শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬১
সুরভী আক্তার
সামনের জন কুঁকড়ে যায় । সংগ্রাম কথা শেষ করেই আবছা অন্ধকারে বেঁধে রাখা লোকটার পেট বরাবর ক্ষুব্ধতা সমেত সর্বশক্তি দিয়ে আরো একটা লাথি বসায় সজোরে । ফের তীব্র যন্ত্রণায় কাতরে গুমড়ে ওঠে সামনের জন । মুখ বাঁধা থাকার দরুন মুখ ফেটে আওয়াজ বেরোয় না সেভাবে । সংগ্রাম হিংস্রের ন্যায় সেভাবেই আরো কয়েকটা লাথি বসায় ।
সামনের জন মেঝের সাথে লুটিয়ে না পড়া অবধি থামে না সে । যদিও বা এটা তার সর্বনিম্ন হিংস্রতার প্রকাশিত রুপ ।
অবশেষে সংগ্রাম থামে । রহিম করিম ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় একে অপরের দিকে । মশাল সামনের দিকে বাড়িয়ে ওর বিভৎস চেহারা দেখে ছলকে উঠতে ভোলে না দুই ভাই । আগুনের ঝিলিকে তপ্তকাঞ্চন চেহারার সংগ্রামের ক্ষুব্ধ অবয়ব জ্বল জ্বল করে ওঠে । তড়তড়ে ঘামের বিন্দু বিন্দু কণায় কপাল জবজবে । কপালর শিরা উপশিরা ফুলে ফেপে দৃশ্যমান । কপাল পেরিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে চিবুক বেয়ে । গৌর বর্নের চেহারা ধারন করেছে তামাটে বর্ন । চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ন । হিংস্রতা স্পষ্ট । একটু পিছিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলছে সংগ্রাম । রহিম জিভে অধর ভিজিয়ে নোয়নো গলায় মুখ খুললো….
” জমিদার সাহেব , আপনি দম লন । আমি দেখতাছি এইডারে ।
আরো একটু পিছিয়ে আসে সংগ্রাম । কোমরে এক হাত ঠেসে দাঁড়িয়ে যায় । শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ শ্রোত বইছে । তপ্ত হয়ে এসেছে শরীর । ক্রোধে রিতিমত কাঁপছে সে । চোখ বুজে নিলো । জ্বলছে চোখ দুটো । কাল থেকে বহু কসরতে সামলেছে নিজেকে । রাত থেকে ভোর হওয়ার জন্য অধীরে অপেক্ষা করেছে এখানে আসার জন্য ।
শ্বাস ফেলে গর্জে উঠলো সংগ্রাম…
” রহিম , লিটন কে ডাকো ।
অগত্যা আদেশ তামিল করলো রহিম । এ ঘর হতে বেরোলো । মিনিটের মাথায় ফিরলো একজন কে সাথে নিয়ে । সটান ভেতরে ঢুকে সংগ্রামের সামনা সামনি দাঁড়ালো লিটন । সংগ্রামের অন্যতম গূঢ়পুরুষ এই লিটন । আরো আছে অনেক । রহিম করিম দৃশ্যমান সঙ্গি হলেও এরা অদৃশ্য মান । সংগ্রামের ছদ্মবেশী ছায়াচর এরা ।
লিটন হাজির হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে মেঝেতে নেতিয়ে পড়ে থাকা লোকটার দিকে ইশারা করে কন্ঠ পিষে বললো সংগ্রাম…
” কি করেছিলো ও কাল ? সাফ সাফ বলবে !
মাধবপুরে , কি হয়েছিল ? কি হয়েছিলো আমার বেগমের বাড়িতে ?
লিটনের গমগমে জবাব….
” ও আপনার শশুর বাড়িতে ফাঁক পেয়ে ঢুকে পড়েছিল জমিদার সাহেব । আপনার আদেশ মোতাবেক আমরা আড়ালচারী ছিলাম । বাড়ির প্রধান ফটক এবং পেছনের ফটক , দুদিকেই গুতদর্শী ছিলো । এমনিতেও বাড়ির খিড়কি ভেতর থেকেই লাগানো ছিলো সর্বদা । বেগম সাহেবার মা…..
