Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭
নওরিন কবির তিশা

দীর্ঘক্ষণের জ্ঞানশূন্যতার সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে চেতনা ফিরলো মেহেসানার। হঠাৎ ওর বোধ হল ও যেন এক অতলান্ত অন্ধকার গহ্বর থেকে উঠে আসছে। চোখের পাতা দুটো মেলতেই এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হলো; অবিরাম ক্রন্দনের ফলে ফুলে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ওগুলো। নাসারন্ধ্রে এখনো কাঁচা মাটির আর আগরবাতির ঘ্রাণ লেগে আছে। মায়ের ক-ব-রের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে সে নিথর হয়ে গিয়েছিল, তার হিসেব নেই।
মেহেসানা শ্লথ নজরে চারপাশে তাকাল। ঘরের ভেতর বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে। মাহতাব সাহেব এতক্ষণ শিয়রে বসে ছিলেন, কিন্তু মেয়ের জ্ঞান ফেরার আগেই কোনো এক প্রয়োজনে উঠে বাইরে গেছেন। এখন ওর শয্যাপাশে নিঃশব্দে বসে আছে আদ্রিয়ান। ও আজ বড় দোটানায়। বাড়িতে ফোন করে কেবল এটুকু জানিয়েছে যে, জরুরি একটি কাজে ওকে শহরের বাইরে আসতে হয়েছে।

মেহেসানার বাড়িতে অবস্থানের বিষয়টি অতি সন্তর্পণে গোপন রেখেছে ও। কেননা ওর পরিবার যদি জানতে পারে মেহেসানার মা মারা গেছেন, তবে তারা সহমর্মিতা জানাতে এখনই এখানে চলে আসতে চাইবে। কিন্তু এই মুহূর্তে মেহেসানার বাড়ির যে পরিস্থিতি, তাতে কোনো নতুন মানুষের ভিড় বা বাড়তি আনুষ্ঠানিকতা আদ্রিয়ান মোটেও কাম্য মনে করছে না।
আকস্মিক মেহেসানার সামান্য নড়াচড়া টের পেয়েই সে ওর দিকে ঝুঁকে এল। মেহেসানা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ওর চোখের চাউনি তখনো ঘোরের মধ্যে। আদ্রিয়ানকে দেখেই ও পাগলের মতো ওর হাত দুটো খামচে ধরল। শুষ্ক ওষ্ঠাধর কাঁপিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,,

– আমরা আমার বাড়িতে পৌঁছে গেছি? আমি তো বিছানায়। ইস ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না? কিন্তু… কিন্তু আমি… আমি কত বাজে একটা স্বপ্ন দেখছিলাম জানেন? মনে হচ্ছিল আম্মু আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। একটা সাদা কাফনে আম্মু শুয়ে ছিল, সবাই কাঁদছিল… ওহ গড! কি ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন!
আদ্রিয়ান স্তব্ধ হয়ে রইল। মেহেসানার এই অস্বীকার করার চেষ্টা ওর হৃদয়ে র ক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। মেহেসানা এবার বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,,
– আমি এখনই আম্মুর কাছে যাব। আম্মু নিশ্চয়ই আমার জন্য শরবত বানিয়ে বসে আছে। কতক্ষণ ঘুমালাম আমি? আম্মু রাগ করবে তো!
আদ্রিয়ান ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,,
– মেহেসানা, প্লিজ শান্ত হও। নিজেকে সামলাও।
মেহেসানা আদ্রিয়ানকে সরিয়ে দিতে চাইল। উন্মদের ন্যায় আওড়ালো,,
– কেন শান্ত হব? আম্মু একা আছে। আমি গিয়ে বলব যে স্বপ্নটা কত খারাপ ছিল। সরুন তো, আমাকে যেতে দিন!
আদ্রিয়ান বিন্দুমাত্র নড়লো না, হঠাৎ মেহেসানার মনের গহীনে সেই রূঢ় সত্যটা তীরের মতো বিঁধল। জানালার ওপাশে উঠোনের সেই শূন্য খাটিয়া আর আগরবাতির অবশিষ্টাংশ ওর চোখে পড়তেই ও হিমশীতল বরফের ন্যায় জমে গেল। স্বপ্ন নয়, এটাই তবে ধ্রুব সত্য! মেহেসানা এবার বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওর শরীরটা কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে নিলে আদ্রিয়ান ক্ষিপ্র হাতে ওকে আগলে নিল। মেহেসানা আদ্রিয়ানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,,

