শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৭
আফীফা আফনান
বিগত প্রায় আধঘণ্টা ধরে থানার ভেতরের একঘেয়ে, ভ্যাপসা পরিবেশে কাঠ হয়ে বসে আছে মেহুল ও হুমা। চারপাশের বিশৃঙ্খলা আর শোরগোলে মাথার রগ দুটো যেন রিফ্লেক্স অ্যাকশনে টিকটিক করে লাফাচ্ছে।
সেই সাথে থানার ভেতরটা যে কতটা বিশৃঙ্খল আর বিরক্তিকর হতে পারে, তা আজ এখানে নিজের চোখে না দেখলে মেহুল হয়তো কোনোদিন বিশ্বাসই করতে পারত না!
বিকেলের ঢলে পড়া রোদে হুমাকে সাথে নিয়ে মেহুল এখন মফস্বল থানার গাদাগাদি আর গুমোট টেবিলগুলোর ঠিক সামনের বেঞ্চিটায় বসে আছে। তখন চারিদিকে একটা গা-ছমছমে নোংরা পরিবেশ, ফাইলের চটচটে গন্ধ, আর সাথে মানুষের অযাচিত গোলমাল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—থানায় ডিউটিতে থাকা অফিসার ও কনস্টেবলদের ঢিলেঢালা ভাব!
ডিউটি বেঞ্চের আশেপাশে কয়েকজন কনস্টেবল উদ্দেশ্যহীনভাবে পায়চারি করছে, কিন্তু কারো কাজের মধ্যে বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো বা গা-ঝাঁড়া দেওয়া ভাব নেই। এক কোণে নীল ইউনিফর্ম পরা এক কনস্টেবল মোড়ার ওপর বসে একমনে ফ্রি ফায়ার খেলছে, আর অন্য দুজন কনস্টেবল টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে বাজার-ঘাট আর সংসারের গল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছে। অপরদিকে একটু দূরে বসা দুই মহিলা কনস্টেবল নিজেদের ব্যক্তিগত কী এক হাসির গল্প নিয়ে মেতে আছেন; তাদের খিলখিল হাসির শব্দে থানার গাম্ভীর্য যেন ধুলোয় মিশছে।
তবে মেহুলের চরম বিরক্তির পারদটা গিয়ে ঠেকেছে সেকেন্ড অফিসারের কাণ্ডে!
ডিউটি চেয়ারে মাথাটা পেছনের দিকে এলিয়ে দিয়ে মধ্যবয়সী, ভুঁড়িওয়ালা সেকেন্ড অফিসার পরম শান্তিতে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। আর প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে তার নাক থেকে এমন এক বিদঘুটে, খড়খড়ে আওয়াজ বের হচ্ছে—যা শুনে মেহুলের মনে হচ্ছে এটা কোনো আইনশৃঙ্খলার রক্ষাকবচ থানা নয়, বরং কোনো পাবলিক পার্ক কিংবা চিড়িয়াখানা!
বিগত আধাঘণ্টায় তারা দুজন একরত্তি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে-বসে কাঠ হয়ে গেল, অথচ পুরো থানার একটা মানুষও এসে অন্তত জিজ্ঞেস পর্যন্ত করল না যে তারা কেন এসেছে বা তাদের সমস্যাটা কী!
অতঃপর সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া হুমা মেহুলের কানের কাছে মুখ এনে বিষণ্ন গলায় ফিসফিস করে বলল, “তোকে তো আসার সময় অনেকবার বলেছিলাম মেহু—এসব বিষয়ে থানায় এসে কোনো কাজ হয় না! দেখলি তো নমুনা?”
মেহুলের চোখের তারা দুটো রাগে জ্বলে উঠল। সে বিষাক্ত এক দৃষ্টিতে ঘুমন্ত অফিসার আর খোশগল্পে মেতে থাকা পুলিশগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, “এরা এত ইরেসপন্সিবল কেন হুমা?! সরকার কি এদের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডিউটিতে বসে গসিপ করতে আর নাক ডেকে ঘুমানোর বেতন দেয় নাকি?!”
কথাটা হুমার দিকে তাকিয়ে বলেই মেহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা হয়ে বসে সামনে হাসাহাসি করতে থাকা দুই মহিলা কনস্টেবলকে উদ্দেশ্য করে খানিকটা উচ্চস্বরে ডাকল—
”এক্সকিউজ মি! হ্যালো… , একটু শুনবেন?”
