Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫ (২)
‎আফীফা আফনান

‎​”ধুর ভাই! আমরা এতো রাইতে এখানে বইসা আছি ক্যান, এই বা*লের মশার কামড় খাইতে?”—পায়ের ওপর চেপে বসা মশাটাকে সশব্দে থাপ্পড় মেরে তাড়াতে তাড়াতে কবিরকে উদ্দেশ্য করে বিরক্ত মুখে কথাটা বলে উঠল উনিশ-বিশ বছরের ছোকরা রিপন।

‎​এদিকে কবিরের অবস্থা তখন একবারে বেহাল! গায়ের শার্ট ঘামে ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে গেছে, কপালে জমে থাকা ঠাণ্ডা ঘামের বিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়ছে চিবুক বেয়ে। চোখেমুখে স্পষ্ট মৃত্যুভয়।
‎​বর্তমানে সে রিপনকে সাথে নিয়ে হুমার সোসাইটির সীমানার ভেতরে, কিছুটা দূরে একটা কাঠের বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। রক্তচোষা মশার অজস্র উপদ্রব সত্ত্বেও কবিরের চোখ দুটো কিন্তু এক সেন্টিমিটারের জন্যও হুমার আট তলার ফ্ল্যাটটার বেলকনির দিক থেকে সরছে না!
‎​সরবেই বা কীভাবে? আজ তার কাঁধে যে সালমানের দেওয়া চরম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল! সালমান সকাল থেকেই তার বাবা এমপি মিনহাজ শাহ নেওয়াজ সাহেবের সাথে কঠিন রাজনৈতিক মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিল, তার ওপর কী যেন এক জরুরি কাজে রাজশাহীর বাহিরেও যেতে হয়েছে তাকে। আর তাই আজ সারাদিন মেহুলের প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর আর আপডেটের পুরো দায়ভারটা সে সঁপে দিয়েছিল বিশ্বাসী কবিরের ওপর।
‎​কিন্তু কবিরের কপালেই যে আজ শনি নাচছিল!

‎তাইতো ​সকালে কবির যখন হুমার বাসার সামনে পৌঁছায়, তার ঢের আগেই মেহুল ব্যাকপ্যাক কাঁধে চেপে গ্রামের উদ্দেশ্যে স্টেশনের দিকে রওনা হয়ে যায়। যার কারনে কবির মেহুলের দেখা পায় না।এদিকে কবির ঘন্টার পর ঘন্টা হুমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও যখন মেহুলের কোন দেখা ও সাড়াশব্দ পেলো না তখন সে হুমার ফ্ল্যাটে দেখতে গিয়েছিল কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলো দরজায় তালা দেওয়া। অতঃপর সে ছুটে গিয়েছিল ক্যাম্পের মাঠে। কিন্তু সেখানেও তার বুথ বন্ধ পেলো। অতঃপর একটু খোঁজ খবর নিয়ে সে জানতে পারলো যে ডক্টর মেহুল আজকে ক্যাম্পেইন স্কোয়াডেই নেই!

‎​ব্যস! ওই এক খবরেই কবিরের বুকের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। সে খুব ভালো করেই চেনে নিজের ছোট সাহেব সালমান শাহ নেওয়াজকে! যে মানুষটা মেহুলকে নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি উন্মাদ দিয়ে ভালোবাসে, তার কানে যদি একবার পৌঁছায় যে মেহুল উধাও—কবির তার দেখা পায় নি, কোথায় আছে তাও জানে না। তবে কবিরের চামড়া তুলে জ্যান্ত তক্তা বানিয়ে ফেলবে সে!
‎​সালমানের সেই হিংস্র রূপের কথা ভেবে ভয়ের চোটে পুরো সত্যটা বলার মতো সাহস কবির কুড়াতে পারেনি। তাই পুরো চসে ফেলে মেহুলকে না পেয়ে সে সেই যে সন্ধ্যায় এসে হুমার ফ্ল্যাটের নিচে খাপটি মেরে বসেছে, এখনো মাঝরাত পার হয়ে গেলেও এখান থেকে নড়েনি! যদি অলৌকিক কোনো উপায়ে মেহুলের একটা ঝলকও অন্তত চোখে পড়ে, তবে তৎক্ষণাৎ সালমানকে খবরটা দিয়ে নিজের পিঠের জ্যান্ত চামড়াটা বাঁচাতে পারবে!

