Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ২৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৬

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৬
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

হসপিটালে আইসিইউ এর বাইরে ভোররাত থেকে বসা রাহাত।এখন সাড়ে সাতটা।বাইরে ঝলমলে রোদ।তবে কতক্ষণ এই আবহাওয়া স্থায়ী হবে বলা যাচ্ছে না।তার গায়ে এখনো রাতের ভিজে জবজবে হয়ে যাওয়া শার্টখানা।এখন অবশ্য ভেজা নেই সেরকম। গায়েই শুকিয়ে এসেছে। চোখজোড়া রক্তলাল। মাথা ভার হয়ে আছে,সম্ভবত জ্বর এসে গেছে।রাহাত নিজেও অনূভব করছে সেটা।তার মা রানী বেগম কে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে সন্ধ্যা রাতে।সব জোগাড় করে অপারেশন শুরু করেছে রাত চারটের দিকে।অবস্থা সংকটাপন্ন। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা। এখনো অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়নি ডাক্তার।রাহাত দু হাতে মুখ ডলে।খোদার কাছে আক্ষেপ জানানো উচিত কি না বুঝতে পারে না।অনেক ছোটবেলায় বাবা কে হারিয়েছে।তারা তিনভাইবোন।সে সবার বড়।বাকিরা আরও ছোট।ছোট বোনটা তো তখন ছয় মাসের।জীবনে এই এক মা”ই ছিলো যে আজীবন আগলে রেখেছে তাদের তিনজনকে।পরিবার,পরিজন, আত্মীয় সজন সব বলতে এই মা’ই সম্বল তাদের।খোদা আজ সেই মা কেও মৃত্যুর মুখে নিয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে তাদের সাথে।আর তারা!তারা হাসিমুখে সেই পরীক্ষা দিচ্ছে।
ওটির দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে উঠে এগিয়ে গেলো রাহাত।ডাক্তার গম্ভীর মুখে তাকালো তার দিকে।

___”ইয়াং ম্যান।মাকে দেখে রাখতে হবে তো নাকি?আর একটু দেরি করে নিয়ে আসলে কি হতো বলো তো।”
___”এখন মা কেমন আছে?”
___”আউট অব ডেঞ্জার। তবে সেটা আপতত।”
মলিন মুখে মাথা ঝাকায় রাহাত।ডাক্তার কাঁধে হাত রাখে।
___”কয়েকদিন হসপিটালে অবজারভেশনে রাখবো।আপাতত রিলিজ দেয়ার কথা ভাবছি না কিন্তু। “
___”নো প্রবলেম…ভিতরে যেতে পারি?”
ডাক্তার সাহেব মাথা ঝাকায়।যেতে পারে।তবে কেবিন এ নেওয়ার পর।আধঘন্টার মধ্যে সব ঝামেলা শেষ করে রানি বেগম কে নিয়ে যাওয়া হলো কেবিন এ।এখনো জ্ঞান ফেরেনি।রাহাত নিজের ঘোলা চোখজোড়া মুছতে মুছতে আলতো হাতে দরজা খুলে প্রবেশ করে মায়ের কক্ষে।রানি বেগম জ্ঞানহারা তখনো।শব্দহীন চেয়ার খানা টেনে মায়ের হাত আকড়ে বসে পাশে।হাত দুটো ধীরেসুস্থে টেনে এনে ছোয়ায় নিজের কপালে।ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।
___”পুরুষ মানুষের কাঁদতে হয় না বলো মা?কেনো এ জঘন্য নিয়ম এ দুনিয়ায়?হ্যা?”
রানি বেগম ছেলের কথার জবাব দেয় না।রাহাত নিজের কপালে ডলে মায়ের নরমসরম হাতজোড়া।

___”আমার কি দোষ মা।তোমরা সবাই ছেড়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় কেনো নেমেছো বলো?জবাব চাই আমার।জন্মের পর হাতেগোনা কয়েকবছর বাবাকে দেখলাম।আজকাল তো চেহারাও মনে করতে পারি না। বাবা নামক সো লোকটার।গোটা একটা জীবন পার হয়ে গেলো।কোনো আত্মীয় সজন পেলাম না।মামা,চাচা, ফুপু কেউ নেই আমার। কেনো বলো?ভাই, বোন আর তুমি।এর বাইরে কেউ ছিলো না এ জীবনে।খোদা সেটাও ধরে রাখতে দিলো না আমাকে।এক নারী আসলো এ জীবনে। মনে হলো জীবন পরিপূর্ণ হলো।আমার জীবনে কিসের আক্ষেপ আর।তোমার পরে একজনকে এতো ভালোবাসলাম,জীবন উৎসর্গঃ করে ভালোবাসলাম।কি হলো জানো মা?সে না অন্য এক পুরুষ কে বিয়ে করে নিয়েছে।না না তার দোষ নয় একদমই।তাকে না জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।দোষ তো আমার মা।আমার ভাগ্যের।আমার পরী আমাকে জানাতে অনেক খুজেছিলো আমাকে।আমি হতভাগা ওর সাথে কেনো ওইকয়দিনে একবারও যোগাযোগ করলাম না মা।কেনো বলোতো।এখন আমি কি করি।তুমি এভাবে শুয়ে থেকো না মা।ওঠো।বলো কি করা উচিত আমার।আমার না অস্থির লাগছে মা,পাগল হয়ে যাবো আমি।মরে যাচ্ছি।তোমাকে শান্তি,সুখ সব দিতে চেয়েছিলাম মা।আমরা তো নিঃস্ব হয়ে গেলাম মা।আমি এখন কি করবো বলো?”
রানি বেগর সাড়া দিলেন না।তার নাড়ী ছেড়া ধন তার সামনে কলিজা চেড়া আর্তনাদে ব্যাস্ত।তিনি চোখ মেললেন না।কৃত্রিম মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে তার।হার্টবিট খুবই লো।কানে গেলো না তার কিচ্ছু।
চোখজোড়া মুছে হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে গেলো মায়ের কেবিন থেকে।মায়ের এই করুন অবস্থা সে দেখতে পারবে না।একদম পারবে না।

জানালার পর্দা ভেদ করে আলো গলে বিছানায় পরছে।সফেদ বিছানায় সোনালি আলোয় চকমক করছে একদম।তিতিরের মুখখানা জানালার দিক ঘোরানো।বিধায় সে আলো এসে তার সুশ্রী মুখখানায়তেই আশ্রয় নিয়েছে।কপালে সরু ভাজ পরে মেয়েটার।নাকমুখ কুচকে নাক ডলে যেখানটায় তার মাথা রাখা ছিলো।তবে চমকে ওঠে এবার।এটাকে বালিশ মোটেই মনে হচ্ছে না।ঝট করে চোখজোড়া খুলে ফেলে সে।মাথা উচুয় খানিকটা।ঈশানের উদাম বুকে পরে আছে সে।তার ছোটখাটো গোটা শরীরটাই ঈশানের ওপর। ঈশান আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে তার কোমড়জোড়া।বেঘোরে ঘুমুচ্ছে।তিতির লজ্জায় আড়ষ্ট হয়,নিজের শরীরে একটা সুতা অবধি নেই।তবে পাতলা চাদরে মোরা তার শরীরখানা।ঈশানের কোমড়ে কোনোরকমে পেচিয়ে আছে একটা তোয়ালে।রক্তিম মুখখানা ঘুরিয়ে নিজের তোয়ালে খানার খোঁজ করে।সেটা অবহেলায় বিছানা থেকে অদূরে পরে আছে।কোমড় ছড়ানো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ঈশানের হাতের নিচে আটকা পরা।তিতির নড়াচড়া করতেই হাতের বাধন দৃঢ় হয় ঈশানের।একপ্রকার খামচে ধরে মেয়েটার লতানো কোমড়খানা।তিতির ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিয়ন্ত্রণে রাখে নিজেকে।নড়াচড়া কমিয়ে ফেলে।মাথা তোলে ঈশানের মুখের দিকো তাকায়।কি নিষ্পাপ মুখখানা,বাচ্চাদের মতো ঘুমাচ্ছে।সে একটু নড়ে উঠলেই বাচ্চারা যেমন ঘুমের ঘোরে নিজের খেলনা আকড়ে রাখে সেভাবে আকড়ে ধরছে তিতিরকে।