কথা শেষ করার আগেই হাত উঁচিয়ে বাঁধা দিলো সংগ্রাম…
” চুপ , বেগম সাহেবা নয় , জমিদার গিন্নি বলে সম্বোধন করো আমার বেগম কে । তাকে বেগম , এবং সাহেবান , দুই সম্বোধনে ডাকার অধিকার শুধু আমার ।
আঁধারে মৃদু হাসলো লিটন । শ্বাস টেনে আবার বলতে শুরু করল ছাড়া প্রসঙ্গ…
” জমিদার গিন্নির মা , মানে আপনার শাশুড়ি বিকেলের দিকে এক পর্যায়ে বাইরে বেরিয়েছিলেন । বাড়ির পেছনে থাকা আমাদের অদৃশ্য প্রহরী কে দেখে ফেলেছিলেন উনি । সন্দেহ করেন নি হয়তো । সন্দেহ যাতে না করেন , তাই তৎক্ষণাৎ আমাদের লোক সরে গেছিলো বাড়ির পেছন থেকে । সেই সুযোগে এই বদমাইশ বাড়িতে ঢুকেছিলো । জমিদার গিন্নি যে ঘরে ছিলেন , সেই ঘরের দিকে হাত বাড়িয়ে ছিলো এই কুৎসিত কর্মা । তবে কিছু করতে পারে নি । যথা সময়ে আমাদের লোকের উপস্থিতিতে আটকানো গেছে ওকে । আপনার বেগম সম্পুর্ন মুক্ত ছিলেন এসব থেকে । খানিক টা ভয় পেয়েছিলেন হয়তো , তার বিচলিত কন্ঠে বুঝতে পেরেছি এটা । তবে আমরা সেখানে এক মুহুর্ত ও অপেক্ষা করি নি , ঘুনাক্ষরেও কোনো কিছু টের পাননি আপনার বেগম । আপনার শাশুড়ি ফিরে আসার অনেক আগেই পরিস্থিতি সামলানো গেছে । আর আপনার কথা অনুযায়ীই এটাকে এখনো জিবিত রেখেছি , ও আমাদের কাছে কিছু স্বীকার করে নি । যদি বলেন তাহলে এক্ষুনি ….
” মুখ খুলে দাও ওর ।
শান্ত গমগমে স্বর সংগ্রামের । রহিম এগিয়ে এসে লোকটাকে এক টানে তুলে বসালো । মুখের বাঁধন খুলে দিতেই হাঁ করে শ্বাস টানতে লাগলো লোকটা । বয়স কম । বেশি না হলেও পরিপক্ব যুবক । চেহারা কালচে । মারের দাগে মুখশ্রী বিভৎস । গাল , কপাল কেটে গেছে । রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধেছে কাঁটা জায়গায় । কাল থেকে তো কম মার খায় নি ।
মুখ খোলা পেয়েই হাঁসফাঁস করে শ্বাস টেনে অস্ফুটে বিড়বিড় করলো লোকটা….
” পা..পানি ! পানি ….
একটু পানি দেন আমারে ।
সংগ্রাম চোয়াল খিচে ফের এগোয় । হাঁটু ভেঙ্গে সম্মুখ বরাবর ঝুঁকে বসে । পাশে হাত বাড়িয়ে দিতেই ওর হাতে মশাল টা ধরিয়ে দেয় করিম । মশাল হাতে পেয়েই সেটাকে এগিয়ে ধরে সংগ্রাম । নিজের থেকে দূরত্বে রেখে লোকটার মুখ বরাবর ধরে । আগুনের ঝলকানিতে লোকটার উপর বজ্র দৃষ্টি পাত করে কন্ঠ পিষে বলে….
” কি চেয়েছিলি তুই ? কে তুই ? আগে তো এ রাজ্যে কখনো দেখিনি !
লোকটা হাঁসফাঁস করে , শুকনো কন্ঠ ঢোক গিলেও ভেজাতে পারে না । কন্ঠ চিরে যাচ্ছে । তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে বুক । তবুও বলে…
” আমি , আমি খালিদ ।
” বাড়ি কই তোর ?
” মাধবপুরেই !
” কার ছেলে ?
” মনসুরের !
