সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৩
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বাড়িময় লোকে লোকারন্য। খাওয়া দাওয়া করানো হচ্ছে বাড়ির সম্মুখ অংশে। পুরোদমে ব্যাস্ত সকলে। ছোটাছুটি চলছে একপ্রকার। এদিকে ঠিক সেই হৈ হট্টোগোলের উল্টোপাশে একরাশ স্তব্ধ নিরবতায় দাড়িয়ে আছে তিনজন মানুষ। তমা তিতিরের খানিকটা পিছনে দাড়ানো। রাহাত আর তিতির একদম মুখোমুখি হয়ে আছে । তমা ভয়ার্ত চোখে দেখছে এদিক সেদিক। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে তার। তিতিরটা আসতে চাচ্ছিলো না। না আসলেই বোধ-হয় ভালো হতো। এতো এতো মানুষ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এরকম একটা নির্জন জায়গায় এসেছে দুটো মেয়ে। বাড়িতে জানলে খুন হওয়ার সম্ভাবনা শত ভাগ।
পাথরের মতো দাড়িয়ে থাকা রাহাত এবার খানিকটা টলে উঠলো। ছলছল করা চোখ দুটোর পলক পরলো এবারে। আচমকা দু হাত বাড়িয়ে ধরলো তিতিরের হাতখানা। ধরা গলায় বললো,
_____” আমি বাচবনা তোমাকে ছাড়া পরী। সত্যি বাচবো না। বোঝার চেষ্টা করো। আমি সব মেনে নেবো। তোমার সব সত্য-মিথ্যা। ভালো মন্দ সব,সব আমার। তুমি শুধু আমার হয়ে যাও। “
স্তম্ভিত হলো তিতির। রাহাতের প্রতিটা কথা মাথার ওপর দিয়ে গেলো যেনো। অজান্তেই কুচকে এলো ভ্রু জোড়া। বুঝে ওঠা মাত্র ছিটকে সরিয়ে আনলো নিজের হাত। অপরাধবোধ এ কেঁপে উঠলো শরীর। কোনো রোমান্সকর অনূভুতির জন্য নয়। রাহাত তাকে স্পর্শ করায়।
_____”আপনাকে আর কতবার বলতে হবে রাহাত ভাই। সেটা কখনো সম্ভব নয়। আমি আমার স্বামী কে ছেড়ে পরপুরুষ এর কাছে যাবো! এটা সম্ভব? এত বড় পাপ আমাকে মেরে ফেললেও করা সম্ভব নয়।”
রাহাতের বুকটা হু হু করছে। তার পরীটা তার সামনে দাড়িয়ে, অথচ অন্য কারোর বউ হিসেবে। তাকে ছাড়তে পারবে না! সে পরপুরুষ। আহ্ কি নিদারুণ যন্ত্রনা।
_____”ত..তুমি ঈশান কে ভালোবাসো পরী?”
তিতিরের মুখ দৃঢ় হলো। কেমন একটা চকচক করলো আখিজোড়া। একবুক আত্মবিশ্বাস এর সাথে বললো,
_____”বাসি। খুউব বাসি।”
_____” আর সে?”
থমকায় তিতির। ঈশান ভাই কি তাকে ভালোবাসে! কি জবাব দেওয়া উচিত রাহাত ভাইকে! তিতিরের জবাব না পেয়ে কেমন একটা বাঁকা হাসি ফুটলো রাহাতের চোখেমুখে।
_____”তোমার স্বামী অন্য এক নারীতে আসক্ত ছিলো জানো সেটা? “
_____”অনেক খোজ খবরই নিয়েছেন।”
_____”নিতে হয়েছে।”
_____”সেসব মিথ্যা। আমি ভালোবাসি তাকে। সে আমার হাসবেন্ড। বৈধতা আছে আমাদের সম্পর্কের।আর কি দরকার?”
রাহাতের মুখের হাসি প্রস্যস্ত হলো আরও খানিকটা।কেমন একটা বাকা গলায় বললো,
_____”তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা আছে? ভালোবাসা?সেটা ছাড়া একসাথে জীবন পাড়ি দেওয়া যায়?”
____”আজ না থাকলে কাল হতে কতক্ষণ? তাছাড়া একই বিষয় আমার আপনার সাথেও কিন্তু প্রযোজ্য। আমিও আপনাকে ভালোবাসিনা। “
রাহাতের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। মুখে আবার নামে রাজ্যের অসহায়ত্ব।
____” এতো কনফিডেন্স?”
____”প্রচুর।”
____”যদি কখনো সেটা ভুল প্রমানিত হয়।”
____”মুক্তি নিশ্চিত। “
রাহাত দু কদম এগিয়ে আবার ধরতে চাইলো বোধহয় তিতিরকে। এবারে তিতির সেই ভুল করতে দিলো না। হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে গেলো। ধাক্কা খেলো তমার সাথে। তমার দু হাতে ধরলো বোনকে। তিতির কড়া দৃষ্টিতে তাকালো রাহাতের দিকে এবারে।
____”আমাকে দয়া করে ছোবেন না রাহাত ভাই। দোহাই লাগে। এবারে অন্তত বুঝুন। আমাদের আর কিচ্ছু করার নেই। দুঃস্বপ্ন ভেবে দুজন দুজনকে ভুলে যাওয়া ছাড়া। আমি আপনাকে না আগে কখনো ভালোবেসেছি আর না তো স্বামী ছেড়ে কখনো আপনাকে ভালোবাসতে পারবো। ওই মানুষ টা এখন আমার সব। তাকে ছেড়ে অন্য পুরুষ এর কথা কল্পনা তেও আসে না আমার।”
____”তোমার সব দুঃস্বপ্ন সরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি। রাত হলে ঘুমাতে পারো না যে দুঃস্বপ্নে, সে কি সেটা পারে? পারে তোমাকে সে সব দুঃখ ভুলিয়ে রাখতে?”
তিতির আরেকদফা অবাক হয়। তার রাতে দুঃস্বপ্নের কথা রাহাতের জানার কথা নয়। তমা আশ্চর্য চোখে তাকায় দুজনের দিকে।
____”আপনাকে কে বলেছে?”
____”মিনু।”
____”আমার দুঃস্বপ্ন হোক বা ভালো স্বপ্ন আপনাকে দয়া করে সেসব নিয়ে ভাবতে হবে না। সুন্দর একটা জীবন পরে আছে আপনার। মরিচীকার পিছনে ছুটে লাভ নেই।”
____”পরী…”
____”ফিরে যান রাহাত ভাই। এতো রাতে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পরপুরুষ এর সাথে দেখা করতে আসা নেহাৎ কোনো ভালো মেয়ের কাজ নয় কিন্তু… তবুও শেষবার দেখা করতে এসেছি আমি। এটাই যেনো আমার আপনার শেষ দেখা হয়। আমার পিছু আপনি আর কখনো আসবেন না। আমাকে দরকার পরলে ঘৃনাও করতে পারেন। আপনাকে ঠকিয়েছি এটাও মনে মনে সাজাতে পারেন। আমাকে ভুলতে যা দরকার হয় করুন। এটা আমার অনুরোধ। “
শব্দ করে হেসে ফেললো এবারে রাহাত। দু হাতে মাথার চুলগুলো খামচে ধরলো। ছলছল রক্তিম চোখে তাকালো তিতিরের দিকে।
____”এ জীবনে তোমাকে ঘৃণা করা সম্ভব নয় পরী। সম্ভব নয়। আর ভুলে যাওয়া? হাহ্ মরে গেলেও নয়। তোমার দাবি আমি ছাড়বো না কোনো জনমেই।”
____”দাবি করতে অধিকার লাগে রাহাত ভাই। খোদা সে ভাগ্য আপনাকে দেয়নি। আমি ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর। পুরোটা তার। আমার নাম,পদবি,ভালোবাসা,সম্মান,শরীর সব।”