তিতির মলিন হাসে।সে নিজেও তো খেলনাই।দেওয়ান সাহেবের খেলনা।খেলা হচ্ছে তাকে নিয়ে।হরিণি চোখজোড়ায় পানি জমে।টপটপ করে সেটা পরে ঈশানের নগ্ন বুকে।তিতির নিজের হাত ছেয়ায় ঈশানের গোটা মুখজুড়ে।আলতো হাতের পরশ বুলায়।কে বলবে এই পাষান লোক তার কাছে এলে হুশ খোয়ায়,দু দুটো রাত একসাথে ছিলো,দু বারই পাগলামো করেছে…প্রথম রাতে অবশ্য তার দোষই বেশি ছিলো।গতরাতেও তাই বোধহয়। তিতিরের হাসি পায়।পুরুষ মানুষের এই চাওয়া-পাওয়াকে ভালোবাসা মনে করা ভুল।রীতিমতো অন্যায় বোকামি।এরা ভালোবাসে অন্য নারীকে,অথচ হুশ খোয়ায় অন্য নারীর সান্নিধ্যে আসলে।মাথা ঝোকায় তিতির,ধীর গলায় বলে,

___”আমাকে ভালোবাসলেন না কেনো হুম?কেনো ভালোবাসলেন না।কেনো কাছে এসে দূর্বল করেন আমাকে?কেনো?শরীরের চাহিদায়?আপনি কাছে আসলে সেটা তো আমারও অনূভব হয়।কিন্তু এটা আমার জন্য কতটা অসম্মানজনক ভাবতে পারেন আপনি?স্বামী আপনি আমার, রাত কাটিয়ে এসেছেন অন্য নারীর সাথে,আবার আমার কাছে আসলেও আমাকে কাছে চান।এর মানে কি দাড়ায়?আমার শরীর আপনার চাই? হু?কেনো এমন করেন বলেন তো?”
তিতির খানিকসময় চুপ করে।কপাল ঠেকায় ঈশানের নরম ঠোঁটে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।ঈশানের ঘুমন্ত কন্ঠ শুনতে পাওয়া যায় আবার।

___”জান, ঘুমাতে দে।নড়াচড়া করছিস কেনো।উমমম?”
শরীর শিথিল হয় তিতিরের।কেঁপে ওঠে।এসব শব্দ তাকে কখনো বলেনি ঈশান।এখন কি তবে তাকেই বললো!নাকি ঘুমের ঘোরে অন্য কাউকে ভেবেছিলো!ঈশান ততক্ষণে তিতিরকে ওপরের দিকে টেনে তিতিরের কন্ঠদেশে মুখ গুজে ফেলেছে।তিতির নিজের শরীরের অস্বাভাবিক কম্পন খেয়াল করে।বুকের দ্রিমদ্রিম শব্দটাও জোরালো হয়েছে। ঈশান জোরে জোরে শ্বাস টানে।নাক ঘষে মেয়েটার কন্ঠদেশে।তিতির খামচে ধরে বিছানার চাদর।বেঁকে ওঠা শরীর নড়াচড়া করতে পারেনা ঈশানের শক্ত হাতের বাধনে।
___”ছাড়ুন আমাকে।উঠতে দিন।”
ঈশান মিটমিট করে তাকায়।পাশ ফেরে।তবে তিতিরকে ছাড়ে না।বুকের সাথে মিশিয়েই রাখে।তিতির নিজের মাথা টা সরাতে গেলে ঈশান এক হাতে ঘুরিয়ে দেয় মাথাটা।তারপর আবার সেই গলায় মুখ ডুবিয়ে অন্য হাতে কোমড় আকড়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়।তিতির স্তব্ধ হয়ে রয়।কান দিয়ে গরম ধোয়া বের হচ্ছে। এমন দূর্বল মূহুর্তে সে বরাবরের মতো শরীরের জোর হারাচ্ছে।সিলিং ফ্যানের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে সে।ডান হাত টা ঈশানের চুলে গলিয়ে দেয়।আলতো টেনে দিতে থাকে চুলগুলো।

___”এমন চলতে থাকলে সর্বনাশ হয়ে যাবে দেওয়ান সাহেব।খুব বড় সর্বনাশ হবে।আমি সেটা হতে দেবো না।নিজের সতিত্ব আমি হারাবো না আপনার কাছে।যে স্বামী নিজের স্ত্রী কে ছোয়ার আগে অন্য নারীকে ছুয়ে আসে দরকার নেই আমার সে স্বামীর।একদম দরকার নেই।এমন যদি কখনো হয় আমার মনে হয় সব মেনে আমি আপনার সাথে থাকতে চাচ্ছি,আমার বেহায়া মন আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছে আমি আত্মবিসর্জন দেবো প্রয়োজনে।নরকের বাসিন্দা হবো।তবুও আপনার তৈরি নরকে আমি ঠায় নেবো না।একদম না…”
নোনাজল অবিরত গড়িয়ে পরে চোখের কার্নিশ বেয়ে।ঈশানের গরম নিঃশ্বাসে কেঁপে উঠছে শরীরটা।বুক অবধি চাদর টানা তার।পেটের ওপর ঈশানের হাত জড়িয়ে।
ওঠা উচিত তার।কিন্তু পুরুষ মানুষের শক্ত বাধন থেকে নড়াচড়া করার মতো শক্তি তার নেই।তিতির আরেকদফা ঈশানের মুখ পরখ করতে চায়।সম্ভব হয় না।ঈশান উপুড় হওয়া।মুখটা তার কন্ঠদেশের ভাজে।মৃদু হাসে তিতির।

___”কি আশ্চর্য দেখুন না।মূহুর্তটা ছিলো আপনার মতো একই ভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে আপনাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আমারও একটা শান্তির ঘুম ঘুমানো।অথচ আমি পারছি না।আপনার স্পর্শে যে ভালো টা লাগার কথা তার থেকেও কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে অযাচিত যন্ত্রণা। আপনাকে হারিয়ে ফেলবো সেই যন্ত্রণা। আপনি কেনো বললেন আমার আগে অন্য নারীকে আপনি স্পর্শ করেননি হুম?কেনো বললেন?কোনটা বিশ্বাস করবো আমি?সেদিন ও তো সজ্ঞানেই ছিলেন…কালও তাই।এক মুখে দুই কথা কেনো আপনার?কি করবো আমি বলুন না,আপনার কোন কথা মেনে সামনে এগোবো আমি?জবাব দিন কি করা উচিত। “
খানিকটা দম নেয় সে।কান্না বুক চিড়ে বেড়িয়ে আসছে।চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। এমন মানসিক টানাপোড়েনে এ জীবনে পরেনি সে কখনো।

