ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭ (২)
নওরিন কবির তিশা
বিস্ময়ে বিমূঢ় তৃষা পলক ফেলতেও ভুলে গিয়েছে যেনো; ও বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে আওড়ালো,
– আপনি ঘুমান নি?
আর্য কোনোরূপ প্রত্যুত্তর করলো না,ঝটকা মেরে তৃষাকে বক্ষস্থল বরাবর ফেলে ওর অবিন্যস্ত কেশরাজে মুখ গুঁজে ঘোরাচ্ছন্ন কন্ঠে বলল,,
– সাহস দেখছি বড্ড বেড়েছে ম্যাডাম!
আর্যর এহেন কাণ্ডে মুহূর্তের মাঝে পানি শুকিয়ে তপ্ত মরুদ্যানে পরিণত হলো তৃষার হৃদকুঠুরিুঠুরি,ও আমতা আমতা করে বলল,,
– আ–আসলে!
ওকে মাঝপথে থামিয়ে আর্য বলল,, – ঘুমিয়েও ইদানীং পুরুষ জাতি সেফ না দেখছি।
তৃষার সমস্ত সংকোচ দূরীভূত করতে আর্যর এই কথাটাই যথেষ্ট ছিল।মুহূর্তেই লজ্জিত আনন বদলে ফুঁসে উঠে ও বলল,,
– নাটক করেন কেনো এতো হ্যাঁ? একটুখানি চুমুই তো খেয়েছি। তাতে কি হয়েছে হ্যাঁ?খসে পড়েছে আপনার মুখ?কামড়ে খেয়েছি একদম?
ক্রোধিত কণ্ঠে কথাগুলো শেষ করেই জিভ কাটল তৃষা। ছিঃ বলতে বলতে কতদূর বলে ফেলেছে! হায় খোদা! ও আড়চোখে একঝলক আর্যর পানে চাইলো।নির্লজ্জ লোকটা তখন ঠোঁট চেপে মিটিমিটি হাসছে। তৃষার মনে হলো ভূমি দুখণ্ড হোক আর ও তার গহ্বরে হারিয়ে যাক!লজ্জায় রীতিমতো লজ্জাবতী গাছের ন্যায় নুইয়ে পড়েছে ও। তৎক্ষণাৎ ভেসে এলো আর্যর কণ্ঠ,,
– উম্ম…কামড়ে টেস্ট করার ইচ্ছা আছে নাকি মিসেস এহসান? থাকলে পূরণ করতে পারেন!আমার কিন্তু কোনো আপত্তি নেই!
ব্যাস তৃষার লজ্জা আর দেখে কে?এতক্ষণ যাও এইখানে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছিল আর্যর এমন কথায় সেটাও দুষ্কর হলো মুহূর্তেই। ও দ্রুত পদক্ষেপে বিছানা ছেড়ে উঠতে যেতেই সহসা ওর ওড়নার আঁচল বন্দি হলো আর্যর হাতের মুঠোয়। গলার ধরে ওড়নার টান অনুভূত হতেই তড়িৎ বেগে পিছু ফিরল তৃষা।আর্যর দুষ্টু দৃষ্টি তখনও ওর দিকেই নিবদ্ধ। তৃষা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,,
– ওড়না ধরেছেন কেনো?ছাড়ুন বলছি!
আর্য ওড়না ছাড়ল তো না-ই, বরং হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় করে এক অতর্কিত হেঁচকা টান মারল। অপ্রস্তুত তৃষা মুহূর্তেই নিজের শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ল আর্যর প্রশস্ত ও তপ্ত বক্ষপটের ওপর। হৃদস্পন্দন যেন একলাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল তৃষার। আর্য অধর কোনে বাঁকা হাসি রেখা ফুটিয়ে গভীর, মাদকতাময় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
– এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো হাত বাড়াইনি, ম্যাডাম! ইয়্যু কমিটেড আ ক্রাইম, অ্যান্ড নাউ ইউ হ্যাভ টু পে দ্য পেনাল্টি! এত বড় একটা ভুল করে পার পেয়ে যাবে ভেবেছ?