____”শেষ অবধি থাকবে তো?”
____”আমার মৃত্যু না হওয়া অবধি থাকবে। খোদার কাছে বৈধ অধিকার এর দাবি আমি পরকালেও করবো। “
____”কোনোদিন যদি জানতে পারো যে স্বামী কে ভালোবেসে সব উৎসর্গ করছো। সে স্বামী পুরোটাই মিথ্যা। তার অস্তিত্বই মিথ্যা?”
তিতির ষ্থির চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। শ্বাস টেনে দৃঢ় গলায় বলে,
____”আগুন লাগিয়ে দেবো সব কিছুতে। মুছে ফেলবো মিথ্যার অস্তিত্ব।
____”সেদিন ফিরবে আমার কাছে? “
____”না।”
তমার এগিয়ে এলো এবারে তিতিরের একদম পাশে। কন্ঠ যথাসম্ভব ভদ্র রাখার চেষ্টা করলো।
____”আপনি দয়া করে যান। আর আসবেন না। মেয়েদের একটা সম্মান থাকে। বিবাহিত বা অবিবাহিত। অবুঝ এর মতো করবেন না। যাকে ভালোবাসেন তার গায়ে নিশ্চয় দাগ লাগলে ভালো লাগবে না আপনার?”
রাহাত তমার কথার সোজাসাপটা কোনো উত্তর দেয়না। তবে কথাটা কাজে দিলো বলে মনে হলো। তিতির দের পিছন দিকে তাকিয়ে লক্ষ করলো একবার। ধরা গলায় বললো,
____”বাড়ি যাও পরী। ভাগ্যের হাতে আমি এতো সহজে সব ছেড়ে দিলাম না কিন্তু। এ দেখা শেষ দেখা না। হতে পারে না।”
তিতির কিছু বলার আগেই সেখান থেকে বেড়িয়ে গেলো রাহাত। তমা তিতিরের হাত টেনে নিয়ে আসলো বাড়ির ভেতরে। তবে ঢুকতেই সামনে পরলো নূরির। ধরা পরে যাওয়া চোরের মতো মুখ হয়ে গেলো তাদের।
____”এখানে কি করছিস তোরা!”
তিতির এগিয়ে এলো দরজা আটকে। মিথ্যা বলায় সে বড্ড কাঁচা। তবে কোনোমতে বললো,
____”এ পাশে লাইট দেওয়া আছে কি না দেখতে গেছিলাম।”
বড্ড কাচা মিথ্যা কথা। এ পাশে আলো জ্বালা হয়না এ জীবনে। আজকে সামনের দিকে আলোয় ঝলমলে। আরও প্রয়োজন নেই এদিককার আলোর। তবে নানা চিন্তায় জর্জরিত নূরির মাথায় বোধহয় আসলো না সেসব কিছু। মাথা নাড়লো কোনোমতে। হাতে পানির বোতল তার। ঘুরে। চলে যেতেই হাফ ছাড়লো দুজন। পানি খাওয়া দরকার। গলাটা অস্বাভাবিক শুকিয়ে গেছে। নূরি, নিশি কে এতো মানুষ এর মধ্যে চোখে পরলো না তাদের। ড্রয়িং রুমের মাঝখানে খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে সব মহিলারা বসে আছে চন্দ্রা দেওয়ান কে ঘিরে। গল্প গুজব হচ্ছে। তমার মা চাবি গুজে দিলেন মেয়ের হাতে। ফোন রেখে এসেছেন তিনি বাড়িতে। রাত কত হবে যেতে, তমার নানাভাই অসুস্থ। ফোন কাছে না থাকলে মন খুঁতখুঁত করে।
তিতির ওপরে আসলো। ঈশানের ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই চমকালো। ঈশান কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে। নিচের ব্যাস্ততা একফোঁটাও কমেনি। তৃতীয় বৈঠক এর খাওয়া দাওয়া চলছে। সবাই ছোটাছুটি করছে। লোকটার কি শরীর খারাপ নাকি! দরজা চাপিয়ে এগিয়ে গেলো ঈশানের দিকে। ঈশান টের পেলো চিরচেনা নারীর অস্তিত্ব। নূপুর এর শব্দ কানে এসে বাজছে। তবে চোখ খুললো না। তিতির শব্দহীন পাশে বসলো। খেয়াল করার চেষ্টা করলো ঈশান ঘুমে কি না। মনে হচ্ছে না। কপাল কুচকে আছে।ধীর গলায় ডেকে উঠলো,
____”ঈশান ভাই?”
জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না ঈশান। ওর সাত জন্মের ভাই হয় তো সে। ডাকতে থাকুক।
তিতির কপালে অস্বাভাবিক কোচকানো লক্ষ করলো।
____”আপনার কি শরীরটা খারাপ লাগছে? ঈশান ভাই?”
ঈশান এ যাত্রায় চোখ খুললো। তিতির ঝুকে ছিলো খানিকটা ঈশানের ওপর। চোখ মেলতেই চমকে সরে বসলো। তবে কন্ঠ থেকে আকুলতা গেলো না।
____”শরীর খারাপ লাগছে কি?”
ঈশান এবারের জবাব দিলো না। উঠে বসলো। গম্ভীর গলায় বললো,
____”একা থাকতে চাই একটু। তোর ঘরে যা।”
তিতির অবুঝের মতো তাকিয়ে আছে। তোর ঘরে যা মানে টা কি!
____”কি হয়েছে বলবেন তো।”
____”কোথায় ছিলিস এতক্ষণ? “
তিতির থমকায়। শুকনো ঢোক গেলে। ঈশানের প্রশ্ন দ্রিমদ্রিম শব্দ শুরু হয়ে গেছে বুকের বা পাশে। মিনমিন করো বললো,
____”নিচে।”
____”কই আমিও তো নিচেই ছিলাম।দেখালাম না তো।”
____”ও…ওই ছিলাম ওখানেই।”
ঈশান সরু চোখে দেখলো তিতির এর মিথ্যা বলা। মেয়েটা তাকে মিথ্যাও বলে! জানা তো ছিলো না। উঠে দাড়ালো বিছানা থেকে। সিগারেট আর লাইটার হাতে নিলো। ঠোঁটে চেপে ধরলো সিগারেট। তিতির নাকমুখ কুচকে বসে আছে। সিগারেট এর গন্ধে তার শ্বাসকষ্ট হয় বরাবরই।ঈশান এক হাতে পকেটে গুজে অন্য হাতে সিগারেট টানছে। দরজা জানালা বদ্ধ ঘরে ধোয়ায় ভরে যাচ্ছে। আড়চোখে একবার দেখলো তিতির উশখুশ করছে গন্ধ। এগিয়ে গিয়ে খুলে দিলো বারান্দার দরজা। নিচ থেকে প্রচুর মানুষের শব্দ কানে ভেসে আসছে। আচমকা বজ্রকঠিন গলায় বলে উঠলো,
