ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৬
নওরিন কবির তিশা
দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশির অবারিত বিস্তারের মাঝে নীলিমা এসে মিশেছে সমুদ্রের অতলে। ফেনিল ঊর্মিমালা অবাধ্য তটরেখায় আছড়ে পড়ে এক নিরন্তর জলতরঙ্গ সৃষ্টি করছে। দোদুল্যমান ঝাউবনের মর্মর ধ্বনি আর সমুদ্রের গম্ভীর গর্জন মিলেমিশে এক অলৌকিক সুরলহরী তুলছে বালুকাবেলায়। তপ্ত বালুকণা অস্তরবির আলোয় স্বর্ণবর্ণ ধারণ করেছে ।
ঘণ্টাখানেক আগেই তৃষা-আর্য আর টুইংকেল এসে পৌঁছেছে এই স্বপ্নিল সৈকতে। কথা ছিল এই যাত্রা হবে শুধু একজোড়া হৃদয়ের নিভৃত আলাপনের, কিন্তু ওই ছোট্ট পরীটিকে ছেড়ে আসা আর্যর পক্ষে যেমন অসম্ভব ছিল, তৃষার মাতৃত্বসুলভ হৃদয়েও তা সইত না। আর্য দ্বিধায় ছিল ঠিকই, কিন্তু তৃষাই জেদ ধরে টুইংকেলকে সঙ্গে নিয়েছে। এখন এই সমুদ্রতীরে ওরা কেবল এক দম্পতি নয়,এক পূর্ণাঙ্গ সুখী পরিবার।
বর্তমানে ওরা সমুদ্রের একদম কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক অভিজাত হোটেলের সুুইটে অবস্থান করছে। কক্ষের একপ্রান্ত জুড়ে বিশাল কাঁচের দেয়াল, যা ভেদ করে বাইরের নীল জলরাশি আর ফেনিল সমুদ্রের উদ্দাম নৃত্য স্পষ্ট দৃশ্যমান।টুইংকেল জানালার কাঁচের ওপর ছোট ছোট হাত রেখে উত্তেজনায় কাঁপছে। ও বার বার লাফিয়ে উঠে আর্যর শার্ট নিচ থেকে টেনে ধরে আধো-আধো কণ্ঠে আবদার করছে,,
– পাপা! লুক অ্যাট দ্য ওয়েভস! চলো না নিচে যাই, আমি ওই সাদা ফেনাগুলো ধরব!
আর্য আলতো হেসে টুইংকেলকে কোলে তুলে নিল। ওর নাকে নাক ঘষে আদুরে স্বরে বলল,
– নো প্রিন্সেস! এখন যাওয়া যাবে না। সান অলরেডি সেট করছে, আর এখন জোয়ারের সময়। ইটস লিটল বিট ড্যাঞ্জারাস নাউ। আমরা কাল সকালে যাব, ওকে?
টুইংকেল এবার সাহায্যপ্রার্থী হয়ে ঠোঁট উল্টে তৃষার দিকে তাকাল। তৃষা তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো ঠিক করছিল। আয়নায় আর্য আর টুইংকেলের খুনসুটি দেখে ওর অধরে এক চিলতে মায়া মাখানো হাসি ফুটে উঠল। সে এগিয়ে এসে টুইংকেলের চিবুক ছুঁয়ে বলল,,
– আরেহ, ডোন্ট বি আপসেট জান! পাপা তো ঠিকই বলছে। এখন বাইরে অনেক হাওয়া। চলো, আমরা বরং এই বড় গ্লাসটার সামনে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখি। লুক, হাউ বিউটিফুল ইট ইজ!
টুইংকেল এবার জেদ ধরে বসল,
– নো বানি! আই ওয়ান্ট টু গো নাউ! প্লিজ পাপা, জাস্ট ফর ফাইভ মিনিটস!
আর্য অসহায় ভঙ্গিতে তৃষার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– নিন ম্যাডাম, সামলান আপনার মেয়েকে! ওকে নিয়ে তো আমার রোম্যান্টিক হানিমুন এখন বেবি ডে আউট হয়ে যাচ্ছে!
