শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৮
অনামিকা তাহসিন রোজা
ট্রেনের হুইসেলটা কেমন যেন বুকের ভেতর দিয়ে কেটে গেল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নড়েচড়ে উঠছে। কেউ ব্যাগ টানছে, কেউ দরজার সামনে জায়গা নিচ্ছে। অথচ এই ভিড়ের মাঝেও যেন একটা জায়গা স্থির হয়ে গেছে। ধারা আর তার ওড়নার কোণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ। ধারা খুব ধীর গতিতে নিচে তাকাল। দুটো শক্তপোক্ত আঙুল এতটুকু ওড়নার কোণ ধরে রেখেছে। জোর নেই। অধিকার নেই। আদেশ নেই। শুধু ভয়। যেন একটু শক্ত করে ধরলে মেয়েটা ভেঙে যাবে আর ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে। ধারার বুকের ভেতরটা আচমকা মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে পড়ল কতদিন সে নিজেই এমন করে শ্রাবণের হাতের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। কতবার মনে মনে ভেবেছে এই হাত একটুখানি টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে শ্বাস নিতে। একটুখানি ছোঁয়া পেলে খুশি হতো। অথচ আজ? আজ সেই মানুষটাই তাকে এমন করে ধরে রেখেছে। আর সে পারছেনা তা ছুঁতে। ধারা চোখ বন্ধ করল। না। কাঁদা যাবে না। এখন কাঁদলে হেরে যাবে সে। ঠোঁট কামড়ে মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল ধারা। কিন্তু লাভ হলো না। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল। কয়েকফোঁটা টপটপ করে পড়ে হুট করেই যেন আটকে রাখা সবকিছু বেরিয়ে এলো। ধারা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছল। কঠিন গলায় বলল,
—” ছাড়ুন।”
শ্রাবণ মাথা নাড়ল,
—” পারব না।”
ধারা আবার বলল,
—” ছাড়ুন বলেছি।”
শ্রাবণ এবার খুব আস্তে বলল,
—” তুমি গেলে আমি পারব না ধারা। সত্যি পারব না। যেও না প্লিজ।”
ধারা হেসে ফেলল। কিন্তু সেই হাসিটা সুন্দর না। বিষাদের হাসি সুন্দর হয়না। এই হাসি ভাঙন ধরায়, হয় কারো বুকে, নয় সম্পর্কে। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। চোখদুটো টলমল করছে। কাঁপা গলায় বলল,
—” আপনি কেনো এমন করছেন? কেনো?”
শ্রাবণ তাকিয়ে রইল। ধারা এবার সত্যিই ভেঙে পড়ল,
—” এতদিন কোথায় ছিলেন আপনি? আমি যখন রোজ রোজ আপনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম তখন কেনো বলেননি এসব? আমি যখন আপনার একটুখানি যত্ন পাওয়ার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করতাম তখন কেনো বলেননি? আমি যখন নিজের সম্মান ভুলে আপনাকে আঁকড়ে ছিলাম তখন আপনি আমাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। আমি তো চলে যেতে চাইনি। তখন তো আমি যাইনি।”
শ্রাবণ থমকে গেল। ধারা চোখ নামিয়ে বলল,
—” আমাকে দেখে তখন পাগল মনে হতো? তখন ছ্যাঁচড়া মেয়ে মনে হতো? এজন্য দাম দিতেন না? এখন মূল্য দিচ্ছি না বলে আপনার বুক ফেটে যাচ্ছে? নাটক করছেন?”
আর বলতে পারল না। গলা ভেঙে গেল। চোখ মুছতে মুছতে বলল,
—” আমি যতটা ভেবেছি তার থেকে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন আপনি। আমি খুব খুশি হয়েছি। এখন যা খুশি তাই করুন।”
ধারা ছিটকে শ্রাবণের হাত সরিয়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। ট্রেনের দিকে পা বাড়াতে গেলে আবারো শ্রাবণ তার বাহু সজোরে চেপে ধরে আর্তনাদ করে,
—” যেও না ধারা। যেও না। প্লিজ! থেকে যাও।”
বলতে বলতে বাচ্চাদের মত কেঁদে ফেলে শ্রাবণ। পুরুষদের কাঁদতে নেই। সমাজ খারাপ বলে। তাই যথাসম্ভব দ্রুত চোখ মোছে শ্রাবণ। কিন্তু কান্না থামে না। তা নিয়ন্ত্রনের বাইরে। ধারা এক মুহুর্তের জন্য শান্ত হয়ে সরু চোখে তাকায় শ্রাবণের দিকে। শুকনো ঢোক গিলে অভিমানী কন্ঠে বলল,
—” থেকে গেলে কী করবেন?”
