Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৬

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৬

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৬
জাবিন ফোরকান

রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করা। বাইরে তুমুল বৃষ্টিপাত। সমস্ত দেশের উপর দিয়ে কোনো এক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাচ্ছে, এমনটা বলা হয়েছে খবরে। অধিকাংশ স্থানে বিদ্যুৎ নেই। বাড়ির দু দুটো জেনারেটর দৈবিক কোনো কারণে একইসাথে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। লোক আসছে এই ঝড়ের মাঝেও সব ঠিক করছে। এটা তো টাকার খেলা। তবে এই মুহূর্তে সমস্ত বাড়ি ক্ষণিকের আঁধারে নিমজ্জিত। থেকে থেকে বিকট শব্দে বাজ পড়ছে। ভূমিকম্পের মতন কেঁপে উঠছে জানালা। ছলকে ছলকে ওঠা আলোতে এই অন্ধকার আরো বেশি ভয়ানক লাগছে।
বিছানায় নিজের মায়ের বুকে গুটিশুটি দিয়ে আছে আয়দান। শরীরে এখনো জায়গায় জায়গায় ব্যান্ডেজ বাঁধা তার। বান্দরবানে পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়ার পর মাসের পর মাস কেটেছে তার হাসপাতালে, জ্ঞানহীন অবস্থায়ই। বাঁচবে কি মরবে, তা এতদিন ছিল অনিশ্চিত। অথচ কাকতালীয় কিংবা দৈবিকভাবে, যেভাবেই হোক না কেন, সে সুস্থ হয়েছে। মাত্র কিছুদিন হলো বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। তার আগমনের মধ্য দিয়েই যেন এই বাড়িতে ফিরেছে নতুন প্রাণ।

জেসমিন নিজের বুকে কম্বল মুড়িয়ে জড়িয়ে নিয়েছেন যক্ষের ধনকে। বজ্রঝড়ের এই রাতে অসুস্থ সন্তানকে কোনক্রমেই একা ছাড়তে নারাজ তিনি। যথারীতি, জাফর বাড়িতে নেই। আয়দানের কারণে মাসকে মাস দেশ – বিদেশে চিকিৎসার দৌঁড়ঝাঁপে ব্যবসার চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। সেই চাপ সামাল দিতে আজ এক সপ্তাহ যাবৎ তিনি বাড়ির বাইরে।
বহুদিন বাদে হাসপাতালের ঠান্ডা বেডের বদলে জননীর শরীর পেয়ে বেশ উষ্ণ অনুভব করছে আয়দান। সুস্থ হয়ে ওঠাটা ছিল তার জন্য এক নতুন জন্মের মতন। অতীতের সব স্মৃতির মাঝে ধূসরতার প্রলেপ পড়েছে। তাতে স্থান করে নিয়েছে নিত্য নতুন পরিবর্তন। বাইরে জোরেশোরে একটা বাজ পড়তেই আয়দান মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ফেলল। জেসমিন তার শরীরটায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে বললেন,
“তুমি ঘুমাও আব্বু, মাম্মি তোমার কাছে আছি।”
ঠিক অমন মুহূর্তেই দরজার বাইরে থেকে কড়া নাড়ার শব্দ। জোরে জোরে কেউ দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। খানিক বাদে ভেসে এলো শশব্যস্ত, ভয়ার্ত এক কন্ঠস্বর,

“আম্মু! আমার অনেক ভয় করছে আম্মু! দরজা খুলো না? প্লীজ?”
চোখ পিটপিট করে তাকালো আয়দান। জেসমিন নিষ্ক্রিয়। যেন তিনি শুনতে পাননি এমন ভঙ্গিতে আয়দানকে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
“একা একা খুব কষ্ট হচ্ছে আম্মু! দরজাটা একবার খোলো না! আমি প্রমিজ করছি, দূরে চেয়ারে বসে থাকব শুধু, তোমার আর আয়দানের কাছে যাব না। একবার প্লীজ? আম্মু?”
শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করল আয়দান। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা আর্তনাদ কার চিনতে তার বেগ পোহাতে হলোনা। তার বড় ভাই, জায়দান দাঁড়িয়ে আছে দরজার অপর পাশে। মা ছেলের একান্ত নিবিড় জগৎ থেকে সম্পূর্ণরুপে বিচ্ছিন্ন।
ছোট্ট আয়দান ডাগর ডাগর আঁখি মেলে নিজের জননীকে দেখল। অতঃপর বললো,