____”তুই কি ভালোবাসিস আমাকে?”
ঈশানের আচমকা প্রশ্নে থমকায় তিতির। বুকের ঢিপঢিপ শব্দ কানে এসে বাড়ি খাচ্ছে। ঘরের মধ্যে কেউ কোনো কথা বলছে না। ঈশান প্রশ্ন টা করেই একমনে সিগারেট টানছে। উলটো হয়ে দাড়ানো। ঘরে পিনপতন নিরবতা। তিতির কি জবাব দেবে খুঁজে পেলো না। শক্ত হয়ে দাড়িয়ে রইলো। হুট করে এই প্রশ্নের কারণ খোঁজার চেষ্টা করলো সে বোধহয়। ঈশান তিতিরের জবাব না পেয়ে এ যাত্রায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো। গম্ভীর গলায় বললো,
____”রাহাত এসেছিলো কেনো? কি কথা ছিলো ওর সাথে তোর? খুব দরকার ছিলো?”
তিতির বরফের মতো জমে গেলো। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো। ঈশান জানলো কি করে! দেখে ফেলেছে! তিতির আমতা আমতা গলায় বলে উঠলো,
____”আ..আ..আমি জানতাম না উনি ওখানে।”
আরেকটা মিথ্যা কথা! ঈশান বাঁকা হাসলো। মেয়েটার দিকে তাকাতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। তাকে মিথ্যা বলছে! বাহ্ দারুণ উন্নতি। সত্যি বললে মেরে ফেলতো ওকে?
সিগারেট এ একটা লম্বা টান দিয়ে দৃঢ় গলায় বললো,
____”স্পর্শ করতে দিলি কেনো ওকে? হাত ছোবে কেনো ও?”
তিতির এর শরীর কাঁপছে এবারে। মানুষ টা সব দেখেছে তাহলে! কোথা থেকে দেখলো। দু পা এগিয়ে গেলো ঈশানের দিকে। ঈশানের দৃষ্টি বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে। তিতির ব্যাস্ত গলায় কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বললো,
____”আমি দিতে চাইনি।”
ঈশান শব্দ করে হাসলো। তাচ্ছিল্য প্রকাশ করলো সম্ভবত।
____”না চাইলে পরপুরুষ হয়ে ছুঁয়ে দেয়! “
____”আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। “
____”আমি মানুষ টাই ভুল। ইট’স ওকে।”
____”ঈশান ভাইই…”
ঈশান দূরে সরে দাড়ালো সামনের দিকে। হাতের শেষ হওয়া সিগারেট টা বারান্দায় ছুড়ে ফেলে পায়ে পিষলো।
____”একা থাকতে দে কিছুক্ষণ। যা এনজয় কর বাইরে। ঘুমাবো আমি। মাথাটা ধরেছে।”
তিতিরের নিজের অজান্তেই কেমন বা পাশ টা দুমড়েমুচড়ে উঠলো। ঈশান তার ওপর রাগ করেছে! তাকাচ্ছে অবধি না। একা থাকতে চাচ্ছে এভাবে।
____”আপনি…”
ঈশান হাত তুলে থামিয়ে দিলো তাকে। গম্ভীর গলায় বললো,
____” এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না তিতির। প্লিজ। মাথা যন্ত্রণা করছে। একটু স্পেস দে।”
তিতির ছলছল চোখে তাকিয়ে ঈশানের দিকে। আচমকা তার এমন কষ্ট হচ্ছে কেনো। বুকটা জ্বলে যাচ্ছে লোকটা তাকে ভুল বোঝায়। কোনো কৈফিয়ত ও শুনছে না। ঈশান পাশ কাটিয়ে বিছানার কাছে চলে এলো। ফোন করলো কাউকে। একটু পরেই বোঝা গেলো সেটা নিয়াজ।
____”নিয়াজ? একটু ওদিকটা দেখ। আমি আধঘন্টা পর আসছি। “
ফোন কেটে হাতের ঘড়িটা খুলে বেড সাইট টেবিলে রাখতে রাখতে আলো নেভালো ঘরের।
____”দরজা আটকে যাস।”
তিতির বেশখানিকটা সময় ঠায় দাড়িয়ে রইলো। ঈশানের কোনো শব্দ পাওয়া গেলো না। কাছে গিয়ে ডাকবে! সমস্যা কোথায়,বকবে না হয় একটু
বকাই উচিত যা করেছে সে। কিন্তু লোকটা তো কথাই বলছে না।
তিতিরের নড়াচড়ার কোনো আভাস না পেয়ে এবার ঈশানই উঠে এলো বিছানা থেকে। ঘড়ি আর ফোন হাতো গটগট করে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। তিতির পিছু ডাকলো কয়েকবার। সাড়া দিলো না ঈশান।
____”স্যার এটা একই বয়সের একজন মহিলার লাশ। একই ভাবে মার্ডা*র। প্রথমে রে*প। তারপর শ্বাসরোধে মে*রে ফেলা হয়েছে।”
কপালে সরু তিন চারটে ভাজ নিয়ে সাজিদের ইচ্ছে হলো দু হাতে মাথার চুল খামচে ধরতে। ঘন্টাখানেক আগে থানা থেকে ফোন এসেছে। নতুন করে আরেকজন নারীর লাশ পাওয়া গিয়েছে তাদের এলাকা থেকে বেশ কিছুটা দূরে জঙ্গলের ভিতরের এক পোড়ো বাড়িতে। ঈশান দের বাড়ির ব্যাস্ততা তখনও শেষ হয়নি। কি এক দরকার এ ঈশান বেরিয়েছে। তারাই সামলাচ্ছিলো সবটা। আচমকা এমন খবরে মাথায় বাজ পরেছে সাজিদ এর। উচ্চ মহল থেকে কল করে বকা ঝকা করা হলো তাকে। সেই বা এক দুদিনে কি করতে পারে। জাদুকর তো নিশ্চয় নয় সে। তদন্ত চলছেই। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো পরের খুনটা আর এ এলাকায় হবে না। মাঝখান থেকে…
সাজিদ গ্লাভস পরে মনোযোগ দিয়ে এদিক ওদিক পরখ করে লাশের। মেয়েটা তাদের এলাকার নয় সম্ভবত। অবশ্য কয় বাড়ির মেয়েকেই বা চেনে! খুব সম্ভবত আশেপাশের কোনো এলাকার। পাশে থাকা তার অ্যাসিসটেন্ট এর এর দিকে ফিরতেই একটা ফাইল এগিয়ে দিলো সে। ফটোগ্রাফ।
____”স্যার খুন টা বেশিক্ষণ হলো হয়নি। এই দেড় ঘন্টার মতো। বলতে পারেন খুনের মিনিট বিশেক পর চোখে পরে স্থানীয় মানুষ এর।”
আশপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বোলালো সাজিদ। গম্ভীর গলায় বললো