তৃষা হাসতে হাসতে আর্যর হাত জড়িয়ে ধরল। আর্যর কাঁধে মাথা রেখে বাইরের রক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,,
– কাম অন ক্যাপ্টেন! এই যে আমরা তিনজন একসাথে এই বিশাল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এর চেয়ে রোমান্টিক আর কী হতে পারে বলো তো? দিস ইজ্য আওয়ার পারফেক্ট মোমেন্ট। জাস্ট ফিল দ্য ভাইব!
আর্য এক হাত দিয়ে তৃষাকে নিজের বলিষ্ঠ বক্ষে টেনে নিল আর অন্য হাতে টুইংকেলকে আগলে রাখল। জানালার ওপাশে তখন সমুদ্রের নীল জলরাশি ক্রমে অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ছে, আর্য তৃষার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বলল,,
– ইউ্য আর রাইট মাই লাভ। তোমাদের দুজনকে পাশে নিয়ে এই সাগরের গর্জন শোনাও যেন এক অপার্থিব সুখ। আই অ্যাম দ্য লাকিয়েস্ট ম্যান অন দিস ওয়ার্ল্ড!
টুইংকেল ওদের কথোপকথনের মাঝে আহ্লাদী স্বরে বলল,
– লাভ ইউ পাপা! লাভ ইউ বানি!
তৃষা টুইংকেলের কপালে গভীর স্নেহে চুম্বন এঁকে দিয়ে আদুরে স্বরে বলল,
– লাভ ই্উ্য টু জান!
আর্য এতক্ষণ মুগ্ধ নয়নে মা-মেয়ের মিষ্টি মুহূর্ত অবলোকন করছিল, কিন্তু তৃষার মুখে শুধু মেয়ের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে সে এবার অভিমানের নাটক শুরু করল। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে, কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে ও বলল,
– বাহ্! বেশ তো! শুধু নিজের মেয়ের বেলাতেই যত সব লাভ ইউ টু আর এদিকে হাজবেন্ড যে চব্বিশ ঘণ্টা আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে, তার বেলায় কোনো রিপ্লাই নেই? দিস ইজ টোটালি আনফেয়ার তৃষা!
আর্যর এমন অতিনাটকীয় কাণ্ড দেখে তৃষা নিজের হাসি সংবরণ করতে পারল না। সে আর্যর দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সুরে বলল,
– ও গড! আপনি সারাক্ষণ এমন বাচ্চাদের মতো করেন কেন বলুন তো? মাঝেমধ্যে তো আমার মনে হয় টুইংকেল আপনার চেয়ে বেশি ম্যাচিউর!
আর্য এবার তৃষার একদম কাছে সরে এসে ওর কানে ফিসফিস করে বলল,
– ম্যাচিউরিটি দিয়ে কী হবে? রোম্যান্টিক হাজবেন্ড হওয়াটাই তো আসল। আর তুমিও তো খুব ভালো করেই জানো, তোমার একটা লাভ ইউ্য শোনার জন্য আমি কতটা ব্যাকুল মাই লাভ।সো, হোয়াই সো কিপটেমি, মাই কুইন?
তৃষা এবার আর্যর মনি বরাবর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে লজ্জার আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। বাইরের সাগরের গর্জন তখন যেন ওদের হৃদয়ের স্পন্দনের সাথে তাল মেলাচ্ছে। তৃষা আর্যর শার্টের কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে নিচু স্বরে বলল,
– জানেন তো সব, তাও কেন বারবার বলাতে চান?
– কজ আমি শুনতে চাই।
– ওকে বাবা, আই লাভ ইউ টু, হ্যাপি নাউ?
– নো!
আকস্মিক আর্যর এমন গুরুতর ভাবে তৃষা ভড়কালো, বিস্মিত নয়ন জোড়া চঞ্চল হয়ে উঠল,,
– কেন?
– আমি তোমার বাপ লাগি?
