শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৯
অনামিকা তাহসিন রোজা
শাস্তি দেয়ারও একটা সীমা থাকে। কিন্তু সামিউল শেখের সহযোগীতায় ধারা সেই সীমা যো পেরিয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে সময় লাগলো না শ্রাবণের। সে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে ধারার সাথে সামিউল শেখের এমন কুটনৈতিক সম্পর্ক দেখে। এসব হচ্ছে টা কি তার সাথে? শ্রাবণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে মানুষটা শান্ত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে এই মুহূর্তে ভয়ংকর একটা সত্য উপলব্ধি করছে। সে এতদিন ভাবত, ধারা একা। আর সে একা। কিন্তু না। এখানে পুরো একটা সিন্ডিকেট কাজ করেছে। আর সেই সিন্ডিকেটের চেয়ারম্যান সামিউল শেখ।
শ্রাবণ সরু চোখে বাবার দিকে তাকাল। সামিউল শেখ দিব্যি শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই রহস্যময় ভদ্রলোকসুলভ ভাব। এদিকে ধারা সালমা বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে নাক টানছে। হঠাৎ ধারা মুখ তুলে বলল,
—” আমি ফিরলেও কিন্তু উনাকে মাফ করব না।”
শ্রাবণের চোখ চকচক করল। ভেতরে ভেতরে মনে হলো, ঠিক আছে। মাফ কোরো না। শুধু ফিরো। পরে দেখা যাবে। কিন্তু তার আগেই সামিউল শেখ গলা খাঁকারি দিলেন।
—” খুব ভালো কথা।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল। কেন যেন ভালো লাগছে না। সামিউল শেখ দুই হাত পেছনে নিয়ে শান্তভাবে বললেন,
—” শাস্তি হওয়া উচিত।”
শ্রাবণ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল,
—” বাবা?”
সামিউল শেখ পাত্তা দিলেন না। ধারার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,
—” তবে শাস্তির নিয়মকানুন ঠিকমতো মানতে হবে।”
ধারা পিটপিট করে তাকাল। সালমা বেগমও অবাক হলেন। ভদ্রলোক গুনে গুনে আঙুল তুললেন।
—” এক নম্বর এক সপ্তাহ কথা বলা নিষেধ।”
শ্রাবণ আঁতকে উঠল,
-“কি?”
সামিউল শেখ চালিয়ে গেলেন,
—” শুধু প্রয়োজনীয় উত্তর। যেমন হ্যাঁ, না, সরুন, দুর হয়ে যান।”
জিহান কাশি চেপে মরছে। নীল ইতোমধ্যে ফোন বের করেছে নোট নেয়ার জন্য। এসব মনে রাখা দরকার। ভবিষ্যতে কাজে দেবে। সামিউল শেখ থামলেন না।
—” দুই নম্বর, শ্রাবণ নিজের প্লেট নিজে ধুবে।”
শ্রাবণ হতবাক হলো, আবারো বলল,
—” কী?”
ধারা তাকিয়ে আছে। সামিউল শেখ গুরুত্ব দিয়ে বললেন,
—” ভালোবাসার সাথে শ্রমের সম্পর্ক আছে।”
নীল বিড়বিড় করল,
—” বাহ।”
—” তিন নম্বর, শ্রাবণ এখন থেকে আগামী সাতদিন স্টোররুমে থাকবে, আর ধারা থাকবে শ্রাবণের রুমে। চার নম্বর, কোনোদিন ধারা যদি বলে তার আর ভালো লাগছে না৷ বাড়ি থেকে চলে যাবে, তবে আমরা কেও আটকাব না। ”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল। সামিউল শেখ এবার শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—” পাঁচ নম্বর অফিস থেকে ফিরেই ধারাকে সময় দিতে হবে। ছয় নম্বর ঝগড়া হলে প্রথমে ক্ষমা চাইতে হবে।সাত নম্বর কখনো কাঁদানো যাবে না।”
শ্রাবণ এবার পুরো বুঝে গেল। ধীরে ধীরে চোখ বড় হলো। তারপর অবিশ্বাস নিয়ে বলল,
—” বাবা।”
সামিউল শেখ এবার প্রথমবার তাকালেন। শান্ত মুখে বললেন,
—” কী হয়েছে বাছাধন?”