____”এরকম একটা জায়গায় চোখে পরলো কার?”
অদূরে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা এক বৃদ্ধা কে দেখালো কনস্টেবল।
____”স্যার উনি। ওনার স্বামী পাগল। সময় অসময় বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। এদিকে এসেছে কিনা খুজতে খুজতে বৃদ্ধা আবিষ্কার করে মেয়েটাকে। তবে সব শুনলে বুঝতে পারবেন, বৃদ্ধার উপস্থিতি অনুমান করে খুনি সরেছে ওখান থেকে। কারণ বৃদ্ধা মেয়েলি গলার চিৎকার এ যায় ওখানে। তবে গিয়ে মৃত অবস্থায় পায়।”
সাজিদ মন দিয়ে শুনলো সব তথ্য। হাতের ফাইলের ছবিগুলো পরখ করে কনস্টেবল এর হাতে দিতে দিতে বললো,
____”মনজু। পোস্ট মর্টেম এর জন্য দ্রুত পাঠাও। আর আশপাশে একদম চিরুনি তল্লাশি দেবে। কোনো ক্লু থাকলে সেটা যেনো হাতছাড়া না হয়। “
লাশ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ময়নাতদন্তের জন্য। স্পেশাল ফোর্স তল্লাশি করছে আশপাশটা। জার্মান শেফার্ড, বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত কুকুর নিয়ে আসা হয়েছে।প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট এর তল্লাশি শেষে মিলায়িত হলো একসাথে। একজন পুলিশ কনস্টেবল এগিয়ে এলো হাতে দুটো প্যাকেট নিয়ে। একটায় একটা শার্টের বোতাম। অন্য টায় একগোছা চুল।
____”আর কিছু?”
____”স্যার একটা গাড়ি আর বাইকের ছাপ আছে। স্পষ্ট নয় যদিও। বৃষ্টি থাকলে ধরা যেতো আজকের কিনা। তবে আমরা সেটাও পরীক্ষা করছি।”
____”মেয়েটার পরিবার এর খোজ?”
____” স্যার দু গ্রাম পরে। মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা সামনে মাসে। বাড়িতে মা আর দাদির সাথে থাকে। টিউশনি করে সংসার চালাতো। রোজার দিন তাই টিউশনি সন্ধ্যার পর ছিলো। এই মেইন রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরে। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই কেউ তুলে এনেছিলো। মেইন রোড থেকে এটা খুব একটা দূরে নয়।”
মুখের আদল কিছুতেই স্বাভাবিক হচ্ছে না সাজিদের। কেউ একজন চ্যালেন্জ ছুড়তে চাইছে তাদের। নাকের ডগায় এক এক খুন করে যাবে, তারা ধরতেও পারবে না। বিরবির করে আওড়ালো,
____”বাস্টার্ড। “
ঈশান এর বাইক বাড়ির গেটের ভিতর ঢুকতেই চোখমুখ কুচকে এগিয়ে এলো রাইসুল দেওয়ান। ঘড়ির কাটায় সাড়ে দশটা বাজে। বাইরের আত্মীয় সজন,দাওয়াতের লোকজন প্রায় সকলেই চলে গেছে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব গোছানো ভাবে পার হয়েছে। কর্মচারী রা আপাতত সকলে খেয়ে নিচ্ছে। তাছাড়া নিয়াজ, নাঈম রাও এখনো খায়নি। তারা অবশ্য অপেক্ষা করছিলো ঈশানের জন্য। ছেলেকে দেখে দু হাত পিছনে রেখে এগিয়ে এলেন।
____”আজকের দিনেও তোমার কাজ থাকে?”
____”কাজ কি দিনক্ষণ দেখে আসে?”
____”ছেলেগুলো অপেক্ষা করছে তখন থেকে। না খেয়ে বসে আছে। তুমি কাজ কারবার এদের ঘাড়ে দিয়ে ভেগেছো।”
বাবার কথায় বিরক্ত হয় ঈশান। তার বিয়ের ওই ঝামেলার সময় থেকেই বাবার সাথে আজকাল পরে না তার। ঘাড় ঘুরিয়ে প্যান্ডেলের দিকে দেখলো। একটা টেবিলে বসে কথা বলছে নিয়াজ, নাঈম, রিতু, অনিমা। অন্য দিকে প্যান্ডেলের লোক, অন্যান্য কর্মচারী রা খাবার খাচ্ছে। বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
____”খেয়ে নিচ্ছি আমরা। এদিকটার বাকি কাজ দেখে নেবো। ভিতরে যাও।”
রাইসুল দেওয়ান আরও কিছু বলতেন। সে সুযোগ না দিয়ে ঈশান পা চালিয়ে গেলো নিয়াজদের দিকে। রাইসুল দেওয়ান আর কথা বাড়ায় না। বাড়ির ভিতরে চলে আসেন। বাড়ির আত্মীয় সজনে এখনো বাড়ি পরিপূর্ণ।
ঈশান কে দেখে হাফ ছাড়লো সকলে। ঈশান ভ্রু নাচালো। চেয়ার টেনে দু দিকে পা দিয়ে বসতে বসতে বললো,
____”এএসপি সাহেব কোথায়?”
নিয়াজ কর্কশ গলায় বললো,
____”তুই কোথায় ছিলি শালা সেটা বল। খিদেয় মরে গেলাম। হুট করে হাওয়া। তোর বাড়ির আয়োজন, আমরা খেটে মরলাম।”
ঈশান হাত বাড়িয়ে কাউকে বললো এদিকটায় খাবার দিতে। বন্ধু দের দিকে ঘুরে বললো,
____”কাজ ছিলো। সাজিদ কই অনি?”
অনিমার মুখ এবারে গম্ভীর হলো। সবার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে বললো,
____”সেম কেস।”
____”মানে!”
____”আরেকটা মার্ডার।”
____”হোয়াট!কোথায়?”
____”মেইন রোডের পাশে দিয়ে যে জঙ্গল গেছে। ওটার ভিতর নাকি একটা পোড়ে বাড়ি আছে সেখানে।”
গম্ভীর থেকে গম্ভীরতম হলো ঈশানের মুখ। অনিমা যতটুকু জানতে পেরেছে সাজিদ এর কাছ থেকে খুলে বললো সবটা। স্তব্ধিত হয়ে বসে আছে সকলে।ঈশান একটা শব্দও করলো না। টেবিলে খাবার আসলো। শুধু ধীর গলায় বললো,
____”খেয়ে নে। আর অণি, আজ থেকে যা। সাজিদের ফিরতে সম্ভবত রাত হবে। ওকে বলে দেবো এখানে চলে আসতে।”
____”কোনো সমস্যা নেই। নিয়াজ,নাঈম দের সাথে চলে যাবো আমি। বাড়িতে মা বাবা আবার অযথা টেনশন করবে দুজনেই বাইরে থাকলে। কেস টার কথাতো নিশ্চয় জানাজানি হয়েছে।
মাথা নাড়লো ঈশান। সাজিদ ফিরলো তখন রাত এগারোটার মতো বাজে। বন্ধু রা সকলেই গার্ডেনেই বসে আছে খাওয়াদাওয়া করে। সাজিদ ফিরছে বলেই এখানে অপেক্ষা আরকি। যারা চলে যাওয়ার বেশির ভাগই চলে গিয়েছে। বাড়িতে চন্দ্রা দেওয়ান এর কিছু অতিথি বাদে। গমগমে পরিবেশ শান্ত হয়েছে অনেকটা। প্যান্ডেল কাল খোলা হবে। তারাও চলে গিয়েছে যারযার মতো। চন্দ্রকাননে আত্মীয় সজন সকলের রাতের থাকার ব্যাবস্থা করা হচ্ছে। দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে যার যার রুম। সাজিদ এসে বসতেই একপ্রকার চেপে ধরলো সকলে। নাঈম তো সরে এসে পাশের চেয়ারে বসলো একদম।