শ্রাবণও একইভাবে ধারার চোখের দিকে তাকিয়ে সাবধানী কিন্তু ফিসফিস করে নরম সুরে বলল,
—” আদর করব। খুব আদর করব। অনেক আদর করব। এত এত ভালোবাসব। আর কষ্ট দেবনা। যা বলবে তাই করব। বাধ্য, ভালো, কেয়ারিং হাজবেন্ড হবো। যা চাইবে তাই দেব। যেও না। প্লিজ। যেও না।”
ধারা রেগে যাবে, নাকি লজ্জা পাবে সেটারও সিদ্ধান্ত নেয়ারও সুযোগ পেল না। চোখ পিটপিট করে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল। ইতোমধ্যে গালে লাল আভা ছড়িয়েছে। এদিকে নীল জিহানের হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে। কেননা ধারা সত্যি সত্যি ট্রেনের অনেকটা কাছে। আর তারা দূর থেকে তাদের কথোপকথনও শুনতে পেল না। তবে শ্রাবণের মুখভঙ্গি ও ধারার চোখের পানি দেখল নীল। তবুও চিন্তা হলো তার। দূর থেকে গলা লম্বা করে তাকিয়ে রইল। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে ট্রেন না, নিজের রেজাল্ট দেখতে এসেছে। একবার ধারা, একবার ট্রেন, আবার শ্রাবণ। তারপর হঠাৎ কপালে চাপড় মেরে বলল,
—” ভাই, আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
জিহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
—” কেনো?”
নীল গম্ভীর মুখে বলল,
—” দেখো, আমি প্রেম-ট্রেম বুঝি না। কিন্তু দূর থেকে যেটা দেখছি, ভাবির মুখে ‘না’ লেখা থাকলেও চোখে ‘হুম’ লেখা।”
জিহান ঠোঁট বাঁকাল,
—” তুই এত দূর থেকে চোখ পড়লি কীভাবে?”
নীল বুক ফুলিয়ে বলল,
—” এক্সের সাথে তিন বছরের রিলেশন ছিল ভাই। অভিজ্ঞতা বলে একটা জিনিস আছে।”
জিহান শুকনো মুখে তাকিয়ে বলল,
—” আর এখন?”
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” এখন অভিজ্ঞতাই আছে। মানুষ নাই।”
জিহান দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল,
—” তোর এই দুঃখগাথা এখন দরকার?”
নীল আবার তাকাল সামনে। শ্রাবণ কী যেন বলছে। ধারা দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনও একদম কাছে। সে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে জিহানের হাত ঝাঁকাল,
—” ভাই ভাই ভাই! দেখো দেখো! ভাইজান কাঁদছে নাকি?”
জিহান চোখ ছোট করে তাকাল। সত্যিই শ্রাবণের কাঁধ কাঁপছে। জিহান স্তব্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ড দেখল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—” নোট কর। সূর্য পশ্চিমে উঠলে, শ্রাবণ শেখ দিনে তিনবার কাঁদে।”
নীল গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল,
—” ইতিহাস বইয়ে লেখা উচিত।”
দুজন আবার তাকাল সামনে। ধারা ব্যাগ ধরে আছে ও শ্রাবণ তার হাত। ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার আর এক মিনিট বাকি। নীল এবার সত্যি চিন্তিত হয়ে গেল।
—” ভাই, যদি সত্যি উঠে যায়?”
জিহানও একটু চুপ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
—” জানি না।”
নীল আতঙ্কিত হয়ে বলল,
—” আমরা কি ইন্টারভেনশন করব? মানে দৌড়ে গিয়ে ভাবিকে ধরে আনব?”