‎​রিপন আবার ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, “ভাই, কিছু তো বলবেন? রাত তো একটা বাজে! গাড়ি-ঘোড়া সব বন্ধ, এখানে ক্যান বইসা আছি কন তো? কারে খুঁজতেছেন এত রাইতে?”
‎​কবির রিপনের দিকে চোখ পাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উঠল, “চুপ থাক রিপন! একটা কথাও বলবি না। বস যদি জানতে পারে যে আমি ওনার তেওয়া কাজ করতে পারি নাই আর তা এতক্ষন লুকায়ে রাখছি, তবে তোকে আর আমাকে এক কবরে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে! ওই ফ্ল্যাটের দিকে নজর রাখ, এক সেকেন্ডের জন্যও যেন চোখ না সরে!”
‎​কবিরের ভয়কাতুরে ধমক শুনে রিপন ঢোক গিলে আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দুজনেই মশার কামড় সহ্য করে ঘামের গন্ধ মেখে নিশাচর শিকারীর মতো আলোর অপেক্ষায় চোখ পেতে রইল হুমার বেলকনির দিকে।

‎কবির ও রিপন যখন চোখ দুটো প্রায় আঠার মতো হুমার আট তলার বন্ধ বেলকনির ওপর লাগিয়ে রেখেছিল, ঠিক তখনই নিশুতি রাতের নীরবতা চিরে আবছা একটি শব্দ কানে এলো।
‎​সোসাইটির মেইন গেট পেরিয়ে একটি সবুজ রঙের সিএনজি ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে প্রবেশ করছে!
‎​ইঞ্জিনের একটানা ভটভট শব্দে দুজনেই সচকিত হয়ে চকিতে নজর ঘুরাল। রিপন গায়ের মশা তাড়ানো বন্ধ করে কবিরের কনুইয়ে একটা গুঁতো মেরে বলে উঠল, “এতো রাতে কে আইলো ভাই এইডা?
‎​কবির মেজাজ খিঁচড়ে ফিসফিস করল, “আমি কি জানি নাকি, কে আইছে! এতো কথা কস ক্যান তুই চুপচাপ দেখ!”

‎একসময় ​তাদের দুজনকে প্রায় গা ঘেঁষে ক্রস করে সিএনজিটি সশব্দে গিয়ে থামল সোজা হুমার ফ্ল্যাটের বিল্ডিংয়ের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে।
‎​গাড়ি থামার ঠিক মিনিট কয়েকের মাঝেই সিএনজির পেছনের দরজা খুলে একটি মেয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। চারপাশটা নিশাচর অন্ধকারে ঢাকা থাকায় আর মাথার ওপর ল্যাম্পপোস্টের আলোটা ফিকে হওয়ায় তারা প্রথম দর্শনে স্পষ্ট চেহারা বুঝতে পারল না। তবে কবির দেখল—মেয়েটির দুই হাতে বুক চেপে ধরে শক্ত করে কিছু একটা আগলে রাখা আছে!

‎​মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে সিএনজিওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে সোজা বিল্ডিংয়ের লিফটের ব্লকের দিকে প্রবেশ করলো। ​মেয়েটির অবয়ব মিলিয়ে যেতেই কবির আবার ওপরের দিকে, অর্থাৎ হুমার বেলকনি আর ঘরের জানালার দিকে নিজের চিল শকুনের মতো নজরটা ফেরাল।
‎​তখনই রিপন উসখুস করে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, আমরা যে এইখানে খামোখা দাঁড়ায়ে আছি… এতো রাইতে তো কেউ আসবো না মনে হয়! নিশ্চয়ই সবাই আরামে ঘুমাইতেছে।”

‎​কবির ধূসর চোখে উপরের দিকে চেয়ে ধীরকণ্ঠে জবাব দিল, “আমার কিন্তু তা মনে হয় না রে রিপন…”
‎​সে আঙুল উঁচিয়ে হুমার আট তলার জানালার দিকে ইঙ্গিত করে আবার বলল, “কারণ দেখ… ওই জানালার ভেতরটায় হালকা আলোর আভা দেখা যাইতেছে। তার মানে—ভেতরে কেউ এখনও জেগে আছে!”

‎​এদিকে আট তলার ফ্ল্যাটে হুমার মনের ভেতরে তখন এক অস্থির তোলপাড় আর অজানা অমঙ্গলের মেঘ জমছিল!
‎​সেই যে মেহুল সন্ধ্যায় গ্রাম থেকে ট্রেনে ওঠার আগে তাকে শেষ ফোন করে জানিয়েছিল যে তারা রওনা দিচ্ছে, তারপর থেকে আর মেয়েটার সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না! ফোনটা একটানা বন্ধ বলে কেটে যাচ্ছে।
‎​হুমা দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকাল—ঘড়ির কাঁটা রাত দেড়টার ঘর ছুঁইছুঁই! এত রাতেও মেহুলের দেখা না পেয়ে হুমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, অজানা ভয় চেপে বসল। হাজার রকমের খারাপ চিন্তা তার মাথায় জট পাকাতে শুরু করল—ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হলো না তো? নাকি রাস্তায় কোনো বিপদে পড়ল মেয়েটা?