কিন্তু কিসের কী! সেই দুই মহিলা কনস্টেবল মেহুলের ডাককে পাত্তাই দিল না। সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তারা নিজেদের হাসাহাসির গল্পে সমানতালে মত্ত রইল, যেন রক্তমাংসের কোনো মানুষ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নেই!
এবার মেহুলের ভেতরের পেশাদারি ধৈর্য সম্পূর্ণ ধসে পড়ল। সারা দিনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আর এই প্রশাসনিক অবহেলার চরম পরাকাষ্ঠা দেখে সে মাথা ঠান্ডা রাখার আর কোনো কারণ খুঁজে পেল না।
তাই কোনকিছু না ভেবে মেহুল ঝটপট দাঁড়াল, এবং কোল থেকে বাচ্চাটা যাতে ছিটকে না যায় সেভাবে সাবধানে রেখে কাঠের ভারী ডিউটি টেবিলটার ওপর সশব্দে নিজের ডান হাতের এক বিশালাকার থাপ্পড় বসিয়ে দিল—
”ধাম!”
শব্দটা এত তীব্র ও বিকট ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে পুরো থানার ভেতরের শোরগোল, গসিপ আর হাসির ফোয়ারা এক নিমেষে থমকে গেল!
ঘুমন্ত সেকেন্ড অফিসার ঝাকুনি খেয়ে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে চোখ বড় বড় করে চারপাশে তাকাতে লাগলেন, আর হাসতে থাকা দুই মহিলা কনস্টেবল আঁতকে উঠে বুকের ওপর হাত রেখে হাঁ করে মেহুলের দিকে চেয়ে রইল!
এদিকে মেহুল তার ধারালো, অগ্নিগর্ভ দৃষ্টি সেই অলস পুলিশগুলোর ওপর ছুড়ে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে অত্যন্ত কড়া সুরে বলে উঠল—
”আপনাদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন পারফর্মেন্স আর ফালতু বিনোদন যদি শেষ হয়ে থাকে, তবে কি এবার সাধারণ মানুষের কথাটা একটু শোনা হবে? নাকি আমি এখনই এসপি স্যারকে ডিরেক্ট কল করে এই থানার বরখাস্তের ব্যবস্থা করব?”
টেবিলে মেহুলের সেই সশব্দ থাপ্পড় আর অগ্নিগর্ভ হুমকির পর থানার পুরো পরিবেশ যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে হিম হয়ে গেল!
চেয়ার থেকে থেবড়ে ওঠা ভুঁড়িওয়ালা সেকেন্ড অফিসার কুঁচকানো চোখে, নিজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার চরম বিরক্তি নিয়ে মেহুলের দিকে তাকালেন। চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে কড়াগ গলায় হাঁক ছাড়লেন—
”কী সমস্যা হ্যাঁ আপনার?! সরকারি অফিসে ঢুকে এভাবে চিল্লাচিল্লি আর টেবিল চাপড়াচ্ছেন কেন? ভদ্রতা শেখেননি? কী চান কী এখানে?!”
অফিসারের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে মেহুলের চিবুক রাগে শক্ত হয়ে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে সোজা অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে ক্ষুরধার গলায় বলল—
”আপনারা ডিউটির নামে যা নোংরামি আর ঢিলামো করছেন, তার ওপর এর চেয়ে ভালো ব্যবহার কোনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আশা করবেন না! বিগত আধাঘণ্টা ধরে একটা কেস নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আপনার এই ফাঁকিবাজ স্টাফদের গসিপ আর আপনার নাক ডাকার শব্দ শোনা ছাড়া আর কোনো কাজ চোখে পড়ল না! এটা থানা নাকি আপনাদের নিজেদের বৈঠকখানা?”
