Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৯

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৯

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৯
জাবিন ফোরকান

“আর কতদিন এই সম্পর্কটা গোপন রাখতে হবে, জায়দান?”
মীরার মোলায়েম কণ্ঠের প্রশ্নে হাতের বাদাম ভাঁজার উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পাশ ফিরে তাকাল আয়দান। সালোয়ার কামিজ পরিহিতা সুদর্শনা নিজের টানা টানা মায়াবী চোখ দুখানা মেলে চেয়ে আছে তার উদ্দেশ্যে।
কতদিন হয়েছে আয়দান মীরার সঙ্গে প্রেম করা শুরু করেছে? এক – দেড় মাস পেরিয়েছে কি? হিসাব করে উঠতে পারলনা সে। সেদিনের প্রস্তাবের জবাবে মীরার উত্তর হ্যাঁ এসেছিল। এরপর থেকেই সূত্রপাত তাদের প্রেমের সম্পর্কের।

দুজনে আজ এসেছে রমনা পার্কে। একধারের বেঞ্চিতে বসে বাদাম ভাঁজা কিনে খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলছিল জব্বর গল্প। তার মাঝেই মীরার হঠাৎ এমন প্রশ্ন আয়দানকে ভীষণ বিরক্ত করল। তবে চোখেমুখে সেই অনুভূতি প্রকাশ করতে দিলনা সে। মীরা তার খানিকটা কাছে সরে কাঁধে মাথা রেখে দূর দিগন্তের দিকে তাকাল। দ্বিতীয় দফায় বলল,
“আমার সবচেয়ে ভালো বান্ধবী সাবিন। ওকে আমি আমার পরিবারের সদস্য মনে করি। ওর থেকে লুকিয়ে রাখার বিষয়টা আমাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছে। তোমাকে নিয়ে আমি খুব খুশি জায়দান। যদি ওর সঙ্গে তোমার পরিচয় না করাতে পারি তাহলে…”
“কিটেন!”
আলতো করে ডাকল আয়দান। পাশ ফিরে বসে দুহাতে ধরল রমণীর মুখ, নিজের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন চোখে তাকাল। মোলায়েম হেসে জানাল,
“আই জাস্ট নিড সাম মোর টাইম, ওকে? তুমিই তো বললে, ও নাকি তোমার পরিবারের মতন। তাহলে তার মুখোমুখি যাওয়ার আগে আমাদের সম্পর্কটা আরেকটু গভীর হওয়া দরকার, তাইনা?”

“কিন্তু…”
ঝুঁকে এলো আয়দান। মীরার কপালে নিজের ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিয়ে মৃদু আঁচে বলল,
“আর কোনো কিন্তু নয়, কিটেন। আমি একটু স্থির হই তোমার সঙ্গে, তারপর সব হবে। ততদিন পর্যন্ত একটু সহ্য করো? নাকি আমায় বিশ্বাস করো না?”
মীরা মাথা ঝাঁকাল জোরে জোরে।
“কি বলছ তুমি? আমি তোমায় কেন বিশ্বাস করব না? আমি শুধু তোমাকে সাবিনের সাথে পরিচয় করাতে চাইছিলাম কারণ তুমি সত্যিই একজন বিশেষ মানুষ, জায়দান।”
“উই উইল ডু দ্যাট সুন, ভেরি সুন, কিটেন।”
মীরাকে নিজের বুকে টেনে তার কানে ফিসফিস করল আয়দান। বুকে মাথা গুঁজে রাখায় আয়দানের চেহারায় প্রকাশ পাওয়া সুচারু অভিব্যক্তিটুকু চোখে পড়লনা মীরার।
কিছুক্ষণ বাদে মীরাকে রিকশায় তুলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিল আয়দান। একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ভদ্র খোলস থেকে মুহূর্তেই বেরিয়ে এলো সে। এতক্ষণ যাবৎ, পার্কের একপাশে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করছিল তার বন্ধুদের দল। দামী গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে চড়ে বসতেই একযোগে শীষ বাজিয়ে উঠল সকলে।
“ভালোই মুরগী ধরেছিস, দেখছি!”

