Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩
অনামিকা তাহসিন রোজা

সেই সময় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের রাজ্যে চলে গিয়েছিল ধারা। মাগরিবের আযানের ঠিক কিছুক্ষণ আগেই ঘুম ভাঙল তার। ফ্রেশ হয়ে নিয়ে দ্রুত বসার ঘরে চলে এলো সে। এসেই তব্দা খেয়ে গেল। কেননা বাড়িতে কেও নেই। সালমা বেগম এই সময়ে সাধারণত রান্নাঘরেই থাকে। তবে আজ নেই কেনো? ধারা গুটিগুটি পায়ে সালমা বেগমের ঘরে এসে উঁকি দিল। কিছু না দেখায় পুরোপুরি ভেতরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারল ঘরেও নেই তিনি। তবে গেলো কোথায়? ধারা সন্দিহান মন নিয়ে বসার ঘরে এসে সোফায় বসে পড়ল। তার খিদে পেয়েছে। দুপুরে ওই মেঝেতে পড়ে যাওয়া ভাতগুলোই খেয়েছে সব। তবুও যে কেনো আবার খিদে লাগছে কে জানে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বাইরে থেকে এক ব্যাগ ভর্তি করে শাক-সবজি ও প্রয়োজনীয় রান্নার কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাজির হলেন রুনিখালা। ধারা সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বলল

—” কী ব্যপার খালা? কোথায় গিয়েছিলেন? ব্যাগে এত কিছু কী?”
রুনিখালা পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে হেসে বললেন,
—” পুরা সপ্তাহের বাজার নিয়া আসছি। আর লবণ, চিনি, জিরা, চা-পাতা এইসবও শ্যাষ হইয়া গেছিল। খালাম্মা কইছে সব নিয়া আসতে। কাইল সকালে আইসা সব গুছামু।”
বলেই তিনি তাড়াহুড়ো করে ব্যাগগুলো রেখে শাড়ির আঁচল ঠিক করে মাথায় ঘোমটার মত করে দিলেন। ছোট্ট পার্সটা কোঁমড়ে গুঁজে নিয়ে বললেন,
—” আমি এখন যাইতাছি আম্মাজান। আমার মাইয়াডার আবার খুব জ্বর। বাড়িত একা আছে। যাই তাত্তাড়ি।”
ধারা মাথা নেড়ে বলল,
—” সে কি? জ্বর? তাড়াতাড়ি যান তাহলে। আর, বেশি সমস্যা হলে কাল আসতে হবেনা।”
রুনি বেগম হেসে বললেন,

—” সেই কথা আপনার শাশুড়ি আমারে আগেই কইছে। দুদিন ছুটি দিবারও চাইছে। কিন্তু আমি আবার কাম ফাঁকি দেয়ারও মানুষ না। সমস্যা না হইলে অবশ্যই আসমু।”
সালমা বেগমের প্রসঙ্গে আসতেই ধারা সতর্ক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” ভালো কথা, মা কোথায় খালা? আপনি কি জানেন? ঘরে তো নেই। পুরো বাড়িতেই নেই।”
রুনি বেগম কিছুক্ষন ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন। এরপর মনে পড়ার ভঙ্গিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন,
—” আইহায় রে! কেমনে ভুলে গেলাম। খালাম্মা আপনারে কইতে কইছে, উনি আজকের রাতটা মিরপুরে থাকবেন। আপনার খালা-শ্বাশুড়ির বাসায়। যাওয়ার সময় আপনারে বলতে চাইছিল, কিন্তু আপনি তো ঘুমাইতেছিলেন। তাই আমারে কইছে যেন কইয়া দিই, রাতের খাবারটা কষ্ট কইরা বানায় নিবেন, আর শ্রাবণ বাবারেও ডিনার দিয়া আসবেন। কাইল সকালেই চইলা আসবে খালাম্মা। আর সাবধানে থাকতে কইছে। কোনো সমস্যা হইলে কল দিতে কইছে।”
ধারা কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে তাকালো। এরপর মাথা নেড়ে কোনমতে বলল,
—” আচ্ছা। ”