‎​হুমা আর এক মুহূর্তও একা বসে অপেক্ষা করাটা যুক্তিযুক্ত মনে করল না। সে সোফা থেকে উঠে নিজের গাড়ির চাবিটা হাতে তুলে নিল। ঠিক করল—নিজে স্টেশনের দিকে আর আসেপাশের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হয়ে মেহুলকে খুঁজে দেখবে।
‎​কিন্তু সে দরজার দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ করে বাসার কলিংবেলটা সশব্দে বেজে উঠল!
‎​টিং ডং!

‎​হঠাৎ নিঝুম মাঝরাতে বেলের আওয়াজে হুমা চমকে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে এক টানে দরজার স্লাইডিং লক খুলে দিল।
‎​দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটিকে দেখে হুমার চোখের কোণে একরাশ চরম স্বস্তি ও শান্তির আলো ফুটে উঠল—সামনে ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে ক্লান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে মেহুল!
‎​”মেহু! তুই কোথায় ছিলি বল তো? আমি তো ভাবলাম তোর কোন বিপদ—”
‎​হুমার স্বস্তির কথাটা মুখের ভেতরেই আটকে গেল! কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই এক করুণ, অনাস্বাদিত মিষ্টি শব্দ ভেসে এলো—
‎​আ্… উুু… ওয়াঁ…!

‎​হুমা চমকে মেহুলের কোল ও বুকের দিকে নজর ফেরাতেই নিঃশ্বাস প্রায় আটকে আসার উপক্রম হলো! যেন হঠাৎ বড়সড় একটা বিষম খেল সে!
‎​চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার মতো বড় বড় হয়ে গেল, ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গেল বিস্ময়ে!
‎​মেহুলের বুকের গভীর ও ওম ছায়ায়, ওর এপ্রনের ভাঁজে জড়ানো অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে এক ক্ষুদ্রে নবজাতক কন্যাশিশু!
‎​হুমা পুরোপুরি স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! এই মাঝরাতে মেহুল একা নয়… তার কোলে এক জীবন্ত ছোট্টপ্রাণকে দেখে।

‎হুমার মাথার ভেতর যেন একঝাঁক বিদ্যুৎ খেলে গেল! মাঝরাতে নিজের প্রিয় বান্ধবীর কোলে এমন একটা লাল টুকটুকে নবজাতক দেখে নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছিল না সে।
‎​বিস্ময়ে চোখ দুটো গোল গোল করে, বাকরুদ্ধ অবস্থা কাটিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠল, “ম… মেহু! এই… এই বাচ্চা তুই কোথায় পেলি! এত রাতে কার বাচ্চা নিয়ে আসলি তুই? ওর মা-বাবা কোথায়, অ্যাঁ? কী ঘটেছে মাঝরাতে আমাকে একটু বলবি?”

‎​মানুষ হুট করে অলৌকিক বা অপ্রত্যাশিত কিছু দেখলে যেভাবে দিশেহারা হয়ে পরপর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, হুমার অবস্থাও ঠিক তেমনই হলো। তার প্রশ্নের জবাবে মেহুল একটা শব্দও খরচ করল না। ওর চেহারায় চরম ক্লান্তি আর এক অদ্ভুত ঘোরের ছায়া।
‎তাই ​মেহুল হুমাকে আলতো করে পাশ কাটিয়ে সোজা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। অতঃপর পরম মমতায়, অতি সাবধানে কুঁকড়ে থাকা ছোট্ট শিশুটিকে এনে সোফার নরম কুশনের ওপর শুইয়ে দিল সে। বাচ্চার ওপর থেকে হাত সরাতেই যেন মেহুলের শরীর থেকে সমস্ত শক্তি এক লহমায় নিভে গেল।
‎​সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ধপাস করে সোফার এক কোণে বসে পড়ল। বুকের ছাতিটা দ্রুত ওঠানামা করছে, যেন কোনো বিশাল ঝড় পার করে সে মাত্র নিরাপদ আশ্রয়ে পা রেখেছে! দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে সে একটার পর একটা দীর্ঘ ও বড় বড় শ্বাস নিতে শুরু করল।
‎​হুমা দ্রুত এসে মেহুলের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ওর হাত দুটি শক্ত করে চেপে ধরল। উদ্বেগে ওর গলা কাঁপছিল, “মেহু! প্লিজ শান্ত হ… আগে এক ঢোক পানি খা আর আমাকে খোলসা করে বল, এত রাতে এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে তুই কোথায় পেলি?”