___”আমার কেনো যেনো আপনার কাল রাতের কথা টা বিশ্বাস করতে মন চাচ্ছে।কেনো বলুন তো।এতোটা ভালো কি করে বেসে ফেললাম আপনাকে?আপনি আমার জন্য বৈধ পুরুষ।তাই?বৈধতার রহমত এটা?রহমত?নাকি অভিশাপ। বলুন তো…আমিও দেখবো দেওয়ান সাহেব।আপনি কেনো এসব বলছেন,করছেন।আপনার বলা দু দুটো দিনের কথারই সত্যতা যাচাই করবো আমি।কালকের কথা যদি সত্য হয় গোটা জীবন আমি আপনার বুকে মাথা রেখে পারি দেবো, আপনার বিপদের ঢাল হবো,আপনার কষ্ট, দুঃখ সবেতে আমি আগে থাকবো সেসব আপনার থেকে দূরে করার জন্য,এক পৃথিবী ভালোবাসা দেবো।আর তা যদি না হয়…সেদিনের বলা কথাগুলো যদি সত্যি হয়।তবে এই তিতিরকে আপনি খুব বাজে ভাবে হারাবেন।গোটা পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব পাবেন না আর…কথা দেওয়া রইলো দেওয়ান সাহেব, কথা দেওয়া রইলো।”

এরপর দীর্ঘক্ষণ গোটা ঘরময় শুধুমাত্র দুটো মানব-মানবীর নিঃশ্বাস এর শব্দ পাওয়া গেলো।একজনের নিঃশ্বাসে রাজ্যের প্রশান্তি,অন্যজনের দীর্ঘশ্বাস… ঈশানের ঘুম এরইমধ্যে বেশ গাঢ়ো হয়েছে।সারারাত না ঘুমানোর ফল হয়তোবা।এবার বেশ সময় নিয়ে তিতির নিজেকে আলগা করলো ঈশানের হাতের বাধন থেকে।চাদর খানা কোনোমতে ধরে বিছানার কিনারায় এসে মেঝে থেকে তুললো তোয়ালে টা।দ্রুত হাতে গায়ে জড়িয়ে নিলো।এবার গায়ের চাদরখানা সুন্দরমতো ঈশানের গায়ে দিলো।রাতের ভেজা পোষাক শুকিয়ে এসেছে।ফ্রেশ হয়ে দ্রুত পরে নিলো জামাকাপড়। বালিশের তলা হাতড়ে নিজের সেলফোন খানা বের করে পার্স হাতে এসে দাড়ালো বিছানার সামনে।ঈশান নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছে।বিছানায় এক হাত ভর দিয়ে ঝুকে এলো ঘুমন্ত মুখটার দিকে।কপালে এলোমেলো হয়ে থাকা চুল গুলো সুন্দর করে সরিয়ে দিলো।নিজের শুষ্ক ঠোঁটের উষ্ণ চুমু একে দিলো ঈশানের ললাটে।

___”আমি আপনাকে ঘৃনা করতে পারছি না দেওয়ান সাহেব।কাল রাতে আপনার ওই স্বীকারোক্তির পর তো আরও না।তবে আমি কিন্তু ভুলে যাইনি কিচ্ছু। ভুলবোও না।শেষ অবধি দেখবো আমি।”
হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে চমকে উঠলো তিতির।ঘুমের বিঘ্ন ঘটায় কপালে ভাজ পরেছে ঈশানের।তিতির দ্রুত ফোনখানা হাতে নিয়ে সাইলেন্ট করে ফেললো।তবে কলে ভেসে ওঠা নামখানা দেখে কয়েক মূহুর্ত স্তম্ভিত হয়ে রইলো তিতির।ঈশানের ফোন এটা।ওপরে জ্বলজ্বল করছে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা নাম।রুষা…
তিতির কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা ধরে রাখে।দ্বিতীয় বারের মতো বেজে ওঠে আবার কলখানা।ঈশানের আবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার আগেই সাইলেন্ট করে ফেললে চাইলো, তবে চাপ লেগে রিসিভ হলো ফোনকলটি।
ভয়াবহ চমকে গেলো তিতির।ফোনের ওপাশ থেকে বেশ মিষ্টি একটা কন্ঠস্বর কানে আসছে।কন্ঠের মালিক যে বেশ সুন্দরী হতে পারে তা কেনো জানি মনে হলো তিতিরের।

___”ঈশান…হ্যালো।”
___”হ্যালো?”
এপাশে মেয়েলি কন্ঠ হয়তোবা আশা করেনি ওপাশের মানুষ টা।খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো।তারপর নরম গলায় বললো,
___”কে?নিশি?”
তিতির শুকনো ঢোক গেলে।বুকের ভিতরটা কেমন একটা অস্থির হচ্ছে।
___”না।”
___”নূরি?”
___”আমি তিতির।”
___”অ্যাম সরি।চিনতে পারছি না।ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড যদি বলতেন আপনি ঈশানের কি হন।”
তিতির থমকে যায়।বুকটা ভারি লাগে।চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোটা পানি পরে।মুখে মলিন হাসি ফুটে ওঠে।ভাগ্য তার প্রতি বরাবরই বেইমান।রুষা তার মানে তাকে চেনেনা!
___”আমাকে চেনেন না সত্যি? “
ওপাশ থেকে রুষা খানিকটা অপ্রস্তুত হলো বুঝি।
___”সত্যি চিনতে পারছি না।ঈশানের কাজিন বুঝি?”
___”জ্বি।ওর ফুপাতো বোন।”
___”অ্যাম এক্সট্রেমলি সরি। ঈশান কখনো তোমার কথা বলেনি…নিশি,নূরি,রিশা,রোশনি ওর বোন। এই অবধি জানতাম।”
তিতির মৃদু হাসে এপাশ থেকে।স্বাভাবিক গলায় বলে,

___”পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো তেমন নই আরকি।”
___”সরি আমার কথায় খারাপ লাগলে। “
___ইট’স ওকে।”
___”বাই দ্যা ওয়ে আমি ওর উডবি।”
___”ওহ্।”
___”ঈশান কোথায়?ওকে একটু দেওয়া যাবে।খুব আরজেন্ট।”
___”ঈশান ভাই ঘুমায়।ডেকে দিচ্ছি।
___”ওহ তাহলে থাক।ডেকোনা,ডেকোনা।ঈশান ঘুম থেকে ডাকলে খুব বিরক্ত হয়।রেগে যায়,দরকার নেই।জাগলে ব্যাক করবেনি।”
তিতির ফোন রাখে।সময় নিয়ে তাকিয়ে রয় ফোন স্ক্রিনে।মেয়েটা বোধহয় অনেক কিছু জানে।আচ্ছা ঈশানের কিসে ভালো লাগে,কিসে খারাপ লাগে,কখন কি করে সব বোধহয় জানে মেয়েটা।জানারই কথা।এতো বছরের সম্পর্ক।তিতির নিজের ওপর বিদ্রুপ এর হাসি হাসে।এক নজর তাকায় ঈশানের দিকে।
___”অথচ এ সব অধিকার কিন্তু আমার হওয়ার কথা ছিলো দেওয়ান সাহেব। দিলেন না।তাইনা…”
তিতির আর দাড়ায় না।শব্দহীন দরজা খানা খুলে বেড়িয়ে আসে সেখান থেকে।

