Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৩২

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩২

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩২
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

ট্রেন থেকে নেমে হাতের ব্যাগ নিয়ে গাড়ির সন্ধানে এগোলো রাহাত। সারারাত জার্নি করে সবে এসে পৌছালো। ঘড়ির কাটায় সময় দেখাচ্ছে সকাল সাড়ে নয়টা। ঈদের দুদিন পর মাকে নিয়ে আবার দেশের বাইরে যেতে হবে তার। তিতির এর সাথে দেখা না করে শান্তি পাচ্ছিলো না মোটে। এ মেয়েটাকে ভুলতে পারছে না সে। আর না তো তাকে ছাড়া গোটা জীবন বাঁচতে পারার কোনো আশা দেখছে। মা টা তার একটু সুস্থ থাকলে যেকোনো একদিক অন্তত বাঁচাতে পারতো সে। আপাতত সেটা করতে পারছে না একদম।
কয়েককদম হাটতেই যথারিতি একটা সিএনজি পেয়েও গেলো সে। শমশেরনগর এর কথা জিজ্ঞেস করতেই সিএনজি ড্রাইভার এর কথায় তার হুশ হলো স্টেশনটা এটা নয়। আরও এক স্টেশন যেতে হতো।
খারাপ মেজাজ দ্বিগুণ খারাপ হলো রাহাতের। নিজের গাড়িটা নিয়ে না আসার ভোগান্তি। গাড়ি সে ইচ্ছে করেই আনেনি। আজকাল কোনো কিছুতে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস, শক্তি পায়না সে। এতটা দূরের রাস্তা। ড্রাইভিং করে আসার মতো মনের জোর পাচ্ছিলো না। সড়ক পথে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকার থেকে রেলে কর্মরত এক বন্ধুর সাহায্যে এসি কেবিনের একটা সিট বুক করে ট্রেনেই এসেছে সে।
সিএনজি কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে যাত্রী তুলতে দাড়ালো। রাহাত বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে। এ ধরনের ট্রান্সপোর্ট এ যাতায়াত এ তার খুব একটা অভ্যেস নেই। রাস্তাঘাটে ঘনঘন গাড়ি থামা সে একদম পছন্দ করতে পারে না। সিএনজি থামতেই মাথা নিচু করে ভিতরে তাকালো এক যুবক। পাশেই দাড়ানো একজন নারী। পুরুষটি নিজেই উঠে বসলো। কন্ঠ উঁচিয়ে ডাকলো নিজের সাথে থাকা নারীটিকে,

____”অনি ব্যাগ গুলো আগে হাতে দাও পিছনে রাখি।”
অনিমা নিজের হাতের ঈদ শপিং এর গুটিদশেক ব্যাগ এগিয়ে দিলো ভিতরে বসা সাজিদ এর দিকে। সাজিদ পিছনে রাখলো সেসব। অনিমা বসতেই চলতে শুরু করলো সিএনজি।
_____”বড্ড গরম বলো?”
_____”একেবারে…সকাল সকালই একেবারে রোজায় ধরে যাবে।”
_____”গাড়ি না নিয়ে এসে খুব ভুলো করেছি। “
সাজিদ ট্যিসু নিয়ে স্ত্রীর কপালের ঘাম মুছে ধীর গলায় বলে,
_____”তোমারই তো মনে হলো ঈদ শপিং একটু ধাক্কাধাক্কি, ট্রান্সপোর্ট জার্নি না হলে চলে! এখন বোঝো ঠ্যালা।”
অনিমা মুখ গোমরা করে মাথা নাড়ে। এসেছে তারা গতকাল। এখানে সাজিদ এর এক ফুপু শয্যাশায়ী। তাকে দেখে ঈদের শপিং সেরে নিয়েছে দুজনে। সকাল সকাল রওনা দিচ্ছে বাড়ির উদ্দেশ্যে। আজকে ঈশানদের বাড়ির আয়োজন এ থাকার জন্য কাল রাত থেকে কল আসছে। রাহাত গভীর চোখে অবলোকন করে কেনো জানি। দম্পতি কে চেনা চেনা লাগছে বোধহয় তার! কোথায় দেখেছে ঘটা করে মনে করতে পারলো না। তবে মনে পরলো মিনিট দশেক এর মধ্যেই। দেখেছে তো। নারীটিকে না দেখলেও ভদ্রলোক টিকে সে খুব চেনে। গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,

____”এক্সকিউজ মি…আপনি সদরঘাট থানার এএসপি সাজিদ তালুকদার?”
সাজিদ মাথা নাড়ে। স্বাভাবিক গলায় বলে,
____”জ্বী। আপনি চেনেন আমাকে?”
____”আমার বাসা শাহবাগে। কয়েকদিন আগে একটা কেসের থ্রু আপনাকে টেলিভিশন এ দেখা হয়েছিলো।”
সাজিদ মৃদু হাসে।
____”এখানে? স্থানীয়? “
____”তেমন নয়…আমার হবু স্ত্রীর সাথে দেখা করতে এসেছি আরকি।কালকেই ব্যাক করবো ঢাকাতে।”
____”ভীষন রাফ জার্নি হয়ে যাবে তো।”
____”তা হবে বলতে পারেন।”
অনিমা মাথা ঝুকিয়ে তাকালো রাহাতের দিকে। মিষ্টি গলায় বললো,
____”লাভ ম্যারেজ হচ্ছে? “
সামান্য হাসি ফুটলো রাহাতের মুখে।
____”জ্বী। লাভ ম্যারেজ। ঈদের দু দিন পর আমার মা কে নিয়ে একটু সিঙ্গাপুর যাবো ট্রিটমেন্ট এর জন্য। মেয়েটাকে না দেখে গেলে খারাপ লাগবে।”
____””ভীষন ভালোবাসেন।”
ঘন চুলে হাত চালালো রাহাত। সামান্য মাথাও ঝাকালো।
____”ভীষন…ভীষন ভালোবাসি।”

গোটা টা রাস্তা আর কারোর মধ্যে তেমন কথা হলো না। সাজিদ ফোনো অফিসের কিছু ডকুমেন্টস দেখতে ব্যাস্ত। কেস টা নিয়ে গলা অবধি ডুবে আছে সে। কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না। যদিও এক দুদিন এ কিছুই আসা করা যায়না। তবুও মাথা জ্যাম ধরে থাকে কেস টা নিয়ে। নিজদের এলাকায় সিভিল ড্রেসে শ খানেক পুলিশ মোতায়েন করা। তাদের কঠোর ধারনা,কালপ্রিট এখনো এলাকা তেই আছে।
নিজেদের এলকার স্ট্যান্ডে নামতে দেখেও রাহাত কে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করার কথা মাথায় এলো না সাজিদ এর। ব্যাগুগুলো হাতে নিয়ে রিকশা ডাকলো একটা।