‎হুমা তাড়াহুড়ো করে সেন্ট্রাল টি-টেবিল থেকে কাঁচের জগে রাখা এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি ঢেলে মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিল। মেহুল কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরে এক নিঃশ্বাসে পুরো পানিটা গিলে নিল।
‎​বেশ কিছুক্ষণ চোখ দুটো বুজে থেকে নিজেকে খানিকটা শান্ত করল সে। বুকের ভেতর জমে থাকা তীব্র উত্তেজনা আর ধকধকানিটা একটু থিতিয়ে এলে মেহুল একে একে রাতের সব ঘটনা খোলসা করতে শুরু করল—স্টেশন থেকে ফেরা, সঙ্গীদের বিদায় দেওয়া, জনমানবহীন নির্জন রাস্তায় মাতালদের তাড়া খাওয়া, আর প্রাণ বাঁচাতে গলির ভেতর লুকিয়ে সেই পচা ডাস্টবিনের ককশিটের নিচ থেকে বিষাক্ত লাল পিঁপড়ার মাঝ থেকে এই অবুঝ প্রাণটিকে উদ্ধার করা… প্রতিটি দৃশ্যপট সে হুমার সামনে তুলে ধরল।

‎​সব শুনে হুমা যেন এক জায়গায় একেবারে ‘থ’ হয়ে জমে গেল! তার মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে, চোখ দুটো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে স্থির।
‎​নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। হুমা তোথলানো গলায় স্বগতোক্তির মতো বলে উঠল, “একটা রক্তমাংসের সদ্যোজাত বাচ্চাকে… পচা ডাস্টবিনের নোংরায় ফেলে রেখে গেল? এ কোন যুগে বাস করছি আমরা মেহু! কতটা অমানবিক আর পাষাণ হলে নিজের পেটের সন্তানকে এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে যেতে পারে কেউ!”

‎​মেহুল কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বাক চোখে সোফায় শুয়ে থাকা একরত্তি শরীরটার দিকে চেয়ে রইল।
‎​ঠিক তখনই সোফায় শুয়ে থাকা খুদে শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল। বাচ্চাটি তার ছোট্ট দুটো হাত শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে ক্যু-ক্যু করে মৃদু স্বরে কেঁদে ওঠার উপক্রম করল।
‎​বাচ্চার ওই ছোট্ট শব্দটুকু কানে যেতেই মেহুল চকিতে তার দিকে একপলক তাকাল। ডাক্তারের পেশাদারি মন আর ভেতরের জেগে ওঠা মায়া এক হয়ে তাকে চটজলদি সচেতন করে তুলল।

‎অতঃপর ​মেহুল সোফায় উঠে বসে হুমার দিকে তাকিয়ে তাগিদ ভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “হুমা! কথা পরে হবে। তুই জলদি একটু হালকা গরম পানি, ডেটল আর পরিষ্কার নরম সুতি তোয়ালে নিয়ে আয় তো! ডাস্টবিনের নোংরা আর পচা জীবাণু সারা শরীরে লেগে আছে, তার ওপর লাল পিঁপড়াগুলো কামড়ে বিষাক্ত করে দিয়েছে। এখনই বাচ্চাটাকে ভালো করে জীবাণুমুক্ত করে গা না মোছালে ইনফেকশন হয়ে যাবে!”

‎​মেহুলের কথা শোনামাত্রই হুমার ঘোর কেটে গেল। সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে—”দাঁড়া, আমি এখনই আনছি!” বলে সোজা কিচেন আর ওয়াশরুমের দিকে ছুটে গেল।
‎​কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে গামলায় গরম পানি, ডেটলের বোতল আর ধবধবে পরিষ্কার নরম একটা কটন তোয়ালে নিয়ে মেহুলের পাশে এসে হাজির হলো।
‎​এক অনাস্বাদিত, অদ্ভুত নিঝুম মাঝরাতে—দুজন অনভিজ্ঞ আর মমতাময়ী নারীর হাতে শুরু হলো ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া এক পরিত্যক্ত রাজকন্যার নতুন জীবন পাওয়ার পরম প্রস্তুতি!

‎​হালকা গরম পানিতে ডেটলের কয়েক ফোটা মিশিয়ে মেহুল পরম মায়ায় খুদে শিশুটির পুরো শরীর আলতো হাতে মুছে দিল। গায়ের কাদা-নোংরা আর বিষাক্ত লাল পিঁপড়ার কামড়ের দাগগুলো ধুয়েমুছে সাফ হতেই যেন বাচ্চার আসল রূপটা ফুটে উঠল—একেবারে ফুটফুটে এক লাল তিলত্তমা! হুমা ওর নিজের একটা নতুন নরম সুতি তোয়ালে দিয়ে বাচ্চাটিকে খুব সুন্দর করে পেঁচিয়ে কোলে তুলে নিল। ওম পেতেই শিশুটি হুমার বুকে মাথা রেখে ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়ল।
‎​বাচ্চাটি স্যানিটাইজ করা শেষ হতেই হুমা মেহুলের দিকে তাকাল। সারাদিনের ধকল, জার্নির ক্লান্তি আর রাতের এই বিভীষিকাময় কাণ্ডের পর মেহুলের চেহারায় যেন ভূতুরে ছাপ পড়েছে। পড়নের লং শার্টের কলার ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ আর ঘামে ভিজে যেন একাকার।

