সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৯
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
ঘুম আজকে বোধহয় ছুটি নিয়েছে। বুকের ভিতরের অশান্তি গুলো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অসহ্যকর অবস্থা তৈরি করে ফেলেছে। শ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে যেনো! ঘরের ভিতর দমবন্ধ লাগছিলো একপ্রকার। তিতিরকে দেখে সেই অনুভূতি যেনো আরও দ্বিগুণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ঈশানের। মেয়েটা ঘুমিয়েছে খানিক আগেই। ঈশানকে জড়িয়েই শান্তির ঘুমে পাড়ি দিয়েছে। খোলা চুলগুলো ঈশানের হাতের মুঠোতে। ছেড়ে দেওয়া মাত্র বাতাসের তীব্রতায় তা এসে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঈশানের চোখেমুখে। কড়া শ্যাম্পুর মাতাল করা ঘ্রানে ঈশানের বারবার উন্মাদ মনে হচ্ছে নিজেকে! ঈশানের উদাম বুকের ওপর পরে আছে মেয়েটা৷ ডান গালটা ঈশানের বুকে ঠেকিয়ে বাঁ হাতে পেঁচিয়ে রেখেছে বলিষ্ঠ শরীরটাকে।
মেয়েটার নেওয়া ঘন ঘন তপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাস এসে আছড়ে পরছে ঈশানের কন্ঠদেশে। কি যে মিষ্টি মধুর যন্ত্রনাূভূতি এটা! ভাষায় প্রকাশ করা যায়না সম্ভবত।
তখন মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে যে কোন পর্যায়ের ভুল করেছে! এখন এতো ঘনিষ্ঠ অবস্থায় থেকে, রীতিমতো আন্দোলন করছে গোটা দেহ। বাঁ হাতে তিতিরের কটিদেশ আকড়ে ধরা। টেনে এনে আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতেই ঘুমের ঘোরে মৃদু শব্দ করে উঠলো মেয়েটা। সামান্য ফাঁকা হয়ে আছে গোলাপি অধরজোড়া। মিষ্টি মিষ্টি হাসছে একটু পরপর। খুব সুন্দর কোনো স্বপ্ন দেখছে হয়তো। ঈশানের হাতের গভীর স্পর্শে সে স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটলো হয়তোবা। ঘুমের ঘোরে নাক,মুখ ঘষলো ঈশানের কন্ঠদেশে। মেয়েটার মুখের লালা এসে ভিজিয়ে দিলো ঈশানের কাধটা। ঠোঁট টিপে হেসে ফেললো ছেলেটা। মেয়েটার গ্রীবাদেশ আঁকড়ে মাথা ঘুরিয়ে ঠোঁট ডুবালো ওই পাতলা অধরজোড়ায়। গভীর চুমু একে মুখ তুললো। ততক্ষনে তিতিরের মুখের হাসি মিলিয়েছে। কপালে ভাজ পরেছে খানিকটা।
ঈশান পুনরায় হাসলো। দ্বিতীয় বারের মতো ঠোঁট ডুবালো। তবে এবার শুধুমাত্র বিরক্ত করেই ঠোঁট সরিয়ে ফেলতে পারলো না, চুম্বকের মতো আঁকড়ে ধরলো কেউ বুঝি! ভুলে গেলো, মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে মেয়েটার গাল গলিয়ে শক্ত করে চেপে, গাঢ় করলো আদর। ঘুমন্ত পরীটার পাতলা অধরজোড়া শোষন করলো একদফা। গভীর থেকে গভীর আশ্লেষে টেনে নিলো মেয়েটার ঠোঁটের মিষ্টত্ব। ঈশানের কাঁধের ওপর থাকা তিতিরের হাতখানা কেঁপে উঠলো। ঘুমের ঘোরেই নখগুলো গেথে গেলো শক্তপোক্ত ফুলো বাহুতে। সে ব্যাথাটুকু টেরও পেলো না ছেলেটা! পা জোড়া ছটফট করে উঠলো তিতিরের, হাতের খামচে ধরা দ্বিগুণ হলো। শ্বাস নিতে না পারার হেতুতে অস্থির বোধ করলো যেনো।
ঈশান ছেড়ে দিলো। মেয়েটার মুখের অবস্থা করুণ। ঠোঁটের নিচের অংশ ফুলে উঠেছে এক মূহুর্তের মধ্যে। আবার নিজের কাজে ব্যাস্ত হবে তার আগেই গুঙিয়ে উঠলো মেয়েটা। ঈশান ভ্রু কোচাকালো। হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—’কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলি, হুম? আমাকে নিয়ে নয়? আমাকে নিয়ে হলে–আমার চুমুতে তো বিরক্ত হওয়ার কথা নয়? অন্য সুইট ড্রিম? হাহ্? আমাকে ছাড়া অন্য কিসে এতো খুশি পাচ্ছিলি তুই?’
ঘুমের মধ্যে ঈশানের এই ছেলেমানুষী কথাগুলো কর্ণগোচর হলো না মেয়েটার! মৃদু গুঙিয়ে গভীর হয়ে মুখ ডুবালো ঈশানের কাঁধের ভাজে। আড়াল করলো মুখটা। ঈশান হাসলো। শরীরটা ঝিমঝিম করছে। কানের কাছে ঠোঁট এগিয়ে ফিসফিস করে বললো,
—’ এখন যদি তোর ঘুমের সুযোগ নেই, কালে
সকালে উঠে রাগ করবি কি? কাঁদবি কি? আমি তো অধৈর্য্য পুরুষ। সহ্য করতে পারছি না আর। কি করবো? করবো আদর? করা যায় তো। তুই ঘুমা, আমি আদর করি?’
