Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ২৪

সায়রে গর্জন পর্ব ২৪

সায়রে গর্জন পর্ব ২৪
নীতি জাহিদ

অতিথির ডিমান্ড চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে শাহীনের বিয়েতে। রায়হান সাহেব চিন্তিত। শাহাদ বার বার বলেছে নিকট আত্নীয়ের বাইরে কাউকে যেন দাওয়াত দেয়া না হয়। অতিথির আয়োজন ছিলো একশ এখন তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে দু’শ। এত কমে হবে নাকি মেজরের বিয়ে! বাবা হয়ে এই প্রথম ছেলেকে ভয় পাচ্ছে। ভয় পাওয়ার ও যথেষ্ট কারণ আছে। শাহাদ,শাহীন এবং রায়হান সাহেব তিনজনের প্রফেশনটাই এমন যে শত্রুর অভাব নেই। শাহীনের বিয়েতে কোনো ঝামেলা চাইছেনা শাহাদ। প্রথমে তো ঘরোয়া আয়োজনের কথাই হয়েছিলো পরে নিজেই মত বদলে বললো,একমাত্র ভাই তার জীবনে কিছু স্মৃতি থাকা প্রয়োজন। নওরীনের ও কেউ নেই। ওদের বিয়েটা নিজেরদের মধ্যেই একটু ভিন্ন ধারায় হোক। বাড়িতে এখনই ভিড় করেছে সকল নিকট আত্নীয়। ছাদে শাহীনের ঘরোয়া গায়ে হলুদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শাহাদ আজ সম্পূর্ণ ফোর্স, নিরাপত্তা নিয়ে বাসায় থাকবে। বাড়িতে সিকিউরিটি আরো জোরদার করেছে। নওরীনকে এই বাড়িতেই আনা হয়েছে। নিচ তলাতে গোসল করানো হয়েছে।হালকা হলুদ লাগিয়েছে বাড়ির সবাই। ঘরোয়া হলুদ শেষ করেই রওয়ানা হবে রিসোর্টের উদ্দেশ্যে।

অফিস রুমে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে। তাহি ফোন দিয়েছে বেশ কয়েকবার। ফোন রিসিভ করলেই মেয়েটা কান্নাকাটি শুরু করবে। জেনে গিয়েছে রিপোর্টের কথা। দিয়ার বন্ধু আশিক ছেলেটা শাহাদের সামনে। পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষন করে শাহাদ বলে উঠলো,
– মি. আশিক বলুন আপনি কি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য?
আশিক হেসে বললো,
– আপনি যে শাস্তি স্যুটেবল ভাবেন।
– দরকার ছিলো কি এই ঝামেলায় জড়ানো?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– দিয়া আমার ছোটবেলার খেলার সাথী।মুরাদ চাচা চলে যাওয়ার পর কখনো ওর সাথে তেমন দেখা হয়নি। গত বছর কলেজে দেখেছিলাম।আমি সার্টিফিকেট উঠাতে গিয়েছিলাম,আর ও দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা। টুকটাক কথা হয়েছিলো।জেনেছিলো আমি মেডিকেলে পড়াশোনা করছি। ফোন নাম্বারটা কিভাবে সংগ্রহ করলো জানিনা। হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে রিপোর্ট পাঠায় আমার ফোনে।অনুরোধ করে বললো রিপোর্টগুলো দেখে জানাতে। রিপোর্ট যখন স্যারদের দেখালাম উনারা কন্ডিশন জানালেন। সৌভাগ্যক্রমে আপনি যার ট্রিটমেন্ট নিচ্ছেন আমি উনার স্টুডেন্ট। আপনার ফাইলটা সেদিন নিজ থেকে ডেকে এনে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো আপনি আমার কি হন। আজ তাই নতুন রিপোর্ট আমাকে দিয়েই পাঠালো।
দীর্ঘ শ্বাস শাহাদের। এ আর নতুন কি! দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে শারীরিক কন্ডিশন সেটা তো জানা কথা।

