে বলে….
” বাউড়ি , রাগ করলে ?
ফুঁসে ওঠে সুরবালা । কিলবিল করে হাত পা । ইচ্ছে করছে এই বাবড়ি ওয়ালা কে পিষে ফেলতে । কিন্তু কি করবে ও ? কিছু করতে না পেরে শেষ মেষ অংকুরের ঝাঁকড়া চুল গুলো দুহাতের মুঠোয় খামচে ধরলো সুরবালা । দাঁত খিচুনি দিলো । ব্যাথা পেয়ে স্থির থেকেই মৃদু আর্তনাদ করলো অংকুর….
” সুরবালা , লাগছে আমার ।
” লাগুক , আপনি খুব বাজে ।
ছেড়ে দিলো সুরবালা । রাগকে অযথা অভীমানে রুপান্তরিত করলো । ফের শুয়ে পড়লো পাশ ফিরে । তব্দা খেয়ে বসে রইলো অংকুর । এই মেয়ের মতিগতি এতো দূর্বোধ্য কেনো ? আবার কি হলো ?
অংকুর বই রাখে । খানিক কাছ ঘেঁষে বলে….
” কি হলো ?
” দূরে যান ।
” কাছে আসিনি । দূরেই আছি ।
” ঘুমান ।
” আচ্ছা ।
বাধ্যের ন্যায় সম্মতি দিতেই ফের লাফিয়ে উঠে বসলো সুরবালা । তেঁতে বললো জিদ্দি খেয়ে….
” খবরদার ঘুমাবেন না ।
” আচ্ছা , আমি পড়বো এখন । তুমি ঘুমাও…
বই কেড়ে নিলো সুরবালা । চোখে চোখ রেখে বলল মলিন হয়ে….
” পড়বেন না আপনি !
অংকুর শ্বাস ফেলে বললো…
” তাহলে কি করবো ?
” ঘুমান ।
পাগলের ন্যায় ঘোরপ্যাচ কথায় এবার ফিক করে হেসে ওঠে অংকুর । বিড়বিড় করে হাসি ঠেলে..
” বাউড়ি একটা ।
অতঃপর শব্দ করে বলে….
” বড্ড জ্বালাচ্ছো আমায় ।
” জ্বলুন ।
” জ্বলছিই তো ।
” আমি ঘুমাবো ।
” ঘুমাও , জায়গা ছেড়ে দিয়েছে !
” এভাবে নয় ।
” কিভাবে ?
আচমকা এগিয়ে যায় সুরবালা । খুব কাছাকাছি এগোয় । অংকুর এখনো ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে । সুরবালা ওকে পুরোপুরি তাজ্জব বানিয়ে আকস্মিক ওকে জড়িয়ে ধরে । এক হাত পিঠ গলিয়ে জড়িয়ে নেয় । অন্য হাত উদরের কাছটায় রাখে । বাবড়ি ওয়ালার প্রশস্ত বুকে মাথা এলিয়ে দেয় সে । অংকুর মূর্ত বনে ওর কান্ডে । সুরবালা নিজের জায়গা করে নেয় । বুকে মাথা এলিয়ে শরীরের সবটুকু ভার ছাড়ে । চোখ বুজে আসে আপনা আপনি । তৃপ্তটায় শ্বাস টানে মেয়েটা । আজকাল এই লোকটা খুব টানে ওকে । বাবড়ি ওয়ালার সঙ্গ পেতে বড্ড আকাঙ্ক্ষি সে । বাবড়ি ওয়ালা কে চায় সে । কিন্তু এই বাবড়ি ওয়ালা তাকে বোঝে না । সুরবালা মৃদু মোলায়েম কন্ঠে বুলি ফুটায় ফিসফিসিয়ে….
” এভাবে !
অংকুর এখনো বিস্মিত । সবটা কেমন ঘোর লাগে ওর নিকট । সুরবালা নড়েচড়ে ওঠে ওর বুকের মাঝে । সম্বিতে ফেরে অংকুর । ঢোক গিলে বলে সন্দিহান….
” এভাবেই ?
” হু । আজ থেকে রোজ ।
” রোজ ?
” হু ।
” জ্বালানোর প্রক্রিয়া টা ভিন্ন করলে যে ? এভাবে জ্বালাবে আমায় ?
সুরবালা কিছু বলতে পারে না । নিজের নির্লজ্জতায় কন্ঠ রোধ হয়ে আসে ওর । অংকুর হেসে ফেলে প্রশান্তিতে । আলগোছে জড়িয়ে নেয় সুরবালা কে । শাড়ি ভেদে উন্মুক্ত নিতম্বে অংকুরের হাতের স্পর্শ পেতেই চোখ বুজে কুঁকড়ে যায় মেয়েটার । কম্পন ধরে শরীরে । শ্বাস প্রশ্বাস জোরালো হয় । অংকুর তা বুঝে হাত সরায় । শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিয়ে ফের জড়িয়ে নেয় । বলে ফিসফিস করে….
