Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১১

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১১

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১১
জাবিন ফোরকান

একের পর এক বেল্টের জোরালো ঘায়ে আহানের মনে হলো বুঝি তার সমস্ত শরীর জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। জীবনে এতটা যন্ত্রণা সে কোনোদিন বোধ করেনি বিধায় হাঁটু ভেঙে এলো মুহূর্তেই। ধপাস করে ড্যান্সফ্লোরের মাঝেই বসে পড়লো সে। সমস্ত শরীরে জড়িয়ে ফেললো নিজের বাহুদ্বয়, বাঁচার আকাঙ্ক্ষায়।
অবশেষে নিজের লীলাখেলা সাঙ্গ করলো জায়দান। প্রচন্ড হাঁপাচ্ছে সে। সমস্ত শরীর ঘেমে উঠেছে, বুক ওঠানামা করছে দারুণ ক্রোধের নিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে। এক হাতে বেল্ট ধরে রেখে অন্য হাতে কলার টেনে ঢিলে করলো সে। শক্ত ঢোক গিলে দেখলো মেঝেতে বিদ্ধস্ত হয়ে পড়া আহানকে। তবুও যেন বুকের ভেতরের মরমজ্বালাটুকু মিটলোনা। ক্লাবের প্রত্যেকটি মানুষ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে হতবিহ্বল চেয়ে আছে বিধায় জায়দান নিজেকে একটু সামলালো। বাইরে থেকে ততক্ষণে গার্ড দৌঁড়ে আসতে শুরু করেছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। লোকজন জড়ো হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আহানের উপর থেকে বিতৃষ্ণা মাখা দৃষ্টি হটিয়ে সে ঘুরে দাঁড়ালো। তাকালো সাবিনের দিকে।
রমণী অ্যালকোহলের প্রভাবে সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা। পা দুটো কাঁপছে, ঢুলছে শরীর এদিক সেদিক। বড় বড় ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে সে তাকিয়ে দেখছে আহানের অবস্থা। জায়দানের দৃষ্টি নিজের উপর অনুভব হতেই হেঁচকি তুললো সে।
লাউড মিউজিক ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে বহু আগেই। প্রত্যেক জ্বলজ্বলে হতভম্ব এবং কৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত দৃশ্যপটে। জায়দান সাবিনের দিকে এক পা এগোলো। তার কন্ঠ বেয়ে অশরীরী শব্দ বেরোলো,

“ ইউ শেইমলেস!”
সাবিন কেঁপে উঠলো। অ্যালকোহলের প্রভাবে নয় বরং নিজের পরিচিত প্রাক্তনের এক অপরিচিত রূপ দেখে। যেমন করে বড়রা বকাঝকা করলে বাচ্চারা লজ্জাবতী পাতার মতন নেতিয়ে যায়, তেমন করেই নেতিয়ে গেলো সাবিন।
“ রাত কয়টা বাজে? আর তুমি একা একা ক্লাবে এসে স্ফূর্তি করছো? ইউ হ্যাভ এনি কমনসেন্স, উইম্যান? ”
জায়দানের ভয়ানক কন্ঠস্বর কানে যেতেই বাঁধনহারা সাবিন যেন রাগান্বিত হলো। কোমরে দুহাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে সে ঝুঁকে এলো, জড়ানো কন্ঠে তীক্ষ্ণ আওয়াজ তুলে বলে উঠলো,
“ ক্লাবে এসেছি, বেশ করেছি! তোমার তাতে কি? তুমি যখন তোমার বউয়ের সাথে ডেটিং এ যাও তখন কোনো সমস্যা হয়না? ”
“ ও আমার বউ না, মাইন্ড ইওর টাং! ”
“ কেন? সত্যি কথা হজম হচ্ছে না? তোমরা, সবগুলো পুরুষ একেকটা নাটকবাজ! দুই সেকেন্ডও লাগেনা তোমাদের একটা ছেড়ে আরেকটাকে ধরতে। কাপড়ের মতন পার্টনার বদলাও। আর মেয়েরা একটু স্ফূর্তি করতে গেলেই যত দোষ? ”
“ শাট। ইওর। ড্যাম। মাউথ! ”

