Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩০

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩০

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩০
অনামিকা তাহসিন রোজা

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই নিজের কোঁমড়ে নিদারুণ ব্যাথা অনুভব করে শ্রাবণ। বেশ ভালোই ব্যাথা হয়েছে। বেকায়দায় শুলে তো হবেই। যতটাই বিরক্তি নিয়ে ঘুম থেকে শ্রাবণ উঠল, ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে সেই বিরক্তি উড়ে গিয়ে ভালো লাগায় পরিণত হলো। সদ্য গোসল সেড়ে আসা স্নিগ্ধ রূপের ধারাকে দেখে চোখ যেন থমকে গেল তার। মেয়েটা চুলে টাওয়াল পেঁচিয়ে কোঁমড়ে শাড়ির আঁচল কুঁচে রেখে ব্যস্ত হাতে ডাইনিং টেবিল মুছছে। দৃশ্যটা এত সুন্দর কেন? শ্রাবণ পা চলল আপনাআপনি। সে নিচে চলে এলো মিনিটের মধ্যেই। ধারা খেয়াল করেনি। তাই নিজের মত করে কাজ করতে থাকল। ছোট ছোট চুলগুলো কপালে এলে এক হাতে সেটা সরিয়ে দিল দারুণ ভঙ্গিতে। ইশ! শ্রাবণ আবারো প্রেমে পড়ল। কি স্নিগ্ধ লাগছে তার বউকে! আচ্ছা এই স্নিগ্ধতা সে আগে কেনো লক্ষ্য করেনি। আগে কখনো তো নজরে আসেনি। নাকি ভালোবাসলেই এসব নজরে আসে?
হুট করে ধারা শ্রাবণকে হাবার মত হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। এরপর গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের মত কাজ করা শুরু করে। মনে মনে নিজেকে বলে, কথা বলা যাবে না। একদম কথা বলব না। কিন্তু এদিকে শ্রাবণ গুটিগুটি পায়ে এসে ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়াল। মিনমিন করে বলল,

—” কী করছো?”
নিতান্তই আজগুবি প্রশ্ন। কথা বলার অযুহাতের উৎস তা বোঝা যায়। ধারা জবাব না দিয়ে অন্য দিকে ফিরে গেল। শ্রাবণ এবারে নিজের দিকে একবার তাকিয়ে বিরক্ত হলো। তাকে কি দেখতে খারাপ লাগছে? সে দ্রুত গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। নতুন অন্য একটা টি শার্ট পড়ে চুল হাত দিয়ে সেট করতে করতে এসে আবারো আগের মত ধারার পিছে দাঁড়াল।
ধারা ডিম ভাজি করছিল, সেটা প্লেটে উঠিয়ে পেছনে ঘুরে শ্রাবণকে থেকে আঁতকে উঠে। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো ডাইনিং টেবিলে যায়। শ্রাবণ আবারো তার কাছে গিয়ে মিষ্টি করে কথা বলার চেষ্টা করে,

—” তুমি এত সকালে গোসল করলে কেন?”
ধারার মন চাইলো পাশে থাকা ছুরিটা শ্রাবণের হাতে তুলে দিয়ে বলতে, আপনি মে’রেই ফেলুন আমাকে। নিন। ছুরি চালান।
নিজ ভাবনাতে নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধারা। এরপর শ্রাবণের দিকে একবার শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ডাইনিং টেবিলে চলে গেল।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ মন খারাপ করে মাথা নিচু করে থেকে হুট করে লক্ষ্য করল বাড়িতে লোকজন নেই। কি আশ্চর্য। সামিউল শেখ, সালমা বেগম কেও নেই নাকি! শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে পুরো বাড়িতে চোখ বুলিয়ে ফাঁকা দেখে অবাক হয়। তখনি সে কিছু একটা মনে করে ফোন চেইক করে। জিহানের পাঠানো লাস্ট মেসেজটা জ্বলজ্বল করছে,