তৃষা ভাষা হারিয়ে ফেলল যেন; সামান্য এইটুকু ভুলে মানুষ এতটা গম্ভীর হয়ে যায়?
– আরে ভাই!
– আমি তোমার ভাই?
– আরেহ! ওকে ওকে ,আই লাভ ইউ টু মাই ক্যাপ্টেন। এবার হ্যাপি?
আর্যর মুখটা এবার তৃপ্তির হাসিতে ভরে উঠল। ও তৃষাকে আর টুইংকেলকে আরও নিবিড় করে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিয়ে জানালার বাইরের আঁধার আচ্ছন্ন প্রকৃতির পানে চেয়ে বলল,
– নট জাস্ট হ্যাপি মাই লাভ, আই ফিল লাইক আই ওন দ্য হোল ওয়ার্ল্ড!
টুইংকেল ওদের এই রোমান্টিক আবহ বুঝতে না পেরে মাঝখান থেকে খিলখিল করে হেসে উঠে বলতে শুরু করল,
– পাপা ইজ আ বেবি! পাপা ইজ আ বেবি!
আর্য আর তৃষা দুজনেই ওর হাসিতে যোগ দিলো। পরিপূর্ণতায় ভরে উঠলো সুইটটি।
– কাল সকালেই মানে? এত দ্রুত আমি বাসায় ফিরব কি করে আব্বু? আর এখন তো রওনা দেওয়া সম্ভব না ইতিমধ্যে সন্ধ্যা ছয়টা বাজে।
মেহেসানার বিস্মিতকন্ঠ উপেক্ষা করে অপর পাশ থেকে মাহাতাব সাহেব বললেন,
– দ্রুত আসার চেষ্টা কর মা। ইমারজেন্সি, বলেই তো তোকে ফোন দিয়েছি।
– আচ্ছা,আম্মুর কিছু হয়েছে?
মেহেসানার দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কণ্ঠেই থমকালেন মাহাতাব সাহেব; ক্ষণকাল নিশ্চুপ থেকে গুরুতর কণ্ঠে বললেন,
– নাহ!
বাবার কন্ঠটা আজ ভরসাযোগ্য ঠেকলো না মেহেসানার কাছে। কোথাও যেন, কোথাও যেন সেই বরাবরের ন্যায় বিশ্বাসের স্থানটা অনুপস্থিত,
– আচ্ছা আব্বু। আমি চেষ্টা করছি আসার। তুমি আম্মুর খেয়াল রেখো। আল্লাহ হাফেজ!
বলতে দেরি সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার টুট টুট শব্দ হলো;মেহেসানা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। বাবার সংক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর ওর বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ভারি করে তুলেছে।অস্থিরতা সীমা ছাড়াতেই, মেহেসানা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিয়েই ডায়াল করল আদ্রিয়ানের নাম্বারে। রিং হওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত ওর কাছে এক একটি যুগের মতো দীর্ঘ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ক্ষণকাল বাদে ভেসে আসলো আদ্রিয়ানের কণ্ঠস্বর,
– হ্যালো?
আবেগ অবদমনে ব্যর্থ মেহেসানা কম্পিত কণ্ঠে ব্যতিব্যস্ত স্বরে বললো,,
– হ্যালো, আদ্রিয়ান? আপনি… আপনি কি একবার আসতে পারবেন? আই মিন, রাইট নাউ?
আদ্রিয়ান তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে উদ্বিগ্ন স্বরে শুধাল,
– মেহেসানা? কী হয়েছে? হোয়াই ডু ইউ সাউন্ড সো আপসেট? আর ইউ ওকে?
মেহেসানা জানালার বাইরে লোনা হাওয়ায় দোদুল্যমান পাতাবাহার বৃক্ষে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,
– আই ডোন্ট নো। আব্বু ফোন করেছিল, কিন্তু…কিন্তু আমার খুব ভয় করছে। আম্মুর কিছু হলো না তো? প্লিজ, আপনি একবার আসুন না!