শ্রাবণ শুকনো গলায় বলল,
—” এগুলো…
সামিউল শেখ মাথা নাড়লেন,
—” না না আমি কাওকে কোনো বুদ্ধি দিইনি।”
শ্রাবণ চোখ সরু করল। সামিউল শেখ ফট করে বললেন,
—” বরং কুবুদ্ধি দিয়েছি।”
সবাই চুপ হয়ে গেল। সামিউল শেখ কাঁধ ঝাঁকালেন।
—” সাতদিন মেয়েটার সাথে অনেক গল্প হয়েছে।”
ধারা মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। ভদ্রলোক নির্বিকারভাবে বললেন,
—” আমি শুধু বুঝিয়েছি ক্ষমা করা আর সহজে ছেড়ে দেওয়া এক জিনিস না। আর তোমাকে একটু কষ্ট না দিলে শিক্ষা হবে না।”
নীল হঠাৎ হাত তুলে বলল,
—” খালু, একটা প্রশ্ন?”
—” বলো।”
—” আপনি কি সিক্রেটলি কাপল কাউন্সেলিং করেন?”
জিহান সাথে সাথে নীলের মাথায় চাপড় দিল। সামিউল শেখ গম্ভীর মুখে বললেন,
—” না। আমি শুধু বেয়াদব ছেলেদের মানুষ বানাই।”
তারপর ধারার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” তবে অত বেশি শাস্তি দিয়ো না।”
ধারা ভ্রু তুলল। কেনো. সামিউল শেখ শান্তভাবে যোগ করলেন,
—” সাতদিনে অবস্থা যা হয়েছে, আরেক সাতদিন দিলে আমার ছেলে প্রেমের গান লিখতে শুরু করবে।”
নীল সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—” ভাইজানের প্রথম অ্যালবামের নাম হবে ‘ বউ ফিরে আয়’ ।”
শ্রাবণ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। নীল সাথে সাথে মুখ বন্ধ করল। আর ধারা না চাইতেও মুখ লুকিয়ে ফিক করে হাসল।
সত্যি সত্যি স্টোররুমে থাকতে হবে শ্রাবণকে তা সে জানে। সেটাতে তার সমস্যাও নেই। সমস্যা হলো ধারাকে নিয়ে। মেয়েটা হুট করে কেমন ইগনোর করা শিখে গেছে। শ্রাবণের সাথে কথা বলা তো দুরের কথা, বরং অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। তাকাচ্ছেও না। এ কেমন শাস্তি! আরে বাবা একটা সুযোগ তো দিতে হয়৷ শেখ বাড়িতে ফেরার পুরো রাস্তাটা অস্বস্তিকর নীরবতায় কেটেছে। সালমা বেগম আর ধারা এক গাড়িতে। সামনে সামিউল শেখ বসে আছেন এমনভাবে যেন উনি কোনো আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করে ফিরছেন। মাঝে মাঝে আয়নায় তাকিয়ে নিজের কাজের প্রশংসাও করে নিচ্ছেন মনে মনে। অন্যদিকে শ্রাবণ দ্বিতীয় গাড়িতে বসেছিল। কিন্তু গাড়িতে বসে থেকেও তার মনে হচ্ছিল সে এখনো প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ধারা ফিরেছে। কিন্তু ফিরেও ফিরেনি। একবারও তাকায়নি। একবারও না। একসময় যে মেয়ে কথার অভাবে দেয়ালকেও গল্প শোনাতে পারত, সেই মেয়েটা এখন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। এটা মারাত্মক। ভীষণ মারাত্মক।