আকাশ আজ রোদ ঝলমলে লাগছিলো সকালে।এই রোদের আলোতেই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছিলো তার।অথচ রাস্তায় পা ফেলতেই আবহাওয়া অন্য কথা বলছে।আকাশ বেশ মেঘলা দেখাচ্ছে।তিতির চোখকুচকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।তমা কে কয়েকবার ফোন দিয়েও ফোন বন্ধ পেলো।আর অপেক্ষা করলো না সে।মাথা ভনভন করছে।রাতে ঠিকমতো না খাওয়ার ফল।কাল সারাদিনই তো প্রায় না খাওয়ার ওপরেই গেলো।মানসিক চাপ আর সহ্য হচ্ছে না তার।মেইন রোডে পৌছুতে আরও খানিকটা সময় লাগবে।রাতে বৃষ্টি হওয়ার জন্য কি না এদিকটায় রিকশা দেখতে পাওয়া যাছে না।অবশ্য ভোর এখন।সেটা একটা কারণ হতে পারে।ফোন বের করে সময় দেখে,আটটা বাজে।সামনে গিয়ে বাস পেলে হয়।মেইন রোড অবধি এসে পৌছুতে তিতিরের প্রায় আধঘন্টা সময় লাগে।রাস্তায় গাড়ি তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না।পাশেই সিমেন্টের এক পুরানো বসার জায়গা মতো।ক্লান্ত শরীরে এসে বসে মেয়েটা।পা ব্যাথা করছে।কাল থেকে রোজা শুরু হচ্ছে।

তার ছুটি এ মাসটাই।তারপর ফিরে যেতে হবে হোস্টেলে।যা করার তার আগেই করে ফেলতে হবে।মিথ্যে সম্পর্ক যুগযুগ বয়ে বেড়ানোর মানেই হয়না।তাছাড়া রুষা মেয়েটার কথাও তার ভাবা উচিত। সে মেয়ে তো জানেও না ঈশানের বিয়ে হয়ে গেছে।হিসেব মতো ঈশানকে পাওয়ার অধিকার তো রুষারই।তিতির ফোনএর ডায়ালবুক খুঁজে খুঁজে একটা নাম্বার বের করে।তার ভার্সিটির এক সিনিয়র।ল ডিপার্টমেন্ট। অ্যাডভোকেট।ঢাকা হাইকোর্ট এর আইনজীবী মেয়েটা।কি বিষয়ে স্পেশালিষ্ট তা তিতির জানেনা।তবে নিশ্চয় সাহায্য পাওয়া যাবে।আর তাছাড়া চাইলেই তো সাথে সাথে মুক্তি মেলেনা।আইনকানুন এর বিষয় এসব।ঝুলে থাকবে কতদিন কেজানে। ছয় মাস তো ভালো মতো লাগবে,যেহেতু তাদের বিয়ের সাত দিনও হয়নি।ততদিনে পরিবার কে নিশ্চয় বুঝিয়ে ফেলা যাবে।তাছাড়া আরও সিদ্ধান্ত তো এরই মধ্যে নিয়েই নিয়েছে সে।সেসব না হয় আপাতত গোপনই থাকুক,এই ঝামেলা মিটলে আর পিছুটান থাকবে না।
তিতির ছোট্ট করে মেসেজ পাঠিয়ে রাখে মেয়েটাকে। সময় হলে কল করে যেনো।

বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙলো ঈশানের।সফেদ বিছানার ওপরে নগ্ন শরীরে উপুড় হয়ে শোয়া।চোখ বুজেই পাশে হাতড়ালো। খুঁজলো তিতিরকে।চট করে তাকালো সে।পুরো বিছানায় কোথাও তিতির নেই।ভ্রু জোড়ার মাঝে জোরালো ভাজ পরলো।দ্রুত উঠে বসলো সে।নেমে এলো বিছানা থেকে।পাশের চেয়ারের ওপর থেকে শুকিয়ে যাওয়া প্যান্টটা পরে নিলো।
___”তিতির?”
সাড়া দিলো না কেউ।বাথরুম এর দরজা খোলা।বেলকনি তে উঁকি দিয়েও দেখতে পাওয়াা গেলো না কাউকে।হঠাৎ দরজার দিকে তাকাতে কুচকে যাওয়া কপাল আরও খানিকটা সরু হলো।দরজার লক খোলা।তিতির কি তমার কাছে?ঝটপট ফোন হাতে কল করলো তিতিরকে।ফোন বন্ধ, তমার নাম্বার এ কল করতেই সাথে সাথেই প্রায় রিসিভ হলো।তমা আদতে বেশখানিকক্ষন আগেই জেগেছে।তিতির,ঈশানকে বিরক্ত করতে চায়নি বলে,বেয়ারা ডেকে ব্রেকফাস্ট আনিয়ে খেয়ে অপেক্ষা করছে সুন্দর মতো।ভাই-ভাবি বৃষ্টির রাতে একসাথে ছিলো,মান অভিমান মিটিয়েছে হয়তো।সকাল সকাল ডাকাডাকি খারাপ দেখায়।ঈশানে কল।পেয়ে একগাল হেসে ফোন রিসিভ করে সে।

___”তিতির তোর কাছে?”
তমা বিস্মিত হয়।তার কাছে তিতির থাকবে কি করে!
মিনিট পাঁচেক এর মধ্যে তমা আর ঈশান এসে দাড়ায় রিসেপশনের সামনে।পুরো হোটেলে তিতির নেই।রিসেপশনিস্ট নিজেও বলতে পারছে না তিতির বেড়িয়েছে কিনা।কারণ সকালে অবধি অন্য একজনের শিফট ছিলো।ঈশান কপালে আঙুল ঘষে
তিতির কখন বেরিয়েছে তার আন্দাজও নেই তার।তমা কাঁদো কাঁদো মুখ করে ভাইয়ের পাশে দাড়ানো।মেয়েটা তাকে তো অন্তত বলে যেতে পারতো।একটু অনুরোধ করতেই সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে রাজি হয় হোটেল কতৃপক্ষ। আটটার দিকে বেড়িয়েছে তিতির।স্বাভাবিক ভাবেই বের হয়ে যাচ্ছে।ঈশান রাগীমুখে তাকায় তমার দিকে।

___”চল।”
তমা ভাইয়ের পিছু পিছু একপ্রকার দৌড়াচ্ছে।এসে বসে গাড়িতে।ঈশান এরইমধ্যে কল লাগায় বাড়িতে নিশির কাছে।জানতে পারে তিতির পৌছোয়নি বাড়িতে।সময়ের হিসেব করে ঈশান।যতক্ষণে বেড়িয়েছে,এতক্ষণে খুব সম্ভব বাড়িতে পৌছে যাওয়া উচিত। মেয়েটা পৌছায়নি এখনো।কি করবে এখন!বাড়ির রাস্তায় যাবে! নাকি আশপাশে খানিকক্ষণ দেখবে খুজে।মাথা কাজ করছে না ঈশানের।
___”ভাইয়া ও বোধহয় বাড়িতেই গেছে।”
___”শুনলি তো যায়নি।”
তমা চিন্তিত মুখে চুপ করে থাকে।তিতিরের সে ছাড়া এখানে কোনো ফ্রেন্ড নেই।কার কাছে যেতে পারে আন্দাজ নেই তার।ঈশান ব্যাস্ত হাতে একে একে নিয়াজ,সাজিদ,নাইম কে জানায় খোঁজ করতে।নিজে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরে আশপাশ টা দেখতে।প্রায় মিনিট বিশেক পরে কল আসে সাজিদ এর নাম্বার থেকে।জানায় তিতিরের লাস্ট লোকেশন এখান কার মেইনরোড অবধিই।তারপর আর ট্র্যাকিং হচ্ছে না।লাস্ট কল ঐশী নামের এক মেয়েকে করা হয়েছে।মেয়েটা যথাসম্ভব অ্যাডভোকেট।
কপালে ভাজ পরে ঈশানের।তিতিরের অ্যাডভোকেট এর সাথে কি কথা থাকতে পারে বুঝে পায়না সে।

