Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ৬

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৬

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৬
অনামিকা তাহসিন রোজা

১০ ঘন্টা পার হয়েছে। ডক্টরের কথানুযায়ী ২৪ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়নি। কেনো যেন হুট করেই ধারার মাঝে অনেক শক্তি সঞ্চয় হয়েছে। সন্ধ্যা সাতটায় নার্স কেবিনে এসে দেখেছে ধারা নিজে থেকেই অক্সিজেন মাস্ক খুলে উঠে বসেছে। আর চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে সাদা পর্দা দিয়ে মোড়ানো জানালার দিকে, অন্ধকারেও কৃত্রিম আলোয় শহরের কোলাহল টের পাওয়া যায়৷ ধারা অবাক হয়। এত এত মানুষ এ পৃথিবীতে। অথচ তার আপন কেওই নেই। কেনো নেই? আচ্ছা সে শুনেছে মানুষ একা থাকতে পারেনা, আর থাকতে হয়ও না। সব মানুষের জন্যই নাকি সৃষ্টিকর্তা সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন। তবে তার কেও নেই কেন? থেকেও নেই। কি আশ্চর্য! ধারার ভাবনার মাঝেই নার্সটা এসে ধারার পাশে এসে দাঁড়াল। হাতে দুটো মেডিসিনের পাতা।

—” এক্সকিউজ মি ম্যাম।”
ধারা চমকে তাকাল। হেসে বলল,
—” জ্বি?”
—” আপনি মাশা-আল্লাহ বেশ শক্ত। আর খুব সাহসী। শারিরীকভাবে এখনো একটু দূর্বলতা থাকলেও মানসিকভাবে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছেন।”
ধারা আবারো মুচকি হেসে বলল,
—” সবটাই অভ্যাস।”
নার্সটি এবারে দুটো ট্যাবলেট নিয়ে ধারার হাতে দিল। পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস পানিও এগিয়ে দিল। ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—” আমি..আমি ঔষধ খাইনা সিস্টার! ”
নার্সটি অবাক হলো।
—” মানে?”
ধারা অস্বস্থিবোধ করল। তবুও হেসে বলল,
—” আমি বিশ্বাস করি এসব ঔষধপত্র ছাড়াই আমি সুস্থ হয়ে যাব। এটা নতুন কিছু না। আমি ছোট থেকেই কখনো এসব খাইনি। অসুস্থ হলে নিজে থেকেই সুস্থ হয়েছি। এসবের দরকার হয়না।”
নার্সটি হেসে ফেলল,

—” কিন্তু ম্যাম এটা সিরিয়াস কন্ডিশন। আপনাকে খেতেই হবে। এইযে এটা খাবার খাওয়ার আগে খেতে হয়, নিন। আর খাওয়ার পর এটা খাবেন। ”
ধারা এবারে মেডিসিন টা হাতে নিয়ে রেখে উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আপ..আপনি কি বলতে পারবেন উনি..মানে আমার হাজবেন্ড এখানে আছে কিনা।”
নার্সটি এবারে এমনভাবে তাকাল যেন ধারার স্বামীর প্রতি তার অনেক ঘৃনা। মুখ কুঁচকে বিরক্ত হয়ে মেয়েটি বলল,
—” না ম্যাম। সেই সকালে আপনার জ্ঞান ফেরার পর হসপিটাল থেকে বেরিয়েছে, তারপর থেকে তো আর আসেনি। সারাদিনে তো আসলো না।”
ধারার মুখটায় আঁধার নেমে এলো। ইশ! কত নিষ্ঠুর লোকটা। একেবারে ফেলে রেখেই গেল। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে সেটাও দেখল না। দুপুরে খেয়েছে কিনা তারও খবর নিল না। ধারার বিষন্ন মন ব্যাথিত হলে নার্সটি এবারে বাকি মেডিসিন গুলো সাজাতে সাজাতে মুখ ভেঙচিয়ে বলে,
—” আপনার হাজবেন্ড বোধহয় খুব খারাপ তাই না ম্যডাম? আপনাকে নিয়ে তো চিন্তাই করেনা, একদম ডোন্ট কেয়ার ভাব তার। জানেন ম্যম, আমার স্বামীটাও না ঠিক এরকম। কুকুরটাকে আর সহ্য হয়না আমার, সিদ্ধান্ত নিছিলাম ডিভোর্স দেব। কিন্তু আমার আপন বাপ-মা-ই আমার কষ্ট বোঝে না। আমার সুখের থেকে তাদের সমাজে সম্মানটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডিভোর্সি মেয়েরা নাকি চরিত্রহীন হয়। হায়রে সমাজ! হাহ! নিজের বলতে পৃথিবীতে কিছুই নেই। আপনার হাজবেন্ড তো আরো খারাপ। এসব লোক দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত হলে কী হবে? ভেতরে ভেতরে কয়লা! ”

