Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৪২

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪২

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪২
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

আজিমপুর কবরস্থান এর সামনে ঈশান এসে যখন নামলো তখন বেলা গড়িয়েছে। তাদের এলাকায় বৃষ্টি থাকলেও ঢাকা শহরের পথঘাট দেখে মনে হয় না বিগত পনেরো দিনেও বৃষ্টির ছিটেফোঁটা ছিলো। কড়া রোদ। প্রচন্ড গরম ও লাগছে। গাড়ি রাস্তায় সাইট করে রেখে চোখের সানগ্লাস টা পরে নেমে এলো গাড়ি থেকে। সারারাত ড্রাইভ করে এসে হোটেলে চেক ইন করেই চলে এসেছে এখানে। ইয়াজ এর লোকেশন এখানেই দেখাচ্ছে।
ঈশান ভিতরে ঢুকলো। শুনশান জায়গা। ভেতরে একটা মানুষ এর ও দেখা নেই। শুধু এক সাইটে অদূরে দুজন মালি ঘাস পরিষ্কার করছেন। ঈশান নিজের হাতে সেলফোন এ লোকেশন অনুযায়ী এগোলো। তবে লোকেশন স্থির থাকলেও আশেপাশে মানুষ এর সাড়াশব্দ নেই। ঈশান ফোন করলো তার ম্যানেজার কে । অমিত ওদিকে কনট্রোল রুমে আছে । ঈশানের ফোন পেয়ে তুললোও সাথে সাথেই। ঈশান আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে বললো,

____”এক্সাক্ট লোকেশন এটাই দেখাচ্ছে না?”
____”জ্বী বস । আপনার থেকে আর মিনিট পাঁচেক। “
ঈশান ফোন রাখলো । বিশাল কবরস্থান । আর হয়তো ওদিকে আর একটু এগোলে দেখতে পাবে কাঙ্ক্ষিত মানুষ টাকে। এই ভাবাভাবির মাঝে পা চালালো কবরস্থান এর দক্ষিণ দিকে। ঈশান ফোনে টুংটাং শব্দে মেসেজ আসতেই ঈশান চেক করলো সঙ্গে সঙ্গেই। ছোট্ট মেসেজ লেখা।
____”তিন মিনিট লেট দেওয়ান সাহেব।”
ঈশান ভ্রু কুচকে ফেলে। ঘড়িতে সময় দেখে। যে সময় আসার কথা ছিলো সে সময় থেকে আসলেই সামান্য লেট। লোকটা কি তাকে দেখছে! কি আশ্চর্য। সে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছে না এখানে। ঈশানের হাত পিছনে চলে গেলো অজান্তেই। শার্টের নিচে সন্তর্পণে আড়াল করে রাখা একটা বস্তুুতে হাত ঠেকলো । ফোন পকেটে রেখে সেই যন্ত্রটা চেক করে নিলো। সাবধানই দৃষ্টি এদিক সেদিক পরখ করলো। কানের ব্লুটুথ স্পিকার এ অমিত। ডিরেকশন দিয়ে যাচ্ছে কোনদিকে যেতে হবে।

____”বস এখানেই দেখাচ্ছে তো।”
ঈশানের পা থমকালো। অমিত অনবরত বলে যাচ্ছে থামতে। একদম এক্সাক্ট লোকেশন নাকি এটাই। তা কি করে হয়? এদিকটা আরও জনমানবহীন। একটা কাক পক্ষীরও আনাগোনা নেই। প্রচুর লম্বা লম্বা গাছপালা। তা হলে কি! একজন জলজ্যান্ত মানুষ লুকিয়ে থাকবে এমন জায়গা বা পরিবেশ নেই। বাধাই করা কবর একেকটা। তবুও তার পাশে মানুষ লুকালে অনায়াসে দেখতে পাওয়া যাবে। ঈশান শকুনের দৃষ্টি বুলালো চারিদিকে। উহু। কাউকে নজরে পরলো না। ফোনে কিছুক্ষণ আগে যে নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছিলো সেটা ইয়াজের আরেকটা নাম্বার। এটা তার জানা ছিলো। খেয়াল হলো যে নাম্বার তারা ট্র্যাক করছে এটা সে নাম্বার নয়। ভাবাভাবির মধ্যেই ব্যাস্ত কন্ঠে অমিত কে জানালো এই নাম্বার এর লোকেশন এর খোঁজ নিতে। তবে নিরাশ হতে হলো। নাম্বার সুইচ অফ হয়ে গিয়েছে এরইমধ্যে। তবে অন্য নাম্বার টা এখনো এখানেই দেখাচ্ছে লোকেশন। ঈশান ব্যাতিব্যাস্ত হয় মনে মনে। ভ্রু জোড়া কুচকে ওই নাম্বার এ কল করতেই তীক্ষ্ণ শব্দ হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকালো ঈশান। থমকালো এক মূহুর্তে। পিছনে দামি মার্ভেল পাথরে বাধাই করা একটা কবর। সেটার ওপর রাখা সেলফোন টা।
বিষয় টা বুঝতে আর সময় লাগলো না ঈশানের। ইয়াজ আদতে আসেনি এখানে। তাকে বিভ্রান্ত করতে ফোন রেখে গিয়েছিলো এখানে। কিন্তু কেনো! এই বিভ্রান্ত টা করে লাভ টা কি হলো? নিচু হয়ে ফোন টা হাতে তুলে নিলো। কোনো ধরনের লক বা পাসওয়ার্ড দেওয়া নেই।

উল্টেপাল্টে ফোনটা দেখে ভিতরে চেক করতে ঢুকলো। সর্বপ্রথম কললিস্ট চেক করলো। সেখানে ঈশান ছাড়া আর কারোর নাম্বার নেই। তবে চমকাতে হলো গ্যালারি তে ঢোকা মাত্র। অসংখ্যা ছবি। নূরি,তিতির, ঈশান ওদের পরিবার। সকলের । বিগত তিন বছরের বিভিন্ন সময়ের অঢেল ছবি। তাদের গোটা পরিবারকে কি পরিমাণ স্টক করা হচ্ছিলো সেটা বুঝতে এক সেকেন্ড ও সময় লাগলো না ঈশানের।
তবে খানিক নিচে নামতেই হাত কেঁপে উঠলো। এখান থেকে তার ছবিগুলো শুরু। অনেক অনেক ছবি। রুষা,সাজিদ,অনিমাদের সাথে। তাছাড়া–তাছাড়া আরও কিছু ছবি। যেগুলো দেখে শক্ত হলো ঈশানের চোয়াল। দাঁতে দাঁত পিষলো। এই ছবিগুলো এখানে কি করছে! ছবিটা জুম করতেই আরেক চমক লাগলো। ঝট করে ঈশান তাকালো সামনের কবরটার দিকে। নেমপ্লেটের ওপর খোদাই করা নাম। হতবিহ্বল হলো ঈশান আরশাদ। হাতের ছবির দিকে এক নজর দিয়ে পুনরায় তাকালো কবরের দিকে।