আয়দানের সবথেকে কাছের বন্ধু সামির বলে উঠল। বান্দার হাতে ঝুলছে ইলেকট্রনিক সিগার। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা পাবলিক মত্ত ভদকার বোতলে। দীর্ঘ এক চুমুক দিয়ে সে শুধালো,
“পাখিকে ক্লাবে আনবিনা? যাহ দোস্ত, একটু শেয়ার না করলে হয়?”
আয়দান প্রাণভরে হাসল। সামিরের হাত থেকে সিগার নিয়ে নিজের ঠোঁটে চেপে কয়েকটি সুখটান দিয়ে উত্তর করল,
“আজকাল দেখছি সবাই খুব অধৈর্য্য হয়ে উঠছে। এত সহজে পাখি ধরে মজা আছে? তাকে তো একটু একটু করে সময় নিয়ে ভক্ষণ করতে হয়।”
আয়দানের কথার বিপরীতে গাড়িজুড়ে আরেক দফায় হাততালি, হাসাহাসি এবং শীষ বাজিয়ে ওঠার রোল পড়ে গেল। সামির পিছনে ঘুরে ঠোঁটে বাঁকা হাসি মেখে বলল,

“যত যাই বলিস, তোকে আমি এর আগে কোনোদিনও এতটা ধৈর্য্য নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কিছু করতে দেখিনি।”
আয়দান সিগারে আরো কতক টান দিল। গাড়ি ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। তবে বন্ধু সামিরের বক্তব্যের বিপরীতে সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালনা। ঠান্ডা মাথায়? ঠিকই ধরেছে সামির। সাবিনের ক্ষেত্রে সে ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়।
ওই মেয়েটাকে নিঃস্ব করে দেবে আয়দান, এটাই তার মহৎ পরিকল্পনা। যেই মেয়ে তার মায়ের গায়ে হাত তোলার মতন দুঃসাহস দেখিয়েছে, সেই মেয়েকে তার কাপুরুষ বড় ভাই দয়া করে ছেড়ে দিলেও সে ছাড়বে না, ছাড়তে পারবেনা।

জায়দানের বিয়ের এক বছর আগেই পড়াশোনার খাতিরে বিদেশে চলে গিয়েছিল আয়দান। ডিগ্রী নেয়ার চার বছরে একবারের জন্যও সে দেশে ফেরেনি। এর মাঝেই বড় ভাইয়ের জীবনে বহু চড়াই উৎরাই গিয়েছে। সেসবের বিশেষ পরোয়া তার নেই। তার শুধু মনে আছে দেশ থেকে যাওয়া একটি ফোনকলের, যেটি তার বাবা জাফর করেছিলেন। বলেছিলেন, জেসমিন হঠাৎ করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তখন কাহিনী না জানলেও পরবর্তীতে নানা মাধ্যমে সে জেনেছিল, তাদের সংসারে আগুন লাগানো ডাইনীটার কাহিনী। সেদিন যদি খারাপ আবহাওয়ার কারণে এয়ারপোর্টের ফ্লাইট বাতিল না হত, তবে তক্ষুণি দেশে এসে একটা হেস্তনেস্ত করত আয়দান।