‎​হুমা কোল থেকে বাচ্চার মুখটা একটু ভালো করে ঢাকা দিয়ে মেহুলকে তাগিদ দিয়ে বলল, “মেহু, এবার তুই আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে তো! তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখনই সেন্সলেস হয়ে পড়ে যাবি। যা, ওয়াশরুমে ঢুকে ভালো করে শাওয়ার নে।”

‎​মেহুলের নিজেরও শরীরটা বড্ড ভারী লাগছিল। ডাস্টবিনের সেই বিশ্রী গন্ধটা যেন তার নাকে-মুখে সেঁটে রয়েছে। সে আর কথা না বাড়িয়ে একটা পরিষ্কার থ্রি-পিস হাতে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ​পনেরো মিনিট পর গরম পানির শাওয়ার শেষে মেহুল ধোঁয়া ওঠা শরীর আর ভেজা কাপড়গুলো নিয়ে বের হয়ে এলো তখনো তার চোখে মুখে ক্লান্তি লেপ্টে আছে। অতঃপর সে ভেজা চুল আর জামাকাপড়গুলো নিংড়ে নিয়ে সোজা বেলকনির স্লাইডিং ডোরটা ঠেলে বাইরে পা বাড়াল—কাপড়গুলো মেলে দেওয়ার জন্য।

‎​এদিকে ঠিক নিচে, সোসাইটির নিঝুম চত্বরে ভয়ের চোটে শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকা কবির আর রিপন তখনো মশার কামড় সহ্য করে চাতক পাখির মতো ওপরের দিকে চেয়ে ছিল।
‎​হঠাৎ আট তলার বেলকনির কাঁচের দরজা ঠেলে ছায়ার মতো কাউকে বাইরে বের হতে দেখেই কবিরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল! সে ঝটকা মেরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ওপরের দিকে তাকাল।
‎​কিন্তু নিঝুম রাত, তার ওপর আট তলার মতো অতটা উঁচুতে আলো-আঁধারির ভিড়ে মানুষের অবয়ব স্পষ্ট বোঝা বড্ড কঠিন! রিপন পাশ থেকে বলে উঠল, “ভাই, কেউ তো বেলকনিতে আইলো মনে হয়! ওইডা কি ডাক্তার ম্যাডাম?”

‎​কবির কোনো ঝুঁকি নিল না। সে দ্রুত পকেট থেকে সালমানের কিনে দেওয়া নিজের হাই-রেজুলেশনের লেটেস্ট স্মার্টফোনটা বের করে ক্যামেরা অন করল। হাত দুটো যেন ভয়ে না কাঁপে, তাই শক্ত করে ধরে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটার দিকে ফোকাস করে একের পর এক ছবি তুলতে শুরু করল। ​ছবি তোলা শেষেই কবির কেঁপে ওঠা আঙুলে গ্যালারি ওপেন করে ছবিটা জুম করতে লাগল…
‎​
‎​ছবিটা ফুল জুম হতেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল ভেজা চুলে বারান্দার রশিতে কাপড় মেলতে থাকা মেহুলের স্নিগ্ধ ও শান্ত চেহারাটা!
‎​মেহুলকে জলজ্যান্ত অক্ষত অবস্থায় ওই বেলকনিতে নিজের চোখে দেখতে পেয়ে যেন এতক্ষণ পর কবিরের শুকিয়ে যাওয়া কলিজায় পানি এলো! বুকের ওপর থেকে যেন শতটনি একটা পাহাড় নেমে গেল!
‎​কবির এক দীর্ঘ, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে স্বগতোক্তির মতো বলে উঠল, “যাক বাবা! খোদা মুখ তুলে চাইছে! ম্যাডাম সহিসালামতে বন্ধুর বাসায় আছে। আজকের মতো ছোট সাহেবের হাত থেকে বেঁচে গেলাম!”

‎​সে আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সোজা সেই জুম করা ছবি আর লাইভ লোকেশনটা সালমানের প্রাইভেট নম্বরে সেন্ড করে দিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়াল—নিজের জীবনটা আজকের মতো অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার মহা স্বস্তি নিয়ে!