রুনিখালা আর দেরি করলেন না। দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। ধারা মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থেকে ভাবল কিছু একটা। শ্রাবণ আর সে বাড়িতে একা ভাবতেই পিলে চমকে উঠলো মেয়েটা। এ কি বিপদ! ডিনার তৈরী করা কোনো কঠিন কাজ না। সেটা ধারা ভালোই করবে। কিন্তু শ্রাবণকে দিয়ে আসতে হবে কেনো? এটা তো জগতের সবচেয়ে ভয়ানক কাজ হয়ে গেল। সালমা বেগম বাড়িতে থাকলে ধারার সময় কাটতো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একটা শ্মশান ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারা সোফায় গিয়ে বসল। এরপর টিভি অন করল। একটার পর একটা চ্যানেল চেন্জ করতে করতে হুট করে একটা মুভির চ্যানেল পেলো সে। হিন্দি কোনো মুভি চলছে। একটু আগ্রহ দেখা গেল তার মধ্যে। মুভির নায়কটা দেখতে বেশ সুন্দর বলে ধারা রিমোট টা পাশে রেখে মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করল।
মেয়েটা মুভি দেখাতে এতটাই মনোযোগী হয়ে গেল, কেও যে সিঁড়ি বেয়ে নেমে তার ঠিক পরের সোফাটাতেই বসে পড়েছে সেটা লক্ষ্য করতে পারলো না। হাতে ল্যাপটপ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ধারার দিকে তাকালো শ্রাবণ। এরপর একইভাবে ধারার দৃষ্টি অনুসরণ করে টিভির দিকে তাকালো। এই মুভি শ্রাবণ হয়তো বিশ বারের বেশি দেখেছে। তবে তার থেকেও ভাবার মত বিষয় হলো ধারার এই অন্যমনষ্কতা দেখে শ্রাবণের বিরক্ত লাগল। সে এবার ল্যাপটপ খুলে গলা খাঁকারি দিল।

ধারা আবারো প্রায় চমকে গিয়ে পাশের সোফায় তাকাল। শ্রাবণ ইতোমধ্যে নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে নির্বিকার ভঙ্গিতে মনোযোগ দিয়ে রয়েছে। ধারা তড়িঘড়ি করে টিভির সাউন্ড কমাল। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল শ্রাবণকে। বুঝলো না তার কি টিভিটা বন্ধ করে দেয়া উচিত, নাকি এভাবেই নিজের মত করে থাকা উচিত? এই দোটানার মাঝে হুট করে আবার মুভির মধ্যে রোমান্টিক সিন শুরু হয়ে গেল। ধারা রীতিমতো হতবাক হয়ে একবার টিভির দিকে তাকালো, একবার শ্রাবণের দিকে তাকালো। টিভি থেকে ভেসে আসা শব্দে রোমান্টিক কথোপকথন ও মিউজক শুনতে পাওয়ায় শ্রাবণও ভ্রু কুঁচকে তাকালো টিভির দিকে। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়। মুভির কাপল তখনই লিপ কিস করতে শুরু করল। শ্রাবণ কপাল চোখ সব কুঁচকে টিভি থেকে চোখ সরিয়ে ধারার দিকে রাগান্বিত চেহারা নিয়ে তাকালো। ধারা আশাও করেনি এসব হবে। তার চেহারা রীতিমত টমেটোর ন্যয় লাল হয়ে গেল। হাত পা কাঁপতে শুরু করলেও সেভাবেই কাঁপা হাতে কোনোমতে রিমোট টা নিয়ে সাথে সাথে অফ করে দিল টিভিটা। এরপর রিমোট দুরে ছুঁড়ে ফেলে মাথা নিচু করে বসে রইলো। লজ্জায় মরে যেতে মন চাইছে তার। এসব মুভির কি কমনসেন্সও নেই। এতক্ষণ ধারা একা দেখছিল, তখন তো এসব সিন আসেনি। যখনই শ্রাবণ আসলো, তখনই এদেরও রোম্যান্স করতে মন চাইলো? ছিহ!
টিভি বন্ধ হতেই ঘরটা হঠাৎ অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেল। ধারা মাথা নিচু করে বসে আছে। কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে। এখন কী করবে সে? মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিড়বিড় করে বলল,