____”ঘটনা কি রে?”
অনিমা খাবার তুলে দিচ্ছে সাজিদের প্লেটে। সাজিদ শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
____”শালা গভির জলের মাছ। “
____”জাল ফেলছিস না কেনো?”
____”এত গভীরে যে জাল পৌছাচ্ছে না। মেয়ে টা জাস্ট কিচ্ছু করতে পারেনি। টাইমিং এর খোঁজ নিয়ে সব দুয়ে দুয়ে চার করে যা বুঝলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটানো হয়েছে সবটা।পুরো কাজটা করা হয়েছে ধর পঞ্চাশ থেকে এক ঘন্টা। “
নিয়াজ বাটি থেকে বড়সড় একটা মাংশের পিস মুখে তুলে নিলো। চিবুতে চিবুতে বললো,
____”এক ঘন্টা অল্প মনে হয়!”
সাজিদ বাঁকা হাসলো। খাবারের লোকমা মুখে নিয়ে বললো,
____”কম না? রে*প সাথে খুন। বডি থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তীব্র আক্রোশ মেটাতে মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সবটা। জেদ চেপে গেছিলো হয়তোবা। না হলে টাইমিং লম্বা হতো।”
মাথার ওপর দিয়ে গেলো নিয়াজের সবটা। ঈশান ভ্রু কুচকে হেলান দিয়ে বসা। হাতে কোকের গ্লাস। রাশভারি গলায় বললো,
____”সম্ভবত ওই বৃদ্ধার জন্য তাড়াহুড়ো করতে হয়েছে!”
সাজিদ মুখ তুললো ঈশানের দিকে। বাকিরাও। নিয়াজ বাচ্চাদের মতো মুখ বাকিয়ে বললো।
____”কোন বুড়ি?”
____”যে লাশ দেখেছে।”
সাজিদ পানি খেলো। স্থির দৃষ্টি ঈশানের দিকে দিয়ে বললো,
____”তুই জানলি কি করে?আমি তো এখনো বলিইনি।”
শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। যেটা সে সচরাচর বন্ধুদের সামনে করে না। চুলে এক হাত চালিয়ে চুলগুলো ঠিক করো। সামান্য ঝুকে বললো,
____”একা তুই গোয়েন্দাগিরি করিস নাকি! আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? হু? “
নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে ধরলো সাজিদ এর দিকে। এরইমধ্যে স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে খবরটা। দু দিকে মাথা নেড়ে খাওয়ায় মন দিলো সাজিদ। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বললো,
____”বাড়ির মেয়েদের রেস্ট্রিকশন দিয়ে দে বের হওয়ার ওপর। আপাতত পুরো এলাকা রেড দেওয়া হবে। অবস্থা ভালো না। কাল থেকে পুরোদমে তদন্ত শুরু হবে।প্রকাশ্যে। বাড়ির মেয়েগুলো যেনো অবাধ্য হয়ে বিপদ ডেকে না আনে।
নয়ন ক্লান্ত শরীরে বসে আছে সোফায়। যা ধকল গেলো আজকে সারাটাদিন। যদিও তার থেকে পরিশ্রম বেশি হয়েছে ঈশানের। তাদের দিদার গ্রামের আত্মীয় সজন দের নিয়ে যাওয়া হয়েছে গেস্ট রুমগুলোতে। সবেই খেয়েদেয়ে বসলো সে। রুমেই যাবে। ঈশান এখনো আসেনি, বাইরে বন্ধুদের সাথে। ভাইয়ের সাথে একটু আলাদা করে কথা বলা দরকার। তিতিরের সেই অসুস্থতার সময় খারাপ ব্যবহার করেছিলো। তারপর থেকে ঈশান কেমন একটা এড়িয়ে চলে তাকে। মোটেই ভালো লাগছে না এটা তার। ভাইয়ের সাথে সেদিন অমন ব্যবহারে অনুতপ্ত সে।
সামনে চকচকে একটা গ্লাস কেউ ধরতেই ঘাড় বাকিয়ে তাকালো পাশ ফিরে। তমা এক গ্লাস লেবুর শরবত করে এনে ধরে আছে। একগাল হেসে ইশারা করলো গ্লাসটা ধরতে।
____”নিচ্ছেন না কেনো? একদম ঠান্ডা ঠান্ডা।”
নয়ন গ্লাসটা হাতে নিলো। অনিহা মুখে বললো,
____”সবে ভাত খেলাম।”
____”তো? রোজা রেখে যে পরিমাণ কাজ করলেন এই গরমে। কত পানির দরকার জানেন? খেয়ে নিন।”
রান্নাঘরের শাশুড়ীর জন্য গরম পানি করতে এসেছিলেন রিক্তা দেওয়ান। চোখ পরলো বসার ঘরে।
সে বেশ খেয়াল করে নয়নের প্রতি তমার এতো যত্ন। মায়ের চোখ তার। সে যা বোঝে মোটেই ভুল হওয়ার কথা নয়। তমা খুব সম্ভবত নয়নকে পছন্দ করে। বিষয়টা মাথায় আসতেই মিটিমিটি হেসে ফেললেন তিনি। এমন হলে নেহাৎ মন্দ হয়না কিন্তু। তবে নয়ন! সে এতো সহজো মানবে না তমাকে। এটা স্পষ্ট টের পায় সে। তিতিরকে তার ছেলে যে গভীর ভাবে ভালোবাসতো, এটা তার অজানা নয়। এতো অল্প সময়ে এতদিন এর ভালোবাসা ভুলে নতুন করে সবটা শুরু করা সম্ভব নয়।
তমা পাশে বসলো নয়নের। তাকিয়ে আছে নয়নের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার দিকে। মানুষ টা তৃপ্তি করে খাচ্ছে,অন্তর প্রশান্তি তে ভরে উঠছে তার। নয়ন হাতে গ্লাসের শরবত টুকু শেষ করে এগিয়ে দিলো তমার দিকে।
____”মামনী চলে গেছে?”
মাথা নাড়লো দুদিকে তমা।
____”উহু। দিদার ঘরে। ওখানে কারা কারা যেনো গল্প করছেই।”
____”ও।”
____”ঈদের দিন পাঞ্জাবি পড়বেন নয়ন ভাই?”
____”হু।”
____”সাদা?”
____”হু “
____”আমার ড্রেসও সাদা।”
____”ও।”
নয়নের অতি সংক্ষিপ্ত জবাবে বিরক্ত হয় তমা। ফোনে মুখ গুজেছে। তার কথার ঠিকমতো জবাবই দিচ্ছে না। হতাশ হলো না সে। আরেকদফা লেগে পরলো।