দুই এ দুই এ চার মিলছে না? মিলছে তো? কিন্তু এর সাথে ইয়াজ এর কি সম্পর্ক। কে হয় ইয়াজ এর? তখনই আরেকটা বিষয় দৃষ্টি গোচর হলো। পাশেই সদ্য খোড়া আরও একটি কবর। পাশেই ঠেকনা দেওয়া একটা নেমপ্লেট। বুকের বাম পাশ থমকালো ঈশানের। প্রচন্ড ঝাকি দিলো শরীর। এটা সেই নেমপ্লেট যেটা তাকে ছবিতে পাঠানো হয়েছিলো। লোকটা মোটেই মজা বা এডিটেট কোনো ছবি দেয়নি। সত্যিই বানানো হয়েছে তিতির এর নামের একটা নেমপ্লেট। ঈশান দু হাতে ভারি পাথরের অংশ টা তুলে ছুড়ে মারলো। ভেঙ্গে ফেলতে। হলোও তাই। অন্য পাথরের সাথে সংঘর্ষে তিন খন্ড হলো। তবে তিতির এর নাম অক্ষত রইলো। অসহ্যকর যন্ত্রণা হচ্ছে ঈশানের। এমন সময় আসলো কাঙ্ক্ষিত ফোনকলটি। ঈশান দাঁতে দাঁত পিষলো। চোয়াল শক্ত করে রিসিভ করলো ফোনটা। ওপাশ থেকে শোনা গেলো অশ্লীল হাসির শব্দ। ইয়াজ এর ফোন। লোকটা সম্ভবত ঈশান এর এই অবস্থা হবে জানতো। ঈশানকে অপদস্ত করতে পেরে ভীষন খুশি। তীব্র বাঁকা গলায় বললো,
____”ঈশান আরশাদ কে ঘোল খাওয়ানোর সাধ আমার আজীবন এর। আজ একটু হলেও পূরন হলো সেটা। কি যে শান্তিই।”
ঈশান এর মাথা দপদপ করছে। ইয়াজ কে না দেখতে পেয়ে নয়। বরং তিতির এর নামের ওই নেমপ্লেট টা দেখে। সূচের আগা দিয়ে কেউ হৃদপিন্ড ক্রমাগত খোঁচাচ্ছে যেনো। গালি দিয়ে উঠলো ঈশান এবারে,
_____”কু/ত্তার বাচ্চা। মরার ভয় নেই? ঈশান আরশাদ এর সাথে লাগতে আসিস? তার কলিজার দিকে হাত বারাস?”
ওপাশ থেকে নিয়াজ আরেকদফা বিশ্রি হাসলো।

_____”আছে তো। খুব আছে। আছে বলেই আজ সেধে কাছে গেলাম না। সিংহ কে ক্ষেপিয়ে, কতক্ষণ দৌড় করিয়ে খাঁচায় না পুরলে মজা আছে? “
_____”থাবা বসালে পালিয়ে বাঁচবি না। “
_____”এটা ঈশান আরশাদ খুব ভালো করে পারে তাইনা? অন্যের সুখে থাবা বসাতে?”
ঈশান কবরের দিকে তাকালো। মনোযোগ দিয়ে সাল তারিখ দেখলো মৃত্যুর। কঠিন কন্ঠে বললো,
_____”কি সম্পর্ক তোর ওর সাথে? তোর উদ্দেশ্য কি? আমার পরিবার এর সাথে তোর কিসের লেনদেন।?”
_____”অন্যের পরিবার ধ্বংস করে জানতে চাস তোর পরিবার এর সাথে আমার কিসের দেনদেন? ছবিগুলো দেখিস নি? কত সুন্দর তোর হাতে পিস্তল ধরা। গুলিতে গুলিতে ঝাঝড়া করে দিচ্ছিস আমার কলিজা টাকে? মনে পরে না সেই দিনের কথা? পরে মনে? সদরঘাট এর ওই কালো রাত্রির কথা? বুড়িগঙ্গা রক্তিম হয়েছিলো আমার কলিজার ক্ষতবিক্ষত দেহের রক্তে। তোর গুলির বর্ষনে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো আমার সব। আমার সুখ ওখানে শুয়ে আছে, আর পাশে তোর সুখের কবর খোড়া দেখে এতো খেপেছিস ? তোর পরিবার তোর কাছে সব, আমার পরিবার আমার কাছে নয়?”
ঈশান রক্ত চক্ষু করে তাকিয়ে থাকে সামনের সমাধি টার দিকে। বছর তিনেক আগের কোনো এক গভীর রাতের স্পষ্ট চালচিত্র চলতে থাকে তার চোখের সমানে। ঈশান হিংস্র কন্ঠে বললো,

_____”তোর মতো বাস্টা/র্ড রাই ওর মতো মানুষ কে ডিফেন্ড করে।”
অট্টহাসি তে ফেেটে পরলো ইয়াজ।
_____”আর তোর মতো মহাপুরুষ বুঝি সবাইকে ওভাবেই ধ্বংস করার দায়িত্ব নেয়? অন্যের কলিজা টেনে বের করার দায়িত্ব? “
বাঁকা হাসলো ঈশান। খানিক শব্দও হলো সে হাসির।ঘর্মাক্ত কপাল হাতের উল্টোপিঠে মুচে ফিচেল গলায় বললো,
_____”আমি যদি ভুল না করি রিভেঞ্জ নিতে ফিরেছিস তুই। তবে শোন। তোর ধ্বংসও আমার হাতে। শীগ্রই হবে সেটা। তোদের মতো আগাছা, আমি আমার সামনে বাড়তে দেবো না। আর আমার বোন বা বউ বা আমার পরিবার। কারোর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস আর করিস না। গুলি বুকের আগে তোর দু চোখে ঢুকবে। “
থামলো ঈশান। ওপাশেও নিরবতাই। হয়তো ঈশানের কথার জবাব দেওয়ার পায়তারা করছে। তার আগেই ঈশান আবার বলে উঠলো,