– ঠিক আছে। কষ্ট করে এসেছেন অসংখ্য ধন্যবাদ। আজ কফি ছাড়া বেশি কিছু খাওয়াতে পারলাম না তার জন্য খুবই দুঃখিত। একদিন ইনশাআল্লাহ দেখা হবে। আপনার ছোটবেলার বান্ধবী ও থাকবে সেদিন।
আশিক মৃদু হেসে বললো,
– যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে ফেলুন অপারেশন। সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন।
– আর যদি না ফিরি?
হাসি হাসি মুখটা ধপ করে নিভে গেলো আশিকের। শাহাদ উঠে দাঁড়ায়। আশিকের বিমর্ষ মুখ দেখে হেসে বলে,
– ইনশাআল্লাহ দেখা হচ্ছে। আমাকে একটু বের হতে হবে। নতুবা এভাবে বিদায় নিতে হতনা।
দুজনই হাত মিলিয়ে বিদায় জানালো একে অপরকে। আশিক বের হতেই শাহাদ পাভেলকে নিয়ে রওয়ানা দিলো রহস্য উদঘাটনে। গেটের সামনে আসতেই দারোয়ান গেট খুলে দিলো। গাড়ি পার্ক করে নিয়ে গেলো কেয়ারটেকার। ভেতরেই ঢুকতেই অভ্যর্থনা জানালো হোম মিনিষ্টার ফরিদ রশীদ। লিভিং রুমে বসলো।

– কি অবস্থা শাহাদ? কেমন চলছে মানবতার হুকুমাত?
– আপনাদের কৃপায় ভালো।
– শুনে ভালো লাগলো। রাশেদের কেসের কি খবর?
– আমি আর কেইস দিয়ে কি করবো স্যার। চাকরি, টাকরি ছেড়ে তো ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরছি। তবে আমার কাছে যে ফাইলটা ছিলো পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের, ওটা পাচ্ছিনা?
চমকে উঠলো ফরিদ। উচ্চ স্বরে বললো,
– মানে কি? কত বড় একটা প্রমান। কিভাবে পাচ্ছোনা?
– বুঝতে পারছিনা,বাড়ি থেকেই হারিয়ে গিয়েছে।
– দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত কাজ করলে। একদম ঠিক করোনি।
শাহাদ মাথা নত করে রেখেছে। সবার জানা কথা ফাইলটা অনেক বড় একটা প্রমান ছিলো কেসের জন্য।
– স্যার আপনার দেয়াল ঘড়িটা সুন্দর কোথায় থেকে নিয়েছেন?
ফরিদ শাহাদের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। এই চিন্তার মাঝেও এই ছেলে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো কেনো? তবুও ভদ্রতার খাতিরে বলে উঠলো,

– গত শীতে দিল্লী গিয়েছিলাম।ওখানে এন্টিক জিনিসের শপ আছে।ওখান থেকে অনেক কমেই নিয়ে। মাত্র সতেরো হাজার পড়েছে। ঘড়ির সিস্টেম ভালো।
শাহাদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে। মানুষ দু বেলা খেতে পায় না,আর সে সরকারের কর্মচারী হয়ে মানুষের টাকায় দেয়াল ঘড়ি কিনে বলে মাত্র সতেরো হাজার। নিজের আয় করা টাকায় কিনলেও হতো। টাকা মেরে খেতে খেতে অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। কাজের মেয়েটা চা নাস্তা এনে দিলো। শাহাদ চা হাতে নিয়ে চুমুক দিলো। মুখে বিরক্তিকর শব্দ করে বললো,

– চায়ে এত চিনি কেউ দেয়?
কাজের মেয়ের মাথ নত। কেমন যেন আড়চোখে তাকালো শাহাদ। সেই চোখে বিরক্ত ক্ষোভ ছিলো।মনে হলো যেন সাধারণ চা বানানোর কাজটাও মেয়েটা পারে না। ঘাড় ঘুরিয়ে পাভেলের দিকে তাকাতেই দেখলো পাভেলের ভ্রু কুচকে আছে। পাভেলকে অনুসরণ করে দেখলো, ফরিদ ফোনে কিছু একটা দেখে বিচলিত। কাজের মেয়েটা তখনো পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারায় ভীতি। ফরিদের চেহারা দেখে শাহাদ প্রশ্ন করলো,
– স্যার সব ঠিক আছে? কেনো ডেকেছেন?
ফরিদ অতি মাত্রায় চিন্তিত গলায় বললো,
– ঠিক আছে। শাহাদ বাসায় ভালো করে খুঁজে দেখেছো রাশেদের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট টা আছে কিনা?
– জ্বি স্যার। কেনো খুঁজবোনা। আমি তো অনেক চিন্তিত।… কিছু কি হয়েছে?
আমতা আমতা করে বললো ফরিদ,

