Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১
জাবিন ফোরকান

দরজার অপরপ্রান্তে দন্ডায়মান প্রাক্তন স্বামীকে দেখে হতচকিত হয়ে গেলাম আমি। শুনেছি প্রাক্তনদের দেখলে নাকি বুকের ভেতরের হৃদপিন্ডটায় আলাদা একটা অনুভুতি হয়, রোমন্থনের। অথচ আমি নিজের মাঝে বিশেষ কিছু অনুভব করলাম না, শুধুমাত্র বিস্ময় ছাড়া। ডিভোর্সের এক বছর দুই মাস বাদে একেবারে অপ্রত্যাশিত এই সাক্ষাৎ আমায় ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ করে দিলো।
“ আপনার ডেলিভারি, স্যার।”
বুঝেশুনে ওঠার আগেই তপ্ত মস্তিষ্কের প্ররোচনায় উচ্চারণ করে বসলাম। মানুষটা নিজের চশমার লেন্সের ভেতর থেকে একেবারে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আমায় দেখলো। আপাদমস্তক ঘুরপাক খেলো ওই গভীর বাদামী মণিজোড়া। নয়নদ্বয়ের মাঝে নির্বিকার শীতলতা বাদে কিছুই নেই। যেমন ছিলোনা আগেও। আজ আমি নতুন করে আবারও টের পেলাম, মানুষটা একটুও বদলায়নি।
দুহাত বাড়িয়ে আমার হাত থেকে পিৎজার বক্সগুলো নিলো সে। সামান্য আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই অকারণে খানিক শিউরে উঠলাম আমি। অথচ সে একেবারেই শান্ত। তাকে দেখলে আমার সবসময় মনে হতো, যেন দুচোখ ভরে এক সুগভীর নীল প্রশান্ত সাগরকে দেখছি।

“ ২ হাজার ৮০০ টাকা, ক্যাশ অন ডেলিভারি স্যার। ”
আমার গলাটা এবার কেমন যেনো ভারী শোনালো। কিসের কারণে এই ভারত্ব, বুঝে উঠতে পারলাম না। মানুষটা চুপচাপ নিজের পকেটে হাত গুঁজলো। ওয়ালেট থেকে তিনটি এক হাজার টাকার নোট বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“ কিপ দ্যা চেঞ্জ। ”
বহুদিন বাদে শোনা কণ্ঠটির মাধুর্য্য উদযাপন করতে পারলাম না। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা পুরুষালী হাসাহাসির আওয়াজে সেটি খানিক চাপা পড়ে গেলো। টাকাটা হাত বাড়িয়ে নেয়ামাত্রই উল্টো ঘুরল সে। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে দরজাখানি আটকে দিলো। আর একটিবার ফিরেও দেখলোনা আমায়।
বোকার মতন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আহাম্মক আমি! কি আশা করছিলাম? হয়ত সে জিজ্ঞেস করবে, আমি কেমন আছি? সেই প্রশ্ন করার কোনো কথাই তো ওঠেনা। আজও স্পষ্ট মনে আছে আমার। এই আমিই সেদিন তার দিকে বিতৃষ্ণাভরে তাকিয়ে বলেছিলাম, “ আজকের পর থেকে আমরা একে অপরের কাছে অপরিচিত।”
সে তো আমার কথাই রেখেছে। একজন অপরিচিত মানুষের তো আমায় জিজ্ঞেস করার কথা নয় আমি কেমন আছি। তবুও এই বেহায়া অন্তরটার এত চাহিদা কিসের?

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাকাগুলো পকেটে ভরলাম। অতঃপর চুপচাপ লিফটে ঢুকে গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম চাপলাম। সামান্য দুলে উঠে লিফট নিচে নামতে লাগলো। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। একদমই স্বাভাবিকভাবে। তারপর একদম হঠাৎ করেই আমার কি যেনো হয়ে গেলো। চোখ দুটো জ্বলতে জ্বলতে ঝাপসা হয়ে উঠলো। অনুভব করলাম, আমার দুই গাল উপচে পানি গড়াচ্ছে টপটপ করে। শরীরটা থেকে থেকে কাঁপছে। হাঁটুর জোর কমে এলো। ধপাস করে লিফটের মেঝেতেই বসে পড়লাম। তারপর যা হলো তা আমার সঙ্গে বিগত এক বছরেও হয়নি।
কাঁদলাম খুব। একেবারে ডুকরে কান্না যাকে বলে। মুখ চেপে ধরলাম নিজের, শব্দ নিবারণে। অশ্রুর বাঁধ ভেঙে বিষাদটুকু ঝরতে লাগলো। গলা ভিজিয়ে পৌঁছে গেলো টি শার্টের ভেতরের বুক অবধি। এ কিসের কান্না আমার জানা নেই। কিন্তু এটুকু আমার অন্তর জানে, সত্যিই একটু প্রাণ উজাড় করে কাঁদা প্রয়োজন।