‎এদিকে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে ভেজা কাপড়গুলো বেলকনিতে মেলে দেওয়ার পর মেহুল ধীরপায়ে সোজা বেডরুমে চলে এলো। সারাদিনের অমানুষিক শারীরিক ধকল, ট্রেনের দীর্ঘ সফর, আর রাতে ঘটে যাওয়া ওই অনাকাঙ্ক্ষিত নাটকীয় ঘটনা—সব মিলিয়ে তার শরীর আর মনের শক্তি যেন একদম নিঃশেষ হয়ে এসেছিল।
‎তাই ​বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেওয়া মাত্রই এক গভীর ক্লান্তির ঘুম এসে তাকে গ্রাস করে নিল। সমস্ত চিন্তা আর অশান্তি ভুলে মেহুল তলিয়ে গেল পরম নিশ্চিন্তির সাগরে।

‎​অন্যদিকে সালমানের ওপর দিয়ে আজ যেন এক ঝোড়ো তাণ্ডব বয়ে গেছে!
‎​সকালে উঠেই এমপি বাবার জটিল রাজনৈতিক দরবার আর মিটিং সামলাতে হয়েছে তাকে। তারপর দুপুরের মাঝেই জরুরি দরকারে সোজা রাজশাহী থেকে ফ্লাইট যোগে ঢাকা, এরপরে বিশেষ এক কাজে ঢাকা থেকে ফ্লাইটে করে চট্টগ্রাম, এরপরে চট্টগ্রাম থেকে আবার ব্যাক টু ঢাকা! আর এখন এই গভীর রাতে ঢাকা থেকে আবারও রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ধেয়ে চলেছে তার গাড়ি।
‎​কুচকুচে কালো বিলাসবহুল মার্সিডিজের পেছনের সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে শুয়ে ছিল সালমান। চরম ক্লান্তি আর ভ্রমণের অবসাদে তার শরীর জুড়ে ছিল তীব্র একঘেয়েমি।

‎​সামনে ড্রাইভিং সিটে রবি আর পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে ধ্রুব বসে নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছিল। ​ঠিক তখনই সালমানের পকেটে থাকা ফোনটা টুং করে ভাইব্রেট করে উঠল।
‎​সালমান ভারী, ক্লান্ত হাতে আইফোনটা পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তৎক্ষনাৎ ডিসপ্লেতে ভেসে উঠেছে ‘কবির’ নামটা।
‎​অসহ্য মেজাজ আর একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে সিটে হেলান দেওয়া অবস্থাতেই হোয়াটসঅ্যাপের ইনবক্সটা ওপেন করল। আর মেসেজটা খুলতেই… এক লহমায় যেন সালমানের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি, ক্ষোভ আর অবসাদ হাওয়া হয়ে গেল!

‎​স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে একটু আগে কবিরের পাঠানো সেই জুম করা ছবিটা। আট তলার আবছা আলো-আঁধারি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে তার ‘অপ্সরা’ মেহুল! ভেজা চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, স্নিগ্ধ রূপ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাপড় মেলছে সে।
‎​সারাদিনের এই নরকযন্ত্রণা আর জঘন্য ব্যস্ততার পর মেহুলের এই একটা ছবি সালমানের তপ্ত হৃদয়ে যেন শীতল চন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে দিল! সেই সাথে ​সালমানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক সূক্ষ্ম, মায়াবী ও মাতাল করা হাসির রেখা।
‎​এদিকে সালমানকে আজ আবারও এভাবে একা একা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে সামনের সিটে থাকা ধ্রুব অবাক হলো। অতঃপর সে সাবধানে ড্রাইভিং সিটে থাকা রবির বাহুতে একটা হালকা টোকা দিল।
‎​রবি কনুইয়ের ধাক্কা খেয়ে সামান্য ঘাড় ঘোরাতেই ধ্রুব চোখের ইশারায় তাকে গাড়ির লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাতে ইঙ্গিত করল। রবি তার দৃষ্টি সোজা ওপরের ব্যাকভিউ লুকিং গ্লাসে নিবদ্ধ করতেই দেখে—পেছনে সিটে হেলান দিয়ে থাকা উগ্র, রাগী সালমান সাহেবের মুখে এক অচেনা মায়াবী হাসি!

‎​ঠিক তখনই সালমানের বরফশীতল গম্ভীর কণ্ঠস্বর গাড়ির ভেতর গমগম করে উঠল—
‎​”এভাবে হা করে লুকিং গ্লাসে না তাকিয়ে… গাড়ির স্পিড বাড়া, রবি!”
‎হটাৎ সালমানের কন্ঠে ​ধ্রুব আর রবি দুজনই চমকে উঠে তৎক্ষণাৎ সামনের দিকে সোজা হয়ে বসল। সাথে সাথেই রবি দক্ষ হাতে গিয়ার চেঞ্জ করে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল। গাড়িটা ঝড়ের গতিতে রাজশাহীর হাইওয়ে ধরে ছুটে চলল, আর সালমান আবারও নিজের অপ্সরার ভেজা চুলের সেই ছবির রূপ সাগরে ডুব দিল!