____”ঈদের দিন বের হবেন কোথায়?”
____”সিওর না।”
____”আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবেন?”
____”সময় হলে।”
____”আমি তিতির কে বলে রাখবো। ওউ ঘুরতে ভালোবাসে কি না।”
নয়ন মাথা তুললো। তিতিরের কথা কানে আসতেই সব ভুলে বসে থাকে সে।
____”কোথায় যেতে চাও ঠিক করে রেখো।”
তমার খুশিতে লাফাতে মন চাইলো বোধহয়। খুশিতে গদগদ হয়ে বললো,
____”পাঞ্জাবি টা পরবেন কিন্তু। ম্যাচিং ম্যাচিং হবে তাহলে।”
নয়ন জবাব দেয় না। জানে ইয়ারফোন গুজেছে। তমা মুখ বাকায়। লোকটা আগে তো এতো বোরিং ছিলো না। আজকাল কথাই বলা যায়না। এতো ব্যাস্ততা দেখায়। অসহ্যকর।
ঘরময় পায়চারি করেছে তিতির। সেই কতক্ষণ যাবৎ। ঈশান সেই যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। খুঁজতে নিচে গিয়ে শোনে বেড়িয়েছে কোথাও। মন খারাপ করে ঘোরাঘুরি করছি সারাটাক্ষন। বাড়ি ফিরেছে তাও আধঘন্টার বেশি হয়ে গেলো। বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে। নিচে নিয়াজ ভাইদের সাথে জমিয়ে গল্প করছে। তাহলে এতো রাত হয়ে গেছে ঘরে আসতে সমস্যা কি! নিয়াজ ভাই না হয় বসে আছে ওখান থেকে নিশি আপুর রুম দেখা যায়। তারা তো ঠিকই চোখে চোখে প্রেম করছে আলো আধারিতে। আর এই কাঠখোট্টা লোকটা সেখানে বসে সিগারেট ফুঁকছে তখন থেকে। এ অবধি তিনটে শেষ করলো। রাইসুল দেওয়ান সিগারেট একদম পছন্দ করেননা। ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে ছেলের কেচ্ছা কাহিনি জানিয়ে দিতে।
তিতির কয়েকদফা নিজের ওপরও বিরক্ত হয়েছে। রাগ করেছে করুক,তাতে তার কি! তার এতো অস্থির লাগছে কেনো। লোকটা যে পরিমাণ কষ্ট দিয়েছে সেও পাক একটু কষ্ট। কিন্তু হচ্ছে উল্টো কাহিনি। ঈশান রাগ করেছে বুঝতে পেরে তার দিন দুনিয়া কেমন এলোমেলো লাগছে। প্রচন্ড গরম পরেছে। ভ্যাপসা গরমে কুলানো যাচ্ছে না। দরজা জানালা আটকে এসি ফুল স্পিডে দিয়ে ঘুমানোর সময় এখন। শেষ রোজার জন্য সাহরীতে উঠতে হবে আবার। রাত হয়ে গেলো কত। অথচ মানুষ টাকে দেখার তাড়নায় বারান্দার দরজারও লক করতে পারছে না। বিছানায় গিয়ে হেলান দিয়ে বসলো। নিয়াজ রা উঠেছে চলে যাওয়ার জন্যই হয়তো।
ঈশান রুমে আসলো ধীরেসুস্থে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো তিতিরকে সে আজ রুমে পাবে না। যে আত্মসম্মান সম্পন্ন মহিলা। তখন ঘর থেকে চলে যেতে বলায় নির্ঘাত আর এক মাস রুমেই আসবে না। তবে তার ধারনা এবারে ভুল প্রমানিত হলো। ঘরের আলো জ্বালতেই আশ্চর্য হলো সে। বিছানার মধ্যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে তিতির। এসি বন্ধ ঘরের। ফ্যান চলছে শুধু। তীব্র গরমে মেয়েটা ঘেমেনেয়ে একাকার। নিজেরও একই অবস্থা তার। এসির রিমোট হাতে পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই কেমন শান্তি শান্তি ভাব চলে এলো তিতিরের চোখেমুখে। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে শুলো। ঈশান ভ্রু জোড়া কুচলে রইলো। শাওয়ার নিতে হবে। ক্লান্ত শরীর আজকে। চলতেই চাইছে না। সকাল থেকে এখন অবধি যা পরিশ্রম গেলো।লম্বা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। তিতির ঘুমেই। আরাম আয়েশেই শুয়েছে। মেয়েটার দিকে যতবার তাকাচ্ছে রাহাতের ওর হাত ধরার দৃশ্য ভেসে উঠছে চোখের সমানে। গা জ্বালা করছে সঙ্গে সঙ্গেই।
মিটিমিটি চোখ মেললো তিতির। শীত শীত লাগছে বিধায় ভেঙে গেলো ঘুমটা। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই ঈশানের কথা মাথায় আসতেই লাফিয়ে বসলো। ঘর নিদারুণ অন্ধকার। ঘড়ির কাটার টিকটিক ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই। ফোন চেপে সময় দেখে নিলো। দুইটা ঠিকঠিক। পাশ ফিরে শূন্য বিছানা দেখে লাফিয়ে নামলো বিছানা থেকে। ঈশান কোথায়! শুতে আসেনি? নিজেকে নিজেরই থাপ্পড় মারতে মন চাইলো তার। এত জলদি একটা মানুষ কি করে ঘুমায়। তখন দেখলো নিচ থেকে আসছে, কতই বা দেরি হয়েছে।এরই মধ্যে ঘুমিয়েও পরলো!
উঠে দাড়াতেই সিগারেট এর তীব্র গন্ধে বেশ বুঝতে পারলো কোথায় থাকতে পারে ঈশান। ওড়না টা গায়ে ঠিকঠাক জড়িয়ে এগোতেই সন্দেহ ঠিক হলো। বারান্দায় রকিং চেয়ায়ে বসে সিগারেট টানছে ঈশান। সারারাত এই করেছে নাকি! গুটিগুটি পায়ে নিজের এসে দাড়ালো একদম পিছনে। মিহি গলায় ডাকলো।
____”ঘুমাতে আসেননি কেনো?”
ঈশান হঠাৎ তিতিরের কন্ঠে ঘুরে তাকালো। মেয়েটা একদম নিঃশব্দে এসেছে দাড়িয়েছে বিধায় বুঝতে পারেনি। তাছাড়া চিন্তার মধ্যেও ছিলো বেশ। তিতির পিছন থেকে সামনে এলো।কঠিন গলায় বললো,
____”সিগারেট টা ফেলে দিন। শ্বাস নিতে পারছি না।”
____”বারান্দার দরজা আটকে ঘরে যা।”
____”আপনি শুতো আসেননি কেনো!সারাদিন এতো পরিশ্রম গিয়েছে।”
ঈশান বিরক্তি মুখে তাকালো। গম্ভীর গলায় বললো,
____”তোকে সেটা নিয়ে ভাবতে তো বলিনি। ঘরে যা। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ঘ্যানঘ্যান করিস না।”
তিতির নিশ্চুপ দাড়িয়ো রইলো ঈশানের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ। ধীর গলায় বললো,
____”রাহাত ভাই ঝামেলা করছিলো দেখা করার জন্য। আমি শেষ একবার দেখা করতে গিয়েছিলাম।”
____”শাট আপ তিতির। অসহ্য লাগে এসব আলোচনা। “
তিতির এর মুখ কঠিন হলো এবারে খানিকটা।
____”আপনি যখন রুষার কথা বলতেন আমারও এমনই লাগতো।”
ঈশানের মুখ বজ্রকঠিন হলো। চেয়ার ছেড়ে শব্দ করে উঠে দাড়ালো।
____”তাই শোধ নিচ্ছিস অন্য পুরুষকে নিজেকে ছুঁতে দিয়ে? হু? প্রতিশোধ? “
সে ছুতে দিয়েছে ইচ্ছে করে! ভুল বোঝার সবটুকু গুন খোদা একে দিয়েছে। ধৈর্যহীন একটা পুরুষ। একটা কথা দু মিনিট শোনার ধৈর্য হয়না।