আর্যর ওষ্ঠাধরের এত কাছের সান্নিধ্য আর ওর গভীর কণ্ঠস্বরে তৃষার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ও ভয়ার্ত, কম্পিত কণ্ঠে শুধু আওড়াতে পারল,
– ক-কী পেনাল্টি?
তৃষাকে আর কোনো কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না আর্য। এক ঝটকায় তৃষার কাঁধের নরম ওড়নাটা টেনে এনে ঢেকে দিল দুজনের মুখাবয়ব। হালকা সুতি ওড়নার মায়াবী অন্তরালে, বাইরের পৃথিবীর আলো-আঁধারিকে আড়াল করে, আর্য আলতো করে নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দিল তৃষার কাঁপতে থাকা ওষ্ঠপুটে। এক লহমায় থমকে গেল চারপাশের সমস্ত কোলাহল, আর বসন্তের এক ঝোড়ো হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল তৃষার সমস্ত অস্তিত্বকে।
জহুরা বেগম ধুপধাপ পা ফেলে উঠোন পেরিয়ে সোজা মাহতাব সাহেবের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। রাগে আর অপমানে তাঁর নাক-মুখ র’ক্ত বর্ণ ধারণ করেছে। ঘরের তক্তপোশে মাহতাব সাহেব স্থবির হয়ে বসে ছিলেন, পাশে পাড়ার আরও দু-তিনজন মুরুব্বি। জহুরা বেগম মাহতাব সাহেবের উদ্দেশ্যে গলা চড়িয়ে বলতে শুরু করলেন,
– ভাইজান, তোমরা তো দেহি কানে তুলা দিয়া আছ! ঘরে যে আগুনের কুন্ডলী পালতাছ, হেই খবর রাহো? মাইয়া তো শহরের পোলার লগে একদম মাখামাখি শুরু করছে। আমি কইতে গেলাম বিহিত, আর ওই ছোড়া আমারে ধমকায়! গ্রামে কি বিচার-আচার বইলা কিছু নাই?
মাহতাব সাহেব ফ্যাকাসে চোখে তাকালেন। পাড়ার মাতব্বর রহমত মিঞা খুকখুক করে কেশে বললেন,
– ঘটনা কি মাহতাব? মাইয়াডারে নিয়া দেহি পাঁচ কথা শুরু হইছে। ওই পোলার লগে মেহুর সম্পর্কটা কি? গেরামের মানুষ কিন্তু কানাঘুষা করতাছে।
উনাদের কথোপকথন এর মাঝে জহুরা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, তাঁর চোখে-মুখে চাণক্য নীতি। ভেতরের আসরে যা রটানোর তা তো রটিয়েই এসেছেন, কিন্তু তাতেও যেন তাঁর তৃপ্তি মেলেনি। এমন সুস্বাদু খবর কি আর চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখা সাজে? উঠোনের এক পাশে জটলা পাকিয়ে থাকা মহিলাদের কানে কানে তিনি দিতে থাকলেন সেই খবরের রসদ। ফল মিলল হাতেনাতে; ভাদ্রের বাতাসে দাবানলের ন্যায় কথাগুলো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল সারা পাড়ায়।
ধীরে ধীরে শান্ত উঠোনটি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। থমথমে নিস্তব্ধতার মাঝে সৃষ্টি হলো এক রুক্ষ গ্রাম্য সালিশের আবহ। কিছুক্ষণ বাদে সেখানে ডাক পড়ল আদ্রিয়ান আর মেহসানার। মেহসানা তখনো শোকের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। সদ্য মাতৃহারা মেয়ের দুচোখের শ্রাবণধারা যেন বাঁধ মানছে না; ডুকরে ওঠা কান্নায় ওর শীর্ণ শরীরটা কেঁপে উঠছে বারবার। ও টলমল পায়ে মাঝ উঠোনে এসে দাঁড়াতেই উপস্থিত নারী-পুরুষের বাঁকা বিদ্রূপাত্মক চাউনিগুলো তীরের ফলার মতো ওর বুক ফুঁড়ে দিতে লাগল। এক অসহ্য অবজ্ঞা আর কৌতূহল চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল ওকে। আদ্রিয়ানের উদ্দেশ্যে রহমত মাতব্বর গম্ভীর স্বরে বললেন,
– ক দেহি বাজান, তুমি কেডা? আমাগো মেহুর লগে তোমার পিরিত কতদিনের?