আদ্রিয়ান নিজেও বেশ চিন্তিত মেহেসানার এমন কণ্ঠে; তবু ও পরিস্থিতি সামলাতে ওপাশ থেকে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-কাম ডাউন, কাম ডাউন মেহেসানা! ডোন্ট প্যানিক। আমি এখনই আসছি। জাস্ট গিভ মি টেন মিনিটস। আই অ্যাম অন মাই ওয়ে। তুমি প্যাক করা শুরু করো, যদি কাল সকালেই বেরোতে হয় তবে আমাদের মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড থাকতে হবে। ওকে? স্টে স্ট্রং, আই অ্যাম কামিং।
মিনিট দশেক অতিক্রান্ত হতেই আদ্রিয়ানের কালো রঙের গাড়িটা এসে থামল মেহেসানার ভাড়া বাসার সম্মুখে। নিস্তব্ধ নিশীথে হেডলাইটের তীব্র আলোকচ্ছটা যেন অন্ধকারকে বিদীর্ণ করছে। ওদিকে মেহেসানা ততক্ষণে কোনোমতে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছে; কিন্তু তার অবয়বের চিরাচরিত সজীবতা আজ বিলীন। চোখেমুখে এক রাশ দুশ্চিন্তার কালিমা আর ললাটে উদ্বেগের রেখা স্পষ্ট।
আদ্রিয়ান গাড়ি থেকে দ্রুত পদক্ষেপে নামতেই দেখল মেহেসানা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে তার ছোট ট্রাভেল ব্যাগ। ওর ফ্যাকাশে মুখ আর কম্পিত ওষ্ঠাধর আদ্রিয়ানের বুকে বি ষা ক্ত তীরের ন্যায় বিঁধল। সে কাছে এসে মেহেসানাকে আশ্বস্ত করতে শান্ত স্বরে বললো,,
– মেহেসানা, লুক অ্যাট মি! নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেললে চলবে না। ইটস নট দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। হয়তো অতটা সিরিয়াস কিছু হয়নি যতটা তুমি ভাবছ।
মেহেসানা ধরা গলায় উত্তর দিল,
– কীভাবে শান্ত থাকব বলতে পারেন? আব্বুর ওই কণ্ঠস্বর… আই নো হিম সো ওয়েল। হি ওয়াজ হাইডিং সামথিং ভেরি ডার্ক। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
আদ্রিয়ান ওর হাতটা নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর স্বরে বলল,
– ডোন্ট ওরি, আই অ্যাম উইথ ইউ। আমরা এখনই রওনা দিচ্ছি চলো।
মেহেসানা গাড়িতে উঠে বসতেই আদ্রিয়ান উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো। পেছনের জানালার কাঁচ দিয়ে মেহেসানা একবার সেই অন্ধকার পথের দিকে তাকাল। রাতের নিঝুম স্তব্ধতা ভেদ করে গাড়িটা দ্রুতগতিতে মহাসড়কের দিকে এগিয়ে চলছে, মেহেসানার মনের ভেতর সহস্রটা প্রশ্নের ঝড় বইছে। আদ্রিয়ান এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে মেহেসানার হিমশীতল হাতের ওপর রাখল। এক নিবিড় আশ্বাসে সে অস্ফুট স্বরে বলল,,
– জাস্ট রিল্যাক্স মেহেসানা!আশা করছি খুব দ্রুতই পৌঁছে যাব আমরা। ট্রাস্ট মি, এভরিথিং উইল বি অলরাইট।
মেহেসানা কোনো উত্তর দিল না, শুধু বড় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে মাথা এলিয়ে দিল। জানালার বাইরে দ্রুতবেগে পিছিয়ে যাওয়া সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলোয় ওর ফ্যাকাশে মুখটা বড্ড নির্জীব দেখাচ্ছে। আদ্রিয়ান ওর অস্থিরতা কমাতে মৃদু স্বরে পুনরায় শুধাল,,
– আঙ্কেল কি আর কোনো কল করেছিলেন? আই মিন, কোনো ক্লু কি দিয়েছেন যে ঠিক কী ধরণের ইমারজেন্সি?