চন্দ্রকাননে আজকে ভীষন ব্যাস্ততা সকলের। আর দুটো রমজান বাকি আছে। প্রতিবছরের মতো এবারেও এলাহি আয়োজন করে ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে দেওয়ানবাড়িতে। বাড়ি ভর্তি মানুষজন। সকাল থেকে পাড়ার মহিলারা সব এসে পরছেন সব ধরনের সাহায্য করার জন্য। গ্রাম থেকে চন্দ্রা দেওয়ান এর বিশেষ অতিথি রা যদিও এখনো এসে পৌছায়নি। অনাথ আশ্রম এর বাচ্চারা বিকেলের দিকে আসবে। বাড়ির বিশাল বাগানে প্যান্ডেলের কাজ চলছে। পুরোদমে খেয়াল রাখছে ঈশান আর নয়ন। রাইসুল দেওয়ান দুই ভাই সমেত বাদবাকি কাজকর্মের তদারকি করছেন।
বাড়ির ভিতরের চিত্রও একই ধরনের। পুরো ড্রয়িংরুমের মেঝেতে গোল হয়ে বসে বাড়ির গিন্নিরা, এলাকার মহিলারা রান্নাবান্নার কাটাকুটি তে ব্যাস্ত। যদিও এতো লোকের রান্নার জন্য বাবুর্চি চলে আসবে কিছুক্ষণ এর মধ্যেই। নিজেদের যার যার ঘরদোর পরিষ্কার করছে বাড়ির মেয়েরা। গেস্ট রুম ঝাড়পোছ দেখিয়ো দিচ্ছে বুয়াদের।
তিতির নিজের ঘর, ঈশানের ঘর দুটো ঘরই গুছিয়েছে সকাল থেকে। আজকে সাহরীর পর নামাজ পরে ঘন্টাখানেক মাত্র শুয়েছিলো বোধহয়। ধুলার চোটে গা চিটমিট করছে একপ্রকার। নিজের কিছু জামাকাপড় এনে রেখেছে এ রুমে। আত্মীয় সজন রা আসলে বাড়ির সবাই কমবেশি জানবেই তাদের বিয়ের কথা। তখন বারবার জিনিসপত্রের জন্য নিজের রুমে দৌড়াদৌড়ি টা চোখে লাগে। ঈশানের আলমারির এক সাইজে নিজের সব রেখে সবেই এসে দাড়িয়েছে বারান্দায়। বাড়ির সামনে বিশাল জায়গা তাদের। বাগানের দিকে মানুষজন এর সমাগম। কাজ চলছে সেখানে। বাড়ির এক সাইটে চুলা খোঁড়ার কাজ চলছে। দু দুটো বড় ষাড় বেধে রাখা হয়েছে জবাই এর জন্য। এসব কখন করবে এরা! বেলা কত হলো! সময় দেখলো। বেলা বেশি হয়নি। ভোর ভোর উঠে এতো কাজ করার জন্য মনে হচ্ছে এরকম।

রেলিঙে কনুই ভর দিয়ে নিচে তাকাতেই চোখ আটকালো তার ব্যাক্তিগত পুরুষটার ওপর। কালো রঙের একটা টি শার্ট আর কালো কার্গো প্যান্ট পরা। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে প্যান্ডেলের লোকেদের সাথে কথা বলছে। কাজের ধরন বুঝিয়ে দিচ্ছে হয়তো। মৃদু হাসলো তিতির সেদিকে তাকিয়ে। কি সুন্দরই না লাগছে লোকটাকে। রোদের তাপে ঘেমে-নেয়ে একাকার। লালচে হয়ে গেছে মুখটা। মাথার সিল্কি চুলগুলো ঘামে ভিজে লেপ্টে আছে কপালের সাথে। গায়ের পাতলা টি শার্ট এরও একই অবস্থা। পেশল শরীর আটকে দৃশ্যমান করছে শরীরের পেশির ভাজগুলো।
নিজের খুলে যাওয়া চুলগুলো খোপা করে ফেললো একটা কাটার সাহায্যে। ঈশান অন্যদিকে ব্যাস্তপায়ে হাঁটা ধরতেই নিজেও এসে বসলো বিছানায়। ফ্যান, এসি রেখে এক মূহুর্ত সরলে গরমে জান জানযায় যায়।অথচ লোকটা এই খা খা পড়া রোদে কি কষ্টই না করছে।

নিচে যেতে নিষেধ করছেন তাদের চন্দ্রা দেওয়ান। গ্রাম এলাকার মহিলাদের একেকজন এর কথাবার্তার ধরন একেক ধরনের। সুবর্ণা বিষয়টা নিয়ে সারাক্ষণ আলোচনা চলে তাদের মধ্যে। তাদের বাড়ির মেয়েদের মনে এসব নিয়ে কনো প্রভাব পড়ুক তা তিনি চাননা। রাইসুল দেওয়ান ও একই আদেশ দিয়েছেন মেয়েদের। আপাতত যখন সব মহিলারা বাড়িতে আসবেন গল্প করতে করতে আয়োজন এ সাহায্য করতে তখন অন্তত নিচে নামার দরকার নেই তাদের। খানিক বাদে নামলেই হবে। নিশি,নূরিও বোধহয় নিজেদের ঘর গোছাতে ব্যাস্ত। তমার মা, বাবা চলে এসেছে। তমা আর ওর ছোট্ট ভাইয়া এখনো আসেনি। সম্ভবত ঘুম থেকেই ওঠেনি।
রিশা,রোশনি,রাফি তিনজনেই এলাকার আরও ছেলেমেয়েদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করছে। তারা মহা উৎসাহী হয়ে আছে কখন ষাড় দুটো জবাই করা হবে। ওপরে এসে খবর দেবে বোনেদের সেটা। এই নিয়ে হাজার খানেক বার এসে প্রশ্ন করছে বাবা, চাচা আর ভাইদের। ঈশান কে খুজছে আপাতত তারা। আর কারোর দেওয়া তথ্যই ঠিকমতো বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না তারা। ঈশান কে পেলো রাহিয়ান দেওয়ান এর সাথে টাকাপয়সার হিসেবে মেলানোর সময়। সদর দরজার পাশে দাড়ানো দুজন। কাগজ কলমে জিনিসপত্রের দাম কত কেমন খরচ হচ্ছে, আরও কত লাগবে সে কথাবার্তা চলছে।

তিনজন বড় ভাইকে দেখে ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে দু পাশ থেকে জাপটে ধরলো তিনজন। ঈশান না তাকিয়েও অবাক হলো না। এ বাড়িতে এমন তাকে জাপটে ধরার সাহস এই তিনবিচ্ছুরই। বাপ ভাইয়ের দরকারি আলাপ বুঝতে পেরে তারাও হৈ হল্লা করলো না। ওখানেই চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো। রাহিয়ান সাহেব চলে যেতেই ঈশান হাটু ভেঙে বসলো ভাইবোন দের সামনে। রিশা, রোশনি একটু ক্লাসে এগোলেও বয়সে একদম বাচ্চা। আর রাফি টা তো বাচ্চাই। তিনজনকে সামনে একসাড়িতে দাড় করিয়ে নরম গলায় বললো,
____”কি দরকার?”
সবার আগে বলার জন্য দু হাত নেড়ে উঠলো রোশনি। তবে তাকে বলতে না দিয়ে রাফি চেঁচিয়ে উঠলো,
____”গরু দুইটা আল্লাহ আকবর দেওয়া হবে কখন বড় ভাইয়া?”
ঈশান ফোলা গাল টেপে রাফির। কোরবানি তে গরু জবাই এর সময় বরাবর আল্লাহ আকবর বলতে দেখে রাফির মাথায় ওটা ঢুকে গেছে। মৃদু হেসে বললে,