ধারার পছন্দ হলো না নার্সটির কথা। শ্রাবণকে নিয়ে এত বাজে কথা সে শুনতে পারল না। নিজের স্বামী যতই খারাপ হোক না কেনো, বাইরের কেও যদি তাকে অপমান করে তবে বাঙালি মেয়েরা মেনে নিতে পারে না। যতই হোক, মায়া আছে তো। ধারা সাথে সাথে নিজের মনের অবস্থা লুকিয়ে হেসে বলল,
—” না না, যেমন ভাবছেন তেমন না। উনি ভীষণ ভালো মানুষ। বাবা-মা কে সম্মান করে। পরিবারের কথা ভাবে। দায়িত্বশীল। নেশাপানিও করে না। কখনো পরনারীর দিকেও তাকায় না। আমার সাথেও…
একটু থামলো ধারা, এতক্ষণ যা বলেছে তা সত্যি। কিন্তু, মিথ্যে বলতে গিয়ে এবারে জ্বিভ কাঁপলো তার, তবুও বলল,
—” আমার সাথেও ভালো আচরণ করে। ভীষণ ভালোবাসে আমাকে। আসলে একটু রেগে আছে আমার উপর, আর অফিসে অনেক জরুরি মিটিং আছে তো। সারাদিন ওখানেই ব্যস্ত ছিল। একটু পরেই নিতে আসবে হয়তো।”
নার্সটা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো ধারার দিকে। ধারার মুখে হাসি আছে ঠিকই, কিন্তু সেই হাসির ভেতর যে কতটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে—তা বুঝতে তার খুব একটা সময় লাগল না। হাতে থাকা মেডিসিনের স্ট্রিপটা আস্তে করে টেবিলে রেখে দিল সে। মুখের সেই আগের বিরক্তি মিলিয়ে গেছে। কণ্ঠও নরম হয়ে এলো,

—” আচ্ছা ম্যাম।”
আর কিছু বলল না নার্সটি। ধারার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক সেকেন্ড। ওর ভেতরের না বলা কথাগুলো বোঝা সহজ।ত খুব ধীরে, একটু হেসে নার্সটা আবারো বলল,
—” আসলে, আমরা মেয়েরা না, একটু অদ্ভুত হই ম্যাম।
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নার্সটা নিজের কথাটা গুছিয়ে নিল,
—” ভালোবাসলে খুব খারাপভাবে ভালোবাসি। প্রেমে পড়লে নিজেকেও হারিয়ে ফেলি। কি অদ্ভুত! নিজের কষ্টটা নিজেই লুকিয়ে রাখি, কিন্তু যার জন্য এই কষ্ট, তার দোষটা কখনো দেখতে চাইনা। মানতে কষ্ট হয়।”
একটু থামলো সে। কথাটার ভেতরে কোনো ব্যঙ্গ নেই এবার। ধারা চুপ করে রইলো। মুচকি হাসিটা এখনো ঠোঁটে আছে, কিন্তু চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। নার্সটা আবার হেসে বলল,