জিহান তাকাল,
—” তারপর শ্রাবণ তোকে ধরে চিকেন ফ্রাই করে ট্রেনে তুলে গ্রামের দিকে পাঠাবে।”
নীল মুখ কুঁচকাল,
—” সেটাও ঠিক।”
তারপর আবার সামনে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
—” কিন্তু ভাইজানের চেহারা ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে ভাবি গেলে এই লোক বাড়ি না গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিবে, আর পরে খালু আমাকে দায়ী করবে।”
জিহান ঠান্ডা গলায় বলল,
—” না। আগে আমাকে দায়ী করবে। তারপর তোকে।”
নীল আঁতকে উঠল,
—” ভাই, আমরা না একটু কাছে যাই?”
জিহান বড় শ্বাস ফেলল,
—” না।”
নীল দুই সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ হতাশার শ্বাস ফেলল। আবার সামনে তাকিয়ে ফিসফিস করল—
—” প্লিজ ভাবি নাটক শেষ করো। আমাদেরও হার্ট আছে! ”
ধারার শীতল দৃষ্টি ও স্থিরতা দেখে শ্রাবণ সাহস পেল। মনে আশা জাগল তার। আবারো বলল,
—” যেও না সোনা।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এরপর হুট করে কি যেন হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা তুলে এনে ট্রেন থেকে অনেক দুরে দাঁড়াল। শ্রাবণও পিছু পিছু আসল। ধারা এবারে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা টিকেট বের করে হাতের মুঠোয় নিল। শ্রাবণের দিকে তাকানোর সাথে সাথে শ্রাবণ আঁতকে উঠে বলল,
—” ধারা প্লিজ। ”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কি আশ্চর্য! লোকটা বোকা নাকি। সে এবারে টিকেটটা শ্রাবণের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
—” প্লিজ বলে লাভ নেই। টিকেট কেটে দিন আবার। আমি অনেক আগেই ট্রেন মিস করেছি।”
শ্রাবণ ধারার কথার মানে বুঝল না। চোখ পিটপিট করে তাকাল। এরমধ্যে পেছন থেকে হুড়মুড় শব্দ হলো। কেউ যেন তাড়াহুড়ো করে ভিড় ঠেলে আসছে। নীল আর জিহান একসাথে ঘুরে তাকাল। তারপর দুজনেরই মুখের অবস্থা এমন হলো যেন গণিত পরীক্ষায় হুট করে বাংলা প্রশ্ন এসেছে। সালমা বেগম হাঁপাতে হাঁপাতে আসছেন। আর তার দুই কদম পেছনে এক হাতে গাড়ির চাবি, অন্য হাতে ফোন, মুখে বিরক্তি আর স্বভাবসুলভ শান্ত ভাব নিয়ে দ্রুত হাঁটছেন সামিউল শেখ।
ভদ্রলোক দূর থেকেই দৃশ্যটা দেখলেন। ধারাকে দেখে তিনি চোখ পিটপিট করে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে থেমে গেলেন। তারপর অবাক হয়ে বলে উঠলেন
—” কী আশ্চর্য! ধারা যায়নি এখনো?”
সাথে সাথে সালমা বেগম হাঁটা থামিয়ে তার দিকে তাকালেন।
—” কী বললে? তুমি চাইছো ও চলে যাক?”
সামিউল শেখ এবারও নির্বিকার। ঘড়ি দেখে বললেন,
—” আরে বিষয়টা তা না। আমি শ্রাবণকে ভুল সময় বলেছিলাম। ধারার ট্রেন সাড়ে এগারোটায় নয়, সাড়ে দশটায় ছিল। সেই হিসেবে তোমার ছেলে এগারোটার পরে এসে তো ধারাকে পাওয়ার কথা না।”
সালমা বেগমের চোখ বড় হয়ে গেল।
—” কীহ?!”
সামিউল শেখ শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—” হ্যাঁ। কিন্তু ধারা এখনো….তাহলে কি ও…
নীল পিটপিট করে তাকালো। জিহান ধীরে ঘুরে তাকালো। এদিকে ধারার কথা শুনে অবুঝের ন্যয় শ্রাবণ কিছু বুঝল না। তোতলিয়ে বলল,
—” আবার টিকেট কাটব কেন?”