” মনসুর ? মানে মাধবপুরের শুরুতেই যার বাড়ি ?
” হ ।
” তোকে তো দেখি নি !
” আমি বাইরে থাহি । গেরামের বাইরে । জমিদারি রাজ্যের বাইরে , ভাটায় কাম করি । বাড়িতে থাহি না ।
দাঁত পিষলো সংগ্রাম । ক্রোধে বললো…
” মোখলেস মিয়ার বাড়িতে ঢুকেছিলি কেনো ?
ছেলেটা কাপলো । তৎক্ষণাৎ উত্তর করলো না । সংগ্রাম তীব্র গর্জনে আবারো একই প্রশ্ন করতেই কেঁপে কেঁপে উত্তর করলো ছেলেটা….
” আপনার বউরে দেখোনের লাইগা ।
মস্তিষ্ক দপ করে ওঠে সংগ্রামের । হাত মুঠো করে নিজেকে সংযত রেখে শুধোয়…
” কেনো ?
” গেরামে আওনের পর অনেক শুনছি হের কথা । কেউ দেখে নাই হেরে । তয় হগ্গলে কইতো হেয় নাকি দেখতে ভালা না । আপনার লগে মানায় নাই । এই লাইগা দেখোনের ইচ্ছা জাগছিলো । আগের দিন শুনছিলাম হেরে রাইখা আইছেন বাপের বাড়িত । তাই সুযোগ খুঁইজা দেখতে গেছিলাম । আমার আর কোনো উদ্দেশ্য আছিলো না বিশ্বাস করেন । আমি কারোর লোক না । কেউ আমারে পাঠায় নাই ।
সবটা শুনেই আকস্মিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো সংগ্রাম । বললো…
” তোকে তো জিজ্ঞেসই করি নি কেউ তোকে পাঠিয়েছে কি না ! মাটিতে থাপ্পর পড়লো , এতে তুই ছিটকে পড়লি কেনো ?
পাগল পেয়েছিস আমায় ? সংগ্রাম জোয়ার্দার কে বুদ্ধু পেয়েছিস ? তোর এসব বা*ল মার্কা অযুহাতে ভুলিয়ে দিবি আমায় ? হ্যাঁ ?
আচ্ছা মেনে নিলাম তোর অযুহাত । এখন কি ভাবছিস, এই অযুহাত টা ছোট ? আমার বেগম কে মারতে নয় , দেখতে গেছিলি তুই । মেনে নিলাম তোর এই অযুহাত ? কিন্তু দূর্ভাগ্য । এটাও কোনো ক্ষুন্ন ঘটনা নয় ।
বাকি টুকু বলতে গিয়ে ক্ষুব্ধতা সংবরন হয় না । একহাতে মশাল ধরে অন্য হাতে ছেলেটার ঘাড় চেপে নিজের দিকে হিচড়ে টেনে আনে সংগ্রাম । কন্ঠ খিচে ফেলে । ভড়কায় ছেলেটা । কোঠর হতে প্রাণ পাখি বেরিয়ে যাওয়ার দশা । ওকে আরো ভয় দেখিয়ে চাপা স্বরে গর্জে ওঠে সংগ্রাম….
” জানোয়ার , আমার বেগম কে দেখবি তুই ?
এতো বড় হিম্মত ? আমার বউয়ের দিকে চোখ তুলবি ?এতো বড় কলিজা ? এই বুকের ভেতর এতো বড় কলিজা বুনেছিস ? আজ তোর বুক ফাটিয়ে কলিজা বের করে ওজন করে দেখবো আমি । বুঝলি ?
আমার বেগম শুধু আমার ? ওকে দেখা , ছোঁয়া , ভালোবাসা , সবকিছুর অধিকার শুধু আমার । আমার জীবনে আসার পর আজ পর্যন্ত খারাপ অভিপ্রায়ে আমার বেগমের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পায় নি কেউ । যে তাকিয়েছে , কবরে পৌঁছেছে সে । ওকে বিয়ে করার আগেও যেই ওর দিকে লালসা নিয়ে তাকিয়েছিল , তাদের কেই ছাড় দেই নি আমি । তোকে কি ছাড় দেবো ?
