Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৪

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৪

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৪
jannatul firdaus mithila

বাদামী চোখদুটোর মালিক থমকায়। কোমরের ওপর থেকে হাতটা সরে যায় আনমনে। ঘনপল্লবিত চোখদুটো কেমন এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো এদিক-ওদিক।কিয়তক্ষন আগেও যে মানুষটা একপ্রকার হিংস্র রাগে ফেটেঁ পড়ছিল,সে-ই মানুষটাই কি-না এমুহূর্তে একদম শান্ত বনে গেলো!তার হতবাক কন্ঠ ফুড়েঁ আচমকাই চাপা স্বরে বেরিয়ে এলো,
“ চাশমিস!”

অদূরের চারটে টেবিল পরেই বসে আছে মাহি। চারিদিকে আজান পড়ছে বিধায় মাথার ওপর একটু করে ঘোমটা টেনেছে মেয়েটা। সে-ই ঘোমটার স্থায়িত্ব বাড়াতে হাত দিয়ে চালাচ্ছে অব্যর্থ চেষ্টা! শিফনের ওড়না কি-না! বেলেহাজ কাপড় কি আর ওতো বারণ শোনে? বেয়াদবের মতো মাথা থেকে পড়ে যাচ্ছে বারংবার। মাহি এবারেও বিরক্ত। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ ঘোমটার সাথে একপ্রকার নিরব যুদ্ধ চালিয়ে অবশেষে দম নিলো মাহি।নাক ফুলিয়ে তৎক্ষনাৎ মাথা থেকে ঘোমটাটা নামিয়ে দিলো আলগোছে। কপালে গোটাকতক বিরক্তির ভাজঁ টেনে, সামনে রাখা ক্যাপাচিনোর কাপে চুমুক বসায় ধীরেসুস্থে। ওদিকে একজোড়া বাদামী চোখ যে নিরবে তাকে পরোখ করে যাচ্ছে সে খবর কী আর আছে তার?

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মুগ্ধ হাসলো। ঠোঁট পিষে তাও আবার নিরবে।মাহির ওপর থেকে চোখ সরিয়ে চাইলো সেই আহত যুবকের পানে। যুবক নড়েচড়ে বসলো তৎক্ষনাৎ। হুডির দৈর্ঘ্য বেশ ভালো হওয়ায় মুখ অব্ধি ঢেকে গিয়েছে তার।আপাতত আহত যুবকের মুখভঙ্গি খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না। মুগ্ধ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো এবার। ঠোঁট কামড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো লোকটার দিকে। লোকটা কেমন ভয়ে কাঁপছে। মুগ্ধ লোকটার সামনে এসে আচমকাই তাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। মাহির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,

“ চাশমিস!”
পছন্দের ক্যাপাচিনোর কাপে চুমুক বসাতে ব্যস্ত মাহি।ওমনি পাশ থেকে কয়েকদিনের বহুল পরিচিত ভারি কন্ঠ কানে পৌঁছাতেই নাকেমুখে উঠে গেলো মেয়েটার। কাশতে কাশতে বুক চেপে ধরে কোনরকম! ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখলো — মুগ্ধ কেমন ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পানে। মাহি ভড়কায়।তড়াক কন্ঠে হতবুদ্ধির ন্যায় বলে ওঠে,

“ আপনি? এখানে!”
মুগ্ধ নির্বিকার! একহাতে মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে খানিক উল্টেপাল্টে ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে ওঠে,
“ এটা যে তোমার বাবার কফিশপ তাতো জানতাম না!”
ভ্রু কুঁচকায় মাহি। মুগ্ধকে শুধরে দিয়ে পরমুহূর্তেই বলে,
“ আপনাকে কে বললো এটা আমার বাবার কফিশপ?”
এপর্যায়ে চোখ সরু করে তাকায় মুগ্ধ। পেছন থেকে আহত লোকটা চলে যেতে চাইলেই সম্পূর্ণ জায়গা দখল করে দাঁড়ায় সে। বিনাবাক্যে লোকটাকে বেশ কায়দা করে আঁটকে ফেলে বুকের কাছে দু’হাত বেঁধে কেমন ভরাট কন্ঠে বলল,