—” বললাম না ট্রেন মিস করেছি। আমার ট্রেন সাড়ে দশটায় ছিল।”
বলেই ধারা শক্ত চিত্তে অন্যদিকে তাকাল, যেন সে ইচ্ছে করে নয়, ভুলে মিস করেছে ট্রেনটা। শ্রাবণের বুক কেঁপে উঠল। ধারা এবার তাকাল তার দিকে। ভেজা চোখে, অভিমানী চোখে। শ্রাবণ কিছু বলল না। চুপ থেকে একটু শান্ত মাথায় ভাবল। এবারে সময় লাগল না। সাড়ে দশটায় ট্রেন থাকা সত্ত্বেও ধারার না যাওয়া, স্টেশনে অপেক্ষা করা, এখন চলে যাওয়ার ভয় দেখানো সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
ধারা তাকে ঘৃনা করেনি। ধারা তো পারেইনা শ্রাবণ শেখকে ঘৃনা করতে। শ্রাবণ এও বু্ঝল আজও সে ধারা সুযোগ দিয়েছে বলেই পেরেছে। নইলে সব হারাতো। সবটা উপলব্ধি করে শ্রাবণ চোখে পানি নিয়েই হাসল। ফিক করে হাসার কারনে ধারার কানে গেল। সে শক্ত কন্ঠ নিয়ে বলল,
—” হাসছেন কেনো আপনি? দ্রুত পরের ট্রেনের টিকেট কেটে দিন।”
শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে হেসে চোখের পানি মুছল। দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” দেব না।”
ধারা নাক ফুলিয়ে তাকাল,
—” কী ভেবেছেন আমি যাবনা? ভুল ভাবছেন। আমি চলে যাবই। ভুলে ট্রেন মিস করেছি বুঝেছেন। ভুলে। নইলে অনেকক্ষণ আগেই আপনি আসার আগেই চলে যেতাম।”
শ্রাবণ আবারো হাসল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে সত্য লুকোনোর প্রয়াস করা ধারার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আকুল দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” তুমি জানতে আমি আসব তাইনা? তুমি অপেক্ষা করেছো আমার জন্য?”
ধারা শুকনো ঢোক গিলল। কথা মিথ্যে নয়। তবে সে স্বীকার করবেনা। তাই কঠোর কন্ঠে বলল,
—” না। কখনোই না। স্বপ্নেও সম্ভব না।”
শ্রাবণ টিকেটটা ছিড়ে ফেলল। প্লাটফর্মে থাকা ট্রেনটিও ধীরে সুস্থে চলে গেল স্টেশন থেকে। শ্রাবণ এবারে নিজের কলার ঠিক করে হাত দিয়ে ঘষে চোখমুখ মুছলো। হাসিমুখে বলল,
—” চলো বাড়ি যাই।”
ধারা ভ্রু কুঁচকাল,
—” বাড়ি যাই মানে? বললাম না চলে যাব। থাক আপনাকে টিকেট কেটে দিতে হবেনা। আমি তো নিজেই পারি।’
বলেই এগুতে চাইলে ধারার বাহু আটকে নিজের কাছে টেনে ধরে শ্রাবণ। শুধু খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। তবে স্পর্শও করল না। শুধু বলল,
—” আবারো আমার জন্য অপেক্ষা করেছো। আবারো তুমি জিতে গেলে। দেখেছো তো আমি তোমাকে ছাড়া কতটা অসহায়! এতটাই অসহায় যে তুমি নিজে না চাইলে আমি আজ তোমায় আটকাতেই পারতাম না।”
ধারা তাকিয়ে রইল। শ্রাবণের গলা ভাঙা,
—” আমি তোমাকে ভালোবাসি ধারা। আরো ভালোবাসব। একবার সুযোগ দাও না সোনা।”
ধারা আবার কেঁদে ফেলল। ঠোঁট কাঁপছে। সে খুব আস্তে বলল,
—” ভালোবাসার কথা আপনার মুখে মানায় না। বরং আপনি শুনুন, জানেন কী? আমি এখনো আপনাকে খুব ভালোবাসি?”
শ্রাবণ চোখ বন্ধ করল। ধারা কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠল,
—” এইটাই আমার সবচেয়ে বড় রাগ। এত অপমান, এত কষ্টের পরেও কেন আমি এখনো আপনাকে ভালোবাসি?কেন আপনি একটু আগে আসলেন না…?”