“ আফামণি আফনার কি হইসে? ”
প্রশ্নটি কানে যাওয়ার পরেই টের পেলাম, লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে গিয়েছে। দরজা খোলা। ওপাশে উদ্বিগ্ন দারোয়ান তাকিয়ে আছে। অতি ক্ষীপ্রতায় পরনের ইউনিফর্ম জ্যাকেটের হাতায় চোখমুখ মুছে নিলাম। উঠে দাঁড়ালাম। ভারসাম্যহীন পদক্ষেপে হেঁটে বাইরে পৌঁছেই শক্ত কন্ঠে জবাব দিলাম,
“ কিছু না।”
দ্রুত পায়ে গ্রাউন্ড ফ্লোর পেরিয়ে গেটের ওপাশে পার্ক করে রাখা স্কুটিতে চেপে বসলাম। পিছনে এখনো বেশকিছু পিৎজা বক্স রাখা আছে। আরো দুইটি জায়গায় ডেলিভারি দেয়া বাকি। ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিয়ে একনজর অভিজাত সুউচ্চ বিল্ডিংটির দিকে তাকালাম। আমার নজর আটকালো ঠিক বারো তম তলায়। আমি জানি, সে ওখানে থাকেনা। আমার কাছে অর্ডার এসেছিলো ভিন্ন একটা নামে। হয়ত কোনো বন্ধু? বন্ধুমহল একসাথে হলে পিৎজাপার্টি বাঞ্ছনীয়।
অপেক্ষা করলাম না আর, স্কুটি ছুটিয়ে চললাম ঢাকা শহরের রাজপথ ধরে।
সকল ডেলিভারি শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত আটটা মতন বেজে গেলো। সাপ্তাহিক বাজার শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটাও করে আসতে হয়েছে। ব্যাগে দুটো তেলাপিয়া মাছ এবং হাফ ডজন ডিম নিয়ে যখন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম তখনি ভীষণ উত্তেজিত কন্ঠস্বরটি অত্যন্ত জোরে কানে বেজে উঠলো।

“ হ্যাপি বার্থডে মাই ডিয়ার সাবিন! ”
আধো আলো আধো অন্ধকারের মাঝে খানিক ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠলাম। খেয়াল করতেই চোখে ভাসলো আমার রুমমেটের শাড়ী পরনে অবয়ব। হাতে এক পাউন্ডের একটি ছোট কেক, তাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। হলুদাভ আভায় মেয়েটিকে অনন্যসুন্দরী দেখাচ্ছে। ধড়ফড় করতে থাকা বুকে হাত চেপে আমি হতবাক কন্ঠে বলে উঠলাম, “ মীরা! ”
মীরা শুধুমাত্র আমার রুমমেট নয়। জীবনের একমাত্র বান্ধবী বটে। একমাত্র কেনো, তার ইতিহাস আরেকদিন স্মরণ করা যাবে নাহয়। আমার বিস্মিত মুখ দেখে ভীষণ মজা পেয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো মীরা। রুমের লাইট জ্বালিয়ে এক হাতে আমার কাছ থেকে বাজারের ব্যাগ কেড়ে মেঝেতে রেখে আবার কেক নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। দ্বিতীয় দফায় শুভেচ্ছা জানালো।

“ শুভ জন্মদিন দোস্ত। ”
অজান্তেই ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ গেলো আমার। আজ ২ নভেম্বর। নিজেরই নিজের জন্মদিনের কোনো হিসাব ছিলোনা। অথচ এই মেয়েটা, কিভাবে স্মরণ রেখেছে? আমি কি কোনোদিন ওকে নিজে থেকে বলেছি? না তো। তবে কি আমার বার্থ সার্টিফিকেট দেখেছিলো কখনো? মনে করতে পারলাম না। স্থবির হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। মীরা ভ্রু দুলিয়ে এক হাতে আমার গাল চাপড়ে বললো,
“ কি? হাবাগোবার মতন চেয়ে আছিস কেন? হাতে কি টাইমড বম্ব ধরে রেখেছি মনে হচ্ছে? ”
প্রতিক্রিয়া জানাতে পারলাম না। এর আগেই মীরা আমাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলো। রুমের একমাত্র ছোট্ট ডাইন ইন টেবিলটায় কেক রাখলো। প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখলাম, শুধুমাত্র কেক নয়। আমার প্রিয় খিচুড়ি, কালাভুনা এবং পায়েশ তৈরি করা হয়েছে। মীরা ঢাকা ভার্সিটির ছাত্রী। তার উপর নিজের একটা অনলাইন কেক বিজনেসও আছে মেয়েটার। এতকিছু সামলে এসব সে কখন তৈরি করেছে ভেবে উত্তর পেলাম না।