“ তুমি যেভাবে বললে ❝ আপনি! এখানে?❞ তাতে ভাবলাম এই কফিশপটা বোধহয় তোমার বাবার।তাই এখানে আমার আসা যাবে না। এসে বোধহয় পাপ করলাম!”
মুখ কুঁচকায় মাহি।লোকটার মুখ থেকে এপর্যন্ত এমন ত্যাড়াব্যাকা কথা ছাড়া আর কি কিছু বেরিয়েছে? কই মাহির তো মনে পরছেনা এসব! মাহি মুখ বাঁকিয়ে অন্যত্র তাকায়।মুগ্ধ কিয়তক্ষন গভীর চোখে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই বলল,
“ চলো চাশমিস! তোমাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি!”
এতক্ষণ নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করলেও এবার যেন ফুঁসে ওঠল আহিরা। তড়িৎ বসা ছেড়ে উঠে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,

“ কেনো? আমরা আপনার সাথে এসেছি? আমাদের হাত-পা নেই? আমরা কেনো আপনার সাথে যাবো?”
এহেন কথায় মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটলো মুগ্ধের।ঘাড়ের রগগুলোও ফুটে উঠেছে হঠাৎ! চোয়াল শক্ত হলো কঠিনভাবে। ছেলেটা ঘাড় বাকিয়ে তাকায় আহির পানে। আহির চোখেমুখে একটা ড্যাম কেয়ার ভাব। অথচ কপালে স্পষ্ট দ্বিরুক্তির ভাজঁ। মুগ্ধ আহির দিকে একপলক তাকিয়ে থেকে আচমকাই বাঁকা হাসলো। অদ্ভুত শান্ত গলায় বলতে লাগলো,

“ হাত-পা নাহয় এখন ঠিক আছে তবে তা ভাঙতে কতক্ষণ?”
এরূপ কথায় কেন যেন থমকায় আহি। মনে উত্থাপিত হয় এক অজানা ভয়। তবুও দমেনি তার অদম্য সাহস। মেয়েটা এবার আরেকধাপ চটে গিয়ে বলে বসলো,
“ ভাঙলে ভাঙবে তাতে আপনার কী? আমাদেরটা আমরা বুঝে নিবো।আপনি নিজের চরকায় তেল দিন।”
মেজাজ খিচঁলো মুগ্ধের।চোয়াল হয়ে গেলো আরও শক্ত। হাতদুটোও মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো সবার অলক্ষ্যে। চোখদুটো থেকে বুঝি আগুন বেরুবে এক্ষুণি! মুগ্ধ কটমট করে যেইনা কিছু বলবে তার আগেই কর্নকুণ্ঠে ভেসে এলো সুপরিচিত এক কন্ঠ!

“ আহি,মাহি!”
আহি মাহি একযোগে কফিশপের দরজার দিকে তাকায়। দেখে, রেহান কেমন চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সেথায়। তাকে দেখেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল মাহি। তড়িৎ মুগ্ধকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো রেহানের কাছে। পিছুপিছু আহিও গেলো। অথচ মুগ্ধ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নিজ জায়গায়। এদিকে রেহান কোনরুপ বলা কওয়া ছাড়াই কেমন ত্রস্ত ভঙ্গিতে মেয়ে দু’টোর হাতের কব্জি চেপে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো তক্ষুনি। আহি-মাহি খানিকটা অবাক হলো রেহানের এমন কান্ডে! দু’জন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো একবার।পরমুহূর্তেই আহি হুট করে বলে ওঠে,
“ ভাইয়া? আর ইউ ওকে?”