____”মিনিট বিশেক পরে।”
তিনজনের আগ্রহী হাসি হাসি মুখ মলিন হলো। চোখাচোখি করলো তিনজন।ঈশান ভ্রু জোরা তুলে জিজ্ঞেস করলো,
____”কি হলো আবার?”
রাফি একদম ঘেষে দাড়ালো ভাইয়ের কাছে। একহাতে ভাইয়ের কাধ আকড়ে ব্যাস্ত গলায় বললো,
____”বার্বি বলেছিলো যখন আল্লাহ আকবর হয় তাকে জেনো খবর দেই। “
____”তো দিবি…”
____”সে তো গোসলে যাবে। শ্যাম্পু খুজলো। গোসলে গেলে তো অনেক সময়…
এদের চিন্তার কারণ যুক্তিযোগ্য। মেয়েমানুষ গোসলে গিয়ে এতো কি করতে পারে যার কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় লাগে জানা নেই ঈশানের। তিতিরের ক্ষেত্রে এটা সে বেশি লক্ষ করেছে একদম। বিশেষ করে এ দুদিনে। ভুলে একবার বাথরুমে ঢুকলে দু ঘন্টা লাগয়ে শাওয়ার নিয়ে বের হয়। জিজ্ঞেস করলে জবাব পায় না মোটেই। মেয়েটা তাকে আবার ইগনোর এর ওপরেই চলে বেশির ভাগ। ভাই বোনদের দিকে তাকিয়ে বললো,

____”আমি তো রুমে যাবো। তাহলে বলে দিবো একটু পর শাওয়ার নিতে? চলবে?”
তিনজন মাথা ঝাকালো একসাথে। খুশিও হলো ঈশান বলে দিতে চাওয়ায়। এই খবরটা তাদের তো আবার বাকি বন্ধু বান্ধব দের জানাতে হবে। এরা হৈ হৈ করে সবাইকে জানাতে ছুট দিতেই মৃদু হেসে নিজের ঘরে এলো ঈশান।
বিছানার ওপরে গোসলের কাপড়চোপড়। তিতির নেই। রাফির ভাস্যমতে শ্যাম্পুর খোঁজে গেছে। বোধহয় নিশি বা নূরির কাছে। গায়ের ঘাম চিটচিটে ভেজা টি শার্ট খুলে চেয়ারের ওপর মেলে বিছানায় দু হাত পিছনে দিয়ে খানিক হেলে বসলো। এসি টা ফুল দেওয়া। তিতির গোমরা মুখে ঢুকলো খানিক পরে। ঘরে ঢোকার পর টের পেলো ঈশান। মেয়েটার পায়ের নূপুর জোড়া খুলে রাখা। যে কারণে শব্দটা কানে আসে না আজকাল। ঈশানকে উদাম গায়ে দেখেই মুখ বাকালো তিতির। দৃষ্টি সরিয়ে এসে ফোন খুঁজলো নিজের। সেটাও পাচ্ছে না। ঈশান আড়চোখে দেখছে বিরক্ত মুখখানা। গম্ভীর গলায় বললো,

____”কি খুঁজছিস? “
____”ফোন।”
____”যাবি শাওয়ারে,ফোনের কাজ কি?”.
____”নয়ন ভাইকে শ্যাম্পু আনতে পাঠাবো।”
ঈশানের আচমকা মেজাজ খারাপ হলো। তিতির মহা উদাস গলায় উত্তর গুলো দিচ্ছে তার। যেনো নেহাৎই জোর করে দিচ্ছে উত্তর। তারওপর শ্যাম্পু আনতে নাকি পাঠাবে নয়নকে! মানে কি!
____”কি শ্যাম্পু?”
তিতির তাকায় না ঈশানের দিকে। লোকটার উদাম শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে পারে না সে। হাত-পা কাপে। এই বাজে সমস্যা টায় নিজের ওপর ভীষন বিরক্ত সে। এ কারণেই কথা বলতে এলোমেলো হচ্ছে তার। খাটের তলায় নিচু হয়ে খুঁজতে খুঁজতে জবাব দিলো,

____”নয়ন ভাই জানে।”
বারবার এক নয়ন ভাই,নয়ন ভাই। রাগ চরে গেলো মাথায়।ঝড়ের গতিতে এসে দাড়ালো তিতিরের সমানে। মেঝে থেকে সোজা হতেই ঈশান কে এমন সামনে তপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে চমকালো ভীষন। দু পা পিছিয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গেই। ঈশানে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে স্থীর দৃষ্টি দিলো। রেগে কিচ্ছু বললো না। তবে গম্ভীর গলায় বললো,
_____”আমি এনে দিচ্ছি নাম বল।”
বড় বড় হলো তিতিরের চোখজোড়া। ঈশান এনে দিবে তার জন্য এসব!
____”আপনি? “
____”হু।”
____”কোনো কাজে যাবেন বুঝি বাইরে।”
____”না।”
____”তাহলে?”
____”দরকার হলে যাবো না? বল নিয়ে আসি।”
____”শুধু আমার শ্যাম্পুর জন্য? “
কপাল কুচকে সামান্য মাথা নাড়লো ঈশান। তিতির হতভম্ব হলো। বিশ্বাস হলো না সহসা নিজেকে। ঈশান আনবে শ্যাম্পু! তার জন্য যাবে মার্কেট এ! বিশ্বাসযোগ্য এটা? ব্যাস্ত গলায় বললো,

____”আপনাকে কষ্ট করে যেতে হবে না। আমি নয়ন ভাইকে বলে দিচ্ছি।সে কাউকে দিয়ে আনিয়ে নেবে।”
রাগ সংযত করে ভারি গলায় বললো,
____”তোকে আর কতবার বলে দিতে হবে যে আমি তোর হাসবেন্ড। যা দরকার আমাকে বলতে তোর সমস্যা কি?”
ঈশান যতবার এই তীব্র অধিকারবোধ থেকে নিজেকে তিতিরের হাসবেন্ড বলে দাবি করে ততবার বুকের ভিতরটায় উথাল-পাথাল শুরু হয় তার। কন্ঠ নামিয়ে বললো,
_____”আগে তো কখনো এমন করেননি। তাই অভ্যাস নেই আরকি।”
_____”করে নে তাহলে অভ্যাস।”
তিতির জবাব দেয় না। দৃষ্টি সরিয়ে রাখে ঈশানের থেকে অন্য দিকে। ঈশান আলমারি থেকে শুকনো একটা টি শার্ট গায়ে জড়াতে জড়াতে বেরিয়ে যেতে উদ্ব্যত হয় ঘর থেকে, তবে যায়না। কি মনে হতেই ঘুরে দাড়ায় বেড সাইট টেবিলের সামনে। খানিক্ষন ড্রয়ার হাতড়ে বের করে একটা মাঝারি বক্স।

____”বোস এখানে।”
তিতির জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই, চোখের ইশারায় এগিয়ে এসে বসতে বলে ঈশান। ধীর পায়ে তিতির এসে বসেও।
ঈশান বক্সটা খুলে সামনে ধরলো একজোড়া ভীষন সুন্দর নূপুর। তিতির হা হয়ে গেলো। মিনমিন গলায় বললো,
__”নুপুর কোথায় পেলেন?”
তিতির এর কথার জবাব দিলো না ঈশান। হাটু গেড়ে বসলো মেঝেতে। আলতো হাতে তুলে নিলো তিতিরের পা জোড়া। থমকে গেলো তিতির। চমকে সরিয়ে ফেলতে চাইলো। তবে ঈশান তা হতে দিলো না।
ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই তাকালো পায়ের দিকে। সুন্দর একজোড়া নূপুর পরানো হচ্ছে তার পায়ে। ঈশানে তিতিরের আশ্চর্য মুখের দিকে তাকালো।হাস্কিস্বরে বললো,
_____”ঈশান আরশাদ এর নিশ্চয় বউয়ের জন্য নূপুর কেনার সামর্থ্য আছে?
তিতির লাজুক দৃষ্টি নামায়। মিনমিন করে বলে,
_____”সেটা কখন বললাম যে নেই। হঠাৎ…
_____” তোর নূপুরের শব্দে সকালে ঘুম না ভাঙলে সেটা সকাল হলো নাকি!”