—’উমমমম।’
—’করবো?’
—’হুমমম…’
—’পরে কাঁদবি না তো? দোষ দিবি না তো?’
—’উমমম।’
ঈশান শব্দ করে হেসে ফেললো। মেয়েটা যে ঘুমের মধ্যে অনুমতি দিচ্ছে, তা বুঝতে বাকি নেই তার। থাকুক, আজ রাত টা ছাড় দেওয়াই উচিত। তবে এভাবে বুকের ওপর লেপটে থাকলে তা সম্ভব নয়, যখন তখন দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে সে!
—’ আমার মেয়েটাকে তুমি কি সত্যিই ভালোবাসো? তোমার মুখে আমি শব্দটা শুনতে চাই, ঈশান। কি চাও তুমি, কি চাচ্ছো বা কি করছো! কোন খেয়ালে চলছো তুমি? ‘
বাপ ছেলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দোতলার করিডরে। রাত পেরিয়ে ভোর হওয়ার পথে। যদিও এখনো দিনের আলো ফোটেনি। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারপাশ। বাইরে মৃদুভাবে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। শীতল পরিবেশ। তিতিরকে বিছানায় শুয়িয়ে, নিজেকে খানিকটা ধাতস্ত করতে — ঈশান সিগারেট ফুঁকতে এসেছিলো ঘরের বাইরে। করিডরে আসা মাত্রই দেখা হয়ে গিয়েছে রাইসুল দেওয়ানের সাথে। বাড়ির কর্তা বরাবরই ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। বাগানে খানিকটা সময় পায়চারি করে, নামাজ পরতে যাবেন। বাকি দুই কর্তাও উঠবে খানিক পরেই, গিন্নিরাও তাই। ঈশান তখন সবেই সিগারেট ধরিয়েছে। একটান দিয়েছে সবেই, ছাদে যাওয়ার নিয়ত আরকি। পিছন থেকে বাবার তীক্ষ্ণ শব্দে ফিরে তাকালো ঈশান, একপ্রকার চমকেই তাকিয়েছে। রাইসুল দেওয়ানের পরনে সফেদ একটা পাঞ্জাবি,পাজামা সেট। হাতজোড়া পিছনে রাখা, চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা এঁটে রাখা। চোখমুখ ফুলো ফুলো। ঘুমাননি নাকি ভদ্রলোক! মুখ জুড়ে রাজ্যের প্রশ্ন ছুটাছুটি করছে। প্রথমেই এমন দীর্ঘ প্রশ্নে খানিকটা সময় থমকে রইলো ঈশান। পরক্ষণেই সামলেও নিলো। সিগারেটটা তৎক্ষনাৎ মেঝেতে ছুড়ে,পায়ে পিষে ফেললো। বাপের মতোই গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ মাঝরাতে এই প্রশ্ন করতে উঠে এসেছো? ‘
ছেলের কথায় পিতার মুখমন্ডলের কোনো ভাবান্তর হলো না। উল্টো প্রশ্ন ছুড়লেন তিনিও,
—’ তুমিও তো ঘুমাওনি দেখছি।’
—’আমাদের জেনারেশনের হিসেব আলাদা। তোমরা যখন ঘুম থেকে ওঠো, আমরা তখন ঘুমাতে যাই। সিম্পল। ‘
রাইসুল দেওয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। পশ্চিমের দেয়ালে বিশাল জানালাখানা হাট করে খুলে দিলেন। সূর্যের দেখা নেই, আকাশ পরিষ্কার একদম। কত যে বাজে, খেয়াল করেননি তিনি! তবে আজান যে আর মিনিট দশেকের মধ্যে দেবে সেটা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়!
—’ আমি যে প্রশ্ন টা করলাম শুরুতে। তার জবাব দিচ্ছো না কেনো?’
ঈশানের ভ্রু জোড়ার মাঝেও ভাজ দেখা গেলো। ভারি কন্ঠে বললো,
—’কি প্রশ্ন যেনো করলে?’
—’তিতিরকে নিয়ে তোমার পরিকল্পনা কি?’
—’কি পরিকল্পনা থাকবে? বিয়ে দিয়েছো, বউ হয়েছে, সংসার করছি, সামনেও করবো। বাচ্চাকাচ্চা হবে। তারা বড় হবে। তারপরের কাহিনি তো জানোই। বুড়ো হওয়ার জীবন নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি না। সবে টগবগে যুবক আমি!’
রাইসুল দেওয়ান বিরক্ত ও গম্ভীর গলায় শুধালেন,
—’কবুল বললেই বিয়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়না। বিয়েটা শুধু দায়িত্বও নয়। রাজি ছিলেনা, একপ্রকার জোর করেই দেওয়া হয়েছে। তারপরও। তুমি যদি শেষ অবধি রাজি না হতে, বিয়েটা হতো না।’
ঈশান বোধহয় বিরক্ত হয় খানিকটা। বাবার সাথে ঘুরে ফিরে এই এক বিষয় নিয়ে আলোচনা তার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। পৌঢ় এরকম প্রশ্নগুলো করে আদতে কি উত্তর শুনতে চান, জানা নেই ঈশানের। ভালোবাসার প্রকাশ কি দেখিয়ে করার জিনিস। ভালোবাসা সবসময় গোপনে সুন্দর। ঈশান শান্ত কন্ঠে বললো,
—’ যা বলার বলে ফেলো। শেষ করো বাক্য। থেমে থেমে কথা বলা শিখেছো কেনো? আগে তো বলতে না!’