– না তো.. ঠিক আছে।
হঠাৎ কাজের মেয়েকে ফরিদ ধমকে উঠলো,
– তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যা এই চা টা ফেলে ভালো চা করে নিয়ে আয়।
চা নিয়ে কাজের মেয়ে ভেতরে চলে গেলো। ফরিদ শাহাদকে বলে উঠে গেলো। কিছুক্ষন পর রুম থেকে বেরিয়ে এলো ঠিকই কিন্তু মুখে আগের মত খুশি খুশি ভাবটা নেই। এসির নিচে ঘামছে। কপালে চিন্তার ভাব। পাভেল বললো,
– স্যার আপনার কি কিছু হয়েছে?
পাভেলের দিকে তাকিয়ে কেমন অন্য মনস্ক হয়ে গেলো। কাজের মেয়েটা আরেক কাপ চা এনে শাহাদকে দিলো। এবার চায়ে চুমুক দিয়ে শাহাদ বলে উঠলো,
– ওয়েল ডান, এবার হয়েছে।
মেয়েটার চোখে মুখে খুশি উতলে উঠলো।
ফরিদ শাহাদকে ভাঙা গলায় বললো,

– শাহাদ শরীরটা খারাপ লাগছে। আজ থাক।পরে একদিন বসবো নাহয়?
– আচ্ছা স্যার আজ আসি তাহলে।
উঠে দাঁড়ায় শাহাদ, পাভেলকে নিয়ে বের হয়ে যায়। দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় পাঞ্জাবির কলারটা পেছন দিকে ঠেলে বুকের উপর থেকে সানগ্লাসটা বের করে চোখে লাগায়। পাভেল শাহাদের এই রূপ দেখে বোকা বনে যায়। এই রূপ সাদা মাটা শাহাদের রূপ নয়, এ যেন সাক্ষাৎ মারপিটে, গুন্ডা শাহাদ। পকেট থেকে সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে সিগারেট জ্বালায় হাঁটতে হাঁটতে। পার্কিং এরিয়াতে গাড়ি নিয়ে আসে কেয়ারটেকার। দু আঙ্গুলে অভিনব স্টাইলে সিগারেট টানা দেখে পাভেল রীতিমতো থতমত খেয়ে বসে আছে। ধোঁয়া ছাড়ছে কায়দা করে। গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে পাভেল বসে পড়ে। ডোর খুলে শাহাদ বসেই পকেট থেকে ফোন বের করে মেসেজ লিখে,

– Well done Tamanna. Keep it up. Will be rewarded very soon.
পাভেল গাড়ি চালাতে চালাতে রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে বলে,
– স্যার মিনিষ্টারের বাসায় কাজের মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছিলোনা না?
– খেয়াল করিনি।
– মিনিষ্টার এমন ঘাবড়ে গেলো কেনো?
– আমাকে বলে ঘাবড়েছে?
অকস্মাৎ শাহাদ হেসে উঠলো। তাচ্ছিল্যভরা বিদঘুটে সেই হাসি। পাভেলের দুই অধর ‘হা’ সদৃশ হয়ে গেলো। শাহাদ চোখে তুলে পাভেলের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের শেষ ফিল্টার টুকু ফেলে ধোঁয়া ছেড়ে বলে,

– The Game will start from now…
শাহাদের বাঁকা হাসি বলে দিচ্ছে বড় গেমটা শাহাদ খেলেছে। কি হতে পারে সেই গেম!
– স্যার একটা প্রশ্ন করি?
– কর
– আপনি তো রাশেদ স্যারের পোস্টমর্টেম করাতে রাজি ছিলেন না পরে কেনো করালেন?
– তুই দেখেছিস করাতে?
– মানে? করান নি??? তাহলে মনির কাছে কিসের রিপোর্ট ওটা?
– কথা কম বল গাড়ি চালা…

খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো তুহিন। হামজাকে ডেকে বললো,
– পেয়ে গিয়েছি। বস ফোন দিয়ে জানিয়েছে। তামান্নাকে বের করে আনতে বলেছে।
– কোথায় পেয়েছিস?
– এখন আপাতত ক্যাপ্টেন তানভীর ওটা হেফাজতে রেখেছে। বসের কাছে পৌঁছে দিবে।
হামজা,তুহিন এবং লাবিবের স্বস্থির নিঃশ্বাস। অহনার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ছিলো মিনিষ্টার ফরিদের কাছে। এই একটা রিপোর্টের জন্য এত চাল চেলেছে শাহাদ। গোয়েন্দা অফিসার তামান্নাকে ও কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলো সেই রিপোর্ট উদ্ধারের জন্য। এন্টিকের সেই ঘড়িতে লাগানো ছিলো হিডেন ক্যামেরা। সব প্রমান আছে কোন কোন অফিসার,এমপি মন্ত্রীর হাত আছে রাশেদের কেসের পেছনে। খেলা এখনো বহুদূর। অহনার পোস্টমর্টেম রিপোর্টই বলে দেয় অহনা রাশেদ দ্বারা রেইপড ছিলো না। রহস্য হলো সেদিন কেনো অহনা রাশেদের রুমে গিয়েছিলো! আর মনির চুরি করা রিপোর্ট ই বা কিসের রিপোর্ট!

শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গাজীপুরের মির্জাপুর ইউনিয়নে এই রিসোর্ট। ৩৫ একর জমির উপর অবস্থিত এই সুবিশাল রিসোর্ট বেছে নেয়ার একটাই কারণ সকলের মন খুলে আনন্দ করা। সাথে সুইমিংপুল তো আছেই। সবুজে ঘেরা অনাবিল সৌন্দর্য্যের আঁধার এই রিসোর্ট। এখানে পৌঁছেই সকলের মন ভালো হয়ে গেলো। রিসোর্ট কতৃপক্ষ সকল আয়োজন করে রেখেছে। গায়ে হলুদ এবং বিয়ে দুটিই এখানে হবে। যে যার যার ভিলা বুঝে নিলো। শাহাদকে ঘুরিয়ে পুরো রিসোর্টের নিরাপত্তা দেখাচ্ছে ম্যানেজার। অন্যদিকে পুলিশ সিকিউরিটি তো আছেই।
দরজায় কড়া নড়তেই সুলতানা কবির দরজা খুলে দিলেন। ছেলেকে দেখে হেসে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। রায়হান সাহেব ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা হাতে টিভিতে চ্যানেল ঘুরাচ্ছে। হেসে বললেন,

– বসো শাহাদ।
– আব্বু বেশিক্ষন বসবোনা। আমি সিকিউরিটি সিস্টেমটা দেখলাম সব ঠিক আছে। আপনারা এদিকটা সামলে নিবেন। পাভেল, হামজা,লাবিব এখানেই থাকবে। অনুষ্ঠানের দিকটা কাব্য,নিশাদ,রজত সামলে নিবে। যদি প্রয়োজন হয় জানাবেন।
– তুমি কোথায় যাচ্ছো?
– আম্মু ভুলে গেলে চলবেনা, বাসায় আরেকজনকে রেখে এসেছি। যতই ওকে নিরাপত্তার বেষ্টনী দিয়ে রেখে আসি না কেনো, চিন্তা থাকবে। আমার মতো কেউ নিরাপত্তা দিতে পারবেনা। কিছুক্ষন পর চলে যাব। কাল আসবো আবার।
রায়হান সাহেব হেসে বললেন,

– শাহাদ তুমি তোমার বাবাকে কি ভাবো?
– অবশ্যই আমার জন্য সুপার হিরো। আপনার হাত ধরেই তো সব শেখা।
– তাহলে কেনো ভাবলে না যে তোমাদের ছায়া এখনো বেঁচে আছে। আমি আর তোমার আম্মু দশটায় চলে যাব। তোমাকে এখানে দরকার সুলতানা মঞ্জিলে নয়।
সুলতানা কবির ছেলের কাঁধে হাত রেখে বলে,
– বাবু, এখানে আমার ছেলে,মেয়ে, নাতি-নাতনী এবং বৌমাদের পাহারায় তোমাকে রেখে যাচ্ছি। ওখানে আমি আর তোমার বাবা না হয় উচ্ছলে যাওয়া মেয়েটাকে দেখে রাখবো। চিন্তা করতে হবে না। ও হ্যাঁ, এত আবেগী হয়ে পড়ো না। আমরা এখানকার অনুষ্ঠান শেষ করে এরপর যাব। এমনিতেও তোমার আব্বুর ঘুম হবেনা নিজের বিছানা ছাড়া।
বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে শাহাদ বলে,