—” ইডিয়ট!”
ধারা আবারো আড়চোখে তাকালো শ্রাবণের দিকে। তাকে কিছু বলা হলো নাকি নিশ্চিত হতে চাইলো। এর মাঝেই শ্রাবণ খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করল,
—” কীসব দেখো এগুলো?”
ধারা কেঁপে উঠলো প্রশ্নে। মাথা আরও নিচু হয়ে গেল। কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—” আ..আমি দেখছিলাম না…মানে..ওই..এমনি চালু ছিল…আমি তো..টিভিই দেখিনি কখনো।”
কথাগুলো এলোমেলো হয়ে গেল তার মুখে। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।
—”এমনি এমনি এসব চালু থাকে?”

তার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট। ধারা এবার আর কিছু বলল না। শুধু ঠোঁট কামড়ে চুপ করে বসে রইলো। আঙুল দিয়ে নিজের ওড়নার কোনা মুচড়াতে লাগলো। ঘরের ভেতর হালকা চাপা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়লো। শ্রাবণ আবার ল্যাপটপের দিকে তাকালেও তার মনটা পুরোপুরি সেখানে নেই। বারবার চোখ চলে যাচ্ছে ধারার দিকে। মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে। চুপচাপ, গুটিয়ে থাকা খরগোশের মত। রিডিকুলাস!
ধারার মন চাইলো দৌঁড়ে এখান থেকে চলে যেতে। কিন্তু পা দুটোও বেইমানি করছে। শক্তি নেই এখান থেকে ছুটে যাওয়ার। তাই চুপচাপ বসে তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। লোকটা কি সুন্দর করে ল্যাপটপে কাজ করছে। দেখেও ভালো লাগে। ধারা মনে করল সে এভাবে তাকিয়ে থাকলেও শ্রাবণ বুঝতে পারবেনা। কিন্তু শ্রাবণ ঝট করে তাকালো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। চোখে চোখ পড়তেই ধারা চোখ সরিয়ে নিল চমকে গিয়ে। আবারো নড়েচড়ে হাঁটু উঠিয়ে বসে রইলো। কিছুক্ষন পর শ্রাবণ টেবিলে ল্যাপটপ টা রেখে কিচেনে গেল। ধারা উঁকি মেরে দেখল শ্রাবণ কফি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখেই এলোমেলো পায়ে দ্রুত কিচেনে চলে গেলো ধারা। বলল,

—” আপনি কফি খাবেন? আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
—” গেট আউট।”
শ্রাবণের ঠান্ডা কন্ঠস্বর।
ধারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো বলল,
—” আমি বানাতে পারি তো। আপনি যান, কাজ করুন। আমি বানিয়ে দিই?”
সাথে সাথে উত্তর দিল না শ্রাবণ। হাতের চিনির বক্সটা রেখে ধারার দিকে ঘুরে তাকালো। শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
—” তোমার সমস্যা টা কী? আমার পিছু পিছু ঘুরো কেনো তুমি? সবসময় আমার চোখের সামনে ঘুরঘুর করো কেনো? বলেছিনা আমার সামনে আসবেনা। কথা কি কানে যায়না? ভদ্র ভাষা বুঝতে পারো না?”
বলেই আবারো নিজের কাজে ব্যস্ত হলো শ্রাবণ। ধারা কিছুক্ষণ হতাশ নয়নে তাকিয়ে থেকে বলল,