ছেলের কথায় জ্বলে উঠলো ভদ্রলোকের মুখটা। তেঁতে উঠলেন একপ্রকারে।
—’ বেশি বড় হয়ে গেছো! বাবার সাথে ভদ্রতা বজায় রাখার প্রয়োজনটাও বোধ করো না।’
ঈশান জবাব দেয় না। পিতা মহাশয় তার রেগে আছে ভীষন। বোঝাই যাচ্ছে। ক্ষেপানোর মানেই হয়না। ঈশানের বলতেও হলো না কিছু। রাইসুল দেওয়ান নিজেই পুনরায় বললেন,
—’ তিতিরকে নিয়ে এরকম ভাবলেশহীন কিভাবে থাকো তুমি? এটা আমার একার কথা নয়। বাড়ির যেকোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করো। এক দেখায় বলে দেবে তোমার এসব অসংগতির বিষয়গুলো। এককালে কি সম্পর্কে ছিলে, সেটা কথা নয়। এখন তোমরা স্বামী স্ত্রী। আর দশটা দম্পতির মতো তোমাদের বলবে কেউ? ওপর যেমন তেমন, নিচে যখন সবাই একসাথে থাকা হয়। তুমি আমার মেয়েটার দিকে ফিরেও তাকাও না। না তো ডাকো, না তো কোনো কিছু! এতো অনীহা কেনো? এখনো সেই শুরুর মতো থাকবে কেনো? আমাদেরও তো ইচ্ছে হয়, তোমাদের হাসিমজায় মেতে থাকা দেখতে। আর সবার মতো করে কেনো মনে হয়না তোমাদের দাম্পত্য? ‘
ঈশান হতাশ শ্বাস ফেলো বাবার দিকে তাকায়। সে কি করে বোঝাবে, বরাবরই সে এরকম। বউ নিয়ে সবার সামনে মাতামাতি! তাও বাবা,মায়ের সামনে! তার বাবা কি ধরনের ভালোবাসার প্রকাশ চাচ্ছে! সে কি এখন জনসম্মুখে বউ বউ করে ডাকবে, বউকে চুমু খেয়ে বেড়াবে! এভাবে প্রমান দিতে হবে? তাছাড়া তাদের আদর সোহাগ দেখর জন্য তিনি বাড়ি থাকেনই বা কখন!
—’বাবা, তুমি ভুল বুঝছো… নিচে তোমরা গুরুজনরা থাকো। সেখানে কি বউ নিয়ে মাতামাতির জায়গা? বউ নিয়ে যেখানে মাতামাতি করার, সেখানে ঠিক থাকলেই তো হলো।’
—’কোথায়?’
ঈশান বাঁকা হাসলো। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো নিজের বন্ধ দরজার ঘরের দিকে। পৌঢ় খুকখুক করে কেশে উঠলেন! ছেলের দিকে তপ্ত নজরে তাকিয়ে বললেন,
—’এককালে বন্ধুর মতো ছিলে। এখন বড় হয়েছো, কথা চেপে যাওয়া শিখেছো। বাবাকে এড়িয়ে যাওয়া শিখেছো। ‘
—’এটা বাস্তবতা, বাবা।’
—’ বিয়ের তিনমাস চলে।’
—’সে হিসেব তোমার থেকে ভালো আমি রাখি।’
—’নিজেদের স্বাভাবিক করেছো?’
—’পুরোটা।’
—’ মনে হয় না কেনো?’
—’স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা –বাবা,মায়ের সমানে প্রকাশ কিভাবে করে? একটু লজ্জা শরম আছে তো নাকি? আমার না হয় কম, তোমার বউমা তো লজ্জার সাগরে ডুবে থাকে। আর আমাকে চেনো তুমি, বাবা।
আমি অনূভুতি সবার সমানে প্রকাশ করাটা প্রেফার করিনা। তাই বলে তোমার বউমা যদি অভিযোগ করে সেটা আলাদা কথা। ওর সাথে কথা হয়েছে তোমার? ‘
রাইসুল দেওয়ান স্থির চোখে তাকিয়ে থাকেন। কি জিজ্ঞেস করতে এসেছিলেন, ভুলে গিয়েছে প্রায়৷ ঈশান পুনরায় বলে উঠলো,
—’ তোমাকে দাদু বানিয়ে প্রমান দিতে পারছি না, তার কারণ অনেক। তোমার ছেলের বউয়ের ক্যারিয়ার আছে। অনার্সটা শেষ হতে এ বছর সমেত মোট তিন বছর। বয়সটাও হোক। আমিও কাজের ব্যাস্ততা কমাই। বিয়ের তিন বছর পর বাচ্চা নেওয়া স্বাভাবিক বলো?’
—’ তোমাকে আমি সে-সব কখন শুধালাম?নির্লজ্জের মতো কথাবার্তা। ‘
মৃদু হাসলো ঈশান।
—’ তুমি কেমন প্রমান চাচ্ছো সেটা তো তাহলে বলতে হবে, না-কি? কমবেশি সবাই টের পায় আমার মনের অনূভুতি। তোমার চোখে এখনো পরেনা!’