____”আপনি আমার কথাই শুনছেন না। তখন থেকে…
____”ও তোকে ছোবে কেনো? কোন সাহসে? কে দেয় সাহস? তুই না দিলে?”
____”আমি দেবো পরপুরুষ কে আমাকে ছোঁয়ার অনুমতি? এটা বিশ্বাস আপনার?”
ঈশান সরে গেলো। রাগ নিয়ন্ত্রণ হতে চাচ্ছে না। এতক্ষণ ভুলে থাকার চেষ্টা করছিলো। মেয়েটা এসে আবার সব মনে করিয়ে মাথা জ্বালিয়ে দিচ্ছে। রেলিং এ দু হাত ভর দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলো।
____”আমার বিশ্বাসে কিচ্ছু যায় আসে না। ঘরে যা।আমাকে আমার মতো থাকতে দে।”
তিতির গেলো তো নাই। বরং ঈশানের কাছে চলে এলো। দু হাতে টেনে ঘোরালো নিজের দিকে।
____”পুরুষ মানুষ সে। জোর করে হাত চেপে ধরলে আমি পারি সরাতে? তাও সরিয়ে দিয়েছি সাথে সাথে। দ্বিতীয় বার আর ছুতে দেইনি।”
দু দিকে মাথা নেড়ে ব্যাঙ্গ করে হাসলো ঈশান।
____”পুরুষ মানুষ! তার জোরের সাথে পারবি না এটা আগে মনে ছিলো না? হাত না ধরে যদি অন্য কিছু করতে চাইতো তখন কি করতিস?”
তিতির অনিমেষ তাকিয়ে রইলো ঈশানের রক্তিম চোখে। আচমকা একদম ঘেষে আসলো। মাথা উঁচিয়ে চোখে চোখে রাখলো।নরম গলায় বললো,
____”আপনি তো ছিলেনই। এর বেশি হলে বাঁচাতেন না আমাকে?”
দু হাতে ঠেলে সরিয়ে দিলো তিতিরকে। কঠিন কন্ঠে বললো,
____”আমি ছিলাম ওখানে সেটা জানতিস? আমি না থাকলে যদি এমন কিছু হতো? অন্য কিছু করতে চাইতো? তখন? তখন কি করতি? আটকাতে পারতি তো না। তারপর কাকে দোষ দিতি? নিজেকে,আমাকে, নাকি ভাগ্যকে? হু? আমি ছুঁয়ে দিলে ফোস্কা পরে। আর ওই ছেলের সাথে যখনই দেখা করতে যাস ও তোকে ছুঁয়ে দেয়। খুব ভালো এটা হা? আজকেও একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটেছে জানিস সেটা? সুবর্ণার যা হয়েছিলো আমাদের এলকায় আবার সেটাই হয়েছে। কালপ্রিট এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কে জানে আজকে এত মানুষ এর মধ্যে সেও ছিলো কিনা। আর এমন সিচুয়েশনে তুই… তুই…
তিতিরের গাল গড়িয়ে নোনাজল পরলো আচমকা। ঈশান বিরক্তিসূচক শব্দ করে চোখ সরিয়ে নিলো। উন্মাদের মতো টান দিলো সিগারেটে। হুংকার দিয়ে উঠলো একপ্রকার।
____”চোখের পানি মোছ জলদি। অসহ্য লাগে এটা।”
তিতির হাতের উল্টো পিঠে পানি মুছে ধরা গলায় বলে,
____”আর কখনো আপনাকে না জানিয়ে কারোর সাথে দেখা করতে যাবো না। প্রমিজ। ঈশান ভাই?”
ঈশান শক্ত করে চেপে ধরলো তিতিরের হাতের কবজি। হুট করে আঘাতে চোখমুখ খিচে নিলো। ব্যাথায় হাত অবশ হয়ে এলো বলে। ঈশান ছাড়লো না। হাতটা এগিয়ে নিলে কপালে ঠেকালো নিজের। নাকমুখ ডললো নেশাগ্রস্তের মতো। সামনে ধরে দাতে দাঁত চেপে বললো,
____”এভাবে ধরেছিলো ও তোকে? কেনো ধরবে?”
মেয়েটা ব্যাথায় জবাবই দিতে পারছে না। ঠোঁট কামড়ে সহ্য করছে। ঈশান ছেড়ে দিলো। ঝটকা দিয়ে দূরে সরিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালো। তিতির মেঝের দিকে তাকালো। লোকটা পাগল নাকি! একটা মানুষ এতোটা পাগলামি কি করে করতে পারে। সিগারেট খেয়ে ফুসফুস জ্বালিয়ে দেবে এক মাসে।
____”সিগারেট ফেলুন?”
____”তোকে যেতে বলেছি আমার সমানে থেকে।”
____”এতো বদমেজাজি হওয়া ভালো না।”
____”তোর থেকে শিখতে হবে আমাকে?”
হাতের ব্যাথা উপেক্ষা করে তীব্র অধিকারবোধ নিয়ে বললো,
____”আপনি আর কয়টা সিগারেট খাবেন। ফেলতে বলেছি আমি এটা। “
তিতিরের কন্ঠের অধিকারবোধ টা ঠিক ধরতে পারলো ঈশান। বলা যায় বুকে এসে লাগলো। রাগ কমতে শুরু করেছে নাকি! স্থির দৃষ্টি তাক করে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো,
____”বাধ্য কর।”
তিতিরের শরীর কেমন করে উঠলো এমন কন্ঠে। বন্য শিকারি বাঘ হুট করে পোষ মেনে যায় কখনো! জানা নেই তার। তবে চোখের পলকে ঈশানের এমন রাগি রাগি মুখ উধাও হতে দেখে বুকটা কাঁপলো তার। তবে সরে গেলো না। উল্টো নিজেই এগোলো। হাত বাড়িয়ে ঈশানের ঠোঁটে রাখা সিগারেট ধরা হাত সরিয়ে আনলো। এক নজর ধোয়া ওঠা সিগারেট এর দিকে তাকিয়ে আবার তাকালো মুখের দিকে। এ লোকটাকে আজকে বড্ড আপন লাগছে। ঠিক সেদিন এর মতো। রাহাত যেদিন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে জরিয়ে ধরেছিলো। তখন যেমন মনে হচ্ছিলো ঈশান কে দরকার তার। তার ওই বৈধ পুরুষের শরীরের উষ্ণতায় পরপুরুষ এর ছোয়া ভুলতে। আজকেও আচমকা তেমন মনে হচ্ছে। তীব্র ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে ফেলতে মন চাচ্ছে লোকটাকে। যাতে কখনো পালাতে না পারে তার থেকে।
ঈশান চুপচাপ দেখে যাচ্ছে তিতিরের কার্যকলাপ। তিতিরের দু হাতে তার দু হাত চেপে ধরা। মেয়েটা নরম ঘায়েল করা দৃষ্টি তাক করে আছে তার দিকে। ভীষন আবেদনময়ী গলায় বললো,
