Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ১৮

সায়রে গর্জন পর্ব ১৮

সায়রে গর্জন পর্ব ১৮
নীতি জাহিদ

ঘুমন্ত কন্যার কপালে চুমু দিয়ে গায়ে কাঁথা পরিয়ে চলে এলো বিদেশী পিটুনিয়া,রডোড্রেন্ডন লাগানো বারান্দায়। রডোড্রেন্ডন নেপালের জাতীয় ফুল হিসেবে পরিচিত। বারান্দার সৌন্দর্য্য বর্ধন করেছে ঠিকই তবে কোথাও কিছু নেই মনে হচ্ছে। সহসা মনে হলো শাহাদের প্রিয় রজনীগন্ধ্যা গুলো নেই। শুকিয়ে গিয়েছে প্রখর রোদে। সন্ধ্যার আকাশে চেয়ে দিয়া নিজেকে শুধায়,

– কি হলো দিয়া?এভাবে মাফ করে দিলি রসকষহীন কাঠখোট্টা মানবকে?
উত্তর খুঁজে পায়না। মানুষটাকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছে সে তার দোষ-ত্রুটি সব সহজেই মাফ হয়ে গেলো। প্রচন্ড রাগ,ক্ষোভ থাকার সত্ত্বেও এই মানুষটা হাসিমুখে মাফ করে দেয়ার পেছনের কারণটা যদি হয় দিয়ার ভবিতব্য তবে তাই সই। একটা মুহুর্তে নষ্ট করতে চায়না নিজের মানুষটার সাথে। সারাটা দিন আজ চোখের পানি পড়েছে টুপ টুপ করে। যে সত্য দিয়া জেনেছে তা যদি সকলের সামনে চলে আসে হয়তো পাথরের মতো অনড়,সায়রে গর্জন তোলা নেভিয়ান, নিজের আপন মানুষদের ভালোবেসে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়া লে.কমান্ডার শাহাদ ইমরোজ ভেঙে পড়বে। দিয়া কখনোই মেনে নিতে পারবেনা ভঙ্গুর শাহাদকে। গতকাল রাত থেকে অভিনয় করে যাচ্ছে ভালো থাকার। তবে এটাই কি সেই শাস্তি। দরজায় খট খট আওয়াজ পেয়েই বারান্দা থেকে ছুটে আসলো।শেহজা না উঠে যায় এই আওয়াজে! দরজা খুলেই দেখতে পেলো এই বাড়ির সবচেয়ে অপছন্দনীয় দুজন মানুষ। একজন জানে অপরজন জানেনা। মনি আর শেফালী ভেতরে আসতে চাইলে দিয়া বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– আপু শেহজা ঘুমায় বাইরে চলুন।
দিয়া কিছুতেই চায়না,তাদের ব্যক্তিগত শোবার ঘরে পরনারীর আগমন ঘটুক। যে নারীর প্রধান আকর্ষণ দিয়ার আপন পুরুষ। আফিয়া খালাকে ডেকে ঘরের কাজগুলোকে নিরবে করার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ড্রইং রুমের লাগোয়া বারান্দায় ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প শুরু করলো। দিয়ার মনোযোগ সেই কাগজে আটকে আছে। আশিককে কিছুক্ষণ আগে মেসেজ দিয়েছে। এখনো রিপ্লাই আসেনি। তৎক্ষনাৎ মনি বলে উঠলো,
– আচ্ছা শেফালী, শাহাদ ভাইয়ের এক্সের নাম যেন কি ছিলো?
শেফালী এমন একটা ভান করলো যেন জানেনা। পরক্ষনে বললো,
– হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে সামরা আপু। দুজনকে বড্ড মানাতো।
দিয়া শান্ত চোখে দেখতে থাকলো দুজনকে। এই প্রথম সামরার কথা শুনলো দিয়া। কেনো যেন কথা বাড়াতে মন চাইলোনা। মনি দিয়ার ভাবভঙ্গি দেখে প্রশ্ন করলো,

