সাঁঝের মায়া পর্ব ১১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
আমরা যেটা চাই,যেভাবে চাই,যাকে চাই বা যে আমাদের চায় সবটা কি সবসময় মনমতো হয়!হাতে থাকে আমাদের? থাকেনা বোধহয়। এ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ হয়তো বহু আগে নির্ধারণ করা হয়ে গেছে।মনটা নিজেদের সাথে যখন বেইমানি শুরু করে আমাদের হাতে থাকে তখন সেটা সামলানোর?উহু থাকেনা হয়তো।মনে প্রাণে আমরা হয়তো মস্তিষ্কের কথা শুনতে চাই,কিন্তু সব কিছুর বিপরীতে গিয়ে মস্তিষ্ক আর হৃদপিন্ড টার যে যুদ্ধ শুরু হয় সেটার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয় মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড দুটোই।তবুও এরা থামে কোথায়?
তিতির বিছানায় পা ঝুলিয়ে দু হাত পিছনে বিছানার ওপর রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে।আজকে দুপুরে যেটা হয়েছে ছাঁদে সে কিছুতেই সেটা ভুলতে পারছে না।যতবার ভুলতে চাচ্ছে ততবার বুকের ভিতর দুড়ুমদুড়ুম শব্দ টা আগের থেকে দ্বিগুণ আওয়াজ শুরু করছে।এটা একটা সমস্যাই বলা যায়।
তিতির ঠাস করে শুয়ে পরলো বিছানায়।ভেসে উঠলো ইশানের ঘামে ভেজা শরীরের ছবি,মাতাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ওই ঘোলা চোখ দুটো।ধ্যাত কি সব ভাবছে।ওই লোকটাকে নিয়ে ভাবা রীতিমতো অন্যায়।ভাই হয় তার ওটা।তাছাড়া রাহাত ভাই…বুকের ভিতরটা আবসর ধকধক শুরু করে দিলো। রাহাত ভাইয়ের কথা মনে পরতে কি. তা তো মনে হচ্ছে না।স্পষ্ট চোখের সমানে ইশান ভাই এর মুখটা ভেসে উঠছে।চোখ বন্ধ করলো।নাহ হচ্ছে না।যতবার রাহাত ভাইয়ের মুখটা আনতে চাচ্ছে ততবার এই লোকটার মুখ আসছে।কেনো হচ্ছে এমন…
হঠাৎ দরজা সটানে খুলে যাওয়ায় লাফিয়ে উঠলো তিতির।দরজায় দাড়ানো মানুষ টাকে দেখে একগাল হেসে দু হাত বাড়িয়ে দিতেই সে মানুষ টাও এসে একপ্রকার ঝাপিয়ে পরলো তিতির এর ওপর।তিতির তাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো পুরো।খিলখিল হাসির আওয়াজে ভরে গেলো রুমটা।
“কত্তোদিন পর তিতিইইইইর….