শেষ কথাটা ভাঙা গলায় বাচ্চাদের মত বলে ফেলল সে। ধারার বুক ওঠানামা করছে। কান্না থামাতে গিয়ে উল্টো শ্বাস কেঁপে যাচ্ছে।
ধারা হঠাৎ এগিয়ে এলো। শ্রাবণ কিছু বোঝার আগেই তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দুরে সরাল ধারা। আবারো শ্রাবণের বুকে ধাক্কা দিল। রীতিমতো অভিমানে, রাগে ধারা কাঁদতে কাঁদতেই আবার ধাক্কা দিল।
—” কেন এসেছেন? কেন? কেন এখন এসেছেন? আগে কোথায় ছিলেন আপনি?”
প্রত্যেক বাক্যের মাঝে শ্রাবণের বুকে অনবরত ঘুষি মারতে থাকল ধারা। শ্রাবণ কিছু বলল না। ধারা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। চোখ মুছে বলতে থাকল,
—” আমি কী করিনি আপনার জন্য? বলেন? কী করিনি?”
শ্রাবণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ধারা আঙুল তুলে বলতে লাগল,
—” আমি নিজের গ্রাম ছেড়েছি। নিজেকে ছেড়েছি। নিজের অভ্যাস ছেড়েছি। নতুন একটা বাড়িতে গিয়ে প্রতিদিন নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। আপনি কথা বলতেন না, আমি অপেক্ষা করেছি। আপনি রেগে যেতেন, আমি ভেবেছি একদিন ঠিক হয়ে যাবে। আপনি আমাকে অপমান করেছেন, আমি নিজেকে বুঝিয়েছি আপনি খারাপ না, শুধু সময় লাগবে। আপনি অবজ্ঞা করেছেন, এতিম এই আমি তবুও বিশ্বাস রেখেছি একদিন আমি আমার স্বামীর কাছে আশ্রয় পাবই! ”
ধারা কেঁদে ফেলল। আরো বলল,
—” আমি নিজের সম্মান পর্যন্ত সরিয়ে রেখেছি। একটা মানুষকে কতবার গিয়ে বলা যায় আমি আপনাকে ভালোবাসি? কতবার গিয়ে বোঝানো যায়? কতবার অপমানিত হলে একটা মানুষ থামে? আরে আমি তো পাগল। ছোট থেকে নি”র্যাতিত হতে হতে ক্লান্ত আমি। মা-বাবার ভালোবাসা না পেয়ে আমার এই নির্লজ্জ হৃদয় এতটাই লোভী হয়ে পড়েছে যে স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজেকে যতটা নিচে নামাতে হয় ততটা নামাতেও প্রস্তুত আমি। আমি এতটাই লোভী! আর ভালোবাসা পাওয়ার এই লোভ আমার রয়েই গেছে। পারিনি। পারছিনা এই লোভের ধ্বংস ঘটাতে। কোনোভাবেই পারছিনা।”
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ধারা কাঁদতে কাঁদতেই হাসল। সেই হাসিতে যন্ত্রণা ফুটে উঠছে,
—” আপনি কি কখনো একবার আমার চোখ দেখেছিলেন? আপনার একটা দৃষ্টির জন্য আমি আমার এই চোখদুটোতে কাজল পড়েছি অনেকবার। কখনো তাকিয়েছেন? কতবার এই কালো চেহারায় পাউডার মেখেছি, দেখেছিলেন? কতবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, আমার মধ্যে কী সমস্যা? কী কমতি? আমি দেখতে খারাপ? আমি বিরক্তিকর? আমি কি এতটাই অপ্রয়োজনীয়? কখনো ভেবেছেন এসব?”