– কেন এমন হলো মিস্টার সার্জন? আম্মু কেন কথা বলছিলো না? আমি এখন কাকে মা বলে ডাকব? আমার পৃথিবীটা কেন এক নিমেষে অন্ধকার হয়ে গেল?
আদ্রিয়ান কোনো সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পেল না। ও কেবল পরম মমতায় মেহেসানাকে নিজের বলিষ্ঠ বক্ষে জড়িয়ে ধরল। নিভৃত কোণ হতে ভেসে এলো গানের কয়েকটি কলি,,
🎶 ওই চাঁদের টিপে মন ভোলে না মা….
দোলনা দোলে মন দোলে না মা….🎶
🎶রাতের চোখে ঘুম যে নামে….
চাঁদের পাশে মেঘ যে থামে….
আমার পাশে নেই তো তুমি মা…..🎶

অপরাহ্ণের ম্লান রৌদ্রালোক নীলাভ জলরাশির বক্ষস্থলে স্বর্ণালী মায়ার বিস্তার করছে। তটরেখায় আছড়ে পড়া অবাধ্য ঊর্মিমালার ফেনিল উচ্ছ্বাসে বেলা ফুরাবার তোড়জোড়। চরাচর গ্রাস করছে সমুদ্রের আর্দ্র হিমেল হাওয়া। তৃষা আর আর্য বালুকাবেলার এক জনাকীর্ণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। সমুদ্রের রূপান্তর অবলোকন করতে করতে তৃষা নিজের গায়ের ওপর ওড়নাটা একটু টেনে নিল। হাড়কাঁপানো না হলেও এই হিমেল বাতাসে অদ্ভুত শীতলতা মিশ্রিত।
আর্য তৃষার এই সামান্য সংকুচিত হওয়াটা লক্ষ্য করল। সে নিঃশব্দে তৃষার একদম কাছে সরে এসে নিজের বলিষ্ঠ হাত দিয়ে ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। আর্যর পৌরুষ উষ্ণতায় তৃষার মনে এক পরম আশ্রয়ের আভাস দিলেও পরক্ষণেই ওর খেয়াল হলো ওরা বর্তমানে সৈকতের জনাকীর্ণ স্থানে রয়েছে। আশেপাশে অসংখ্য পর্যটকের আনাগোনা। তৃষা কিছুটা লজ্জিত হয়ে আর্যর বাহুবন্ধন থেকে সরে যেতে চাইল।
তৃষা মৃদু স্বরে বলল,

– আরেহ! ছাড়ুন তো। মানুষজন কী ভাবছে বলুন তো? সবাই ওদিকেই তাকাচ্ছে।
আর্য তৃষাকে সরতে না দিয়ে বরং বন্ধন আরও জোরালো করল। ওর অধরে সেই পরিচিত কৌতুকমাখা হাসি। তৃষার একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ও গভীর স্বরে বলল,
– লেট দেম লুক! তাতে কী হয়েছে? আমি তো আমার নিজের বউকেই আগলে রেখেছি।আর এই লোনা বাতাসে তোমার এই কাঁপুনিটুকু কমানোর রাইট তো কেবল আমারই, তাই না?
তৃষা আর্যর বুকের শক্ত আবরণে নিজেকে সঁপে দিলেও লোকলজ্জার ভয়টা তখনো কাটেনি। সে আর্যর শার্টের হাতা খামচে ধরে ফিসফিস করে বলল,,