—’ এলাকার কোনো কিছু নিয়ে তোমার চিন্তা নেই। বারবার বলছো সে-সব সমাধান না হলে তুমি তিতিরের বিষয়টা পাবলিশড করবে না। তাহলে? তোমার তো উচিত এই বিষয়টা দ্রুত কিসে সলভ হয়, সেটা ভাবা। নয়কি?’
—’আমি পুলিশ না বাবা। পুলিশ দেখছে বিষয়টা।’
—’পুলিশের প্রতিদ্বন্দ্বী তাহলে?’
থমকায় ঈশান। বাবার দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকাতেই তিনি বলে ওঠেন,
—’বিষয়টা জটিল। তোমার সান্নিধ্য একফোঁটা পাচ্ছি না। কেনো? কি করছো তুমি আজকাল? এমন তো নয় অফিসের ব্যাস্ততা! তোমাকে অফিসেও পাওয়া যায়না। কি কাজ তোমার আর? ‘
—’সন্দেহ করছো?’
—’বাবা আমি তোমার। কিছু একটা হচ্ছে যা ঠিক নয়। কি সেটা?’
—’এই তদন্তে আমার করনীয় কিচ্ছু নেই।’
—’ওকে। মানলাম। তাহলে অফিসে থাকোনা, বাড়িতে থাকো না। বন্ধুদের সাথে নয়…তাহলে? কি করছো আজকাল? অন্য কোনো প্রফেশন আছে কি তোমার? ঢাকায় কি বিজনেস করতে? ‘
ঈশান সামান্য ঝুঁকলো। কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললো,
—’যদি বলি খুনখারাবি! বিশ্বাস করবে? ‘
সোজা হয়ে দাড়ালো ঈশান। বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত গুঁজে ফিচেল কন্ঠে বললো,
—’ অ্যাম আ গ্যাঙস্টার! এটা হলে কেমন হয়! এই সবকিছু আমার করা…’
গর্জে উঠলেন দেওয়ান কর্তা। দাঁতে দাঁত পিষলেন।
—’শাট আপ! কি যা তা বলছো! আজকাল স্বাভাবিক কথা বা আলোচনাও করা যাবে না তোমার সাথে? কি বলছো ভেবে বলছো? কি এক জঘন্য বিষয় নিয়ে মজা মশকরা করছো, বুঝতে পারছো? কি ঘৃন্ন্যিত একটা বিষয়! দেওয়ান বাড়ির ছেলেদের এসব মজা মানায়?’
ঈশান শব্দ করে হেসে ফেলতে গিয়েও হাসলো না। মুখটা এক নিমিষে গম্ভীর করে ফেললো। ভারি কন্ঠে বললো,
—’ তাহলে? এ ধরনের প্রশ্ন করার মানে কি, বাবা? শুরু করলে তিতিরকে নিয়ে– গিয়ে থামলে এলাকার এই জঘন্য বিষয়গুলোর কাছে। আমি কি করে জানবো সে-সব? ‘
—’আজকে রাতে কোথায় ছিলে? যখন বাড়িতে এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো?’
—’কাজে।’
—’সেই কাজটার কথাই তো জানতে চাচ্ছি। বলে গেছো সাজিদের কাছে যাচ্ছো। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তোমার কোনো বন্ধুদের কাছেই যাওনি।’
—’গোয়েন্দাগিরি করছো আমার ওপর?’
—’ তোমার দিদার আশ্রমে ওই রুষা মেয়েটা এসেছিলো। দেখা করতে গিয়েছিলে মাঝরাতে?’
—’এ খবরও কানে এসেছে?’
ভদ্রলোক ছেলের দিকে গম্ভীর চোখে চেয়ে রয়। ইতস্তত করে সম্ভবত।
—’ওই মেয়ের সাথে তোমার…তোমার…’
বাবার প্রশ্নটা সম্পূর্ণ করে দেয় ঈশানই। বাঁকা সুরে বলে,
—’ রুষার সাথে সম্পর্ক আছে কি-না? নাহ্ নেই। যোগাযোগও নেই। ওই রাতের দেখা হওয়া জাস্ট অ্যাক্সিডেন্ট। তোমার বউমাকে জানিয়েছি। মিটমাট হয়েছে সে-সব। ‘
খানিকটা শান্তি পেলেন যেনো সে। কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে রাশভারি গলায় বললেন,
—’এরপর অ্যাক্সিডেন্টলিও যেনো আর দেখা না হয়। যা ছিলো অতীতে ছিলো, বিয়ে করেছো বউ এসেছে ঘরে। পুরানো সম্পর্কের জের টেনে আমার মেয়েটা যেনো অসম্মান না হয়। ‘
—’হবে না। ভরসা রাখো।’
—’ভরসা রেখেই তো এতদূর। চটজলদি ঝামেলা শেষ হোক। আমি তোমাদের বিয়ের আয়োজন করতে চাই। দ্রুতই। নিশির সম্বন্ধ আসছে একের পর এক। নূরি, নয়ন ওরাও আছে। সবার কথাই ভাবতে হয় আমার। তোমার বিয়ে দিয়েই যা বিপদে পরেছি! বাকিদের কি গতি করবো, বা কতদিনে করতে পারবো। খোদা মালুম!’