—” আমি তো আপনাকে বিরক্ত করছি না।”
—” তোমার উপস্থিতিই আমায় বিরক্ত করে। চোখের সামনে থেকে যাও প্লিজ।”
ধারা ধীরে ধীরে মাথা তুললো। চোখে লজ্জা, ভয়, অস্বস্তি, সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অবস্থা। মিনমিন করে বলল,
—” ঠিক আছে। ”
বলেই পিছু ঘুরে প্রস্থান নেয়ার জন্য এক কদম এগোল ধারা। তৎক্ষনাৎ হঠাৎ করে শ্রাবণের মুখ থেকে ব্যথার আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। গরম পানি ভর্তি কেটলিটা হাত ফসকে কাত হয়ে পড়তেই ফুটন্ত পানি ছিটকে এসে পড়লো তার হাতের ওপর। ধারা এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালো।
—” আল্লাহ!”
সব ভুলে, সব অপমান ভুলে দৌড়ে ফিরে এলো সে। শ্রাবণ ইতোমধ্যে দাঁত চেপে হাতটা ধরে আছে। মুখ শক্ত, কিন্তু চোখে স্পষ্ট যন্ত্রণা।
ধারা এক মুহূর্তও দেরি করলো না। দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাতটা টেনে নিয়ে সিঙ্কের কল খুলে দিলো। ঠান্ডা পানির নিচে ধরে রাখলো শক্ত করে।

—” এভাবে ধরুন…না না, ছাড়বেন না..জ্বালা করবে।”
তার কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু হাত স্থির। শ্রাবণ প্রথমে কিছু বলার চেষ্টা করলেও ঠান্ডা পানির স্পর্শে একটু স্বস্তি পেয়ে চুপ করে গেলো। শ্রাবণ কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই প্রথম, এতটা কাছ থেকে, এতটা মন দিয়ে। ধারার চোখে তখন ভয়, উৎকণ্ঠা আর একরাশ অদ্ভুত মায়া।
—” একটু দাঁড়ান..!”
বলেই ধারা দ্রুত পাশের তাক থেকে একটা পরিষ্কার কাপড় নিয়ে ভিজিয়ে এনে আলতো করে চেপে ধরলো তার হাতে। তাড়াহুড়ো করে তার হাতটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো। শ্রাবণ এবারে হাত এক ঝটকায় সরিয়ে নিল।
—” ডোন্ট টাচ মি।”
ধারা অপমানিত বোধ করে মাথা নিচু করল। কিন্তু আবারো জিজ্ঞেস করল,
—” লাল হয়ে গেছে তো.. জ্বলছে না? বরফ এনে দিই?”
শ্রাবণ এবার চোখ সরিয়ে নিল। গলা একটু ভারী,
—” দরকার নেই।”

শ্রাবণ আর কোনো কথা না বলে সোজা ফ্রিজের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে বরফের ট্রে টেনে বের করল। হাতটা একটু শক্ত করে ধরে আছে সে। স্বভাবগত ভাবেই পুরুষ কাউকে বুঝতে দিতে চায় না ঠিক কতটা কষ্ট পায় সে। ধারা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ যেন নিজের কাজটা খুঁজে পেল। দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে কফি বানাতে শুরু করল সে।
হাত কাঁপছে হালকা। তবুও যত্ন করে সবকিছু করছে। পানি বসানো, কফি, চিনি মাপা সব এক এক করে করে ফেলল। পেছন থেকে বরফে হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে তার দিকে।
দ্বিতীয় বার মানা করল না। বানাতে চাইছে যখন, বানিয়ে নিক।
বানানো শেষ হলে ধারা দুটো কাপে কফি ঢালল। একটা কাপ এগিয়ে এনে একটু ইতস্তত করল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে শ্রাবণের দিকে এগিয়ে দিল,
—” কফি..!”
শ্রাবণ এক ঝলক তাকালো তার দিকে। তারপর কিছু না বলেই কাপটা নিয়ে নিল। ধারা হাত নামিয়ে নিল ধীরে। কয়েক সেকেন্ড, কেউ কথা বললো না। শ্রাবণ এক চুমুক দিল কফিতে। ধারাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,