___”ঐশী নামে কাউকে চিনিস?”
এদিক ওদিক মাথা নাড়ে তমা।চেনেনা সে।ঈশান বিরক্ত মুখে গাড়ি ড্রাইভ শুরু করে।শহরের কোনায় কোনায় খুজছে মেয়েটাকে।

কলিং বেলের শব্দে দরজা খুলে দেয় রিক্তা।তিতির কে একা দেখে কপালে ভাজ পরে।এদিকওদিক তাকায় পিছনে।
___”ঈশান কই?”
___”আসছে।”
___”তোকে নামিয়ে দিয়ে গেলো বুঝি?”
___”হু।”
রিক্তা আর কথা বাড়ায় না।তিতির উঠে আসে সিড়ি বেয়ে নিজের ঘরে।বিকেল তিনটে বাজে।বাড়ির সবাই খুব সম্ভবত ভাতঘুম দিচ্ছে।নিশি,নূরি ভার্সিটি তে বোধহয়।বাকিভাইবোন গুলো স্কুলে।তিতিরের ক্লান্তিতে মাথা ঘুরাচ্ছে।কিছু খাওয়া প্রয়োজন। তবে খেতে ইচ্ছে করছে না।আজকাল খাওয়াদাওয়ার প্রতি আগ্রহ পায় না একদমই।জামাকাপড় না পাল্টেই ক্লান্ত শরীরখানা ছেড়ে দেয় বিছানায়।হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে চার্জে লাগায় ফোনটা। বন্ধ হয়ে আছে সেই সকাল থেকে।মাঝরাস্তায় বাসে নষ্ট হওয়ায় একঘন্টার রাস্তা তিন ঘন্টায় আসলো।ফোন কোনোমতে চালু করে বাথরুমে ছোটে সে।শাওয়ার নিয়ে একটা ঘুম দেবে।

___”ঈশান,তিতির এর নাম্বার চালু হয়েছে। লোকেশন তোদের বাড়ি দেখাচ্ছে তো।”
সাজিদের ফোন পেয়ে হাফ ছাড়লো ঈশান।ঘেমে-নেয়ে একাকার ক্লান্ত শরীরটা হেলান দিলো গাড়িতে।তমার কান্নারাত মুখটায় ততক্ষণে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।দু হাতে চোখ মুছলো মেয়েট।ভাইয়ের দিকে তাকালো।ঈশান মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে আছে।ভীষন মায়া হলো তার ভাইটার জন্য। সে জানে কি পরিমাণ মানসিক চাপ গেছে ঈশানের ওপর সারাটাদিন। পাগলের মতো কোথায় কোথায় খুঁজলো তারা তিতিরকে।তমা মনে মনে হাজার একটা বকা দেয় তিতিরকে।সাথে মেয়েটার দূর্গতি কল্পনা করে চুপসে যায়।ঈশান বাড়ি গিয়ে মেয়েটাকে খেয়ে না ফেললে হয়।আমতা আমতা করে খানিক সময় নিয়ে বলে ওঠে,
___”ভাইয়া…”
জবাব দেয় না ঈশান।
___”ভাইয়া বলছি কি।তিতির এমনই।একটু জেদি তো।ওকে কিছু বলো না হ্যা?”
___”ওই বেয়াদব মেয়ের নামে ওকালতি করতে তোকে ধাক্কা মেরে ফেলে রেখে যাবো বলে দিলাম।”
তমা ভয়ে চুপ করে থাকে।আপাতত বাঘের খাচায় থেকে বাঘের কাছে হরিণের প্রানভিক্ষা চাওয়া চূড়ান্ত বোকামি বই কিছু নয়।

মেঘলা মেঘলা দিন হওয়ায় সূর্য ডুবতেই রাত মনে হচ্ছে একদম।শাওয়ার নিয়ে এসে মাথা ব্যাথায় কুলাতে না পেরে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হয়েছে তিতির এর।কয়েকমাস হলো মাইগ্রেন এর ব্যাথাটা অস্বাভাবিক হারে বেরেছে।মাথার ওপরে মাঝবরাবর অসহ্য ব্যাথা হয় প্রতি সপ্তাহেই।ডাক্তার এর কাছে যাবে যাবে করেও যাওয়া হয়নি।কাল বৃষ্টি তে ভেজার কারণে নাকি ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া না করা,অত্যাধিক মানসিক চাপে সে ব্যাথা এখন আকাশচুম্বী। ঘর অন্ধকার করে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে সে।
তমাকে বাড়িতে নামিয়ে ঈশান গটগট করে এসে ঢুকলো বাড়িতে।ড্রয়িং রুমে বাড়ির মা চাচিরা চায়ের আসরে ব্যাস্ত।ঈশানকে রীতিমতো বিধস্ত দেখাচ্ছে।চোখদুটো রক্তিম।রাগ মাথায় উঠে আছে।তাকে এভাবে ঢুকতে দেখে ছুটে এলেন রাহেলা দেওয়ান।
___”কোথায় ছিলি বাপ।দুপুরে খেতে এলি না?তিতির কে নামিয়ে দিলি তখন অন্তত খেয়ে যাবি তো নাকি?”
ঈশান মায়ের কথা শুনে থমকায় খানিকটা।তিতির যে একা একা এসেছে এট বাড়ির কেউ জানেনা তারমানে।সে নিজেও চুপ করে গেলো।চেপে গেলো অশান্তির বিষয়টা।
___”ব্যাস্ত ছিলাম মা।ওপরে যাচ্ছি।”
___”যা ফ্রেশ হয়ে খেতে নাম।তিতির উঠলে ওকেও নিয়ে আসিস।মেয়েটা মাথা যন্ত্রণায় পাগল হয়ে যাচ্ছে।না উঠলে ডাকিস না আবার।”