—” ঠিক আছে, আমি আর কিছু বলব না।”
একটু এগিয়ে এসে গ্লাসটা আবার হাতে ধরিয়ে দিল,
—” আগে এইটা খেয়ে নিন ম্যাম। শরীরটা ঠিক করা জরুরি।”
ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ট্যাবলেট দুটার দিকে।
তারপর ধীরে গ্লাসটা নিল। আজকে কেনো যেন নিজের জেদের উপরেও ভরসা পেল না। শরীরটা সত্যিই খুব ক্লান্ত, ওষুধটা মুখে দিয়ে পানি খেলো।
নার্সটা হালকা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল,
—” এই তো। এভাবেই ভালো হয়ে যাবেন ইনশা-আল্লাহ। একটা কথা বলি ম্যাম?”
ধারা মাথা নেড়ে বলল,
—” বলুন।”
—” আমি জানি আপনার হাজবেন্ড আসবে। কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। আপনাকে দ্রুত মেডিসিন নিতে হবে। আমি ক্যান্টিন থেকে খাবার এনে দিই। আপনি খেয়ে নিন?”
ধারা একটু গড়িমসি করল। খিদে পেয়েছে ভীষণ। গতকাল দুপুরে একটু বাসি ভাত খেয়েছে। এখন পর্যন্ত পানি ছাড়া পেটে কিছু পড়েনি। তার খাওয়া দরকার। ডক্টরও বলে গিয়েছে। কিন্তু… ধারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—” দরকার নেই। উনি আসুক।”
নার্সটা মনে মনে খুব দুঃখ পেল। মুখ ফঁসকে বলেই ফেলল,
—” এত কিছুর পরেও… আপনি আপনার হাজবেন্ড কে অনেক ভালোবাসেন, তাই না?”
ধারার হাসি মিলিয়ে গেল। নার্সটিকে দেখে মনে হলো খুব সন্দিহান হয়েই জিজ্ঞেস করেছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে ধারা আবারো হাসল। নার্সটির হাত ধরে বলল,
—” কেনো? আপনি আপনার হাজবেন্ড কে ভালোবাসেন না?”
নার্সটি যেন তব্দা খেলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। এরপর এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে চলে যেতে যেতে বলল,
—” খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তো আমার! ওর মত জানোয়ারকে কে ভালোবাসবে? লা’থি মা’রি ওর সংসারে হুহ!”
বলেই গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল নার্সটি। ধারা সেদিকে তাকিয়ে একটু হাসল। ভীষণ মজা পেল। এ-ই হলো এক সমস্যা। যারা ভালোবাসবে, তাদের স্বামী মে’রে ফেললেও তারা নিজেদের স্বামীকে ভালোবেসে যাবে। মুখে যতই বলুক না কেনো! যতই কুকুর, জানোয়ার বলে গালি দিক না কেনো, দিন শেষে সেই জানোয়ারের জন্যই রাত জেগে কাঁদবে, সারাদিন তার জন্যই চিন্তা করে চোখের নিচে কালি ফেলবে, তার সুস্থতা, নিরাপত্তার জন্যই জায়নামাজ অশ্রুতে ভেজাবে। কি আশ্চর্য!
ধারা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকালো। বাইরে শহরের আলো ঝলমল করছে। গাড়ির হেডলাইট ছুটে যাচ্ছে একটার পর একটা। এত মানুষ, এত জীবন, কিন্তু তার নিজের জীবনে, একটা মানুষ থেকেও যেন নেই। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটলো আবার। নিজেকেই খুব আস্তে বলল,
—” আমি চলে গেলে সত্যিই খুশি হবে উনি? ভালো থাকবে? কখনো এমন করে রাগ করবেনা? ঠোঁটে হাসি ফিরবে?”
চোখের কোণ থেকে একটা জলবিন্দু গড়িয়ে পড়লো ধীরে। কেউ দেখলো না। শুধু নিঃশব্দে, একটা মেয়ের ভেতরের পৃথিবীটা একটু করে ভেঙে পড়লো, আবার নিজেই জোড়া লাগাতে শুরু করলো।