রাত। বাড়িতে ফিরে সামিউল শেখ নিজ দায়িত্বে শাস্তি কার্যকর করেছেন। স্টোররুম পরিষ্কার করা হয়েছে। মেঝেতে ম্যাট। একটা বালিশ। পাতলা কম্বল। এবং একটা মশাও দেখা যায়। কিন্তু কয়েল দেয়া হয়নি। মশাটিকে নীল ‘নৈতিক সমর্থন টিম’ বলে পরিচয় দিয়েছে। শ্রাবণ এখন সেই স্টোররুমে বসে আছে। যেই রুমটা একসময় ফাঁকা দেখে তার বুক ভেঙেছিল, আজ সেই রুমেই সে নির্বাসনে। লোকটা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। মাথা নিচু, হাতে ফোন। ফোনে ধারার ফোন নম্বরটা জ্বলজ্বল করছে। নতুন ফোন পেয়েছে সে সামিউল শেখের থেকে, সেই নাম্বার জোগাড় করেছে শ্রাবণ। ভাবল কল দেবে, কিন্তু সাহস না পেয়ে নাম্বারটা দেখে আবার ফোন অফ করে দিল। বুকের ভেতর হালকা চাপ লাগছে। বিড়বিড়িয়ে বলল,
—” আরে ভাই, শাস্তি দিক, কিন্তু একটু তাকাক তো!”
ঠিক তখন দরজায় নক হলো। শ্রাবণ মুখ না তুলেই বলল,
—” আয়।”
দরজা খুলে ঢুকল নীল। তার পেছনে জিহান। দুজনের হাতে চিপস। আর একটা ঠান্ডা জুস। নীল ভেতরে ঢুকে চারপাশ দেখে শিস দিল,
—” ওহহো পরিবেশটা সাহিত্যিক।”
জিহান মাথা নাড়ল,
—” একদম।”
নীল বসল,
—” কেমন আছেন স্টোররুম সাহেব?”
শ্রাবণ তাকাল না। নীল আবার বলল,
—” বাহ, ভাবির সাথে মিল আছে। উনিও কথা বলে না।”
শ্রাবণ এবার তাকাল। খুব ধীরে বলল,
—” দুর হ হারামির দল!”
নীল উত্তেজিত হয়ে বলল,
—” ওহহো রাগ আছে। মানে এখনো বেঁচে আছে।”
জিহান এসে পাশে বসল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—” কষ্ট হচ্ছে?”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—” আমি বুঝতে পারছি না।”
জিহান ভ্রু তুলল। শ্রাবণ নিচু গলায় বলল,
—” এতদিন ও আমার পেছনে ঘুরেছে। আমি কখনো পাত্তা দিইনি। এখন আমি তাকাচ্ছি, আর ও তাকাচ্ছে না।”
নীল নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
—” অভিনন্দন। আপনিও অবশেষে প্রেম নামক রোগে আক্রান্ত।”
শ্রাবণ তাকাল। নীল আঙুল তুলে বলল,
—” সমস্যা কী জানেন? আপনি এখন শর্টকাট খুঁজছেন।”
—” মানে?”
জিহান উত্তর দিল,
—” তুই সাতদিন কষ্ট পেয়েছিস। ভাবি তো বহুদিন পেয়েছে। তাই রেজাল্ট একদিনে আসবে আশা করিস না।”
শ্রাবণ মাথা নিচু করল। কথাটা মিথ্যে নয়। একটু বলাতেই যে বাড়িতে ফিরেছে এটাই তো অনেক। নীল এবার গম্ভীর হলো। সামনে এসে বসল। বলল,
—” টেকনিক নাম্বার ওয়ান।”
শ্রাবণ তাকাল। নীল আঙুল তুলল,
—” বেশি বেশি সরি বলবা না।”
—” কেন?”