“মাম্মি?”
“হুম,আব্বু?”
“ভাইয়া বজ্রপাত অনেক ভয় পায়। একা একা কষ্ট পাচ্ছে ভাইয়া, ওকে ভেতরে নিয়ে আসি?”
“হুশ! ওটা তোর ভাইয়া না!”
কর্কশ গলায় খানিকটা খেঁকিয়ে উঠলেন জেসমিন। দরজার ধাক্কা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আয়দানকে আরো শক্তভাবে নিজের বুকে গুঁজে কম্বলে ঢেকে নিলেন জাগতিক সকল অনুভব থেকে। ফিসফিস করে সন্তানের কানে বললেন,
“ওটা একটা মনস্টার! আর ওই মনস্টার তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়, আয়দান!”
“আম্মু! আয়দান?”
দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা হাহাকার কানে যেতেই শিউরে উঠল আয়দান। আঁকড়ে ধরে রাখল জেসমিনকে। কাছে কোথাও ভয়ানক এক বজ্রপাত হলো। সমস্ত বাড়ি কেঁপে উঠলো, সঙ্গে তীক্ষ্ণ কোনো চিৎকার বুঝি!
অতঃপর পিনপতন নীরবতা।

একদম সকালে ঘুম ভাঙলো আয়দানের। বাইরের ঝড় থেমে গেলেও বৃষ্টি তখনো ঝরছে ঝিরঝির করে। স্নিগ্ধ পরিবেশ এবং ভীষণ ঠান্ডা। জেসমিনকে আয়দান আবিষ্কার করল একদম কাছেই। ঘুমে আচ্ছন্ন। মায়ের মুখটা কাছ থেকে দেখতে ভালোই লাগে তার। ঝুঁকে জেসমিনের গালে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে আস্তে করে কম্বলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আয়দান। বারান্দায় গিয়ে খানিকটা সময় ঘুম ঘুম চোখে বৃষ্টি বিলাস করল। অতঃপর চোখ কচলে নিদ্রা বিদায় করে রুমের বাইরে এগোলো। আকাশ গুমোট বেঁধে থাকলেও রাতের মতন আঁধার আর নেই। দরজা খুলে ব্যান্ডেজ জড়ানো পা খানি বাইরে রাখতেই আয়দান থমকে পড়ল সামনের দৃশ্য লক্ষ্য করে।
দরজার সামনেই মেঝেতে একটা পাপসের উপর গুটিশুটি দিয়ে শুয়ে আছে জায়দান। দুবাহুর মাঝে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে, তবুও ফিনফিনে শরীরটা ঠান্ডায় কাঁপছে থরথর করে। চোখজোড়া বন্ধ। ঘুমের ঘোরে আছে নাকি অসুস্থ বোঝা দায়। আয়দান নিষ্পলক তাকিয়ে রইল বড় ভাইয়ের অসহায় অবয়বের পানে।

মৃদু পদধ্বনি শুনে আয়দান মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল অপর প্রান্ত বেয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসছেন পিতা, জাফর আরেফিন। স্যুট বুট পরনে, হয়ত সকালে বৃষ্টি কমতেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছিলেন। মাত্রই পৌঁছেছেন। রুমের সামনে এসে থমকে গেলেন জাফর। সুচারু নয়নে একনজর মেঝেতে গুটিশুটি দিয়ে থাকা জায়দান এবং আরেক নজর আয়দানকে দেখলেন। অতঃপর কাউকে কিছু না বলে হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে এলেন।
জায়দানের ফিনফিনে পাতলা শরীরটা পাপস থেকে নিজের বাহুর মাঝে তুলে নিলেন পিতা। বুকে ঠেকিয়ে চেপে ধরে নিঃশব্দে উল্টো ঘুরলেন। হাঁটতে শুরু করলেন দুই তলার রুমের দিকে। থামলেন খানিকটা সময়ের জন্য। পিছনে তাকিয়ে আয়দানকে বললেন,
“ঠান্ডা লাগবে। ভেতরে গিয়ে আম্মুর সাথে শুয়ে থাকো, যাও।”
অতঃপর আর দাঁড়ালেন না জাফর। বড় ছেলেকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে আড়াল হয়ে গেলেন দৃষ্টিসীমার।