“ সর আল্হাদ করতে হবে না।আমি ভাবলাম ভুলে গেছিস আমাকে।আমি এসেছি পাঁচ দিন হলো।আর আজ আসছিস।”
তমা দু গাল টিপে ধরলো তিতির এর।আহ্লাদী গলায় বললে,”অ্যাম সরি সোনা।বিশ্বাস কর বাসায় ছিলাম না আমি।নানুবাড়ি থেকে এসেছি বিশ মিনিট।মা যে মূহুর্তে বলেছ তুই এসেছিস।এই দেখ জামা টাও চেঞ্জ করিনি।ছুটে চলে এসেছি।”
তিতির নিজেও ঝাপটে ধরলো তমা কে।তমা তার সম্পর্কে মামাতো বোন।পাশের বাসার।তমার বাবা তিতির এর মামাদের আপন চাচাতো ভাই।তিতির আর তমা ছোটবেলা থেকে হরিহর আত্মা একদম।একসাথে বড় হওয়া,প্রাইমারি স্কুল লেভেল, হাই স্কুল লাইফের একাংশ।তাছাড়া বাড়িতে যতক্ষণ থাকে এদের আলাদা করা দায়।এখন সময় পাল্টেছে। হয়তো সময়ের সাথে একসাথে থাকার সময়ের পরিবর্তন এসেছে তবে দুজনের বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা একফোঁটাও কমেনি।আজও দুজনই ভার্সিটি ছুটি হলেই প্ল্যান করে একসময় বাড়িতে চলে আসে।
তিতির শুকনো চুমু দিলো তমার গালে।একগাল হাসলো।,”জানি আমি। তুই ছিলি না।মাফ করলাম তাই।”
“ধন্যবাদ বার্বিডল।”
তিতির একছুটে গেলো নিজের স্যুটকেস এর দিকে।বেস্টুর জন্য নিয়ে আসা গিফট একরকম ছুড়ে দিলো তার কোলে।
“খবরদার এখন খুলবি না।”
তমা মুখ বাঁকালো।”আমি এখনই দেখবো।”
তিতির চোখ গরম করে তাকাতেই জিনিসটা রেখে দিয়ে গা ঘেষে বসলো তমা।মুখ টপে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
“তোর রাহাত ভাউয়ের কি খবর সেটা বল।”
তিতির এর মুখটা কেমন যেনো গম্ভীর হয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গেই।কেনো এমন হলো সে সেটা জানেনা।
“সিঙ্গাপুর গেছেন উনি।”
“তোকে ছাড়াই!একেবারে হানিমুনের জন্য চলে যেতি।”
তমার কথা গায়ে মাখলো না তিতির।অন্য বার হলে হয়তো এটা নিয়ে খুব ইয়ার্কি চলতো বেশকিছুক্ষন।আজ ইচ্ছে হচ্ছে না।এর আগে যতবার এসেছে তমা তাকে আর রাহাত ভাইকে নিয়ে ক্ষেপাতো।তবে তখন তো একদমই কিচ্ছু ছিলো না।এখনও নেই,তারপর রাহাত ভাই এখন যেমন অ্যাপরোচ করেছেন তখন তো জাস্ট তার প্রতি কেয়ার ছাড়া আর কিচ্ছু প্রকাশ রাশ করতো না।
ঠোঁট উল্টালো তিতির,”যা তা বকিস না।”
“ওহ্ তুমি তলে তলে টেম্পো চালাও আমি বললেই হরতাল। “
তিতির তমার ঘারে হাত দিয়ে টেনে শুয়ে পরলো বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে।
“সেটা নয়।কাহিনি ঘটে গেছে।সেটা তোকে বলিইনি এখনো।”
তমা কুনুইএ ভর দিয়ে কাত হয়ে তাকালো তিতির এর দিকে।
“হানিমুনে এ গেছিলি? “
“ধ্যাত তা না।উল্টাপাল্টা বকিস না।শোন আগে।”
“এটা প্লিজ বলিস না বাচ্চা আছে তোদের।”
তিতির তপ্ত চোখে এক নজর তাকালো তমার আগ্রহভরা হা করা মুখের দিকে।ওর তাকানোর অবস্থায় হাসি পেলো ওর।মুখ ঘুরিয়ে সোজা তাকালো সিলিং এ-র দিকে।
“বাজে বকিস না।রাহাত ভাই আমাকে বিয়ে করতে চায়।”
“কিইইইইই”
তমা লাফিয়ে উঠলো পুরো।তিতির এক হাত ধরে টেনে বসালো তাকে।চেপে ধরলো মুখটা।
“আস্তে ভাই।”
“এত্তো বড় কথা।এত্তো বড় কথা আমাকে তুই এতক্ষন না বলে বসিয়ে রেখেছিলি।”
“আসলি তো কিছুক্ষণ। প্রথম কথাতেই তো বললাম।”
তমা মাথা নাড়লো দু দিকে।”সবটা বল।খুলে বল।সব খুলে বল।”
“থাম বলছি।”.
