শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১
আফীফা আফনান
”তুই কখনো মা হতে পারবি না! তার ওপর নিজেকে একবার দেখ, কেমন মুটিয়েছিস! দেখতে একদম বয়স্ক মহিলাদের মতো লাগে। তোকে দেখলেই আমার বন্ধুরা আমার সামনে হাসাহাসি করে। আমার তো একটা আত্বসম্মান আছে তাই না।
এখন তো তোকে নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে পর্যন্ত আমার অস্বস্তি হয়। তাই অনেক ভেবে বুঝলাম আমার পক্ষে তোকে বিয়ে করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়।
আমি মুক্তি চাই! পারলে আমাদের মাঝে যা কিছু ছিল, সব ভুলে যা। আর হে আরেকটা কথা আমি আনিকাকে পছন্দ করি আর ওকেই বিয়ে করতে চাই। তবে হে আনিকা এসব কিছু জানে না তাই ওকে নিয়ে অযথা কিছুই ভাবিস না। এটা আমার সিদ্ধান্ত, কারন তোকে বিয়ে করলে আমার লাইফটা জাস্ট নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমি মামাকে পরিষ্কার বলে দেবো—এই বিয়ে আমার পক্ষে সম্ভব না। সেই জন্য বলছি প্লিজ, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কান্নাকাটি করে কোনো সিন ক্রিয়েট করিস না। বলে দিস তুইও এই বিয়েটা করতে ইচ্ছুক নস। তুইতো আমাকে ভালোবাসিস আমার জন্য কি এতোটুকু করতে পারবি না মেহুল? আমরা না হয় বাকি জীবন ভালো বন্ধু হয়ে থাকবো।”
নিজের ভালোবাসার মানুষটার মুখে এমন নির্মম কথা শুনে মেহুল যেন পাথর হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার চারপাশের পুরো পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সময়টা যেন থমকে গেলো
দীর্ঘ বারোটা বছর! হ্যাঁ বারোটা বছর ধরে যে মানুষটাকে পাওয়ার জন্য সে দিন গুনেছে, পরম যত্বে অপেক্ষা করে এসেছে—সেই মানুষটাই আজ তাকে এভাবে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে?
মেহুল যে কখনো মা হতে পারবে না, এ সত্য তো আরমানের অজানা ছিল না। সব জেনেশুনেই তো সে মেহুলের হাত ধরেছিল। হাজারটা ওয়াদা করেছিল—কখনো একা ফেলে যাবে না। তবে আজ কেন সেই অপূর্ণতাকেই অজুহাত বানিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো?
ওহ, ভুল হলো! শুধু তো এই একটা কারণ নয়, আরও একটা কারণ আছে। তাকে নাকি এখন বয়স্ক মহিলাদের মতো দেখতে লাগে!
হঠাৎই মেহুল হেসে উঠল। অদ্ভুত, শব্দহীন এক হাসি। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল কেবল ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া একরাশ হাহাকার।
এদিকে মেহুলকে হঠাৎ এভাবে হাসতে দেখে আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বিরক্ত ও অবাক কণ্ঠে বলে উঠল, “এভাবে হাসছিস কেন? আমি কী বলতে চেয়েছি বুঝেছিস তো? আমার হাতে একদম সময় নেই, মামাকে জানাতে হবে। কিন্তু তার আগে তোর সাথে সব পরিষ্কার করা দরকার ছিল বলেই এখানে আসা। আশা করি তুই কোনো ঝামেলা করবি না।”
এতক্ষণ সব কিছু পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে শুনলেও, মেহুল এবার চোখ তুলল। শান্ত, শীতল গলায় প্রশ্ন করল, “ঠিক কতদিন ধরে আনিকাকে পছন্দ করো, আরমান ভাই?”