বর্তমান।
একটা ঝটকা খেয়ে ঘুম ভেঙে গেলো আয়দানের। ধড়ফড় করে উঠে এদিক সেদিক তাকিয়ে বুঝতে পারল গাড়িটা কোথাও বাম্প করেছে, এই কারণে ঝাঁকি খেয়েছে সে। গাড়িতে উঠে পিছনের সিটে বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ দুখানা লেগে এসেছিল টের পায়নি সে। গভীর ঘুমের ঘোরে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে। অবশ্য, অতীতের কোনো স্মৃতিচারণকে আদও দুঃস্বপ্ন বলা যায় নাকি তার জানা নেই। লম্বাটে আঙুলে চোখ কচলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করলো সে। বুঝতে পারল, হাসপাতালের কাছাকাছি এসে পড়েছে।
জেসমিন স্ট্রোক করেছেন খবরটা শোনার পর থেকেই অস্থিরতায় টিকতে পারেনি আয়দান। সে জানতো, এবার তাকে আইনের বেড়াজালে আটকে রাখার আর কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মীরা নামক মেয়েটাও পুলিশের কাছে এসে কোনোপ্রকার জবানবন্দী দেয়নি কিংবা মামলা করেনি। সবটাই কাজ করেছে আয়দানের পক্ষে। পুলিশের কাছে তাকে বিনা দোষে ধরে রাখার কোনো কারণ নেই আর। উল্টো উকিল লাগিয়ে দিলে তারা বিপাকে পড়তে পারে। জাফর হালকা কলকাঠি নাড়তেই আয়দান তাই মুক্ত হয়ে গিয়েছে। মুক্ত সে শুরু থেকেই অবশ্য ছিল, শুধু কিছু ঘণ্টার ব্যাপক ভোগান্তি হয়েছে।

এই মুহূর্তে ঠিক কোনপ্রকার অনুভূতিই টের পাচ্ছেনা আয়দান। জেসমিনের চিন্তায় হয়ত অন্য সকল অনুভূতি ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। কেমন একটা ভোঁতা যাতনা ছড়িয়ে আছে তার বুকজুড়ে। কোথাও গিয়ে কিছু একটা আজীবনের জন্য তার কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছে। এই বোধটুকু হাজার চেয়েও সে মন থেকে সরাতে পারছেনা।
ফ্রন্ট মিররে প্রতিফলিত হতে থাকা ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা নিজের পিতার অবয়ব দেখল সে। জাফর আজ নিজেই ড্রাইভ করছেন। তাকে থানা থেকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন।
“মাম্মি, ঠিক আছে তো, তাইনা?”
অবশেষে আমতা আমতা করে প্রশ্ন করেই ফেলল আয়দান। জাফর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আনমনে জবাব দিলেন,
“হুম।”

নিজের চিরায়ত রূপে ফিরতে চাইলো আয়দান। এমন বোবা অনুভূতি নিয়ে জ্বলতে ভালো লাগছেনা তার। হাতটা মুঠো পাকিয়ে গাড়ির দরজায় হালকা ধাক্কা বসিয়ে সে খেঁকিয়ে উঠল,
“সবকিছু ভাইয়ার দোষ! আমি তোমাকে বলে রাখছি আব্বু, আমার মাম্মির যদি কিছু হয়েছে তাহলে আমি ভুলে যাব জায়দান আরেফিন আমার বড় ভাই হয়! তুমিও আমাকে আটকাতে পারবেনা!”
জাফর কোনো কথা বললেন না। নীরবে গাড়ি চালিয়ে গেলেন। সিটে হেলান দিল আয়দান। হুমকি দিয়ে এখন একটু শান্তি লাগছে। বরাবর এমনটাই হয়ে এসেছে। গোটা পরিবারের বলির পাঁঠা একজনই। কেউ কোনোদিন না এর বিরোধিতা করেছে, না করেছে প্রতিবাদ।
“তুমি জানো?”
হঠাৎ করে জাফরের গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল আয়দান।
“কি জানবো?”

জাফর খানিকটা সময় নিলেন। গাড়ি সাবধানে মূল সড়ক থেকে নামিয়ে হাসপাতালের সামনের সড়কে ঢোকাতে ঢোকাতে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবে জানালেন,
“তুমি যখন বান্দরবানে পাহাড় থেকে পড়ে গিয়েছিলে, তখন তোমার আহত শরীরটাকে পিঠে তুলে হাফ কিলোমিটার পথ পায়ে ছুটে নিয়ে এসেছিল তোমার দশ বছরের বড় ভাইটা। কারণ হাফ কিলো ছুটে এসে খবর দিয়ে আবার হাফ কিলো দৌঁড়ে গিয়ে তোমাকে বাঁচাতে বাঁচাতে তোমার মৃ*ত্যু হয়ে যেতো।”
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো আয়দান। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলনা। নির্বাক হয়ে গেল সম্পূর্ণ। জাফরের চেহারা অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক। যেন তিনি নিজের ছোট ছেলের জীবনের চরম সত্যটা মাত্র উগড়ে দেননি! মিররে বাকরুদ্ধ সন্তানকে এক নজর দেখে জাফর মৃদু আঁচে বললেন,
“অথচ হি ইয জাস্ট আ মনস্টার টু ইউ।”
কয়েক মুহূর্ত কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া করতে পারলোনা আয়দান। অতঃপর ঝুঁকে এসে কাঁপা কন্ঠে গর্জে উঠল,
“আ…আব্বু…! ইউ জাস্ট কান্ট ডাম্প মি লাইক…!”
“আমরা এসে পড়েছি।”