ঈশান মাথা ঝাকায়।রাহেলা আপনমনে গিয়ে বসে জা’য়েদের পাশে।টিভিটে মগ্ন সবাই।সেই নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ঈশান শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে উঠে আসে ওপরে।নিজের রুমের দিকে যায়না।তিতির যে তার রুমে নেই তা সে জানে।সুতরাং সয়ম নষ্ট না করে তিতিরের রুমেই যায় সে।যথারীতি পেয়েও যায় মেয়েটাকে। আধভেজা চুলগুলো বিছানা ছারিয়ে মেঝে ঠেকেছে।বা কাত হয়ে গালের নিচে বাচ্চাদের মতো হাত গুজে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।ঈশান বেশ শব্দ করে দরজা আটকায়।তাকে পাগল বানিয়ে এখন ঘুমানো হচ্ছে বাড়িতে এসে।হঠাৎ শব্দে ঘুম ভাঙে তিতিরের।বেশিক্ষণ হয়নি ঘুমের।দু ঘন্টা বড়জোর। মাথা ব্যাথা কমার প্রশ্নই ওঠেনা।বরং এ সময়ে শব্দে ঘুম ভাঙায় আরও মাথা ব্যাথা বাড়লো দ্বিগুণ। এলোমেলো ভঙ্গিতে উঠে বসলো সে।নিভু নিভু চোখে তাকালো দরজার সামনে দাড়ানো অগ্নিমূর্তির মানব টির দিকে।চমকে গেলো।ঈশান দাড়িয়ে।কি যে বিধস্ত অবস্থা। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, শার্টের ওপরে বোতাম দুটো খোলা,হাতাগুলো গুলোও খুলে রাখা।মারপিট করে এসেছে নাকি!তবে সে কিছু বলার আগেই সজোরে থাপ্পড় পরলো তার ডান গালে।আঘাতের জোর এতটাই ছিলো যে তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পরলো বিছানায়।ব্যাথা আর্তনাদ করে উঠলো।ঈশান ঝড়ের গতিতে টেনে নামালো তিতির কে বিছানা থেকে।আরেকটা থাপ্পড় মারতে হাত তুললেই ভয়ে নিজের দু হাতে মুখ আড়াল করলো তিতির।ঈশান থামলো।রাগে মাথা কাজ করছে না।তিতির থরথর করে কাপছে।ঝরঝর করে পানি পরছে চোখ থেকে।ঈশান দু হাতে সোজা করলো মেয়েটাকে। দাঁতে দাঁত চাপলো।

___”আমাকে খুন করবি নাকি নিজে খুন হবি।এখন জবাব দে।দ্রুত।”
তিতির চোখ ভর্তি পানি নিয়ে তাকিয়ে থাকে ঈশানের দিকে।মাথার যন্ত্রণা অস্বাভাবিক লাগছে এখন।বমি বমি পাচ্ছে।
___”জবাব দিচ্ছিস না কেনো।”
___”কি করেছি আমি?”
তিতিরের ফুপিয়ে বলা কথাগুলোর পিঠে মেজাজ আরও দ্বিগুণ খারাপ হয় ঈশানের।এত বড় কান্ড ঘটিয়ে এসে বলা হচ্ছে কি করেছে সে!বেআক্কেল একট মেয়ে এটা।
___”মেরে ফেলতে মন চাচ্ছে তোকে।বেয়াদবির একট াসীমা থাকে।কাকে বলে হোটেল থেকে এসেছিস তুই।?”
এবার তিতির থমকায়।ঈশানের এহেন আচরনের জবাব মেলে।সাথে সাথে কানে বাজে রুষা নামের সেই মেয়েটির মিষ্টি কন্ঠ!যদিও মিষ্টি লাগছে না এখন মোটেই।মনে হওয়ার সাথে সাথে ব্যাথা শুরু হলো এবার বুকে।ধাক্কা দিয়ে দূরে সরালো ঈশানকে।
___”কথায় কথায় এভাবে দেয়ালে চেপে ধরবেন না।আমাকে স্পর্শ করেন কেনো বারবার?সীমায় থাকতে বলিনি আমি?”
ঈশানের তপ্ত চোখের আগুনে ভস্ম হয়ে যাওয়ার দশা তিতিরের।অথচ এখন আর ভয়ডর হচ্ছে না তার।ঈশান হাতের মুঠো শক্ত করলো।ইচ্ছে হচ্ছে কষিয়ে আরও একটা থাপ্পড় মারতে।কিন্তু মেয়েটার ফর্শা গালে তার পাঁচ আঙুলের ছাপ ভয়াবহ ভাবে দৃশ্যমান।রক্ত জামট বেধে যাওয়ার মতো হয়ে গেছে এক নিমিষেই।বুকটা ধকধক করে উঠলো।ঈশান আবার আকড়ে ধরে মেয়েটার বাহু।কিছু বলতে গেলে এ-ই জায়গাটায় চেপে ধরা যেনো ঈশানের প্রিয় কাজ।জায়গাটা ব্যাথা থাকে আজকাল।

___”পাগলের মতো খুজেছি তোকে।আন্দাজ আছে তোর?কি পরিমাণ প্যানিক হচ্ছিলো আমার?না বলে চলে এসেছিস কেনো।জবাব দে?”
ঈশানের একদমে চিৎকার করে বলা কথায় সেটিয়ে রইলো পিছনের দিকে।তবে ভয় প্রকাশ করলো না।
___”জবাব দিচ্ছিস না কেনো?”
তিতির এবারেও জবাব দেয় না।নির্বিকার চোখটা সরিয়ে নেয় ঈশানের থেকে।নিজের বাহুতে ধরা ঈশানের শক্ত হাতখানাও একই শক্তিতে সরিয়ে দেয় সে।
___”কি আশ্চর্য! বাড়ি আসবনা…?”
ঈশানের মুখটা আরও কঠিন হয়
যেনো তিতির কোনো অবান্তর কথা বলেছে।
___”আমি বাড়ি নিয়ে আসতাম না?জাহান্নামে নিতাম তোকে?”
তিতির এবার বিদ্রুপ এর হাসি হাসে।দু’দিকে মাথা নাড়ে হেসে।তারপর স্থির দৃষ্টি তাক করে ঈশানের দিকে।
___”আমার জন্য তো আপনিই জাহান্নাম।আর কেথাও সেটা অনূভত হয়না।”
বুকের বা পাশে ছুড়ির আঘত লাগে ঈশানের এবারে।
খানিকটা এগিয়ে ঘেষে দাড়ায়।

___”বড্ড বড় বড় কথা বলিস তুই।বেয়াদবির একটা লিমিট থাকে।আমার দায়িত্বে ছিলিস তুই।সকালে উঠে তোকে রুমে না পেয়ে কোথায় কোথায় খুজেছি জানিস?”
তিতির ভীষন অবাক হয় মনে মনে।মুখ সরিয়ে নেয় অন্যদিকে।তার মুখটাও কঠিন হয়ে আছে।ভাবলেশহীন গলায় বলে,
___”জানার আগ্রহবোধ করছি না।দুঃখিত।তাছাড়া আপনার দায়িত্বে কিভাবে থাকি আমি!গিয়েছিলাম নিজ দায়িত্বে, এসেছিও তাই।মাঝে কাউকে কেনো কৈফিয়ত দিতে হবে বুঝলাম না।”
ঈশানের ধৈর্যের সীমা ভেঙে যাচ্ছে তিতিরের এহেন কথাবার্তার ধরনে।চিৎকার করে উঠলো,
___”তিতির?”
___”চেচামেচি করবেন না দয়া করে।নিজের রুমে যান। মাথা যন্ত্রণা করছে আমার।ঘুম দরকার।”
ঈশান কঠিন মুখে শোনে মেয়েটার চটাংচটাং কথাগুলো।
___”ঘরে চল।”
তিতির যেনো অবাক হয়।আশেপাশে তাকায়।
___”ঘরেই তো আছি।”
___”হেয়ালি না করে ঘরে চল।”
___”হেয়ালি তে আপনি অভ্যাস্ত দেওয়ান সাহেব।আমার দ্বারা ওসব হয়না।যেতে পারেন এখন।”
মেয়েটার কথাবার্তা রীতিমতো উদ্ধতদের মতো শোনাচ্ছে।