– পৃথিবীতে অনেক সন্তানের জন্ম হবে,অনেক বাবা মা আসবে কিন্তু রায়হান মাহবুব আর সুলতানা কবিরের মতো বাবা মা যুগে যুগে গুটি কয়েক বার আসবে। আমি ধন্য।
সুলতানা কবির ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– পৃথিবীতে অনেক সন্তান আসবে,তবে আমার বাবুর মতো একটিও আসবেনা হয়তো,আসলেও তারা শাহাদ ইমরোজ হতে পারবেনা। আমি ধন্য তোমায় গর্ভে ধরে।

মরিচ বাতির ঝিলমিল আলো, স্লো মিউজিকে গান বাজছে। শাহাদের নির্দেশ প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগে যেন লাউড মিউজিক বাজানো যাবেনা। সন্ধ্যার পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। সবার হলুদের শাড়ি এক রকম, দিয়া এবং নওরীন ব্যাতীত। তাহির ইচ্ছেতেই এমনটা হয়েছে। তাহি দুই ভাবীকে দুই রূপে দেখতে চেয়েছে। খোঁপায় হলুদ গাঁদা, হাতের রেশমি চূড়ি হলদে এক প্যাচী বাঙালী ধাঁচের শাড়িতে তাহিকে দেখলে যে কেউ বলবে এই মেয়ের বয়স বড়জোর চব্বিশ কি পঁচিশ। ছেলেরা সব সাদা পাঞ্জাবী পরেছে। হলুদের স্টেজ সাজিয়েছে। পুরো রিসোর্ট আজ আলোকিত। তাহি হলুদের ডালা গুলো নিয়ে স্টেজে রেখে আসলো। শিফা, বিদিপ্তা সবার হাতে কাজ। স্টেজ থেকে নামতেই ধাক্কা খেলো লিমনের সাথে। আজ রাগ না করে সোজা নেমে পড়ে। মনে মনে ভাবছে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছে এই ছেলে। উপেক্ষা করে চলে আসে। থমকে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো লিমন সাউন্ডবক্সের লোকজনের সাথে কথা বলছে। আজ তাহিকে একটুও জ্বালাতন করছেনা। তাহি বিস্মিত হলো। মনে মনে খুশি হয়ে রিসোর্টের ভেতর চলে গেলো। নওরীনকে বিউটিশিয়ান এনে সাজানো হয়েছে। দিয়া এক পাশে বসে দেখছে। সাজানো শেষে বিউটিশিয়ান দিয়াকে বললো,

– ম্যাডাম সব কি ঠিক আছে?
দিয়া এগিয়ে এসে বললো,
– মাশা আল্লাহ সব ঠিক আছে। কারো নজর না লাগুক।
নওরীন হেসে বলে,
– ভাবীমা আপনি যেখানে আছেন সব ঠিক থাকতেই হবে।

শিফা,বিদিপ্তা,তাহি, নিশি,নিশাদের বউ সবার সাজগোছ সব শেষ হলো। দিয়া নিজের মত সাজতে বসেছে। শাড়ি পরেছে কুচি দিয়ে। ব্লাউজের হাঁতা হাতের কবজি অবধি ঢাকা। কলাপাতা রঙের রাজশাহী মসলিন শাড়ি। গলায় মাল্টিকালার এন্টিক সেট। মাথায় হলুদ,কলাপাতা শেডেড হিজাব। সব মিলিয়ে অনবদ্য লাগছে। লেন্স পরতে বলেছিলো বিদিপ্তা। ঘন কালো কুচকুচে চোখে লেন্স পরলে মনে হলো ভালো লাগবেনা।তাই আর পরা হয়নি। এক প্যাচে শাড়ি পরলে শেহজাকে সামলাতে পারবেনা। শাড়ির আঁচল ও ছাড়েনি।একেবারে সেফটিপিন দিয়ে সেট করে ফেলেছে।দু হাতে গাঁদা ফুলের বালা পরেছে। এখানে আসার পর থেকে শাহাদের সাথে আর দেখা হয়নি।
স্টেজের বসে আছে শাহীন। শাহীনের কয়েক জন বেস্ট ফ্রেন্ড এসেছে। শাহাদের বন্ধুদের মধ্যে চারজন এসেছে। সকলে স্টেজে বসে আছে। অকস্মাৎ প্ল্যান চেঞ্জ করে ফেলেছে শাহাদ। নওরীনকে ভেতর থেকে বের না করার নির্দেশ দিয়েছে। হঠাৎ এমন চেঞ্জে বিচলিত সবাই। পাভেল কাজী নিয়ে এসেছে। রায়হান সাহেবসহ চাচা ফুফুরা সবাই প্রশ্ন করছে শাহাদকে। আলাদা রুমে বৈঠক বসেছে। শাহাদ কেন্দ্রবিন্দু। শাহীনকে ডেকে নিয়ে এসেছে আলোচনায়। শাহাদ সবার সামনে দৃঢ় আওয়াজে বলে উঠলো,