মেহেসানা ক্লান্ত নয়নে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। ধরা গলায় বলল,
– নাহ! আব্বুর কথাগুলো কেন জানি খুব রহস্যময় ঠেকছে। আই অ্যাম ফিলিং সো হেল্পলেস!
আদ্রিয়ান ওর হাতের ওপর সামান্য চাপ দিয়ে অভয় দিয়ে বলল,,
– ডোন্ট বি সো নেগেটিভ! আমি তো তোমার সাথে আছি। মাঝপথে কোনো ক্যাফে খোলা থাকলে আমরা কফি ব্রেক নেব। তোমার ব্রেইনকে একটু রেস্ট দেওয়া দরকার। জাস্ট ট্রাই টু ক্লোজ ইওর আইজ ফর আ হোয়াইল।
ভোরের আলো ফুটেছে বেশ খানিকক্ষণ।সৈকতের বালুকাবেলা এখন অনেকটা শান্ত, কেবল দু-একজন প্রাতঃভ্রমণকারীর পদচিহ্ন আঁকা পড়ছে সেখানে। তৃষা, আর্য আর টুইংকেল;তিনজনেই এখন হোটেলের নিচে সমুদ্রের কাছাকাছি এক ছিমছাম ক্যাফেতে বসেছে। ঝাউবনের ফাঁক দিয়ে আসা ভোরের বাতাস তৃষার খোলা চুলে বিলি কাটতে তৎপর।
আর্যর পরনে হালকা নীল রঙের লিনেন শার্ট চোখে সানগ্লাস। টুইংকেলকে নিজের কোলে বসিয়ে ও সযত্নে ফ্রেঞ্চ টোস্ট খাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে টুইংকেলের মন পড়ে আছে বালুকাবেলায় আছড়ে পড়া সেই ফেনিল ঢেউগুলোতে। ও ছটফট করতে করতে বলল,
-পাপা, ফিনিশ ফাস্ট! আমি ওই স্যান্ড ক্যাসেল বানাবো, লুক! ওই বাচ্চাটা বানাচ্ছে!
আর্য হেসে টুইংকেলের গাল টিপে দিয়ে বলল,
– ওয়েট প্রিন্সেস! আগে ব্রেকফাস্ট শেষ করো। উই নিড এনার্জি টু বিল্ড আ বিগ ক্যাসেল, রাইট? বানিকে দেখো, ও কত লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাচ্ছে!
তৃষা তখন হাতে কফির মগ নিয়ে সমুদ্রের দিগন্তরেখার দিকে আনমনে চেয়েছিল। আর্যর কথা শুনে ও মৃদু হেসে কফিতে একটা চুমুক দিল। তৃষা আর্যর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ স্বরে বলল,
– জানেন, এই সময়টা কত পিসফুল! মনে হচ্ছে পৃথিবীটা জাস্ট থমকে গেছে আমাদের জন্য। থ্যাংক ইউ্য ক্যাপ্টেন, আমাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য।
আর্য তৃষার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
– তোমাকে খুশি দেখতে পাওয়াটাই তো আমার মেইন গোল, মাই লাভ। আর এই সমুদ্র? এটা তো জাস্ট একটা ব্যাকড্রপ। আসল বিউটি তো আমার সামনেই বসে আছে।
তৃষা লজ্জায় একটু ইতস্তত করে কফির মগে মনোযোগ দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল,
– ওহ কাম অন! সবার সামনে এমন ফ্লার্ট করবেন না তো। বাই দ্য ওয়ে, আজ কিন্তু আমি টুইংকেলকে নিয়ে ওয়াটার বাইক রাইড দেব। ইউ আর নট ইনভাইটেড!
আর্য এবার কৌতুকের সুরে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
– ওহ রিয়ালি? ক্যাপ্টেনকে বাদ দিয়ে ওয়াটার বাইক? ইটস লাইক হার্ট ছাড়া বডি! দেখবে, মাঝ সমুদ্রে গিয়ে আমাকেই মিস করবে। সো, বেটার হয় আমাদের তিনজনকেই একসাথে ইনভাইট করলে!