___”রুমে চল।বাড়ির কেউ আলাদা দেখলে কাহিনি করবে সেটা চাস?”
তিতির নিজের গায়ের ওড়না টা ঠিকমতো জড়িয়ে সরে দাড়ায় ঈশানের থেকে খোলা জানালা সুন্দর মতো আটকে এসে বিছানার কিনারে দাড়ায়।আধো অন্ধকারেও স্পষ্ট ঈশানের রক্তিম মুখখানা।রেগেও বেশ সুদর্শন দেখাচ্ছে।
___”আমার যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছি আমি।”
___”আমাকে রাগাস না আর।খুন করে ফেলবো।”
___”সামান্য মানুষ আমি।আমাকে মেরে হাত নোংরা করবেন কেনো!ঘরে যান।”
___”তিতির…”
___”ওহ আর শুনুন।কাল উকিলের কাছে যাবো।তৈরি থাকবেন।”
উকিলের কথা কানে আসতেই স্থির হলো ঈশান।উকিলের কথা এখানে আসছে।কোথা থেকে সাতপাঁচ হাতড়ে পেলো না ঈশান। তবে সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জবাব দিলো তিতির নিজেই।

___”যা হওয়ার দ্রুত হয়ে যাওয়া মঙ্গল।আর রইলো বাকি পরিবার।আগে পরে জানবেই।সুতরাং শুরুতে জানা ক্ষতি দেখছি না।যেতে পারেন এখন।”
এবার বোধহয় উকিলের কাছে যাওয়ার বিষয়টা মাথায় ধরলো ঈশানের।হাতের শক্ত মুঠো সজোরে আঘাত হানলো তিতিরের মাথার পিছনে দেয়ালে।চোখমুখ খিচে বন্ধ করে ফেললো সে।
___”আর একবার উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা মাথায় আনলে মরবি আমার হাতে তুই বলে দিলাম।”
ঈশান দ্রুত হাটা ধরে বেড়িয়ে যেতে।কি মনে করে আবার ফিরে আসে।মাথা নিচু করে তিতিরের মুখখানা বা হাতের আঙুলের সাহায্যেৃ উচু করে তোলে।
___”সেদিন যা বলেছিলাম ভুলে যা।এতো সহজে মুক্তি নেই তোর।আমাকে মুক্তি দিয়ে রাহাতের সাথে ঘর করতে যাবি হু?দেওয়ান বাড়ির বউ এর এই অধপতন আমি মানবো না।”
___”সতীনের ঘর আমাকে করতে বলছেন?আমার অতো দূর্গতি হয়নি ঈশান আরশাদ দেওয়ান। হবেও না।”
আবার সেই এককথা।ঘুরে ফিরে তিতির সেই এক জায়গায় আটকে আসে।কি করা উচিত তার।কি বলবে সে।মেয়েটাকে বলবে সবটা!এতো সহজে সবটা সমাধান হলে তো হতোই।একদিন বাঁচাতে অন্য দিক বাজে ভাবে ডোবাতে পারে না সে।তার থেকে থাকুক এই ভুলবোঝাবুঝি, থাকুক এ দুরত্ব আর কটা দিন।হিসেব মিলুক সবকিছুর আগে।
আঙুল গুলো শক্ত করে আকড়ে ধরলো তিতিরের গাল।ব্যাথা দেওয়ার মতো করে নয় মোটেও।

___”শোন,একটা কথা মাথায় রাখ।ভার্জিনিটি কি বুঝিস?আমি ভার্জিন।পিওর ভার্জিন।তবে এক দুবার বিয়ে করা একটা বেয়াদব নারীকে চুমু খাওয়ার মতো দূর্ভাগ্য আমার হয়েছে।আর সেদিন মানে ফার্স্ট নাইটে যা বলেছি সেটা ভুলে যা।না ভুলতে পারলে আমাকে বলবি।বাংলা সিনেমার মতো এই দেয়ালে মাথায় একটা গুতো দিয়ে আমি ভুলিয়ে দেবো।ঠিক আছে?আর এক কথা বলবি না।”
তিতির বিরক্ত চোখে তাকায় ঈশানের দিকে।
___”বিশ্বাস করি না আমি আপনাকে।
___”একই মানুষের একদিনের কথা বিশ্বাস করিস,আরেকদিনের টা করিস না।সমস্যা কি তোর?”
___”সেটাই তো সমস্যা। কথায় কথায় গিরগিটির মতো মানুষ কে বিশ্বাস করা যায়!”
___”সে তুই যা বাণী দেওয়ার দিতে পারিস।নিশি,নূরি কে ভালোবাসিস?”
তিতির হা করে তাকিয়ে থাকে।কোন কথার মধ্যে কোন কথা।এখানে নিশি,নূরি আসলো কোত্থেকে!
___”বাসিস?”
তিতির বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ে।বাসে না মানে!এটা প্রশ্ন হলো!

___”যদি শুনিস তোর জন্য ওদের কোনো বিপদ হচ্ছে তুই কি করবি?”
তিতির কি জবাব দেবে খুঁজে পায়না।তার জন্য তার ভাইবোনেদের এমনকি কোনো আপনজনের ক্ষতি সে কখনো হতে দেবে না।সম্ভবই না।
___”কি করবি? “
___”হতেই দেবোনা কখনো।”
___”তাহলে!আমার দায়িত্ব আরও বেশি নয় কি?আমি তোদের সবার বড়।ওদের সবার ভাই।বাবার পর ভাইরা আশ্রয়। তোর তো স্বামী। দায়িত্ব বারে নি বলছিস?”
তিতির আশ্চর্য হয়।বেশ অবাক হয়ে শোনে ঈশানের কথা।
___”আপনি এসব বলছেন কেনো?”
___”জবাব দিতে চাইলেও দিতে পারছি না।আই নিড টাইম।দিতে হবে তোকে সেটা।আর রইলো বাকি অন্য চ্যাপ্টার।ওসব ক্লোজ করবি।রাহাত নামে ছেলেটার প্রতি কি আছে আমি আর জানতে চাইনা।ফারদার ওই ছেলের নাম শুনতে চাইনা আমি তোর মুখে।জিব টেনে ছিড়ে ফেলবো বলে দিলাম।”
ঈশান তিতিরকে ছেড়ে ঘুরে চলে যেতেই পিছন থেকে ভেসে এলো তিতিরের কন্ঠ।