তমা একপ্রকার হাপাচ্ছে উত্তেজনায়।হা করে তাকিয়ে ঠেলে তাগাদা দিতে লাগলো তিতির কে সব বলার।
“আসার আগের দিন রাতে হুট করে সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।”
তিতির কে এতটুকুন বলেই থামতে দেখে বিরক্ত হলো তমা।
“কষা রুগীর মতো থেমে থেমে না বলে সবটা বল না বাল।”
“আন্টি হজ্বে গিয়েছেন।ওখান থেকে ফিরলে আমার বাড়িতে আসবে মামাদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে।”
“ওয়াহ্ জানেমান।কি সুইট…তুই কি বললি তারপর”
তিতির চোখ বুঝলো।”কি বলবো আর।বলেছি আসুন। তারপর পরিবার কে জানান।তারা যা বলবে তাই।আমার কোনো মতামত নেই।সম্মান করি আপনাকে,কিন্তু ভালো হয়তো এখনো বাসিনা।ভালোবাসা কাকে বলে সেটা অনূভব করিনি।”
তমা নিজেও মাথা নাড়লে।”তাকে না মানার কারণ নাই।পারফেক্ট প্যাকেজ একটা।ওরম ছেলে পেলে সাথে সাথে তিনশ কবুল পরে ফেলবো। ইউ আর লাকি ভাই।গড ব্লেলসড্ ইউ বোথ মাই লাভ।আর ভালোটালো এক্কেরে বিয়ের পর বাসবি।ওরম ছেলে পেলে রাত দিন বুকে নিয়ে ভালোবাসা যায়।”
তিতির নিজেও হাসলো।সত্যিই তাই।রাহাত ভাই একটা পারফেক্ট মানুষ। যেকোনো মেয়ের লাইফ পার্টনার এমনই হওয়া উচিত। তমা রাহাত ভাই সম্পর্কে সবটাই জানতো বরাবর। রাহাত জানানোর অনেক আগে থেকেই তিতির আন্দাজ করেছিলো সবটা।মেয়েদের সিক্সড সেন্সস বলে কথা।
এই মূহুর্তে নিজের রুমে যাচ্ছিলো ইশান।রাহাত ভাই নামটা শুনেই থেমে গেলো ইশান।না চাইতেও কানে গেলো কিছুটা।রাহাত নামটা সে এই মেয়ের মুখে বেশ কয়েকবার শুনেছে।এই মেয়ের ফোনে কল আসা থেকে শুরু করে এখন তমার কাছেও একে নিয়ে গল্প করা হচ্ছে। ইশান ভ্রু কুচকে দাড়িয়ে থাকে।খিলখিল হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে রুমের ভিতর থেকে।কেনো যেনো রাগ হচ্ছে তার।কেনো হচ্ছে রাগ।হওয়া উচিত কি!কারণ আছে কোনো!হয়তো আছে,হয়তো নেই।কে জানে!
রাইসুল দেওয়ান এবং তার স্ত্রী রাহেলা দেওয়ান এই মূহুর্তে বসে আছেন চন্দ্রা দেওয়ান এর কামড়ায়।পরিবেশ ভয়াবহ থমথমে।এর কারণ তারা দুজন বুঝতে পারছে না।কেনো জরুরি তলব করা হয়েছে,আর কেনোই বা তখন থেকে তাদের মা এমন পাথর হয়ে স্থির দৃষ্টি জানালার দিকে দিয়ে বসে আছেন।সুমি দেওয়ান এগিয়ে গিয়ে বসলেন শাশুড়ীর পাশে।পাশের বেড সাইট টেবিল থেকে গরম তেলের বাটি হাতে নিয়ে আলতো হাতে মালিশ করতে লাগলেন পায়ে।তিনি নড়চড় করলেন না একদম।রাইসুল দেওয়ান এবার খানিকটা গলা পরিষ্কার করলেন কেশে।ধীর গলায় ডাকলেন মাকে।
“…মা?”.