সরল সহজ স্বীকারোক্তি তে বুকের বা পাশ চিনচিন করে উঠলো তিতিরের। তার নূপুর এর এক পার্ট খুঁজে পাচ্ছে না দু দিন হলো। বাধ্য হয়ে আরেকটা খুলে রেখে দিয়েছে। ঈশান যে সেটা খেয়াল করেছে বা করতে পারে ক্ষুনাক্ষরেও আন্দাজে ছিলো না তিতিরের। বিধায় আচমকা ঈশানের এহেন কার্যে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো সে।
ঈশান নিজের হাতের তালুতে নিলো তিতিরের পা জোড়া।ফর্শা পায়ে চকচক করছে নতুন অলংকার। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো ঈশান সেদিকে।
____”খুলবি না নূপুর জোড়া।”
____”ভারি কেনো এতো?”
____”শব্দ জেনো কানে আসে তাই। যতদিন কপালে একটা মিষ্টি চুমু একে ঘুম না ভাঙাচ্ছিস,ততদিন সকাল বেলা বিছানা ছেড়ে যখন উঠবি এই শব্দে যেনো আমার ঘুম ভাঙ্গে। মনে থাকবে?”
লাজে রাঙা হয় তিতিরের মুখখানা। জবাব দেয় না। ঈশানের খসখসে হাতের তালুতে রাখা তার পা জোড়ার দিকে তাকিয়ে বিছানার চাদর খামচে বসে থাকে। ঈশানের ভীষন ইচ্ছে করছে পা জোড়ায় আলতো ভেজা চুমু খেতে। তবে সেটা আপাতত করা যাবেনা। নেশা জাতীয় জিনিস আপাতত কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। মেয়েটা যতদিন না ইজি হচ্ছে তার সাথে, ততদিন সে খুব চেষ্টা করবে মেয়েটাকে বিব্রতকর অবস্থায় না ফেললে। তবে যতটুকু করার দরকার ততটুকু সে করবেই। না হলে অস্থিরতা থামবে না তার। এই যেমন ওই কমলার কোয়ার মতো মিষ্টি ওষ্ঠজোড়ার স্বাদ সকাল বিকেল নিতে মন চায় তার…একবার পেলে বারবার এর যে নেশা হয়, সেটা হয়ে গেছে বোধহয় তার।

_____”দশ মিনিট অপেক্ষা কর।আমি শ্যাম্পু পাঠিয়ে দিচ্ছি। কোনটা মেসেজ কর আমাকে। নাম মনে থাকবে না।”
এখানে আর সময় নষ্ট করে না সে। ঘরে এসেছিলো তিতিরকে দেখতেই। সাথে রেস্ট নেওয়াও হয়ে গেলো। দ্রুত মেয়েটাকে শ্যাম্পুটা দিয়ে আবার কাজের ওদিকটা দেখতে হবে। তার বাবা যদি টের পায় সে সেখানে নেই, আরেকদফা ধমকা ধমকি শুরু করবে।

নিচে প্রচুর মানুষ এর আনাগোনার শব্দ ভেসে আসছে কানে। গরু জবাই এর কাজ শেষে কষাইরা দ্রুত মাংশ কাটার কাজও শেষ করে দিয়েছে। পুরোদমে রান্নার প্রস্তুতি চলছে এখন। ডেকোরেশন এর লোকেরা চেয়ার টেবিল সাজাতে ব্যাস্ত। বাড়ির ভিতরে মানুষ গিজগিজ করছে। চন্দ্রা দেওয়ান এর গ্রামের লোকজন এসে পৌছেছে কিছুক্ষণ আগে। গ্রামের একগাদা আত্মীয় সজনে বাড়ি পরিপূর্ণ একেবারে। ছোট বাচ্চাদের ছোটাছুটি তে মুখরিত বাড়ি টা। নিশি সবেই নেমেছে নিচে। নূরি, তিতির কাউকেই ডেকে সাড়া পায়নি। মায়ের সাথে হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছে আপাতত।
তমা আর তিতির বারান্দার দাড়িয়ে দেখছে নিচে মানুষ জনের নিদারুণ ব্যাস্ততা। বেশ লাগছে দেখতে। দুজনের চোখই ব্যাস্ত হয়ে খুজছে দুজনের প্রিয় মানুষ কে। আপাতত কাউকেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
দুপুরে এসে গড়িয়েছে সময়। সকালের থেকে দ্বিগুন গরমে অতিষ্ঠ একেবারে। আবহাওয়া একটু ঠান্ডা ঠান্ডা থাকলেই পারতো। এমনতি রোজ রোজ বৃষ্টি নামে, মেঘ সেজে থাকে আকাশে। আজকে বৃষ্টি না নামলেও অন্তত একটু রোদ টা কম থাকলে হতো।
নিজেদের বাড়ি অথচ নিজেরা নিচে নামতে পারছে না। সকাল থেকে ঘরবন্দীর মতো বসে আছে। রিশা রা তিনজন কি সুন্দর ছোটাছুটি করছে সারা বাড়ি, বাইরে। তাদের আটকাচ্ছে না কেউ। আটকানোর কেউ নেই। তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে,

____”বড় হওয়াটা কিন্তু ভালো জিনিস না তমা…যত বড় হবি তত জীবনের সুখের আয়ু কমবে, বেচে থাকার আয়ু কমবে, হাজার একটা জ্বালা যন্ত্রনা নিজেকে সামলাতে হবে। ছোটই কত ভালো ছিলাম বল। ওদের দেখ,না আছে চিন্তা, না আছে ভাবনা।”
____”তা ঠিক। আগে মনে আছে এরকম আমরাও ছুটতাম ছোটবেলায়। তখন ছুটতে নিষেধ করতো পরে হা পা ভাঙ্গবো বলে। না কারোর নিষেধ শুনতাম আর না মানতাম। “
তিতির, তমা সেসব দিনের কথা মনে করে হাসে মৃদু।
____”তখন ঈশান ভাই প্যাকেট দিলো তোকে দিতে। কি ছিলো ওতে?”
____”শ্যাম্পু।”
____”কোথায় পেলো?”
তিতির ব্রু কুচকে তাকায়। গাধার মতো প্রশ্ন। কোথায় পায় মানে!
____”দোকান থেকে।”
____”কার ওটা?”
____”আমার।”
____”ঈশান ভাই কেনো দিলো?”