জাফর তাকে কোনোপ্রকার সুযোগ দিলেন না। গাড়ি পার্ক করে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। নিজের সিটে দ্রুততর হৃদস্পন্দন নিয়ে বসে থেকে শেষমেষ বাইরে এলো আয়দানও। সজোরে গাড়ির দরজা আটকে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ হাসপাতালের বিল্ডিংটার দিকে তাকালো। বুকের ভেতর সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ক্রমশ শক্ত করে তুললো তার দুহাতের মুঠি।
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল, সেই ঝড়ের রাতের পর থেকে আর কোনোদিন সে জায়দানকে বজ্রপাত ভয় পেতে দেখেনি।

শীতের সন্ধ্যা হবে হবে। ফেব্রুয়ারীর গায়ে কেটে বসা ঠান্ডা মারাত্মক। সমস্ত শরীরকে জমিয়ে দেয়। কমলাভ বর্ণে আকাশ রঞ্জিত। সময়ের আর হিসাব নেই আমার কাছে। কোথায় কোথায় ঘুরে বেরিয়েছি জানিনা। আজ আমার বিশেষ কোনো ঠিকানা নেই। এই সড়কই যেন ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে যাওয়া অন্তরের একমাত্র আশ্রয়স্থল। কোন কূলে গিয়ে ভিড়বে এই জীবনতরী, সে নিজেই অজ্ঞাত।
একফোঁটা পানি কিংবা এক বিন্দু খাবারও পেটে পড়েনি। অথচ নেই তৃষ্ণা কিংবা ক্ষুধার জ্বালা। মোহর পড়েছে যেন সকল চাহিদায়। দিশাহারা এই অন্তরের বিশেষ কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। আমি এক শূণ্য আজ। মহাশূন্যে ছুটে চলা উচ্ছল পতঙ্গ।
ঠিক কখন জড়তায় ঘেরা পা দুখানা টেনে বাসায় পৌঁছেছি জানিনা। বাইরের শীত আমার বুকে বসে গিয়েছে। খানিকটা কাশতে গিয়ে টের পেলাম গলা ভেঙে গেছে। সে যাক। যার যাওয়ার তাকে তো আর জোর করে ধরে রাখা যায়না!

বাসার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে প্রথমে পোশাক বদলালাম। হাত মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গেলাম। আনমনে চায়ের পাতিল বসিয়ে দুধের কৌটো বের করলাম। মীরাকে ভালো কিছু খাওয়ানো দরকার। এমন চিন্তায় মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখতে চাইলাম। গতকালের ব্রেড ফ্রিজ থেকে বের করে তাওয়ায় সেঁকে একটা ডিম ভাঁজি করে দিলাম। অতঃপর গ্লাসে গরুর দুধ নিয়ে কাউন্টারে রেখে ধীরপায়ে গেলাম মীরার রুমে। নিজের কন্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক শোনাতে গলা পরিষ্কার করে ডাকলাম,
“বাইরে আয় মীরা, নাস্তা খেয়ে এরপর কথা বলব আমরা।”
ভেতর থেকে জবাব এলোনা। বিষয়টা স্বাভাবিক হলেও নিজের অতি সতর্ক হয়ে ওঠা মন আর কোনোকিছুই স্বাভাবিকভাবে নিতে চায়না। সহসাই দরজা ঠেলে বিনা অনুমতিতে ভেতরে ঢুকে গেলাম।
মীরার বিছানা সম্পূর্ণ ফাঁকা। একদম টানটান করে গোছানো, কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। একপাশের আলনা একদম খালি। নেই কোনো ব্যবহার্য কাপড় চোপর। এমনকি বাসা বদলানোর সময় মীরার কেনা বড় লাগেজটার অস্তিত্ব নেই রুমের কোথাও। থমকে গেলাম আমি। বুকের ভেতর ভারী একটা পাথর চেপে বসল যেন।
অতঃপর চোখ পড়ল আমার দৃশ্যটির উপর। সন্ধ্যার আবছায়া কমলা রশ্মি জানালা গলে বিছানায় পড়ছে। ঠিক সেখানটায় পেপারওয়েটে চাপা দিয়ে রাখা একটা কাগজ। ইচ্ছা হলনা সেটা দেখার। কারণ আমি উপলব্ধি করতে পারছি ওটা কি।
অবাধ্য পা দুটো আমায় টেনে নিলো ভেতরে। বসলাম বিছানায়। কাঁপা হাত বাড়িয়ে তুলে নিলাম কাগজটা। মীরার গোটা গোটা হাতের লিখায় পূর্ণ এক ছোট্ট পত্র।