সাবিনের প্রতি সে চরম ঘৃণা পুষে দিন পার করেছে, কারণ জীবনে সে সবথেকে বেশি যাকে ভালোবাসে, সেই মাকেই আঘাত করেছে ওই মেয়ে! দেশে ফেরার পর স্কুটি – গাড়ি সংঘর্ষের ঘটনাটা স্রেফ আয়দানের বুকে ধিকিধিকি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার কত্ত বড় সাহস! সে শুধু তাদের সংসার ধ্বংস করেও শান্ত হয়নি, তাকে অপমান অবধি করতে পিছপা হয়নি! জায়দান যদি ভেবে থাকে শুধুমাত্র একটা সরি বলিয়ে সে সবকিছুর সমাধান করে ফেলেছে, তবে তার বড় ভাই বোকার স্বর্গে বাস করছে। অবশ্য, ওটা এমনিতেই জাত বোকা!
এখন, আয়দান নিজের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ধরে এগোচ্ছে। সাবিনকে সে এমনভাবে ভাঙবে, যে পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী আঠাও তার ভাঙা অংশগুলোকে জুড়তে পারবেনা। সাবিনকে ভাঙার এই খেলায় বাকি সকল গুঁটি হলো তার অঘোষিত যুদ্ধের কোলাট্যারাল ড্যামেজ।
ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতেই কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে গেল আয়দান টের পেলনা। বন্ধু বান্ধব সকলে মিলে গাড়ি থেকে বের হতেই সেও বেরিয়ে এলো। আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাব, সিঁড়ির ধাপ নেমে গিয়েছে একেবারে নিচে। সকলে এগোল ভীষণ ফুরফুরে মেজাজে। আয়দান পকেট থেকে নিজের মিনি পারফিউম বের করে কলারে মাখতেই সামির ভ্রু দুলিয়ে শুধালো,

“এত আয়োজন?”
বিস্তৃত হাসল আয়দান,
“গার্লস্ লাইক দ্যা ওয়ে ইউ স্মেল।”
“উম, বাট আই অলরেডি লাইক ইউ!”
একটি আবেশিত মেয়েলী কন্ঠস্বর ভেসে এলো। সিঁড়ির গোঁড়ায় নিচের দিকে দাঁড়িয়ে এক বডিকোণ মিনি ড্রেস পরনে রমণী। উরুর নিচ থেকে সবকিছুই উন্মুক্ত, মোলায়েম ধবধবে ত্বক তাতে স্পষ্টত দৃশ্যমান। আয়দান একেকবার তিনটি করে ধাপ পেরিয়ে নিচে নামল। অতঃপর কোনো বাক্য ব্যয় না করেই রমণীকে একপাশের পাথুরে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। খিলখিল করে হেসে উঠল রমণী,
“আরে, আস্তে আস্তে টাইগার। বহুদিন যাবৎ ক্ষুধার্ত আছো মনে হচ্ছে।”
“হ্যাঁ, ক্ষুধার্ত, তোমার জন্য।”
রমণীর গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল আয়দান, তাকে পাল্টা আঁকড়ে ধরল সে। সামির দৃশ্যটি লক্ষ্য করতে করতে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো। বন্ধুর পিঠে হাত ঠেকিয়ে কয়েকটি চাপড় দিয়ে বলল,
“চিল, ব্রো। তোর খাবার কেউ কেড়ে নেবে না।”
অতঃপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ক্লাবের ভেতরে চলে গেল সামির। তার দিকে বিশেষ নজর আয়দানের নেই, সে ব্যস্ত রমণীতে। পাথরের দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে রমণীর কোমর চেপে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে প্রশ্বাস টানলো আয়দান, অপর হাতে ধীরে ধীরে নিজের বেল্টের বাকল খুলতে আরম্ভ করল। ফিসফিস করে বলল,
“গেট ইন্টু রুম, রাইট নাউ।”
“অধৈর্য্য।”
মাদকীয় আওয়াজে হেসে উঠল রমণী।