– এমন একসাথে হলুদের জায়েজ সাধারণত নেই। বিয়ে তো হবেই ইনশাআল্লাহ কালকে।আজকে হলে সমস্যা কি? কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানোর পর একসাথে হলুদ করুক আর যাই করুক তাতে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। স্টেজে উঠানোর আগেই বিয়ে পড়ানো হোক।
সম্মতি দিয়ে রায়হান সাহেব বলে উঠলেন,
– পড়ান তবে বিয়ে কাজী সাহেব। আমার আপত্তি নেই।

শাহীন স্তব্ধ। বুঝতেই পারেনি ভাইজান এতটা করবে তার জন্য। একটা সম্পর্কে হালাল সম্পর্কে রূপ দিতে এই মানুষটা তার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছে। শাহীনের কাছ থেকে কবুল পড়িয়ে স্বাক্ষর নিয়ে নওরীনের কাছে আসে। শাহাদ এই প্রথম চেয়ার টেনে নওরীনের পাশে বসলো। কবুল বলার আগে নওরীনের চোখে পানি দেখে মাথায় হাত রাখলো। দিয়াকে ইশারা দিয়ে পাশে বসালো। সুলতানা কবির, মঞ্জিলা,সাবিনা,ইফাত সবাই বসলো। শাহাদ মাথায় হাত রাখতেই নওরীনের কান্নার জোর বেড়ে গেলো। ওর একজন চাচা,মামাও আসেনি আজ। হয়তো সাবেক এমপির ছেলে শুনলে আসতো। সে কথা গোপন রেখেছিলো রায়হান সাহেবের আদেশে। ভেবেছে তাদের অমতে নিজের পছন্দে বিয়ে করছে কেনো আসবে এই বিয়েতে! নওরীনের কান্না থামাতে শাহাদ বলে উঠলো,

– দেশ রক্ষাকারী সেনাকর্মকর্তা তোমার স্বামী। স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসার,দায়িত্ব, সুখ-দুঃখ সব সামলে যখন ক্লান্ত হয়ে উঠবে তখন ভাববে তোমার একজন শাহীন ইমরোজ আছে। যদি সেখান থেকেও আঘাত প্রাপ্ত হয়ে যাওয়ার জায়গা না পাও তখন ভাববে তোমার মাথার উপর একজন বড় ভাইজান আছে যার দরজা তোমার জন্য চিরকালের মত খোলা। সবার বাবার বাড়ি থাকলেও তোমার ভাইজানের বাড়ি আছে। সেখানে তুমি একমাত্র একচ্ছত্র অধিকারী। তুমি বাকিদের চেয়ে স্পেশাল ভাইজানের কাছে। ভাইজান ছাড়াও সেখানে মমতাময়ী ভাবীমাকে পাবে। আর কিছু কি লাগবে?
নওরীন কাঁদতে কাঁদতে হেচকি উঠিয়ে ফেলেছে। দিয়া একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে।সুলতানা কবির দুজনকে আগলে ধরে। কবুল বলে নিজের নাম লিখে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে শাহীন ইমরোজের হৃদয়ে রাজ করা বৈধ রাজরানী রূপে। কাজীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শাহাদ। নওরীনকে স্টেজে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয় সকলকে।