– উফ্ ক্যাপ্টেন! আপনার এই পাবলিক ডিসপ্লে অফ অ্যাফেকশন মাঝে মাঝে আমাকে বড্ড বিব্রত করে। অন্তত টুইংকেলের কথা তো ভাবুন! ও যদি দেখে ফেলে?
আর্য তৃষার বোকা কোথায় ঠোঁটে চেপে হাসলো।পাশেই টুইংকেল তখন সাগরের ফেনা নিয়ে খেলায় মত্ত। আর্য তৃষার থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে সরাসরি ওর চোখের মণি বরাবর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল; দ্বিগুণ গাঢ় কন্ঠে বলল,
– টুইংকেল এখন ওর স্যান্ড ক্যাসেল নিয়ে ব্যস্ত। আর তাছাড়া, ও তো জানেই ওর পাপা ওর বানিকে কতটা ভালোবাসে। সো, রিল্যাক্স মাই কুইন! জাস্ট ফিল দ্য মোমেন্ট।
তৃষা লজ্জায় আর্যর বুকে মুখ লুকাল।আর্য ওর কপালে আলতো করে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দেওয়ার পরমুহুর্তেই পাশ থেকে টুইংকেলের তীক্ষ্ণ খুশির চিৎকার ভেসে এলো,
– পাপা! বানি! লুক হেয়ার! সি হোয়াট আই হ্যাভ মেড!
ওরা দুজনেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে একে অপরকে ছেড়ে দিল। ওদের থেকে হাত দুয়েক দূরে টুইংকেল বালুর এক চমৎকার দুর্গ বানিয়েছে। তৃষা আর আর্য হাত ধরাধরি করে ওর কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল।টুইংকেল গর্বিত ভঙ্গিতে ক্যাসেলটা দেখিয়ে বলল,
– দিস ইজ্য আওয়ার হাউজ! ওই দেখো বড় গেটটা, ওখান দিয়ে পাপা আসবে। আর ছোট গেট দিয়ে বানি আর আমি!
তৃষা মুগ্ধ নয়নে ক্যাসেলটার দিকে তাকিয়ে বলল,

– ওওও মাই প্রিন্সেস! আমাদের ছোট্ট বাড়িটা একদম তোমার মতোই কিউট!
আর্য পাশ থেকে টুইংকেলের বালুমাখা গালটা টেনে দিয়ে কৌতুকের সুরে বলল,
– বাট প্রিন্সেস, পাপার গেটটা বড় কেন? আমি কি খুব মোটা নাকি?
টুইংকেল খিলখিল করে হেসে উঠে আর্যর গলা জড়িয়ে ধরল,
– নো পাপা! তুমি তো সুপারহিরো, তাই তোমার এন্ট্রিটা বড় হওয়া চাই!
তৃষা আর্যর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আর্য তৃষার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো চাপ দিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
– শুনলে তো? সুপারহিরোর কুইন হওয়া কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। সো, গেট রেডি ফর মোর রোম্যান্স!
তৃষা এবার মুঠোয় থাকা আর্যর হাতের তালুতে চিমটি কাটল; আর্য মৃদু আর্তনাদ করে উঠতেই তৃষা রাগতো কণ্ঠে বললো,,