॥ প্রিয় সাবিন,
আমি আজ নিজের কাছে নিজেই পরাজিত হলাম। জীবনে বাবা মায়ের পর আমি সবথেকে বেশি যে মানুষটাকে ভালোবেসেছি, সেটা হলি তুই। অতঃপর আমার জীবনে আরো একটা মানুষ এলো। যাকে কোনো কারণ ছাড়াই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। এতটাই অন্ধ ভালোবাসা যে চোখের সামনে তার অপারগতা থাকলেও কোনোদিন দৃষ্টি মেলে সেসব দেখতে চাইনি। আজ আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তার অর্ধেক দায় হলেও আমার নিজের। তুই একদম সঠিক ছিলি। ভুলটা আমারই।
আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি জানিনা। জানলেও তোকে বলতাম না। তুই শুধু এটুকু জেনে রাখ, আমার এই নির্বাসনে তোর কোনো দোষ নেই। দোষ সম্পূর্ণই আমার। নিজের প্রায়শ্চিত্ত করা প্রয়োজন, সঙ্গে প্রয়োজন গুছিয়ে নেয়া। আমি নিজেকে সময় দিতে চাই। আমার চিন্তারা সব এলোমেলো হয়ে আছে রে। গুমড়ে গুমড়ে এই বোঝা বইতে থাকা আর সম্ভব হচ্ছেনা। তুই মন খারাপ করিস না। তুই অনেক চেষ্টা করেছিস। কিন্তু, ঐযে বললাম? আমি পরাজিত হয়েছি? এই পরাজয়ের গ্লানি অঙ্গে মেখে তাই আমি বিদায় নিচ্ছি, অনির্দিষ্টকালের জন্য। আমাদের স্বপ্নের ক্যাফে আজ থেকে তোর নামে তোলা রইলো। অনেক সুন্দর করে আমাদের দুজনের স্বপ্নটাকে বাস্তব করে তুলবি, কেমন? আমি জানি, তুই পারবি। কারণ তুই তো আমাদের স্যাভেজ সাবিন!
আমাকে খুঁজিস না। খুঁজলেও পাবিনা। শুধু তোর অন্তরে আমার যে জায়গাটা, সেটা আজীবন রেখে দিস। কে বলতে পারে? হয়ত কোনো একদিন হঠাৎ করে উদয় হয়ে খিলখিল করে হেসে বলে উঠব,
মিসড মি, ডার্লিং?
ইতি,
তোর ব্যর্থ বান্ধবীটা ॥

ঠোঁটের কোণে নিদারুণ এক হাসি ফুটলো আমার। একটুও আর কান্না পেলো না। সবটুকু অশ্রুজল যে ফুরিয়েছে কখন! বুকের ভেতর থেকে চাপটা সরে গেলো। এর বদলে তৈরি হলো ফাঁপা শূন্যতা। বিছানায় এলিয়ে দিলাম নিজেকে। বুকে চেপে ধরে রাখলাম চিঠিটা। আমার জীবনে সর্বশেষ কাছের মানুষটার শেষ স্মৃতি! জানালা গলে চোখে এসে লাগল কমলাভ আভা। চিকচিক করে উঠলো আমার দুই নয়ন। অদূরে ক্রমশ কালো হয়ে আসতে থাকা আকাশ দেখে ভাবলাম, এই আঁধার পৃথিবীতে নয় বরং আসছে আমার জীবনে। চিঠিটা আঁকড়ে ধরলাম বুকের মাঝে, ফাঁপা শূন্যতাঘেরা দেয়ালের মাঝে শুয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলাম,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৫

“শেষমেষ তুইও আমায় একা ফেলে চলে গেলি?”
শক্ত একটি ঢোক গিললাম। চোখ বুঁজে ফেললাম, ভেতরে আটকা পড়ল অশ্রুরেখা।
“তোরা সবাই এত স্বার্থপর কেন মীরা?”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here