শাহীন সদ্য বিয়ে হওয়া সহধর্মিণীকে দেখে মন ভুলানো হাসি দিলো। কলাপাতা ও গোলাপী রংয়ের জামদানীতে মনে হচ্ছে সদ্য ফোটা পদ্মফুল। শাহীনের হাসি যেন মনের মাঝে ঝড় তুলেছে নববধূর। সদ্য স্বামী হওয়া পুরুষকে উপহার দিলো প্রাণ ভরিয়ে তোলা মিষ্টি হাসি। দুজনকে একসাথে বসানো হলো। স্লো মিউজিকে গান বাজছে। শাহাদ রজতকে ডেকে বললো গানের সাউন্ড বাড়িয়ে এঞ্জয় করতে। নিজে একটু দূরে সরে আসলো।এই আওয়াজ মাথায় লাগে। একপাশে বন্ধুদের সাথে কথা বলছিলো। শাহাদের চারজন বন্ধু এসেছে। ডাক্তার মল্লিকা রহমান, পাইলট কানিজ রোকসানা, পুলিশ কমিশনার রকিব হালদার ও ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান। কেউই স্কুল কলেজের বন্ধু নয়।সকলে কর্মসূত্রে পরিচিত আজ পনেরো বছর ধরে। সকলেই সংসার, পরিবার, কাজ নিয়ে ব্যস্ত।শাহাদ আজকের এই আনন্দের সন্ধিক্ষণ বন্ধুদের সাথে কাটাতে চেয়েছে।যারা সবসময় বিপদে- আপদে পাশে ছিলো। আলাপের মাঝে রোকসানা বলে উঠলো,

– ভাবীর সাথে পরিচয় করাবিনা? মেয়েটাকে ও তো দেখলাম না।
– কল করেছি আসছে।
দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে গুটি পায়ে মেয়ে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসছে রমনী। শাহাদ প্রায় অবাক হয় এই নারীর রূপে।একেক সাজে একেক রকম। এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে রাণী। মনের মাঝে ঝড় তুলেছে এই রমনী। সামনে এসেই দিয়া সালাম দিলো। শাহাদ কানিজের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলো মেয়েটা হা করে তাকিয়ে আছে। কানিজের মনে কি চলছে শাহাদ বুঝতে পেরেছে। শেহজাকে কোলে নিয়ে বললো,

– এই হচ্ছে আমার রাজকন্যা। ইনি তার মা,আমি তার অপ্রিয় স্বামী।
রকিব হালদার সালাম দিলেন। শেহজাকে কোলে নিয়ে বললো,
– মা শা আল্লাহ সত্যই রাজকন্যা।
শাহাদ দিয়াকে পরিচয় করিয়ে দিলো সকলের সাথে। কানিজ রোকসানা বললো,
– এই শাহাদ, তোর বউ যে আমার বিশ্বাস হচ্ছে। উনি তো অনেক ছোট। বাল্য বিবাহ করলি?
সকলে হেসে উঠলো। দিয়া লজ্জা পেলো। শাহাদ মৃদু হেসে বলে,
– পাওয়ার অফ শাহাদ ইমরোজ বুঝলি।
মনিরুজ্জামান হেসে বলে,

– ভাবী আপনাকে কি জাদু করেছে এই শা*লা! যে আপনি সহজে বিয়ে করে নিলেন?
দিয়া তখনো হাসছে। কানিজ হেসে বলে,
– আমি শিউর শাহাদ কিডন্যাপ করে বিয়েটা করেছে।
ডাক্তার মল্লিকা দিয়াকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
– ওরা মজা করছে আপনি কিছু মনে করেন নি তো ভাবী? আসলে আমরা অনেক ক্লোজ শাহাদের।
– না আপু। উনি তো কথাই কম বলে। আপনাদের সাথেই দেখলাম একটু হাসি খুশি আছে।
কিছুক্ষন সকলে আড্ডা দিয়ে স্টেজের দিকে চলে গেলো। শাহাদ স্টেজের সামনে চেয়ারে বসেছে বন্ধুদের নিয়ে। হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো। খুব তাড়াতাড়ি হলুদ লাগানোর পর্ব শেষ করেছে। এখন কালচারাল পার্টে চলে গেলো। সবাই গান-বাজনা নিয়ে রেডি। স্টেজ বিশ মিনিটের মধ্যে রেডি করেই যে যার যার পজিশন নিলো। অন্ধকারে নিমজ্জিত স্টেজে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো। লিমন প্রথম গানের সুর ধরলো,