আরমান একটুও দ্বিধা না করে উত্তর দিল, “দুই বছর।”
’দুই বছর!’—শব্দ দুটো মেহুলের বুকে তপ্ত শূলের মতো বিঁধল। তার মানে, সে যখন নিজের চেনা শহরে আরমানকে পাওয়ার তীব্র অপেক্ষায় দিন গুনছিল, ঠিক তখনই তার ভালোবাসার মানুষটি অন্য কাউকে নিজের হৃদয়ে জড়িয়ে নিচ্ছিল।
মেহুল আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করল না। কারন সে জানে, মানুষ যখন চলে যেতে চায়, তখন অজুহাতের অভাব হয় না।
তাইতো ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে মেহুল শেষবারের মতো আরমানের দিকে তাকাল। সেই গভীর দৃষ্টিতে কী ছিল, আরমান তা পড়তে পারল না। মেহুল শুধু বলল, “মুক্তি দিলাম। কারণ, যে চলে যেতে চায়, তাকে আটকে না রেখে যেতে দেওয়াই শ্রেয়।”
মেহুলের মুখে এই কথা শুনে আরমানের মুখটা স্বস্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এতোক্ষন একটু দোটানায় থাকলেও মেহুলের কাছ থেকে নিজের মন মতো উত্তর পেয়ে নিজের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আর পেছনে রেখে গেল এক ধ্বংসস্তূপ—যেখানে পড়ে রইল বারো বছরের ভালোবাসায় তিল তিল করে ভেঙেচুরে যাওয়া একটা মেয়ে।
আরমান ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই মেহুল রোবটের মতো ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। দরজাটা বন্ধ করেই সে শাওয়ারের কলটা ছেড়ে দিল। তীব্র বেগে নেমে আসা পানির ধারার নিচে সে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সামনে রাখা বড় আয়নাটার দিকে তাকাতেই মেহুলের বুকটা চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
আজ মেহুলের আকদ হওয়ার কথা ছিল! এই এতক্ষণ আরমান যখন তাকে এতগুলো অপমানজনক কথা বলছিল, তখনো মেহুল বিয়ের কনে সেজে লাল শাড়িতে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সকাল থেকে তার আনন্দের সীমা ছিল না, খুশিতে যেন সে হাওয়ায় ভাসছিল সে। কারণ, দীর্ঘ বারো বছরের ভালোবাসার আজ পূর্ণতা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুহূর্তের ঝড়ে সব যেন ধুলোয় মিশে গেল।
মেহুল বরাবরই মেকআপ পছন্দ করত না। কিন্তু আজ সেজেছিল। পার্লারের মেয়েরা প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে যত্ন করে তাকে সাজিয়ে দিয়েছিল। আর আজ সেই পরম যত্নের সাজ পানির ধারায় ধুয়ে-মুছে একাকার হয়ে নর্দমায় বয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ মেহুল নিজের দুহাত দিয়ে মুখটা পাগলের মতো ঘষতে শুরু করল। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে মুখটা রগড়াচ্ছে, যেন ঘষে ঘষে নিজের গায়ের চামড়াটাই তুলে ফেলতে চাইছে।
মেকআপ পুরোপুরি ধুয়ে যাওয়ার পর মেহুল আয়নায় নিজের আসল মুখটা দেখল। চোখের নিচে হালকা ডার্ক সার্কেল, কিছু ব্রণের দাগ, থুতনির নিচে একটা পুরনো কাটার দাগ আর গালে কিছু তিল। মেহুল এর আগে কখনো এগুলো এভাবে খেয়ালই করেনি। কারণ, তার তো কখনো আয়নাতে নিজেে এভাবে দেখার প্রয়োজনই পড়েনি! তার বাবা ইকবাল সাহেব তো সবসময় বলতেন, “আমার মেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী, দেখতে হুবহু তার মায়ের মতো।”
মেহুলের এখনো মনে আছে এইতো সকালে যখন সে সাজছিলো তখন মেহুল আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিলো বিধায় তার বাবা শিকদার জাবেদ ইকবাল সাহেব যখন তার রুমে এসেছিলো তখন তার চেহারা মেহুলের চোখ এড়ালো না। সে মুচকি হেসে বলে উঠল, “কী বাবা? আমাকে একদম মায়ের মতো লাগছে না?”