—” শোন ভাই, বলেছিলাম না সকালে ম্যাজিক দেখবি?দেখ, বুমমম! ম্যাজিক! তোর সব পথের কাঁটাগুলোকে সরিয়ে নিয়েছি। কীভাবে নিয়েছি বড় কাহিনী। পরে বলব। আপাতত এনজয়। যা করতে হবে, কর। আজকে যেন অর্ধেক হলেও গলাতে পারিস। বেস্ট অফ লাক। ”
শ্রাবণ হতবাক হয়ে নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিক করে হেসেও ফেলল। মনে মনে খুশিই হয়েছে সে। এইতো মোক্ষম সুযোগ। তার বউয়ের মাথায় কুবুদ্ধি ও কানে বিষ ঢালার মতও কেও নেই। শ্রাবণ এবারে মনে মনে মিনিটেই কিছু প্লান করে ফেলল। এরপর আস্তেধীরে শিস বাজাতে বাজাতে হাঁটলো। ব্যস্ত ধারার দিকে নজর রেখে হাঁটতে হাঁটতে হুট করে চোখ উল্টে পড়ে গেল শ্রাবণ। ঠাস করে কিছু পড়ার শব্দে ধারা চমকে পেছনে তাকাল। শব্দটা এত জোরে হলো যে সে প্রায় লাফিয়ে উঠল। হাতে থাকা প্লেটটা কেঁপে উঠল। সে দ্রুত পেছনে তাকাল। শ্রাবণ মেঝেতে পড়ে আছে। মাথা কাজ করল না ধারার। তারপর যেন শরীর আগে বুঝে ফেলল, মানুষটা পড়ে গেছে।

—” এ কি! কী হলো! শেখ সাহেব?”
কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। নিজেরও খেয়াল থাকল না সে নাম ধরে ফেলেছে। ধারা দৌড়ে এগিয়ে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে গেল তার পাশে। দুই হাতে শ্রাবণের কাঁধ ধরে টান দিল।
—” এই! শুনছেন? উঠুন!”
কোনো সাড়া নেই। ধারার বুক ধক করে উঠল। সে দ্রুত শ্রাবণের মুখের দিকে ঝুঁকল। চোখ বন্ধ। নিঃশ্বাস আছে কিনা বুঝতে গিয়ে হাত কাঁপতে লাগল। কপালে হাত দিল,
—” এ কী! শরীর এত গরম কেন?”
তার নিজের গলাও কেঁপে উঠল। গত সাতদিনের কথা মাথায় চলে এলো। না খাওয়া, না ঘুমানো, এলোমেলো অবস্থা। গতরাতে স্টোররুমের মেঝেতে শুয়েছিল। ধারার গলা শুকিয়ে গেল। কোনোভাবে কি গতরাতের জন্য অসুস্থ হয়ে গিয়েছে? সে তাড়াহুড়ো করে চারদিকে তাকাল।

—” পানি… পানি…”
দ্রুত উঠে গিয়ে গ্লাসে পানি নিয়ে এলো। আবার হাঁটু গেড়ে বসে শ্রাবণের গালে চাপড় দিল।
—” শুনছেন? চোখ খুলুন। প্লিজ…
শ্রাবণ ভেতরে ভেতরে এমন অভিনয় করছে যেন জাতীয় পুরস্কার তারই প্রাপ্য। কিন্তু বাইরে থেকে মুখ এতটাই নিষ্পাপ আর মৃতপ্রায় যে নিজেকেই নিজের জন্য খারাপ লাগছে। ধারা এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। সে দুই হাতে শ্রাবণের মুখ তুলে কোলে নিল।
—”চোখ খুলুন..শুনতে পাচ্ছেন। আল্লাহ আমি এত বড় মানুষকে কীভাবে উঠাব মেঝে থেকে।”
শ্রাবণ নড়ল না। ধারা প্রায় কেঁদে ফেলল। সে এবার সত্যিই ভেঙে গেল। কাঁপা হাতে তার চুল সরিয়ে দিল।
—” শেখ সাহেব? একটু উঠুন। চোখ খুলুন। দেখি সাহায্য করুন আমায়। দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন।”
হুট করে যেন শ্রাবণের চোখ একটু খোলা বোঝা গেল। একটু একটু জ্ঞান নিয়ে অস্ফুটস্বরে সে বলল
—” আমার…মাথা.. ঘুরছে।”
ধারা যথাসম্ভব শক্তি দিয়ে শ্রাবণকে সোফায় এনে বসিয়ে দিল। হাত দিয়ে জামাকাপড় ঝেড়ে দিল।