– ভাবীজান আপনাকে নিশ্চয়ই শাহাদ ভাই বলেছে সামরার কথা?
– এক্সের কথা প্রেজেন্টকে জানিয়ে কি লাভ? ভালো তো প্রেজেন্টের সাথে থাকতে হবে।
শেফালী চমকে উঠলো। এই প্রথম দিয়া মুখের উপর উত্তর দিলো। কয়েকটা লাগিয়ে দিতে মন চাইলো। দিয়া দুজনকে উপেক্ষা করে বললো,
– এক্সকিউজ মি একটু কাজ আছে।
আশিকের ফোন রিসিভ করতেই পুরোটা শুনে নিলো। গাল বেয়ে টুপ টুপ করে জল পড়ছে। ভেতরটা কান্নায় ফেটে পড়তে চাইছে। ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠছে। দিয়া পণ করেছে একেবারে স্বাভাবিক থাকবে৷ কাল বিকালে যখন জানতে পারলো, তখনো বিষয়টি ছিলো বেশ কিছুটা স্বাভাবিক কিন্তু আজকের টা!সেল ফোনটা টেবিলে রেখে ওয়াশরুমে গেলো। কিছুক্ষন পর এসে দেখলো শাহাদ শুয়ে আছে মেয়ের পাশে ঘর অন্ধকার করে। দিয়া কাছে আসতেই বলে উঠলো,

– আশিক নামের কেউ বার বার ফোন দিচ্ছে। কথা বলে নাও।
– দেখছি।
– আশিক কে?
– কেনো থাকতে পারে না? আবার সন্দেহ করবেন?
– শুনিনি তো কখনো এই নাম তাই জিজ্ঞেস করলাম।
– ছিলেন কয়দিন আমার সাথে যে শুনবেন।
শাহাদ বিস্মিত হচ্ছে দিয়ার তর্ক করার ভঙ্গি দেখে। দিয়া বারান্দায় গিয়ে কথা বলে ফিরলো। শাহাদের দিকে এক নজর দেখতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। মন চাইছে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে,
– আপনাকে কে দিয়েছে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার অধিকার। আমার হয়ে থাকবেন কথা দিয়েছিলেন। কেনো এত অবহেলা করলেন।
শাহাদের ডাকে সম্বিত ফিরে এলো।

– ফারাহ, লাইটটা অফ করে দাও। আমার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছে।
– মাইগ্রেনের মেডিসিন নিন। চলে যাবে।
শাহাদ এক পেশে হাসি দেয়। সত্যি বিছানা থেকে উঠে মেডিসিন নিলো। দিয়া অবাক হয়ে চাইলো। মেডিসিন নিলো কেনো! ওর তো মাইগ্রেন নেই! ওর মন রাখতে মেডিসিন নিলো! আজ চোটপাট করা শাহাদ এত শান্ত কেনো! পুনরায় শুয়ে পড়তেই দিয়া বললো,
– সামরা কি বেশি সুন্দর আমার চেয়ে?
শাহাদ দু চোখ তড়াক করে উঠলো। না ঘাবড়ে বলল,
– সুন্দর কি না জানিনা তবে ভদ্র মেয়ে ছিলো।
– জানালেন না যে কখনো?
– আমি অতীত ঘাটাই কম। এছাড়া এই বাড়িতে কতগুলো ভাঙা রেকর্ডার আছে,আমি না বললেও তোমার কানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজিয়ে দিবে।
শাহাদের তাচ্ছিল্যভরা হাসি এই অন্ধকারে ও দিয়া অনুভব করলো। কথাটা পুরোপুরি শোনার আগ্রহ জন্মালো দিয়ার। মন চাইলো শাহাদকে ঘিরে ওর জীবনের আদ্যোপান্ত সব জানতে হবে,সব। দিয়া প্রশ্ন ছুড়লো,