ইকবাল সাহেব মুগ্ধ চোখে মেয়ের দিকে চাইলেন। তার চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠলেও মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আমার মাকে আজকে একদম তার মায়ের মতোই লাগছে।”
বাবার মুখে ‘আমার মা’ ডাকটা শুনে মেহুলের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অভিমানী সুখের হাসি ফুটে উঠল।
ইকবাল সাহেব মেহুলের পাশে এসে খাটের ওপর বসলেন। মেয়ের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা মা, তুই এই বিয়েতে সত্যি খুশি তো?”
মেহুল বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি খুশি থাকলেই আমি খুব খুশি, বাবা।”
মেয়ের কথাতে ইকবাল সাহেব হোহো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “আমি তো খুব খুশি, মা! আরমানের মতো এত ভালো একটা ছেলে পেয়েছি, যে আমার মেয়েকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে এবং তার সবটা জেনেই তাকে নিজের করে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? আর তার চেয়েও বড় কথা, বিয়ের পর তুই আমার থেকে দূরে চলে যাবি না, আমার চোখের সামনেই থাকবি। এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।”
বাবার ঠোঁটের কোণে থাকা সেই তৃপ্তির হাসিটা মেহুলের বুকে যেন পরম এক শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। সে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল এই মানুষটার দিকে। যে মানুষটা জীবনের প্রতিটি ঝড়ে তাকে আগলে রেখেছে, সমাজ যখন তাকে অপূর্ণ বলে ছুড়ে ফেলেছিল, তখনো এই বাবা তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলো—আজ তার মুখের এই হাসিটাই মেহুলের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
অতঃপর মেহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, আবেগ সামলাতে না পেরে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। ইকবাল সাহেবও পরম যত্নে পরম মমতায় কলিজার টুকরো মেয়েকে নিজের বুকের সাথে আগলে নিলেন।
কিন্তু এখন দৃশ্যটা সম্পূর্ণ আলাদা বাবার চোখে মেহুল সুন্দরী হলেও তাহলে আজ কেন তাকে শুনতে হলো সে দেখতে বয়স্কা মহিলাদের মতো? এই যে চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল, এটা তো এমনি এমনি পড়েনি। দিনের পর দিন আরমানের জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করার ফল এটি। আরমান যখন রাত জেগে অফিস করত, তখন তো তার পরিবারে কেউ তার জন্য জেগে থাকত না। আরমানের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থেকে শুরু করে সকালের ওষুধ—সব মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো মেহুলেরই ছিল। আজ শিকদার এন্টারপ্রাইজে আরমানের যে এত সাফল্য, তার পেছনে মেহুলের অবদান কতখানি, তা তো মেহুল ছাড়া আর কেউ জানে না।
তাহলে আজ কেন মেহুলকে এই চরম অপমান সহ্য করতে হলো? মানুষ এত সহজে অন্যের করা এত আত্মত্যাগ ভুলে যায় কীভাবে?