‎​মেহুল তখন গভীর ঘুমে একদম আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। সারাদিনের ধকলের পর তার শরীর যেন বিছানার সাথে মিশে গিয়েছে।
‎​হঠাৎই হুমার তীব্র চিৎকারে তার ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল!
‎​”মেহু! মেহু উঠ ! দেখ কী বিপদ!”

‎সাথে ​সাথেই মেহুল ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। চোখের পাতাগুলো ঘুমে ভারী হয়ে আসছে, তবুও ছোট ছোট চোখে সে আবছা আলোয় তাকাল। দেখল—হুমা ঘরে পায়চারি করছে, আর তার কোলে থাকা খুদে বাচ্চাটা পুরো ঘর মাথায় তুলে একনাগাড়ে চিল-চিৎকার করে কেঁদে কেটে ভাসিয়ে দিচ্ছে!
‎​মেহুল চোখ ডলতে ডলতে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল, “ও… ও এভাবে কাঁদছে কেন হুমা? কী হয়েছে ওর?”
‎​হুমা বিচলিত ও চরম অস্থির হয়ে বলল, “আরে আমি কি জানি রে! শান্ত হয়ে পরম আরামেই তো ঘুমাচ্ছিল, হঠাৎ করেই ঘুম থেকে জেগে এমন চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে! কী হয়েছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না!”

‎​মেহুল ছোট ছোট চোখে বাচ্চাটার দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। একজন চিকিৎসকের মন নিয়ে চিন্তা করে বলল, “ও কি কোনোভাবে গায়ে কোথাও ব্যথা পাচ্ছে? লাল পিঁপড়াগুলোর বিষক্রিয়ায় আবার জ্বালা শুরু হলো না তো?”
‎​মেহুলের মুখ থেকে কথাটা বের হতে না হতেই হুমা তড়িঘড়ি করে বাচ্চাটিকে মেহুলের কোলে গচ্ছিত করে দিল, “এই ধর! তুই ডক্টর, তুই এদিক-ওদিক হাত দিয়ে দেখ তো কোথাও ব্যথা-ট্যাথা পাচ্ছে নাকি!”
‎​মেহুল ঘুম জড়ানো হাতে বাচ্চাটিকে সাবধানে কোলে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করতে চাইল। কিন্তু ঠিক তখনই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য মেহুল আর হুমা—দুজনের চোখেই ধরা পড়ল!
‎​কোলে নেওয়া মাত্রই শান্ত হওয়া দূরে থাক, বাচ্চাটি তার খুদে মুখটা মেহুলের বুকের দিকে কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে বাড়িয়ে দিল! মেহুলের সুতি জামার কলারের কাছে মুখ ঘষে সে অদ্ভুত এক আকুলতায় নিজের খাবারের সন্ধান করতে লাগল!

‎​দৃশ্যটা দেখে মেহুলের চোখ দুটো এক লহমায় বড় বড় হয়ে গেল! ঘুমের ঘোর মুহূর্তের মধ্যে উবে গিয়ে সে আঁতকে উঠে বলে উঠল, “ও শিট! এ… ও কী করছে?! ও আমার কাছে এমন করছে কেন?”
‎​হুমাও দৃশ্যটা দেখে অবাক হয়ে এক সেকেন্ড ভাবল, তারপরই তার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। সে হাত উঁচিয়ে বলে উঠল, “বুঝেছি! মেহু, বাবুটা ব্যথা পেয়ে কান্নাকাটি করছে না… আমার মনে হচ্ছে ও চরম ক্ষুধার্থ! ওর খিদে পেয়েছে! না জানি কতক্ষণ ধরে কিছু খায়নি।”

‎​মেহুল কথাটা শোনামাত্রই যেন ছ্যাঁকা খাওয়ার মতো চমকে উঠল! সে তড়িঘড়ি করে বাচ্চাটিকে আবার হুমার কোলেই ঠেলে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, ” খিদে পেয়েছে? নে নে, তুই ধরে ওকে খাইয়ে দে!”
‎​হুমা গোল গোল চোখে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, “আজব তো! আমি কী খাওয়াব?”
‎​মেহুল অস্থির হয়ে বলল, “কেন? ঘরে যা আছে তা-ই খাওয়া!”
‎​হুমা মেজাজ খিঁচড়ে চিল-চিৎকার করে উঠল, “আরে বোকা মেয়ে! ও মায়ের দুধ খুঁজছে! বা*ল, আমি কোত্থেকে দেব শুনি?”
‎​হুমার এমন কড়া আর চাঁচাছোলা কথায় মেহুল এক মুহূর্ত বোকা হয়ে গেল। হুমা তখন মাথায় হাত দিয়ে একটু চিন্তা করে বলল, “উফ! ফ্রিজে গরুর দুধ আছে না? দাঁড়া, ওটাই একটু গরম করে খাইয়ে দিই!”