ত্রস্ত পায়ে গাড়ির দিকে ছুটছে রেহান। আহির প্রশ্নের জবাব দেয়নি তখনও। গাড়ির কাছে এসেই মেয়ে দু’টোকে গাড়িতে বসায় সে। অতঃপর নিজেও গিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে। ভয়ার্ত ঢোক গিলে গাড়ির আউট মিররে চোখ ফেলতেই দেখলো —বলিষ্ঠদেহী মুগ্ধ একজনকে কাঁধে তুলে বেরুচ্ছে কফিশপ থেকে।কাধেঁর ওপর পড়ে থাকা লোকটার ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে সে বুঝি নিষ্প্রাণ। না-কি তাকে আবার মেরে ফেলেছে মুগ্ধ? রেহান আর ভাবতে পারলোনা কিছু। তড়িৎ মাথা চেপে ধরলো নিজের। ব্যাকসিটে বসে থাকা আহি-মাহি চমকালো এবার। চিন্তিত মুখে প্রশ্ন ছুড়লো,

“ কি হয়েছে ভাইয়া? শরীর খারাপ লাগছে?”
রেহান ঢোক গিললো সামান্য। তড়িৎ পেছনে ফিরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ আহি মাহি! তোমরা আমার একটা কথা রাখবে?”
ওপর নিচ মাথা নাড়ায় দুজনেই। রেহান এবার ভয়ে ভয়ে বলে ওঠে,
“ আজকের পর থেকে একমাত্র বাড়ির মানুষ ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলবেনা তোমরা।স্পেশালি মাহি তুমি! মনে থাকবে?”
অবাক হয় মাহি। হঠাৎ তাকে কেনো এমন বলা হচ্ছে তা-ই যেন বুঝে আসছেনা মেয়েটার।তবুও সে চুপচাপ মেনে নিলো কথাটা।রেহান ফের বলল,

“ আজকে থেকে একা একা কোথাও বেরোবে না।খুব প্রয়োজন হলে এটলিস্ট আমাকে বা অন্য কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে বেরোবে।কেমন?”
এপর্যায়ে আহির কেমন খটকা লাগলো যেন।কিছু একটা ভেবে নিয়ে সে হুট করেই বলল,
“ আপনার কাজিন ব্রাদার কি যেন নাম উনার?”
রেহান জিভ দিয়ে সামান্য ঠোঁট ভিজিয়ে জবাব দেয়,

“ মুগ্ধ!”
“ ওহ হ্যা! আচ্ছা.. উনি মাহির সাথে এতো ঘনিষ্ঠ হতে চাইছেন কেনো? এজ পার আই নো, হি ইজ ঠু অলড দ্যান আস। তারপরও কেনো?”
রেহানের কন্ঠস্বর কাঁপছে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের ওপর পরে থাকা হাতটা শক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। মনে মনে আওড়ায় সে,
“ মাঝে মাঝে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও জবাব দেওয়া যায় না আহি!”
মনে মনে কথাটা বললেও মুখে কুলুপ এঁটেছে রেহান। গাড়িতে স্টার্ট বসিয়ে স্রেফ বলল,
“ জানিনা!”

উমম…উমমম উমমম.. ”
গাড়ির ডিঁকি থেকে আহত লোকটার গোঙানির শব্দ ভেসে এলেও তা কানে নেয়নি মুগ্ধ। উল্টো দক্ষ হাতে গাড়ি চালাচ্ছে নিজের মতো। ঠোঁটে বাজছে সেই চিরচেনা শিসের শব্দ! প্রায় আধঘন্টার রাফ ড্রাইভিং শেষে মুগ্ধ গাড়ি থামালো একটি পুরাতন পরিত্যাক্ত গোডাউনের সামনে। মুগ্ধ বেশ সময় নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। দু’হাত পকেটে গুঁজে বেশ ভাব নিয়ে চলে গেলো গোডাউনের ভেতরে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর,গোডাউন থেকে কালো স্যুট-ব্যুট পরিহিত দু’জন বলিষ্ঠদেহী লোক এলেন দৌড়ে। দু’জনার গায়ে একই ধরনের কালো রঙা স্যুট।দেখলে মনে হবে এ যেন তাদের ইউনিফর্ম! লোক দু’টো ত্রস্ত পায়ে ছুটে আসেন গাড়ির নিকট। গাড়ির ডিঁকি খুলে আহত লোকটাকে কাঁধে তুলে আবারও নিয়ে তাকে নিয়ে চললো গোডাউনে। আহত লোকটা এখনো গোঙাচ্ছেন। অথচ নির্দয় লোকগুলোর এইটুকুও মায়া নেই!