_____”আমার জীবনে কোনো ভুল নেই। ঈশান আরশাদ নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো প্রায়শ্চিত্ত দেবে না। তোর মতো নরকিট এর কাছে তো আরও নয়। আয়নার মতো পরিষ্কার আমার সামনে সব। কি, কেনো,কোন যুক্তিতে তুই আমার পিছু লেগেছিস। সেটার্ বুঝতে বাকি নেই আমার। ঘিন্না হয় না তোর নিজের ওপর? হ্যা? হওয়া তো উচিত। শুনে রাখ তোর হাল ও একই হবে। একই জায়গায় আত্মবিসর্জন দেওয়ার জন্য তৈরি থাক। “
ইয়াজের মাথা দপদপ করে উঠলো। ঈশানের কথাগুলো তার রাগ তিনগুণ বাড়িয়ে দিলো যেনো। ঈশানের মধ্যে কেনো অনুশোচনা নেই মানে? গোটা একটা পরিবার ধ্বংস করেছে সে। তার কলিজার টুকরা কে বন্দুকের গুলিতে ঝাঝড়া করে ওই বুড়িগঙ্গার পচা পানিতে ফেলেছিলো। তেরো দিন পর সেই পচাগলা লাশ! শরীরের অংশ বোঝা যাচ্ছিলো না। আর ওর নাকি কোনো অনুতাপ নেই! ইয়াজের অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিলো। ঈশানের থেকে আরও বিশ্রী গালিতে রাগে ফোন ছুড়ে মারলো।
ওপাশ থেকে ফোন কাটতেই ঈশান একদলা থুতু ফেললো পাশেই। সামনের কবরের দিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
_____”কোনো অনুতাপ নেই আমার। কিচ্ছু ভুল করিনি আমি। এক ফোটাও নয়। তুই এটা ডিজার্ভ করতিস। এর থেকে কঠিনভাবে মৃত্যু তোকে দিতে চেয়েছিলাম আমি। ইয়াজ এরও তাই হবে। ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর হাত থেকে কোথায় গিয়ে লুকাবে? “

বৈশাখের মাঝামাঝি চলছে। ওইকয়দিন টানা বৃষ্টির পর কঠিন গরম পরেছে। জনজীবন অতিষ্ঠ একপ্রকার। নাহ বৃষ্টির দেখা আছে আর না তো একটু ঠান্ডা আবহাওয়া। ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন।
ঈশান ঢাকা গিয়েছে দু দিন হয়ে গিয়েছে। চন্দ্রকাননে আত্মীয় সজন এর ভিড় ও একদম কমে গিয়েছে। চন্দ্রা দেওয়ান এর গ্রামের এক ননদ বাদে আর সবাই চলে গিয়েছে। তিতির দেরও মজা করার মুডের বারোটা বেজে গিয়েছো ঈশান চলে যাওয়াতে। ব্যাস্ত, অভ্যস্ত জীবনযাপন আবার শুরু হয়নি এখনো। স্কুল, কলেজ,ভার্সিটি সবই বন্ধই। তবে বাড়ির কর্তাদের অফিস শুরু হয়ে গিয়েছে এরই মধ্যে। দিনের বেলা বাড়ির মেয়েরা বাদে আর কোনো পুরুষই আপাতত বাসায় থাকে না। ঈশানের কড়া আদেশে তিতির রাও কেউ গেট এর বাইরে বের হয় না।
বাড়ির বুয়ার থেকে শোনা যায় এলাকায় কড়া পাহাড়া চতুর্দিকে। পুলিশ টহল চলে হরহামেশাই। সবার বুঝতে বাকি রয়না সুবর্ণার ওই কেস টা কঠিন ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
বিকেল বেলা বাড়ির গার্ডেনে বসে আছে বাড়ির মেয়েরা। রাফি,রোশনি রা খেলছে । ওদিকে বেতের চেয়ার গুলো তে তিতির,নিশি,নূরি আর তমা বসা। এ বেলা গরম কম। সূর্য বিদায় নিয়েছে আকাশ থেকে। নূরি আগের থেকে একটু স্বাভাবিক হলেও চিরাচরিত সেই আগের চঞ্চলতা নেই। বেশিরভাগ সময়ই চুপচাপ থাকে। মনমরা হয়ে বসে থাকে। ভালো মন্দ সিদ্ধান্তের দোটানায় যেটাকে বলে। না মুখ ফুটে কাউকে বলার সাহস করে আর না তো নিজে সবটা একা এই ছোট্ট মাথায় নিতে পারছে।

মালি গার্ডেনে পানি ছেটাচ্ছে। ছোট রা সেই পানি তে আধভেজা হতে ব্যাস্ত। তিতির গভীর মনোযোগ এ তাকিয়ে আছে সেদিকে। দেখে সেটা মনে হলেও আদতে তার মন গিয়ে পরে কাছে ঈশান এর কাছে। মানুষটা যাওয়ার পর পৌছে একবার জানিয়েছে। তারপর সে কল করায় শুধু হু হা করে ফোন কেটেছে। কিসের এতো ব্যাস্ততা জানা নেই তার। বড় মামা যে বললো অফিসের কোনো কাজই নেই, তাহলো কোন কাজে গিয়ো বসে আছে কে জানে।
বাগানের এ পাশ টায় একটা বিশাল বাগানবিলাস এর গাছ। গোলাপি ফুলে গাছ ভর্তি। সে গাছেরই নিচে গোল হয়ে বেতের চেয়ারে বসা সকলে। গাছে সম্ভবত একটা পাখির বাসাও আছে। কিচিরমিচির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সবাইকে এমন থ মেরে যেতে থেকে ডেকে উঠলো নিশি। তিতির কেই আগে ডাকলো।