চন্দ্রা দেওয়ান তাকালো এবার ছেলের দিকে।এক হাতে ইশারা করলেন কাছে গিয়ে বসতে।রাইসুল সাহেব বসলেন। মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে।
চন্দ্রা দেওয়া বউমা কেও রাখতে বললেন তেলের বাটি।চুপ করে সামনে বসতে বললেন।রাহেলা দেওয়ান বসলোও তাই।চন্দ্রা দেওয়ান তাকালো পরপর দুজনের দিকে।
“তোমাদের সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।”
রাইসুল সাহেব সাথে সাথে উৎসাহ নিয়ে মাথা নাড়লো।
“বলো মা।”
তিনি খানিকটা দম নিলেন হয়তো।
“আমি যা বলবো তার সাথে তোমরা একমত নাও থাকতে পারো।আমার কথা তোমাদের মতের সাথে নাও মিলতে পারে।”
“মা আপনি যা বলবেন কোনোটাই আমাদের… “
ছেলের বউকে এক হাত তুলে থামতে বললেন তিনি।
“শেষ করতে দাও সবটা।তারপর তোমাদের মতামত ও শুনবো।”
স্বামী স্ত্রী দুজনেই মাথা ঝাকালো।
“বাকিদের না ডাকার কারণ আছে।ডাকিনি কেনো ভাবছো হয়তো।তারও কারণ আছে।দরকার তোমাদের দুজনকেই। ইশান কে নিয়ে কথাটা।”
দুজনেই তাকিয়ে রইলো মায়ের পরের কথা শোনার জন্য।
“ ইশান দাদুভাই এর বিয়ে ঠিক করলে তোমরা।এতো বড় সিদ্ধান্ত তোমাদের মনে হলো না আমাকে জানানো দরকার? আমি বেচে আছি এখনো?নাকি গুরুত্ব টা আর… “
“মা এটা কি বলছো।তোমার মত না নিয়ে কিছু করবো এটা কিভাবে ভাবলে তুমি।”
“আমার কথা শেষ করতে দাও রাসু।বাড়ির বড় নাতি ও।আমার জান ও।অথচ তার বউ আসবে সেটা জানার অধিকার আমার নেই।ঠিকাছে সেটা বিষয় নয়।বিষয়টা সম্পূর্ণ অন্য।তোমাদের ছেলের বউ আসার কথা,কবে আসবে সে।”
রাহেলা দেওয়ানের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন এবার তিনি।
“মা মেয়েটার বাবা অসুস্থ। তাছাড়া কাল রাতে ইশান কে জিজ্ঞেস করতেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে না করলো।এখন নাকি আবার বিয়ে নিয়ে ভাবছে না।আর কিছু বললো না।”
চন্দ্রা দেওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললো।এই খবর জানে সে।কাল রাতেই অণিমার থেকে শুনেছে সে।হাত বাড়িয়ে একটা ডায়েরি হাতে নিলো।ছলছল চোখে তাকালো।
“এটা তনয়ার ডায়েরি।”
তনয়া নামটা কানে আসতেই স্বামী স্ত্রী দুজনের চোখও ছলছল করে উঠলো।তিনি এক হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেন সুমির হাতখানা।”তনয়ার কথা মনে পরে বড়বউমা?”