মেহসানা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে উঠল। এই অপমান সহ্য করার শক্তি ফুরিয়েছে ওর। আদ্রিয়ান ওর সামনে এক পা এগিয়ে এসে ঢাল হয়ে দাঁড়াল। ওর দুচোখে আগুনের হলকা, কিন্তু কণ্ঠে অসীম গাম্ভীর্য; দৃঢ় স্বরে ও বলল,
– আপনাদের এই জাস্টিস সিস্টেমের ধরন দেখে আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি। একজন মানুষ তার মাকে হারিয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, তার সেই শোককে সম্মান না জানিয়ে আপনারা বসেছেন তথাকথিত চরিত্র বিচার করতে? ইজ দিস ইয়োর হিউম্যানিটি?
মাতব্বর এবার চোখ রাঙালেন,
– শহরের বুলি রাইখা কও, মেহুর লগে তোমার সম্পর্ক কি?
আদ্রিয়ান মাহতাব সাহেবের দিকে তাকাল। তারপর সোজা মাতব্বরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
– সম্পর্কটা হলো সম্মানের। আমি মেহসানাকে পছন্দ করি এবং ওকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেতে চাই। আপনাদের ভাষায় যদি সেটাকে অপরাধ মনে হয়, তবে সেই দায় আমার। বাট রিমেম্বার, মেহসানা ইজ্য মাই রেসপন্সিবিলিটি নাও। আমি ওর সম্মানে কাউকে আঁচড় কাটতে দেব না।
জহুরা বেগম ফোঁস করে উঠলেন,
– পছন্দ করো মানেই কি সব অইয়া গেল? আমরা কি মইরা গেছি? বিয়া ছাড়া এক লগে এই গেরামে থাকা চলব না।
আদ্রিয়ান এবার মাহতাব সাহেবের হাত ধরল। বিনীত তবে অটল স্বরে বলল,
– মাহতাব আঙ্কেল, আই অ্যাম সরি যে পরিস্থিতির কারণে আমাকে এভাবে কথা বলতে হচ্ছে। আমি আমার পরিবারকে সব জানাব। কিন্তু তার আগে, আমার মেহসানাকে একটা পরিচয় দেওয়া দরকার যাতে এই অহেতুক অপমান থেকে ও মুক্তি পায়।
উঠোনে তখন গুঞ্জন শুরু হলো। মাতব্বর কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
– শোন মাহতাব, মাইয়াডারে আর বদনামে রাইখো না। পোলায় যেহেতু দায়িত্ব নিবার চায়, তাইলে এইখানেই কথা পাকাপাকি হোক। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক কইরা ফালামু।
মাহতাব সাহেব কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেলেও সমাজের এই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যেন পাথর হয়ে গেছেন। অন্যদিকে মেহসানা তখনো ঘোরের মধ্যে। ওর চারপাশের পৃথিবীটা যেন ঝাপসা হয়ে এসেছে; মানুষের উচ্চবাচ্য, ফিসফাস সবই ওর কানে পৌঁছাচ্ছে বহুদূর থেকে আসা কোনো অস্পষ্ট গুঞ্জনের মতো। ও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেবল আদ্রিয়ানের দিকে। ওর সেই চাউনিতে যেমন ছিল একরাশ প্রশ্ন, তেমনি ছিল অবুঝ এক আশ্রয় খোঁজার প্রবল আকুলতা।
দরিয়াপুর গ্রাস করেছে নিবিড় তিমির। সুবর্ণপুর গ্রামের পাশ্ববর্তী বিমলা নদীর কূল ঘেঁষে দাঁড়ানো গ্রামখানি।ভাদ্রে গুমোট আকাশের বুক চিরে কিছুক্ষণ আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল; এখনো দূর দিগন্তে মেঘের গুরুগুরু গর্জন সেই বৃষ্টির রেশটুকুই জানান দিয়ে যাচ্ছে। সিক্ত মাটির সোঁদা গন্ধে ভারী হয়ে আছে চারপাশ। এরই মাঝে সম্পন্ন হয়ে গেল আদ্রিয়ান ও মেহসানার এক অনাড়ম্বর পরিণয়। লৌকিকতার কোলাহল শান্ত হতেই এক গাঢ় নিস্তব্ধতা এসে গ্রাস করেছে সমস্ত পরিবেশকে; যেন প্রকৃতিও এই অসময়ের মিলনের সাক্ষী হতে ক্ষণকাল মৌনব্রত পালন করছে।