____”বার্বি? কিছু হয়েছে? মন খারাপ?”
তিতির এর ধ্যান ভাঙ্গলো এ বেলায়। সে জবাব দেওয়ার আগেই উত্তেজিত কন্ঠ পাওয়া গেলো। অবশ্যই তমার। সে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা কন্ঠে বললো,
____”বুঝলে না বড়পু। আমাদের বার্বির মন খারাপের কারন? অনেক সোজা তো। স্বামি বিদ্যাশেএএ…”
নিশি ফিক করে হেসে ফেললো। একই সাথে নূরিও হেসে ফেললো তমার বলার ভঙ্গিতে। তিতির সামান্য লজ্জায়ই পরলো বড় বোনদের সামনে। চোখ রাঙালো তমা কে। তমা থামার পাত্রী হলে তবে তো। সে মহা উচ্ছ্বাস এ বলেই গেলো আরও কিছুক্ষণ। তিতির কে লজ্জায় ফেলতে পারদর্শী মেয়েটা।
বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়েছে। কারোরই ঘরে যেতে মন চাচ্ছে না। ঘরের ভিতর কেমন একটা ভ্যাপসা গরম। এসি ছাড়া এক দন্ড বসা যায়না। তবে এ বেলা একটু একটু শীতল বাতাস বইছে। ভালো লাগছে এখানেই বসতে।
রিক্তা দেওয়ান মেয়েদের পকোড়া দিয়ে গিয়েছেন। নিজের এক পোস্তর গল্প করে তারপর ভিতরে গেলেন। বাড়ির কর্তারা ফেরেন রাত আট টা – সাড়ে আটটার দিকে। মাগরিব এর আজান হয়ে গিয়েছে। রিশা রোশনি দের ছটফটানি বন্ধ হয়েছে। তিতির দের থেকে সামন্য দূরে মাদুর বিছিয়ে তমার ভাইসহ এ বাড়ির বিচ্ছু কটা লুডু খেলতে বসেছে।
তিতির চা যে সবেই চুমুক দিয়েছে। শেনা গেলো তমার আরেকটা অশ্লীল বাক্য।

____” ঈশান ভাই তোকে যা চোখে হারায় তিতির। বলেছিলাম না। তোরা মুখে বলবি ভালোবাসিনা, ওদিকে আমাদের এসে বলবি ‘বাবু কে ধর তমা, তোর ভাইয়ের আন্ডারওয়্যার খুজে দিয়ে আসি।”
নিশি, নূরির সামনে এমন বাক্যে প্রয়োগ এ তিতির লজ্জায় আড়ষ্ট হলো। যতই হোক বড় বোন। তমা বোন কম বন্ধু বেশি। নিশি, নূরি যেমন। সে আর তমা ঠিক তেমন। তমার কথায় নাকেমুখে উঠে গেলো চা। এই বাক্য তমা উঠতে বসতে শোনায় তাকে। তাই বলে আজ সবার সমানে! নিশি, নূরি ওড়নায় মুখ চাপা দিয়ে হেসে ফেললো।
তমা নিজেও কথাটা বলে অট্টহাসিতে মেতেছে। নিশি তমার কথায় মাথা ঝাকিয়ে সহমত জানালো।
____”ভুল কিন্তু বলেনি ও। যা অবস্থা দেখছি তোর আর ভাইয়ার। এতে মাখোমাখো প্রেম। শরীর জুড়ে আদরের ছাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াও। আমাদের ফুপু, খালামুনি হতে বেশি দেরি নেই তো।”
তিতির ঝটপট নিজের কন্ঠদেশ ওড়নায় আড়াল করে। গার্ডেনের হলুূদ আলোয় তিতিরের শরীর এর উন্মুক্ত অংশগুলেয় ঈশানের করা ক্ষত গুলোর কালশিটে দাগগুলো জ্বলজ্বল করছে। এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিলো সেসব এর কথা। তিতির লাজুক কন্ঠপ বললো,

____”বড়পু তুমিও শুরু করলে!”
____”করবো না? এমন আদর ভালোবাসা আমরা স্বচক্ষে দেখতে চেয়েছিলাম। হচ্ছেও তাই। কতটা খুশি আমরা জানিস তুই? ভাইয়া সেদিন দিদার কাছে যেভাবে তোকে আগলে রাখার কথা বললো আমরা তো কেঁদে ফেলেছি।”
তিতির লাজুক মুখে মৃদু হাসে। কান্না তো তারও পায়। ঈশান যতবার তাকে আদুরে কথাগুলো শোনায় ততবার কান্নায় ভাসাতে মন চায় সবকিছু। নরম কন্ঠে বললো,
____”তোমার ভাই খুব ভালো মানুষ আপু। আমাদের শুরুটা ওভাবে হলেও শেষটা অন্য রকম হবে।”
নিশি হাসলো বোনের কথায়। মাথায় হাত রাখলো।
____”হতেই হবে।”
রাত বাড়ছে। বোনরা একসাথে হলে বরাবর এর মতো গল্প গুজবের কমতি থাকে না। আজকে পরিমাণ টা বুঝি বেশিই। নূরি আবার আচমকাই অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছে। ইয়াজ এর কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আচ্ছা কেমন আছে মানুষ টা! খুব কি শরীর খারাপ? নাকি নূরির ব্যবহারে নিজের ওপর এতটাই বিরক্ত যে একটা বারও মুখোমুখি হচ্ছে না তার! রাত বাড়ে, তার বুকে জ্বালা যন্ত্রণা সেই রাতের আধারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে।

____”হাই বিউটিফুল লেডিস।”
ওপাশ থেকে পুরুষালি পরিচিত কন্ঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সকলে। নিয়াজ, আর নাঈম। গার্ডেন এর ছোট্ট বেতের গেট খুলে এগিয়ে এলো এদিকে। নিয়াজ এর হাতে কিসের একটা প্যাকেট। সেটা বাড়িয়ে দিলো তিতির এর দিকে। দুজন বসলো চেয়ারে। তিতির খুলে দেখলো। পেস্ট্রি ভিতরে।
নিশি বাড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়াজ কে চাপা কন্ঠে বললো,
____”এরকম অভদ্র,বখাটেদের মতো হাকডাক করতে করতে কেউ আসে!”
নিয়াজ বাঁকা হাসলো। তবে সঙ্গে সঙ্গেই চোখেমুখে কপট আহত ভাব ফুটিয়ে তুলেবললো,
____”অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে,
তাই কাছে আসো…”
____”চুউউউপ। কি হচ্ছে টা কি?”