তমার বাচ্চাদের মতো প্রশ্নে মেজাজ খারাপ হচ্ছে তিতিরের। কি, কেনো, কিভাবে হাজার একটা বাড়তি কথা অতিষ্ঠ করে ফেলছে মেয়েটা। বিরক্তমাখা গলায় বললো,
____”আমার শ্যাম্পু শেষ হয়ে গেছিলো।তাই এনে দিলেন উনি।”
তমার চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো। হা করা মুখখানা চাপিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
_____”বলিস কি! এনে দিলো তুই বলতেই?”
তিতির ঠোঁট উল্টায়। নিচের দিকে ঈশানকে খুঁজছে তার চোখজোড়া। নির্বিকার গলায় জবাব দেয়,
____”আমি বলতে যাবো কোন দুঃখে। আমি তো নয়ন ভাইয়া কে বলতে যাচ্ছিলাম। সেটা শুনে সে কাউকে দিয়ে নিয়ে আসলো মনে হয়।”
ঈশান নিজে গিয়েছিলো মোড়ের দোকানে। তমা আসার সময় ঈশানকে নিয়ে আসতে দেখেছে সেটা। নিজেই হয়তো দিতেও আসতো। তবে রাসেদ দেওয়ান এর ডাক পরায় আর এদিকে তমাকে বাড়ির ভিতর ঢুকতে দেখে তার হাতেই দিয়েছে। তমা অতী উচ্ছ্বসিত ভাবে ঘেষে আসে তিতিরের কাছে।বাঁকা গলায় বলে,

____”প্রেম তো ভালোই মাখো মাখো হয়েছে দেখছি। না হলে ঈশান আরশাদ দেওয়ান তিতিরপাখির জন্য নিজে পায়ে হেঁটে এই ব্যাস্তায় দুপুরের খা খা রোদের মধ্যে শ্যাম্পু কিনতে যায়!!”
তিতির নিজের রক্তিম গাল দুটো আড়াল করতে অন্য দিকে তাকায়। নিজের দোলনায় পা দুটো তুলে বসলো। তমাও পাশাপাশি আসা। তিতির পা তুলে বসতেই নূপুর এর জোরালো শব্দে আরেকদফা খামচে ধরলো তমা তিতিরের হাতের বাহু। চেঁচিয়ে উঠলো,
____”এটা কোথায় পেলি…কি প্রিটিইইই।”
নিজের পায়ের দিকে এক নজর দিয়ে ধীর গলায় বললো,
____”তোর ভাই দিয়ে গেলো একটু আগে।”
____”আগেরটা হারিয়ে ফেলেছিস,ওটা পেয়েছিলি? “
মাথা নাড়ে তিতির। পায়নি সেটা।
____”তার জন্যই দিলো এটা।”
তমা গদগদ হয় একেবারে।
____”প্রেম জমে ক্ষীর।এটা স্বীকার করবি না তাও?”
____”তোর ভাই একটাবারের জন্য ভালোবাসি বলেনি। সময় লাগবে নাকি তার ভালোবাসতে। কিসের প্রেম তবে!”
তমা এক হাতে জাপটে ধরে তিতিরের কাধ। ফিচেল গলায় বলে,

____”ভালোবাসি সামান্য শব্দ মাই বার্বি। ওটা তো চাইলেই উচ্চারণ করে ফেলা যায়। সবাই না বাসলেও ভালেবাসি বলে। আমার ভাই না হয় ভালোবেসে তবেই ভালোবাসি বললো। সেটা ভালো নয় কি? তাছাড়া এইযে এতো ছোট ছোট জিনিস লক্ষ করে যত্ন করছে এসব ভালোবাসা নয়? হুম হুম?”
____”সর তো। তুই আর তোর জাদরেল ভাইয়ের ভালোবাসা…অসহ্যকর বিষয়।”
তমা খিলখিলিয়ে হাসে। ঈশানের কথা তুললেই রাঙ্গা হয় তিতিরের মুখখানা। লজ্জায় হুটোপুটি খায় একেবারে। ভালোবেসে গলে যায়,অথচ জেদের কাছে হার মেনে কেউ মুখে স্বীকার করতে নারাজ।

ক্রমাগত ফোন বেজে যাচ্ছো নূরির। ফোনটা তিনদিন হলোই বেজে যাচ্ছে। সেদিন রাতের বিশ্রি ঘটনাটার পর ভুলেও ইয়াজের ফোন তোলেনি সে,আর না তো রিপ্লাই করেছে। যতবার ইয়াজ কল করে,আবেগি বার্তা দিয়ে মেসেজ করে ততবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওই ঘৃন্য দৃশ্য গুলো। গা গুলিয়ে ওঠে তার। কান্না পায় ভীষন। ভালোবাসায় সব অসহায় লাগে। মন তো বলে সব ছেড়ে ছুড়ে ক্ষমা করে দিতে মানুষ টাকে। আবার নারীসত্ত্বা কঠোর ভাবে নিষেধ করে সেটা। মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত সে। না খেতে পারে,না ঘুমাতে পারে। ঘরময় অন্ধকার করো শুয়ে থাকে সারাটাক্ষন। কাউকে বলতেও পারছে না কিচ্ছু। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে উঠো বসে। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো নিশি। ভেজা চুল,গোসল করেছে হয়তো। দ্রুত কাভার্ট থেকে হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে বসে পরলো চুল শুকাতে। জানালার,দরজার পর্দা গুলো এমন হাট করে টেনে দেওয়া দেখে ভ্রু কুচকে গেলো। উঠে গিয়ে টেনেও দিলো।

____”দিনের বেলা এমন অন্ধকার করে বসে থাকিস।কেমন লাগে তোদের! “
____”খারাপ না।”
____”নিচে চল। পাড়ার চাচিরা সবাই চলে গেছে। দিদা নিচে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছে এখন।”
____”দিদার ওই ক্যাটক্যাটে লোকজন তো আছেই।”
নিশি হেসে ফেলে। তারা সবাই আতঙ্কে থাকে তাদের দিদার এসব প্রত্যন্ত গ্রামের আত্মীয় সজন নিয়ে।
____”তারা তো আছেই। কাল অবধি থাকবেই।”
নূরি মুখ বাকায়।
____”তাহলে কাল অবধি এমন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবো।অসহ্য।”
নিশির হাতের কাজটা সেরে পা তুলে এসে বসে বিছানায়। নূরির শুয়ে ছিলো বিধায় চুলগুলো বেশ এলোমেলো দেখাচ্ছে।কেঁদে কেটে মুখটা ফোলা ফোলা।
____”কেঁদেছিস তুই?”
নূরি অপ্রস্তুত হয় খানিকটা। দু হাতে মুখ ডলে মাথা নাড়ে দুদিকে।
____”কাঁদিনি। “
____”মনে হচ্ছে কেঁদেছিস। চোখটোখ ফুলে আছে।”
____”ঘুমিয়েছিলাম।তাই হয়তো…
নিশি মুখে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করে না। চঞ্চল নূরির বদলানো বেশ চোখে পরেছে তার। বেশ কয়েকদিন হলোই এমন দেখিছলো। দু তিনদিন হলো সেটা আরও বেরেছে। আর কারোর সাথে না হলেও তার কাছে ভাইবোন দের চঞ্চলতা কখনো কমেনি এর আগে। এবারই প্রথম নূরির এমন পরিবর্তন। এটা নিয়ে সে ভাবেনি তা নয়। তবে সময় দিতে চায় নূরির নিজের মুখে সেটা বলার জন্য। কোনো সমস্যা কি না! কিছু নিয়ে ভাবনায় আছে কিনা। তবে নূরি মুখ ফুটে কিছু না বলায় সেও জোর করেনি একবারও। তার দৃঢ় বিশ্বাস আজ না হয় কাল নূরি নিজ থেকেই বলবে সেসব ।

____”আপু?”
____”হু।”
____”নিয়াজ ভাই এসেছে?”
____”ওরা তো সবাই সকাল থেকেই আছে। “
____”সেদিন মা বলছিলো তোমার জন্য একটা বিয়ের কথা বলেছে বড় বাবার এক বন্ধু। “
____”মা বলেছে আমাকেও।”
____”নিয়াজ ভাই এর কথা বাড়িতে জানাবে না?”
নিশির হাস্যজ্জল মুখ মলিন হয়। এটাই তো ভয়ের। নিয়াজের কথা বাড়িতে জানানোর পর সবাই কি রিঅ্যাক্ট করবে। নিয়াজ তো বিশাল ভয় ঈশান কে নিয়ে। এতদিন এর বন্ধুত্ব। এতদিন বলতে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে প্রথম বন্ধুত্বই দুজনের। সেই বন্ধুর বোনের সাথে বিগত আট দশ বছরের প্রেম। এতদিনে জানালে ঈশান টা কেমন রিঅ্যাক্ট করে কে জানে! ভুল বুঝবে কি না!