তুই ওকে আঘাত করতে গেছিলি ? আঘাতের কথা বাদ দিলাম , কেননা আঘাতের হিসেব ধরলে তোর শাস্তি আরো হাজার গুণ কঠিন হবে । জ্যান্ত কুরবানী দেবো তোকে । তোকে কঠিন শাস্তি দিতে চাইছি না ।
ওকে দেখতে গেছিলি ? হ্যাঁ ? এবার এটার শাস্তি দেবো তোকে । প্রস্তুত হ !
তোদের মতো পুরুষদের ঘৃণা করি আমি ! তোদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই । এই সুশীল সমাজে তোদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিঃসরণের কোনো স্থান নেই । স্থান রাখবো না আমি ।
এই দুচোখে আমার বেগম কে দেখতে চেয়েছিলি , না ? উপড়ে ফেলবো তোর এই দুচোখ ? লিটন , গরম শিক নিয়ে এসো ।
ভয়ানক হুমকিতে শিউরে ওঠে খালিদের অন্তরাত্মা । এক মুহুর্তেই দাঁড়িয়ে যায় লোম কুপ । তীব্র গরমে ঘেমে নেয়ে এককার । পিঠ বেয়ে উষ্ণ শ্রোত বয়ে চলে । ভয়ার্ত ঝিলিক খেলে যায় দুই চোখে । মশালের স্ফুলিঙ্গ সংগ্রামের ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে বর্তমান ।
খালিদ পথ খুঁজে পায় না । টালমাটাল হয়ে বাঁধা অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে সংগ্রামের পায়ের নিকট । বাঁধা হাতে পা জড়িয়ে ধরে । কেঁদে ওঠে । কান্না চেপে ধরে কন্ঠ নালিতে । কান্না আর ভয়ের চোটে গলা সহ পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে । কোনো রকমে উচ্চারণ করে সে….
” আমাকে ক্ষমা কইরা দেন জমিদার সাহেব । আর এই ভুল করমু না আমি । এবারের মতো মাফ কইরা দেন । ভুল হইয়া গেছে আমার । আমি সবটা কইতাছি আপনারে , সবটা স্বীকার করতাছি । আমি নিজে থাইকা এইসব করি নাই । আপনার স্ত্রী রে দেখোনের লাইগা যাই নাই আমি । আমারে পাঠানো হইছিল অন্য কাজে । সবটা কমু আমি । তবুও ছাইড়া দেন আমারে । মারবেন না দয়া কইরা ।
হাসে সংগ্রাম..
” উঁহু , কিচ্ছু বলবি না তুই । তোর থেকে সবটা শোনার প্রতিক্ষা রাখি না আমি । যেই থালাতে খাস সেই থালাতেই ফুটো করবি ? এটা বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে । আর আমার কাছে বিশ্বাসঘাতকত দেরও কোনো ছাড় নেই । তবে আজ তুই বিশ্বাসঘাতকত হিসেবে নয় , অন্য কিছুর জন্য শাস্তি পাবি ।
মেয়েদের দিকে হাত তো দূর , চোখ বাড়ানোর জন্যেও কাউকে ক্ষমা করি না আমি । আর তুই উদ্দাম কলিজা নিয়ে পুরো শরীর বাড়িয়েছিস আমার আপন নারীর দিকে , তোকে কি করে ক্ষমা করি ? সময় আসলে এসবের সাথে জড়িত নিজের পিতৃস্বসেয় কেও ছাড়বো না আমি । তুই তো কোন ছাড় !
উঠে দাঁড়ালো সংগ্রাম ।
ছেলেটা পা জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে । কান্নার শব্দে গমগমিয়ে ওঠে পুরো ঘর । এক ঝটকায় লাথি মেরে ওকে নিজের পা থেকে ছাড়ায় সংগ্রাম । ফিরে দাঁড়ায় ।
পেছনে হাত গুটিয়ে সটান হয়ে বুক ফুলিয়ে দম নেয় । ক্রোধিত স্বরে আদেশ করে….