ঈশান ফিচেল হাসি দিলো বাবার দিকে তাকিয়ে। ঠোঁট টিপে হাসি আটকে ফিসফিস করে বললো,
—’চাপ নিয়ো না। জলদিই বিয়ে করবো আবার।’
রাইসুল দেওয়ান চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতে গিয়েও থমকালেন। ঘাড় বাকিয়ে তাকালেন ছেলের দিকে। ওপর থেকে নিচ অবধি স্ক্যান করে গেলেন যেনো। রাশভারি গলায় বললেন,
—’আজকাল বাড়িতেও সিগারেট টানছো? দেওয়ান বাড়ির ছেলের এতটা অধপতন! বদ অভ্যাস গুলো ধরেছো কবে সেটাও টের পেলাম না। আজকাল চাক্ষুস দেখতে হয়! ছিহ্ । আল্টিমেটাম দিলাম, এসব ছাড়ো।’
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চোখ জ্বালা করছে। ঘুম দরকার একটা। গতরাতে শরীর, মন দুটোর ওপরই তীব্র চাপ গিয়েছে। তিতিরের ওপর উল্টোপাল্টা কিছু করে বসবে, সেই ভয়ে বাইরে এসেছিলো। আরেক ঝামেলা হয়ে গেলো। মাথা ঝিমঝিম করছে এখন। কালকেও সারাদিন প্রচন্ড প্রেশারের ওপরই যাবে। সাজিদকে ম্যানেজ করা, অমিতের সাথে কথা বলা, ঈয়াজ মির্জার আপডেট, তাহমিদকে নিয়ে… নানা দিক সামলাতে হবে। একবার ঢাকা যাওয়ার নিয়তও করে ফেলেছিলো। তবে তার দৃঢ় বিশ্বাস সাজিদ হুট করে ঝামেলা করে বসবে না। করতে পারবে না। কারণ এদিককার মানুষ টা ঈশান সয়ং। নাহ্ ভয় পেয়ে নয়, বন্ধুর প্রতি আবেগে। মৃদু হাসলো ঈশান। বিরবির করে বললো,
—’ চাকরির পরোয়া করছিস না! আমাকে অ্যারেস্ট করতে পারছিস না! নিজে যে কি ভাবে ফেঁসে যাবি, একবারও বোঝার চেষ্টা করলি না! বোকা ছেলে..।’
জবজবে ভেজা সর্বাঙ্গ। মাথার চুলগুলো মোছা হয়নি ভালোমতো। টপটপ করে পানি গড়িয়ে পরছে। কোমড়ে অবহেলায় একটা ট্রাউজার জড়ানো। উদাম শরীর বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মতো অনবরত
গায়েব হচ্ছে কোমড়ে জড়িয়ে থাকা ট্রাউজারের মধ্যে!
—’ এত বড় মিথ্যা কেনো বললেন? আমাকে এতটা অসম্মান কেনো করলেন, দেওয়ান সাহেব ? আপনি…আ-আপনি অন্য নারীকে ছুঁয়ে এসে, আমাকে..আমাকে ছুঁয়েছেন!’
তিতিরের আর্তনাদগুলো চার-দেয়ালের মধ্যে বারি খেলো স্ব শব্দে। বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা পাখির খাঁচা টায় একজোড়া টিয়া পাখি ঝিমুচ্ছিলো। মেয়েটার চিৎকারে ছটফট করে উঠলো পাখি দুটো। ডানা ঝাপটিয়ে বোঝাতে চাইলো কতটা ভয় পেয়েছে।
ঈশানের পা জোড়া থমকালো। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো। তিতির দাঁড়িয়ে অন্ধকার ঘরের মাঝামাঝি। কাঁধের একপাশের ঝুলিয়ে রাখা ওড়না বাইরের বাতাসে এলোমেলো ভাবে ওড়াউড়ি করে যাচ্ছে।
ঈশান দু কদম এগোতেই তার থেকে ছিটকে পিছিয়ে গেলো তিতির। এতোটাই পিছিয়ে গেলো যে, পিঠ ঠেকলো শীতল দেয়ালে। বাইরে আজকে অসময়ে ঝড়বৃষ্টি হানা দিয়েছে। আকাশভেঙ্গে বৃষ্টি হচ্ছে একদম। তিতির দু হাতে নিজের চুলগুলো খামচে ধরলো। উদভ্রান্তের মতো করছে মেয়েটা। কান্নাগুলো গলার কাছে আঁটকে আসছে, দলা পাকিয়ে আসছে যেনো। মেয়েটার ফর্শা মুখটা রক্তিম হয়ে আছে, ডাগর ডাগর আখিজোড়া ফুলে উঠেছে কান্নার তীব্রতায়। তিতির তাকালো ঈশানের দিকে। ঈশানের নির্বিকার মুখটা দেখে ঘৃনা, রাগ আরও দ্বিগুণ মাত্রা বৃদ্ধি পেলো। মেয়েটার কোনোমতে কান্না আটকে তপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