নিস্তব্ধ কক্ষে বিছানার এক নিভৃত কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে মেহেসানা। আকস্মিক দরজার কপাট খোলার মৃদু শব্দ হলো। মেহসানা সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখল আদ্রিয়ান ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। আদ্রিয়ানকে দেখা মাত্রই ওর সমস্ত অস্তিত্ব যেন কুঁকড়ে গেল; লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় ও মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল।
আদ্রিয়ান মেহসানার এই সংকুচিত অবস্থাটা লক্ষ্য করল। ও ঘরের আলোটা একটু কমিয়ে দিয়ে মেহসানার থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে বসল। মেহসানা ধরা গলায়, নিচু স্বরে আওড়াল,
– আপনি… আপনি কেন এমনটা করলেন? আপনার ফ্যামিলি কথা মনে নাই? ওনারা যদি আমাকে মেনে না নেন? আর এই অসময়ে… আমার নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে।
আদ্রিয়ান গভীর দৃষ্টি মেহসানার পানে নিবদ্ধ করলো। ওর চিরচেনা সেই কৌতুকমাখা দৃষ্টি আজ বড্ড শান্ত। ও ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
– রিলাক্স মেহসানা! জাস্ট ব্রিদ। আমার ফ্যামিলির চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। আই নো হাউ টু হ্যান্ডেল মাই প্যারেন্টস। আর তুমি কি মনে করো আদ্রিয়ান আফজাল কোনো ঠুনকো আবেগে এই ডিসিশন নিয়েছে? ইট ওয়াজ আ নেসেসিটি টু প্রটেক্ট ইওর ডিগনিটি। সো, ডোন্ট গিল্ট-ট্রিপ ইয়োরসেলফ।
আদ্রিয়ানের অভয়বাণীতে মেহসানার ভেতরের জমাট বাঁধা ভয়টা কিছুটা হালকা হলো। ও চোখের কোণ মুছে আদ্রিয়ানের দিকে একপলক তাকিয়ে ম্লান হাসল। আদ্রিয়ান এবার মুচকি হেসে নিজের স্বভাবজাত ভঙ্গিতে ফিরে এল। ও শার্টের হাতা দুটো গুটিয়ে মেহসানার একদম চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বলল,
– ব্যাস! অনেক হয়েছে ইমোশনাল ড্রামা। এখন ওই করুণ মুখটা বন্ধ করুন তো মিসেস আদ্রিয়ান! এক দিনে এত সহ্য করা আমার পক্ষে ইমপসিবল। আমি তো ভেবেছিলাম বিয়ের পর আপনি হয়তো আমাকে সাউন্ডবক্স স্টাইলে থ্যাংকস দেবেন, কিন্তু আপনি তো দেখছি পুরো বোবা হয়ে গেলেন!
মেহসানা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আদ্রিয়ানের এই হঠাৎ পাল্টে যাওয়া মেজাজ ওর ভেতরের জড়তা ভেঙে দিল। ও ত্যাড়া স্বরে বলল,
– এই যে মিস্টার! আপনি কি ভাবছেন বিয়ে হয়েছে বলে আমি আপনার ওই ফালতু কথাগুলো সহ্য করব? সাউন্ডবক্স কি না সেটা কাল সকালেই টের পাবেন। আর ল্যাম্পপোস্টদের থ্যাংকস দেওয়ার কোনো নিয়ম আমার জানা নেই!