” ওর চোখ গেলে দেবে ।
দুহাত কেটে তড়পে তড়পে মারবে । অতঃপর বিনা গোসলে জানাযা পড়িয়ে গোরস্থানে পুঁতে ফেলবে । একটা কাক পক্ষিও যেন টের না পায় । আর ওর পরিবার , খোঁজ নেবে ওর পরিবারের । তাদের ব্যাবস্থা করবে একটা ।
কথা টুকু শেষ করেই গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো সংগ্রাম ।
পেছন থেকে ছেলেটার গলা ফাটা আর্তনাদ । বাঁচার চেষ্টায় ছটফট । চোখে মুখে বিভৎস ভয় । প্রাণের ভয় ।
নীড় হতে বেরিয়েই সংগ্রাম মুখোমুখি হয় সুলেখার । তপ্ত সংগ্রাম নিজের মাঝে শিথিলতা টানে ।
চোখ ফিরিয়ে কোনোরূপ কথা না বলে ফোঁস করে প্রস্থানের জন্য প্রধান ফটকের দিকে চলতে নিলে ডাকেন ভদ্রমহিলা….
” জমিদার বাবা ,
থামে পদযুগল । ঘাড় ঘোরাতেই ভদ্রমহিলা লেনিন হেসে আবার বলেন….
” সেতু অসুস্থ , কাইল থেকে জ্বর বহুত । তোমার আওনের খবর শুইনা ছটফটাইয়া উঠলো । আমি ওরে বাইরে বেরোইতে দেই নাই । তুমি গিয়া একবার দেখা কইরা আইবা ?
” পারবো না ।
সহসা স্পষ্ট প্রত্যুত্তর করেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । দম্ভভরে পা চালিয়ে এক মুহুর্তেই ফটক পেরিয়ে জিপে উঠে বসলো । ধোঁয়া ছাড়িয়ে জিপ উড়িয়ে নিয়ে চলে গেলো সে ।
সুলেখার পাশে দিলশাদ গাজি দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বিড়বিড় করলেন সংগ্রাম কে দেখে….
” বউয়ের লাইগা আইজ চতুর্থ খুন টাও সারলো জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার । কি আছে ঐ বউয়ের মধ্যে ? তুমিতো দেখছো , কও দেহি কি আছে ? আমারে তো চোখ তুলতেও দেয় নাই ।
” তুলতে দেয় নাই , তোলার চেষ্টাও কইরেন না । নাইলে পঞ্চম খুনটা আপনারে করবো ।
বলেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো সুলেখা । পিছু ফিরে অন্দরে ঢুকলো ।
বাড়ি ফিরেছে সংগ্রাম । তখনই সোজা বাড়ি ফিরেছে ।
সকালের নাস্তা সবার সাথেই করেছে সে ।
খাওয়া শেষে ঘরে উঠে ঘুম লাগিয়ে ছিলো একটা । কাল থেকে চোখের পাতা লাগানো হয় নি । এখন একটা প্রশান্তির ঘুম প্রয়োজন । ক্ষুব্ধ মস্তিষ্ক শান্ত করা প্রয়োজন । এই তাগিদেই সেই সকাল থেকে বিকেল অবধি ঘুমোচ্ছে সংগ্রাম । বেঘোরে ঘুম তার । এর মধ্যে নড়চড় করে নি । টের পায় নি একবারও । বিকেলের শেষ ভাগ । পশ্চিম দিগন্ত সিঁদুর রাঙা । পাখিরা যে যার নীড়ে ফিরছে কিচিরমিচির শব্দ তুলে । মাগরিবের আজান পড়বে একটু পর । শ্যামা আসরের নামাজ আদায় করে ঘর হতে বেরিয়ে আতিয়া বেগমের ঘরে ঢুকছে । সেখানেই ছিলো এতক্ষণ । এর মধ্যে সংগ্রাম কে ডাকে নি একবারও । ঘুমানোর আগে সংগ্রাম ডাকতে নিষেধ করে তবেই ঘুমিয়েছে ।
আতিয়া বেগমের ঘর ছেড়ে নিজ ঘরে আসলো শ্যামা । এখনো সংগ্রাম কে সেভাবেই ঘুমোতে দেখে খানিক বিস্মিত হলো । কপাল গুটিয়ে ফেললো । আজ এতো ঘুমাচ্ছে কেনো এই লোক ?