”অ্যাই মেয়ে! মুখ সামলে কথা বলুন! কাকে কী বলছেন হুশ আছে?!”—অফিসার তড়িৎ গতিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মেহুলের সাথে তর্কে মেতে উঠলেন।
পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে দেখে পাশে থাকা হুমা তৎক্ষনাৎ মেহুলের হাত ধরে হালকা টান দিল। মেহুলকে সামলে নিয়ে সে শান্ত কণ্ঠে অফিসারকে উদ্দেশ্যে করে বলল, “দেখুন অফিসার, আমরা এখানে ঝগড়া করতে আসিনি। আমরা একটা বাচ্চার ব্যাপারে মিসিং ডায়েরি রিপোর্ট করতে এসেছি।”
কথাটা শুনে সেকেন্ড অফিসার মেহুল আর হুমার দিকে এক অদ্ভুত, সন্দেহজনক আর অবহেলার দৃষ্টি ছুড়ে দিলেন। যেন তারা কোনো উটকো ঝামেলা নিয়ে এসেছে! তিনি বিরক্তিকর ভঙ্গিতে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা কনস্টেবলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হুঁ! একখানা সাধারণ ডায়েরির ফাইল আনেন তো। দেখেন তো এদের কী সমস্যা!”
হুমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চটজলদি বলতে গেল, “আসলে অফিসার, আমরা কুড়িয়ে পাওয়া একটা বাচ্চার—”
কিন্তু হুমার কথা সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই মেহুল হঠাৎ টান মেরে তার হাতটা শক্ত করে ধরে থামিয়ে দিল!
হুমা অবাক হয়ে মেহুলের দিকে তাকাল। কিন্তু মেহুল তখন এক চরম গা গুলানো ও তীব্র ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে আছে সেই সেকেন্ড অফিসারের দিকে!
কাগজপত্র নেওয়ার বাহানায় সেই সেকেন্ড অফিসার ততক্ষণে নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ডান হাতের আঙুলটা বিশ্রীভাবে কানের ভেতর ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চুলকাচ্ছেন, আর পরক্ষণেই সেই একই হাত দিয়ে নাক চুলকাচ্ছেন!
দৃশ্যটা দেখে মেহুলের পাকস্থলী যেন উল্টে বিশ্রী বমি ভাব চলে এলো। তার স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন ও পরিচ্ছন্ন মন এই জঘন্য লোকগুলোর কাছ থেকে আইনি কোনো সহযোগিতা নেওয়ার কথা ভাবতেও শিউরে উঠল! মেহুল এক সেকেন্ডের মধ্যে বুঝতে পারল—যে পুলিশ অফিসার নিজের ন্যূনতম ব্যক্তিগত রুচি ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে জানে না, তাদের কাছ থেকে এই একরত্তি বাচ্চার নিরাপত্তা বা সঠিক বিচার আশা করা চরম বোকামি! এখানে সময় নষ্ট করা মানে নিজের মানসিক শান্তি বিসর্জন দেওয়া।
অতঃপর মেহুল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। মুখটা বিষাক্ত করে সে হুমার হাত শক্ত করে টেনে ধরে গটগট করে বাইরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। এতিকে হুমাতো রীতিমতো হাঁপাতে হাঁপাতে মেহুলের পিছু পিছু টানতে টানতে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলো। থানা ভবনের বারান্দা পার হতেই হুমা অস্থির হয়ে বলে উঠল, “অ্যাই মেহু! কী করছিস তুই! এভাবে চলে আসলি কেন? কী হয়েছে তোর?”
মেহুল কোনো কথার উত্তর দিল না। সে হনহন করে পা চালিয়ে থানার বিশালাকার লোহার গেটটা পার হয়ে সোজা রাস্তায় চলে এলো। রোদের তাপ আর ভেতরের অভিজ্ঞতায় তার ফর্সা মুখটা তখন একদম লাল হয়ে গেছে। বাচ্চাটিকে বুক দিয়ে শক্ত করে আগলে ধরে, হুমা যে প্রাইভেট গাড়িটি নিয়ে এসেছিল—তার ঠিক সামনে এসে থামল মেহুল।
গাড়ির দরজায় হাত রেখে মেহুল হুমার দিকে ফিরে তীব্র ক্ষোভে বলে উঠল, “না গিয়ে কী করব হুমা?! দেখলি না ভেতরের পরিবেশ কেমন বিদঘুটে আর থার্ড ক্লাস?! এরা শুধু শুধু দেশের সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা ট্যাক্সের টাকা ধ্বংস করছে, আর কিচ্ছু না! এদের কাছে একটা নিষ্পাপ বাচ্চার দায়িত্ব দেওয়া আর তাকে কোনো কসাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া একই কথা!”