বিশাল গোডাউন! যার পুরোটাই ফাঁকা। ঢাকা কামরাঙ্গিরচড়ের পূব পাশের বেশ কয়েকটা গোডাউন বরাবরই মানবশূন্য! এখানে কাজ-ধাঝ খুব একটা নাহলেও বড় বড় আমলা-দালাল কিংবা নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন অপকর্ম ঠিকই ঘটে। গোডাউনের সম্মুখ দুয়ার দিয়ে ঢুকছে মুগ্ধ। ময়লা ধুলোপড়া শুকনো পাতার ওপর পা পড়তেই চারপাশে গুঞ্জন ভেসে আসছে মর্মর শব্দের! আশেপাশে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বেশ কয়েকজন কালো রঙা স্যুট পরিহিত লোক।সকলের হাতে বিদেশি অস্ত্র! প্রত্যেকের মাথা নুইয়ে আছে কেন যেন। মুগ্ধ রয়েসয়ে গিয়ে দাঁড়ালো একদম সামনে। দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থেকে কোরিয়ার ভাষায় হঠাৎ বলল,
“ দামবে-গাজিয়ো-ওয়া!”

[আমার সিগারেট দে!]
কথাখানা বলতে দেরি! পাশ থেকে একজনের ছুটে আসতে দেরি হলোনা যেন।কালো পোশাকধারী লোকটার হাতে একটা ব্লান্ট সিগার প্যাকেট।কোরিয়ার সবচেয়ে দামী সিগারের মধ্যে যেটি অন্যতম। লোকটা কাঁপা কাঁপা হাতে একটা সিগার তুলে দিলো মুগ্ধের হাতে।মুগ্ধ সিগার-টা তক্ষুনি ঠোঁটের ভাঁজে গুঁজল। আবারও লোকটার দিকে হাত বাড়াতেই পেয়ে গেলো লাইটার। অবশেষে সিগার জ্বালিয়ে দিলো এক সুখটান। মোটার ব্লান্টের জোরালো ধোঁয়ায় ধূমায়িত চারিপাশ। দুআঙুলের ভাঁজে সিগার ধরে রেখে একটু একটু টান দিতে ব্যস্ত সে। এরইমধ্যে গোডাউনে ঢুকলো সেই দু’জন বডিগার্ড। যাদের একজনের কাঁধে সে-ই আহত লোকটি।তারা এসেই লোকটাকে আলগোছে কাঁধ থেকে নামিয়ে মেঝেতে রাখে। লোকটা আতঙ্কে জর্জরিত! নিবুনিবু চোখে চারিদিকে একই ধরনের পোশাকধারী মানুষদের দেখে তার এবার মাথা ঘুরে যাওয়ার যোগাড়! সে কেমন ফাঁকা ঢোক গিলে সামনে তাকায়। ঘোলাটে দৃষ্টি অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বলিষ্ঠদেহী যুবকের দীর্ঘকায়ী পিঠে পড়তেই থামলো সে। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে কোনমতে বলতে লাগলো,

“ আপনি ভুল করছেন মিস্টার!আপনি শুধু আমার সাথে নয়,আপনি গোটা দেশের সাথে গাদ্দারি করছেন।”
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধ এখনো সিগার ফুঁকছে। প্রায় মিনিট খানেক পেরুতেই সে কেমন বাঁকা হেসে গম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগলো,