মেহুলের হঠাৎই তার বাবার কথা মনে পড়লো। মানুষটা হয়তো সত্যটা জানলে খুব কষ্ট পাবে। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মেহুলের ভেতর থেকে।
অতঃপর ভাবতে ভাবতেই একটানা কিছুক্ষণ আয়নায় নিজের দিকে চেয়ে রইল মেহুল। তারপর হঠাৎ করেই সে জোরে হেসে উঠল। সেই হাসির দমকে যেন ঠিকরে পড়ছিল তার সাথে হওয়া সমস্ত অন্যায়ের আর্তনাদ। হাসতে হাসতেই একসময় সে মেঝেতে বসে পড়ল। তার কান্না আর শাওয়ারের পানি যেন আজ মিলেমিশে এক হয়ে গেল। এভাবেই কেটে গেল দীর্ঘক্ষণ।
হঠাৎ করেই মেহুল বাইরে কারো উপস্থিতি টের পেল। তাই তো সে গায়ের ভেজা শাড়িটা সামলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল।
রুমে পা রাখতেই মেহুল দেখল, ফ্যাকাসে মুখে অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তার মনি—মিনারা বেগম।
মেহুলকে ভেজা কাপড়ে বের হতে দেখে মিনারা অত্যন্ত ব্যথিত চোখে কিছু একটা বলতে চাইলেন। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে মেহুল খুব শান্ত গলায় বলল, “মন খারাপ কোরো না মনি। যা হচ্ছে, হতে দাও। তুমিই তো একদিন বলেছিলে কাউকে জোর করে আটকে রাখা যায় না।”
মিনারা স্তব্ধ হয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরক্ষণেই তার চোখেমুখে তীব্র রাগ আর ক্ষোভ ফুটে উঠল। তিনি ভাঙা গলায় অথচ ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন, “আরমান এমনটা কীভাবে করতে পারল মেহুল? ও তোকে এভাবে রেখে দুলাভাইয়ের কঝে আনিকাকে বিয়ের করার প্রস্তাব রেখেছে! তাও এমন একটি দিনে, ও কি নিজের অতীত আর তোর করা সব অবদান এক নিমেষে ভুলে গেল?”
মিনারা বেগমের কথার মাঝেই মেহুল নিজের ভেজা জামা বদলে নিয়েছে। অতঃপর মনির রাগান্বিত চেহারার দিকে তাকাল। পরম মমতায় কাছে এসে মিনারা বেগমের মুখটা নিজের দুহাতের মুঠোয় নিল। খুব নরম গলায় বলল, “সব ভুলে যাও মনি, সব। মিছেমিছি রাগ করে থেকো না। একটু হাসো তো দেখি! এই দেখো আমি হাসছি।”
মিনারা বেগম অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু মেহুল ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফোটাল। ঠিক তখনই কর্কশ আওয়াজে তার ফোনটা বেজে উঠল। মেহুল দ্রুত গিয়ে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলল। মেহুল তা শান্তভাবে শুনল, তারপর শুধু বলল, “আমি আধঘণ্টা পরেই আসছি।”
ফোনটা রেখে মিনারার দিকে একপলক তাকিয়ে মেহুল জিজ্ঞেস করল, “বাবা কোথায়?”
”নিচে আছেন।” মিনারা বেগম জবাব দিলেন।
মেহুল আর কথা না বাড়িয়ে মিনারাকে ঘরে রেখেই নিজের রুম থেকে বের হয়ে এলো। ওদিকে মিনারা তখনো আরমানের ওপর মনে মনে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
মেহুল যখন লম্বা করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ঠিক তখনই তার কানে চেনা একদলা হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসলো। ভেতরের কোনো একটা ঘর থেকে কেউ খুব রসিয়ে রসিয়ে হাসছে আর গল্প করছে। এই চেনা কণ্ঠস্বরটি মেহুলের খুব পরিচিত—আনিকা! মেহুলের মামাতো বোন, বয়সে মেহুলের চেয়ে মাত্র তিন মাসের ছোট। এই সেই আনিকা, যাকে আরমান এখন পছন্দ করে। কী অদ্ভুত আর নির্মম একটা রসিকতা! আরমানের চোখে মেহুল আজ বুড়ি হয়ে গেছে, অথচ মেহুলের চেয়ে মাত্র তিন মাসের ছোট আনিকা এখনো তার কাছে অল্প বয়সী এক রূপসী তরুণী!