“ এসব….কেনো মীরা? আমি…মানে…”
“ হুশ। একদম চুপ। ঘেমে নেয়ে মুখের যা ছিরি করেছিস! যাহ, মুখ হাত ধুয়ে একটা সুন্দর জামা গায়ে দিয়ে আয়। ”
“ কিন্তু….”
“ তুই যাবি নাকি রান্নাঘর থেকে ঝাঁটাটা আনবো? ”
ফিক করে হেসে ফেললাম। মীরা এমনিতে শান্ত শিষ্ট লেজবিশিষ্ট প্রজাতির মেয়ে। শুধু আমার সাথেই তার ভেতরের শয়তানি রূপটা বেরিয়ে আসে। এমন শয়তানকে উস্কানি না দেয়াই শ্রেয়। তাই দ্রুত ওয়্যারড্রব থেকে একটা ফ্রক টেনে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।
একদম সংক্ষিপ্ত একটা গোসল সেরে গামছায় চুল মুছতে মুছতে যখন বেরোলাম, তখন মীরা সবকিছু তৈরি করে ফেলেছে। মেয়েটার মুখশ্রী ভীষণ সুন্দর। খানিকটা উপন্যাসে বর্ণনা করা নায়িকা চরিত্রদের মতন। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বক এবং গোলাপী ঠোঁটের ডগায় কুচকুচে কালো তিল। হাজার খুঁজলেও চেহারায় খুঁত খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আজ পরনের সবুজ শাড়ীতে তাকে মানিয়েছে বেশ। আমাকে দেখেই আরেক দফায় উৎফুল্ল এক হাসি উপহার দিলো মীরা। তারপর টেনে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসালো।
“ কেক গলতে শুরু করেছে। ধর ধর কাট, ফু দে একটা জোরসে। ”
ফু দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটতেই হাততালি দিয়ে জন্মদিনের সঙ্গীত গাইতে আরম্ভ করলো মীরা। গলা ধরে এলো আমার। বহু কষ্টে ভেতরের বিষাদঘূর্ণিকে আটকে রাখলাম। শেষ কবে আমার জন্য কেউ এমনটা করেছিল? মনে করতে পারলাম না। পেয়েছিলাম আমি অনেক কিছুই। তবে এমন স্বচ্ছ মনের একটা মানুষ আমার কোনোদিন ছিলোনা। আগে বুঝতে না পারলেও বর্তমানে আমি তা বুঝতে পারি।
আমাকে কেকের পিস খাইয়ে দিতে দিতে ঘ্যাচাং করে বেশ কতক সেলফি হাতিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো মীরা।
“ একটা বাঁধাই করে আমাদের বাসার মেইন দেয়ালে টাঙিয়ে রাখবো। কিছুদিন আগেই একটা ফটোফ্রেম পেইজ থেকে পি আর পাঠাতে চেয়েছে, কাস্টোমাইজ করে নেবো একদম, কি বলিস রে সাবিন? ”

কোনো জবাব না পেয়ে মেয়েটা অবশেষে ঘুরে তাকালো। তখনি দুচোখ মেলে দেখলো আমার নয়ন ভরা অশ্রু। টপটপ করে গড়াচ্ছে না। চরম অবাধ্যতায় সেসব আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রাণের মীরার বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলোনা। সবকিছু ফেলে সে দুহাতে আমাকে আগলে নিলো বুকের মাঝে। জড়িয়ে ধরলাম তাকে আমি, যতটা জোরে সম্ভব। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। আজ একটামাত্র দিনে এই আমার দ্বিতীয় কান্না। জন্মদিনটা কি তবে অশুভ?
মীরার সকল প্রফুল্লতা হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গিয়েছে। মুখজুড়ে এখন ভয়ানক চিন্তার বসবাস। আমার পিঠে হাত বুলিয়ে নরম গলায় সে শুধালো,
“ দোস্ত। কি হয়েছে রে? আমার সাবিনটা এমন কাঁদছে কেনো? ”
নিজের সাবিন নামটা আমার খুব বেশি পছন্দ নয়। ছোটবেলা থেকে একটা টিপ্পনী শুনেই বড় হতে হয়েছে। এটা নাকি ছেলেদের নাম। আমার নামটা সাবিনা হওয়া উচিত ছিলো। অথচ মীরা যখন আমায় আদর দিয়ে ডাকে, তখন এই নামটাই আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। কি স্নেহ আমার নামটায়!