—” কারণ বেশি সরি শুনলে মনে হয় নাটক করছে।”
শ্রাবণ চোখ সরু করল। জিহান যোগ করল,
—” টেকনিক টু, ভাবির জন্য কিছু কর। কিন্তু দেখানোর জন্য না।”
নীল মাথা নেড়ে হেসে বলল,
—” তোমার ভাগ্য ভালো ভাবি তোমায় ভালোবাসে। তাই মানানোটা সহজ হবে। অন্য কেও থাকলে তোমায় লাথি মেরে পগারপার হতো।”
শ্রাবণ জোরপূর্বক মাথা নাড়াল। কথাটা মিথ্যা নয়। জিহান মাথা নাড়ল,
—” আর টেকনিক থ্রি জোর করে কথা বলাবি না।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল,
—” তাহলে?”
জিহান হেসে বলল,
—” এমন পরিবেশ তৈরি কর, যেন ভাবি নিজে কথা বলতে চায়।”
নীল উত্তেজিত হয়ে বলল,
—” কিন্তু এমন করলে তো উল্টোটাও হতে পারে।”
জিহান তাকাল
—” উম..ঠিক।”
নীল আবার বলল,,
—” শোনো ভাইজান, মোট কথা তোমাকে মন জয় করতে হবে। মনে করো তোমাদের বিয়েই হয়নি। এখন ভাবির মন জয় করো, আবারো যেন তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়। বুঝেছো?”
জিহান মাথা নাড়ল। শ্রাবণ মুখ কুঁচকাল। একটু ভেবে মাথা নাড়াল, যার অর্থ বুঝেছে। দুজন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর জিহান ধীরে বলল,
—” তুই জানিস ও কেন তাকাচ্ছে না?”
শ্রাবণ দুদিকে মাথা নাড়াল। জিহান বলল,
—” কারণ ও ভয় পাচ্ছে।”
শ্রাবণ তাকাল,
—” ভয়?”
—” হ্যাঁ। যদি বিশ্বাস করার পর আবার আগের মতো হয়ে যাস?”
শ্রাবণ চিন্তায় ডুবলো। জিহান উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে থামল।
—”তাই প্রমাণ কর।”
নীলও উঠল। বের হওয়ার আগে বলল,
—” আর একটা কথা।”
শ্রাবণ তাকাল। নীল দাঁত বের করে বলল,
—” ভাবি তিনবার লুকিয়ে তোমার দিকে তাকিয়েছে। মনে হয় মায়া লেগেছে।”
শ্রাবণের চোখ চকচক করল,
—” আসলেই?”
নীল কাঁধ ঝাঁকাল,
—” আমি সিসিটিভি না। কিন্তু অভিজ্ঞতা আছে।”
তারপর দ্রুত দরজা বন্ধ করে দৌড়ে পালাল। স্টোররুমে বসে থাকা শ্রাবণ অনেকক্ষণ পর খুব আস্তে হাসল। একটু পর জিহান আবারো এলো, কিন্তু নীলকে রেখে। এসে শ্রাবণের কানে কানে বলল,
—” দোস্ত টেনশন নিস না। হেল্প করব তোকে। সাতদিনের আগেই তুই আর ভাবি এক রুমে থাকবি গ্যারান্টি। এখন ঘুমা। কাল সকালে একটা ম্যাজিক দেখবি।”
সালমা বেগম ও ধারা একসাথে শ্রাবণের রুমের বিছানায় রয়েছে। সালমা বেগম ইতোমধ্যে শুয়ে পড়েছেন। কিন্তু ধারা কাউচে বসে আছে। তার মন টানছে না। সালমা বেগম ডেকে উঠলেন,
—” ধারা, আয় শুয়ে পড়।”
ধারা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” মা, উনি স্টোর রুমে থাকতে পারবে না। মেঝেতে শুতে কষ্ট হবে। এই শাস্তিটা মাফ করা যায় না?”