___”কতটা ভালোবাসেন রুষাকে?”
ঈশান স্বাভাবিক চোখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায়।চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বলে,
___”ঘরে আয়।মা খাবার দিতে আসবে।তখন এ ঘরে দেখলে খামোখা প্রেশার বাড়াবে।”
ঈশান চলে গেলে ছলছল চোখে বসে বিছানায়।এতসব কথা শোনালো।কেনো শেষপ্রশ্ন টার জবাব না হলো না।একবার বললেও পারতো ভালোবাসে না রুষাকে।চোখ মুছতে মুছতে আচমকা চোখ পরলো পাশের দেয়ালে।ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে।তাজা রক্ত যাকে বলে।খেয়াল হলো একটু আগে দেয়ালে ঈশানের সেই আঘাতের কথা।হু হু করে কেঁদে ফেললো সে।এত এত যন্ত্রণা তার এই ছোট্ট মাথাটা আর নিতে পারেনা।নিজেই যন্ত্রণা দেবে,নিজেই আবার আসবে যত্ন করবে,জেলাসী দেখাবে,ছেড়ে যেতে বলে আবার যেতে দেবেনা।অন্য নারীর সাথে রাত কাটানোর গল্প শুনিয়ে পরে বলবে তাকে ছাড়া আর কাউকে কখনো স্পর্শ করেনি।এসবের মানে কি!তার ওপর এগুলো মানসিক টর্চার নয়!এখন নিজেকে আঘাত করে গেলো
পেটের বা পাশের একটা ব্যান্ডেজ টা গতকাল রাতেও খেয়াল করেছে।কেনো যেনো জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করা হয়নি।ব্যান্ডেজ টা দেখে বোঝা গেলো আঘাতটা পুরানো।কবে হয়ছে সে জানেনা।তার ওপর আজ আবার হাতটা..ফুপিয়ে ওঠে তিতির।তাকে যে এতো আয়োজন করে পোছাচ্ছে তার কষ্টে ফেটে যাচ্ছে তা র বেহায়া বুকটা।এর থেকে যন্ত্রণার আর কি আছে।ড্রয়ার হাতড়ে ফার্স্ট এইড বক্স টা বের করে।চোখমুছে চুলগুলো খোপা করে নেয়।মাথার ব্যাথায় তাকিয়ে থাকা দায়।দরজা টা চাপিয়ে এসে দাড়ায় ঈশানের রুমের সামনে।

___”ঢুকছিস না কেনো!নিজের ঘরে নক করে ঢুকতে হয় বুঝি?”
পিছন থেকে রাহেলা দেওয়ান এর গলা পেয়ে চমকে ওঠে তিতির।পিছন ফিরতেই চোখে পরে রাহেলা হাতে খাবারের ট্রে হাতে দাড়িয়ে।এগিয়ে আসে রাহেলা তার দিকে।
___”হাতে ওটা কি?”
চোখেমুখে উদ্বেগ ফুটে ওঠে তার।
___”ফার্স্ট এইড দিয়ে কি করবি।কার কি হলো?”
তিতির শাশুড়ী কে শান্ত করতে ব্যাস্ত হয়।হাতের আঘাতের কথা সন্তর্পণে এড়িয়ে যায়।মাথায় আসে ঈশানের পেটের আঘাতটার কথা।
___”কিছুনা মামনী।ওইযে ওনার পেটের ওই খানাটায় একটু ওষুধ লাগিয়ে দেবো। “
___”ওখানটায় আবার ব্যাথা পেয়েছে?”
তিতির মাথা নাড়ে দুদিকে।

___”না।চিন্তা করো না তো।কিচ্ছু হয়নি।”
রাহেলা হাফ ছাড়ে।
___”তোর মাথা ব্যাথা কমেছে?”
___”না।”
___”ওষুধ খেয়েছিস?দিয়ে এসেছিলাম যে।”
___“খেয়েছিলাম।”
___”ওটায় তো এতক্ষণে কমে যাওয়ার কথা।তোর কমেনি কেনো বুঝলাম না।”
___”চিন্তা করো না।খাবার তোমার ছেলের জন্য তো?দাও।”
রাহেলা হাসে।তিতিরের হাতে তুলে দেয় ট্রে টা।
___”শুধু ছেলের জন্য হবে।কেনো শুনি?ছেলে আমার একটা পুতুল ঘরে এনেছে। তার জন্যও আছে।”
তিতির ঠোঁট উল্টায়।আহ্লাদী গলায় বলে,
___”আমার জন্য আনার দরকার ছিলো না।আমি নিচেই যেতাম তো।”
___”আমাকে কি সেকেলে দজ্জাল শাশুড়ী লাগে?খাবার এনেছি যেনো ছেলে ছেলের বউ খেয়ে দেয়ে একান্তে সময় কাটাতে পারে।”
তিতির লজ্জা পায় শাশুড়ীর মুখে এমন কথায়।অজান্তে রক্তিম হয় মুখ।রাহেলা গাল টানে আলতো হাতে।
___”থাক লজ্জা পেতে হবে না।যা ঘরে যা।দরজা তো খোলাই।অনুমতির জন্য দাড়িয়ে আছিস কেনো!তোরও ঘর এটা…”

রাহেলা ঠেলে ভিতরে দিয়ে নিজে চলে আসে সেখান থেকে।ঈশান বোধহয় তিতিরের অপেক্ষাই করছিলো। রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা।এপাশে রক্তাক্ত হাত টা ঝুলছে।এরইমধ্যে এসে গায়ের শার্ট খোলা শেষ।তিতির মুখ বাকায়।গায়ে জামাকাপড় পরে থাকতেই পারে না যেনো লোকটা।খাবারের ট্রেখানা টেবিলে রেখে এগিয়ে এসে টুল টেনে বসে ঈশানের পাশে। ঈশান ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে থাকে।তিতির হাত খানা নিজের হাতে নিয়ে পরখ করছে তখন।বেশ কেটেছে হাতটা।ঈশান বাধা দেয়না।তিতির ধীরেসুস্থে ওয়াশ করে,ওষুধ লাগায়।ক্রমাগত ফু দিয়ে যাচ্ছে সেখানে।ঈশান অদেখা হাসে।মেয়েটা কি ভাবছে,এতটুকু আঘাতে ঈশান আরশাদ ব্যাথা পায়!এইটুকু রক্তক্ষরণ কিছুই না তার জন্য। এর থেকে হাজার গুন বেশি রক্তক্ষরণ তো আজ গোটা দিনে হয়েছে।তার বুকের বা পাশটায়।যখন তিতিরকে কোত্থাও খুজে পাচ্ছিলো না সে।

___”রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।আমি সবসময় আঘাতে মলম লাগাতে আসতে পারবো না।আমার ওপর চোটপাট করে আমাকে দিয়েই ওষুধ লাগাবেন।এ চিন্তাভাবনা দূরে রাখুন।”
___”লাগাতে এসেছিস কেনো!আমি বলেছি একবারও।”
তিতির জবাব দেয় না।ধীরেসুস্থে ব্যান্ডেজ করে ফেলে হাতটা।খানিকটা উঁচু হয়ে তাকায় পেটে দিকে।
___”দেখি এদিক ঘুরে বসুন।”
ঈশান যেনো বাধ্য পুরুষ।চেয়ার ছেড়ে আলগোছে এসে বসে বিছানায়।তিতিরও ঘুরে পায়ের কাছে বসে।আলতো হাতে তুলে ফেলে পেটের ব্যান্ডেজ খানা।

___”এটা কবে ঘটিয়েছেন।”
___”হবে দিনকয়েক।”
___”কিভাবে?”
___”মনে নেই।”
তিতির সরু চোখে উপর দিকে তাকায়।ঈশান কেমন একটা চোখে তাকিয়ে আছে তারই দিকে।কিছু একটা কড়া কথা বলতে মুখ তুলেছিলো সে।অথচ ঈশানের এহেন দৃষ্টি তে সব কথা গুলিয়ে গেলো তার।মাথা নিচু করে ফেললো।মন দেওয়ার চেষ্টা করলো কাজে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৫ (২)

___”ওভাবে তাকিয়ে থাকবেন না।”
___”আমার চোখ..”
___”হোক আপনার চোখ।শরীরটাও আমার।”
___”তোর শরীর দেখছি কে বললো!”
___”বাজে কথা খালি।”
তিতির মুখ কালো করে নতুন ব্যান্ডেজ করে ফেলে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৬ (২)