নিয়াজ গানের মাঝেই থামলো। সবাই হাসছে একপ্রকার। শুধু নূরি বাদে। তার কারণ অবশ্য আছে। নাঈম এর লুকানো দৃষ্টি সে টের পাচ্ছে বারবার। তার প্রতি নাঈম এর আলাদা টান, কথার ধরন অন্য কিছু ইঙ্গিত দেয় বারবার। কিন্তু সে তাতে সায় দেবে কেনো! সে এক পুরুষে আসক্ত নারী। বিগত তিন তিনতে বছর এক পুরুষকে মন প্রান এ ভালোবেসেছে।
নিয়াজ, নাঈম বাড়ি ফিরছিলো। ঈশান এর কড়া নির্দেশ সে না ফেরা অবধি তার বাড়ির মেয়ে দের যেনো একটু খেয়ালে রাখে ওরা। তাছাড়া নিয়াজ এর সাথে সেই ঈদের দিনের পর নিশির আর দেখা হয়নি। আর নাঈম ও খানিকটা নূরিকে দেখতে চাচ্ছিলো। তিতির পেস্ট্রি সবাইকে হাতে হাতে দিয়ে যাচ্ছে। পেস্ট্রি আদতে নূরি আর তিতিরের সব থেকে বেশি পছন্দ। আর নূরির কথা মাথায় রেখেই এটা আনার বুদ্ধি টা নাঈম এর।
বাড়ির কর্তারা এখনো ফেরেনি। গিন্নিরাও এখন বাহিরে আসবেন না। নিশি, নিয়াজ কে এক সাইটে গল্প গুজবের সুযোগ দিয়ে পাশ ফিরে বসলো বাকিরা। নূরি নিশ্চুপ। নাঈম গল্প জুড়েছে তিতির আর তমার সাথে।
আলো আধারির খেলায় নূরির চোখ হঠাৎ করেই আটকে গেলো ওপাশের পাচিলের ওপরের দিকে। একজোড়া চোখ কি তাদের দিকে তাকিয়ে! নূরি ভ্রু কুচকে ভালো করে তাকাতেই চোখের মালিক সম্ভবত সরে গেলো। নূরি মনে মনে নিজেকে ধমক দিলো এবারে। কেই বা এতো সাহস করবে!

নূরি আড়ষ্ট হচ্ছে বারবার নাঈম এর এমন আড়চোখের তাকানো তে। বিরক্ত লাগছে তার। আচমকা উঠে দাড়ালো। সবাইকে ছোট্ট করে বিদায় জানিয়ে গটগট করে চলে গেলো বাড়ির দিকে। নাঈম দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখে নূরির প্রস্থান। তিতির তাকিয়ে রইলো নাঈম এর দিকে। ওই যে একটা কথা!’ ভালোবাসা টের পাওয়া যায়। সত্যিই যায়। নাঈম এর চোখের দৃষ্টির পবিত্রতা তিতির টের পায়। সদ্য প্রেমে পরা বিবাহিত রমনী সে। একজন মেয়ের প্রতি একজন পুরুষের দৃষ্টি কিছুটা হতেও আচ করতে পারে সে। তবে মায়া ও হলো নাঈম এর জন্য। নূরি তো অন্য কাউকে ভালোবাসে।
নূরির দৃষ্টির আড়াল হতেই নাঈম গল্প জমাতে চাইলো তিতির দের সাথে। তবে আড্ডা আর জমলো না। নূরির এমন উপেক্ষা তাকে বরাবরই পোড়ায়। যে ভালোবাসার যোগ্য নয়, তাকে ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে কত পায়তারা। অথচ অপর একজন যে একটু খানি ভালোবাসার পাওয়ার তৃষ্ণায় হাপিত্যেশ করে সে দেখার সময় কই আমাদের!
ঘড়ির কাটা আমন মনে এগিয়ে চলছে। নিয়াজ আর নাঈম আর দেরি করে না। তিতির রাও এখন উঠলো। ভিতর থেকে মুক্তা দেওয়ান এসে ডেকে গিয়েছে। কর্তারা ফিরবে খানিক্ষন পর। তাছাড়া কি দরকার এতো রাতে বাগানে বসে থাকার।

ছেলেগুলো চলে যাওয়ার সাথে সাথেই তিতির রাও বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। তমা ভিতরের ছোট গেট পেড়িয়ে নিজের বাড়িতে চলে যেতেই নিশি আর তিতিরও রোশনি দের নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো।
হাবিজাবি খেয়ে খিদে নেই কারোরই। তবে মায়েরা কখনো না খেয়ে শুতে দেয়! ডিনার টেবিলে বসেছে সকলে। রাইসুল দেওয়ান দের ফিরতে আজ খানিকটা দেরিই হচ্ছে। রাত নয়টা পার হয়ে গিয়েছে এখনো আসেননি তারা। তিতির রা সেই সুযোগ এ ডাইনিং ছেড়ে সোফায় গিয়ে টিভিতে মুভি চালিয়ে খেতে বসেছে। খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। রাহেলা মিটিমিটি হাসতে হাসতে কানে ফোন চেপে এসে দাড়ালো তিতিরের সামনে। ভ্রু জোড়া তুলে জিজ্ঞেস করলেন।
____”তোর ফোন কোথায়? “
তিতির আশেপাশে খুঁজলো। নেই তো। রাহেলার দিকে তাকাতেই রাহেলা ধীর কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,
____”আমার ছেলে টা কখন থেকে খুঁজছে তোকে। ফোন তুলছিস না কেনো! “
তিতিরের মনে পরলো ফোন সম্ভবত গার্ডেন এই রেখে এসেছে। ঈশান ওদিকে ফোন কেটে দিয়েছে। রেগেছে বোধ-হয়। তিতির চটজলদি হাত ধুয়ে ছুটলো গার্ডেন এ। গিয়ে পেলোও বেতের টেবিল টার ওপরে। তখন কথায় কথায় খেয়ালই করেনি। ঈশানের বেশ কয়েকটা ফোন এসেছে। ফোন হাতে নিয়ে ঘুরতেই হাতে টান পরলো তার। ভয়ে চিৎকার করার আগেই মুখ চেপে ধরলো মানুষ টা। ওপাশে শুধু দারোয়ান আংকেল পাহারায় বসা। তবে দেখা যাচ্ছে না৷ সম্ভবত নামাজ না হলে রাতের খাবার খাচ্ছেন। আলো ছেড়ে খানিকটা টেনে বাগানবিলাস এর ঝোপঝাড় এর এদিকে নিয়ে আসা হলো তিতিরকে। তিতির এর রুহ কাঁপছে। তবে হাতের বাধন শিথিল হতে ঘুরে তাকাতেই থমকালো সে। মুখ দিয়ে সাথে সাথেই বের হলো একটা শব্দ।