“ মাসিক বেতন — ৫০ হাজার টাকা। সে হিসেবে বছরের ইনকাম — ছয় লাখ টাকা। পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ইনকাম হবে ত্রিশ লাখ টাকা। অথচ তাের ব্যাংকে আছে ৬৫ কোটি টাকা। সে-ই সাথে বসুন্ধরায় তিনটে ফ্ল্যাট, কালো মার্সিডিজ। এতোই যখন দেশপ্রেমিক তাহলে এতো টাকা পেলি কই? তোর কোন বাপে দিয়ে গিয়েছে এতো টাকা তোরে?”
থমকায় কাস্টম অফিসার রিক্ত। অপরিচিত কারো মুখে নিজের এতো এতো কালো টাকার সন্ধান শুনে লোকটার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেলো! তিনি ভাঙা কন্ঠে আবারও তেজ দেখিয়ে বললেন,
“ ম-মিথ্যা বলবেন না।আপনি.. ইচ্ছে করে আমায় ফাঁসাচ্ছেন।”
সিগার-টা এক্ষুণি ঠোঁটে গুঁজত মুগ্ধ। তবে এরইমধ্যে কাস্টম অফিসারের এহেন কথা কানে যেতেই ছেলেটা কেমন সশব্দে হেসে ওঠে। যার প্রতিটি হাসির শব্দ কান ধরিয়ে দিতে সক্ষম সবার! মুগ্ধ সময় নিয়ে হাসি থামায়। সিগার-টা ঠোঁটে গুঁজে ফের বলে,

“ ০৯Kj 8o ”
সংরক্ষিত গোপনীয় কোডিং নাম্বারটি শুনতেই চোখদুটো কেমন বড়সড় হয়ে গেলো অফিসারের। গলায় নেমে গেলো শুষ্কতা। শরীরে ধরলো কম্পন। সে কেমন হতবাক কন্ঠে বললো,
“ আপনি…? ”
পেছন থেকে তক্ষুনি হাসির রোল পড়লো সকলের মাঝে।খালি পরিত্যক্ত গোডাউনের চারকোণে বাজতে লাগলো সকলের হাসির শব্দ! যা একপ্রকার গাকাঁটা দিয়ে দিচ্ছে অফিসারের। পেছন থেকে একজন বডিগার্ড আচমকাই হাসতে হাসতে বলে ওঠে,

“ গুন-নেু নুগু-ডো আনি-য়া, বারো গু-রিমজা কো-মুল জা-সিন-ই-য়া! দো ওয়াইল্ড ফায়ার!”
[তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং দ্য শেডো মনস্টার।রাশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং।]
থরথর করে কাঁপতে লাগলো রিক্ত! ভয়ে কলিজা অবধি শুকিয়ে কাঠ তার! ওদিকে মুগ্ধ এবার সময় নিয়ে পেছনে ফিরে। ঠোঁটের ভাজঁ থেকে সিগার-টা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চটতে লাগলো একদফা। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আপাতত অফিসারের ওপর। সে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে তার নিকট। অফিসার ভয়ে তটস্থ। পেছনে বেঁধে রাখা হাতদুটো ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ সে। মুগ্ধ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তার মুখোমুখি। কোমরের পেছন থেকে নিজের বন্দুকটা বের করে এনে হঠাৎ তাক করলো অফিসারের কপালের ঠিক মধ্যিখানে।এবার বুঝি নিশ্বাস অব্ধি ফেলতে ভুলে গিয়েছে রিক্ত! ভাঙা ভাঙা কন্ঠে চিৎকার করে বলল,