—’ সম্ভব নয় আর, একজন ধ*র্ষণকারীর সাথে এক মূহুর্ত কাটানো সম্ভব নয়। গা গুলাচ্ছে আমার। বমি পাচ্ছে। অসুস্থ, নর্দমার কীট লাগছে নিজেকে। আমাকে স্পর্শ করবেন না দয়া করে । ‘
ঈশানের মুখে কোনো ভাবান্তর বোঝা গেলো না। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে সে। তিতিরের বলা কথাগুলো স্তব্ধ করে দিয়েছে তাকে। গভীর রাত এখন! সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে গোসল করে ঘুমানোর কথা ভেবেছিলো। সাজিদের ফোনে নিজেদের বিশেষ মূহুর্তে বাঁধা পড়ায় আরও বিরক্ত ছেলেটা। এই মন-মানসিকতার নিয়ে মেয়েটার কাছে যেতেও অপরাধবোধ কাজ করছিলো। সেই কারণে আজকে মেয়েটার খুব কাছে যাওয়া হয়নি! তিতির শাওয়ার নিয়ে এসে ঘুমিয়েছিলো, সে গিয়েছিলো শাওয়ার নিতে। এসেই মেয়েটার এই রনচন্ডি রুপে স্তম্ভিত হতে হলো ছেলেটাকে! তিতিরের হাতে ঈশানের ফোনটা। সেটা শক্ত করে ধরে আছে। থরথর করে কাঁপছে পাতলা দেহখানা। ঈশান এগিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাড়িয়ে থাকে। তিতির আরেকদফা গর্জে উঠলো। ঈশানের ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিতে দিতে বললো,
—’ আ-আপনি! আপনি অন্য নারীদের… ছিহ্…আমাকে ছুলেন কেনো? ওটাই যদি আপনার নেশা হয়, কোনো দরকার ছিলো না এক নারীকে ঘরে নিয়ে আসা। কেনো বিয়েতে রাজি হলেন, কেনো আমার জীবনটাও তছনছ করলেন? আপনাকে আমি একজন সৎ চরিত্রের পুরুষ হিসেবে জানতাম, ভরসা করতাম, বিশ্বাস করতাম! কেনো শেষ করে দিলেন সব। এই…এই জঘন্য নেশায় কবে থেকে ডুবে আছেন আপনি? আপনি একজন অসুস্থ পুরুষ। ‘
তিতির থামে। হাঁ করে শ্বাস টানে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তার। পা জোড়া ভেঙে আসতে চাচ্ছে। বল পাচ্ছে না শরীরে। একহাতে খামচে ধরলো বারান্দার দরজার ওপরে ঝুলিয়ে রাখা পর্দাখানা। ব্যাগ্র কন্ঠে বললো,
—’ বিয়ের প্রথম রাতে যেমনটা বলেছিলেন, ডিভোর্স চান। আবার মুখ ফুঁটে চেয়েই দেখতেন। দিয়ে দিতাম তৎক্ষনাৎ। নিজেও জানতেন আপনি একজন জঘন্য, পাপী পুরুষ। একের পর এক ধর্ষ*ন, খুন করে গিয়েছেন। আর আমি সেই পুরুষের ঘর করি? খোদা…’
আর্তনাদ করে উঠলো তিতির। অসহায়ের মতো শব্দ
গুলো আউরালো।
—’ আমি ম*রে যাইনি কেনো সবটা শোনার আগে? আমাকেও ওই মেয়েগুলোর মতো ধর্ষ*ন করে মেরে ফেলেননি কেনো? আমার সাথে ভালোবাসার নাটক করে ঠিক আমার সতিত্ব কাড়লেন, দিনের পর দিন এক বিছানায়… ছিহ্! কেনো শুয়েছেন আমার সাথে, আমি…আমি তো–আমার সাথে কিসের নাটক করেছেন?’
ঈশানের বুকের বাঁ পাশটা হাহাকার করে উঠলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। তৃষ্ণার্ত নাবিকের মতো এক পশলা বৃষ্টি, একছটাক পানির আশায় ছটফট করে উঠলো হৃদপিন্ড। হৃদপিন্ডের দ্রিমদ্রিম শব্দ সম্ভবত গোটা ঘরময় বুঝতে পাওয়া যাচ্ছে! ঈশানের কানে বাজছে তিতিরের একেকটা কথা। সূচের মতো বিঁধছে বুকে। আচমকা খেয়াল করলো, সে নিজেও শরীরে বল পাচ্ছে না। অবশ শরীরটা কাঁপছে তারও। মেয়েটা তার ফোন পেলো কি করে! সব দেখলো কি করে? উত্তর হাতড়ে পেলো না। চোখমুখ শক্ত করে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ তোকে ডিভোর্স দিতে চাইনি তাই। আর… ’
ছেলেটার কথা শেষ হয়না। কথার মাঝেই গর্জে ওঠে মেয়েটা। হু হু কান্না কোনোমতে গিলে তপ্ত কন্ঠে শুধায়,