আরো এক ঘন্টা পর শ্রাবণ হসপিটালে এলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে কেবিনে ঢুকল। ধারা বসে বসে দুহাতের আঙুল নিয়ে কিছু একটা করছিল। ক্যানুলা খুলে ফেলাতে হাত নাড়াতে ব্যাথা পাচ্ছিল। দরজা খোলার শব্দে চোখ তুলে তাকিয়ে শ্রাবণকে দেখতেই সে আঁতকে উঠে সোজা হয়ে বসল। শ্রাবণ কোনো কথা না বলে দ্রুত টুল টেনে ধারার বেডের পাশে বসল। ধারা সন্দিহান কিন্তু অস্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে শ্রাবণের দিকে। অথচ শ্রাবণ একবারো তাকাল না, একবারো জিজ্ঞেসও করল না- কেমন আছো। বরং সাথে আনা মাঝারি সাইজের ব্যাগটা থেকে আঙুর, আপেল, কমলা আর বেদানা বের করে প্লেটে রাখল। সবকিছু গুছিয়ে বাড়ি থেকে আনা চাকু হাতে নিয়ে মুহুর্তেই কে’টে পিস পিস করল ফলগুলো। ধারা পুরো সময়টাই শ্রাবণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণের চেহারা ফ্যাকাসে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দাগ, শার্টটাও কুঁচকানো, মলিন। অফিস থেকে এসেছে দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু এ অবস্থা কেনো? লোকটা কি তাড়াহুড়ো করেছে?
ধারার ভাবনার মধ্যেই শ্রাবণ এবারে ফলে ভরা প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

—” খাও।”
এরপর কমলার খোসা খুলতে শুরু করল। ধারা বিনা তর্কে প্লেটটা এগিয়ে নিয়ে মিনমিন করে বলল,
—” আপনি… দুপুরে খেয়েছেন?”
শ্রাবণ নিজের কাজ করতে করতেই এবারে চোখ তুলে তাকাল। নাহ, দৃষ্টি এখনো কোমল না। সেই আগের মত নিষ্ঠুরই রয়েছে। ভ্রু কুঁচকে সে বলল,
—” দ্যাটস নান অফ ইওর বিজনেস।”
ধারা এবারে নিজেও ভ্রু কুঁচকালো। কেবল নেয়া প্লেটটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
—” দ্যান, দ্যাটস অলসো নান অফ ইওর বিজনেস।”
শ্রাবণ বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল। কমলা দুটো খোসা ছাড়িয়ে প্লেটে রেখে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
—” বাহ। জবান চলছে তো ভালোই। যত দ্রুত অসুস্থ হও, তত দ্রুতই সুস্থ হও। গ্রেট!”

ধারা ভ্রু কুঁচকে অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলো। একবারো সেদিকে তাকাল না শ্রাবণ। দাঁত চেপে ধরে বলল,
—” নাটক করো না মেয়ে। এসব ন্যাকামো দেখার সময় নেই আমার। শুধু শুধু এসব খেতে বলছি না। সুস্থ হয়ে উদ্ধার করো আমায়। কিছু হয়ে গেলে তো আমারই বোঝা হও৷ যেমন আজকের পুরো দিনটা নষ্ট করেছো আমার।”
ধারার ভীষণ কান্না পেল। সারাটা দিন তো লোকটা হসপিটালেই ছিল না। তাহলে কীভাবে দিন নষ্ট হলো তার। ধারার মন বিষাদে ভরে গেল। আবারো রাগও উঠছিল। সে এবারে জেদ ধরে কান্না চেপে বলল,
—” কীভাবে দিন নষ্ট হয়েছে আপনার? আপনি কি আমার জন্য এখানে সারাদিন বসে ছিলেন? নাকি ডক্টরের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করেছেন? নাকি, আমি ডেকেছিলাম আপনাকে?”
কথাটা বলেই থেমে গেল ধারা। নিজের গলার স্বর নিজেই যেন চিনতে পারল না। খুব জোরে বলেনি, কিন্তু কথাটার ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা চাপা থাকেনি। শ্রাবণের হাত থেমে গেল মুহূর্তে।
কমলার কোয়া আলাদা করতে করতে স্থির হয়ে রইলো কিছু সেকেন্ড। তারপর ধীরে মাথা তুলে তাকাল। দৃষ্টি এবার আগের চেয়ে তীক্ষ্ণ।