– বেশরম কোথাকার!
আর্য বাচ্চাদের মত মুখ করে বলল,
– এখানে বেশরমের কি হলো? আমি যদি একটু রোম্যান্টিক না হই তাহলে আমার টুইংকেল এর আরেকটা ভাই বোন কোথা থেকে আসবে?
তৃষা অগ্নিদৃষ্টি হেনে তাকাতেই আর্য নিষ্পাপ মুখশ্রী টুইংকেলের দিকে নিবদ্ধ করে বলল, – কি মাম্মাম তুমি চাওনা তোমার আর একটা ছোট ভাই কিংবা বোন আসুক?
তৃষা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, – ক্যাপ্টেন!
এদিকে পাপার প্রশ্নে ছোট্ট টুইংকেল বালুমাখা হাতে তালি দিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল। নীলাভ নিষ্পাপ দু’চোখে রাজ্যের কৌতূহল খেলে গেল। ও আর্যর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অতি উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলল,,
– ইয়েস পাপা! আই ওয়ান্ট আ লিটল ব্রাদার অর সিস্টার! তাহলে আমি আমার স্যান্ড ক্যাসেলের ওই ছোট গেটটা দিয়ে ওকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারব। আর আমার সব খেলনাও শেয়ার করব ওর সাথে!
টুইংকেলের এমন অকপট আবদুরে উত্তরে তৃষা যেন লজ্জায় একদম মাটির সাথে মিশে গেল। ও দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল কেউ ওদের কথা শুনে ফেলেছে কি না। ওর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই লোহিত বর্ণ ধারণ করেছে। ও দাঁতে দাঁত চেপে আর্যর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

– ক্যাপ্টেন! আপনি তো দেখছি লিমিট ক্রস করছেন। বাচ্চার সামনে এসব কী বলছেন? ওর মাথায় তো এখন ওসবই ঘুরবে!
আর্য এবার তৃষার একদম কাছে সরে এলো;টুইংকেলকে কোলে তুলে নিয়ে তৃষার কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে অত্যন্ত গভীর স্বরে বলল,,
– লুক মিসেস এহসান, ডিমান্ড কিন্তু পাবলিকের! সো, আমার কোনো দোষ নেই। আর তাছাড়া, সুপারহিরোর ফ্যামিলি কি শুধু তিনজন নিয়ে পূর্ণ হয়? অন্তত চারজন তো হওয়া চাই!
অতঃপর টুইংকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, – তাইনা প্রিন্সেস?
ছোট্ট টুইংকেল কিছু না বুঝেই বাবার সাথে সায় মেলালো,
– হুম পাপা!

– হ্যাঁ রে মেহু? তোর সাথে যে ছুয়ালডা আইছে ও কেডা তোর? মানে বুঝিসই তো এত ডাঙ্গর হইছোস প্রেমিক থাকতেই পারে!
সদ্য প্রয়াত মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এমন অপ্রাসঙ্গিক কথায় বড্ড বিস্মিত দৃষ্টিতে চাইলো মেহেসানা।ওর ছোট ফুফু শাড়ির আঁচলটা কাঁধে টেনে কৌতূহলী চোখে উত্তরের অপেক্ষা করছেন। গ্রামের মানুষের স্বভাবই এমন;শোকার্ত বাড়িতেও তারা রসদ খুঁজে বেড়ায়। মেহেসানা আমতা-আমতা করে অস্ফুট স্বরে বলল,

– ফুফু, উনি… আসলে উনি বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন, এটুকুই।
ছোট ফুফু মুখটা একটু বেঁকিয়ে বললেন,
– আরে থু কতা! বিপদের সময় তো কত মাইনষেই পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু এই ছুয়াল তোরে আগলাইয়া রাখছে দেহি নিজের জানের লাহান। চোহে-মুখে তো অন্যরকম মায়া দেহি। ক দেহি মেহু, শহরের কোনো বড় ঘরের পোলার লগে তলে তলে পিরিত করতাছস নাকি? তগো বাপ-বেটির তো আবার অনেক দেমাগ!
মেহেসানা লজ্জায় আর অপমানে কুঁকড়ে গেল। ওর মনে হলো, এই মুহূর্তেই যদি পৃথিবীটা দু’ভাগ হয়ে যেত, তবে সে তার ভেতরে লুকিয়ে পড়ত। আদ্রিয়ানের মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে ওকে জড়িয়ে ফুফু এসব কী বলছেন! ওর এমন ভাবনায় মশগুলরত অবস্থার মাঝেই পেছন থেকে ভেসে এলো ‌এক গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর,,
– সম্পর্কটা কেবল পিরিত শব্দ দিয়ে বিচার করলে বড্ড ছোট করা হবে, আন্টি।
আকস্মিক এই কণ্ঠস্বরে মেহেসানা আর জহুরা বেগম দুজনেই চমকে পেছনে তাকাল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো ‌আদ্রিয়ান ওরা তাকাতেই ও ধীর পদক্ষেপে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এসে মেহেসানার পাশে দন্ডায়মান জহুরা বেগমের দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,,