“ আমি জানতাম না..বিশ্বাস করেন বস! আমি চিনতে পারিনি আপনাকে।”
মুগ্ধ বাঁকা হাসলো। অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে বললো,
“ চিনে ফেলেছিস বলেই তো মরতে হবে!”
রিক্ত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে।আর্তনাদ করে কত-শত অনুনয় জুড়েছে তা বলার বাইরে।অথচ সেসবে কান দেয়নি মুগ্ধ! উল্টো এক নিমিষে ট্রিগার চাপলো তক্ষুনি। মুহুর্তেই এক বিকট শব্দে শান্ত হলো পরিবেশ। শান্ত হলো অফিসারের দেহ!রক্তে রঞ্জিত রিক্তের মুখমণ্ডল একদফা পরোখ করে মুগ্ধ আচমকাই বলল,

“ এতক্ষনে সুন্দর লাগছে! আই লাইক দা কালার অফ ব্লাড!”
কথাটা ব’লেই মুগ্ধ ধীরেসুস্থে নিজের পা থেকে জুতো খুলে।পাদু’টো উম্মুক্ত করে আলগোছে দাঁড়ালো মেঝেতে গড়িয়ে পড়া উষ্ণ র*ক্তের ধারায়। সেথায় পা ডুবিয়ে ছেলেটা কেমন পৈশাচিক হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। চোখবুঁজে কোমরের ওপর দু’হাত ঠেকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কিয়তক্ষন। বিরবির করে বলল,
“ এতদিনে মাথাটা একটু ঠান্ডা লাগছে! ঔষধ পেলাম যে!”

রাতের খাবার-দাবার শেষ! সকলে যে যার মতো ব্যস্ত। এদিকে রেহান বড্ড চিন্তিত! মুগ্ধের ব্যাপারে কাউকে না কাউকে আগাম সর্তক করা জরুরী। কিন্তু কাকে করবে তা-ই যেন ভাবছে সে! তার অবচেতন মন একবার রৌদ্রের কথা ভাবলেও পরক্ষণে সে ভাবনায় আগুন লেগেছে আরেক চিন্তায়! কেননা আগামীকাল ছেলেটা হানিমুনে যাবে।এমন সময় মুগ্ধের মতো সিরিয়াস ইস্যু নিয়ে কথা বলা কী ঠিক হবে?
রেহান আর ভাবতে পারলোনা। মনকে হাজারবার শাসিয়েও যখন কাজ হলোনা তখনি সে ছুটলো রৌদ্রের ঘরের দিকে।

বিছানার ওপর এক ব্যাগ কাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। অথচ রৌদ্র অরিন মত্ত নিজেদের মাঝে।উষ্ণ চুম্বনে ব্যস্ত দু’জন। এরইমধ্যে দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়াবার শব্দ হলো। মুহুর্তেই ছিটকে গেলো দু’জন। হাঁপিয়ে তাকাচ্ছে একে-অপরের দিকে। রৌদ্র বেশ বিরক্ত! কার এতবড় সাহস? তার এমন একটা রোমান্টিক মুডে এসে বাগড়া দেয়? রৌদ্র চটে গিয়ে টেনে ধরে অরিনের কোমর। হিসহিসিয়ে বলে,
“ তুই ছাড়লি কেন?”
অরিন শুকনো ঢোক গিললো। মিনমিনিয়ে বলল,
“ কে যেন এসেছে!”
বলতেই আরেকবার নক পড়লো দরজায়। রৌদ্র কটমট দৃষ্টিতে তাকায় দরজার পানে।ভীষণ রাগ নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে যেতে লাগলেই অরিন পেছন থেকে তক্ষুনি বলে ওঠে,

“ টি-শার্টটা পড়ে নিন!”
রৌদ্র থামলো।আবারও পিছু এসে টি-শার্টটা হাতে এগিয়ে গেলো দরজার কাছে। গায়ে টি-শার্ট জড়িয়ে দরজাটা খুলে যেইনা কিছু বলবে তার আগেই রেহান বলে ওঠে,
“ ভাই! ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।প্লিজ একটু বাইরে আসবি?”
রৌদ্রের মেজাজ বিগড়ায়।দাঁত খিঁচে বলে,
“ এতো রাতে কিসের কথা? যাহ পড়ে শুনবো।এখন আমি ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল ঘাঁটছি। সো আম অলসো বিজি!”
রেহান অতিষ্ঠ চিন্তায়।সে তক্ষুনি এগিয়ে এসে খপ করে চেপে ধরে রৌদ্রের হাত।রৌদ্র হতবাক এহেন কান্ডে। রেহান কেমন অনুনয় সুরে বলল,