জায়দানের সদা নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বরের মাঝে নির্বিকারতার ছিটেফোঁটাটুকু নেই। হিংস্র পশুর অরণ্য কাঁপানো গর্জন যেন।ক্লাবের মিউজিক এবার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো। চারিপাশ গ্রাস করলো পিনপতন নীরবতা। হতভম্ব সকলে ফিরে চেয়ে দেখলো ছ ফুটি এক রুদ্রমূর্তি দানবকে। ভ্রুর মাঝে তীব্র ক্রোধ কুঞ্চন, চোখের চশমার আড়ালে বাদামী আভায় গুরুতর দৃষ্টি। আবদ্ধ যা তার কাঁধের নিচ অবধি উচ্চতার রমণীর উদ্দেশ্যে।
সাবিন দুলে উঠলো। জায়দানের হঠাৎ হুংকার তাকে ভড়কে দিয়েছে। হেঁচকি তুলে চোখ পিটপিট করে তাকালো সে। এহেন জায়দানকে তার চেনা নেই।
তর্জনী তুলে সাবিনকে শাসালো জায়দান।
“ আমি শেষ বারের মতন বলছি, সাবিন। চুপচাপ, এই মুহূর্তে তুমি আমার সাথে চলো। ”
আরেক হেঁচকি তুললো সাবিন। ঢুলতে ঢুলতে বলল,
“ নাহলে কি করবে তুমি? তোমাকে আমি ভয় পাই? আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও! যাও! তোমার বউয়ের কাছে যাও! আমার কাছে কি? ধোঁকাবাজ পুরুষ… আহ্হ্হ!”
নিজের দেহ শূন্যে ভেসে উঠেছে অনুভব করে আতঙ্কে চিৎকার করে বসলো সাবিন। তাকে রীতিমত পুতুলের মতন করে নিজের কাঁধের উপর ফেললো জায়দান। এক হাতে কোমর চেপে ধরে সুরক্ষিত করলো রমণীর অবস্থান। সাবিন ছটফট করতে করতে ক্রমাগত তার পিঠে দূর্বল কিল ঘুষি বসাতে লাগলো, পায়ের হিলজোড়া খুলে গড়িয়ে পরে গেলো মেঝেতে।

“ ছাড়ো! ছেড়ে দাও আমাকে… বেত্তমিজ, বেলাজ, বেহায়া টাওয়ারের বাচ্চা টাওয়ার! ”
কোনো হেলদোল হলোনা জায়দানের মাঝে। অগুনতি চোখ তার উপর দৃষ্টি ফেলে রেখেছে, তবুও বেপরোয়া সে আজ। সামান্য ঝুঁকে ড্যান্সফ্লোর থেকে সাবিনের হিলজোড়া আঙুলের ডগায় তুলে নিলো সে। কই মাছের মতন কিলবিল করা সাবিনকে সে চেপে রাখলো শক্তভাবে। অতঃপর চোখ ঘোরালো সামনের মানুষটার দিকে। ফ্লোরের মাঝে বসে নিজেকে আঁকড়ে ধরে আগুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আহান।
“ তুই কি ভেবেছিস? আজকের পর পার পেয়ে যাবি? ”
জায়দান ঝুঁকে এলো। নিভু নিভু লালাভ আলো তার চেহারায় প্রতিফলিত হলো, বাদামীর মাঝে ফুটলো দানবীয় দৃষ্টি।
“ তোকে যদি আর একবার ওর আশেপাশেও দেখতে পাই…”
“ খু*ন করবি?”
প্রফেসরের ঠোঁটজুড়ে সূক্ষ্মতর এক বিপদজনক হাসির রেখা ফুটলো। হিমালয়ের ন্যায় হিমশীতল এবং সমুদ্রের ন্যায় গভীর কন্ঠে সে হুমকি দিলো,
“ শরীরকে তো মেডিক্যাল সাইন্স বাঁচিয়ে নেয়, আমি ধরলে তোর মস্তিষ্ককে সাইকোলজির আব্বাও বাঁচাতে পারবেনা! ”