হুমা মেহুলের মেজাজ চড়ে যেতে দেখে আর বাড়তি তর্ক করল না। সে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে, শান্ত হ আগে। গাড়িতে বস।”
মেহুল তড়িঘড়ি করে পেছনের সিটের লক খুলে বাচ্চাটিকে পরম যত্নে কোলে নিয়ে ভেতরে গিয়ে বসল। হুমাও ড্রাইভিং সিটে বসে দরজার লক আটকে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। অতঃপর গাড়ি রাজপথের দিকে চলতে শুরু করতেই মেহুল বাচ্চার নরম তুলতুলে গালটায় একটু হাত বুলিয়ে দিল। বাইরে তখন বিকেলের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে, আর মেহুলের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—” কি ঘটবে সামনে।”
সন্ধ্যার আবছা আলো নেমে আসছে ‘শিকদার নিবাস’-এর বিশাল সবুজ আঙিনায়। গোধূলির রাঙা আলো গাছের পাতা ছুঁয়ে ধীর পায়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
বাগানের দোলনাটায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন ইকবাল শিকদার। মেহুল বাড়ি ছেড়ে রাজশাহী মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে আজ চার দিন হতে চলল। দেখতে দেখতে চারটে দিন কেটে গেলেও, বাড়ির পুরো পরিবেশটাই যেন মেহুলকে ছাড়া একদম প্রাণহীন, খাঁ খাঁ করছে! সেই সাথে ইকবাল সাহেবের মনটাও কেমন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতায় ছেয়ে আছে।
মেহুল দূরে যাওয়ার পর থেকে তিনি যখনই সামান্য একটু অবসর পেয়েছেন, তখনই ফোন করে মেয়ের খোঁজখবর নিয়েছেন। আর মেহুলও ব্যস্ততার ফাঁকে অন্তত একটা ছোট মেসেজ পাঠিয়ে বাবার দুশ্চিন্তা দূর করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু গত কাল রাত থেকেই মেয়েটার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই!
অপরদিকে সকালে ব্যস্ত আছে মনে করে কল না দিলেও বিকেলের মধ্যে বেশ কয়েকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি—ফোন শুধুই রিং হয়ে কেটে গেছে।
এদিকে মেয়ে যে বান্ধবী হুমার বাড়িতে উঠেছে তার নাম্বারটাও মেহুলের থেকে নিতে ভুলে গিয়েছেন তিনি। তাইতো মেয়ের এই হঠাৎ যোগাযোগহীনতা ইকবাল সাহেবের বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। রাজশাহী শহরটা নিয়ে এমনিতেও তার টেনশনের শেষ নেই, তার ওপর মেহুলের এমন ফোন রিসিভ না করা সব নিয়ে তিনি অস্থির হাতে চশমাটা বারবার নাকের ওপর ঠিক করছেন, মনটা ভীষণ উচাটন হয়ে আছে।
ঠিক তখনই দূরবর্তী মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো মাগরিবের আজানের সুমিষ্ট ধ্বনি।
আজানের সুর কানে আসতেই ইকবাল সাহেব একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু দু-পা এগোতেই বাড়ির ভেতরের বারান্দা থেকে মিনারা বেগম প্রায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেরিয়ে এলেন! তার হাতে বাজতে থাকা মোবাইল ফোনটি উঁচিয়ে ধরে দূর থেকেই উৎফুল্ল গলায় বলে উঠলেন—
”ভাইজান! ভাইজান , দাঁড়ান! মেহুল কল করেছে! আপনার ফোন তো টেবিলে ফেলে রেখে এসেছিলেন, তাই আমার ফোনে মেহু রিং দিয়েছে!”
’মেহুল কল করেছে’—শব্দ দুটো শোনামাত্রই ইকবাল সাহেবের বুকের ওপর থেকে যেন এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক পাথর নেমে গেল! তিনি এক প্রকার ছুটে গিয়ে মিনারা বেগমের হাত থেকে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে কানে তুললেন।
”হ্যাল্লো… মা? মেহু? তুই ঠিক আছিস মা?!”—ইকবাল সাহেবের গলায় একরাশ আকুলতা আর ব্যাকুলতা এক নিমেষে ঝরে পড়ল।
ওপাশ থেকে মেহুলের সেই সুমিষ্ট, পরিশীলিত গলা ভেসে এলো—”বাবা! একদম ঠিক আছি। তুমি কেমন আছো বলো? আর এভাবে হাপাচ্ছ কেন?”