আদ্রিয়ান এবার অট্টহাসি হেসে উঠল। ও চেয়ারটা টেনে মেহসানার আরও একটু কাছে এসে বলল,
– ওয়াও! ব্যাক টু ফর্ম! এই তো আমার চেনা মেহসানা। লিসেন, এই ল্যাম্পপোস্ট এখন তোমার অফিশিয়াল গার্ডিয়ান। সো, নেক্সট টাইম আমাকে হুমকি দেওয়ার আগে ভেবেচিন্তে দিও। আই অ্যাম আ সার্জন, মনে আছে তো? হার্ট কাটাকাটি করা আমার বাঁ হাতের কাজ!
মেহসানা এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। আদ্রিয়ানের এই অদ্ভুত রসবোধ ওর বিষণ্ণ মনে এক পশলা বৃষ্টির হয়ে নামলো। ও মৃদুস্বরে বলল,
– আপনি একটা আস্ত ইডিয়ট!
আদ্রিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে গভীর স্বরে বলল,
– অ্যান্ড দিস ইডিয়ট ইজ অলওয়েজ দেয়ার ফর ইয়্যু,ম্যাম। অলওয়েজ!
কেটে গেছে বেশ খানিকক্ষণ। ঘরের স্তব্ধতা ছাপিয়ে কেবল ঘড়ির কাঁটার মৃদু টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর্যর উন্মুক্ত প্রশস্ত বক্ষপটের ওপর এখনো মাথা রেখে শুয়ে আছে তৃষা। তার এলোমেলো চুলের গুচ্ছ আর্যর গলার কাছে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, কিন্তু কারও মধ্যেই যেন নড়ার বিন্দুমাত্র তাগিদ নেই। আর্যর এক হাত তৃষার পিঠের ওপর আলতো করে রাখা, যেন এক অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়ে ওকে আগলে রেখেছে।
তৃষা যখন ঘোর কাটিয়ে সন্তর্পণে হাতের বাঁধন শিথিল করে উঠতে চাইল, ঠিক তখনই আর্যর আঙুলগুলো ওর চিবুক ছুঁয়ে দিল। আর্যর চোখের অতল গভীরে তৃষা যেন নিজেরই এক প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেল যেখানে শাসনের চেয়ে প্রশ্রয়ই বেশি। আর্য ঈষৎ বিরক্ত কন্ঠে বলল,
– কি হয়েছে?
তৃষা আরক্ত মুখে মিনমিন করে বলল,- সরুন!
আর্য তৃষার চিবুক ধরা হাতটা সরাল না, বরং আরও একটু নিবিড় করে ওকে নিজের দিকে টেনে নিল। ওর চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাউনি তৃষার হৃদস্পন্দনকে যেন নতুন করে অস্থির করে তুলছে। তৃষা কোনোমতে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
– ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? কি হয়েছে বলুন তো? আপনার মতলবটা তো ভালো ঠেকছে না!
আর্যর ওষ্ঠাধরে তখন এক অদ্ভুত বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। ও তৃষার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। ওর তপ্ত নিশ্বাস তৃষার ঘাড়ের কাছে আছড়ে পড়তেই তৃষা চোখ বুজে ফেলল। আর্য নেশাক্ত কণ্ঠে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল,,,
🎶ন্যাশে সি চড় গয়ি ওয়্যে,
কুড়ি ন্যাশে সি চড় গয়ি…..🎶
🎶পতঙ্গ সি লড় গয়ি ওয়্যে,
কুড়ি পতঙ্গ সি লড় গয়ি…🎶
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭
আর্যর কণ্ঠের সেই মাদকতা আর গানের কলিগুলো তৃষার কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ওর সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে এল। ও কি ভাববে আর কি বলবে, তা যেন মাথা থেকে মুহূর্তেই উবে গেল। এই গম্ভীর লোকটার গলায় এমন চটুল গানের সুর তৃষাকে যেন এক ঘোরের জগতে নিয়ে গেল। ও শুধু অনুভব করল, ওড়নার সেই হালকা আবছায়া পর্দাটা আর্যর হাতের টানে আবারও ওদের ঘিরে ধরেছে, আর বসন্তের ঝোড়ো হাওয়ার মতো আর্যর সান্নিধ্য ওকে এক অজানা নেশায় ডুবিয়ে দিচ্ছে।

Part48 please