॥ ৮৫০ কোটি টাকা ॥
হোয়াটস অ্যাপে জায়দানের শেষ মেসেজটির দিকে গত এক ঘন্টা যাবৎ একনাগাড়ে চেয়ে আছি আমি। মেসেজটি এসেছে বেশ কিছুদিন আগেই। অথচ এই কয়েকদিনে আমি চোখ তুলে প্রাক্তনের নাম্বারের দিকেও তাকানোর সাহস পাইনি।
আমার ড্যাড, তাকদীর হুসেইনের মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। বিষয়টা আমি ঠিক কেমনভাবে নেব বুঝতে পারছিনা। ভোঁতা একটা অনুভুতি কাজ করছে অভ্যন্তরে। জায়দান শুধু হিসাবই বের করেনি, বরং প্রত্যেকটি অনলাইন ডকুমেন্টস, দলিল দস্তাবেজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর রিপোর্টসহ আমায় পাঠিয়েছে। সারাটা রাত আমি সেসব ঘেঁটেই দেখেছি। একটা প্রশ্নই আমার মাথায় ঘুরঘুর করছে।
ড্যাড ঠিক কত বড় ঋণ নিয়েছিল যে ৮৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি নিমিষে ফুরিয়ে গেল? এটা কি আদও সম্ভব? আমার ড্যাড কি এতই বোকা? নাকি কোথাও গিয়ে আমিই বোকা বনে গিয়েছি?
সেদিন বড় চাচার বাসায় নিজের বাবার রেঞ্জ রোভার আহানের আওতায় দেখেও আমি কিছু বলিনি। কিন্তু তাকবীর চাচা কি ভেবেছিল, আমি এখনো সেই আহাম্মক সাবিন রয়ে গিয়েছি যে বিজনেসের বি বোঝে না?
যদি নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতাম, তবে এক্ষুণি হাতের ফোনটা আছাড় দিয়ে ভাঙতাম। অথচ আমি আর আগের মতন নেই। ক্রোধে টগবগ করে ফুটতে থাকার মতন সত্যটা আজ আমায় বিশেষ কিছু অনুভব করাতে ব্যর্থ রইল।
হাজার চাওয়া সত্ত্বেও আমি জায়দানকে ভুলতে পারছিনা। সেদিন তার বলা কথাগুলো আমার কানে বাজছে আজ অবধি। আমি কাঁদতে পারছিনা। যে মানুষটাকে আমি অবহেলা করে এসেছি চিরটাক্যাল, সে সত্যিই নিজের মনে আমার প্রতি এক আকাশ সমান অভিমান পুষে রেখেছিল? আদও কি জায়দানের অনুভূতি নেই? যদি নাই থেকে থাকে, তবে সেদিনের চাপা ক্ষোভটুকু কি ছিল?

আমি আজকাল নিজেই নিজেকে চিনতে পারিনা। কে আমি? কি পরিচয় আমার? কি উদ্দেশ্য আমার? কিভাবে আমি এমন একটা মানুষের প্রেমে পড়লাম, যাকে কখনো আমি গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি? নাকি দেখেছিলাম? যদি তাকে গুরুত্ব না দিতাম, তবে ওই বাড়িতে কি তার অবহেলার খোঁজ রাখতাম? আমার শ্বাশুড়ির উপর রাগ ছিল, শুধুমাত্র নিজের প্রতি অবিচারের জন্য নয়, বরং জায়দানের জন্য। যখন দেখতাম ওই বাড়িতে আদতে মানুষটার কোনো দামই নেই, তখন কেন যেন সহ্য হতনা আমার। ইটের জবাবে পাটকেল ছুঁড়তে মন চাইতো। তবে কি সেটাই ছিল আজকের এই প্রেমের দাবানলের জন্ম দেয়া ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ? শুধু আমিই টের পেয়েছি দেরীতে? আমি কি নিজের দোষেই জায়দানকে দূরে ঠেলে দিয়েছি? নাকি এসব আমার প্রাপ্য ছিল, অতীত কর্মের জন্য? সবকিছুই কি তবে আমার কর্মফল? ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।
এখন আমার কি করা উচিত? কোন পথে চলা উচিত? মাথায় সবকিছু জট পাকিয়ে গিয়েছে ভয়ানকভাবে। আমাকে তো কেউ শিখিয়ে দেয়নি কখনো, জীবনে চলার পথে এসব কিভাবে সামাল দিতে হয়। তবে আমি কোন পদ্ধতি অনুসরণ করব? কি করলে একটু শান্তি মিলবে? নিজেকে জায়দানের কদমে নামিয়ে আনব? তবে কি সে আমায় গ্রহণ করে নেবে? যদি গ্রহণ করেও, আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যত কি হবে? আরো একবার ওই বাড়িতে থিতু হওয়া যে আমার পক্ষে অসম্ভব!