”আমি কেমন থাকি বল তুই ছাড়া?! কাল রাত থেকে তোকে কতবার ফোন করেছি জানিস? একবারও কল ধরিসনি! কত রকমের খারাপ চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরছিল মা আমার! তোকে ছাড়া কি এই বাড়ি ভালো লাগে আমাদের?”—বাবার কণ্ঠে জমে থাকা সমস্ত চিন্তা ও অভিমান যেন এক ঝটকায় বেরিয়ে এলো।
মেহুল ফোনের ওপারে মৃদু একটু হাসল। বাবার এই সীমাহীন মায়া আর ভালোবাসাই তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তবে সে ইচ্ছা করেই বাচ্চাটির ব্যাপারে বাবাকে এখন কিছু বলল না। কারণ, এই অনাহূত রাজকন্যার কথা জানলে বাবা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়বেন।
তাই মেহুল অত্যন্ত মিষ্টি গলায় বাবাকে আশ্বস্ত করে বলল, “ইশ রে আমার আব্বুটা! এত দুশ্চিন্তা করো কেন বলো তো? আসলে গতকাল রাত থেকে ক্যাম্পে পেশেন্টের প্রচণ্ড চাপ ছিল। আর বিকেলে তো হঠাৎ করে এক জটিল কেস সামলাতে গিয়ে ফোন সাইলেন্ট করা ছিল। তাই দেখতে পাইনি। সরি তো আব্বু… আর কখনো এমন হবে না!”
মেয়ের নরম, আদুরে গলার আশ্বাস পেয়ে ইকবাল সাহেবের মুখের থমথমে ভাব অনেকটাই কেটে গেল। তিনি ধীর পায়ে বারান্দার চেয়ারটায় বসে বললেন, “ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছিস তো মা? শরীর খারাপ করিস না যেন। তুই না থাকলে আমার সকালের চা-টাও যেন পানসে লাগে!”
”হ্যাঁ আব্বু, একদম টাইমমতো খাচ্ছি। তুমি একদম চিন্তা করো না তো! শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখছ তো তুমি? সময়মতো ওষুধ খাচ্ছ?”—মেহুল পরম মমতায় বাবার খবর নিচ্ছিল।
কিন্তু ঠিক তখনই!
হুমার গাড়ির ব্যাকসিটে শুয়ে থাকা সেই একরত্তি রাজকন্যা হঠাৎ করে নিজের পুঁচকে গলা ছেড়ে ফিক করে কেঁদে উঠল—”উঁউঁউঁ… প্যাঁঅঅঅ!”
শব্দটা এত স্পষ্টভাবে ফোনের রিসিভারে গিয়ে আঘাত করল যে, ইকবাল সাহেব চমকে উঠলেন!
তিনি ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা একটু পরখ করে নিয়ে তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করলেন, “অ্যাই মেহু! বাচ্চার কান্নার শব্দ এলো না?! এই সময় তোর ওখানে বাচ্চা কোথা থেকে এলো মা?”
হঠাৎ বাচ্চার কান্নার শব্দে মেহুলের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য ছ্যাঁৎ করে উঠল! সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে গাড়ির কাঁচ থেকে মুখ সরিয়ে, যেন সত্যিই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে—এমন ভঙ্গি করে চটজলদি বলে উঠল—
”ওহ্ ওটা! আসলে আব্বু আমি এখন হুমার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমার সাথে কথা বলছি তো… পাশের ফ্ল্যাটের ছোট্ট বাচ্চা হয়তো কান্নাকাটি করছে! একদম পাশে তো, তাই শব্দটা চলে এসেছে।”
ইকবাল সাহেব সরল মনে মেয়ের বানিয়ে বলা কথাটা বিশ্বাস করে নিলেন। তিনি এক গাল হেসে বললেন, “ওহ্, তা-ই বল! আমি তো ভাবলাম তুই কার বাচ্চা নিয়ে বসে আছিস! ঠিক আছে মা, আজান হয়ে গেছে। সাবধানে থাকিস, নিজের যত্ন নিবি। আর কাল সকালে উঠে আগে আমাকে একটা কল দিবি, বুঝলি?”