____”নিয়াজ কথা বলবে ভাইয়ার সাথে। জলদিই। “
নূরি হেলান দিয়ে বসে বিছানায়। উদাস গলায় বলে,
____”নিয়াজ ভাই না মানার মতো ছেলে না। তাকে যে কেউ পছন্দ করবে। আমাদের বাড়ির সবারও আপত্তি থাকবে না দেখো তুমি।”
____” কি জানি। ভয় হয় তবুও। অশান্তি না হয় ভাইয়ার সাথে আবার।”
নূরি বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎক্ষন। বুকের ভিতর জমাট বাধা কথাগুলো ঘুরপাক খায় ক্রমাগত।
_____”নিয়াজ ভাই তোমাকে খুব ভালোবাসে আপু।”
নিশি হাসে সামান্য। সে জানে ওই পাগল ছেলেটা ঠিক কতটা পাগল তার জন্য। ভালোবাসার দাবি নিয়ে সে আগে এগোলেও, নিয়াজ সেটাকে স্বীকৃতি দিয়ে এতগুলা বছর আগলে রেখে তাকে। ভালেবাসার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে।

____”খুউউব।”
____”বিয়ের তাড়া দেয়না?”
____”সকাল বিকাল।”
____”কাছে চায় তোমাকে?”
____”সর্বক্ষণ। তবে তোর নিয়াজ ভাইকে তো জানিসই। পাগলামি টা আমার আর ভাইয়াদের সাথেই করে শুধু। এমনিতে ভীষন ম্যাচুয়র। বুঝদার। কাছে চায় সেটা বৈধ উপায়ে। সর্বোচ্চ পাগল হয়ে চুমু খাওয়ার বায়না করে সময় অসময়। এর বেশি এক বিন্দুও না।”
নূরির বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসতে চায়। তার আর নিশির সম্পর্ক বরাবরই বোন কম,বন্ধু বেশি। তারা একে অপরকে যতটা ইজিলি সবটা বলতে পারে আর কারোর সাথে সম্ভব নয়। যেমনটা সম্পর্ক তমা আর তিতিরের। কিছু জিজ্ঞেস করা বা শেয়ার করার আগে দু বার ভাবতে হয়না তার। তবে আজ কেনো ভাবছে সে এতো! জানানো উচিত নয়কি? এর একটা সমাধান চাওয়া উচিত নয়?

সারাদিন এর ব্যাস্ততা শেষে ইফতারের সময় আসন্ন প্রায়। আর ঘন্টাখানেক বাকি আছে। এরইমধ্যে প্রায় সকলেই চলে এসেছে। চন্দ্রা দেওয়ান এর আশ্রম এর বাচ্চারা, এলাকার মানুষজন,তাদের সকল আত্মাজন তো আছেই। নিচে সারি সারি টেবিল চেয়ারে বসতে দেওয়া হচ্ছে সক্কলকে।
বাড়ির ভিতরে বসে বাড়ির মহিলারা। বাইরে গ্রামের মহিলাদের জন্য আলাদা বসার জায়গাও রয়েছে। তিতির রা চার বোন ওপর থেকে নেমে আসতেই নিচের বেশির ভাগেরই নজর আটকালো তিতিরের দিকে। বাকিরা বাড়ি থেকেই পড়াশোনা করে বিধায় চেনে সকলেই। একমাত্র তিতিরই থাকে না বাড়িতে। তিতির রা নেমে এসে বসলো চন্দ্রা দেওয়ান এর পাশেই। মেঝেতে বসার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। চন্দ্রা দেওয়ান অবশ্য বসা হুইল চেয়ারে।

____”এটা তোমার মেয়ের ঘরের নাতনি টা না বুবু?”
প্রতিবেশী এক জা এর কথায় মৃদু হেসে তিতিরের মাথায় হাত বুলালো চন্দ্রা দেওয়ান।
____”হুম।আমার পুত্তুল টা।”
____”অনেক বড় হয়ে গেছে। দেখেছিলাম তখন এতটুকুন ছিলো। তারপর কত বছর দেখিনি। “
মহিলা আগ্রহ চোখে তাকালো তিতিরের দিকে।বলা বাহুল্য সকলেই প্রায় মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
_____”তা তুমি কি তোমার চাচার সাথেই থাকো?”
মাথা নাড়লো তিতির।বিনয়ের সাথে বললো,
____”নাহ হোস্টেল এ থাকি। ছোট আব্বুর বাসা থেকে আমার ভার্সিটি দূরে। আগে স্কুল করতাম সেখান থেকেই।পরে শিফট হয়েছি।”
____”তোমার চাচার ছোট ছেলেটার সাথে তোমার বিয়ের কথা চলতো না?”
তিতির থমকে থাকায় চন্দ্রা দেওয়ান এর দিকে।উত্তর টা দেন চন্দ্রা দেওয়ান নিজেই।

____”ওটা কথার কথা তো হয়েই থাকে। তেমন কিছু না।”
____”কথার কথাগুলাই আগে পরে সত্য হইয়া বইসা থাকে। সুন্দরী, যুবতী মাইয়া ঘরে থাকলে এমন হবেই। দিয়া দেও চাইলে। মাইয়া ঘরে রাইখা লাভ কি! তাছাড়া তোমাগো ঈশানের সাথেও তো নানা কানাঘুষা শুনি কয়েকদিন হলো। বিয়া নাকি দিতে চাও ওদের। দিলে দিয়া দেও। আগে পরে ওই পাড়ার সুবর্ণার মতো কাহিনি ঘইটা যাইতেই পারে। তাছাড়া তোমাগো মাইয়ার উপরে বদ নজর বেশিই পরবো।”
তিতির মাথা নিচু করে বসে থাকে। চন্দ্রা দেওয়ান কথা বারান না। এদের সাথে যুক্তিতর্কে পারা যাবে না। মাঝখান থেকে কথা বারবে। ইফতার এর সময়ও হয়ে এসেছে প্রায়। তিতিরের ব্যাস্ত চোখ অযথা খোজে ঈশান কে। ঈশানের এখানে আসার সম্ভাবনা নেই,তবুও খুব করে ইচ্ছে করে লোকটা এসে সবার সামনে তাকে স্ত্রীর পরিচয় টা দিক।
চন্দ্রা নাতনির দিকে তাকায়। তমা উশখুশ করছে মুখের ওপরে কিছু বলতে। দিদার চোখের ইশারা চুপ করে। চন্দ্রা দেওয়ান গম্ভীর গলায় বলে,
____”আযান দেবে। বাড়তি আলোচনা রেখে দোয়া কালাম পড়ো সকলে।”
বিষয়টা নিয়ো আলোচনা দীর্ঘ করতে না পেরে বড্ড হতাশ হলো যেনো সকলে। আড়চোখে সকলে দেখছে তিতির দের সব বোনদের। চন্দ্রা দেওয়ান কে ভয়ডর পান তারা। তার আশকারা না-পেয়ে এ নিয়ো আলোচনা আর বাড়লো না।