– আন্টি, সম্পর্কের অনেকগুলো স্তর থাকে যা কেবল লৌকিক চোখের চশমা দিয়ে ধরা যায় না। আজ মেহেসানা যে শোকের সাগরে ভাসছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ওর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এই অকাল কৌতূহল কি বড্ড বেমানান ঠেকছে না? মানুষ মারা গেলে বাড়িতে স্বজনরা আসে শোক ভাগ করে নিতে, কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে নয়।
জহুরা বেগম আমতা-আমতা করে বললেন,
– না মানে বাজান, আমি তো এমনেই কইলাম… গ্রামের মাইনষে তো কত কথা কয়…
আদ্রিয়ান তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে শান্ত-দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
– গ্রামের মানুষ তো অনেক কিছুই বলবে, কিন্তু আপনি তো ওর আপনজন। মানুষের কথার চেয়ে এই মুহূর্তে মেহেসানার মনের শান্তিটা কি বেশি মূল্যবান নয়? আর আমার কথা যদি বলেন, তবে জেনে রাখুন—বিপদের দিনে ছায়া হয়ে পাশে থাকাটা কেবল পিরিত নয়, ওটা মনুষ্যত্ব। সেই বোধটুকু সবার থাকে না বলেই পৃথিবীটা আজ এত জটিল। যাই হোক, আপনার হয়তো বাইরে অনেক কাজ আছে, আপনি বরং সেদিকেই নজর দিন।
আদ্রিয়ানের অকাট্য যুক্তি আর ব্যক্তিত্বের সামনে জহুরা বেগম আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর সাহস পেলেন না। গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। মেহেসানা অবাক হয়ে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা তাকে আগলে রাখার জন্য কতটা নিচে নেমে লড়াই করতে পারে, তা ভেবে ওর চোখের কোণে আবার নোনা জল চিকচিক করে উঠল। আদ্রিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে আলতো স্বরে বলল,,

– ডোন্ট ক্রাই প্লিজ!কিছু মানুষের কাজই হচ্ছে অন্যের ক্ষতস্থানে আঙুল দিয়ে খোঁচানো। আর আমার ডেজিগনেশনটা ভুলে যেও না, আমি একজন সার্জন। আমি জানি কোন ক্ষতটা ড্রেসিং করে সারাতে হয় আর কোনটাকে ইগনোর করতে হয়। সো, জাস্ট ব্রিদ!
মেহসানা চোখের পানি মুছে ধরা গলায় বলল,
– আপনি কেন ওর সামনে ওভাবে বলতে গেলেন? ও এখন সারা গ্রামে ঢোল পিটিয়ে বেড়াবে। আপনার মতো একজন রেসপেক্টেড পারসনকে নিয়ে এসব স্ক্যান্ডাল ছড়ালে আমার খারাপ লাগবে।
আদ্রিয়ান এবার এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। পকেটে হাত গুঁজে মেহসানার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
– স্ক্যান্ডাল? রিয়েলি মেহসানা? তুমি কি মনে করো আদ্রিয়ান আফজাল অন্যের গসিপে ভয় পায়?
– বাট তাও!
– জাস্ট স্টপ ইট্য, ইগনোর দেম।

সায়াহ্নয়ের সময়সীমা পেরিয়েছে বহুক্ষণ; সৈকত গ্রাস করেছে নিবিড় তমসা। আকস্মিক তন্দ্রাচ্ছন্নতা কাটিয়ে পিটপিট করে চোখ মেলল তৃষা,সঙ্গে সঙ্গে অনুভূত হলো ও আর্যর প্রশস্ত বক্ষপিঞ্জরে একদম লেপ্টে আছে। আর্যর এক হাত ওর কোমরে শক্ত করে জড়ানো, যেন ঘুমের ঘোরেও সে তার এই অমূল্য সম্পদটুকু হাতছাড়া করতে চায় না। তৃষা কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে রইল। আর্যর হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ আর ওর শরীরের সেই পরিচিত মদির ঘ্রাণে আবার নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে চাইল।