– আপনাদের বিচ্ছেদ কেনো হলো?
– ফারাহ আমার আজ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। পরে বলি।
– কবে যাবেন সিঙ্গাপুর?
– কেনো! সিঙ্গাপুর কেনো যাব!
– আর কত লুকাবেন?
শাহাদ তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। দিয়ার কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারছেনা। তখন থেকে বাতাসে প্রশ্ন ছুঁড়ছে । কিসব আবোলতাবোল বলছে। শাহাদ এগিয়ে এসে দিয়ার গাল দুটো আজলায় তুলে বললো,
– কি হয়েছে ফারাহ,এমন কেনো করছো?
কাঁদতে কাঁদতে বললো,
– আপনি সিঙ্গাপুর কবে যাচ্ছেন বলেন?
আচমকা শাহাদের কিছু একটা মনে পড়াতে লাফ দিয়ে বেড থেকে নেমে কাভার্ডের কাছে চলে যায়। কাপড়ের উপরে থাকা ফাইলের দিকে চোখ যায়। শান্ত চোখে দিয়ার দিকে তাকায়। কিছুটা ধমকে বলে,

– হাত দিতে গেলে কেনো?
– এই তাহলে আসল কারণ ছিলো আমাকে দূরত্বে রাখার? মাঝখানে অবিশ্বাসের কারণ দেখিয়ে আমার দুটি বছর নষ্ট করলেন।
– ফারাহ এসব নিয়ে পরে কথা হবে। আমার ভালো লাগছেনা। যেভাবে হাঁউ মাঁউ করছো মেয়ে উঠে যাবে। কাঁদতে হলে বাইরে গিয়ে কাঁদো নতুবা বারান্দায় ।
– আরো বেশি করে খারাপ ব্যবহার করুন, যত খুশি করুন। কালকে কেনো এত ভালোবাসলেন?
– ভুল করেছি।

শাহাদ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক আজ কিছুতেই সঙ্গ দিচ্ছেনা। দিয়াকে ওই অবস্থায় ফেলে গলায় তোয়ালে পেঁচিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। রেখে গেলো ক্রন্দনরত মেয়েটাকে। আঁড়ালে থাকা সত্যগুলো সামনে আসছে কেনো?সামরাকে নিয়ে অবান্তর কথা কে জানালো? আর আজ তো সবচেয়ে বড় গোপনীয়তা সামনে চলে এলো। হে মহান রব,আমাকে ধৈর্য্য দিন। অনেক কাজ বাকি, অন্তত আর কিছুটা দিন আমার ঝুলিতে যোগ হোক। রাশেদকে পুরো ডিপার্টমেন্ট রেপিস্ট হিসেবে চেনে।এই অপবাদ মুছে দিতে হবে। তাহির একটা গতি করে রেখে যেতে হবে, ফারাহর ভবিষ্যত সাজিয়ে যেতে হবে। বাকি কাজ শাহীনকে বুঝিয়ে দিতে হবে। পুনরায় মাথায় প্রদাহ হচ্ছে। নিষাদের বিয়ের পর থেকে শরীরের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে।চেক আপ করাতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সা*প বেরিয়ে এলো।

– এই মেয়ে বড্ড বাড়ছে। ওর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
– কি করবে মনি আপা?
– ওর স্বামী নিয়ে অহংকার অনেক বেশি, ভাবছি এবার নাহয় সব কিছু ছাড়িয়ে প্ল্যানটা শাহাদ ভাইকে ঘিরে করবো।
– মানে?
– দেখে যা।
ডিনারের টেবিলে আজ সবাই আছে। অনুপস্থিত শুধু শাহাদ আর মনি। শাহাদ গোসল সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মনি শেফালীর কামরায় থাকছে। শিফা দু বার মনিকে ডাকার পর ও আসছেনা। দিয়া শাহাদকে ডাকার জন্য রুমের ভেতর যেতেই দেখে ভেতর থেকে রুমের দরজা লক। দিয়ার মাথায় খেলে গেলো অদ্ভুত চিন্তা। ছুটে গিয়ে শেফালীর রুমে মনিকে পেলো না। কথা না বাড়িয়ে সুলতানা কবিরকে বললো,