বিহ্বল চেয়ে থাকলো আহান। এহেন জায়দানকে সে কভু দেখেছে কি? কল্পনা করেছে সদা নির্বিকার সত্তার ভেতরে কোনো অশুভতা লোকানো থাকতে পারে? করেনি। সে জানে, আজ সে পাল্টা কিছুই করতে পারবেনা। এই রুদ্রমূর্তির বিপক্ষে যাওয়ার অর্থ হয়না। কিন্তু আজকের জন্য সে জায়দানকে কোনোদিনও ছেড়ে দেবেনা। মাঝে মাঝে জিততে হলে খেলায় কয়েক ধাপ পিছিয়ে আসতে হয়, আহান তাই নিশ্চুপ রইলো।
জায়দান আহানের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য দাঁড়ালোনা। উল্টো ঘুরে হনহন করে এগোলো। সাবিন তখনো তার কাঁধে অশান্ত হয়ে ঝুলছে। পা দুটো দুলিয়ে ঝটকা দিয়ে যাচ্ছে। তবে বান্দার কোনো পরোয়া নেই। তার কাঁধ খামচে ধরলো সাবিন, কানের লতিতে দূর্বল এক কামড় বসিয়ে বলে উঠলো,
“ আমাকে ছাড়ো…!”
“ শাট আপ পিসফুলি বিফোর আই মেইক ইউ ফোর্সফুলি! ”

ক্লাব থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের বাইকের দিকে হাঁটা দিলো জায়দান। একপাশে পার্ক করে রাখা বাইকের ওয়েল ট্যাংকের উপর সে বসালো সাবিনকে। রমণী মুহূর্তেই ভারসাম্যহীন হয়ে ঢলে পড়লো। দ্রুত হাতে তাকে ধরে ফেলে নিজের বুকে ঠেকালো জায়দান।
“ সহ্য করতে পারোনা যখন, এত ড্রিংক করেছ কেন? ”
তার বুকে মুখ গুঁজে সাবিন অস্থিতিশীল গলায় বললো,
“ তোমার আম্মুকে জিজ্ঞেস করে করব নাকি? আমি সাবিন হুসেইন, আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি! ”
“ ওকে নাউ, শাট আপ অ্যাগেইন! ”
জায়দান বাইকে চেপে বসলো। নিজের হেলমেট মাথায় চড়িয়ে সাবিনকে দ্বিতীয় হেলমেট পড়াতে যেতেই সে ধস্তাধস্তি আরম্ভ করলো।
“ নাহ! আমি যাবলা…তোমাল সাথে আমি কোত্থাও যাবলা! ফালতু লোক, আমি তোমাকে দুই চোলে দেখতে পারিনা! দূল হও, দূল হয়ে যাও আমার চোখেল সামনে থেকে…যাও তুমি… আলেওয়ালার কাছে যাও…”
সাবিনের জিহ্বা জড়িয়ে গিয়েছে, এখন শব্দগুলোও আর স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করতে পারছেনা সে। তাতে জায়দান এক রামধমক দিয়ে উঠলো।

“ চুপ! একদম চুপ! আর একটা কথা বললে আই উইল হ্যাভ টু কিস ইউ শাট আপ…!”
জায়দানের ধমকে কাজ হলো। হেঁচকি থামিয়ে বাধ্য মেয়েটি হয়ে চুপটি করে রইলো সাবিন। জায়দান দ্রুতহাতে তাকে হেলমেট পরিয়ে দিলো। এখনো সাবিনের শরীর ভারসাম্যহীন দুলছে লক্ষ্য করে এতক্ষণ যাবৎ এক হাতে ঝুলতে থাকা মোক্ষম অস্ত্র বেল্টটি এবার সে অন্য কাজে লাগালো। সাবিনের কোমরে জড়িয়ে বেল্টির বাকল নিজের পিছনে টেনে বাইকের উপর উভয়কে একসাথে শক্তভাবে বেঁধে ফেললো জায়দান। অতঃপর নিজের ব্লেজার খুলে নিয়ে রমণীর গাউনে মোড়া লাস্যময়ী শরীর ঢেকে ফেললো সম্পূর্ণ। সাবিন দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে আপনমনে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করতে থাকলো,
“ ঘৃলা করি…আলেওয়ালা ভালো লা…তুমিও ভালো লা…”
জায়দান টেরটুকুও পেলনা কখন তার ঠোঁটের কোণজুড়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সাবিনকে নিজের মাঝে সম্পূর্ণরুপে সুরক্ষিত করে নিয়ে সে বাইক চালু করলো। সড়কপথ ধরে ছুটে চললো তার ডুকাটি, আর বুকে আগলে রইলো অবাধ্য প্রাক্তন স্ত্রী।

আজ হঠাৎ করে রামেন খাওয়ার সাধ জেগেছে। কিচেনে মৃদু মিউজিকের তালে তালে দুলে দুলে ফুটন্ত পানির পাত্রে রামেনের প্যাকেট খুলে ঢেলে দিলো মিসির। চামচ দিয়ে নেড়ে পানি শুকিয়ে আসতেই সুরে সুরে শীষ বাজিয়ে উঠলো সে। মশলার প্যাকেট ছিঁড়ে মিশিয়ে নিলো, সঙ্গে খানিকটা টমেটো সস। যেই মুহুর্তে প্লেটে ঢেলে ঝাল ঝাল স্বাদ আস্বাদন করতে যাবে ওই মুহূর্তেই,
ডিং ডং।
বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে এলো মিসিরের। ব্যস্ত জীবনে এমনিতেও সময় পাওয়া হয়না। যে একটা দিন একটু বিশ্রামে ছিল, তাও পন্ড করতে কোন পশু হাজীর হয়েছে করে জানে! রামেনের বাটি রেখে দিয়ে চেয়ারে ঝুলে থাকা টি শার্ট উদাম গায়ে জড়িয়ে দরজার দিকে এগোলো মিসির।
“ মানে, রাত বিরাতেও একটু শান্তিতে…”
বলতে বলতে মাঝপথেই মিসিরে কন্ঠ রোধ হয়ে গেলো। ডাগর ডাগর গোলাকৃতির চোখজোড়া প্রসারিত হয়ে উঠলো ভীষণ বিস্ময়ে। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং বেস্ট ফ্রেন্ড, জায়দান। ছেলেটা একা হলে এত অবাক মিসির হতো না। তবে তার কোলে কিলবিল করতে থাকা প্রাক্তন স্ত্রীর শরীরটাই মিসিরকে বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিয়েছে।
সাবিন এক হাতে জায়দানের কলার চেপে ধরে আছে, অন্য হাত বায়ুতে ছড়িয়ে কোনো কারণ ছাড়াই ভাঙা কন্ঠে গেয়ে উঠলো,

“ আকাশেতে লক্ষ তালা, চাল কিন্তু একলা রে ইয়াহ!”
মিসিরের চোয়াল ফাঁক হয়ে গেলো। আঙুল তুলে সে আমতা আমতা করে উঠলো,
“ এই এই…এই এইটা.. কিইইইই?”
“ হাহাহাহা! ”
সাবিন খিলখিল করে হেসে উঠলো। জায়দান মিসিরকে কোনো উত্তর করলোনা। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে পড়লো। দরজা আটকে পিছন পিছন ছুটে এলো মিসির। সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জায়দান বলে উঠলো,
“ গেস্টরুমটা খুলে দে তো। ”
“ হাহ? কিন্তু!”
জায়দানের চোখের দৃষ্টি মিসিরকে অতিরিক্ত কোনো তর্কে এগোতে দিলোনা। বেডরুম থেকে চাবি নিয়ে এসে অ্যাপার্টমেন্টের গেস্ট স্পেসের দরজা খুলে দিতেই জায়দান তাকে কোনোকিছু না বলে পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকলো। তার কোলে কিলবিল করে উঠলো সাবিন।
“ উন্নাহ! যাবলা? লা লা লা! ছালো..! ”
রমণী হেঁচকি তুললো, তারপর জায়দানের ঘাড়ে ঘুষি বসাতে বসাতে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মিসিরের দিকে,

“ হেল্প! যাবলা…এই লোকটা আমাকে কিলন্যাপ করেছে…হেল্প…সামবাডি…এনিবাডি…ড্যাড!”
হতবিহ্বল মিসির কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুকে বেপরোয়া ভঙ্গিতে গেস্ট স্পেসের ভেতরে আড়াল হয়ে যেতে দেখলো। তারপর পিছন থেকে জোর গলায় সাবধান করলো,
“ রাত বিরাতে মেয়ে মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি পাড়া প্রতিবেশী শুনলে সমস্যা হবে কিন্তু! ”
ওপাশ থেকে তখনো চেঁচামেচির গুঞ্জণ ভেসে আসতে শুনে মিসির দরজাটা চাপিয়ে আটকে দিলো।
ছোট একটা লিভিং রুমের পাশে গেস্ট বেডরুম। ভেতরে ঢুকতেই সেন্সর লাইট আপনা আপনি জ্বলে উঠে হালকা হলুদাভ আভা ছড়িয়ে দিলো। ছটফট করতে থাকা সাবিনকে সাবধানে ধরে বিছানার উপর রাখলো জায়দান। মুহূর্তেই মাগুর মাছের মতন ধড়ফড় করে উঠতে চাইলো সাবিন। তাকে ঠেসে ধরলো প্রফেসর।
“ ছালো! বেদফ..! আমি থাকবো লা…তোমাল সাথে আমি…থাকবো লা…!”
“ উফ্! এত এনার্জি আসে কোথা থেকে তোমার?”
অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে সাবিনের গা থেকে নিজের ব্লেজার খুলে নিয়ে তাকে ঠেলে বিছানায় শোয়ানোর চেষ্টা করলো জায়দান। কব্জি পাকড়াও করে ফেললো। বারংবার ঝটকা দিতে দিতে ধস্তাধস্তি আরম্ভ করে দিলো সাবিন, সঙ্গে বিনা কারণে ফুঁপিয়ে উঠলো,

“ লা…! না! আমি বাসায় যাবো…ড্যাড..আমি বাসায় যাবো…”
“ কাম ডাউন! জাস্ট…”
“ নাআআআ! বেঈমান..সবাই বেঈমান…সবাই ধোঁকাবাজ…!”
“ সাবিন! ”
জায়দানের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেলো। এক ধাক্কায় ঠেলেঠুলে সে সাবিনকে বিছানায় ঠেসে ধরলো। ধপাস করে বালিশের উপর রমণীর ফিনফিনে শরীরটা পরে যেতেই তার দুহাতের কব্জি মাথার উপরে তুলে বিছানার সঙ্গে আঁকড়ে ধরলো। একেবারে হঠাৎ করেই জমে গেলো সাবিন। ধস্তাধস্তি এবং ফোঁপানি থামিয়ে অশ্রুসিক্ত জ্বলজ্বলে নিষ্পাপ এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো জায়দানের পানে। প্রাক্তন তার খুব নিকটে এসে পড়েছে।
বিছানায় চিৎ হয়ে রয়েছে সাবিন। জায়দান তার উপরে হাঁটুতে ভর দিয়ে উবু হয়ে আছে। উভয়েই ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলছে। আজকের রাত প্রত্যেকের জন্যই ভীষণ ক্লান্তিকর। হাঁপালো জায়দান, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অস্ফুট উচ্চারণ করলো,

“ ফর গডস সেক, স্টপ…”
সাবিন একচুল নড়লোনা আর। স্থির চেয়ে আছে সে জায়দানের দিকে। চোখের মাঝে প্রজ্জ্বলিত অব্যক্ত বিন্দুর খেলা। অবাধ্য মেয়েটিকে হঠাৎ করে এমন নিশ্চুপ হয়ে যেতে লক্ষ্য করে সামান্য দ্বিধান্বিত হলো জায়দান। মাথা কাত করে তাকালো। অতঃপর টের পেলো কতটা কাছাকাছি অবস্থান তাদের। একটুখানি এদিক সেদিক এবং…
“ তোমার চোখজোড়া অনেক সুন্দর। একেবারে সমুদ্রের মতন, গভীর। ”
মোলায়েম এক কন্ঠ ভেসে সাবিনের তরফ থেকে, এবার আর জড়িয়ে গেলোনা শব্দগুলো। জায়দান ভ্রু কুঁচকে ফেললো। প্রতিক্রিয়া করার মতন কোনো ভাব খুঁজে পেলনা নিজের মধ্যে। হাতের বাঁধনে ঢিল পড়তেই সম্মোহিত পুতুলের মতন নিজের একটি হাত ছাড়িয়ে জায়দানের গাল ছুঁয়ে দিলো সাবিন। যেন প্রাক্তনের মোহে সে হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে। রমণী নিজের সঠিক মস্তিষ্কে নেই, তাতে নিষিদ্ধ তরলের প্রভাব বোঝা সত্ত্বেও কোনো এক কারণে একচুল নড়তে পারলোনা জায়দান। সাবিনের আঙুল তার গাল বেয়ে নেমে এলো চিবুকে।

“ জায়দাআআআআন?”
ডাকটি কানে যেতেই কি হলো বলতে পারবেনা জায়দান। মধুর বর্ষণ হলো বোধ হয় কাছে কোথাও। আনমনে জবাব দিয়ে বসলো সে,
“ হুমম? ”
সাবিন বালিশ থেকে মাথা তুললো সামান্য, তার হাতের আঙ্গুল পেঁচিয়ে গেলো জায়দানের ঘাড়জুড়ে। ফিসফিস করলো সে,
“ আই মিস ইউ।”
অতঃপর যা হলো তাকে পৃথিবীর ঠিক কোন ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব তা জায়দান নিজের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়েও বের করতে পারলোনা।

সাবিনের নরম ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো জায়দানের অধরপল্লবকে। একদম সুস্থির, পাথরের ভাস্কর্যে পরিণত হলো প্রফেসর। রমণী এবার নিজের অপর হাতটিও তার অতীব দূর্বল বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে দুহাতে আলতো করে স্পর্শ করলো তার মুখ, যেন ভঙ্গুর প্রজাপতি তার অস্তিত্ব। সাবিন যেন নিজেকে জায়দানের মাঝে মিশিয়ে ফেলতে চায়। ঠোঁটজোড়া বুলিয়ে গেলো নিজেদের অবাধ্য স্পর্শ, জিভের ডগায় সে লেহন করে নিলো অধরকে। কম্পন খেলে গেলো জায়দানের শরীরে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো সে শক্তভাবে, আঙুলের মাঝে আঁকড়ে ধরলো বিছানার চাদর। শুধুমাত্র একটা ধাক্কা, একটা ধাক্কা দেয়া দরকার। দোহাই লাগে ধরিত্রী, একটা ধাক্কা দেয়ার শক্তি দাও জায়দানকে!
সব দ্বিধা, সংশয়, আপত্তি, নীতি ভেঙে চুরমার করে দিতে দরকার হলো শুধু সাবিনের আলতো কামড়। জায়দান দৃষ্টিসুমুখে শুধু ধোঁয়াশা দেখলো। তারপরই চাদর আঁকড়ে রাখা হাতটা খামচে ধরলো সাবিনের মুখের এক পাশ। অপর হাত পৌঁছালো রমণীর কোমরে।

চোখ বুঁজে ফেললো জায়দান। সাবিনের ঠোঁটের মাঝে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ ঘটালো নিজের জিভের। গুঙিয়ে উঠলো রমণী। সেই শব্দ যেন শিরদাঁড়াজুড়ে শিহরণ খেলিয়ে দিলো। গভীর থেকে গভীরতম হয়ে উঠলো অনুভূতির বিনিময়। নিষিদ্ধ, প্রশ্নবিদ্ধ এক তীব্র আকর্ষণ। জায়দান এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করলো, অক্সিজেনের প্রয়োজনে আর্তনাদ করে উঠলো সাবিন। সামান্য কেশে উঠলো। পরোয়া করলোনা জায়দান। এক টানে চোখ থেকে চশমাখানি খুলে কোথায় ছুঁড়ে ফেললো নিজেও জানেনা। আবারো দখল নিলো সে সাবিনের অধরের। চুম্বকের আকর্ষণ যেন। উপেক্ষা করা দুষ্কর।
সাবিনের অতি দূর্বল আঙুল তার শার্টের বোতামে জড়িয়ে গেলো। কাঁপা কাঁপা স্পর্শের প্রবাহ খেলিয়ে দিলো প্রশস্ত বুকজুড়ে। নেমে এলো তা, বেল্টের বাঁধনের কাছে। জায়দান ঠোঁট ছেড়ে সাবিনের গলায় মুখ ডোবালো। এক হাতে আঁকড়ে ধরলো রমণীর চুল, ঠোঁটের গভীর ছোঁয়ায় রাঙালো কপাল, গাল, চিবুক, গ্রীবা। সবশেষে আলতো কামড় বসালো চিবুকে।

“ আহ্হঃ!”
এবার খানিকটা জোরেই গুঙিয়ে উঠলো সাবিন। তাতেই সমস্ত মন্ত্রজাদু লুপ্ত হয়ে গেলো। জমে গেলো জায়দান।
কয়েক সেকেন্ডের ভীতিকর স্থিরতা। তারপরই নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে সটান উঠে বসলো জায়দান। বিছানায় এলিয়ে থাকা সাবিনের অবয়ব দেখলো আপন ঘোলাটে দৃষ্টিতে। চোখজোড়া আর খুলে রাখার শক্তি নেই রমণীর, বুক ওঠানামা করছে ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে। পরনের পোশাক লেপ্টে আছে শরীরে, হালকা বাতির আভায় চিকচিক করছে ত্বক। একটি ঢোক গিলে চোখ বুঁজে ফেললো সাবিন। ঘুমিয়ে পড়েছে হয়ত।
এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়লো জায়দান। সদা শীতল মস্তিষ্ক আর কাজ করছেনা তার। ডান বাম কোনদিকেই আর তাকালোনা সে। কানে বাজছে অদৃশ্য এক বিপদসংকেত।
অপরাধ, অসামাজিক, অভদ্র, সুযোগসন্ধানী, পাপী।

শব্দগুলো চারপাশ থেকে শিকলে আবদ্ধ করে ফেললো যেন জায়দানকে। এই রুমের ভেতর দম বন্ধ হয়ে এলো তার। সম্পূর্ণ নেতিয়ে যাওয়া সাবিনকে কোনমতে একটি কম্বলে ঢেকে মুহূর্তেই রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো জায়দান। দরজাটা আটকে দিয়ে তাতে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো। বুকের ভেতর অস্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হচ্ছে তা। এক হাতে নিজের মাথার চুল আঁকড়ে ধরলো জায়দান। তারপরই জ্ঞানশূণ্য হয়ে পাশের দেয়ালে সজোরে ঘুষি হাঁকিয়ে বসলো।
ধাম!

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১০

মৃদু এক শব্দ, সঙ্গে হাতের আঙুলের খাঁজে র*ক্তের উদগীরণ।
“ স্কাউন্ড্রেল! ”
চাপা গর্জনে নিজেকে ধিক্কার জানালো জায়দান।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১১ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here