হঠাৎ সম্বিৎ ফিরতেই ও আর্যর বাহুবন্ধন থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বিধিবাম! আর্যর অবচেতন মনের সেই সুদৃঢ় বন্ধন আরও একটু নিবিড় হলো। তৃষা নড়েচড়ে উঠতেই আর্য ঘুমের ঘোরেই ওকে নিজের গায়ের সাথে আরও একটু পিষে ধরে কপালে মুখ গুজল। তৃষা অসহায় হয়ে আবার ওর বুকেই আছড়ে পড়ল।
স্মৃতির মণিকোঠায় তখন ফিরে এল কিছুক্ষণ আগের দৃশ্য। সৈকত থেকে ফেরার পর থেকেই আর্যর কপালে বিরক্তির রেখা ছিল; মৃদু মাথা যন্ত্রণায় ও যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল। তৃষা প্রথমে টুইংকেলকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করে খাইয়ে পরম মমতায় ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যখন ঘরে এল, দেখল আর্যর দুচোখ বোজা, কপালে হাত দিয়ে যন্ত্রণার উপশম খুঁজছে। তৃষা নিঃশব্দে ওর শিয়রে বসে বিলি কেটে দিতে লাগল আর্যর অবিন্যস্ত কেশরাশির মাঝে। আর্যর সেই ব্যথাতুর মুখশ্রীতে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে তৃষা কখন যে নিজের অজান্তেই ওর আশ্রয়ে তলিয়ে গিয়েছিল, তার কোনো হিসেব নেই।
আর্যর উষ্ণ নিশ্বাস তৃষার ঘাড়ের কাছে এসে বিঁধতেই ওর সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল; স্মৃতির পাতা থেকে বেরিয়ে ও ধীর স্বরে অস্ফুট কণ্ঠে বলল,

– ক্যাপ্টেন?
ওপাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ও ফের ডাকলো,,- শুনছেন?
অপরপক্ষ সম্পূর্ণ নিরব থাকায় দুষ্টু চিন্তারা এবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল ওর। ও ধীরলয়ে ওর মুখটা আর্যর একদম কাছে নিয়ে এল। আর্যর ললাটে সযত্নে লেপ্টে থাকা অবিন্যস্ত চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে নিজের ওষ্ঠাধরের এক পশলা উষ্ণ ছোঁয়া এঁকে দিল সেখানে। টুপ করে দেওয়া সেই চুমুর পর ও থমকে রইল কয়েক পল, যদি আর্য জেগে ওঠে! কিন্তু না, আর্যর প্রশান্ত মুখচ্ছবিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এবার দ্বিগুণ সাহসের সঞ্চার করে তৃষা আর্যর বন্ধ চোখের পাতায় আর গালের খাঁজে আরও দু-একটি কাঁপাকাঁপা পরশ এঁকে দিল।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৬

ব্যাস!আর না। বড্ড দুঃসাহসিক অভিযান সম্পন্ন করেছে আজ ও। ও তড়িঘড়ি উঠতে তৎপর তক্ষুনি বাঁধলো অঘটনটা। তৃষার বিক্ষিপ্ত কেশরাজ আটকে গেল আর্যর শার্টের বোতামে। সজোরে টান লাগতেই বিচ্ছিরিভাবে চোখ মুখ কুঁচকে আর্তনাদ করে উঠল তৃষা। পরক্ষণে চোখ মেলতেই বিষ্ময়ের সীমার চূর্ণ করে তাজ্জব বনে গেল ও।ওর ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে আর্যই ওর চুল টেনে ধরেছে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭ (২)