ইফতার শেষে নামাজ পরে রাতের খাবারের জন্য বসানো হয়েছে সকলকে। বাইরে তুমুল হৈ হল্লা চলছে একেবারে। বাড়ির ছেলেরা সকলে নাক অবধি ডুবে আছে। এটা সেটা নিয়ে ছুটতে হচ্ছে এদিক ওদিক। বাড়ির মহিলারা ভিতরে সকলকে নিয়ে ভীষন ব্যাস্ত। তিতিরের ফোনটা নিয়ে কার্টুন দেখতে দেখতে সোফায় বসে খাবার খাচ্ছে রাফি। কার্টুন এর লোভে হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছে সে। আচমকা কল বেজে ওঠায় দারুণ বিরক্ত হলো। কেটে দিলো সুন্দরমতো। তবে থামার নাম গন্ধও নেই। একের পর বেজে যাচ্ছে কল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ঘর ভর্তি মানুষ এর মধ্যে তিতির কে খুজলো সে। চোখে পরলো, তবে ঘরের অন্য পাশে। নূরি,নিশি আর তমার সাথে ড্রয়িং রুমের এক কোনে বসে খাবার খাচ্ছে। এতো মানুষ এর হট্টগোল এর মধ্যে ডেকে জীবনেও পাওয়া যাবে না। প্লেটের দিকে তাকালো সে।নিজের খাবারও শেষ হয়নি। তার মায়ের কড়া আদেশ ছিলো খাবার শেষ না করা অবধি এক পাও যেনো না ওঠে। অগত্যা পঞ্চম বারের মতো কলটা কেটে খাওয়ায় মন দিলো না। সাথে চালু করলো ফোনের নট ডিসটার্ব মুড। প্রায় আধ ঘন্টা পর উঠে গিয়ে ফোন গুজে দিলো তিতিরের হাতে।
তিতির রা তখন খাওয়া শেষে নিচতলার বারান্দায় দাড়িয়ে বাইরের আয়োজন দেখছে। রাত্তির বেলা এ ধরনের আয়োজন বরাবরই ভাল্লাগে তাদের। নস্টালজিক লাগে বলতে গেলে।

____”একটা নাম্বার থেকে বারবার ফোন আসছিলো বার্বি।অনেকবার…”
তিতির ভ্রু কুচকে ফোন খোলে। আননোন নাম্বার। ট্রু কলারে সো করেনা কারোর নামই। ব্যাক করবে কি! ভাবতে ভাবতেই আঠারো তম মেসেজ ভেসে উঠলো ফোন স্ক্রিনে। বড় বড় হয়ে গেলো তিতিরের চোখজোড়া। কেঁপে উঠলো থরথর করে হাতটা। তমার নজর এড়ালো না সেটা।তিতির অসহায় চোখে তাকাতেই ইশারা করলো খানিকটা সরে আসতে। তিতির আসলো। ফোনটা তুলে দিলো তমার হাতে। মেসেজে লেখা,
____”পরী, আমি তোমার বাড়িতে। বাইরে এতো এতো আয়োজন হচ্ছে। এখানেই আছি। একটা বার একটু আমার সাথে দেখা করো প্লিজ। করতেই হবে দেখা। কল ধরছো না। আমি কিন্তু দেখা না করো এক পা ও নড়বো না।”
এটা শেষ মেসেজ টা। এর আগেও একই ধরনের মেসেজ। অসংখ্য ফোন কল। তিতির জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তমার জবাব এর আশায়। তমার ফোনটা দেয় তিতিরের হাতে। গম্ভীর গলায় বলে,

____”যা মনে হচ্ছে। লোকটা দেখা না করে যাবে না।”
____”বাড়ির কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হবে।”
____”বাড়ির সবার কথা ছাড়। ভাইয়া জানলে সর্বনাশ হবে। সেদিন যে রিঅ্যাক্ট করেছে। আজকে আবার দেখলে খুনোখুনি হবে একটা।”
কথা শেষ হতে না হতেই ভাইব্রেট করে উঠলো ফোন।
____”কি করবো।”
____”বাড়ির পিছনে আসতে বল। আমিও যাচ্ছি সাথে। বল জাস্ট ২ মিনিট।”
তিতির খামচে ধরে রাখে তমার হাত।ব্যাগ্র কন্ঠে বলে,
_____”না গেলে হয়না। আমার একদম মন সায় দিচ্ছে না তমা।”
তমারও একই কথা মনে হচ্ছে সত্যি বলতে। তবে যা বুঝছে লোকটা দেখা না করে যাবে না। সেদিনই যা পাগলামি দেখেছে বিশ্বাস নেই এক ফোটাও।

____” সেদিন কেমন উন্মাদ এর মতো করলো দেখলি না? যদি সত্যি সত্যি বাড়ির ভিতরে চলে এসে সিন ক্রিয়েট করে? তখন কি করবি?”
তিতিরের আচমকা কান্না পাচ্ছে। বাড়ি ভর্তি এতো এতো মানুষ। একটা পরপুরুষ এর সাথে এতো রাতে সবার চোখ এড়িয়ে দেখা করতে যাওয়া নেহাৎই দৃষ্টি কটু দেখায়। কারোর চোখে পরে গেলে কেলেংকারী ঘটার সম্ভাবনা প্রচুর। তবে আপাতত কিচ্ছু করার উপায় নেই। রাহাত ক্রমগত টেক্সট করে যাচ্ছে। যতদূর মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বাড়িতে চলে আসতে পারে। অন্যদিন হলে না হয় একটা মিমাংসা করতে পারতো, আজ না বের হয়ে উপায় কি! পাচ গ্রামের মানুষ এর সমানে কিছু করে বসলে তাদের বাড়ির মানসম্মান কোথায় গিয়ে ঠেকবে!
রাহাত কে ছোট্ট একটা মেসেজ করে আসতে বললো বাড়ির পিছনে। নিশি, নূরি কে নিজেদের ঘরে যাচ্ছে বলে ধীরেসুস্থে বেড়িয়ে এলো। এতো এতো মানুষ।এর চোখ এড়িয়ে বের হওয়া বড্ড রিস্কি।

অন্ধকারে পাথরের ন্যায় দাড়িয়ে আছে রাহাত। দেওয়ান বাড়ির পিছনে এদিকটায় একটা ছোট্ট গেট আছে। সেদিক দিয়েই ভিতরে এসে দাড়িয়েছে। পিছনে আলো জ্বালা হয়নি, সম্ভবত কোনোদিনই জ্বলা হয়না। যে কারণে ঘোর অন্ধকার। যাতায়াত সেরকম হয়না বলে হয়তো গাছগাছালিতে ঢাকা পরা চারপাশ। তিতিরের মেসেজ পেয়ে এসে দাড়িয়ে আছে প্রায় মিনির দশেক। মেয়েটা এখনো আসেনি। ভাবাভাবির মধ্যে দেখতে পাওয়া গেলো পরিচিত নারীটির অবয়ব। আধো অন্ধকারে আসছে। সাথে আরেকজন আছে। সেও নারী। একটু কাছে আসতেই রাহাতের বুঝতে অসুবিধা হলো না এটা সেই মেয়েটা। তমা নাম। যে সেদিনও রেস্টুরেন্টে এসেছিলো তার পরীর সাথে।
তিতির, তমা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে আসছে। বাড়ির দরজা টা একটু আলগা করে খুলেই রেখে এসেছে। খোলা টা যদিও কারোর চোখে পরবে না। কারোর চোখে না পরলেও কেনো যেনো মনে হলো খোলা রাখার কথা। রাহাত কে দেখতে পাওয়া গেলো প্রকান্ড আমগাছটার নিচে দাড়িয়ে থাকতে। বাড়ির ওপাশের ঝলমলে আলোর রেখা এসে পরছে এদিকটায়। সেরকম অন্ধকার লাগছে না। ইতস্তততা কাটিয়ে এসে দাড়ালো তিতির আর তমা। তমা দূরে দাড়াতে চাইলেও আজকো তিতির তা হতে দিলো না। টেনে দাড় করিয়ো রাখলো পাশেই।
রাহাতের দিকে তাকাতেই চোখে পরলো একজোড়া ভীষন অসহায় চোখ। ছলছল করছে সেটা। অপলক তাকিয়ে তার দিকে। রাহাত কিছু বলার আগেই তিতিরের ভারি কন্ঠ শুনলে পেলো,