– আম্মু আপনার ছেলের রুমের চাবি দিন।
সুলতানা কবির বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো,
– কেনো মা কি হয়েছে?
রায়হান সাহেব ও হতবাক। সুলতানার দিকে তাকিয়ে বললো,
– চাবিটা দাও। কিছু কি হয়েছে আম্মু?
– আব্বু আমার চাবি লাগবে।
আঁচল থেকে সুলতানা কবির শাহাদের রুমের চাবি দিলো। দিয়া ছুটে আসলো।পুরো পরিবার ওর পেছনে। রুমের দরজা খুলতেই দেখতে পেলো শরীর জুড়ে নাইটি পরা মনি। দিয়ার শ্বাস আটকে গেলো। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেলো। সুলতানা কবির দু কদম পিছিয়ে যেতেই শিফা ধরে ফেললো। রায়হান সাহেব স্তব্দ। শাহীন অন্যদিকে মুখ ঘুরালো বাবাকে আঁকড়ে ধরে। রায়হান সাহেব জোরেই বলে উঠলেন,

– আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি; লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।
দিয়া জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। শেহজা ওর বেবি বেডে। দরজা খোলার শব্দে উঠে চুপচাপ তাকিয়ে আছে বাবার দিকে এবং বাবার পাশে মহিলার দিকে। নামার চেষ্টা করছে। দিয়া এক ছুটে মেয়েকে কোলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরলো। যেন এমন লজ্জার চিত্র না দেখে মেয়ে। শাহাদের শরীরে ট্রাউজার। শাহাদ এখনো ঘুমে। এত কিছু হয়ে গেলো অথচ মানুষটার কোনো হেলদোল নেই। দিয়া চমকে গিয়ে শিফাকে বললো শেহজাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে। সকলের সামনে মনির চুলের মুঠি ধরে টেনে খাট থেকে নামিয়ে কষে দুটো থাপ্পড় দিয়ে দেয়ালের দিকে ছুড়ে মা*রে। মাথায় গালে প্রচন্ড ব্যাথায় মনি ককিয়ে উঠে। হুংকার ছেড়ে শেফালীকে বললো,

– শেফালী মনিকে নিয়ে এক্ষুনি আমার রুম থেকে বের হও। মনি আজকের পর তোকে কখনো আমার স্বামীর আশেপাশে দেখি আমার হাতের প্রথম খু*নটা তোকে করবো অপবিত্র না*রী।
আঁৎকে উঠেছে সকলে। শেফালী নিজেও চমকে উঠেছে। চিৎকার দিয়ে বলে,
– নিজের স্বামীর চরিত্র ঠিক নেই, আসছে আরেকজনকে দোষ দিতে। মুখ সামলে কথা বলবি আমার সাথে।
দিয়া পুনরায় গর্জে উঠে বলে,
– আমার চোখের সামনে থেকে এদের সরান আম্মু, ভাইয়া। আমি সত্যি খু*ন করে ফেলবো এখন।
শাহীন বজ্রকন্ঠে ধমকে বললো,
– বের হ রুম থেকে ব*দ*মাশ গুলা। মনি তোকে তো আমি দেখছি পরে।
দিয়া শাহাদের মাথা কোলে নিয়ে দুবার ডাকলো। শাহীনকে চিৎকার দিয়ে বললো,
– ভাইয়া পানি দেন।

হতভম্ব সকলে দৌঁড়ে গেলো। দিয়া শাহাদের মুখে পানি ছিটাতে শুরু করলো। বেশ কিছুক্ষন পর শাহাদ আস্তে আস্তে চোখ খুললো। চোখে ঝাপসা দেখতে পাচ্ছে সব।অনেকের গলার আওয়াজ পাচ্ছে। দিয়া শাড়ির আঁচলে শাহাদের ভেজা মুখ মুছে দিলো।সুলতানা কবির ঘাঁবড়ে গিয়ে কাঁদছেন। পুরোপুরি হুঁশে আসতেই বুঝতে পারলো বাসার প্রতিটি মানুষ তার সামনে। মাথা দিয়ার কোলে আবিষ্কার করলো, পরনের পোশাক না দেখে কিছুটা বিব্রত হলো। উঠতে চাইলে শাহীন এবং দিয়ার সাহায্যে হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসলো। প্রশ্ন ছুঁড়লো,
– বুঝতে পারছিনা কি হয়েছে,খুলে বলোতো।সবাই এই রুমে কেনো?
আকস্মিকভাবে শেফালী পুনরায় রুমে ঢুকে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
– নাটক করছেন আপনি, মনে ছিলো না মনি আপার সাথে এক বিছানায় শোয়ার আগে। ছিঃ ভাইজান বলতে লজ্জ্বা লাগছে।
খাট থেকে নেমে দিয়া সকলের সামনে সজোরে হাত টান টান করে অনবরত কয়েকটি থা/প্প/ড় দিলো। তর্জনি আঙ্গুল তুলে শাসালো,