—’ আমার নারীত্বে দাগ লাগালেন কেনো? অন্য নারীদের ছুঁয়ে এসে, অসম্মান করে এসে…আমার সতীত্ব কাড়লেন কেনো? আমি কি দোষ করেছিলাম? আপনি যা করতেন, আমার ওপর সেটার দায় কেনো পরবে। সেই জঘন্য পাপের ভাগ আমার কেনো? আপনি…আমাকে বিয়ে করার পরও! অন্য নারীদের…‘
গা গুলিয়ে উঠলো তিতিরের। বমি পাচ্ছে সত্যিই তার। ঈশান দেখলো সবই। মেয়েটার চোখ উল্টে আসছে যেনো। ব্যাস্ত হয়ে ছুটে গেলো তিতিরকে আগলে নিতে। মেয়েটা দুর্বল হাতজোড়া জোড় করে লেপটে দাড়িয়ে রইলো দেয়ালের সাথে। ঈশান যেনো তাকে না স্পর্শ করে–সেই অনুনয় আরকি! ঈশান শ্বাস আটকে দাড়িয়ে পরে। ঠোঁট কামড়ে শীতল কন্ঠে বলে,
—’ বিয়ে করা বউ তুই। সেই অধিকারে ছুঁয়েছি। ‘
হেসে ফেললো তিতির। বিয়ে করা বউ! একের পর এক ধর্ষ*ন করে, মেয়েদের খুন করে। বাড়িতে এসে স্বামী স্ত্রীর আহ্লাদ গুলো! হাস্যকর লাগলো তিতিরের। বুকে চিড়ে আত্মচিৎকার গুলো দলা পাকিয়ে আছে। বিদ্রুপের হাসি হেসে বললো,
—’ তাই বলে এতোটা অধিকার আমি আপনাকে দিতাম না। ভাবলেন কি করে? কিসের বউ, কিসের স্বামী! মানি না আমি আর। এটা জোর করে দেওয়া বিয়ে। রাজি ছিলেন না। বোঝা উচিত ছিলো আমার। ‘
ঈশান দু কদম এগোয়। ভ্রু জোড়ার মাঝে সরু ভাজ ফেলে প্রশ্ন ছোড়ে,
—’তাই? তা এখন বুঝেছিস? ‘
তিতিরের নিজের শরীরের ওড়নাটা ব্যাস্ত হাতে ঠিক করলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজ করলো। অতঃপর ঈশানের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
—’ কি,কেনো, কিভাবে…কোনো কৈফিয়ত আমি চাইনা দেওয়ান সাহেব। ওইসব করা যায়, যাদের ওপর আমরা নিজেদের অধিকার ফলাতে চাই। অধিকার আছে বলে মনে করি। আপনার সাথে আমার সে-সব চুক্তি মুছে হয়েছে৷ আপনি আমার কেউ নন, আমি আপনার সাথে থাকতে পারবো না। আপনার মতো ঘৃনা আমি এ জন্মে আর কাউকে করতে পারবো না। আপনার স্পর্শে গা আগুনে জ্বালিয়ে দিতেও দু’বার ভাববো না আমি। আপনার গায়ে হাত তুলতে চাই না আমি। ছোবেন না আমাকে।
বাড়িতে বলে এখনই সব শেষ করবেন। এখনই।’
ঈশান অসহায়ের মতো হাসলো। শেষ করবে মানে কি! এই নারীকে ছাড়া তার গতি কি! শেষ মানে? ডিভোর্স? বিচ্ছেদ! ঈশান শুকনো ঢোক গিলে কোনোমতে প্রশ্ন করলো,
—’ কি চাস তুই?’
—’ এতোকিছুর পরেও এই প্রশ্ন! অমূলক নয় কি? কি চাই মানে? একজন ধর্ষ*নকারীর সাথে আমার কি কথা থাকতে পারে! বোঝেন না? আত্মসম্মানহীন নারী লাগে আমাকে? মুক্তি চাই আমার। মুক্তি দেবেন, ডিভোর্স দেবেন…’
থরথর করে কাঁপলো বলিষ্ঠ পুরুষালি দেহটা।চোখের সামনে এক মূহুর্তের জন্য অন্ধকার দেখলো। মেয়েটার মুখে কি ভীষন দৃঢ়তা! ভয় পাচ্ছে ঈশান। এই ভয় কখনো পায়নি সে আগে! ঈশান শান্ত কন্ঠে বললো,
—’ তোর ফেরার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, সেটা এতদিনেও টের পাসনি? আর মুক্তি? মুক্তি মানে কি?
বিচ্ছেদ? কে দেবে? তুই নাকি আমি? ‘
তিতিরের চোখের ঘৃনায় বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে ঈশান আরশাদের। তিতির দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
—’ আপনি দেবেন। না হলে আমাকেই যা করার করতে হবে।’
হাসলো ঈশান। ঘর্মাক্ত মুখটা দু হাতে ডলে, সামনের রমনীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’ যদি না হয় সে-সব কিছু। মানে…ডিভোর্স না হলে?’