____”রাহাত ভাই! “
রাহাত তার সামনে। তিতির হতভম্ব হয়। তাদের বাড়ির কড়া পাহারায় চাইলেই হুটহাট কেউ ঢুকে পরতে পারে না। বাড়ির গেটের ওয়ালগুলোরও বিশাল প্রাচির তোলা। রাহাত ভিতরে ঢুকলো কোথা থেকে! তিতির এর হাতের কবজি দৃঢ় ভাবে আকড়ে রেখেছে রাহাত। হতভম্বতা খানিক কমতেই সে হাত ঝটকা টানে সরিয়ে ফেললো। কন্ঠ খাদে নামানোর প্রয়োজন বোধ করলো না।
____ “আপনি পাগল রাহাত ভাই? এরকম করে এতো রাতে কারোর বাড়িতে ঢোকা কি ভদ্রলোক এর কাজ?”
রাহাত এর মুখের ওপর কোনো অনূভুতির ছাপ নেই। সম্পূর্ণ নির্বিকার লাগছে। নির্বিকার কন্ঠেই শুধু বললো,
____”পরী, চিৎকার করে না। একটু কথা বলবো শুধু। পাঁচ মিনিট।”
তিতিরের মস্তিষ্ক জ্বলছে। এটা কি ধরনের অসভ্যতামি। এভাবে কে ব্যবহার করে! বিরক্তি আর রাগে একাকার হলো সে। সেই স্বরেই বললো,

____”আমাকে ছেড়ে সরে দাড়ান আগে। আর কতবার বলতে হবে অযাচিত পুরুষের স্পর্শে গা গোলায় আমার।”
রাহাত এর অসহ্য যন্ত্রনা হয় তিতির এর এ ধরনের কথায়। সে যতবার ছুঁতে যায় ততবার এ কেমন কথা! সে আর কিছু করেছে? শুধু তো হাত টাই ছুঁয়েছে। এতে পরপুরুষ এর কথা মনে করিয়ে না দিলে হচ্ছিলো না! বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
____”ঈশান ছুলে এমন হয়না?”
তিতিরের মুখ বজ্র কঠিন হয়। দু পা পিছিয়ে দাড়ায়। শক্ত গলায় বলে,
____”কোন কথা থেকে কোন কথায় টেনে নিয়ে যাচ্ছেন? আপনি এখানে এসেছেন এসব কথা জিজ্ঞেস করতে! উনি আমার স্বামী। আপনাকে আর কিভাবে বোঝাবো আমাকে ভুলে যাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই আপনার। কেনো বারবার এভাবে নিজেকে ছোট বানাচ্ছেন রাহাত ভাই? “
রাহাত আচমকা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে এলো তিতিরের দিকে। সেই সাথে তাল মিলিয়ে তিতির ও পেছালো। রাহাতের মুখ নিমিষে রক্তিম হয়ে উঠেছে। কেমন একটা ব্যাগ্র শোনালো কন্ঠস্বর।
____”রোজ রাতে ছোঁয় ও তোমাকে? হুম। বলো।”
রাহাত তিতিরের বাহু চেপে ধরে উন্মাদ এর মতো আউরালো কথাগুলো। হাতের ব্যাথায় তিতির কেঁদে ফেললো। ছাড়া পেতে মরিয়া হলো। সত্যিই গা গোলায় তিতিরের। চেচিয়ে বলে উঠলো,
____” আমরা স্বামী স্ত্রী। যা ইচ্ছে করতে পারি। ও যখন ইচ্ছে আমাকে ছোঁবে। সেটার কৈফিয়ত আপনাকে দেবো? পাগলের প্রলাপ বকছেন কেনো?”
রাহাত বাহু ছেড়ে আঙুলে কপাল ডললো। শ্বাস ফেললো জোরে জোরে। তিতির হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছলো। রাহাতের কিছু বলার আগেই বললো,

____”এই মূহুর্তে বেড়িয়ে যাবেন। আপনার প্রতি আমার আকাশ ছোঁয়া সম্মান ছিলো রাহাত ভাই। সেটা মিশিয়ে যাচ্ছে মাটির সাথে। অন্তত যেটুকু আছে সেটুকু হারিয়ে যেতে দেবেন না। আমারই কষ্ট হবে। আমাদের কিচ্ছু ছিলো না যেটার মায়ায় আমি আমার ভালোবাসা,স্বামী, সংসার ছেড়ে আপনার কাছে ছুটবো। বিয়ের আগের দিন অবধি আমার স্বামী কে জানিয়ে ছিলাম। ভালো না বাসলেও অপেক্ষা করবো আপনার প্রস্তাবের এ কথা যে আমি আপনাকে দিয়েছিলাম। কোথায় ছিলেন আপনি? আমি আমার পরিবার জলে ভাসাতে পারিনি। আমার এরা ছাড়া কেউ নেই। নানুআপু,মামা, মামিরা আমাকে রাজকন্যা করে রেখেছে জীবনে। সেই নানুআপুর মৃত্যু সয্যায় একটাই চাওয়া ছিলো। আমার আর ঈশান ভাইয়ের বিয়ে। আমি তবুও কথার খেলাপ করতে চাইনি৷ পরিবার মানা না মানা পরের কথা। অন্তত আপনাকে দেওয়া কথা রাখতে চেয়েছিলাম। মানছি আপনিও বিপদে পরেই যোগাযোগ করতে পারেননি আমার সাথে। আপনার বা আমার কারোর হাত নেই এতে। ভাগ্য বলতে একটা জিনিস হয় রাহাত ভাই। আর কত বার বলবো, বোঝবো আপনাকে? খোদার মর্জির বাইরে এক কদম আমরা চলতে পারি না। চেষ্টা করার প্রশ্নও ওঠে না৷ জানি এতে সহজে ভোলা যায়না। তবুও, পাপ আমি করতে পারি না। পরকীয়ায় জড়াতে বলেন আমাকে? নিজের ভালোবাসাকে হত্যা করে কোনো এক কালে আপনি সম্মন্ধ নিয়ে আমার হাত চাইতে আসতে চেয়েছিলেন, সেটা আকড়ে স্বামী কে ছাড়তে বলেন? পাগল? “
রাহাত শুনে গেলো তিতিরের এক দমে বলা কথাগুলো। মেয়েটার সব কথাই তো সঠিক। কার কি দোষ? খোদাই যদি না মেলায় কপালে। তবে তবুও কেনো সে পারছে না ভুলতে সামনের নারী টিকে। এতো কথায় লাভের লাভ কিচ্ছু হলো না। রাহাতের মনের ভাবের কোনো পরিবর্তনই হলো না। সে ব্যাগ্র কন্ঠে বললো,