আর জায়দান? তাকে আমি কি কারণে ভালোবাসলাম? কোন কারণে তার প্রেমে পড়লাম? আমি তো শুরু থেকেই জানতাম, আমার প্রতি আগ্রহগুলো শুধুই তার করুণা এবং কর্তব্যবোধ। সবকিছু জানা সত্ত্বেও কিভাবে সেসবকে অনুভূতি ধরে নিলাম? আমি নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গিয়েছে। কোনো কারণ ছাড়া কি কাউকে কখনো ভালোবাসা যায়?
“ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেতে আয়।”
অতি পরিচিত কণ্ঠটি আমাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। সামান্য মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলাম মীরা ভাত বাড়ছে। কিছুক্ষণ আগেই দুজন নিজেদের ক্যাফে থেকে ফিরেছি। এসে আমি বিছানায় সিঁধিয়ে গেলেও মীরা রান্নায় ব্যস্ত ছিল। চিংড়ি মাছের ঘ্রাণ আসছে, বোধ হয় বড়া বানিয়েছে। এই মুহূর্তে মেয়েটাকে আলুভর্তা চটকাতে দেখছি।
বিছানায় কম্বল টেনে গায়ে দিয়ে মৃদু আঁচে বললাম,

“আমার ক্ষুধা নেই মীরা, তুই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
“গত কয়েকদিন ধরে তোর নাটক দেখছি আর সহ্য করে যাচ্ছি। আজকে আবার নাটক শুরু করলে সোজা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাসার বাইরে পাঠিয়ে দেব।”
“ভালোই হবে। রাস্তার কুত্তাদের সাথে রাত কাটাবো।”
“সাবিন!”
কড়া চোখে তাকাল মীরা। আলুরভর্তায় খানিকটা সরিষার তেল ছিটিয়ে নিল। আমি বেশিক্ষণ দেখলাম না। বালিশে মুখ গুঁজলাম। তবে মিনিটখানেক বাদেই টের পেলাম মীরা বিছানায় এসে বসেছে। গুঙিয়ে উঠলাম, সঙ্গে সঙ্গে গা থেকে কম্বল সরে গেল।

“মীরার বাচ্চা!”
খেঁকিয়ে উঠে বসতেই আমার কোলে পানির বোতল ছুঁড়ে থিতু হয়ে বসল মীরা। হাতে প্লেট, তাতে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, ফুলকপির তরকারি, আলুর ভর্তা এবং চিংড়ি বড়া। ফু দিয়ে ভাত মাখাতে মাখাতে সে বলল,
“নে আ কর। দ্রুত।”
মেয়েটার দিকে আমি দীর্ঘক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে রইলাম। জীবনে আমি বহু পাপ করেছি। তার মধ্যে একদিন এক ভিক্ষুককে পাঁচশো টাকার নোট দিয়েছিলাম, ঈদের আগে চাঁদরাতের দিন। মনে আছে কারণ সেই ভিক্ষুক ওইদিন আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেছিল, যে আমি নাকি জীবনে অনেক সুখী হব। সেই একটিবারই বোধ হয় আমি বদ দোয়ার বদলে কারো দোয়া পেয়েছিলাম। সেই জন্যই হয়ত সবকিছু হারিয়ে ফেলা এই জীবনটায় এসেছে মীরা।
মীরা মুখে গ্রাস তুলে দিতেই এবার বাধ্য শিশুর মতন খেয়ে নিলাম। চিবুতে চিবুতে বললাম,
“তুই অনেক ভালো মা হবি, মীরা।”