এগিয়ে যায় শ্যামা । সংগ্রামের মাথার কাছে বসে । স্বভাবসুলভ উবু হয়ে ঘুমাচ্ছে সংগ্রাম । মাথার বালিশ টাকে দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে । শ্যামা মৃদু হাসলো । ঘুমন্ত ছোট জমিদার সাহেব কে দেখতে পুরোটাই অন্যরকম লাগে । শ্যামার নিকট সর্বদা শিথিল সংগ্রাম , তবে ঘুমন্ত অবস্থায় সংগ্রামের শিথিলতা টাকে আরো গভীর ভাবে অবলোকন করে শ্যামা । একটা মানুষ এতটা নরম,কোমল হতে পারে কি করে ? পুরো তুলোর ন্যায় । শুভ্র সৌন্দর্যের অধিকারক তার ছোট জমিদার সাহেব । ঘুমিয়ে থাকলে সৌন্দর্য বেড়ে যায় শত গুণ । খুঁটিয়ে দেখতে পারে শ্যামা । ও ঝুঁকে বসে সংগ্রামের দিকে । বাম হাতে আলতো করে সংগ্রামের মাথার কাছটায় হাত বোলায় । চুল গুলো গুছিয়ে দিয়ে চোয়ালে হাত রাখে । নাকের পাশের কালো কুচকুচে আঁচিল টাকে কেন্দ্রে রেখে পুরোটা মুখশ্রী দেখে নেয় । ওষ্ঠ নামিয়ে চোখ বুজে শব্দ করে স্পর্শ আঁকে সেই আঁচিল টায় । চোখ খুলে বিড়বিড় করে….
” আপনি খুব সুন্দর ছোট জমিদার সাহেব ।
আপনার সৌন্দর্য কে বর্ননা করার ভাষা নেই আমার জবানে । সুন্দরের থেকেও সুন্দর আপনি । এতো কেনো সুন্দর হলেন ? পুরুষ মানুষ এতোটা আকর্ষণীয় হয় বুঝি ? তাও আবার আমার মতো একটা মেয়ের জীবনে এতোটা সুন্দর পুরুষ কভু কাম্য ছিলো কি ? আমি আপনাকে পেয়ে ধন্য ছোট জমিদার সাহেব । ধন্য আমার এই জীবন । যে জীবন এতোটা অবহেলায় অতিবাহিত হওয়ার পর আপনাকে পেয়েছে , সে জীবনের উপর হাজার শুকরিয়া । শুকরিয়া ঐ রবের নিকট , যিনি আপনাকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন । শ্রেষ্ঠ স্বামী আপনি । যে আমাকে এতোটা বেশি ভালোবাসে । শ্রেষ্ঠর চেয়েও অধিক কিছু আপনি । আমাকে এতো বেশি ভালোবাসার জন্য হাজার হাজার শুকরিয়া । এতো সুদর্শন পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী আমি । ভাবলেই অন্তরাত্মা শিথিল হয়ে যায় আমার । আপনাকে দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় । এতো সুন্দর হয়েও কেনো বেছে নিলেন আমায় ? আমি জানি আপনি এটা পছন্দ করেন না । তবুও প্রশ্ন জাগে ।
এতো কেনো ভালোবাসেন আমায় ?
” সুফিয়ানার জন্য , তোমাকে ভালো না বাসলে সুফিয়ানা আসবে কি করে ?
আকস্মিক সংগ্রামের ঘুম কাতুরে ভার কন্ঠে চমকে ওঠে শ্যামা । ছিটকে পিছিয়ে আসে । ধড়ফড় করে বৃহৎ নয়নে তাকায় । পিটপিট করে চোখ মেলে সংগ্রাম । ছ্যাঁত করে ওঠে শ্যামা । ঢোক গেলে তৎক্ষণাৎ । সংগ্রাম সহসা বাঁকা হাসলো । মাথা তুলে হাত বাড়িয়ে একটানে শ্যামা কে বিছানায় ফেললো । সময় পার না করে অগত্যা চেপে ধরলো শ্যামা কে । গলার কাছে মুখ গুজে শ্বাস টানলো চোখ বুজে । শ্যামা নির্বাক । গ্রীবায় সংগ্রামের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে থতমত স্বরে মিনমিন করলো….