শ্রাবণ চোখ তুলল। ধারা চোখ মুছে বলল,
—” তারপর একদিন বুঝলাম সমস্যা আমার না। আমি শুধু ভুল জায়গায় ভালোবাসা খুঁজছিলাম।”
শ্রাবণ ভাঙা গলায় বলল,
—” ধারা শোনো…
ধারা হাত তুলে থামিয়ে দিল। জোর গলায় বলল,
—” না। চুপ করুন। আপনি আমার কথা শুনবেন।”
কাঁপা শ্বাস নিল মেয়েটা,
—” আপনি জানেন আমি কেন চলে গিয়েছিলাম? কারণ আমি চাইনি আপনি আমাকে খুঁজুন। আমি চাইনি আপনার করুণা পেতে। আমি চাইনি আপনি বাধ্য হয়ে আমাকে ফিরিয়ে আনুন। আমি প্রথমবার নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবারে কঠিন থেকে কঠিনতম হয়ে উঠব। আর কখনো শ্রাবণ শেখের কথা মনে করবনা। চলে যাব গ্রামে। সেখানেই থাকব। সব কিছু ভেবেছি। কিন্তু.. কিন্তু… আবারো আটকে গেলাম। যখন ট্রেনটা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, আমার পা চলেনি। আমি পারিনি যেতে। মনে হয়েছিল আমি নিজেই ম”রে যাব। আমি পারবনা। আমি পারবনা ছোট থেকে কিছু না পেয়ে শেখ বাড়িতে ভাগ্য করে পাওয়া মা-বাবাকে হারাতে। পারবনা আমায় ঘৃনা করা সেই স্বামীটাকে ছাড়তে। হোক না সে খারাপ, কিন্তু সে তো আমারই। কতশত চিন্তা করেছি আপনার ধারনা আছে? তাই চাইলেও চলে যেতে পারলাম না। চোখের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে ট্রেনটা বেরিয়ে গেল, আমি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলাম আর নির্লজ্জ আমিটার উপর ক্ষুব্ধ হলাম। ভালোবাসলে নির্লজ্জ হতে হয়। আপনি বুঝবেন না। যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলাম এবার আমি কী করব. ঠিক তখনই দেখি পাশে এসে আমার সেই খারাপ স্বামীটাই এলোমেলো চুল, চোখের নিচে কালি, অগোছালো শার্ট আর এক বুক অস্থিরতা নিয়ে ছুটে এসে হাঁপাচ্ছে। আমার জন্য চোখের পানি ফেলেছে। আমার জন্য কেঁদেছে, আর্তনাদ করেছে। এখন যদি নিজের কলিজাটা কে”টে দিতে হয়, সেটাও তো দিতে দ্বিধাবোধ করবনা আমি।
আপনি ভালোবাসার কী বুঝেন হ্যাঁ? নিজের কী অবস্থা করেছেন? এইযে এই বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে আমার সামনে এসে হাজির হয়েছেন, আপনার কী মনে হচ্ছে আমি খুব খুশি হয়েছি? খুব আনন্দ পেয়েছি? বিশ্বাস করুন, আপনার এই অবস্থা দেখে আমার নিজেরই ম”রে যেতে মন চাইছে এখন।”
শ্রাবণ স্থির হয়ে শুনছে। ধারা নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে হেসে ফেলল,
—” দেখেছেন? আমি কতটা বোকা? কতটা বলদ আমি। এখনো, আবারো নির্লজ্জের মত বলেই যাচ্ছি আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনি ঠিকই বলেন, আমি একটা ইডিয়ট! ”
শ্রাবণের বুক মোচড় দিল। তার চেঁচিয়ে বলতে চাইল, হ্যাঁ তুমি আসলেই ইডিয়ট। কারন তুমি নিজের ভালোবাসা ঠিকই মনে রেখেছো, কিন্তু আমার ভালোবাসা যে অপেক্ষায় গুমড়ে ম”রছে। এই দায়িত্ব কে নেবে? এবারে ধারা সামিউল শেখকে কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। সাথে সাথে সে দ্রুত পায়ে সামিউল শেখের সামনে দাঁড়িয়ে জেদি কন্ঠে বলল,
—” আমাকে আরেকটা টিকেট কেটে দিবেন বাবা? আমি ভুলে ট্রেন মিস করেছি।”
সামিউল শেখ চোখ পিটপিট করে তাকালেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। এতক্ষণ যে নাটক দেখেছেন তিনি, তাতে যে বেঁচে আছেন এ-ই অনেক। ধারা অপেক্ষারত চোখে সামিউল শেখের দিকে তাকিয়ে থাকলে ভদ্রলোক গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” টিকেট কেনার মত টাকা এখন সাথে নেই মা।”
ধারা হতাশ হলো। ভাবল সত্যিই সামিউল শেখ টাকা আনেন নি। অথচ সে যদি পিছু ফিরে শ্রাবণের দিকে তাকাত, তবে বুঝে যেত সেখান থেকেই অদৃশ্য হুমকি ভেসে এসেছে, চোখে চোখে বিপজ্জনক হুমকি দিয়ে সামিউল শেখের মুখ ও পকেট দুটোই বন্ধ করেছে শ্রাবণ।
ধারা হতাশ হয়ে চোখ নামিয়ে নিল। আসলে কি সে সত্যিই টিকিট চাইছিল? নাকি চাইছিল কেউ একজন আরো একবার বলুক— যেও না। প্ল্যাটফর্মের বাতাসটা কেমন যেন বদলে গেল। এতক্ষণ যারা চুপ ছিল, এবার তাদের ভেতরের কথাগুলোও আর চুপ থাকল না। সালমা বেগম এতক্ষণ দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখছিলেন। এই সাতদিনে হারিয়ে যাওয়া তার মেয়েটাকে। হ্যাঁ, মেয়েটা। বউমা না। এই সাতদিনে তিনি একবারও -বউমা কোথায়? ভাবেননি। তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরেছে, আমার মেয়েটা খেয়েছে তো? ঘুমিয়েছে তো? ভয় পায়নি তো? তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। একদম দ্রুত পায়ে এসে ধারার সামনে দাঁড়ালেন। ধারা চমকে তাকাল। পরের মুহূর্তেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই সালমা বেগম তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। আর তারপর ভদ্রমহিলা সত্যি সত্যি কেঁদে ফেললেন।
—” তুই এত নিষ্ঠুর হলি কীভাবে মা?”