– খবরদার আর একটা কথা মুখ থেকে বের করলে জিভ টেনে ছিঁ*ড়ে ফে/লবো। আমার সাথে হওয়া সব অন্যায় মুখ বুঁজে মেনে নিয়েছি তার মানে এই না যে তোমাদের দুই শয়তানের চাল বুঝতে আমার সময় লাগবে। এতটা নিচে কিভাবে নামলে শেফালী! এনিওয়ে আমি চাইছিনা এখন আমার স্বামীর সামনে এসব কথা উঠুক।বের হও।
শাহাদ কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে ফারাহ। শাহীন খুলে বলোতো।
সকলের মাথা নত। শেফালী গজগজ করতে করতে বলে উঠলো,
– আপনার কুকীর্তির ছবি হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছি দেখে নিন।

শাহাদ তড়িঘড়ি করে ফোন হাতরাচ্ছে। দিয়া খাটের একপাশে ফোন লক্ষ্য করতেই ধরার জন্য হাত বাড়ানোর আগেই শাহাদ ফোন নিয়ে আনলক করলো হোয়াটসঅ্যাপ। চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিভৎস সব ছবি। ছবি গুলো স্ক্রল করে বার বার দেখছে। এই তো এই বেডরুম,এই বেড। বেডে শুয়ে থাকা মানুষটা শাহাদ,আর পাশে অর্ধ নগ্ন মনি।জড়িয়ে ধরে আছে উন্মুক্ত গায়ের শাহাদকে। প্রচন্ড চাপ অনুভূত হচ্ছে মস্তিষ্কে। ফোনের সাথে দেয়াল ঘড়ির সময় মিলিয়ে দেখলো না ঠিক আছে ঘড়িতে দশটা বেয়াল্লিশ। মাঝে সময় মাত্র দু ঘন্টা।এত কিছু কি করে সম্ভব হলো। ফোনটা একপাশে রেখে মনে করার চেষ্টা করছে,কিছুতেই মনে করতে না পেরে দিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

– ফারাহ মেডিসিন নিয়ে শোয়ার পর তুমি তো বেরিয়ে গেলে,মাঝে এমন কি হলো যে চরিত্রে দাগ লেগে গেলো। এখন কি উপায়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করবো বুঝতে পারছিনা। সবচেয়ে বড় কথা,মনির সাথে উলটা পালটা কিছু করিনি তো?
শেফালীর দিকে চোখ যেতেই দিয়া ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের করে দিলো। দিয়ার এমন আচরণ সকলকে বিস্মিত করছে। শাহাদের কাছে এসে বলে,
– আপনি কেনো চাপ নিচ্ছেন? সব কিছু ঠিক আছে।
– অবুঝ পেয়েছো আমাকে? কি করেছি আমি?
দিয়া সকলের সামনে পাগলের মতো চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বললো,
– আমাকে একটু স্বস্তি দিন। আমি এত যন্ত্রণা নিতে পারছিনা। মনি আপনার সাথে সেদিন যা করতে চেয়েছিলো আজ ও তাই করতে এসেছে।
শাহীন, রায়হান সাহেব এবং সুলতানা কবিরের দু হাত ধরে বেরিয়ে গেলো।ওদের একা ছেড়ে দিতে বললো। পুরো ঘটনা খোলাসা করতে রুমে নিয়ে এলো বাবা মাকে। রায়হান সাহেব প্রশ্ন করলেন,