” আ.. আপনি জেগে ছিলেন ?
” জেগে গেছি তোমার ঠোঁটের স্পর্শে ।
তোমাকে সুযোগ সন্ধানী বললে ভুল হবে না । আমার ঘুমের ভালোই সুযোগ নিতে পারো তুমি । জেগে থাকলে কাছে আসো না , নিজে থেকে এখনো অবধি জাগ্রত অবস্থায় একটা চুমু পর্যন্ত খাও নি । দেখে মনে হয় ভাঁজা মাছটা উল্টে খেতে জানো না । অথচ ঘুমিয়ে গেলে কত কি করো ?
” উহহহ , কি করলাম আমি ?
” এইযে চুমু খেলে ?
” চুমু খাওয়ার অধিকার রাখি আমি ।
” অধিকার তো ফলাও না ।
” এইতো ফলালাম !
” সেটা ঘুমের সুযোগে ।
ভাবছি এখন থেকে বেশি বেশি ঘুমাবো । ঘুমের বাহানায় বউয়ের অধরের পরশ তো পেতে পারবো । নতুবা সজ্ঞানে সে তো নিজে থেকে ধরা দেয় না আমায় ।
শ্যামা লাজুক হাসে ।
সংগ্রাম উদর পেঁচিয়ে নেয় ওর । নড়েচড়ে বলে শ্যামা….
” ছাড়ুন এখন ।
” যখনই ধরি তখনই ছাড়তে বলো ।
” তো আপনি যখন তখন ধরেন কেনো ?
” বউ হও যে ! বউকে ভালোবাসতে ইচ্ছে জাগে হরহামেশা , সময়ে অসময়ে ।
” সারাদিন ঘুমিয়েছেন । এখন উঠুন , পেটে কিছু পড়েছে আজ ? খিদে পায় নি ? ডাকতেও বারন করেছিলেন , তাই ডাকি নি ? সন্ধ্যার আজান পড়বে এক্ষুনি । আপনি উঠুন , আমি খাবার গরম করে নিয়ে আসছি ।
সংগ্রাম শ্বাস ফেললো । গরম শ্বাস আছড়ে পড়লো শ্যামার গলার নিকট । বললো সংগ্রাম…
” উঠবো একটা শর্তে ।
ঘুমের সুযোগে চুমু খেয়েছো । এখন আরো একটা খেতে হবে । তারপর উঠবো , নতুবা নয় । নিজেও উঠবো না । তোমাকেও উঠতে দেবো না ।
শ্যামা চোখ গোল গোল করে চায় । তৎক্ষণাৎ বলে….
” ছোট জমিদার সাহেব , উঠুন ।
” আগে আমার কথা শোনো তারপর ।
” আমি পারবো না ।
” আমিও ছাড়বো না ।
শ্যামা তোড়জোড় করলো । নাছোড়বান্দা সংগ্রাম ছাড়ছে না । ফোঁস করে শ্বাস ফেললো শ্যামা । সংগ্রাম মাথা তুলতেই টুপ করে একটা চুমু খেলো গালে । আলগা সংগ্রাম কে ঠেলে সরিয়ে উঠে বসলো । সহসা বিছানা ছেড়ে ছুটলো বাইরের দিকে ।
শব্দ করে হাসলো সংগ্রাম । উঠে বসতে বসতে গা মোড়ালো । চোখ মুখ ডলে বললো….
” লজ্জা বতী বেগম আমার । বিয়ের তো কমদিন হলো না । এবার একটু লাজুকতা কমান ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০ (২)
মাঝে কেটেছে কতগুলো দিন । দিন পেরিয়ে মাস ।
সবটা চলছে আপন গতিতে । সবাই চলছে নিজেদের মতো । মাস পেরিয়েছে । ময়নার মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজ বেশ কদিন হলো । এখন পুরোপুরি মুক্ত ময়না ।
পড়াশোনার ঝামেলা বড় ঝামেলা । এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছে ময়না । এখন আর ভয়ে ভয়ে থাকতে হয় না । কথায় কথায় আফতাবের ধমক খেতে হয় না ।