“ আমাকে মাফ করে দে দোস্ত। তুই আমার জন্য এতকিছু করলি, অথচ তোকে ধন্যবাদটাও দিতে পারছিনা। আমার সবকিছু কেমন যেন লাগছে মীরা।”
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠলাম আমি। মীরা তাতে আমায় দ্বিগুণ শক্তিতে চেপে ধরলো। বললো,
“ তুই তো অনেক শক্ত মেয়ে সাবিন। কান্নাকাটি করা তো আমার স্বভাব ছিল রে। তবে আজ কেন তুই ভেঙে পড়ছিস পাগলি? তোর এমন ভঙ্গুর সত্তা দেখলে তো আমার ভয় করে। ”
মীরার কথা আমায় বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনলো। অশ্রু বিসর্জন বন্ধ হলো সহসাই। মীরার বুক থেকে মুখ তুলতেই নিজের আঁচল দিয়ে আমার ফুলে ওঠা চোখজোড়া মুছিয়ে দিলো সে। নিজেকে রুখতে পারলাম না আর। কান্না জড়ানো ভারী গলায় প্রায় ফিসফিস করে জানালাম,
“ ওকে দেখেছি আজ। ”
আমার কথাটা শুনতেই জমে গেলো মীরা। একনাগাড়ে শূন্য চোখে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপরই মেয়েটির ভ্রু জুড়ে ক্রোধের কুঞ্চন সৃষ্টি হলো।

“ কিঃ? ওই বদমাইশটাকে? জুতা খুলে পিটিয়েছিস কয়বার? থোতা মুখটা ভোঁতা করে দিয়ে আসিসনি? ”
আমার ঠোঁটে এক মলিন হাসি ফুটলো। মীরা নিজের আঁচল কোমরে বাঁধতে বাঁধতে খেঁকিয়ে উঠলো,
“ একবার বল শুধু ওই বজ্জাত তোকে কি বলেছে? ওটাকে কোথায় পাওয়া যাবে? গতকালকেই একজোড়া হিল জুতো নিয়েছি। একেবারে ঠেঙিয়ে ওটাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে ছাড়বো। ”
আমার হাসিটা আরো বিস্তৃত হলো। আমি জানি, মীরা সত্যিকার জীবনে সেটা কোনোদিনও করতে পারবেনা। মানুষের সামনে এ ভীষণ ভদ্র ও দূর্বল গোছের। ওর সব অনুযোগ – অভিযোগ এবং দুঃসাহস আমায় ঘিরে। তবুও ওর কথাগুলো কেমন যেন আমার বুকে এসে লাগলো। ধারালো তীরের ফলার মতন। আমি জানি, মীরা কিছুই জানেনা। অথচ আমার ভীষন খারাপ লাগলো।
আমার দোষের ঘানি অন্য একটা লোক কেনো টানবে? এই বোধটুকু আগে না থাকলেও এখন যথেষ্ট রয়েছে আমার। একটি নিঃশ্বাস ফেলে সরে দাঁড়ালাম তাই। টেবিল থেকে পায়েশের বাটিটা তুলে চামচ দিয়ে মীরাকে খাইয়ে দিলাম। মেয়েটি বাধ্য শিশুর মতন খেয়ে নিয়ে মহা বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমি দূর্বল হেসে বললাম,
“ মীরা। ওর কোনো দোষ ছিলোনা। ও নিতান্তই একজন ভালো মানুষ। একটু অতিরিক্ত ভালো। ”
এই প্রথম আমার বান্ধবী মীরা আমার কথার ধাঁধা সমাধান করতে অপারগ রইলো। আমিও এই ধাঁধার উন্মোচন ঘটাতে বিশেষ আগ্রহী নই। থাকনা অতীত, শুধু অতীত হয়েই।

গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোতে একটা আলাদা ধরণের শান্তি বিরাজ করে। অন্যান্য এলাকার রেস্তোরাঁর মতন উচ্চ শব্দে হাসাহাসি – কোলাহল চলেনা। এখানে আগত মানুষগুলো অভিজাত গোছের। তারা কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী অধিক। বিনোদনের থেকে ব্যবসায় সময় ব্যয় করা শ্রেয় তাদের জন্য। তবে এই শান্ত পরিবেশ কেন যেন খুব একটা পছন্দ নয় আরওয়ার। সবকিছুই কেমন যান্ত্রিক লাগে। মানুষগুলো রোবটের মতন। আগাগোড়া আভিজাত্যে মোড়ানো। প্রাকৃতিক ছোঁয়া নেই। আছে অর্থের গৌরব এবং বংশপরম্পরায় অর্জিত সম্মান। এর চাইতে মিরপুরের রাস্তার ধারের টং দোকানগুলোর চিত্র বেশ উপভোগ্য লাগে। কি সুন্দর করে হাসে সবাই! রাজনৈতিক আলোচনা করে। তাই সতর্কবার্তা টাঙানো থাকে টংগুলোতে।
এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ।

আরওয়া আশপাশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে বসে থাকা পুরুষ মানুষটাকে দেখলো। এই অভিজাত শ্রেণীর সদস্যদের থেকে ভিন্ন কিছুই মনে হচ্ছেনা তাকে। ধূসর রঙের ক্রপ স্যুট এবং ফরমাল পরনে। কোটের জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারে ঝুলিয়ে রেখেছে। চোখে হালকা ফ্রেমের চারকোনা আকৃতির চশমা। ত্বক উজ্জ্বল না হলেও হালকা বাদামী বর্ণটা বেশ চোখে পড়ার মতো। ভিড়ের মাঝে দেখলে সবার আগে চোখে পড়ার মতন স্বাস্থ্যকর গড়ন। তবে আরওয়া রূপে বিশেষ আকর্ষিত নয়। এমন সুদর্শন চেহারা সে অহরহ দেখে অভ্যস্থ।
পুরুষটির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আরওয়া নিজের হাতের ফাইলের দিকে মনোযোগ দিলো।
॥ নাম: জায়দান আরেফিন
বয়স: ৩২
পেশা: প্রফেসর অব কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট।
ম্যারিটাল স্ট্যাটাস: ডিভোর্সড, নো কিডস ॥
বায়োডাটার এই পর্যায়ে এসে থমকে গেলো আরওয়ার দৃষ্টি। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে দেখলো সামনে বসে থাকা আগাগোড়া স্যুট টাইয়ে মোড়া পুরুষটাকে। পোশাক তার পানীয়ের মতোই রসকষহীন।
ব্ল্যাক কফি, নো সুগার।

“ ডিভোর্সড? ”
আরওয়া খানিক আগ্রহবোধ করে এই প্রথম প্রশ্ন ছুঁড়লো। জায়দান নামক পুরুষটি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে হাত থেকে কফির মগ নামিয়ে টেবিলে রাখলো। চোখের চশমার লেন্সের আড়াল থেকে একজোড়া ঘোলাটে বাদামী দৃষ্টি চাইলো রমণীর পানে। ওই দৃষ্টিজুড়ে নির্লিপ্ততা।
“ যদি আপনার এতে সমস্যা থেকে থাকে তবে এই অ্যারেঞ্জমেন্ট আপনি এখনি ক্যান্সেল করতে পারেন।”
“ না না। আপনি ভুল বুঝছেন। ”
আরওয়া ভদ্রতাস্বরুপ একগাল হেসে আবারো বললো,
“ আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম, আপনার প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের কারণটা কি? ”
জায়দান টানটান শিরদাঁড়ায় খানিকটা ঝুঁকে এলো টেবিলে। ওই ধারালো বাদামীর মাঝে হিমশীতল তীরের ফলা যেন, যা বিদ্ধ হলো রমণীর মনমাঝে।
“ কোনো কারণ নেই। আমি গীবত অপছন্দ করি। ”
“ মানে? ”
“ সকল প্রশ্নের উত্তর হয়না। ”

আরওয়া ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। আজকের আগেও সে পারিবারিকভাবে ঠিক হওয়া এই সম্পর্কটাকে ভাঙার ১০১ টা উপায় ভেবে বের করে রেখেছিলো। অথচ আজ মানুষটার সামনে বসে তার মনে হলো,
অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ বোধ হয় সবসময় খারাপ হয়না।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here