ধারা জমে গেল। সালমা বেগম তার মুখ দুহাতে ধরে দেখতে লাগলেন।
—” এই সাতদিন কীভাবে ছিলি? কেমন ছিলি? খেয়েছিস? অসুস্থ হোস নি তো?”
ধারা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। সালমা বেগম চোখ মুছলেন। হাসার চেষ্টা করলেন। পারলেন না।
—” আমার উপর রাগ ছিল না মা?”
ধারা দ্রুত মাথা নাড়ল,
—” না।”
—” তাহলে আমারে শাস্তি দিলি কেন?”
ধারা মাথা নিচু করতেই সালমা বেগম ভাঙা গলায় বললেন,
—” তোর স্বামীর উপর রাগ থাকতেই পারে। থাক। আমি কিছু বলব না। ওর অনেক দোষ। খুব দোষ।”
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ মাথা নিচু করল। সালমা বেগম আবার বললেন,
—” ফিরে চল মা। ওকে মাফ করতে না পারলে করিস না। কথা বলিস না। আলাদা ঘরেই থাক। ঝগড়া কর। আমার সামনে বিচার দে। কিন্তু বাড়ি চল।”
ধারা আর মাথা তুলে তাকাতে পারল না। এতক্ষণ চুপ করে থাকা সামিউল শেখ গলা খাঁকারি দিলেন। সবাই তাকাল। ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বললেন,
—” আমি আবেগী কথা কম বলি। তবে একটা তথ্য দেই।”
ধারা তাকাল। সামিউল শেখ শান্ত গলায় বললেন,
—” গত সাতদিনে আমার ছেলে আসলেই কষ্ট পেয়েছে। আরেকটা সুযোগ দেয়া উচিত বোধহয়।”
নীল কাশি দিল। জিহান মুখ চেপে রাখল। সামিউল শেখ আবার বললেন,
—” ধারা, আজ আর টিকেট পাবেও না মা। এক কাজ করো। এখন বাড়ি চলো। আমরা কথা বলি। আর হতভাগাটাকে আরেকটা সুযোগ দাও। আমি অনুরোধ করছি, এ কথাটা রাখো। এরপর যদি কখনো মনে হয় তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, তাহলে আমিই তোমায় নিজ দায়িত্বে পাঠিয়ে দেব।”
সবাই অবাক হয়ে তাকাল। ভদ্রলোক শান্ত।
শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৭
—” কিন্তু এখন তুমি ওকে আরেকটা সুযোগ না দিলে তোমার শাশুড়িকে আমি সামলাতে পারব না। অন্তত আমাদের কথা ভেবে থেকে যাও।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল ভদ্রলোকের দিকে। চোখে একটা প্রশ্ন স্পষ্ট – কীভাবে থেকে যাবে সে? সামিউল শেখ এবারে সবাইকে পেরিয়ে এগিয়ে আসলেন। সবার আড়ালে ধারার কানে কানে কিছু একটা বললেন। কয়েক সেকেন্ড পরে ধারার চোখজোড়া চকচক করে উঠল। সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল, আর সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,- ঠিক আছে, বাড়ি চলুন মা।