টুইংকেল এবার দু-হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল,
– ইয়েস! অল থ্রি! পাপা, বানি এন্ড ম্যি!
তৃষা হেসে ফেলল। আর্যর ওর হাতটা টেবিলের ওপর নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো চাপ দিল। তৃষা চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আর্য বন্ধন আরো জোরালো করে অগোচরে চোখ টিপ দিল ওকে।
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ন’টা ছুঁইছুঁই। আদ্রিয়ানের গাড়িটা মেঠোপথের একদম শেষপ্রান্তে এসে থমকে দাঁড়াল। সামনে গলিটা এতটাই সংকীর্ণ যে চাকা ঘোরানোর উপায় নেই। আদ্রিয়ান ইঞ্জিন বন্ধ করতেই এক গভীর নিস্তব্ধতা যেন ওদের চারপাশকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। যান্ত্রিক পদক্ষেপে গাড়ি থেকে নামলো মেহেসানা। অতঃপর আদ্রিয়ানের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে শুধু বলল,
– আমার পিছু পিছু আসুন।
ব্যাস আর কোন বাক্যব্যয় না করে ও দ্রুত পদক্ষেপে এগোতে শুরু করলো।গলি পথ ধরে এগোনোর সময় মেহেসানা দেখল, রাস্তার মোড়ের পরিচিত মুখগুলো করুন দৃষ্টি মেলে ওর দিকে তাকাচ্ছে। তবে সে দৃষ্টি উপেক্ষা করেই মেহেসানা যত দ্রুত সম্ভব বাড়ির দিকে এগোলো।
ও দ্রুত পায়ে সরু গলিটা পেরিয়ে পরিচিত উঠোনে এসে দাঁড়াতেই ওর বুকের ভেতরটা যেন আছড়ে ভাঙল। টিন শেডের দোতলা বাড়ির বিশাল উঠোনটাতে তিল ধারনের জায়গা নেই; আত্মীয়স্বজনের উপচে পড়া ভিড় ঠেলেঠুলে কোনো মতে এগোলো মেহেসানা,ওর প্রতিটি কদম যেন সহস্র মণ ওজনের পাথরের ন্যায় ভারী হয়েছে আজ।
পর্দার ওপারে উঠোনের মাঝখানে রাখা কাঠের খাটিয়াটি নজরে আসতেই মেহেসানা থমকে দাঁড়াল। ওর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো। সাদা কা ফ নের কাপড়ে মোড়ানো একটি নিথর দেহ শায়িত সেথায়। মুখমণ্ডলটুকু কেবল উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সেই চিরচেনা প্রশান্ত মুখ, যার আঁচলে মেহেসানা একদিন সমস্ত আবদার আর নিশ্চিন্তির আশ্রয় খুঁজে পেত।
মেহেসানা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মস্তিষ্ক শূন্য, ও কোন মতে টলমল পায়ে খাটিয়ার পাশে গিয়ে বসে পড়লো। কম্পিত হাত বাড়িয়ে মায়ের শীতল কপালে স্পর্শ করে বলল,,
– আম্মু? এই আম্মু? তুমি এখানে শুয়ে আছো কেনো?
অতঃপর ও একবার চারিধারের মানুষের দিকে তাকিয়ে বলল,,
– আচ্ছা আমার আম্মু এখানে শোয়া কেন? আর আমার আম্মু তো অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠে। এতক্ষণ তো ঘুমায় না। তাহলে আজ ওঠেনি কেন?
ও মায়ের মৃ:তদেহ পাগলের মতো ঝাঁকাতে শুরু করল,, – ও আম্মু! উঠবা না? দেখো আমি আসছি তো। শরবত বানিয়ে দিবা না আমায়? আম্মু?