—” এইযে? শুনতে পাচ্ছেন?”
শ্রাবণ আধখোলা চোখেই অস্ফুটস্বরে বলল,
—” খিদে পেয়েছে।”
ধারার মায়া হলো।
—” এখুনি খাবার আনছি। দেখি আগে পানিটা খেয়ে নিন।”
শ্রাবণ বাধ্য ছেলের মত গ্লাস ধরে পানি খেল। এরপর একটু একটু করে নিজেকে স্বাভাবিক করার অভিনয় করল। ধারা স্বস্তি পেল।
—” একটু অপেক্ষা করুন। খাবার আনছি আমি।”
কয়েক মিনিটের মধ্যে রুটি, আলু ভাজি নিয়ে এলো ধারা। এরপর শ্রাবণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—” নিন। খেয়ে নিন।”
শ্রাবণ মায়াভরা চোখে তাকাল। বলল,
—” মানলাম আমি খারাপ। তাই বলে একজন অসুস্থ মানুষকে তুমি নিজ হাতে খেতে বলছ? এ কেমন নিষ্ঠুরতা?”
ধারা চোখ পিটপিট করল। শ্রাবণ আবারো হতাশ কন্ঠে প্লেটটা সরিয়ে দিয়ে মাথা এলিয়ে দিল সোফায়। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,

—” থাক। আমার খাওয়া হবে না। ইশ! মা থাকলে খাইয়ে দিত।”
ধারা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে শ্রাবণ। মুখ ফ্যাকাশে। চোখ আধবোজা। সদ্য একটু আগে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, অন্তত ধারার তাই বিশ্বাস। ধারার ভেতরের সব রাগ, অভিমান, সিদ্ধান্ত— সবকিছু একসাথে এসে দাঁড়াল এক জায়গায়। লোকটা খেয়েছে তো? তার চোখ আবার একবার শ্রাবণের মুখে গেল। সত্যিই শুকিয়ে গেছে। এতদিনের কষ্টের কথা মনে পড়তেই বুকটা নরম হয়ে গেল। সে বড় শ্বাস ফেলল। নিজেকে মনে মনে বলল—মানুষটা অসুস্থ। এটা আদর না। এটা মানবতা। হ্যাঁ। একদম মানবতা।
ধারা প্লেটটা আবার হাতে নিল। সোফার সামনে এসে বসল। শ্রাবণ চোখ আধখোলা রেখেই দেখল। ভেতরে ভেতরে এমন আনন্দ হচ্ছে যে মনে হচ্ছে এখনই উঠে নাচতে পারে। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে মনে হলো দুর্বল, ভাঙা, অসহায় এক যুবক। ধারা রুটিটা ছিঁড়ে একটু আলুভাজি নিয়ে এগিয়ে দিল।

—” মুখ খুলুন।”
শ্রাবণ তাকাল। তারপর খুব আস্তে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
—” তুমি খাওয়াবে?”
ধারা ঠান্ডা গলায় বলল,
—” বেশি কথা বললে রেখে চলে যাব।”
শ্রাবণ সঙ্গে সঙ্গে মুখ খুলল। ধারা খাইয়ে দিল। লোকটা এত শান্তভাবে খেল যে দেখে মনে হলো জন্ম থেকেই অসুস্থ। কয়েক লোকমা পর ধারা জিজ্ঞেস করল,
—” এখন কেমন লাগছে?”
শ্রাবণ চিবুতে চিবুতে খুব ধীরে বলল,
—” একটু ভালো।”
ধারা মাথা নাড়ল। আবার রুটি ছিঁড়ল। শ্রাবণ চুপচাপ তাকিয়ে আছে। ধারা খেয়াল করল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কী?”
শ্রাবণ আস্তে বলল,
—” কিছু না।”
আরেক লোকমা নিয়েও শ্রাবণ আবার তাকিয়ে রইল। ধারা এবার বিরক্ত হলো।