‎​মেহুল সঙ্গে সঙ্গে হাত উঠিয়ে বাধা দিয়ে কড়া গলায় বলল, “একদম না! পাগল হয়েছিস নাকি হুমা?! এত ছোট নবজাতক বাচ্চাকে গরুর ফ্যাট মিল্ক দিলে ওর পেটে মারাত্মক বদহজম আর ইনফেকশন হয়ে যাবে! এটা ওকে দেওয়া যাবে না।”
‎অতঃপর ​মেহুল বিছানা থেকে নেমে কিছুক্ষণ ঘরে পায়চারি করল। তারপর মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে গুটিয়ে একটা খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “হুমা, শোন… এই মাঝরাতে আসেপাশে কি কোনো ২৪ ঘণ্টার অল-নাইট ফার্মেসি খোলা পাওয়া যাবে? যেখানে নবজাতকের কৌটোর ফার্স্ট ফর্মুলা মিল্ক আর ফিডার পাওয়া যেতে পারে?”
‎​হুমা একটু ভেবে সোজা মাথা নাড়ল, “হুম, ওই মেইন রোডের মোড়ে একটা বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে ২৪ ঘণ্টার ফার্মেসি আছে। হয়তো খোলা পেতে পারি।”
‎​”তবে আর এক সেকেন্ডও দেরি নয়! চল!”

‎​আর কোনো দ্বিধা না করে, দুজন মেয়ে এই গভীর মাঝরাতেই বাচ্চার কান্না থামাতে আর তার জন্য বেবি ফুড জোগাড় করতে বাইরে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হুমা বাচ্চাটিকে তোয়ালেতে ভালো করে মুড়ে নিজের কোলে চেপে ধরল, আর মেহুল তার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে সোজা ফ্ল্যাটের লক খুলে নিচে নেমে এলো।
‎​নির্জন রাতে হুমার প্রাইভেট গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে রাজশাহীর ফাঁকা রাস্তায় ধেয়ে চলল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে শহরের এদিক-ওদিক ঘুরে, দু-তিনটে বন্ধ দোকানের সামনে চক্কর কাটার পর অবশেষে তারা মেইন রোডের সেই অল-নাইট খোলা থাকা ফার্মেসিটার দেখা পেল।

‎​মেহুল গাড়ি থেকে নেমেই ছুটল ফার্মেসির কাউন্টারে। যেহেতু সে ডাক্তার তাই নিজেই প্রেসক্রিপশন মেপে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতোই নবজাতকের জন্য একদম সঠিক ব্র্যান্ডের জিরো-সাইজের ফর্মুলা মিল্কের কৌটো, একটা ছোট মেজারমেন্ট ফিডার আর নিপল কিনে আনল।
‎অবশেষে ​বাসায় ফিরেই হুমা দ্রুত কিচেনে গিয়ে গরম পানি ফুটিয়ে ফিডার স্যানিটাইজ করে নিল। তারপর মেহুল মেপে মেপে ইষদুষ্ণ পানিতে হালকা ফর্মুলা মিল্ক গুলিয়ে ফিডারটা বাচ্চার মুখে তুলে দিল।

‎​ক্ষুধার্থ শিশুটি চুষনিটা মুখে পাওয়ার সাথে সাথেই এক তীব্র তৃপ্তি নিয়ে চুষতে শুরু করল। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিডারের দুধ শেষ করে, পেটের ক্ষুধা শান্ত হতেই অবুঝ শিশুটি ছোট একটা ঢেঁকুর তুলে মেহুলের বুকের ওমে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুজল।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৫

বাচ্চাটিকে অবশেষে শান্ত হতে দেখে মেহুল আর হুমার বুক থেকে যেন এক বিশাল বড় পাথর নেমে গেল। ঘড়ির কাঁটায় তখন শেষ রাতের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সারারাত এভাবে ধকল সহ্য করে দুজনের শরীরেই আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট ছিল না।
‎তাই ​তারা আর আলাদা রুমে যাওয়ার ঝামেলার মধ্যে গেল না। মেহুলের বেডরুমের মস্ত বড় কিংসাইজ খাটটার ঠিক মাঝখানে পরম মায়ায় ছোট্ট তোয়ালে জড়ানো ফুলের মতো বাচ্চাটিকে শুইয়ে দিল। আর তার দু-পাশে পাহারা দেওয়ার মতো করে—একপাশে ক্লান্ত মেহুল আর অন্যপাশে নিস্তেজ হুমা গা এলিয়ে দিল।
‎​বাইরে ভোরের পাখি ডেকে ওঠার আগেই, নামপরিচয় হীন কুড়িয়ে পাওয়া ছোট্ট রাজকন্যাকে মাঝে নিয়ে তিনজনে মিলে যেন এক পরম শান্তির ঘুমে তলিয়ে গেল!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