মাহতাব সাহেব ততক্ষণে মেয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, উনি কাঁধে হাত রাখতেই মেহেসানা র:ক্তলাল দৃষ্টি হেনে তার দিকে তাকিয়ে বলল,,
– আব্বু? তুমি না বললে আম্মু ঠিক আছে? তাহলে আম্মু এখনো উঠেনি কেন? দেখেছো, এজন্যই বলতাম তুমি অন্তত আম্মুর খেয়াল রাখো। ঠিক মতো ঔষধ গুলো দাও।নিশ্চিত আবার দুর্বল হয়ে পড়েছে।
মেয়ের আর্তনাদে শুষ্ক কপোল গড়িয়ে দু ফোঁটা অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ল মাহাতাব সাহেবের, তিনি মেয়েকে উঠাতে গিয়েও ব্যর্থ হলেন। মেহেসানা ধুলোবালির মধ্যেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল, পুনরায় মায়ের সমগ্র মুখে হাত বুলিয়ে বলল,,
– এই আম্মু? উঠছো না কেন?
মেহেসানা উন্মত্তের মতো পুনরায় মায়ের নিথর দেহটা ঝাঁকাতে শুরু করতেই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন মুরুব্বি এগিয়ে এলেন। তিনি মেহেসানার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন। অভিজ্ঞ চোখ ভিজে আসতে চাইলেও তিনি কণ্ঠস্বর কঠোর করে বললেন,
– থামো মা! এভাবে মুদ্দারকে নাড়াতে নেই, ওদের শরীরে বড় ব্যথা লাগে। ছেড়ে দাও ওকে।
মেহেসানা শূন্য চোখে তাকিয়ে বলল,
– ব্যথা লাগবে কেন? আম্মু তো ঘুমোচ্ছে! ও তো কিচ্ছু বলছে না!
মুরুব্বি এবার সইতে না পেরে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
– পাগলামি করিস না মেহেসানা! তুই কি বুঝতে পারছিস না তোর মা আর নেই? তোর মা মা রা গেছে! ও আর কোনোদিন চোখ মেলবে না।
‘মা রা গেছে’—দুটো শব্দ তপ্ত সিসার মতো মেহেসানার কানে গিয়ে বিঁধল। ওর চারপাশের পৃথিবীটা হঠাৎ কেমন যেন দুলে উঠল। চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। সে অসংলগ্ন পায়ে উঠে দাঁড়াল। ভিড়ের মধ্য দিয়ে চোখ গেল গেটের ওপাশে; পর্দার আড়ালে আবছাভাবে আদ্রিয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
মুহূর্তেই মেহেসানা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক উন্মাদের মতো দৌড়ে গেল আদ্রিয়ানের কাছে। আদ্রিয়ান তখন বাইরে থাকা লোকজনের কাছে সব শুনে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মেহেসানা ওর শার্টের হাতা খামচে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
– ডাক্তার সাহেব! এই যে ডাক্তার সাহেব শুনুন! আপনি তো মস্ত বড় ডাক্তার, আপনি তো অনেক মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচিয়ে তোলেন। আমার আম্মুর কী হয়েছে একবার দেখুন না!
আদ্রিয়ান স্তব্ধ হয়ে মেহেসানার র-ক্তলাল-অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেসানা ওকে টানতে টানতে উঠোনের দিকে নিতে চাইল আর বলতে লাগল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৫
– সবাই বলছে আম্মু নাকি মা রা গেছে! ওরা কিচ্ছু জানে না। আপনি চলুন, আম্মুকে একটা ইনজেকশন দিন কিংবা অক্সিজেন দিন। ও তো এখনই জেগে উঠবে! আপনি সুস্থ করে দিন না ওকে, প্লিজ!
মেহেসানার এই বুকফাটা আহাজারিতে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে এল। আদ্রিয়ান কোনো কথা বলতে পারল না, কেবল য ন্ত্র ণা কাতর চোখে মেহেসানাকে দু-হাতে আগলে ধরার চেষ্টা করল। মেহেসানা আদ্রিয়ানের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
– আপনি ডাক্তার হয়েও কেন চুপ করে আছেন? একবার বলুন যে ওরা মিথ্যা বলছে! একবার বলুন আম্মু এখনই চোখ মেলবে!