– কি চলছে এসব?
– আব্বু মনি ভাইজানকে পছন্দ করে। ইদানিং মরিয়া হয়ে উঠেছে ভাবীমাকে তাড়াতে। আমাদের গ্রামের বাড়িতে ভাইজানের সাথে এমন কিছু করেছিলো সেদিন অন্ধকারে যার পরে ভাইজান অস্থির হয়ে পড়েছিলো।আপনারাই তো দেখলেন। আর আজ ভাইজানকে বদনাম করতে গিয়ে নিজেই অপমানিত হলো।আব্বু বিশ্বাস করেন ভাইজান সেন্সে ছিলোনা।
সুলতানা কবির থম ধরে বললো,
– মনি একটি মেয়ে শাহীন। আমি কিভাবে নিজের ছেলেকে বাঁচাতে একটি মেয়েকে ফাঁসাবো। চোখকে কি করে অবিশ্বাস করবো?
শাহীন ফ্লোরে বসে মায়ের কোলে মাথা রাখলো,চোখ গড়িয়ে পড়ছে অবারিত অশ্রু। ভাইজান মানুষটা প্রচন্ড আত্নসম্মানপ্রবন।আজকের ঘটনার পর কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারবেনা। ডাক্তার বার বার বলেছে স্ট্রেস যেন কম নেয়।ভাবীমা কি করে সামলাচ্ছে তাকে। যে ভাইজান এতক্ষন হুঁশে ছিলোনা সে কি করে কোনো নারীর সম্ভ্রম নিয়ে খেলবে!

– কাঁদছো কেনো আব্বা?
– আম্মু, ভাইজান ভালো নেই। একদম ভালো নেই। আম্মু আমার মাথার উপর থেকে আমি বোধ হয় আশ্রয় হারিয়ে ফে/লবো। ভাইজানের মাইল্ড ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছিলো দু বছর আগে।ট্রিটমেন্ট নিচ্ছিলো ঠিকই,তবে ভাইজানের মনে হতো তার সময় বেশি নেই। গত বছর ডিসেম্বর মারামারির মাঝে মাথায় যে আঘাত লেগেছিলো ব্রেইন হেমারেজ হয়। এরপর থেকে শরীর খারাপের দিকে যেতে থাকে।অথচ কাউকে একটু ও বুঝতে দিলোনা। নিরবে আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।আপনিই বলুন, যে ভাইজান গত দু ঘন্টা যাবৎ বেহুঁশ ছিলো সে কি করে মনির ক্ষতি করবে!
রায়হান সাহেব নিজের ইজি চেয়ারে বসে শান্ত গলায় বললো,

– অপারেশন করানো যাবেনা?
– চান্স ২০/৮০। এই চান্স কিন্তু সুস্থ হওয়া না হওয়ার নয়।
– তবে!
– ২০% সুস্থ হওয়ার,বাকি ৮০% মৃত্যুর। অপারেশনের পর জ্ঞান না ফিরলে শেষ সব।
এই একটা কারণ গত একটা বছর লুকিয়ে এসেছে। চুপ চাপ নিজের কাজ করছে।ভাবীমাকে দূরে ঠেলে রেখেছে। অপারেশন করবে না জানিয়েছে। অসমাপ্ত কাজ গুলো সমাপ্ত করে তারপর সময় হাতে থাকলে অপারেশন করবে। এই চিন্তায় যেদিন ভাবীমার মাইগ্রেনে পেইন শুনেছে সেদিন থেকে আপনাকে,আমাকে দিয়ে প্রেশারাইজ করছে ডাক্তার দেখাতে বলার জন্য। মনের ভেতর ভয় ঢুকে গিয়েছে।বিকেলে আমাকে বলেছে,
– আমার অসমাপ্ত কাজের সমাপ্তি তোমার হাতে রেখে গেলাম। আমার অনুপস্থিতিতে পূর্ণ করো।

– ফারাহ অন্যায়ের পরিমাণ কি এতই অত্যধিক ছিলো যে শাস্তি হিসেবে তোমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুণরাবৃত্তি ঘটল। আমি সকলের সামনে মুখ তুলে দাঁড়াবো কোন মুখে? আজ রাতটা যদি শেষ রাত হতো।
– এর চেয়ে বড় অপবাদ আমাকে দিয়েছিলেন,কই আমি তো এমন করিনি।
– রজনীগন্ধা মূর্ছা গেলে কি কম সুবাস দেয়! তখনো নিজের সর্বোচ্চ সুবাস ছড়িয়ে সকলের ভালোবাসা আদায় করে নেয় ।তুমি হলে আমার সেই রজনীগন্ধা। আর আমি কাঁটা, না সুবাস আছে,না রূপ-রঙ আছে, গায়ে লেগে কেউ আঘাত পেলে উঁপড়ে ফেলে।
শাহাদ থেমে দিয়ার দিকে তাকিয়ে পর পর বললো,