____” যা বলবো মানবেন?”
ঈশান বাধ্য ছেলের মতো ধীর গলায় বললো,
____”বিচ্ছেদ বাদে।”
তিতিরের শরীর শিহরিত হলো। ধুকপুক শব্দ জোড়ালো তো হয়েই আছে।
____”ভয় পান?”
ঈশান সেটার জবাব দিলো না। মেয়েটা চূড়ান্ত আবেদনময়ী লাগছে। তার রাগ ভাঙ্গাতে এমন করছে বুঝি!ঈশান তিতিরকে রেলিঙের সাথে চেপে ধরে হাস্কিস্বরে বললো,
____”কিস মি।”
তিতির হত-বিহবল হলো। কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে গেলো! কিস করার কথা আসলো কোথা থেকে। চোখ বড় বড় করে বললো,
____”হ্যা?”
ঈশান আরও খানিকটা ঝুকলো তিতিরের দিকে। একই হাস্কিস্বরে বললো,
____”কিস মি…ছেড়ে দেবো সব।”
তিতির আশ্চর্যবনে আছে। ঈশানের শেষ কথাটা বোধগম্য হতেই। ধোয়া ওঠা সিগারেট এর টুকরোর দিকে তাকালো।
____”সিগারেট ছেড়ে দেবেন?”
____”এটা সেদিনও বলেছিলাম। ওই ঠোঁটের নেশা স্বইচ্ছায় ধরিয়ে দিলে বাকি সব নেশা ছেড়ে দেবো।”
দুটো মানব মানবি ঝড়ে উথাল-পাতাল হৃদয় নিয়ে মুখোমুখি দাড়িয়ে। চোখে চোখ রেখে হিসেবের খাতা খুলে বসে আছে। বারবার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরছে তিতির। নিজ থেকে কিভাবে এগোবে সে। এটা কোনো কথা! লজ্জায় দাড়িয়ে থাকতে পারছে না যেনো। চুমু কিভাবে খাবে।
____”পারবি না তো? যা ঘরে যা এবার। আর জ্বালাতন করিস না। যেদিন পারবি সেদিন আসিস।”
তিতির ঈশানের হাত থেকে সিগারেট টা নিলো নিজের হাতে। নিচে ফেলে পিষে ফেললো পায়। বাকি যেটুকু দুরত্ব ছিলো সেটাও মেটালো। এক বিন্দু ফাঁক নেই দুজনের মধ্যে। তিতিরের দ্রুত ওঠানামা করা বক্ষজোড়ার স্পর্শ ঈশানের বুকে। ফরফর করছে তার বুকটাও। ঈশান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার শার্টের কলারে টান পরলো। তিতির দু হাতে শার্টের কলার চেপে নিচু করে ফেলেছে ঈশান কে। ঝড়ের গতিতে মিলিয়ে নিয়েছে দু জোড়া ওষ্ঠ।
ঈশান স্তম্ভিত, হতবাক। কল্পনা তেও বিশ্বাস করেনি তিতির এটা করবে। পাথরের মতো দাড়িয়ে রইলো। তিতির ছেড়ে দিয়েছে ওষ্ঠজোড়া। চোখ বুজে আছে। থরথর করে কাপছে ঈশানের কলারে চেপে রাখা হাত জোড়া। ঈশান খেয়াল করলো সে শ্বাস নিতে পারছে না। হার্টবিট মিস হচ্ছে বারবার। তিতিরের লজ্জারুন মুখখানা দেখে এবারে হুশ হলো তার। যা ঘটেছে সত্যি। এই মেয়েটা সত্যি ঘটালো এই কান্ড! তিতির সময় নিয়ে খুললো চোখজোড়া। তিরতির করে কাপছে পাতলা কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট। ইতস্তত করে বললো,
____”এবার ছাড়বেন?”
____”ফিল তো করতে পারলাম না। আগেই তো ছেড়ে দিলি!”
লজ্জায় দৃষ্টি নত হলো মেয়েটার। সে যেটুকু এগিয়েছে তাতেই মরে যাচ্ছে লজ্জায়। আর কত ফিল করাবে!
____”ওয়ানস্ মোর।”
____”আ…আমি আর পারবনা।”
ঈশান ঘোরলাগা চোখে দু হাতে চেপে ধরলো লতানো কোমড়। উঁচু করে দাড় করালো নিজের পায়ের ওপর। হাত দিয়ে গাল চেপে মাথা নিচু করে কপালে কপাল ছোয়ালো। শ্বাস ফেলছে জোরে জোরে দুজনেই।
____” ছলনা করলি কেনো!”
তিতির আশ্চর্য হয়! ছলনা কোথা থেকে আসলো এখানে। যা করতে বললো তাই তো করলো।
____”কিসের কথা বলছেন?”
____”নিজ ইচ্ছেতে কাছে আসলি কি? না তো। তাহলে? ছলনা হলো না?”
____”আপনিই তো বললেন তাহলে ছেড়ে দেবেন সিগারেট। “
____”তাহলে ফিল করতে দিচ্ছিস না কেনো ভালোমতো?”
তিতির কিভাবে বোঝায় মেয়ে সে। কিভাবে আগ বাড়িয়ে এভাবে চুমু খাবে! জবাব না দিয়ে চোখ বুঝে থাকে। সে তো মানা করছে না আজকে ঈশানকে। আজকে জেদ করে খেলেই হয় চুমু।
ঈশান শুকনো ঢোক গিললো। বৃদ্ধাঙ্গুলি স্লাইড করলো নিচের ঠোঁটে। হাস্কিস্বরে বললো,
____” আমি করি একটু?”
তিতির কি এখন লজ্জার মাথা খেয়ে অনুমতি দেবে! আশ্চর্য লোক।এতদিন অনুমতির তোয়াক্কা করেনি। আজ নাটকের শেষ নেই।
তিতিরের সাড়া না পেয়ে চোখ মেললো ঈশান। ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে দাড়িয়ে ঠকঠক করে কাপছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো ঈশান। ছেড়ে দিলো মেয়েটাকে। তিতির অবাক চোখ মেললো।
ঈশান পিছিয়ে পকেটে দু হাত গুজলো।
____”সাহরীর জন্য উঠতে হবে একটু পর। শুয়ে রেস্ট নে।”
তিতির কিছু বলবে তার আগেই কড়া পরলো
দরজায়। থামাথামির নাম নেই। এসময়ে এতো জোরে কড়া নাড়া! চোখাচোখি হতেই দ্রুত পায়ে দরজা খুললো এসে ঈশান। তিতির পিছন পিছন ছুটে এসেছে। দরজা খুলতেই চোখে পরলো কান্নারত মুখ। রিক্তা দেওয়ান দাড়িয়ে। উদভ্রান্তের মতো দু হাতে চেপে ধরলো ঈশানের হাত।ফুঁপিয়ে উঠলো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৩২
____”বড় আব্বা…আ..আমার…সর্বনাশ…”
তিতির ছুটে এসে ধরলো মেজো মামনীকে।
____”মেজো মা কি হয়েছে বলবে তো।”
রিক্তা দেওয়ান হাতের ইশারা করলো ওদিকটার একটা রুমের দিকে। নূরির রুম ওটা। কোনোমতে আউড়ালো,
____”আব্বা…আমার মেয়েটা..

Er porer part gulo please din
Er porer part gulo ajkeo dilen na r koto din wait korbo ei vabe na porte iccha kore na