—’মৃ*ত্যু।
তিতিরের কথার পিঠে একদম দুরত্ব ঘোচালো ঈশান। তবে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো না। হিসহিসিয়ে বললো,
—’ মৃ*ত্যু! তাই কি? আমাদের বিচ্ছেদের একমাত্র উপায় মৃত্যু…তবে? কে মরবে? সেটা তুই না হয় ঠিক কর…’
তিতিরের অগ্নিঝড়া দৃষ্টি ঈশানের নজরে মিলিত হয়ে আছে। ওই চোখে নিজের জন্য এক আকাশ সম ঘৃনা ছাড়া আর কিচ্ছু দেখলো না ঈশান। মেয়েটা এতো ঘৃনা করে ফেললো এক নিমেষে! তা কি করে হয়! মরে যাওয়ার মতো যন্ত্রনা! এমনই হয় মৃ*ত্যু যন্ত্রনা! আগে তো কখনো টের পায়নি। তিতিরের মুখে বিদ্রূপ খেলে গেলো। হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
—’ আপনার হিসেব জানি না আমি। তবে আপনার থেকে মুক্তি পেতে যা করতে হয়, করবো আমি। আপনি আমাকে মুক্তি দিতে চাননা। সে-কারণেই আমি আপনাকে মুক্তি দেবো। দরকার হলে, সুই*সাইড করবো আমি। এবং আপনি জানেন আমার জেদটুকু। আমি শেষ অবধি সেটা করতেও দু সেকেন্ড ভাববো না।’
ধৈর্যের বাঁধ এবারে ভাঙলো ঈশানের। বুকের হাহাকার আর দমিয়ে রাখা গেলো না। আর না তো কঠিন পুরুষ হয়ে থাকতে পারলো। ছটফট করে উঠলো প্রকাশ্যেই। হাঁটু ভেঙে বসে পরলো তিতিরের সামনে। পুরুষমানুষ না-কি কাঁদেনা! অথচ দেওয়ান সাহেব কেঁদে ফেললো। উন্মাদের মতো করে আউরালো কথাগুলো।
—’ডিভোর্স, বিচ্ছেদ, মুক্তি। আমি মৃ*ত্যু যন্ত্রনা টের পেয়ে যাই তোর মুখে এসব শব্দ শুনলে। আ-আমি…
আমাকে ছেড়ে যাস না, তিতির। আমি সরি। খুব ভুল হয়ে গিয়েছে। আমার শেষ কথাটা শোন একবার। মরে যাবো, শেষ হয়ে যাবো– তোকে ছাড়া। আমি ভালোবাসি তোকে, শুরুতে সেটা টের না পেলেও এখন পাই। ভেঙেচুরে প্রেমে পরেছি তোর আমি। এ প্রেম, এ মোহ, এ ভালোবাসার মায়জালা থেকে বের করতে পারবি না তুই আমাকে। ধ্বংস হয়ে যাবো, মরে যাবো।’
তিতিরের মন বিন্দু মাত্র গললো না। আর না তো মুখের আদল পরিবর্তন হলো। সে নিজেকে ঈশানের স্পর্শ থেকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ঈশানের কম্পিত হাতজোড়া ঠেকালো তিতিরের পায়ে। বাঁধ না মানা অশ্রু ফোঁটা গুলো আছড়ে পরলো রমনীর মোমের মতো পায়ের ওপর। তিতির ঘৃনায় কুঁচকে নিলো মুখ। শক্ত হয়ে এলো শরীর। যে স্পর্শে সে লজ্জাবতী লতার মতো লতিয়ে যেতো, সে স্পর্শ আজকে একমুহূর্তে জন্য বিষ মনে হলো তার।
ঈশান দু’হাতে পেঁচিয়ে নিলো পা জোড়া। মাথা ঠেকালো মেয়েটার নরম-কোমল উদরে। মুখ গুঁজলো তার সেই অতি প্রিয় জায়গা টায়। ডুকরে উঠে বললো,
—’ ভালোবাসি শব্দটা শুনতে চেয়েছিলি না? ভালোবাসিতো। তাহলে? বিচ্ছেদ কেনো? খুন করে রেখে যা। তবুও বিচ্ছেদ চাস না। আমি বেঁচে থাকতে, তোর মৃ*ত্যুর যন্ত্রনা দিতে চাসনা। তোকে ছাড়া এ জীবন, কিসের জীবন! চাইনা কিছু। ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি তোকে কিছু বলতে চাই। ’
তিতির জবাব দেয় না। দু হাতে ঠেলে সরাতে চায় ঈশানকে। ঈশান ছাড়লো না। আর দৃঢ় করলো হাতের বাঁধন। অস্ফুটস্বরে বললো,
—’ আমার শেষ কথাটুকু শুনবি না?’
তিতির চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। নিজের দু হাত কোথায় রাখবে, হদিশ পাচ্ছে না তার! শক্ত করে মুঠো করে রাখা হাতটা থরথর করে কেঁপে যাচ্ছে। ঈশান স্পর্শ টের পাচ্ছে যেই কাঁপন। ইলেকট্রিসিটি নেই নাকি! ঘরময় কিসের অন্ধকার এতো। একফোঁটা আলোও নেই গোটা ঘরে। বাইরের ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো-তে ঘরের ভিতরটা দৃশ্যমান হচ্ছে। সাথে দৃশ্যমান হচ্ছে তিতিরের কঠিন মুখখানা। এখন আর মেয়েটা কাঁদছে না। পাথর হয় একদৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে আছে। পা জোড়া ছেড়ে ব্যাস্ত ঈশান দাঁড়িয়ে পড়ে। ভেজা শরীরের পানি শুকানোর আগেই, ঘামের চোটে স্যাতস্যাতে হয়ে আছে গোটা শরীর। শ্বাস আটকে আসছে ছেলেটার। বাঁ পাশের যন্ত্রনা ধড়ফড় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বাইরে থেকে। ঈশান ব্যাস্ত হলো, মরিয়া হলো তিতিরকে ছুঁয়ে দিতে। আজকে প্রথম নিজে থেকে, নিজ অধিকার থেকে তিতিরকে ছুঁয়ে দিতে দ্বিধা করলো ঈশান।
সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৮
নিস্তব্ধ ঘরে দুটো মানব মানবী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। বাইরের তীব্র উথাল-পাথাল ছাড়া আর কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। ঈশান জোরে জোরে শ্বাস টানলো। কম্পিত দু হাত তিতিরের দিকে বাড়ালো। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে, কথাগুলো গুছিয়ে নিলো বোধহয়। নিজের হাত দু’খানা ইশারা করে কোনোমতে বললো,
—’ভিক্ষা চাইছি তোকে। তোর ভালোবাসাকে। ছেড়ে যাস না, তিতির। নরক যন্ত্রনা পাচ্ছি। হয় জানে মেরে ফেল, না হলে একবার জড়িয়ে নে। বুকে নে আমাকে। কৈফিয়ত শোন আমার। একটাবার, শেষবার..…’