“ একটু! প্লিজ একটু শোন আমার কথা।”
এপর্যায়ে রৌদ্রও কেমন সিরিয়াস হলো। সে পা বাড়িয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ কী হয়েছে?”
রেহান আমতা আমতা করছে এবার।ছেলেটা অস্থির। একবার ঘাড়ে হাত রাখছে,আরেকবার কপালে।রৌদ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রেহানের ওমন হাবভাব দেখে সে কেমন সন্দিগ্ধ কন্ঠে বললো,
“ এতো প্যানিক করছিস কেনো? ঘটনাটা কী?”
রেহান ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ফেললো। কোমরের ওপর দু’হাত রেখে বলতে লাগলো,
“ আমার কাজিনের কথা মনে আছে তোর?”

রৌদ্র পুরোটা বোধগম্য হয়নি বোধহয়। সে কেমন আন্দাজ করে বলল,
“ কোনটা যেন?”
“ আরে ঐ যে মুগ্ধ আছে না? মির্জা সায়ান মুগ্ধ! কোরিয়া থেকে এসেছে। মনে পরলো?”
রৌদ্র নড়েচড়ে দাঁড়ায় এবার।ঠোঁট গোল করে বলে,
“ ওহ হ্যা! মনে পরেছে। সে কি দেশে এসেছে না-কি?”
রেহান ওপর নিচ মাথা নাড়ায়। ভয়ার্ত ঢোক গিলে আবারও বলে,
“ আসলে ওকে নিয়েই কথাটা।”
“ কী?”

“ একচুয়েলি মুগ্ধ.. কোনো সাধারণ মানুষ নয়।”
ভড়কায় রৌদ্র। ভ্রু গুটিয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ মানে?”
রেহান বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেললো বড় করে। মনে ভীষণ সাহস যুগিয়ে অবশেষে বলল,
“ আসলে ও একজন…”
“ রেহান ভাই! রুহিপু ডাকছে। তারাতাড়ি এসো।”
রেহানের মুখের কথাটা শেষ হবার আগেই পুতুল দৌড়ে এলো কোত্থেকে যেন। এসেই রেহানের হাত ধরে টানতে টানতে বলল কথাটা।এদিকে রেহান অস্থির। যে করেই হোক,রৌদ্রকে কথাটা বলা জরুরী। রৌদ্র এবার মুখ খুললো। থামালো পুতুলকে। নিচু কন্ঠে বললো,

“ তুমি যাও পুতুল। রেহান আসছে!”
নাছোড়বান্দা পুতুল। একপ্রকার গো ধরেই বলে ওঠে,
“ রুহিপু ঘুম থেকে উঠেই কাঁদছে।বলেছে রেহান ভাইকে যেখান থেকেই পারি সাথে করে যেন নিয়ে আসি। প্লিজ ভাইয়া! তুমি পরে কথা বলিও।এখন চলো।”
অগত্যা এমন কথায় রেহান আর কথা বাড়ালো না।এমুহুর্তে তার শ্যামবতীর প্রয়োজন তাকে।না গেলে কী আর হয়? রেহান পুতুলের হাত ধরে করিডর দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থামলো।পেছন ঘুরে অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো রৌদ্রের ওপর। করুণ কন্ঠে বললো,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৩

“ তারাতাড়ি ফিরে আসিস ভাই। তোর সাথে আমার অনেক কথা আছে।”
রৌদ্র চুপ করে শুনলো শুধু। রেহানের কথাগুলো কেমন অন্যরকম লাগলো শুনতে। কী হয়েছে তার? ও কী কোনো কিছু নিয়ে টেন্সড?

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৫