____”রাহাত ভাই। আপনি অন্তত এমন পাগলামি করবেন আশা করিনি আমি। বাড়ির কেউ দেখে ফেললে কি হতে পারে আন্দাজ আছে আপনার!”
রাহাত দু পা এগিয়ে আসে। আশ্চর্যজনক ভাবে পা জোড়া কাঁপছে তার। এই মেয়ের সামনে বড্ড অসহায় সে।
____”আমি বাঁচতে পারছি না পরী তোমাকে ছাড়া। “
তমার হাতের টান স্পষ্ট অনুভব করে তার পিঠের অংশে। তিতির নিজেও ভীষন ইতস্তত। পরিচিত একটা মানুষ। বিগত পাঁচ -ছয় বছরের পরিচয়। কতশত কথা হয়েছে, কতদিন স্বাভাবিক ভাবে মুখোমুখি হয়েছে। আজকাল বড্ড অস্বস্তি ঘিরে ধরে মানুষটার সাথে কথা বলতে গেলেই…
নরম গলায় বললো,
____” এটা কোনো কথা না রাহাত ভাই। বাঁচতে পারছি না এটা বললে জীবন থেমে থাকবে না। সেটা আপনিও জানেন, আমিও। আমাদের কোনো ধরনের রোমান্টিক সম্পর্ক ছিলো না, রাত জেগে প্রেমালাপ আমাদের হতো না। স্কুল কলেজ ফাঁকি দিয়ে আর দশটা সাধারণ কাপল এর মতো রিকশায় ঘুরে বেড়ানো ডেটে যাওয়া এসব কল্পনাও করিনি আমি আপনার সাথে। “
____”আমি তো করেছি।”

____”সেটার জন্য আমি আপনাকে ব্লেম করিনা। করবোও না। আপনি আমাকে ভালোবেসেছিলেন। এতগুলো বছর সেই ভালোবাসা থেকে আগলে রাখতেন আমাকে। আমি সেটা অনেক পরে টের পেয়েছি। যখন টের পেয়েছি আমি আপনাকে প্রশ্রয় দেইনি,আপনিও প্রশ্রয় চাননি। স্বাভাবিক, সুস্থ একটা পরিচয় ছিলো আমাদের। আপনাকে সেসময় যদি ফোনে পেতাম আমি হয়তো আজকের দিনটা অন্য রকম হতো। কিন্তু সেটা হয়নি। আমি প্রচন্ড রকমের ভাগ্যে বিশ্বাসী। জন্ম,মৃত্যু, বিয়ে তিনটাই খোদার পরিকল্পনা মতো হবে। আপনি আমি একচুল সেটার পরিবর্তন করতে পারি না,পারবো না। আপনার ভালোবাসা মিথ্যা ছিলো না, আমি চলে আসার আগের রাতে পার্কে বসে আপনাকে দেওয়া আমার কথাও মিথ্যা ছিলো না। আপনি যদি আমার বাড়িতে এসে বিয়েতে রাজি করাতে পারতেন আমার পরিবার কে। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করে আপনাকে বিয়ে করে নিতাম হয়তো। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমি আপনার ভাগ্যে ছিলাম না রাহাত ভাই। আমি অন্য একজনের স্ত্রী। বিয়ে জীবনে একবারই হয় রাহাত ভাই। আমি সেই নীতিতে বিশ্বাসী। এ জীবনে আমি আমার স্বামী কে ছেড়ে অন্য পুরুষ এর কাছে যেতে পারবনা। সম্ভবই নয়। “

ডেকোরেশন এর লোকদের সহ বাকি সবার জন্য বরাদ্দ টাকা রাখা ঈশানের কাছে। টাকা নিতে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে ঢুকলো সে। আলমারি খুলে টাকা পুরে নিলো নিজের প্যান্টের পকেটে। ঘরে র থেকে বের হওয়ার সময় খেয়াল হলো পুরো ঘরে তিতির নেই। এমনকি নিচে আসার সময়ও সবাইকে দেখলেও তিতির চোখে পরলো না কোথায়। নিশি বললো ওপরে এসেছে। ওর রুমে কি! হতেও পারে। যেহেতু তমাকেও দেখলো না কোথাও। নিজের রুমের দরজা লক করে তিতিরের ঘর ধাক্কা দিতেও খেয়াল হলো সেটাও বাইরে থেকে লক! ভ্রু কোচকালো সে। দ্রুত পায়ে নিচে এসে টাকা হাতে দিলো রাশেদ দেওয়ান এর। ব্যাস্ত চোখ খুজতে ব্যাস্ত হলো তিতিরকে। রাফি, রিশাদের ডেকেও পাওয়া গেলো না খবর। তমার মা জানালো তাদের বাড়ির চাবি তারই কাছে, তমা বাড়ি গেলে নিশ্চয় চাবি নিয়েই যেতো।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১ (২)

মেয়েটার ওপর বড্ড মেজাজ খারাপ হয় তার। নিচে কোনায় কোনায় খুজেও না পেয়ে আবার ছুটলো ওপরেই। তার ফোনটাও ভুলে নিজের রুমেই রেখে এসেছে। ফোন হাতে এসে দাড়ালো বারান্দায়। তিতিরকে ফোন করতে ডায়াল করতে যাবে তখন চোখে পরলো অদূরে আবছায়া। তাদের এ পাশের সবকটা বারান্দা থেকে বাড়ির সামনের বাগান সহ পিছনের একাংশ দেখা দেখা যায়। এ পাশের আলো তে সেখানে দাড়িয়ে থাকা তিনটে মানুষ কে বুঝতে তার সময় লাগলো না বেশিক্ষণ। দক্ষ চোখজোড়া চট করে ধরে ফেললো সেখানকার মানুষ এর মুখাবয়ব। শক্ত হলো সর্বাঙ্গ। পুরুষ মানুষ টার চেহারা বুঝতে না পারলেও তার ব্যাক্তিগত নারীটার মুখ বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে। সাথে অন্য মেয়েটা যে তমা বুঝতে দু সেকেন্ড লাগতো তার। ছেলে টা কে হতে পারে! ভাবতে ভাবতেই পুরুষটি আচমকা আকড়ে ধরলো তিতিরের হাতজোড়া। মাথা দপদপ করে উঠলো ঈশানের। কপালের শিরা উপশিরা ফুলে ফেঁপে উঠলো রাগে। দাঁতে দাঁত চেপে পা চালালো সেখানে যেতে।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৩