সালমা বেগম চোখ পিটপিট করে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ ধারার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। চোখে সেই রহস্যময় মায়ের হাসি।
—” কী বললি?”
ধারা হালকা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মাথা নিচু করে বলল,
—” কিছু না।”
সালমা বেগম ভ্রু তুললেন,
—” না না, আবার বল। আমার বয়স হয়েছে। কানে কম শুনি।”
ধারা মুখ কুঁচকাল,
—” আমি শুধু বললাম স্টোররুমে থাকলে উনার কষ্ট হবে। উনি তো কখনো থাকেনি।’
সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন
—” ওহ। তাই?”
ধারা চুপ করে গেল। নখ খুটতে থাকল। তার সত্যিই অনেক কষ্ট হচ্ছে। এসব একটু বেশি বেশি হয়ে যায়না? সালমা বেগম এবার বিছানায় একটু সোজা হয়ে বসে বললেন,
—” মা শোন, সাতদিন আগে যে ছেলে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে শহর ঘুরে বেড়িয়েছে, সে স্টোররুমে ঘুমাতে পারবে না?”
ধারা মাথা নিচু করে আঙুল খোঁচাতে লাগল। কিছু বলল না। সালমা বেগম এবার একটু হেসে বললেন,
—” আমার একটা প্রশ্ন আছে।”
ধারা তাকালে বললেন,
—” যখন তুই স্টোররুমে ছিলি, তখন কি তোর কষ্ট হতো?”
ধারা থেমে গেল। চোখ নামিয়ে বলল,
—” হতো।”
—” তখন শ্রাবণ কি জানত?”
ধারা নীরব রইল। সালমা বেগম আস্তে বললেন,
—” না।”
আবার একটু থামলেন। বললেন,
—” আর আজকে?”
ধারা কিছু বলল না। সালমা বেগম নরম গলায় বললেন,
—” আজকে ওর কষ্ট হচ্ছে, আর তুই সেটা বুঝতে পারছিস।”
ধারা মাথা নিচু করল। ভদ্রমহিলা মুচকি হাসলেন।
—” তাহলে শিক্ষা হচ্ছে।”
ধারা দ্রুত বলল,
—” কিন্তু মা, উনি তো এমনিতে… মানে..
—” কী?”
—” চেহারা দেখলেন না?”
সালমা বেগম এবার সত্যি একটু থামলেন। তিনি দেখেছেন। বাড়িতে ফিরে শ্রাবণ খাওয়ার সময় প্লেটের দিকে তাকিয়ে বসেছিল। দুই লোকমা খেয়ে উঠে গেছে। চোখের নিচের কালি, ক্লান্ত মুখ সবই দেখেছেন। তবুও মুখে কিছু আনলেন না। তিনি হাসলেন।
—” আরে বাবা, ও ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙে তিনদিন আমাকে বলেনি। এইটুকুতে কিছু হবে না।”
ধারা ছোট্ট গলায় বলল,
—” মেঝে শক্ত…”
সালমা বেগম এবার হাসি চেপে বললেন,
—” কাঁথা দিয়েছি।”
ধারা একটু থেমে বলল,
—” মশা..
—” কয়েল দিয়েছি।”
—” গরম..
—” ফ্যান আছে তো। ”
ধারা থেমে গেল। সালমা বেগম এবার মজা পেয়ে গেলেন। তিনি বালিশে ভর দিয়ে বললেন,
—” আর কিছু?”
ধারা বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকাল। অনেকক্ষণ পর ছোট করে বলল,
—” ওনার মাইগ্রেন উঠলে?”
সালমা বেগমের চোখ নরম হয়ে গেল। তিনি অনেকক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,
—” ধারা?”
—” হুম?”
—” তুই ওকে মাফ করেছিস?”