—” কী বললে?”
ধারা গিলল ঢোক। ভয় পেয়েছে, তবুও থামল না।
—” বললাম, আমি তো আপনাকে আসতে বলিনি। আর আপনি সারাদিন এখানে দায়িত্ব পালনও করেন নি। আপনার তো দিন নষ্ট হওয়ার কথা নয়।”
শ্রাবণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল, সেই চেনা তাচ্ছিল্যের হাসি।
—” তাই নাকি?”
চেয়ারটায় একটু পেছনে হেলান দিল সে।
—” তাহলে এখানে না খেয়ে পড়ে ছিলে কেন? দুপুরে খাওনি, রাতেও আমি না আসা পর্যন্ত খাওনি। এসব কেনো? নাটকটা সম্পূর্ণ করতে?”
ধারার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে।
—” নাটক?”
শব্দটা খুব আস্তে বের হলো তার ঠোঁট থেকে। শ্রাবণ এবার সোজা হয়ে বসল,

—” হ্যাঁ, নাটক। সারারাত বাথরুমে পড়ে থাকো, তারপর অজ্ঞান হয়ে যাও। ইজেন্ট ইট আ টিপিকাল ক্লাসিক ড্রামা। আমাকে গিল্ট ট্রিপ করানোর চেষ্টা, রাইট?”
ধারার চোখ ভিজে উঠল এবার। সে মাথা নাড়ল ধীরে,
—” এত ছোট মানসিকতা? আপনি.. সত্যিই এমনটা ভাবেন?
—” আর কী ভাববো?”
শ্রাবণের উত্তরটা দ্রুত। একটুও থামল না।
—” তোমার মতো মেয়েরা এসবই করে৷ তুমি কী মনে করেছো? তুমি বাংলা সিরিয়ালের মত নিজে থেকেই খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকবে, আর আমি গিল্টি ফিল করব? তোমাকে এসে খাইয়ে দেব? আমার কি আর কোনো কাজ নেই? তুমি নিজেই নিজের খেয়াল রাখো না, দ্যটস ইওর ফল্ট।”
ধারা চুপ করে রইলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর খুব ধীরে বলল,
—” আপনি…আপনি এতটা নিচ? এতটা নিচু মন আপনার? যেসব কথা আমার চিন্তাতেও আসেনি, আপনি সেসবও নির্দ্বিধায় বলছেন! ”

ধারা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। এবার সে বুঝতে পারছে সে আবারো মানসিক শক্তি হারাচ্ছে। ধারার কণ্ঠটা কাঁপছিল, কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট ছিল। যেন বুকের ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট একসাথে বেরিয়ে এলো। শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। চোখে বিরক্তি ছিল, কিন্তু সেই বিরক্তির ভেতরে কোথাও যেন খুব সূক্ষ্ম একটা দ্বিধাও খেলে গেল, যেটা সে নিজেই বুঝতে চাইল না।
—”ডোন্ট ওভার রিয়েক্ট,” ঠান্ডা গলায় বলল সে,
-“নিজেকে এতটা ইনোসেন্ট দেখানোর দরকার নেই। আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না।”
ধারা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো, কিন্তু সে হাত তুলে মুছল না। কাঁদতে কাঁদতেই তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের দিকে।
—”মানুষ চিনতে ভুল করেন না? তাহলে আমায় চিনলেন কোথায়? একটা দিন…একটা মুহূর্তও কি চেষ্টা করেছেন?”
শ্রাবণ চুপ। ধারা ধীরে ধীরে বলতেই থাকলো,
—”আপনি যেদিন আমাকে এই ঘরে এনে রাখলেন, সেদিন থেকেই আমি চেষ্টা করছি। আপনার পছন্দ অপছন্দ বুঝতে..আপনার রাগ সহ্য করতে, আপনার জন্য রান্না করতে, আপনার জন্য অপেক্ষা করতে, আপনার মন বুঝতে…সবকিছুতে চেষ্টা করেছি। আমি নাটক জানি না।”
শ্রাবণের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গভীর হলো। ধারা এবার চোখ নামিয়ে নিল। কেবিনটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। শ্রাবণ হঠাৎ বিরক্তির ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো।