—” সমস্যা কী?”
—” ক-কফি ঠিক আছে?’
ধারার প্রশ্নে ভয়। সে আসলেই জানে না তাড়াহুড়ো করে কী বানাল।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে আবারো এক চুমুক খেয়ে বলল,
—” ঠিক আছে। চিনি কমই খাই আমি।”
ধারা চমকে তাকালো। এটা কি প্রশংসা? নাকি শুধু একটা তথ্য? সে কিছু বললো না। শুধু খুব আস্তে মাথা নেড়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল। এবারে ধীরে অপর কাপটা নিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে শুরু করল। শ্রাবণ এক মুহুর্তের জন্য তখন ভেবেছিল ধারা অন্য কাপটা নিজের জন্য বানিয়েছে। কিন্তু এবারে ধারাকে কফির কাপ নিয়ে উপরে যেতে দেখে বিরক্তিতে শ্বাস ফেলল শ্রাবণ। রীতিমতো ধমক দিয়ে ডাকলো ধারাকে,
—” এই মেয়ে?”
ধারা চমকে পিছু ঘুরলো,
—” জ্বি?”
—” যাচ্ছো কোথায় তুমি?”
—” আভা আপুকে কফি দিতে।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েই রইলো। সোফায় গিয়ে বসতে বসতে বলল,
—” ও চলে গেছে।”
কথাটা শুনে ধারা একটু থমকে গেল। চলে গেছে? তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। সে তো বুঝতেই পারেনি কখন বেরিয়ে গেল আভা। কয়েক মুহুর্ত গেলে খুব আস্তে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল ধারা। অদ্ভুতভাবে বুকটা হালকা লাগছে। যেন ঘরের ভেতর জমে থাকা ভারী কিছু হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গেছে। নেই! এই ভাবনাটা আসতেই কেন যেন ভীষণ স্বস্তি লাগলো তার। কিন্তু সেই স্বস্তিটা বেশিক্ষণ টিকলো না। ধারা ধীরে ধীরে আবার এগিয়ে এলো। সোফার পাশে এসে দাঁড়াল। হাতে ধরা কফির কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এই কফিটা সে বানিয়েছিল আভার জন্য, এখন? ফেলে দেবে? নাকি? ধারা একটু ইতস্তত করল। তারপর খুব আস্তে বলল,

—” তাহলে এই কফিটা..?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—”কী?”
ধারা কাপটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” মানে এটা আমি ওনার জন্য বানিয়েছিলাম.. এখন এটা কী করব?”
তার গলায় দ্বিধা, চোখে সংকোচ।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,
—” কফিতে কি বিষ মিশিয়েছো?”
ধারা আঁতকে উঠে দুদিকে মাথা নাড়াল,
—” না তো। এসব কেমন কথা! ছিহ।”
—” তাহলে নিজে খেতে পারছো না? আশ্চর্যকর কথাবার্তা শুরু করেছো কেনো ইডিয়ট। আর না খেলে ফেলে দাও। আমার সাথে অযৌক্তিক কথা বলতে আসবেনা।”
ধারা চুপ করে গেল। কাপটা একটু শক্ত করে ধরল।
ফেলে দিতে মন চাইল না তার। খাবার নষ্ট করতে তার সবসময়ই কষ্ট লাগে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব আস্তে বলল,
—” আমি..খেয়ে নিতে পারি?”

শ্রাবণ একটু অবাক হয়ে তাকালো। ধারার চোখ নিচু, কণ্ঠ নরম, যেন অনুমতি চাইছে। অথচ শ্রাবণ যে প্রথমেই তাকে এই ইঙ্গিত দিয়েছে তা কি বলদ মেয়েটা বুঝলো না। কিছুক্ষণ নীরবতা। বিরক্ত হলো শ্রাবণ। মেয়েটা চরম গাধা! এই ভেবে তারপর শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
—” তোমার ইচ্ছা।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২

ধারা আর কিছু বলল না। চুপচাপ সোফার এক কোণায় বসে পড়ল। দু হাতে কাপটা ধরে ছোট করে এক চুমুক দিল। মনে মনে ভাবতে থাকলো রাতে ডিনারের জন্য কী রান্না করা যায়? উনি কী খাবে? জিজ্ঞেস করবে কি? আবারো যদি ধমক দেয়? ধারা সিদ্ধান্ত নিল নিজের মত করে খাবার বানাবে। তার বিশ্বাস ধারার রান্না শ্রাবণ অপছন্দ করবেনা। রান্নাতে ছোট থেকেই পটু হওয়ায় খুব সুন্দর রান্না পারে সে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত কফিটা শেষ করল ধারা। এখনি রান্নার আয়োজন করতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here