– রাশেদ কিভাবে মা’ রা গিয়েছিলো জানো,তাহির অবিশ্বাস নিতে না পেরে সুইসাইড এটেম্পট করেছিলো। ওর প্রাণহীন দেহের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম, এতটা ভালোবাসলি কেনো! যে ভালোবাসায় প্রাণের মূল্য নেই। আজ আমার মনে হলো আমিও একই পথের যাত্রী। আমি মনিকে মেয়ের মতো মানুষ করেছি ফারাহ। ও কাজটা কিভাবে করলো! আমি ওর সাথে একবার দেখা করতে চাই।
দিয়া রনাঙ্গিনী হয়ে রুখে দাঁড়ায়,
– খবরদার আজকের পর স্বেচ্ছায় ওর মুখ দেখবেন না।অন্যথায়, আমি নিজে ম*রে,আপনার মেয়েকে মে*রে ফে*লবো।
দিয়া অকস্মাৎ রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। শাহাদ নিচে তাকিয়ে দেখে টি শার্ট নিচে গড়াচ্ছে। আরেকটা নতুন বের করে দিয়ার পেছনে ছুটে গেলো৷ ততক্ষনে সুলতানা কবির,রায়হান সাহেব ও এলেন মনির রুমের সামনে। দিয়া রুমে সরাসরি ঢুকে হন্তদন্ত হয়ে কিছু খুঁজছে। কাঙ্ক্ষিত জিনিস দুটো পেয়ে সকলের সামনে আছাড় দিয়ে চূর্ণ বিচূর্ণ করে সুউচ্চ শব্দে হুমকি দিলো,

– ফোন দুটো প্রমান ছিলো আমার স্বামীর ক্যারিয়ার,রেপুটেশন সব ধ্বংসের। আমি দুটোই ধ্বংস করলাম। সকলের সামনে মুক্ত মনে অভিশাপ দিলাম, মনি আজ যেভাবে আমার ক্ষতি করতে চেয়েছিলে নিজের সম্মানের তোয়াক্কা না করে, এমন দিন আসবে ভবিষ্যতে তোমাকে রা*স্তা কুকুর বেড়াল ও দেখলে থুতু দিবে। শেফালী বোন হয়ে ভাইয়ের এত বড় ক্ষতি করতে চাইলে যে এতটুকু বুক কাঁপেনি! সেই বোন আজ থেকে মৃত আমার স্বামীর কাছে। অন্তত তোমাদের সংস্পর্শে আমি আমার স্বামী সন্তানকে রাখবোনা। আমি এই বাড়ি ছেড়ে দিব।
রায়হান সাহেব দিয়ার মাথায় হাত দিয়ে বললেন,

– কোথাও যেতে হবে না। রুমে যাও। শাহাদ খেয়ে নাও। জীবনটা তো খুব ছোট আমাদের। আজ আছি কাল নেই। যতটুকু সময় আছি,ততটুকুতে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করা উচিত। যদিও আমাদের পরিবারের মতো বিরল ঘটনা কোথাও ঘটেছে কিনা সন্দেহ আছে। শাহাদ আমার প্রাণ। মনি এ বাড়িতে কেনো আমার পরিবারের ত্রিশ সীমানায় যেন তোকে না দেখি। আর শেফালী তুমি তো অসুস্থ। তোমার ব্যবস্থা আমি করছি। আমি সকল কাজ থেকে রিটায়ার্ড হয়েছি ঠিকই কিন্তু বেঠিক সন্তান মানুষ করতে ভুল করবোনা এবার। তুমি আমার পরিবারের ভিত্তিকে বদনাম করতে সাহায্য করেছো। পাখনা বেড়ে উঠেছে তাই না। কিভাবে
কা/টতে হয় জানা আছে আমার।
নিশব্দে পা ফেলে শাহাদ বেরিয়ে এলো কামরা থেকে। দিয়া পেছনে ছুটলো। আজ মনে হলো দিয়ার মনের জোর অনেক বেশি,সেই তুলনায় শাহাদের নেই বললেই চলে।এতটুকুতে নড়ে গেলো? শাহাদ সুইমিং পুলের পানির দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে দিয়াকে বললো,