—” কী সমস্যা?”
শ্রাবণ গম্ভীর মুখে বলল,
—” অসুস্থ হওয়াটা এত সুন্দর হয় জানা ছিল না।”
মনে মনে বিড়বিড় করল,
—” অজ্ঞান হলে খাইয়ে দেবে জানলে আগেই অজ্ঞান হতাম। ইশ! জিনিসটা আগে কেন মাথায় আসেনি।”
ধারা থেমে গেল। সরু চোখে তাকাল। শ্রাবণ দ্রুত দুর্বল মুখ করে বলল,
—” মানে, তুমি খাওয়ালে ভালো লাগে।”
ধারা ঠোঁট চেপে অন্যদিকে তাকাল। আবার খাওয়াতে লাগল। দুই মিনিট পর শ্রাবণ আবার বলল,
—” একটু পানি?”
ধারা পানি ধরল। শ্রাবণ গ্লাস ধরল না। শুধু তাকিয়ে রইল। ধারা চুপ থেকে নিজেই গ্লাস ধরিয়ে দিল। পানি খেয়ে শ্রাবণ হালকা শ্বাস ফেলল। চোখ বন্ধ করে বলল,

—” শান্তি..
ধারা চমকাল,
—” কী হলো?”
শ্রাবণ চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
—” মনে হচ্ছে বেঁচে গেলাম।”
ধারা থেমে গেল। কথাটা অদ্ভুতভাবে গায়ে লাগল। সে আর কিছু বলল না। চুপচাপ আবার রুটি ছিঁড়তে লাগল। কিন্তু হঠাৎ তার চোখ নিচে গেল। লোকটার হাতটা সোফার পাশে এবং খুব আরামে রাখা। তবে হাতে কিছু অদ্ভুত দাগ দেখে ভ্রু কুঁচকাল ধারা। কেমন যেন ফাটা দাগ। রক্তও এসেছিল বোধহয়। আস্তে জিজ্ঞেস করল,
—” মাথা ঘুরছে?”
—” হুম।”
—” শরীর দুর্বল?”
—” খুব।”
ধারা মাথা নাড়ল। তারপর শান্ত গলায় বলল,

—” আপনার হাতে…কী হয়েছে?”
শ্রাবণ জমে গেল। ধীরে নিচে নিজের হাতের দিকে তাকাল। দুজনই কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো। শ্রাবণ খুব ধীরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর ছোট গলায় বলল—” তেমন কিছু না। হয়তো কোথাও দাগ পড়েছে।”
ধারা কিছুক্ষণ মলিন চোখে তাকিয়ে থেকে যন্ত্রের মত বলল,
—” আপনি দেয়ালে ঘুষি মেরেছেন?”
শ্রাবণ জমে গেল। খুব সামান্য সময় নিয়ে। কিন্তু সেই সামান্য সময়টাই যথেষ্ট। ধারা চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার হাতে। দাগগুলো একদম পরিষ্কার। আঙুলের গিঁট ছড়ে গেছে। কয়েক জায়গায় চামড়া উঠে গেছে। হালকা শুকনো রক্তের রেখা। এগুলো পড়ে গিয়ে হয় না। এগুলো কোথাও আঘাত করলে হয়। শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিল। গলা পরিষ্কার করে বলল,