রাহেলা দেওয়ান মাথা নিচু করে ফেললেন।টপটপ করে কয়েকফোটা পানি পরলো কোলের ওপর।তনয়া কে ভোলা সম্ভব। এ জীবনে সম্ভব?প্রাণের বান্ধবী কে ভোলা সম্ভব! যার হাত ধরে এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলো সে।এক আত্মা এক প্রাণ বলা হতো। ননদ,ভাবির সম্পর্কের আরও ষোল বছর আগে থেকে তাদের বন্ধুত্ব।তারপর সম্পর্কের প্রমোশন করে তনয়াই নিয়ে আসে ভাইয়ের বউ করে তাকে।এক মূহুর্তে থাকতে পারতো না কেউ কাউকে ছাড়া। চোখের সামনে ভেসে উঠলো প্রিয় মানুষ টার কাফনের কাপড়ে মোড়া নিষ্প্রাণ মুখখানা।বুকটা খা খা করে উঠলো।ভুলতে পারেনা সে সেই বিভৎস দিনটা।যেদিন তার হাতে হাত রেখে হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ছেড়েছিলো তার বোনসম ননদ,বান্ধবী টা।
“আমি ওকে এ জীবনে ভুলতে পারি মা?”
চন্দ্রা দেওয়ান চোখ মুছিয়ে দিলেন বউমার।সেটা সে জানে।বউমা আর আর তার মেয়ে একে অপরের জন্য ঠিক কি ছিলো।
“তোমার শশুর আর তনয়া দুজনেই আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।আশ্চর্য হলেও একটা কথা কি জানো তাদের শেষ কিছু ইচ্ছের মধ্যে একটা ইচ্ছে মিলে গেছে।আমি নিজে খানিক অবাক হয়েছি।কিন্তু ইচ্ছে টা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছিলো।কিন্তু… “
“কিন্তু কিসের মা।বাবা আর তনুর সব ইচ্ছে আমি পূরণ করবো।তুমি একবার বলো।”
ছেলের কথায় হাসলেন হালকা।”
“,এখন মানবি কি না…ইশান আর তিতিরের…
চুপ করলেন কিছুক্ষণ তিনি,” ইশান আর তিতির এর বিয়ে।
রাইসুল দেওয়ান,রাহেলা দেওয়ান চমকে উঠলেন। হতবিহ্বল হয়ে গেলেন পুরো।
“চমকাচ্ছো?আমিও চমকেছিলাম।যখন তোমাদের বাবা তনু মারা যাওয়ার পর একদিন আমাকে বলেছিলেন। আমি হ্যা হু করলেও গুরুত্ব দেইনি।ওরা বড় হবে,ওদের পথ ওরা নিজেরা বেছে নেবে।আমাদের পুরানো যামানার চিন্তা ভাবনা,মতামত ওদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।কিন্তু…
চোখে আসা পানিটুকু শাড়ির আচলে মুছলেন তিনি।
“কিন্তু অবাক সেদিন হয়েছিলাম যেদিন তনুর এই ডায়েরিখান আমি খুঁজে পাই।”
হাতের ডায়েরি খানা রাহেলা দেওয়ান এর দিকে ঠেলে দিলেন তিনি।সুমি পাতা ওলটালেন।চিহ্ন দেওয়া পাতাটা বের করলেন।
পড়লেন,বেশ কয়েকবার হাত বোলালেন লেখাটুকুতে।টপটপ পানিতে ভিজে গেলো ডায়েরির পাতা।
“আমি যেদিন জানতে পারি তনয়ার ইচ্ছাও এটা ছিলো।সেদিন থেকে আমি কেমন একটা স্বার্থপর হতে শুরু করলাম বোধহয়। সবসময় মনে হতো ওদের দু’জনে বিয়ে হলে… ”
কঠিন দৃষ্টিতে তাকালেই দুজনের দিকে।”,আমি চাই তোমরা তোমাদের ছেলেকে বোঝাও।সে যেনো তিতির কে বিয়ে করেন।তোমাদের বাবা আর তনয়ার শেষ ইচ্ছে টা আমাকে মৃত্যুর আগে পূরণ করে যেতে পারি।”
দু’জনে থ হয়ে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে।