আমার কথা শুনে মীরা মৃদু হাসল। চিংড়ি মাছের বড়া ভেঙে গ্রাস মাখিয়ে আমার মুখে তুলে দিয়ে বলল,
“অবশ্যই। তুই যা ট্রেনিং দিচ্ছিস! আমি একেবারে এক্সপার্ট হব।”
মেয়েটার দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলাম আমি। সুন্দর মানুষের নাকি অহংকার বেশি থাকে। ঠিক আমার মতন। যদিও আমি সুন্দর কিনা জানিনা। তবে সাজগোজ করলে নিজেকে খুব একটা খারাপ লাগেনা। তবে মীরা এত সুন্দর হয়েও নিরীহ কেন? নাকি আমার চোখেই প্রাণের বান্ধবীকে জগতের সবথেকে সুন্দর রমণী মনে হয়?
আমি নিষ্পলক চেয়ে আছি লক্ষ্য করে মোলায়েম হাসলো মীরা।
“তোর মাথার ভেতর কোন নতুন আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠছে শুনি?”
এক মলিন হাসি ছুঁয়ে গেল আমার অধরে। খানিকটা পানি পান করলাম। মীরাকে অতি যত্নে গ্রাস মাখাতে দেখতে দেখতে আনমনে বললাম,

“কাউকে কি কখনো কোনো কারণ ছাড়া ভালোবাসা যায়?”
মীরা থামলে পারতো। অথচ সে থামলো না, স্বাভাবিক থাকলো। ঠিক আমি যেমনটা চাইছি। সে জানে, আমি কতটুকু অনুভূতি বিনিময় করতে পারি। আমি নিজে থেকে আগ্রহ করে কিছু না বললে বেশিরভাগ সময় মীরা আমায় খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেনা। আমায় বুঝে উঠতে সময় দেয়, সাহায্য করে। কারণ সে জানে, সব সামলে ওঠার পর আমি তাকে ঠিকই জানাব। তাই মীরা পাল্টা প্রশ্ন এড়িয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিল।

“এজন্য তোকে ভালোবাসার সংজ্ঞাটা বুঝতে হবে।”
আরেক গ্রাস মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে শুধালাম,
“মায়া আর ভালোবাসা এক, সেটা?”
“তুই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটে বিশ্বাস করিস?”
থমকে গেলাম। প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হল।
“জানিনা। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে হয়ত হয়।”
“কেন হয় বল তো? প্রথম দেখায় তো কারো অন্তর পড়া যায়না।”
“রূপ দেখে? মানুষটা সুন্দর, সেই কারণে?”
“এক্সাটলি!”
ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। আমার অগোছালো জবাব সত্যি হবে ভাবিনি। মীরা সোজা হয়ে বসল। আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল,

“ভালোবাসার অনেক নাম আছে। যখন তুই কাউকে তার রূপ দেখে ভালোবাসবি, তখন সেটা আসক্তি। এই আসক্তিই ভালোবাসা নামে পরিচিত হয়।”
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলাম। মীরা বলে গেল,
“যখন কাউকে তার দয়ালু স্বভাব দেখে ভালোবাসবি, তখন সেটা মুগ্ধতা। যখন সে তোকে ভালোবাসে তাই তুই তাকে ভালোবাসিস, তখন সেটা সহানুভূতি।”
আমার মুখে শেষ গ্রাস তুলে দিল মীরা। তাকালো চোখের মাঝে, গভীরভাবে। তার কন্ঠস্বর যেন প্রতিধ্বনিত হলো শুধু দেয়ালে নয়, বরং অন্তরজুড়ে।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৮

“কিন্তু যখন তুই মানুষটাকে ভালোলাগার কোন কারণ খুঁজে পাবিনা, তখন সেটি ভালোবাসা।”
মস্তিষ্ক থেকে হৃদপিন্ডে অনুভূতির তরঙ্গ খেলে গেল। অপলক চেয়ে থাকলাম আমি। মীরা বসে নেই, সে প্লেট নিয়ে উঠে গেল। একই প্লেটে এবার নিজের জন্য ভাত বাড়ছে সে। দৃশ্যটির পানে বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়েই রইলাম। বুঝলাম না, কখন একটি প্রার্থনাবাক্য আমার অন্তর থেকে নির্গত হল।
“মীরা যেন সবসময় ভালো থাকে আল্লাহ, আর আমার কাছেই থাকে…..”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here