ধারা দ্রুত মাথা নাড়ল,
—” না।”
সালমা বেগম ঠোঁট চেপে হাসলেন,
—” কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে জীবনে রাগই করিস নি। মাফ করবি কীভাবে?”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিল। বিষয়টা নিয়ে সে নিজেই বিভ্রান্তিতে আছে। সালমা বেগম মুচকি হেসে উঠে এলেন, হাত বাড়িয়ে মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন,
—” এটাই তো সমস্যা মা।”
ধারা তাকাল। সালমা বেগম বললেন,
—” রাগ থাকলে মানুষ দূরে যায়। ভালোবাসা থাকলে আবার ফিরে তাকায়।”
ধারা ঠোঁট কামড়ে রইল। ভদ্রমহিলা আবার শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করে বললেন,
—” তোর যদি খুব চিন্তা হয়, তাহলে গিয়ে দেখে আয়।”
ধারা চমকে তাকাল,
—” মা!”
সালমা বেগম চোখ না খুলেই বললেন,
—” আমি কিছু বলিনি।”
একটু থেমে,
—” আর হ্যাঁ, শাস্তি মাফ করা যাবে না। তবে বন্দির স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিষিদ্ধ না।”
ধারা একদম স্থির হয়ে গেল। তারপর বিরক্ত মুখ করে বলল,
—” না না। আমি যাব না।”
সালমা বেগম চোখ বন্ধ রেখেই হাসলেন,
—” আচ্ছা।”
সালমা বেগম চোখ বন্ধ করে ছিলেন। তিন মিনিট পর তিনি আস্তে দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলেন। হাসি আটকে আগের মত চোখ বুঁজে থাকলেন তিনি। কিছু বললেন না। এবারে তাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো উচিত হবে না। ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তিতে ঘুমিয়ে গেলেন।
শ্রাবণ মেঝেতে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ফোন স্ক্রল করছে। ইউটিউবে অলরেডি একটা নাটক দেখা হয়ে গেছে। কি আশ্চর্য! স্টোররুমটা এত নীরব, অন্ধকার। এখানে ধারা থাকতো কী করে? শ্রাবণ ফোন পাশে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশেপাশে তাকাল। জেলখানার থেকে কম কিছু মনে হচ্ছে না তার। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে শুয়ে পড়ল সে। মেঝেতে শোয়ার অভ্যাস নেই শ্রাবণের। তবুও কোনো কিছুর পরোয়া না করে শুয়ে পড়ল। কারন শরীর ক্লান্ত, মনও অস্থির। একটু ঘুমোনো দরকার। চোখ বুঁজে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিল শ্রাবণ। ঘুমানোর চেষ্টা করছে এমন ভান করা ছাড়া উপায়ও নেই। কারণ শরীরটা এত ক্লান্ত যে চোখের পাতা ভারী, কিন্তু মাথার ভেতরটা অদ্ভুত জেগে আছে। মেঝেটা শক্ত। একটা সময় যে মেয়েটাকে সে এই ঘরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, আজ সেই একই মেঝেতে শুয়ে থাকতে গিয়ে তার মনে হলো এটার নাম শাস্তি না, এটার নাম নীরবতা। আর নীরবতা খুব ভয়ংকর জিনিস।
স্টোররুমের ভেতর আধো অন্ধকার। জানালায় পর্দা দেয়ার আলো নেই বললেই চলে। শুধু দরজার নিচ দিয়ে করিডোরের হালকা আলো ঢুকছে। হঠাৎ খুট করে খুব আস্তে দরজার শব্দ হলো। শ্রাবণের চোখ খুলতে ইচ্ছে করল। কিন্তু খুলল না। পায়ের খুব হালকা শব্দ পাওয়া গেল।
ধারা উঁকি মেরে দেখে নিল শ্রাবণকে। এরপর পা টিপে টিপে ঢুকে পড়ল। শ্রাবণ নিঃশ্বাস স্বাভাবিক রাখল। বুঝিয়ে দিল ঘুমিয়ে আছে। তবে সে বুঝলো কেও এসেছে। দরজাটা আবার খুব আস্তে বন্ধ হলো। কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই। তারপর শ্রাবণ টের পেল কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার খুব কাছে। হুট করে শ্রাবণ আবিষ্কার করে ফেলল সে ধারার উপস্থিতি চিনতে পারে। চোখ বন্ধ রেখেও সে ঘ্রানে চিনতে পারে ধারাকে। ব্যাপারটা উপলব্ধি করে মনে মনে খুব খুশি হলো সে। কারন ভালোবাসা না থাকলে কেও কখনো না দেখে কারো উপস্থিতি টের পায়না৷
ধারা কিছু বলল না। আগে ঝুঁকে ভালো করে তাকাল শ্রাবণের দিকে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। চোখ বন্ধ। ঘুমিয়েছে? নাকি অভিনয় করছে? আরও একটু ঝুঁকল। শ্রাবণের নিঃশ্বাস গায়ে লাগল তার। ধারা চোখ সরিয়ে নিল দ্রুত। নিজের মনেই বিড়বিড় করল খুব আস্তে,
—” ঘুমিয়ে গেছে নাকি?”