“আমি জানি তোমাদের মত হয়তো নেই।কিন্তু আমি তবুও চাই।এখন এটা আমারও শেষ ইচ্ছা বলতে পারো।”
রাহেলা দেওয়ান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। হয়তো প্রিয় বান্ধবীর স্মরণে, তার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে পেরে।
“বউমা,ডায়েরিটা তুমি রাখো।আমাকে এখনি জবাব দিতে হবেনা তোমাদের। আজ রাতে ডায়েরি টা পরো।তোমাকে না বলা অনেক কথাই এখানে লিখে গেছে তনু।ক্ষমা করো আমাকে।আমি পড়েছি,আমি চাই তুমিও পড়ো।তারপর না হয় কাল তোমাদের দুজনের সিদ্ধান্ত আমি জানতে চাইবো।আর তোমাদের ছেলেকে আমি নিজেই বলতে চাই।তবে তার আগে তোমাদে…
রাইসুল দেওয়ান মায়ের হাত মুঠে করে ধরলো।
“আমার বা রাহেলার কারোরই কোনো অভিযোগ নেই মা।”
প্রশ্ন চোখে তাকালো স্ত্রীর দিকে।সুমি দেওয়ান মাথা উপর নিচ করলেন।
“আমার আর রাহেলার সিদ্ধান্ত আমরা এখনই জানিয়ে দিলাম মা।আমাদের কোনো কিছু বলার নেই।তুমি যা ভালো মনে করবে সেটাই।আর ইশানের সাথেও তুমি কথা বলতে পারো।আমার মনে হয় না ইশান তোমার কথা ফেলবে। “
চন্দ্রা দেওয়ান মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।তিনি জানতেন তার পুত্র বা পুত্র বধূ কেউই দ্বিমত করবেন না।তবে ইশানকে নিয়ে যে বেগ পেতে হবে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন।তবে অনিমার মুখে তিনি শুনেছেন তার দাদুভাই যে মেয়েকে পছন্দ করতেন সে মেয়ে কোনো কারণে এখন সম্পর্কটা আর চাচ্ছেন না।নাতির বন্ধুবান্ধবগুলোর এ বাড়িতে সেই ছোটবেলা থেকে যাতায়াত। তার সাথেও তাদের বন্ধুর মতোই সম্পর্ক।তিনি তাই অনিমাকে বলেছিলো ইশানের পছন্দ সম্পর্কে জানতে,এটাও সত্যি ইশান এর সাথে যদি রুষার সম্পর্কে এই ফাটল না আসতো সে তিতির এর কথা তুলতেন না।মৃত্যু অবধি মনেই চাপা রেখে যেতেন।কি লাভ মনের ওপর বৃথা জোর খাটিয়ে যে মনে অন্য কেউ।তবে অনিমার কথায় সে স্পষ্ট টের পেয়ছে তার নাতি সে মেয়েকে ভালোবাসেনি।তাহলে সমস্যা কোথায় তিতির কে বিয়ে করতে।তিতির এর মতো মেয়েকে সে নিশ্চয়ই না ভালোবেসে পারবে না।
সাঁঝের মায়া পর্ব ১০
রাইসুল দেওয়ান আর রাহেলা দেওয়ান বেড়িয়ে গেলে নিরবে গড়িয়ে পরা চোকের পানিটুকু সযত্নে মুছ ফেললেন সফেদ শাড়ির আচল দিয়ে।মেয়ে, মেয়েজামাই কে হারানোর পর এই ছোট্টো পুতুল টাকে তারা সযত্নে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। ছোট্ট থেকে এ বাড়ির সবার থেকে বেশি আদরে মানুষ হয়েছে তিতির।চোখের মণি সক্কলের।তাকে এ বাড়িতেই আজীবন রাখতে পারলে ক্ষতি কি।আর যেখানে দু দুটো মৃত্যু মানুষ এর শেষ ইচ্ছে এটা…তিনি বুক ভরে শ্বাস নিলেন।হেলান দিয়ে চোখ বুঝে ফেললেন। তার দাদুভাই রাজি হবে তো তার পুত্তুল টাকে বিয়ে করতে