– ভয়াবহ রকমের অন্তর্দ্বন্দে ভুগছিলাম। একবারের জন্য নিজেকে পারভার্ট মনে হয়েছিলো। ভাবলাম পুরুষ সত্ত্বা জেগে উঠেছিলো কি! নিজের অজান্তে এমন কিছু করে ফেলেছি। তবে ভাবতে পারিনি এভাবে আমার পাশে থাকবে। বেঁচে থাকার ইচ্ছে টা ম*রেই গিয়েছিলো ফারাহ।
দিয়া মুচকি হাসে। হেসে বলে,
– সিঙ্গাপুর কবে যাবেন?
– যাবোনা।
ঘাড় ঘুরিয়ে দিয়া তাকাতেই শাহাদ মুচকি হেসে বলে,
– একা যাবোনা, সঙ্গে রাজকন্যা আর রানীকে নিয়ে যাব। কাছে এসো আদর করি।
আজ মনে হলো এমন একজন জীবনসঙ্গী থাকলে সবচেয়ে কঠিন মুহুর্ত হেসে পার করা যায়। রাশেদের জীবনের ভুল পয়েন্ট ছিলো তাহি থেকে দূরে থাকা। এই প্রথম বারের মত মনে হলো আপায়তত নেভি থেকে দূরে এসে বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। নতুবা আজ অন্য রকম জীবন গাঁথা রচিত হতো,যা থাকতো কলুষতাময়। সুস্থ থাকার জন্য,ভালো থাকার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ ফারাহ নামক মেডিসিন প্রয়োজন। কিছুদিন সমস্ত চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রেখে স্ত্রী সন্তানকে সময় দিবে। বাঁচার স্পৃহা জেগে উঠেছে। দিয়া শাহাদের কাছে ঘেষতেই এক হাতে আগলে নিয়ে মাথায় উষ্ণ অধর ছুঁইয়ে বলে,

– তুমি জানোই না জান তুমি আমার মিষ্টি ভোরের চক্ষু তৃষ্ণা, তুমি আমার প্রেম জাগানো এক সমুদ্র তপস্যা।
দিয়া মাথা উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
– আর সামরা
শাহাদ হেসে বলে,
– কেউ না
– ওরা যে বললো?
– মিথ্যে বলেছে
– আপনি ও বলেছিলেন।
– বলেছিলাম কি সম্পর্ক আছে?
– নাহ
– তবে?
– বললো যে আপনার এক্স।
– বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা বলেছে।
দুজনই নিরব। অকস্মাৎ শাহাদ বলে উঠলো,

সায়রে গর্জন পর্ব ১৭

– ফারাহ, তোমাকে দ্বিতীয়বার দেখেছি লাবনী বিচে। সঙ্গে ছিলো দাদাসাহেব আর দাদীজান। ডিউটি শেষে রাশেদের সাথে বিচে বসেছিলাম। আমার আশেপাশে এত অফিসারদের দেখে নাক মুখ কুঁচকে জোরেই বলেছিলে দাদাজানকে, ” কোথাকার কোন লাট সাহেব এসেছে দাদাসাহেব দেখেছেন, এই লোকের জন্য এতজন বডিগার্ড লাগে। এভাবে আমাদের সুন্দর সময়টা নষ্ট করছে।অর্ধেক সৈকত তো এরাই দখল করেছে।”
তোমার কথা শুনে তোমার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তুমি সেই মেয়ে যার সুরভিতে আমি মুগ্ধ হতে বাধ্য হয়েছিলাম।সেই রজনীগন্ধার সুভাস। যাকে প্রথম দেখেছিলাম ‘সান ডান্সার’ রেস্টুরেন্টে পরী রূপে পাঁচ বছর আগে।

সায়রে গর্জন পর্ব ১৯