উত্তর নেই। ধারা এবার চারপাশে তাকালো। স্টোররুমটা এমনিই ছোট। একপাশে তারই সেই পুরোনো বাক্স, কয়েকটা বইয়ের কার্টন, ভাঙা চেয়ার। একটা পুরোনো তাক। আর মাঝখানে মেঝেতে পড়ে থাকা একটা মানুষ। মেয়েটার চোখ গিয়ে আটকাল শ্রাবণের নিচে। বালিশ নেই। চাতরটা মারাত্মক পাতলা। ফোনটা পাশে পড়ে আছে। শার্টের হাতা গুটানো। এক হাত মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে আছে। ভ্রু একটু কুঁচকে গেল ধারার। চুপচাপ আরও একটু সামনে এলো। মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। আস্তে বলল,
—” এত শক্ত মেঝেতে ঘুমাচ্ছে কীভাবে?”
কথাটা এমনভাবে বলল যেন প্রশ্নটা নিজের কাছেই। তারপর নিচু হয়ে বসে পড়ল। শ্রাবণের মুখের দিকে তাকালো। আজ ভালো করে দেখল বোধহয়। চোখের নিচের কালো দাগ। শুকনো ঠোঁট, দাড়ি। অদ্ভুত ক্লান্ত একটা মুখ। মেয়েটার বুকের ভেতর কেমন খচখচ করে উঠল। আস্তে হাত বাড়ালো। কিন্তু ছুঁলো না। মাঝপথেই থেমে গেল। চোখ নামিয়ে নিল। নিজের মনেই খুব আস্তে বলল,
—” কী অবস্থা করেছেন নিজের।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়াল। আরেকটু দাঁড়িয়ে রইল। নিশ্চিত হচ্ছে সত্যিই ঘুমাতে পারছে কিনা। শেষে খুব আস্তে বলল,
—” কষ্ট হলে উঠে চলে যাবেন। এত জেদ দেখানোর দরকার নেই।”
কথাটা বলেই দরজার দিকে হাঁটল। কিন্তু দরজার হাতলে হাত রেখেও কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। পেছনে তাকাল না। তারপর বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হলো। স্টোররুম আবার নীরব হয়ে গেল। কিন্তু মেঝেতে শুয়ে থাকা শ্রাবণ ধীরে ধীরে চোখ খুলল। অনেকক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁটের কোণে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটল। ফিসফিস করে বলল,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৮
—” ধরা খেয়ে গেছো সোনা। ওরা ঠিকই বলেছিল। শ্রাবণ শেখকে ঘৃনা করার মত মনটাই নেই তোমার।”
মুচকি হাসল শ্রাবণ। এবারে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে খুশিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনন্দ নিয়ে চোখ বুঁজে ফেলল,—” এবার বোধহয় ঘুম আসবে।”