____”আমি নিয়ে যেতে চাই তোমাকে পরী। শান্ত মাথায় অনুরোধ করতে এসেছিলাম মায়ের জন্য। কিন্তু… “
____”সম্ভব নয় রাহাত ভাই। আমার স্বামী ছাড়া আমি এক পা কোনো পুরুষের সাথে হাটবো না। আপনি দয়া করে চলে যান। অশান্তি করবেন না। আমি চাইনা আপনার সাথে দেখা করতে। আপনার ভালো জন্য। সমানে রেখে সামনের জিনিস কখনো ভোলা যায়না। আমাকে ভুলতে হলে সর্বপ্রথম আমাকে চোখের একদম আড়াল করতে হবে। দয়া করুন। আমাকেও,নিজেকেও। “
রাহাতের কানে এসব কিচ্ছু ঢুকতে চাচ্ছে না। ঈশানকে বারবার স্বামী স্বামী করায় মাথায় এসে হানা দিলো সেদিন হোটেল রুমে বলা রুষার কথা গুলো! ঈশান এর স্পর্শ তিতিরের গায়ে! সেই স্পর্শে তিতির ভুলেছে তাকে? রাহাত কাতর কন্ঠে বললো,
____” কিভাবে আদর করে ও তোমাকে? রোজ রাতে? হুম? আমি তবুও মেনে নেবো। ওর সন্তান তোমার গর্ভে থাকলে তবুও। তুমি শুধু আমার সাথে চলো। আমার স্পর্শে ঈশানের সব মুছে ফেলবো আমি। পরী…যাবে তো..? “
তিতির এর মাথায় যন্ত্রনায় ছিড়ে যাচ্ছে। তার ইচ্ছে করছে চেঁচিয়ে লোক জমা করতে। কিন্তু বিবেক বোধ থেকে পারলো না। রাহাতের ব্যাক্তিত্ব জানে সে। এহেন পাগলামি গুলো কখনো দেখেনি তিতির। তার এই মূহুর্তে খুব মনে হলো লোকটাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো খুবই দরকার। এতক্ষণ হলো এসেছে। দরজার কাছে নূরি এসে দাড়িয়েছে। সম্ভবত তিতিরকে দেখার চেষ্টা করছে। ওদিকে মানুষ দেখে রাহাত পিছিয়ে গেলো কয়েকপা। আধারে ঢাকা পরলো তার শরীর। তিতির উল্টো পিছিয়ে দাড়ালো। নূরির চোখে পরলো তিতিরকে। মন শান্ত হলেো। তিতিরের ফেরার জন্য অপেক্ষা করলো।
তিতির কঠিন স্বরে বললো,

____”আজ শেষ দিন রাহাত ভাই। এরপর কখনো আমার সাথে এভাবে জোর করে দেখা করে, ঔদ্ধত্যতার পরিচয় দিলে আমি আর আপনার প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকেও চুপ থাকবো না। ঈশান ভাই বা বাড়ি সকলকে জানাতে বাধ্য হবো।”
রাহাত তিতিরের এমন কঠিন রুপে যেনো আজকাল অভ্যস্ত। খানিক থমকালেও পরক্ষণেই হুট করে বাঁকা হাসি দিলো। ফিচেল কন্ঠ, অথচ শেনালো বেশ সিরিয়াস। বললো,
____”ওর মতো একটা কাপুরষ এর সাথে তোমাকে থাকতে দেবো না আমি। তুমি জানো ও কে???”
তিতিরের কপালে ভাজ পরে। ঈশান কে কাপুরষ বলা! অসহ্যকর লাগলো সমানের মানুষ টাকে। রাগত স্বরে বলে উঠলো,
____”আপনি যেটা করে যাচ্ছেন সেটা পুরুষ মানুষ এর মতো কাজ হচ্ছে তো? বিবেক কি বলে? অন্যের বউয়ের কাছে এতো রাতে এসে হাঙ্গামা করছেন।”

____”বিবেক কার কি বলবে সেটা না হয় তেমার সিদ্ধান্তের ওপরই ছেড়ে দিলাম পরী। তোমার ফেরেশতা স্বামীর হাতের রক্তের দাগ দেখেও যদি বিবেক তোমাকে আরও…
রাহাত আরও কিছু বলবে তার আগেই দেখলো বাড়ির ভিতর থেকে কেউ এগিয়ে আসছে এদিকেই। তিতির রাহাতকে থামতে দেখে কিছু কঠিন কথা বলবে তার আগেই তিতির কে হতভম্ব করে প্লাস্টিকের পানির একটা উপুড় করে রাখা বালতির ওপর পা দিয়ে চোখের পলকে প্রাচীর টপকালো রাহাত। প্রায় কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যেই নূরি এসে দাড়ালো। নাকে এসে বাড়ি খেলো অন্য রকম পারফিউম এর ঘ্রান। ভৃরু কুচকে বললো,
____”ফোন পাসনি?”
____”পেয়েছি। “
____”এখানে কি করছিস! কখন এসেছিস! আমি ভাবলাম পাসনি এখনো।”
তিতির হাতের ফোনটা নূরিকে ইশারা করে দেখালো। পেয়েছে বুঝিয়ে বললো,
____”চলো।”
নূরি হাঁটা ধরলো তিতিরের পাশাপাশি। কয়েকপা এগিয়ে পিছনে ফিরে তাকালো বাগানবিলাস এর গাছের ওদিকে। কড়া পারফিউম এর ঘ্রান এখানে অবধি এসেছে। নূরি আচমকা ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
____”কেউ কি ছিলো ওখানে?”
তিতির এর মুখ এখনো কঠিন হয়ে আছে। পিছনে তাকালো সেও। থমকানো, বা চমকানো কোনোটাই ঘটলো না। স্বাভাবিক কন্ঠে জবাব দিলো,
____”নাহ তো।”