—”ড্রামাটিক ডায়ালগ বললে কিছু বদলায় না।”
কিন্তু গলার স্বরটা আগের মতো কঠিন থাকলো না পুরোটা। ধারা আর কিছু বলল না। শুধু পাশ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লো। মুখটা জানালার দিকে রাখল, যেন আলো-অন্ধকার মিশে থাকা শহরটার ভেতরেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। একটু পরে খুব আস্তে বলল,
—” আমি যদি অসুস্থ হয়ে মরেও যাই, তবুও আপনি আর কোনোদিনও আমার দিকে তাকাবেন না প্লিজ। হসপিটালে আনা তো দূরের কথা, রাস্তার কুকুরকে যেভাবে ইগনোর করেন, সেভাবে ইগনোর করবেন। আপনি যদি সত্যিকারের মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে এই কথাটা মনে রাখবেন।”
শ্রাবণ দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। অদ্ভুত এক অনুভূতি বুকের ভেতর ধাক্কা দিচ্ছিল। রাগ? বিরক্তি? না কি অপরিচিত কিছু? সে কিছু বলল না। শুধু টেবিলের ওপর রাখা ফলের প্লেটটা একটু এগিয়ে দিয়ে ধীর পায়ে দরজার দিকে হাঁটলো। দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল এক মুহূর্ত। পেছনে তাকাল না। তবুও অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, পেছনে যে মেয়েটা চুপচাপ শুয়ে আছে, সে আর আগের মতো নেই। আর হয়তো, তার নিজের ভেতরেও কোথাও কিছু বদলাতে শুরু করেছে, যেটা সে এখনো স্বীকার করতে প্রস্তুত না।
শ্রাবণ থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য।কিন্তু পরক্ষণেই শক্ত কন্ঠে নির্দেশ দিল,

—” ঠিক আছে। বাকি ড্রামা পরে করো। এখন দ্রুত তৈরী হয়ে বাইরে এসো। বাড়িতে যেতে হবে। আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি।”
শ্রাবণ চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই ধারার ভেতরটা হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে গেল। এই মানুষটার জন্যই সে এতক্ষণ নিজেকে বুঝিয়েছে, সবাইকে বুঝিয়েছে, আর এই মানুষটাই, একবারও ভাবলো না সে বেঁচে থাকবে কি না। ঠোঁট কাঁপছে তার।
—” আচ্ছা।”
খুব আস্তে বলল সে। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো,
—” প্লেটটা ফাঁকা করে আনবে।”
ধারা এবার সোজা হয়ে বসল। চোখে পানি থাকলেও গলাটা স্থির,
—” ঠিক আছে। আপনি গাড়িতে গিয়ে বসুন। আমায় দশ মিনিট সময় দিন। আসছি।”
কথাগুলো খুব শান্তভাবে বলল সে। কিন্তু সেই শান্তির ভেতর একটা ভাঙা শব্দ লুকিয়ে আছে, যেটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই প্রথম, ধারা তাকে তাড়াচ্ছে। না চেঁচিয়ে, না কেঁদে, শুধু দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কেবিনের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আর কিছু না ভেবে শ্রাবণ প্রস্থান নিল।
সাথে সাথেই সেই নার্সটি কেবিনে ঢুকে পড়ল।

—” ম্যাম, এখন তাহলে আপনাকে খাবার এনে দিই।”
—” লাগবেনা সিস্টার। এই ফলগুলো খেলে হবেনা?”
নার্সটি কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল,
—” উম..হ্যাঁ হবে। তবে পরে ভারি কিছু অবশ্যই খাবেন বাড়িতে গিয়ে। মেডিসিন রেখে যাচ্ছি। খেয়ে নেবেন। আর ভালো থাকবেন।”
ধারা হাসল। নার্সটি চলে যেতে ধরলেই ধারা ডেকে উঠলো,

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৫

—” সিস্টার শুনুন!”
—” জ্বি ম্যাম?”
—” আপনার কাছে ফোন আছে?”
—” শিওর ম্যাম আছে! ”
—” একটা কল করতে পারি?”
—” ইয়াহ শিওর।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here