মেহুল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। মাথা নেড়ে সে যখন পা বাড়িয়ে চলে যেতে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে কিছু বিষাক্ত কথা তীরের মতো এসে তার কানে বিঁধল। আনিকার বান্ধবীদের একজন বলে উঠছে:
”বাহ আনিকা! শেষমেষ তুই-ই জিতলি। অবশেষে তুই যা চেয়েছিলি, ঠিক তাই হতে চলেছে।
পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলো, “তুই-ই আরমান ভাইয়ের বউ হতে যাচ্ছিস! কী কিসমত তোর, মানতেই হবে! সব কিছু একদম তোদের প্ল্যান মতোই হয়েছে। তোর ওই কাজিন মেহুলটা আসলেই একটা আস্ত বোকা! তোদের কত অন্ধের মতো বিশ্বাস করত। বেচারি জানতেই পারল না যে বিগত দুই বছর ধরে তোর আর আরমান ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক চলছে! তুইও কী সুন্দর অভিনয় করে গিয়েছিস একদম জায়গা মতো হাত দিয়েছিস।”
ঠিক তখনই আনিকা বলে উঠলো, ” আসলে আরমান যেমনটা বলেছে আমি তেমনটাই করেছি। আর মেহুলের কথা বলছিস ও কিছুই করতে পারবে না। একে তো বন্ধা জীবনে বাচ্চা হবে না তার ওপর আরমানতো ওকে ভালোইবাসে না। আরমান তো মাএ ভালোবাসার নাটক করেছে শুধু মাএ ইকবাল ফুফার কোম্পানিতে নিজের জায়গা করে নিতে। আর আমাদের বিয়েটা আরো আগেই হতো, কিন্তু ওর অফিশিয়াল কাজের জন্যই এতো লেট জানিসই তো আরমান আজ এক সপ্তাহ হলো শিকদার এন্টারপ্রাইজ এর বড় পদে এসেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা কয়েকদিন পরে দেখবি ও কোম্পানির চেয়ারম্যান হযে যাবে”।
আনিকার কথা শুনেই বান্ধবিরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো একজনতো বলেই বসলো, “আমাদেরও একটু টিপস দে না রে, দেখি কোনো বড়লোক বাপের ছেলেকে পটাতে পারি কি না! পারলেই তো জীবনে মজা আর মজা।”
আনিকারাযখন এসব বলে হাসছে ঠিক তখনই কথাগুলো কান দিয়ে সোজা মেহুলের বুকে গিয়ে বিঁধল। সে বুঝতে পারল, তাকে ঠকানো হয়েছে; অত্যন্ত নির্মম আর ঠাণ্ডা মাথায় ঠকানো হয়েছে। দিনের পর দিন ভালোবাসার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে, তার সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে এক গভীর অন্ধকারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দুজন মানুষ বিগত দুটো বছর ধরে তার চোখের সামনেই আড়ালে একটা বিষাক্ত সম্পর্কের জাল বুনে এসেছে!
মেহুলের নিজের ওপরই এখন তীব্র চিৎকার করে হাসতে মন চাইল। ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো নিজের মনকে—কী অদ্ভুত বোকা তুই মেহুল! এতগুলো বছর পার করেও মানুষ চিনতে পারলি না?
কিন্তু সেই দুর্বলতা ক্ষণিকের জন্যই। হঠাৎ করেই মেহুলের চোখের মণি দুটো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। কান্নার জল শুকিয়ে সেখানে জমা হলো এক হিমশীতল আগুন। একটু আগেও সে ভেবেছিল আরমানকে নীরবে ছেড়ে দেবে, নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে সরে দাঁড়াবে। কিন্তু না! প্রতারণার শাস্তি তো তাদের পেতেই হবে। মেহুল তাদের ছেড়ে দেবে ঠিকই, কিন্তু এত সহজে ছাড় দেবে না।
যে মেহুল এতকাল শুধু ভালোবাসতে জানত, অবহেলার ধাক্কায় তার সেই চেনা রূপটা মুহূর্তেই উবে গেল। তার অবয়বে এখন কোনো করুণা নেই, কোনো হাহাকার নেই; আছে কেবল এক ভয়ঙ্কর, শান্ত জেদ।
সে দরজার আড়াল থেকে আনিকার ঘরের দিকে তাকাল। মেহুলের ঠোঁটের কোণে এবার আর বিষাদের হাসি ফুটল না, ফুটল এক চরম প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা। শিকারী যেমন তার শিকারকে বাগে পাওয়ার জন্য ওত পাতে, মেহুলের চোখ দুটো ঠিক তেমন ধারালো হয়ে উঠল।