মা লো মা, ঝি লো ঝি
বইন লো বইন, করলাম কী?
রঙ্গে ভাঙ্গা নৌকা
বাইতে আইলাম গাঙ্গে।
একসাথে কাব্য, রজত,নিশাদ কোরাস করে গেয়ে উঠলো,
কালীর নয়নজলে
জলে বুক ভেসে যায়
কী সাপে কামড়াইলো আমার
দুর্লভ লকাইর গায়
কালীর নয়নজলে
জলে বুক ভেসে যায়
কী সাপে কামড়াইলো আমার
দুর্লভ লকাইর গায়
আর কোথায় রে মা মনসা
তোমায় প্রণাম জানাই
কালীর নয়নজলে।
শাহীন গাইলো,
ছিলাম শিশু, ছিলাম ভালা
না ছিলো সংসারের জ্বালা
সদাই থাকিতাম মায়ের সঙ্গে
ছিলাম শিশু, ছিলাম ভালা
না ছিলো সংসারের জ্বালা
সদাই থাকিতাম মায়ের সঙ্গে
আমার দেহেতে আইলো জুয়ানি
উজান বহে গাঙ্গের পানি
কামিনী বসিলো ভাব অঙ্গে
ভাঙ্গা নৌকা বাইতে
আইলাম গাঙ্গে।
পুরো গান শেষে রকিব হালদার মাইক টা হাতে নিয়ে বলে,

– বিয়ের দিনই তুমি সংসারের জ্বালার কথা চিন্তা করো। আহারে নতুন ভাবী আপনার কপাল পুড়ছে।
নওরীন হেসে উঠলো। শাহীন স্টেজ থেকে নেমে সবার সামনে বললো,
– তুমি কি রাগ করেছো? আমি কিন্তু এত কিছু ভেবে গাই নি।
নওরীন হেসে বলে,
– আজকে কিছুতে রাগ করবোনা। এঞ্জয় করো।আমার ভালো লেগেছে তোমার বেসুরে কন্ঠের গান। ধন্যবাদ জনাব।
শাহাদ হাসছে ওদের দেখে। পাশে বাবা মাকে ও দেখলো তারাও হাসছে। আড়চোখে দিয়াকে দেখলো হাত তালি দিয়ে গানের বিটের সাথে। লিমনকে নামতে বললো ইশারাতে। কিছু একটা বলাতে লিমনের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। লিমন নিজের জায়গায় গিয়ে নতুন মিউজিক ধরলো। মাইক হাতে নিয়ে সকলকে চমকে দিয়ে কাটখোট্টা, নিরস শাহাদ গেয়ে উঠলো,

আমার সকল অভিযোগে তুমি
তোমার মিষ্টি হাসিটা কি আমি?
আমার না বলা কথার ভাঁজে
তোমার গানের কত সুর ভাসে
তোমায় নিয়ে আমার লেখা গানে
অযথা কত স্বপ্ন বোনা আছে
আমার হাতের আঙুলের ভাঁজে
তোমাকে নিয়ে কত কাব্য রটে
ভুলিনি তো আমি তোমার মুখে হাসি
আমার গাওয়া গানে তোমাকে ভালোবাসি
আসো আবারও কাছে, হাতটা ধরে পাশে
তোমায় নিয়ে যাব আমার পৃথিবীতে
এই পৃথিবীতে।

সায়রে গর্জন পর্ব ২৩

প্রতিটি বাক্য যেন শাহাদের না বলা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মুগ্ধ নয়নে স্তব্ধ হয়ে দেখলো অনুষ্ঠান জুড়ে সকলে। এই কটা লাইন যেন যথেষ্ট ছিলো রমনীর হৃদয়ে ঝড় তোমার জন্য। অনেকেই অবাক।শাহাদ গান এত ভালো গাইতে জানে এই কথা তাহি ছাড়া কেউ জানতোনা। রাশেদের গানের পার্টনার ছিলো শাহাদ। সে কথা রাশেদের সাথেই নিরবে গোপনে সমাহিত হয়েছিলো সেদিন। আজ শাহাদকে গাইতে দেখে তাহির চোখে পানি। রিপোর্ট নিয়ে কথা বলতে চাইলেও শাহাদ জানিয়েছে পরে বলবে। তবে ভাইজানকে এভাবে দেখে আজ নিজের কাছেও শান্তি লাগছে। মানুষটা গোমট খুলে বেরিয়ে আসুক।সবাই তাকে চায়। সে সুস্থ হয়ে সকলকে ভালো রাখুক এটাই যেন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

সায়রে গর্জন পর্ব ২৫