দূরত্বের সাথে সাথে বিলিন হলো পারফিউম এর ঘ্রান । কেউ-ই আর কথা বাড়লো না। তিতির বসার ঘরে অপেক্ষাও করলো না আর। অশান্তি লাগছে। রাহাত কি বলে গেলো শেষের কথাগুলো? ঈশান এর হাতে রক্তের দাগ! ঈশান কে! মানে কি এসব কথাগুলোর। লেকটা পাগল হয়ে গিয়েছে। সম্পূর্ণ উন্মাদ।
ঘরে ঢুকে দরজা আটকে শাওয়ার এ ঢুকলো তিতির। রাত করেও লম্বা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। আলমারি খুলে গায়ে জড়ালো ঈশানের একটা শার্ট। কোমড়ে তোয়ালে পেঁচানো। চুলগুলো মোছা হয়নি ভালো করে। ঈশানের শার্ট টেনে জোরে জোরে শ্বার টানলো। এই মানুষ টার স্পর্শ তার এখন দরকার। বড্ড দরকার। বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পরলো তিতির। সদ্য ভেজা চুলগুলো বিছানার বাইরে ছড়িয়ে দিলো। ঘরটা কেমন শূন্য। দম বন্ধ লাগছে। যদিও এটা ঈশান যাওয়ার পর থেকেই মনে হচ্ছে। তিতির ফোন করলো ঈশানকে। দু বার রিং হতেই তুললো ঈশান।
সেও তিতিরের অপেক্ষা তেই ছিলো। এ দু দিন যা ধকল গিয়েছে। দু দিন হলো দেখে না মেয়েটাকে। অথচ মনে হচ্ছে জনম জনম হলো দেখা হয়না। তিতিরের নরম মিহি কন্ঠ কানে আসতেই থমকে যায় ঈশান। এতক্ষণ পরিকল্পনা করে রেখেছিলো কষিয়ে ধমক দেবে। সেটা দেওয়া গেলো না। উল্টো ফোনের ওপাশে তার ব্যাক্তিগত নারীর শ্বাসপ্রশ্বাস কানে এসে লাগতেই নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলো।

____”রেগে গেছেন? “
____”একটু।”
____”আমিও রেগে।”
____”কেনো!”
____”এ দুদিন দু মিনিটও কথা বলেননি। মনে পরেনি বুঝি?”
____”পরেছে।”
____”তবে?”
____”ব্যাস্ত ছিলাম খানিকটা।”
তিতির শ্বাস নিলো জোরে জোরে। শরীরে ঈশানের শার্টের আড়ালে তার ছোট্ট দেহ হারিয়েছে। আর সেই শার্ট থেকে আসা ঈশানের শরীরের ঘ্রানে তার মন অতলে হারাচ্ছে।
চোখ বুঝে নিজেও অনূভব করলো ঈশান এর শ্বাসপ্রশ্বাস। মিহি কন্ঠে বললো,
____”ফিরবেন কবে?”
____”জলদিই।”
____”কাল পরশু?”
____”সামনে সপ্তাহ।”
আতকে উঠলো তিতির। সামনে সপ্তাহ!
____”কি কাজ এতো? বড় মামা যে বললো অফিসের কাজ নয়।”
____”অন্য কাজ। জলদিই ফিরবো। “

তিতির চুপ মেরে রইলো। চোখ বুজে পরে রইলো। দুটো মানব মানবিই উত্তাল মন নিয়ে শান্ত। একটা কথাও হচ্ছে না দুজনের মধ্যে। বলার প্রয়োজন পরছে না। একে অপরকে যে কতটা মিস করছে এই মূহুর্তে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে দুজনেই। ঈশান ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানার ওপরের ল্যাপটপ টা সরিয়ে শুয়ে পরলো। মেয়েটাকে দূরে রেখে বিয়ের পর এই প্রথম এতদিন এর জন্য বাইরে। অস্থির কি তারও লাগছে না। লাগছে তো। কিন্তু উপায় কি। যেতে পারছে না তো সে।
তিতির এবারে কথা বললো,
____”ফিরে আসুন জলদি। ভীষন মিস করছি।”
ঈশান এর হৃদ স্পন্দন দ্রুত হয়। মেয়েটা কত অবলিলায় বলে দিলো আজকে কথাটা।
____”হুম…ঘুমা। “
____”আপনি কি করবেন এখন?”
____”কি করতে বলিস?”
____”আমি তো চাই এক্ষুনি ফিরে আসুন। তা যখন হচ্ছে না তাহলে আর কি।”
ঈশান এপাশ থেকে নিঃশব্দ হাসলো। একবার ইচ্ছে হলো মেয়েটাকে ভিডিও কল অন করতে বলবে। চোখের তৃষ্ণা টা মেটাক একটু। কিন্তু মন সংযত করলো। ওই মুখ টা দেখলে এক মূহুর্ত আর এখানে থাকার ধৈর্য হবে না তার। সব জলাঞ্জলি দিয়ে ছুটবে বউয়ের কাছে। সেটা ভালো হবে না মোটেই।

____”ঘুমা। পাহারা দেই আমি।”
____”কাকে?”
____”তোকে।”
____”আমাকে পাহারা দিতে হবে?”
____”দিলে ক্ষতি কি? মাথার কাছে ফোনটা রাখ। কল কাটার দরকার নেই।”
____”কিন্তু। “
____”চুপ। কথা কম। যা বললাম কর। কাজ করতে হবে আমার রাত জেগে। ঘুম ধরা যাবে না। তোর নাক ডাকার শব্দে যদি উপকার হয় ক্ষতি কি।”
____”আমি নাক ডাকি?”
____”কথা কম তিতির।”

তিতির রেগে কিছু বলতে গিয়েও বললো না। লোকটা কাজের সময় এতো চাপা। বললেই হয় মিস করছে। সেটা না। ঢং এর শেষ নেই। এমনিতে মুখে লাগাম নেই। এখন এসেছে লাগাম টানতে। তিতির কথা বাড়ায় না। ভেজা চুল আরেকদফা মুছে গা এলিয়ে দিলো বালিশে। রাহসতের কথাগুলো বলতে গিয়েও এখন বলতে ইচ্ছে হলো না। এতে সুন্দর মূহূর্ত নষ্ট করার মানেই হয়না। ফিরুক মানুষটা। তারপর বলবে যা বলার। ফোনটা পাশে রেখে চোখ বুজলো। ঘুমাতে সময় লাগলো না আজ। কে জানি ঈশান ওপাশে কলে আছে বলে হয়তো।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪১

নিঃশ্বাস এর শব্দ ঘন হতেই ঈশান হাসলো এপাশে। কপাল চেপে ধরলো দু আঙুলে। কি ছেলেমানুষী করলো সে এসব! তার কি এই আহ্লাদ করার বয়স আছে! নতুন প্রেমে পরা নিব্বা নিব্বি প্রেমিক প্রেমিকার মতো পাগলামি হয়ে গেলো এটা। শব্দ করে হাসতে ইচ্ছে হলো ঈশানের। তবে হাসলো না। ছোটখাটো পাগলামি করতে দোষ কি! এই যেমন দু রাত ঘুম হয়নি মেয়েটাকে ছাড়া। অথচ ওই নিঃশ্বাস এর শব্দ কানে আসতেই চেখ ঘুমে ভেঙে আসছে। মনে হচ্ছে মেয়েটা তার কাছেই আছে। ভালোবাসলে ইম্যাচুইরিটিও দরকার আছে বোধহয়।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৩