” জ্বালানোর প্রক্রিয়া যদি এমন হয় , তাহলে আমি জ্বলতে প্রস্তুত । যতো খুশি জ্বালাও আমায় ।
এভাবে নিজে থেকে আমাকে জ্বালাতে আসছো , এতে যে তোমাকেও জ্বলতে হবে , তার ধারনা কি রাখো ?
” রাখি !
” বদলাচ্ছো ?
” বদলাতি চাইছি !
” পুরোপুরি বদল আসবে কবে ?
” সময় লাগবে আরেকটু !
” অপেক্ষা করবো ?
” হু ।
” এবারের অপেক্ষা টা ছটফটে হবে ভীষণ ।
সুরবালা মৃদু হাসে । নাজুক মুখ লুকিয়ে নেয় বক্ষের ভাঁজে । কান পেতে অনুভব করে বাবড়ি ওয়ালার ধক্ ধকে বক্ষ স্পন্দন । এতেই লজ্জা গাঢ় হয় মেয়েটার । হাসি লুকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে…
” ঘুমান ।
অংকুর মাথা তোলে । সুরবালার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে….
” অপেক্ষায় রইলাম বাউড়ি । আশা করি এবারের অপেক্ষার প্রহর খুব জলদি শেষ হবে ।
বেলা গড়িয়েছে । গ্রামে বেরিয়েছে সংগ্রাম ।
রান্নার তোড়জোড় চলছে রান্না ঘরে । অন্দরে নিরিহের ন্যায় চুপচাপ বসে আছে শ্যামা । তাকে কাজ করতে দেওয়া হয় না আর । এই মুহূর্তে অন্দরেও কেউ নেই , যার সাথে কথা বলবে সে । এক মনে বসে বসে ধ্যানে মগ্ন হয়ে চেয়ে আছে কোনো এক পাশে । ঠুকঠাক আওয়াজ আসছে রান্না ঘর থেকে ।
শ্যামা শ্বাস ফেলছে ক্ষিয় কাল বাদ বাদ । কেমন ভার ভার লাগছে নিজেকে । অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে । রান্না ঘর থেকে একজন বেরিয়ে এসে মাথা নুইয়ে বললো…..
” জমিদার গিন্নি , জমিদার সাহেবের জন্য আলাদা করে মাছ উঠিয়ে রাখুন আপনি । উনি তো চিংড়ি মাছ খান না । চিংড়ি মাছের ছোঁয়াও খান না । আলাদা বাটিতে মাছ উঠিয়ে , আপনি নিজেই আলাদা করে রাখুন । আমরা এসবে হাত লাগাবো না ।
শ্যামা একটা কাজ পেলো এতক্ষণে । তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো । রান্না ঘরে ঢুকে কড়াই থেকে একটু মাছের তরকারি আলাদা করে একটা বাটিতে তুললো । সব কিছুর থেকে আলাদা করে রান্নাঘরের একপাশে বাটিটা ঢেকে রাখলো । আজ চিংড়ি মাছ রান্না হবে । সংগ্রাম খাবে না সেসব । এমনকি এর গন্ধটাও পছন্দ করে না সে । দুপুরের খাবার খেতে আসলে ওকে আলাদা করে খেতে দিতে হবে । রান্নাঘরে একপাশে বাটিটা ঢেকে রেখে বেড়িয়ে আসলো শ্যামা । এবার আর অন্দরে বসলো না । উপরে উঠলো সোজাসুজি । করিডোরে এগোতেই নিজ ঘরের সামনে মুখোমুখি হলো জুনাইদের । আকস্মিক আজ জুনাইদের সাথে চোখাচোখি হলো শ্যামার । শ্যামা তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া না দেখালেও জুনাইদ যেনো ভুত দেখার ন্যায় চমকালো ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬১
ঢোক গিললো অনারগল । মুহুর্তেই চোখ নামিয়ে নিলো । কপাল গুটালো শ্যামা । নিজেদের ঘরের সামনে জুনাইদ কে দেখে সন্দিহান হলো খানিক । জুনাইদ কি কোনো ভাবে ওদের ঘর হতে বেরোলো ? কিন্তু এটা কি করে হয় ? এই করিডোরের মাথাতেই জুনাইদের ঘর । হয়তো ঘর হতে বেরিয়েই আসছে সবে । কিন্তু ওদের ঘরের এতোটা কাছ ঘেঁষে কেনো ? আর ঠিক দরজার সামনেই মুখোমুখি কেনো সাক্ষাৎ হলো দুজনার ? শ্যামা তো চোখ নামিয়ে ছিলো । লক্ষ্য করে নি সেভাবে । হয়তো ওর ধারনা ভুল , আন্দাজ ভুল । অবান্তর ভুল ধারণার জন্য দুদিকে মাথা নাড়ালো শ্যামা । জুনাইদ তড়িঘড়ি করে ওকে পাশ কাটিয়ে গেলো । ঘরে ঢুকলো শ্যামা । তবুও সন্দিহান হয়ে এদিক ওদিক তাকালো । ঘরের সবটা ঠিক আগের মতোই আছে । গোছালো সবটা , ঠিক যেভাবে গুছিয়ে গেছিলো সেভাবেই । তাহলে কেনো এই ভুল ধারণা আসলো ওর মনে ?