”আচ্ছা আব্বু, তুমিও নিজের খেয়াল রেখো। বাই…”
কথাটা শেষ হতেই মেহুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা কেটে দিল।
ওদিকে ইকবাল সাহেবও ফোনটা কেটে একবুক শান্তি আর স্বস্তি নিয়ে মাগরিবের নামাযের উদ্দেশ্যে অজু করতে পা বাড়ালেন। অন্তত তার কলিজার টুকরো মেয়েটা ভালো আছে—এইটুকুই যেন একজন বাবার সারাদিনের সবচেয়ে বড় প্রশান্তি!
সালমানের নিজের ব্যক্তিগত জিম রুমের ভেতরে তখন এক শ্বাসরুদ্ধকর আর থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। নেওয়াজ বাড়ির এক কোণে অবস্থিত বিশাল এই জিম স্পেসটা পুরো লাল-কালো থিমে সাজানো, যার এক ইঞ্চি জায়গাতেও সালমানের অনুমতি ছাড়া কারও পা রাখার বিন্দুমাত্র সাহস নেই।
জিমের মেঝের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সালমান শাহ নেওয়াজ। পরনে শুধুই কালো রঙের জিম ট্রাউজার, উন্মুক্ত চওড়া বুকের প্রতিটি পেশি থেকে অনবরত বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। ভারী ডাম্বেল আর রডের কসরতে তার পুরো শরীরের চামড়া রক্তিম আভা ধারণ করেছে। কিন্তু সেই শারীরিক ক্লান্তির কোনো চিহ্ন তার চোখেমুখে নেই; বরং তার ধারালো, গভীর চোখের তারা স্থির হয়ে আটকে আছে সামনের বিশাল দেয়ালটার ওপর টাঙানো বিশালাকার স্মার্ট টিভিটার দিকে!
টিভির স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে আজ সকালে মেডিকেল ক্যাম্পে ঘটে যাওয়া সেই লজ্জিত, রক্তিম মুহূর্তটা!
মেহুল যখন অপরাধবোধে মাখা মুখে আধো-লজ্জিত ভঙ্গিতে সরি বলছিল—ঠিক সেই দৃশ্যটা স্পষ্ট ভেসে উঠছে বার বারবার। সালমান সবার আড়ালে তার চোখের হাই-টেক সানগ্লাসের গোপন ক্যামেরা দিয়ে মেহুলের সাথে কাটানো পুরো সময়টা নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে রেখেছিল। আর এখন সেটাই মনোযোগ সহকারে দেখছে। এদিকে
টিভির আলোয় তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে এক মায়াবী, মাতাল করা হাসি। ঘামের ফোঁটা কপাল বেয়ে গড়িয়ে চোখের পাপড়িতে এসে জমলেও সালমানের দৃষ্টি সেই টিভির স্ক্রিন থেকে যেন এক চুলও সরছিল না।
ঠিক এমন সময় জিম রুমের ভারী মেহগনি কাঠের দরজায় সশব্দে কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো—”ঠক, ঠক, ঠক!”
এই রুমের সীমানায় ঢোকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তা বাড়ির প্রতিটা মানুষ হাড়ে হাড়ে জানে। তাই দরজার ওপার থেকেই ভেসে এলো রবির গম্ভীর ও চাপা কণ্ঠস্বর—
” ভাই! একটু বাইরে আসেন, জরুরি কথা আছে।”
কানে শব্দটা পৌঁছাতেই সালমান একমুহূর্তের জন্য টিভির দিক থেকে চোখ সরাল। বুকের গভীর থেকে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে স্টেন্ড থেকে তোয়ালে নিয়ে সে ভারী কদম ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই দেখতে পেল—সামনে থমথমে আর গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে রবি।
রবির চেহারা দেখে সালমানের বুকের ভেতর এক সূক্ষ্ম খটকা লাগল। রবিকে সচরাচর এত বিষাদগ্রস্ত বা গম্ভীর হতে দেখা যায় না, যদি না মারাত্মক কোনো কাণ্ড ঘটে থাকে!
সালমান রবির দিকে একনজর তাকিয়ে তোয়ালে দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এত থমথমে মুখ কেন তোর?”
পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুবর দিকে ঘামভেজা তোয়ালেটা ছুড়ে দিয়ে, তার হাত থেকে একখানা কালো সুতি টি-শার্ট টেনে নিয়ে গায়ে জড়াতে জড়াতে সালমান ফের বলল, “তোর ওই গম্ভীর চেহারার কারণ কী বলবি রবি? আর সকালের ওই কেসটার কিছু করলি?”
রবি কিছুটা সময় নিয়ে অত্যন্ত বিনীত ও গম্ভীর গলায় বলল, ” ভাই, সকালে যে বয়স্ক মহিলাটা বিচার দিয়ে ছিলো—যার মেয়েকে স্টেশনের আশেপাশের এলাকায় কিছু বখাটে ছেলেরা উত্ত্যক্ত করেছিল আর ছেলেকে মেরেছিল, তাদের সিসিটিভি ফুটেজ আমি বের করেছি।”
টি-শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিতে নিতে সালমান বলল, “হুম, তা চিহ্নিত করতে পেরেছিস ওই জানোয়ারগুলোকে? কোথাকার ছেলে ওরা? আমার এলাকায় এসব করার সাহস পায় কই এরা?”
রবি এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে উত্তর দিল, “চিনেছি ভাই। ওই এলাকার স্থানীয় কিছু বখাটে আর গ্যাংস্টার ওরা। তবে…”
”তবে কী?”—সালমান ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
রবি এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের হাতে থাকা আইপ্যাডের স্ক্রিন অন করে সরাসরি সালমানের চোখের সামনে তুলে ধরে বলল—
”ফুটেজটায় শুধু ওই মায়ের বিচারই নেই ভাই… ভিডিওটায় আরও মারাত্মক কিছু রেকর্ড হয়েছে। ফুটেজের একদম শেষ অংশটা একটু দেখুন!”
সালমান কৌতুহল নিয়ে ট্যাবের জ্বলজ্বলে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই কয়েক মিনিট পরেই তার চোখের তারা দুটো থমকে গেল, বুকের গভীর থেকে বাতাস যেন নিমেষে উবে গেল!
সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে—ঝাপসা এক অন্ধকার রাতের দৃশ্য! নির্জন রাজপথ চিরে ছুটছে মেহুল! তার পেছনে তাড়া করে আসছে চার-পাঁচজন নেশাগ্রস্ত, হিংস্র মাতাল ছেলে! মেহুল জীবন বাঁচাতে উন্মাদের মতো দৌড়ে গলির ভেতরের অন্ধকারের দিকে ঢুকে যাচ্ছে, আর লোকগুলো তার পিছু পিছু সেই গলির বাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে!
মুহূর্তের মধ্যে সালমানের চোখের ভেতরের সমস্ত মায়া আর কোমলতা উধাও হয়ে সেখানে নেমে এলো তাণ্ডবনৃত্যের এক রক্তচক্ষু দাবানল!
তার ফর্সা হাত দুটো এক নিমেষে শক্ত মুষ্টিতে রূপান্তরিত হলো। ভেতরের রাগ আর হিংস্রতায় হাত আর ঘাড়ের রগগুলো মোটা হয়ে ত্বকের ওপর খোদাই করা লতার মতো ভেসে উঠল! চিবুকের হাড় দুটো কামড়ে ধরে সালমান এমন এক হিংস্র এক্সপ্রেশন ফুটিয়ে তুলল, যা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুব আর রবি পর্যন্ত যেন শিউরে উঠল!
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১৬ (২)
মেহুল—তার প্রেয়সী , তার রক্তে মেশা ভালোবাসার অপ্সরা—তার গায়ে হাত দেওয়ার দুঃসাহস করেছে কোন জানোয়ারের দল?
সালমান চোখ দুটো বন্ধ করে এক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর যখন চোখ খুলল, সেই চোখে তখন কেবলই খুনের নেশা! সে ট্যাবের স্ক্রিনে ভেসে থাকা সেই মাতালগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে হাড়-কাঁপানো এক শিলাখণ্ড গলায় গর্জে উঠল—
”রবি! ওই ছেলেগুলোকে আধাঘণ্টার মধ্যে আমার টর্চার সেলে চাই! বেঁচে থাকবে, নাকি পঙ্গু হয়ে আমার পায়ে পড়বে—সে সিদ্ধান্ত আজ রাতে আমি নিজে নেব!”