—” নাহ। ”
ধারা তাকিয়ে রইল। শ্রাবণ আমতা আমতা করে যোগ করল,
—” গাড়ির দরজায় লেগেছিল বোধহয়।”
ধারা মাথা নাড়ল,
—” ও।”
তারপর আবার রুটি ছিঁড়তে লাগল। শ্রাবণ একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু সেকেন্ডের মধ্যেই ধারা না তাকিয়েই বলল,
—” গাড়ির দরজা কি সাধারণত চারটা আঙুলে সমানভাবে লাগে?”
শ্রাবণ ধারার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাল। এত সুন্দর কথা বলা শিখল কবে মেয়েটা? তবে এখন অযুহাত বানানো জরুরি। ধারা শান্ত, খুব শান্ত। শ্রাবণ ছোট্ট কাশি দিয়ে বলল,
—” আসলে, দরজাটা একটু…
—” তাহলে দেয়ালে মেরেছেন?”
শ্রাবণ বিরক্ত হওয়ার অভিনয় করে বলল,
—” আরে কি যা তা বলছো! আমি কি নীলের মত পাগল?”
ধারা এবার তার দিকে তাকাল। একদম সরাসরি।।রাগবিহীন, নির্বিকার ও শুধু খুব ক্লান্ত একটা দৃষ্টি। শ্রাবণ অদ্ভুতভাবে অস্বস্তি অনুভব করল। ধারা আস্তে বলল,

—” কবে?”
শ্রাবণ চোখ নামিয়ে ফেলল।
—” কী?”
—” কবে মেরেছেন?”
শ্রাবণ ঠোঁট ভিজাল,
—”মনে নেই।”
ধারা কিছু বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে তার হাতটা নিজের দিকে টেনে নিল। শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকাল।
ধারা আঙুলগুলো উল্টেপাল্টে দেখল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
—” অনেক জোরে মেরেছিলেন।”
শ্রাবণ উত্তর দিল না। ধারা আবার বলল,
—” তখন খুব রাগ হয়েছিল?”
শ্রাবণ এবার হালকা হাসল। কিন্তু হাসিটা অদ্ভুত,

—” রাগ না।”
ধারা তাকাল। চোখে মায়া ও কৌতূহলের মিশ্রন। শ্রাবণ অনেকক্ষণ চুপ থেকে খুব আস্তে বলল,
—” ভয় হয়েছিল।”
ধারার হাত থেমে গেল। শ্রাবণ আর তাকাল না। চোখ নিচু রেখেই বলল,
—” খুঁজে পাইনি তো…!”
আবার চুপ থেকে তারপর অদ্ভুত লজ্জা নিয়ে বলল,
—” গত পরশু একটা জায়গায় গেছিলাম। মনে হয়েছিল তুমি আছো। গিয়ে দেখি না। তখন একটা দেয়াল সামনে ছিল।”

ধারা আর কিছু বলল না। তার বুকের ভেতরটা আস্তে আস্তে চেপে ধরল কিছু। এই মানুষটা? এই লোকটা? যে একসময় তার কান্না দেখেও বিরক্ত হতো, সে দেয়ালে ঘুষি মেরেছে? তার জন্য? ধারা কিছুতেই মিলাতে পারছে না। হঠাৎ খুব বিরক্ত লাগল নিজের উপর। সে তো চাইনি এমন। সে তো চেয়েছিল লোকটা একটু বুঝুক। এভাবে না। এভাবে না। ধারা ধীরে হাত ছেড়ে দিল। চোখ অন্যদিকে সরিয়ে বলল,
—” আপনাকে বোধহয় খুব কষ্ট দিলাম।”
শ্রাবণ মলিন হেসে ধারার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৯

—” আমি তোমায় যতটা কষ্ট দিয়েছি, ততটা এখনো দাওনি আমায়। আর দিলে আমি হয়তো তোমার মত সহ্য করতে পারব না।”
ধারা চুপচাপ প্লেটটা শ্রাবণের সামনে রেখেই রান্নাঘরে চলে গেল। শ্রাবণ কাতর চোখে তাকিয়ে রইল। এত কীসের অভিনয় করছে মেয়েটা? এইতো কথাতেই বোঝা গেল আবারো নিজেকেই কষ্ট দিচ্ছে।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩১