সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১২
জাবিন ফোরকান
ডিভোর্স—শব্দটির সঙ্গে যেন দাম্পত্য কলহ এবং অশান্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নাহলে একটা সম্পর্ক কি আদও কোনোদিন ভাঙন পর্যন্ত গড়ায়? যদি কেউ আমায় জিজ্ঞেস করে, তবে আমার উত্তর হবে ‘হ্যাঁ’।
যেদিন প্রথম মীরাকে জানিয়েছিলাম, আমি ডিভোর্সড, সেদিন মেয়েটার চোখেমুখে যে নিদারুণ করুণা ভেসে উঠেছিল আমি কোনোদিন ভুলতে পারবোনা। হয়ত সে আমায় সহমর্মিতা দেখিয়েছে। আমার বৈবাহিক জীবন খুব একটা সুখকর ছিলোনা, নিশ্চয়ই স্বামীর কাছ থেকে বিশাল আঘাত পেয়েছি। এমনটাই ধারণা মীরার, আজও। আমি কোনোদিন মেয়েটার ভ্রান্ত ধারণাকে বদলানোর চেষ্টা করিনি। অথচ আমার অন্তর জানে, ধারণাটা কতটা মিথ্যা!
জায়দান আরেফিন এবং আমার বিয়েটা পারিবারিকভাবে হলেও পুরুষটি কোনোদিন আমার প্রতি দায়িত্ব পালনে কোনো কমতি রাখেনি। একজন স্বামী হিসাবে এই দেশে যতটুকু করা যায়, তার থেকে বাড়তি করেছে সে আমার জন্য। তার যত্ন, আবেদন, দায়িত্ববোধ, কর্তব্য পালন নিয়ে অভিযোগ করতে পারবোনা আমি কোনোদিন। মানুষ হিসাবে সে অনেকটাই নিখুঁত। একদম পাঠ্যবইয়ে দেয়া ভালো মানুষের পরিচায়কের প্রতীক সে।
অথচ, ভদ্রতার খোলসকে তাড়া করতে করতে আমরা বোধ হয় ভুলে যাই, এই পৃথিবীতে ‘পারফেক্ট’ বলে কিছু হয়না।
জায়দান ছিলো পারফেক্ট। সমাজের মাপকাঠির হিসাবে একশোতে একশো। বাঙালি মা – বাবা যাদের উদাহরণ দিয়ে সন্তানদের বড় করে তোলে, জায়দান সেই উদাহরণ। ভদ্র, সুশীল, নম্র, মিষ্টভাসী, গুরুজনের প্রতি সম্মান প্রদানকারী, বুদ্ধিমান, মেধাবী। মায়ের প্রতি তার অনুরাগ বরাবর অধিক ছিলো। জননী এক বললে এক, পৃথিবী চতুর্ভূজাকার বললে পৃথিবী আসলেই চতুর্ভূজ! গোল্লায় যাক তার উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি! অভিজাত মহলে জায়দানের মতন মা ভক্ত সন্তান দুটো নেই, গোটা জগতে আছে কিনা ভাবলেও আমার সন্দেহ হয়।
মায়ের ভক্ত সন্তানকে সর্বদাই সমাজ সবথেকে সুশীল মানুষের ট্যাগ লাগিয়ে দেয়।
হয়ত আমার স্বামীর অতিরিক্ত ভালোমানুষী গুণগুলোই আমার কাল ছিলো। কিংবা হয়ত সত্যিকার দোষী শুরু থেকে আমিই ছিলাম। কে করবে সেই বিচার?
জায়দানের মা জেসমিন শিকদারের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শুরু থেকেই সাপে নেউলে ছিলো। কারণ, আমি ছিলাম আমার স্বামীর বাবার পছন্দের পাত্রী। শ্বাশুড়ি ছেলেকে অন্যত্র বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, যেটা শ্বশুড় মশাইয়ের চাপে সম্ভব হয়ে উঠেনি। তাই আরেফিনদের ডেরায় পদার্পণ ঘটে সাবিন হুসেইনের, অভিজাত মহলের কুখ্যাত নামটি। জেসমিন শুরু থেকেই আমায় বাঁকা নজরে দেখতেন। আমারও তখন ভীষণ জেদ ছিলো বিধায় তার ক্রোধ সহ্য করতে পারতাম না। বিয়ের পরপরই সংসার জীবনে অভ্যস্থ হওয়া আমার জন্য ছিলো অসম্ভব প্রায়। যে মেয়ে জীবনে কোনোদিন নিজে নিজের মাথার চুলগুলো অবধি নিজে মোছেনি, সেই মেয়ে বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় হয়ে যাবে সংসারী? চিন্তা করাটাও ছিল হাস্যকর। কিন্তু আমার শ্বাশুড়ির কামনা ছিলো আমি তাই হই। মেয়েমানুষ মানেই আঁচলে সংসার বেঁধে রাখতে হবে চাবির মতন, কিন্তু আমার তো আঁচলটাই ছিলোনা!
আমি জানিনা প্রকৃত দোষী কে।
আমি? যে কখনোই নিজের হঠাৎ বিয়েকে মেনে নিয়ে শ্বাশুড়ির চাওয়ামত সুশীল, মুখ বুঁজে সহ্য করে যাওয়া বউ হতে পারিনি?
আমার শ্বাশুড়ি জেসমিন শিকদার? যিনি কখনোই নিজের ছেলের পাশে এক ভদ্র মেয়ের বদলে আমার মতন উশৃঙ্খলকে মেনে নিতে পারেননি?
নাকি আমার স্বামী জায়দান আরেফিন? যে আসলে নিজের স্ত্রী কিংবা মায়ের মাঝে কোনোদিন একজনকে বেছে নিতে পারেনি? মাতৃভক্তি এবং স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ববোধ, কোনটা তার কাছে অধিক জরুরী ছিলো? তার উত্তর আর কোনোদিন পাওয়া সম্ভব হবেনা আমার পক্ষে।
আনমনে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। বোধ হয় আমার ভাবনার শক্তি অতিরিক্ত ছিলো, দীর্ঘশ্বাসের শব্দটুকু তাই ছুঁয়ে গেলো প্রফেসরের কানকে।
এলিভেটরের একপাশে নির্জীব বস্তুর মতন দাঁড়িয়ে ছ ফুট প্লাস প্রাক্তন পাঁচ ফুটি আমিকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো। সরাসরি না তাকিয়েও তার দৃষ্টির প্রতিফলন খেয়াল করলাম এলিভেটরের আয়নাস্বরুপ দেয়ালে। তার সদা নির্বিকার চেহারা এবং বাদামী চোখজোড়ার মাঝে অদ্ভূত প্রশান্তি আমায় ভাসিয়ে নিলো স্মৃতির দুনিয়ায়। যেই সময়টায় আমরা এক ছিলাম, একে অপরের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম। একসাথে বারান্দায় বসে আকাশ দেখা, নিঃশব্দে রাত্রির নির্জন সড়কে হাজার তারার নিচে হেঁটে যাওয়া, ভার্সিটি থেকে স্বামী বাসায় এলে তার হাতে ফুলের তোড়া – চকলেট – কাঁচের চুড়ি উপহার পাওয়া, রাত বিরাতে ঘুম পেলে শিশুদের মতন তার কোলে চড়ে বিছানায় যাওয়া, গভীর রাতে স্টাডিরুমে ভূতের মুখোশ পরে সেজে থেকে ভয় দেখাতে গিয়ে নিজেই তার ছায়া দেখে ভয় পেয়ে যাওয়ার মতন স্বপ্নীল স্বাভাবিক মুহূর্তের কোনো কমতি ছিলোনা আমাদের বিবাহিত জীবনে। হয়ত সেই কারণেই আমি আজও মানুষটার প্রতি এতটা মায়া অনুভব করি। হয়ত এটা আমার অপরাধবোধ। লোকটাকে আমি শান্তিতে বাঁচতে দেইনি। কোনোদিন তার জীবনে আমার যাওয়া উচিত হয়নি।
“তোমাকে ভাবুক দেখাচ্ছে।”
জায়দানের নির্লিপ্ত কন্ঠস্বর এলিভেটরের মাঝে খানিক প্রতিধ্বনিত হলো। আমি নিজের শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। কোমরে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে, সকালে যেভাবে ফ্লোরে মোক্ষম একটা আছাড় খেয়েছি! সেই মুহূর্তটার কথা মনে পড়লেও আমার গাল দুটো লালচে হয়ে যাচ্ছে।
“মনে করার চেষ্টা করছিলাম, গতকাল রাতে কি কি হয়েছে।”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দিয়ে নিজের চিন্তাকে দূর করার চেষ্টা করলাম। জায়দান এক পা সামান্য উঁচু করে দেয়ালে ঠেকিয়ে নিজের ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে বললো,
“তোমার সত্যিই মনে নেই গতকাল কি কি হয়েছে?”
“না। সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা।”
“গুড।”
ঝট করে মাথা কাত করে ছ ফুটিকে দেখলাম। আমার গতকাল রাতে ক্লাবে যাওয়ার পর থেকে কি হয়েছে, কিভাবে আমি মিসিরের বাসায় এসেছি আর এই বান্দাই বা কিভাবে আমার খোঁজ পেলো এতসব ঘটনা অ্যালকোহলের বকওয়াস মার্কা প্রভাবে আমার মস্তিষ্ক থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছে, ব্যাপারটায় তার গুড বলার কারণ কি? কেমন যেন সন্দিগ্ধ হলাম। আড়চোখে চেয়ে আমি সন্দেহপূর্ণ কন্ঠে শুধালাম,
“আই ডিড নট ডু এনিথিং স্টুপিড, ডিড আই?”
জায়দান ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল তুলে নিজের ঠোঁটে বুলিয়ে আনলো। দৃশ্যটি চেয়ে দেখে অযথাই ঢোক গিললাম আমি। প্রাক্তন উত্তর করলো,
“ইউ ডিড নট, আন্টিল মর্নিং।”
সকালের ঘটনাটা আরো একবার চোখের সামনে ভেসে উঠল আমার। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। এলিভেটরের দেয়ালে ধাম করে হালকা এক ঘুষি বসিয়ে দিলাম লজ্জাবোধে। জায়দান আমার কার্যক্রম দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে, সামান্য কেশে কন্ঠ পরিষ্কার করে নিশ্চুপ হয়ে পড়লো।
এলিভেটর গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে যেতেই দরজা খুলে গেলো। বাইরে পা রেখে চারপাশের পার্কিং লট দেখে নিশ্চিত হলাম, এটা সেই জায়গাই যেখানে আমি পিৎজা ডেলিভারি দিতে এসে ডিভোর্সের পর প্রথম জায়দানকে দেখেছিলাম। অতএব, এটা মিসিরের নতুন ফ্ল্যাট। আগে সে মতিঝিলের দিকে থাকতো।
হনহন করে এগোলাম আমি, কিসের তাড়নায় নিজেও জানিনা। জায়দান কোনো তাড়াহুড়ো করলোনা। উপরন্তু ধীরে সুস্থে নিজের বাইকের কাছে পৌঁছালো। সিটে চড়ে বসে হেলমেট খুলে নিয়ে আমায় ডেকে উঠলো,
“সাবিন? আসো বসো।”
ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। এগিয়ে গেলাম ঠিকই তবে বাইকে উঠলাম না। বরং একটি নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
“তোমাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আমার মনে হয় তুমি আমার জন্য যথেষ্ট করেছ। আর করার প্রয়োজন দেখিনা।”
জায়দানের অভিব্যক্তির পরিবর্তন হলোনা। শুধু স্থির চেয়ে দেখলো সে আমায়। কন্ঠস্বর সামান্য গভীর হলো যখন সে আমায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি করেছি আমি?”
বুকের ভেতর কেমন যেন এক চিনচিনে ব্যাথা হলো। মাথাটাও সকাল থেকে ভীষণ রকমের যন্ত্রণা দিচ্ছে। জায়দানের বানিয়ে দেয়া হ্যাংওভার স্যুপ কাজ করছে ঠিকই, তবে অত্যন্ত ধীরে।
“এইযে, ক্লাব থেকে নিরাপদে বন্ধুর বাসায় নিয়ে এসেছ। রাতে আশ্রয় দিয়েছ। ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে আসোনি এইতো অনেক। আর তাছাড়া, তোমার ভার্সিটির ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে, আমি নিশ্চিত তোমার অনেক অতিরিক্ত কাজও আছে। আমি বাসায় চলে যেতে পারবো, চিন্তা নেই।”
“অতিরিক্ত কাজ?”
জায়দানের সুস্থির কণ্ঠের বিপরীতে আমি দৃষ্টি হটিয়ে আনমনে আঙুল মটকাতে লাগলাম।
“এইতো, যেমন সামনে তোমার এঙ্গেইজমেন্ট নয়ত বিয়ে। কাজের কি আর কমতি আছে নাকি?”
না তাকিয়েও বুঝলাম লোকটার নির্বিকার মুখে অনুভূতির ছিটেফোঁটাটুকু অবধি নেই। বুকের ব্যাথা আর ধুকপুকানি প্রচন্ড হারে বেড়ে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্তরের জ্বলন মেটানোর ব্যর্থ প্রয়াসে বলে উঠলাম,
“কংগ্র্যাচুলেশন্স, বাই দ্যা ওয়ে। আরওয়া মেয়েটা ভালো। ঠিক তোমার মতন। তোমাদের…দারুণ মানাবে।”
শেষ কথাটি বলার সময় গলা এত জোরে কেঁপে উঠলো যে লজ্জা এবং আতঙ্কে আমি মুখ ঢেকে ফেললাম। ওপাশ থেকে ভেসে এলো শুধু নীরবতা। চরম অসহ্যকর এক নৈঃশব্দ্য। দীর্ঘক্ষণ। অতঃপর,
“হুম।”
মৃদু এক ধ্বনি, শব্দ হিসাবে আখ্যা দেয়ারও যোগ্য নয় তা। এটুকুই হলো আমার প্রাক্তন স্বামীর প্রতিক্রিয়া। আমি চোখ মেলে তাকানোর আগেই মাথায় হেলমেট চড়িয়ে ফেলায় আমি তার মুখভঙ্গি দেখতে পেলাম না। তবে জানতে বাকি নেই, ওই মুখে সামান্যতম পরিবর্তনও হয়নি।
জায়দান আর অপেক্ষা করলোনা, দ্বিতীয়বার নিজের বাইকে উঠতে আমায় সাধলোনা। মানুষটা এতক্ষণ যাবৎ শত দেয়ালের ওপাড়ে ছিলো, এখন মনে হচ্ছে শত নেয়, সে হাজার দেয়ালের ওপাশে।
পার্কিং লটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি জায়দানের বাইকটাকে সড়কপথে নেমে আড়াল হয়ে যেতে দেখলাম। মাথা আর বুকের ব্যথাটা তখন এতটাই অসহ্য হয়ে দাঁড়ালো যে চোখ দুটো যাতনার অশ্রুতে ঝাপসা করে তুললো।
সকালের প্রকৃতি ভীষণ স্নিগ্ধ। চারপাশে শিশিরের বর্ষণ। গাছের পাতায় পাতায় চিকচিক করছে কুয়াশার ফোঁটা। যেন গোটা ধরিত্রীকে ছেয়ে ফেলেছে ধোঁয়াটে বাষ্প। পাখিদের কিচির মিচিরের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে শনশনে হওয়ার মৃদঙ্গ। এমন কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ে বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে পায়ে পায়ে বাইরের গলিপথে বেরিয়ে এলো মীরা। পরনের সালোয়ার কামিজের উপরে কালো শাল ভালোমত জড়িয়ে সামনে এগোলো সে। অপর পাশে খোলা ময়দান। এক প্রান্তে ড্রেনেজ লাইনের সঙ্গে লাগোয়া এক বিরাট জলপাই গাছ। সেই গাছের নিচে কুয়াশায় ঘেরা এক অবয়ব। ক্রমশ কাছে যেতেই স্পষ্ট হলো অবয়বখানি।
“জায়দান?”
মেয়েলী সুমধুর কণ্ঠটি কানে যেতেই ঘুরে দাঁড়ালো আয়দান। তীক্ষ্ণ চোখমুখ হঠাৎ করেই কোমল হয়ে গেলো, তাতে ভর করলো নির্মলতা। মীরার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলো সে। মুক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁত দেখিয়ে সম্ভাষণ জানালো,
“গুড মর্নিং, কিটেন। ডিড ইউ স্লিপ ওয়েল?”
নরম রোদের মিষ্টি আলোয় আয়দানের মুখখানি জ্বলজ্বল করে উঠলো বুঝি। নাকি মীরার কল্পনা? রমণী বলতে পারবেনা। ছেলেটির ঠোঁটের হাসি দেখামাত্র হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে অনুভূত হতেই মীরা ঢোক গিলে বললো,
“গুড মর্নিং। আপনি আজ, এত সকালে কি করছেন?”
আয়দানের হাসি আরো একটু বিস্তৃত হলো। গলায় ঝুলতে থাকা মাফলার টেনে সামান্য ঢিলে করে জবাব দিলো,
“ভুলে গিয়েছেন? গত রাতে বলেছিলেন, কিছু খাননি। খেতে ইচ্ছা করছেনা। আপনার বান্ধবী কোথায় যেন চলে গিয়েছে।”
“ওহ, হ্যাঁ। আপনি চিন্তা করবেন না। সকালেই ওর সাথে আমার কথা হয়েছে, ও ঠিক আছে।”
“উম, ভালো লাগলো। এখন তাহলে ব্রেকফাস্ট করতে আর কোনো সমস্যা নেই, রাইট?”
আয়দান নিজের পিছন থেকে হাত সামনে আনতেই তাতে একটি প্যাকেট দেখা গেলো। মীরা ভীষণ অবাক হয়ে সেটি হাতে নিতেই বুঝতে পারলো ভেতরে রয়েছে গরম গরম ভাপা এবং চিতই পিঠা, সঙ্গে চাটনী।
“ফুডকার্টে বিক্রি করছিলো। ভাবলাম, শীতের সকালে এর চাইতে ভালো নাস্তা আর কি হতে পারে?”
মীরা ফ্যালফ্যাল করে আয়দানের দিকে তাকালো। মনে হলো বুঝি তার অন্তরের অন্তঃস্থলে সূক্ষ্ম এক অনুভূতির পুষ্প গজালো। এই বান্দাকে ইদানিং তার প্রায়শঃই দেখা হয়। সেদিন হঠাৎ ইনস্টাগ্রামে মেসেজ পাঠানোর পর থেকে দেখা সাক্ষাৎ হরহামেশা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা ভার্সিটির রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে হাতির ঝিল এবং আজকের নতুন বাসার গলি অবধি, অল্প সময়ে ব্যাখ্যার অতীত সম্পর্কটি যেন গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে।
“থ্যাংক ইউ, কিন্তু আপনার এতটা কষ্ট করার দরকার ছিলোনা।”
উষ্ণ হয়ে উঠতে থাকা লালচে আভা মাখা গাল নেড়ে বললো মীরা। আয়দানের কোমল দৃষ্টি তার গাল ছাপিয়ে এসে পড়লো ঠোঁটের মাঝে। দ্রুতই তা আবার সরে গেলো চোখের উপর। মুচকি হাসলো আয়দান।
“আমার কেন মনে হচ্ছে আপনি আমার সঙ্গ আর পছন্দ করছেন না? তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছেন? বেশ তবে, আমি নাহয়…”
“না!”
আয়দান উল্টো পথে পা বাড়াতেই আতঙ্ক জেঁকে বসলো মীরার হৃদয়ে। আচমকা হাত বাড়িয়ে সে কব্জি পাকড়াও করে ফেললো আয়দানের।
“জায়দান, যাবেন না প্লীজ!”
ভয়ার্ত কাঁপা কন্ঠস্বরটি মীরার, নিজেকেও চমকে দিল। আয়দান থমকে পড়লো। অতঃপর সময় নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। প্রথমে দেখলো নিজের কব্জিতে জড়িয়ে যাওয়া রমণীর দূর্বল মোলায়েম আঙুলগুলো। তারপর মুখ তুলে তাকালো কম্পিত নয়নমাঝে।
“থেকে যেতে বলছেন?”
মীরা শক্ত একটি ঢোক গিললো।
“জ্বি।”
“আমার থেকে যাওয়ার মূল্য যে অনেক! পরিশোধ করতে পারবেন?”
বিস্ময় এবং কিঞ্চিৎ চিন্তায় মীরার ঠোঁটজোড়া আধ ইঞ্চি ফাঁক হয়ে রইলো। আয়দান লম্বা পা ফেলে এগোলো। রমণী তার কাঁধসমান। নিজের গলা থেকে মাফলারটি খুলে নিয়ে তার গলায় জড়িয়ে দিতে বেগ পোহাতে হলোনা আয়দানের। মীরা শুধু স্তব্ধ হয়ে দেখে গেলো সবটা। তার দ্রুততর হৃদস্পন্দন কানে যেতেই আনমনে তীর্যক হাসলো আয়দান। ঝুঁকে এসে রমণীর চোখ বরাবর নিজের দৃষ্টি রেখে প্রায় ফিসফিসে এক গভীর কন্ঠে শুধালো,
“মাই কিটেন, ক্যান ইউ পে আপ দ্যা কস্ট?”
“থেকে যাওয়ার বিনিময়ে, কি চান আপনি?”
মীরার কাঁপা কণ্ঠের প্রশ্নে আয়দান অতি যত্নে তার চুলের গোছা গুছিয়ে কানের পিছনে গুঁজে দিলো। ঝুঁকে এলো বেশখানিক। জমে গেলো মীরা, নিজের কপালে একজোড়া ঠোঁটের মৃদু ছোঁয়া টের পেলো সে।
“প্রেম। আমার বিড়ালছানার প্রেম। ডেট মি?”
হতভম্ব মীরা। কল্পনাতীত শব্দগুলো তার মাথায় যেন জট পাকিয়ে গেলো। নিজের কানকে বিশ্বাস হলোনা তার। শুধু নিষ্পলক চেয়ে রইলো সে আয়দানের পানে। ছেলেটা হঠাৎ করে বজ্রপাতের মতন উদয় হয়েছে তার জীবনে। তোলপাড় ঘটিয়ে দিচ্ছে তার অন্তরের আঙিনায়। আর এখন? যেন নিজের মায়াজাল বিছিয়ে সে সম্মোহিত করে ফেলেছে মীরাকে। যে অনুভূতির নিশ্ছিদ্র জাল থেকে মুক্তি নেই মীরার।
“মীরা!”
তীক্ষ্ণ কন্ঠে জোরালো ডাক কানে যেতেই সম্মোহনের জাল ছিঁড়ে গেলো। চমকে উঠে পিছনে তাকাতে গেলো মীরা। ঠিক তখনি নিজের কানের লতিতে ঠোঁটের স্পর্শ টের পেলো, সঙ্গে অতি মৃদু ফিসফিস কন্ঠস্বর তার সমস্ত শরীরজুড়ে অনুভূতির তরঙ্গ খেলিয়ে দিলো।
“উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো, বিড়ালছানা।”
কুয়াশার আচ্ছাদন ভেদ করে উদিত হলো সাবিন। দ্রুতপায়ে হেঁটে আসছে। মহা বিস্ময় নিয়ে বান্ধবীকে দেখে পরক্ষণেই পিছনে ঘুরে তাকালো মীরা। কিন্তু কোথায় আয়দানকে দেখতে পেলনা। ছেলেটা যেন বাতাসের মাঝে গায়েব হয়ে গিয়েছে!
“কি ব্যাপার? কাকে খুঁজছিস? আর সকালবেলা বাইরে একা একা কি করছিস? আমি তো বলেছিলামই চিন্তা না করতে, ফিরে আসবো।”
মীরা কয়েক মুহূর্ত তব্দা খেয়ে কি যেন ভাবলো। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে দ্রুত জবাব দিলো,
“কিছুনা। পিঠা বিক্রি হচ্ছিলো তো, ভাবলাম যাই হাঁটতে গিয়ে কয়েকটা কিনে নিয়ে আসি।”
প্যাকেট দেখিয়ে সাবিন কোনো প্রতিবাদ করার আগেই তাকে টেনে বিল্ডিংয়ের ভেতর এগোলো মীরা। কন্ঠে গুরুগম্ভীর ভাব এনে বললো,
“তোর আজকে খবর আছে সাবিন! আমাকে না জানিয়ে, না শুনিয়ে কোথায় চলে গিয়েছিলি তুই? আর এসব কি পোশাক পড়েছিস? পার্টিতে গিয়েছিলি কোনো? একবারও বলিসনি! জানিস কতটা চিন্তায় ছিলাম? আমি কিন্তু ভীষণ রেগে আছি!”
চুপটি করে বকুনি শুনতে শুনতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজেদের বাসার দিকে এগোলো সাবিন।
মীরার বকাঝকা মায়েদের চাইতে কোনো অংশে কম নয়। সাবিন বাইরের পোশাক পাল্টে টি শার্ট, ট্রাউজার পড়তে পড়তেও সে নিজের গজগজ জারি রাখলো। টেবিলের উপরের পিৎজা আর কেক বানানোর সরঞ্জাম সরিয়ে প্লেটে পিঠা এবং পিরিচে চাটনী রাখতে রাখতে সে বলেই যাচ্ছে,
“আর দেখিস! আমি যদি তোকে আর একটা কোনো গোপন কথা বলেছি আমার! তুই সবসময় এমন করিস। পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আর তুই একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াস? যদি আরো একটা অঘটন ঘটে যায় তখন কি হবে শুনি? আমার কথার পাত্তা আছে কোনো? তোর জায়গায় একটা কলাগাছকে কথা শোনালেও এতক্ষণে আমায় পাকা কলা উপহার দিত। বলিহারি, ফোনটাও রেখেছিস বন্ধ করে। আমাকে তুই ভাবিসটা কি? সকালে যদি ফোন না করতি আমি সত্যিই থানায় গিয়ে…”
“মীরা?”
সাবিনের খানিকটা শীতল গলায় অবশেষে বিরতি দিলো মীরা। বান্ধবী তার এগিয়ে এসে টেবিলে চেয়ার টেনে একেবারে শান্ত ভঙ্গিতেই পিঠায় কামড় বসালো। অতঃপর জিজ্ঞেস করলো,
“তোর মনে আছে? বেশ কয়েক মাস আগে,তুই একবার আমাকে ব্লাইন্ড ডেটের কথা বলেছিলি?”
প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক হলেও মীরা উত্তর দিতে কার্পণ্য করলোনা। চেয়ার টেনে বসে খানিকটা পুদিনা পাতার চাটনী মেখে চিতই পিঠা মুখে দিয়ে বললো,
“হুম। আমার কয়েকটা ক্লাসমেট গিয়েছে। অনেকেই এখন করে। তোকে তো বলেছিলাম, পাত্তা দিসনি। হঠাৎ জিজ্ঞেস করছিস যে?”
সাবিন আস্ত একটা ভাপা পিঠা নিজের মুখে পুরে কি যেন চিন্তা করলো। তারপর চিবিয়ে পানি দিয়ে খাবারটুকু গিলে নিয়ে আপনমনে বলে বসলো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১১ (২)
“আমার যাওয়া উচিত।”
মীরা বরফ হয়ে গেলো। ড্যাবড্যাব করে অবিশ্বাস নিয়ে তাকালো প্রাণের বান্ধবীর দিকে।
“কিঃ?”
“ব্লাইন্ড ডেট সেট কর মীরা, আমি ডেটে যাব।”
নির্বিকার জবাব সাবিনের।
